❝কাজলদীঘি❞
BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১০৭ নং কিস্তি
—————————
নেপলার কথা শুনে সবাই হাসছে।
হ্যাঁগো ম্যাডাম, হেসো না।
সকালে তুমি বললে না, হ্যাঁরে নেপলা অফিসের এই ভাড়া গাড়ি এলো কেন, এই প্রথম আমাদের বাড়িতে ভাড়াগাড়ি ঢুকলো, এতে কে যাবে?
মিত্রা বিষ্ময় ভড়া দৃষ্টিতে তাকাল নেপলার দিকে!
তার আগে অবিদদাকে দাদা বকেছে।
দাদাই বলেছিল আমাকে একটা তোর ভাড়ার গাড়ি জোগাড় করে দে।
আবিদদা বললো, কেন তোমার গাড়ি আছে তো, আমার গাড়িটা তোমার পছন্দ নয়।
ওমনি আবিদদা ঝাড় খেল।
তখনই বুঝে গেছি ডাল মে কুছ কালা।
আবিদদাকে বললাম, তুই শুধু দাদাকে ফলো করে যা, পরে তোকে সব বলছি।
তিনজনে একসঙ্গে খেয়েদেয়ে বরলাম। দাদা ভাড়ার গাড়িতে ওঠার সময় লগবুকে সাইন করেছে। নামার সময়ও লগ বুকে সাইন করে নেমেছে। আমরা দু-জন দাদার পেছন পেছন এসেছি।
দাদা গাড়ি থেকে নেমে লগবুকে সাইন করে অফিসের ভেতরে চলে এলো।
আমি আমাদের গাড়ির কিলোমিটার দেখলাম।
ওঠার সময় আবিদদাকে বলেছিলাম কিলোমিটারটা নোট কর।
দাদার কোথাও একটা খটকা লেগেছে।
ঠিক তাই। আমাদের গাড়ির কিলোমিটার হয়েছে নয় আর দাদার গাড়ির কিলোমিটার হয়েছে তেরো। চার কিলোমিটার বেশি।
আমি বললাম আবিদদা, ঘণ্টা দুয়েক সময় পাবি, দাদা মালটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবার আগে, এখুনি কাজ সেরে ফেল।
আবিদদার মাথা টাঁই করে গরম হয়ে গেল। হারুণকে ডেকে বাপ-বাপান্তর। হারুণ যে কটা গাড়ি দিয়েছে তার প্রত্যেকটায় গণ্ডগোল ধরা পরলো। পঁচিশটার মধ্যে কুড়িটা গাড়ি বাতিল।
অফিসের কাজ চলছে কি করে! অদিতি বলে উঠলো।
তোমার কাছে একটাও ফোন এসেছে?
না।
তার মানে গাড়ি নিয়ে কোনও প্রবলেম হয়নি?
এই যে বললি গাড়ি বাতিল!
আবিদদা আরও বেশি গাড়ির ব্যবস্থা করেছে, ফিডব্যাক দেওয়ার জন্য।
সামলাচ্ছে কে?
আমি চিনি না। আবিদদা চেনে। তবে রবীণদা আর ইসমাইলভাই আছে।
তোরা তো সব তৈরি হয়ে গেছিস—চম্পকদা বললো।
নেপলা হাসছে।
আপনি একবার ভাবুন চম্পকদা, কি নিস্তব্ধে কাজ সেরে ফললো। সুতনুবাবু বললো।
চা খাবি? আমি বললাম।
না খিদে পেয়ে গেছে। আমি সব বলে এসেছি।
মিত্রা হাসছে।
দাদাদেরটা এ ঘরে, আমাদেরটা ম্যাডামের ঘরে।
চম্পকদা, নেপলার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
তুই কি করে জানলি আমরা কি খাবো?
বড়োমাকে ফোন করলাম। বড়োমা যা বললো সেই ভাবে অর্ডার দিলাম।
আবিদ চোখ মুখ কুঁচকে ঘরে ঢুকলো। দাদার দিকে একবার তাকিয়ে ইসারায় ঘরে ঢোকার অনুমিত নিল। আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো।
নিজে নিজেই চেয়ারে এসে বসে পরলো।
আমার দিকে কাগজগুলো এগিয়ে দিল।
কি এগুলো?
কেন নেপলা কিছু বলে নি। সকালেই বলতে পারতে, তাহলে ঝামেলা করতে হতো না।
তোকে ঝামেলা করতে কে বললো?
বা রে আমার লোক এখানে কাজ করছে। ঝাড়টা লাস্টে কে খেত?
মিলি শব্দ করে হেসে উঠলো।
হেসো না মিলিদি। নিজেরা তো বেশ সাইড হয়ে গেলে। মরতাম আমি অদিতিদি।
আমি কাগজগুলোয় একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম।
তোকে কে সাহায্য করলো?
টিয়া ম্যাডাম।
তারমানে সারা অফিস রাষ্ট্র করে দিয়েছিস।
কেউ জানে না।
এবার কি করবি?
লাস্ট ছয় মাসের বিলে যেটা এক্সট্রা নিয়েছে এ মাসের বিল থেকে সেটা বাদ যেতে শুরু করবে। গাড়ি সব ঠিক করে আনতে বলেছি।
তাপসেরগুলো?
তাপসদার আবার হাফ কিলোমিটার কম হচ্ছে। তাপসদা বলছে ওটাই ঠিক। আমি হারুণকে বলেছি, তাপসদা যেখান থেকে চেক করে সেখান থেকে চেক করিয়ে আন। তাতে পারলে কাজ করবি না পারলে ছেড়ে দে।
অদিতিকে দে। দেখে নিক।
আবিদ, অদিতির কাছে উঠে গেল।
অদিতি—
অদিতি আমার দিকে তাকাল।
বিতানের থেকে ওর বউটা একটু চালাক চতুর। কাজও ওর থেকে ভালো বোঝে। বিতানের জায়গায় ওর বউকে বসিয়ে দাও।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। নেপলা খাবার আনতে পাঠা।
দাদার দিকে তাকালাম।
তোমরা একটু বসো, আমি আসছি।
আমাদের সঙ্গে মিটিংটা কখন করবি?
আসছি। খেয়ে নাও।
চম্পকদা।
বল।
তুমি, রনিতা দিদিমনি, সুতনুবাবু এখন যেও না। আর একটু কাজ আছে।
রনিতাকে ছেড়ে দে ও অসুস্থ।
নেপলা খাবার আনতে বলেছে খেয়ে নিক, তারপর বাড়ি পৌঁছে দেবে।
রনিতা দিদিমনির দিকে তাকালাম।
একদিন ফোন করে আপনার বাড়ি চলে যাব।
রনিতা দিদিমনি হাসলো।
বসুন।
আমি ঘরের বাইরে এলাম। করিডোর দিয়ে সোজা হেঁটে নিউজরুমের কাঁচের দরজার সামনে দাঁড়ালাম। ভেতরে আমার পরিচিত সবাইকে দেখতে পেলাম।
ভেতরে ঢুকতেই মল্লিকদার চেয়ারের পাশে অরিত্রকে দেখতে পেলাম। চোখাচুখি হয়ে গেল।
অর্ক। অরিত্র চেঁচিয়ে উঠলো।
অর্ক পেছন ঘুরে তাকিয়েই টেবিল থেকে উঠে এলো।
যাক তাহলে নিউজরুমের কথা তোমার মনে পড়েছে।
আমি চারদিকে চোখ বোলাচ্ছিলাম।
কি দেখছো, কতোটা পরিবর্তন হয়েছে।
একটু একটু করে চারদিকে ভিড় জমে গেল।
অনেক নতুন ছেলেমেয়ে। কাউকেই চিনি না।
চলো আগে নিজের টেবিলটায় গিয়ে বসো।
অর্ক আমার হাত ধরলো। পায়ে পায়ে নিজের টেবিলটার দিকে এগিয়ে এলাম।
টেবিলটা যেমন ছিল ঠিক তেমনি আছে। শুধু চেয়ারটার পরিবর্তন হয়েছে। আমার সেই চটাওঠা চেয়ারের জায়গায় একটা গদিওলা ঘোরন চেয়ার এসেছে।
সন্দীপকে দেখতে পাচ্ছি না?
দ্বীপায়নদার কাছে গেছে। অর্ক বললো।
কেন?
পেজ সেটিং করতে।
একটু চা খাওয়া।
এই হ্যাজানো শুরু করলে।
পাশাপাশি যারা দাঁড়িয়ে আছে, তারা মাঝে মাঝে ফিক ফিক করে হাসছে।
ঘোরোন চেয়ার কেন, আমার সেই চায়ার।
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।
সকলে হাসছে।
দূর থেকে দেখলাম, সন্দীপ, দ্বীপায়ণ নিউজরুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো।
সোজা এদিকে এগিয়ে এলো।
কখন এলি?
জাস্ট এলাম।
বোস।
দাদার ঘোরোন চেয়ার কেন, দাদার সেই চেয়ারটা এনে দাও। অর্ক বললো।
সন্দীপ হাসছে।
আজকে বোস, কালকে ঠিক খুঁজে বার করে দেব।
দ্বীপায়ণ।
দ্বীপায়ণ হাসছে।
হাসছো কেন?
তুমি তো সোর মাচিয়ে দিয়েছ।
আবার কি অন্যায় করলাম?
আমার ঘরের ছেলেরা এখুনি মুখ শুকিয়ে অমসত্বের মতো বসে আছে। যারা এতোদিন ফোঁস ফাঁস করতো এখন দেখছি সাপুরের গন্ধ পেয়ে গেছে, গর্ত খুঁজছে। দ্বীপায়ণ হাসতে হাসতে বললো।
বস আমার একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করছে—
বল—
তুমি কি ভগবান—
রমকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, বামাক্ষ্যাপা ভগবান ছিলেন?
এই তুমি উল্টো পূরান শুরু করলে।
বল না—
তোমার আমার মতো সাধারণ মানুষ ছিলেন।
তোর ঘরে নিশ্চই রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের ফটো আছে?
আছে—
প্রত্যেকদিন ইচ্ছে হোক, অনিচ্ছায় হোক একবার কপালে হাত ঠেকিয়ে ঘরের বাইরে আসিস।
এই টুকু করি—
কেন করিস?
শ্রদ্ধায়।
কেন শ্রদ্ধা করিস। তুই একজন শিক্ষিত মানুষ উনি একজন গো-মুর্খ মানুষ। তবু….।
একটা মিথ—
কিসের মিথ? তোরা গল্প গাথায় তাদের কাজকে মিথে পরিণত করেছিস। তাঁরা তোর আমার মতো সাধারণ মানুষ। তাদের কাজের পরিধি তার ব্যাপ্তি তাকে ভগবানের পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। তুই এই কথাই বলতে চাইছিস তো?
ভিড়টা আরও ঘন হলো। চারদিক নিস্তব্ধ।
টেলি প্রিন্টারের কেঁচর কেঁচর আওয়াজ তীব্রভাবে কানে এসে লাগছে।
আবার বলি, মানুষ চেন, প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা আলাদা চরিত্রে গড়া। আমরা কেউই কাম, ক্রোধ, লোভ, মাৎসর্য, ক্ষুধা এর বাইরে নয়। এই পঞ্চরিপুর প্রকাশ আমরা চাক্ষুষ দেখতে পাই। কিন্তু মনকে যদি একটা রিপু হিসাবে ধরি তা ইনভিজিবিল।
ঠিক এই জায়গার খেলাটা কাউকে ভগবান বানায় কাউকে অসুর বানায়। তোদের অনিদাকে কেউ যদি ভগবান বলে তাতে অনিদার কিছু যায় আসে না। অনিদার ইনটিউসনটা ভীষণ কাজ করে। বলতে পারিস থার্ড সেন্স। হ্যাঁ, এটা বলতে পারি, তোদের থেকে আমি ওই সেন্সটার একটু বেশি চর্চা করি। আমার কেন জানি হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় এই জায়গাটায় একটা গণ্ডগোল থাকতে পারে। কেননা মানুষ ভীষণ লোভী, সে কিছুতেই তার লোভ সম্বরণ করতে পারবে না। হয়ও তাই। পটাপট লেগে যায়।
অর্ক পেছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরলো।
আর বলবো না।
সবাই অর্ককে দেখছে।
বিশ্বাস করো তোমাকে ভীষণ খোঁচাতে ইচ্ছে করে, খোঁচালেই কিছু না কিছু তোমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। ওটাই লাভ। মাথার মধ্যে না পাওয়ার লোভটা আরও বেশি চাগাড় দিয়ে ওঠে।
দেখ বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো কেমন ভাবে তাকিয়ে আছে। ভাবছে এ আবার কেমন জন্তু।
কেউ ভাবছে না। ওরা তোমাকে আজ চাক্ষুষ দেখছে। তবে আমাদের কাছে তোমার গল্প শুনে, তোমাকে চেনা হয়ে গেছে।
আলাপ করিয়ে দে।
অর্ক, অরিত্র সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। সবাই দেখলাম কম বেশি পা ছুঁলো।
সুমন্ত কোথায়?
রাইটার্সে গেছে।
তোদের বউ দুটো?
এবার ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই হেসে ফেললো।
ওদের নাম নেই। অরিত্র বললো।
মাঝে মাঝে গুলিয়ে ফেলি বুঝেছিস কোনটা রাত্রি কোনটা দিন।
দিন না বৃষ্টি। অরিত্র বললো।
তারমানে অরিত্রর বউটার নাম বৃষ্টি।
অর্ক হাসছে। ভিড়টার দিকে তাকিয়ে বললো।
কনফার্মেশনের পদ্ধতিটা শিখলি।
এবার ভিড় করে থাকা ছেলেমেয়েগুলো চোখ বড়ো বড়ো করলো। একজন বললো।
সত্যিতো অর্কদা ঠিক ধরেছো।
সাবধানে থাকিস। হাসতে হাসতে এমন একটা পেটে কিল মারবে না, গড়গড় করে সব বলে দিবি। যেই বলবি পরক্ষণেই বলবে, এর আমাশার দোষ আছে অর্ক, এর দ্বারা হবে না।
আমাশা বুঝিস তো।
অর্ক ওদের দিকে তাকিয়ে বললো।
সায়ন্তনদার কেশ।
আবার হাসি।
ঠিক এই জায়গাটাকে সকলে সাধারণ মানুষকেও ভগবান বলে, তাই না অর্ক?
আবার সকলের চোখ বড়ো বড়ো।
অর্ক প্রচণ্ড জোরে আমার কাঁধটা ঝাঁকিয়ে দিল।
ওমনি আমাকে টাচ করে দিলে।
দ্বীপায়ণ এখনও চা এলো না।
সে-কি! দেখতো একটু।
ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
যাও, তোমরা এবার কাজ করো।
ভিড়টার দিকে তাকিয়ে বললাম।
একে একে সবাই চলে গেল।
অর্ক, সায়ন্তনকে ধারে কাছে দেখছি না।
তোমায় বলা হয়নি, ম্যাডাম ওদের একটা আলাদ ঘর করে দিয়েছে। ফটোগ্রাফি সেকশন।
তারমানে! বেশি ফাঁকি মারার কল।
বলো না বলো, সন্দীপদাকে বলো।
সন্দীপের দিকে তাকালাম।
ওদেরও একটা প্রাইভেসি আছে।
কয়েকদিন পর ডেস্কের ছেলেরা বলবে, ওমনি একটা ঘর আলাদা করে দিবি, তার দুদিন পর রিপোর্টিংয়ের ছেলেরা বলবে একটা ঘর দিয়ে দিবি। কেন ওদের আলাদা ডার্করুম নেই?
আছে।
তাহলে। এতো বড়ো নিউজরুমটা কি করতে পড়ে আছে?
অর্কর দিকে তাকালাম।
ওদের রুমটা কোথায়?
দ্বীপায়নদের পাশের ঘরটা।
ওটা আগে কি কাজে লাগতো।
রেকর্ড রুম ছিল।
সেটা এখন কোথায়? উঠে গেছে?
না। লাইব্রেরী রুমে চলে গেছে।
সবকটাকে কাল থেকে এ ঘরে নিয়ে এসে বসাবি। প্রত্যেকটার চাঁদবদন দেখতে চাই।
দ্বীপায়ণ হাসছে।
ডাক দেখি কটা আছে একটু দেখি।
কেউ নেই সবাইকে কাজে পাঠিয়েছি। সন্দীপ বললো।
প্রেস ক্লাবে?
এই শুরু করে দিলি, একবার মাথায় ঢুকলে খালি খোঁচা।
ছিদাম চা নিয়ে এলো।
সবে মাত্র মুখে দিয়েছি, মেয়ে নিউজরুমের দরজা ঠেলে ঢুকলো। বুঝে গেলাম ডাক এসেগেছে।
পায়ে পায়ে কাছে এলো। চলো।
কোথায়?
মা ডাকছে।
মাকে বল একটু পরে যাচ্ছি।
না এখুনি।
তাহলে একটু বোস চা-টা খেয়ে নিই।
অরিত্র এগুলো কি রে?
আমার টেবিলটার দিকে তাকালাম।
তোমার চিঠি।
কয় বছরের।
বিগত সাতদিনের।
এতো!
আমাদের কেউ দেয় না।
বেছে ফেল। জায়গাটা পরিষ্কার কর।
সন্দীপ আজকের কি হাল?
সকাল থেকে লিড নিউজ পাইনি।
বানিয়ে ফেল।
কোথা থেকে?
অর্ক আর অরিত্রর হাতে গোটা দশেক করে আছে, তেলতুল দে দিয়ে দেবে।
মেয়ে হাসছে।
সন্দীপ আঙ্কেল, অর্ক মামাকে তেল দাও।
থাম, তোর বাবা বললো ওমনি তুই নাচতে শুরু করলি।
উঠে দাঁড়ালাম।
দ্বীপায়ণ তোমার লোকজন সব আছে তো?
আছে।
আমি আসছি।
তোমার ধাক্কা খাওয়ার মতো শক্তি সকলের আছে কিনা একবার পরখ করতে হবে।
হাসলাম।
নিউজরুম থেকে বেরিয়ে এসে করিডরে এলাম। অনিসার দিকে তাকালাম।
দাদাইয়ের ঘরে না মার ঘরে?
মার ঘরে চলো।
মিত্রার ঘরে এলাম।
সবাই হই হই করে উঠলো।
বাবাঃ বেশ খুশ মনে হচ্ছে সকলকে—
হবে না, মাথা থেকে একটা বিরাট পাথর নামলো। মিলি বললো।
কনিষ্কবাবু নিশ্চই মনে মনে গালাগাল দিচ্ছে।
মোটেই না। কাল শুধু শোবার আগে বলেছে, ঠেলার নাম বাবাজি।
নেপলা, আবিদ গোগ্রাসে গিলছে।
নেপলার দিকে তাকালাম।
শরীরটা ঠিক রাখতে হবে, তোমার খিদে পায় না। আমাদের পায়। নেপলা মুখে একবোঝা খাবার ঢুকিয়ে হালুম হালুম করে বললো।
তোমার জন্য একটা প্রমাণ সাইজের ধোঁসা নিয়ে এসেছি।
বেশ করেছিস।
বরুণদা হাসছে।
ইসি ফোন করে ছেলের খবর নিচ্ছে?
কেন! কোনও অন্যায় করেছে নাকি? আমি বললাম।
মিত্রা হাসছে।
মিলি, টিনা, অদিতির খাওয়া শেষ। বাথরুমে গেল হাত ধুতে। আমি মেয়ে পাশাপাশি বসলাম। দু-জনেরি এক খাবার। মিত্রা দেখলাম ফ্রায়েডরাইস খাচ্ছে। ছেলে, সুন্দরও তাই। মিলিরা বেরতে পিকু, বিতান ঢুকলো।
তোমাদের তাড়া আছে মনে হচ্ছে। মিলিদের দিকে তাকালাম।
তোমাকে পাওয়া যাবে না। গরমে গরমে সব কিছু বুঝে নিতে হবে। মিলি বললো।
খেলাম না গিললাম, বুঝলে অনিদা। টিনা বললো।
বরুণদা আমার মালপত্র।
পেয়ে যাবে। ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করো।
আবার আমাদের পেছনে কি বাঁশ দেবেন বরুণদা। মিলি বললো।
তোমাদের পেছেনে না সামনে।
বরুণদা এমনভাবে বললো, আবার হই হই করে হাসি।
টিনা বললো, ধ্যুস।
মিলি দেখলাম তার ফাইল পত্র নিয়ে আমার পাশের চেয়ারে এসে বসে পড়লো।
আবার কি হলো?
জানতে হবে না, তুমি কি ভাবে ব্যাপরটা ধরলে।
কেন তখন তো দেখলে।
দূর তখন মাথায় ঢুকেছে নাকি খালি হ্যাঁ-হুঁ করে ছেড়ে দিয়েছি।
আমি ঠাণ্ডা চোখে তাকালাম।
প্লিজ অনিদা, ওইভাবে তাকিয়ো না। মাঝে মাঝে তোমাকে ভীষণ ভয় করে।
নেপলা হাসছে। মিত্রা হাসছে।
বলো তুমি ধরলে কি করে?
প্রত্যেকটা মাসের ইনকাম এবং এক্সপেন্ডিচার দেখ। তাকে পার্সেন্টেজে পরিণত কর, দেখবে গরমিলটা ধরা পড়ে যাবে। এরপর এই যে গরমিলটা হলো কোন মাসে হলো, সেই মাসের ইনভয়েসগুলো দেখো দেখবে চম্পকদা তখন যে ব্যাখ্যা দিলো, সেই ব্যাখ্যাটা ধরতে পারবে।
তার মানে একাউন্টেসের নলেজ থাকতে হবে?
তা একটু থাকতে হবে, না হলে তুমি এই গরমিলটা ধরতে পারবে না।
বরুণদা কাল থেকে তোমার কাছে ক্লাস করতে হবে।
আমার কাছে নয়।
তাহলে!
টিয়ার কাছে করো, আরও ক্লিয়ার হবে।
বিতান বৌকে ডাক। মিলি বললো।
টিয়া আসে নি? আমি বললাম।
খাবার নিয়ে চলে গেছে। তার নাকি ভীষণ প্রেসার। মিত্রা বললো।
বরুণদার দিকে তাকালাম।
ওকে করতে দিয়েছ?
বরুণদা মাথা দোলাচ্ছে।
মেয়েটার সঙ্গে আমাকে বসতে হবে।
বসতে পার, বিতানের থেকে মাথাটা শার্প।
বিতানের দিকে তাকালাম। বোকার মতো হাসছে।
বৌয়ের গর্বে গরবিনী। টিনা বললো।
ছাগল, হাসছিস কেন, বৌয়ের কাছে কাজ শিখতে লজ্জা করছে। আমি বললাম।
তুমি বিশ্বাস করো কতবার বলেছি, বহুত দেমাক।
তুই বলতে পারলি! টিনা বললো।
কেন পারবো না। যা সত্যি তাই বললাম।
এটাকে বলে প্রফেশন্যাল এ্যাটিচুড, মাথায় রাখ তাহলেই উপকার হবে। আমি বললাম।
পিকুবাবু তোমার মাথায় ঢুকেছে?
কিছুটা, আজ রাতে বসে আবার দেখব।
মিলি মন দিয়ে ফাইল দেখছে।
টিনা এগিয়ে এলো।
মিলি পাশের চেয়রটায় বোস।
ওকে খেতে দে। মিত্রা বললো।
বরুণদা হাসছে।
কেন খাচ্ছে না। তুমি ওরকম করবে না। ঝাড়টা তুমি খেলে। মিলি বলে উঠলো।
টিনা আমাকে খোঁচা মারলো। বলো।
তুমি আমাকে তিন বছরের ব্যালান্স দিয়েছিলে।
হ্যাঁ।
তোমরা স্টক স্টেটমন্টটা দেখো।
কোনটাকে স্টক স্টেটমেন্ট বলছো বলো।
টিনাকে বোঝালাম। আমার পেছনে মিলি, অদিতি দাঁড়িয়ে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।
এই দেখো। ফার্স্ট ইয়ারে তুমি যে টাকার কাগজ কিনেছিলে সেকেন্ড ইয়ারে তার থেকে বেশি লেগেছে। তাই তো?
হ্যাঁ।
কেন? সোজা হিসাব, কাগজের দাম বেড়ে গেছে, তাই এ্যামাউন্ট বেশি লেগেছে। আমি বললাম।
আমরা তো তাই জানতাম, সেই ভাবেই মেইনটেন করে আসছি। সাপোর্টিং বিলও আছে।
এবার দেখো প্রথম বছরে কাগজ ছাপতে যা রিল লেগেছে দ্বিতীয় বছরে তার থেকে একটু বেশি লেগেছে। তুলনা মূলক ভাবে দ্বিতীয় বছরে এবং তৃতীয় বছরে কম বেশি সেম রিল লেগেছে।
তাহলে ওই বছরে কি সার্কুলেশন কম ছিলো? সার্কুলেশনের হিসাব দেখ, খুব বেশি হের ফের হয়নি। এবার রিলের জিএসএময়ে চলে যাও তাহলেই গলদটা চোখে পড়ে যাবে।
ওরে বাবা। এতো!
হ্যাঁ এতো। তোমরা বলবে অনিদা যাদু জানে। এই সাধারণ ব্যাপারটার জন্য যাদু জানার দরকার নেই। শুধু একটু বুদ্ধিটাকে খেলাতে হবে।
তারপরেই তোমার দেওয়া ব্রসিওরটা আদ্য প্রান্ত চোখ বোলালাম, পটাপট ধরে ফেললাম।
তুমি এত কিছু শিখলে কি করে?
সে একটা গল্প আছে।
বলে ফেলো, বলে ফেলো। মেয়ে বললো।
পটাপট যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা বসে পরলো।
কি রকম গল্প বলো। মেয়ে বললো।
মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম।
বলে ফেল মেয়ে বলছে।
মিত্রার দিকে তাকালাম, বেশ পরিত্রপ্ত মুখ।
নেই কাজ তো খই ভাজ।
বলো না, কেন ঝুলিয়ে রাখছো। মিলি বললো।
আমি হাসছি।
হাসলে হবে না তোমাকে বলতে হবে। অনিশা বললো।
অতীশবাবুর আগে গোপালবাবু বলে একজন মেশিনম্যান ছিলেন। আমি যখন দেখেছি তখন বুড়োর শেষ সময়। বলা যেতে পারে রিটায়ারের পরও তাকে কাজে বহাল রাখা হয়েছিল।
তখন তোমার সঙ্গে মিত্রাদির….।
কোনও যোগাযোগ নেই। এমনকি ও যে এই অফিসের মালিক তাই-ই জানতাম না।
সাংঘাতিক!
ঠিক তা নয়। তখন আমি নিউজরুমে আসি, কাজ করি, চলে যাই। নিউজরুমে আমার সম্পর্ক ছিল দুজনের সঙ্গে মল্লিকদা আর সন্দীপ।
দাদা আমার বস। কাজ করি টাকা পাই। আদার ব্যাপারী জাহাজের খোঁজ রাখতে যাব কেন।
অদিতিরা হাসছে।
যাক সে কথা। আমার জীবনের ওটা একটা আলাদা অধ্যায়।
নিত্যদিন আসা যাওয়া করাতে নিচের তলার কম বেশি সকলের সঙ্গেই মুখ চেনা চিনি। ওই সূত্র ধরেই প্রেসে যাই।
যখনই কাজের ফাঁকে প্রেসে যেতাম, দেখতাম বুড়ো বসে বসে ঝিমুচ্ছে।
মনে মনে একদিন বুড়োকে খুব গালাগাল দিলাম, শুধু ঝিমোবে আর বসে বসে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ধ্বংস করছে অফিসের। এই কাজটা যদি আমি পেতাম দু-বেলা দু-মুঠো পেট পুরে ভাত খেয়ে নিশ্চিন্তে বাঁচতে পারতাম।
তবে একটা ব্যাপারে খুব অবাক হতাম। মাঝে মাঝে বুড়া হঠাৎ চোখ খুলে চেঁচিয়ে উঠতো, এবার কাগজটা ছিঁড়বেরে গাধা, তোদের কে এতো স্পিড তুলতে বললো।
সঙ্গে সঙ্গে অতীশবাবু গিয়ে মেসিনের কানটা একটু মুলে দিয়ে আসতো।
খুব খিট খিটে ছিল, আর অকথ্য ভাষায় কাঁচা কাঁচা গালাগাল দিত।
সে কানে শোনা যায় না। কম বেশি সকলেই হাসাহাসি করতো। বুড়ো নির্বাক।
ওই ব্যাপারটা দেখে বুড়োর প্রেমে পড়ে গেলাম। ঝিমতে ঝিমতে বুড়ো কি করে বললো, মেসিনের স্পিড বেরে গেছে? অতীশবাবুও বাধ্য ছেলের মতো মেসিনের কানটা গিয়ে মুলে দিয়ে এলো।
এঁটুলে পোকার মতো বুড়োর গায়ে সেঁটে গেলাম।
প্রথম কয়েকদিন বুড়ো দুরছাই করলো।
তখন আমার শোবার জায়গা নেই। প্রেসের কাজ শেষ হলে স্ক্র্যাপ পেপার বিছিয়ে টান টান হয়ে শুয়ে পরতাম। প্রতিদিন বুড়োকে তেল দিই।
আলাপ পরিচয় একটু গাঢ় হতে বুড়ো মাঝে মাঝে বলতো গা-হাতটা একটু দাবিয়ে দে।
তখন বুড়ো যা বলতো তাই করতাম।
হঠাৎ একদিন বুড়ো ঝিমুতে ঝিমুতে নড়ে চড়ে উঠলো। বললো, দেখতো বাঁদিকের কাগজটা একটু হেজি ছাপা হচ্ছে না।
একেবারে অকাট্য সত্য। মেশিন বন্ধ হলো। দেখা গেলো কাগজের বাঁদিকটা সত্যি হেজি ছাপা হচ্ছে। এ বলে তাহলে নতুন করে প্লেট বানা, প্লেট ঝাড় খেয়ে গেছে। ও বলে এত কম সময়ের মধ্যে প্লেট বানানো সম্ভব নয়, যা আছে তাই চালা।
বুড়োর মুখ থেকে কাঁচা কাঁচা রাম খিস্তি বেরল।
যে গুলো এতক্ষণ কপচাচ্ছিল সেব চুপ করে গেল।
বুড়ো কিন্তু নির্বিকার চোখ বন্ধ করে বসে।
অতীশ।
বুড়োর গলাটা বাজখাঁই ছিল।
বলুন।
সিঁড়িদিয়ে দু-নম্বর ইউনিটে ওঠ।
অতীশবাবু তরতর করে উঠে গেলেন।
উঠেছিস?
হ্যাঁ।
বাঁদিকের প্লেটের বাঁদিক থেকে তিন নম্বর নাটটা একটু টাইট দে।
অতীশবাবু তাই করলেন।
ওখান থেকে নামবি না।
বুড়োর কথা বেদ বাক্য। অতীশবাবু দাঁড়িয়ে রইলেন।
রাম চালাতো মেশিনটা।
মেশিন রান করা শুরু করলো। মিনিট পাঁচেক পর বুড়ো বললো দেখতো হেজি আসছে কিনা।
একবারে ম্যাজিক আর হেজি ছাপা হচ্ছে না।
আমি ভাবতাম বুড়ো কি তাহলে ম্যাজিক জানে? তাই যদি না হয়, তাহলে বুড়ো বললো কি করে? আমাকে যে ভাবেই হোক বিদ্যেটা শিখতে হবে। সাংবাদিক না হতে পারি যদি মেশিন ম্যান হই তাহলেও দু-বেলা দু-মুঠো খেয়ে পড়ে দিব্যি কেটে যাবে।
এবার ফলো আপ শুরু নিজের বুদ্ধি মতো।
দেখতাম বুড়ো ঠিক বিকেলের দিকে অফিসে আসতো। অফিসের গাড়িই বাড়ি থেকে বুড়োকে তুলে আনতো।
বুড়োর ভীষণ দেমাক ছিল। প্রেসে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একজন চেয়ার এগিয়ে দিত। বুড়ো ওই যে গ্যাঁট হয়ে বসলো, কাগজ ছাপা শেষ না হওয়া পর্যন্ত উঠতো না।
বুড়ো নেশা করতো। আমিও দু-চারবার বুড়োকে আফিম এনে দিয়েছি।
আস্তে আস্তে আমি বেশ ভালোই জমিয়ে নিয়েছি। মেসিনের একটু আধটু কাজ শিখেছি। আপনি থেকে তুমিতে চলে এসেছি। কাগজের লাইনে কেউ কাকা, মেশোমশাই, জ্যেঠামশাই, পিসেমশাই নেই। আট থেকে আশি সব দাদা। আমিও গোপালদার টেনিয়া হয়ে গেলাম। উদ্দেশ্য একটা মাল বাগাতে হবে। কাজ শিখতে হবে।
কপালে কি আছে জানি না। সাংবাদিক না হয়ে যদি মেশিন ম্যানের চাকরিটাও জোটে তাহলে খেয়ে পরে বেঁচে যাব।
বুড়োকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতে শুরু করলাম। একটা নেশা ধরে গেল।
একদিন কথায় কথায় বুড়ো বললো, জানিস অনি আমার গুরুদেব ছিলেন কোল সাহেব।
কি বললে।
হেইনজ কোল। খাঁটি জার্মান।
তারপর!
আমাকে গোপাল বলে ডাকতে পারতো না। বলতো গুফাল।
একদিন একটা কাজে ভুল করেছিলাম সাহেবের মুখ লাল। বকা-ঝকা দেওয়ার পর বললো, গুফাল তুমার কানটাকে ঠিক করো।
ভাবলাম আমি তো কালা নই। তারপর কথা বলে বুঝলাম মেসিনের শব্দ শুনে কানটাকে সেট করতে বলছেন। সেই আমি কোল সাহেবের কাছে শিখতে শুরু করলাম।
তুই একটু ভালো করে লক্ষ কর অনি। চলার সময় মেশিনটা ঘটাং ঘটাং আওয়াজ করছে ঠিক, কিন্তু তার মধ্যেও প্রত্যেকটা ইউনিটের নিজস্ব একটা ভাষা আছে। মেশিনটাও যে মানুষের মতো কথা বলতে পারে। ওরা প্রত্যেকটা ইউনিট একে অপরের সঙ্গে কথা বলে। এদের মধ্যেও মেল ইউনিট আছে ফিমেল ইউনিট আছে। একে অপরের সঙ্গে কথা না বললে ওরা কাজ করবে কি করে। কাজ শিখতে হলে, তোকে ওদের ভাষাটা জানতে হবে।
বুড়োর কথা হাঁ করে শুনছি। আর মনে মনে ভাবছি শালা নেহাত একটা আস্ত পাগল।
এটা সম্ভব নাকি!
অনেক ভেবে চিন্তে মনে হলো বুড়ো আজ আফিমের মাত্রাটা একটু বেশি চড়িয়ে ফেলেছে। মেসিনের আবার পুরুষ মানুষ, মেয়ে মানুষ! মনে মনে বললাম—মামদোবাজির জায়গা পেয়েছো। ব্যাটা বুড়ো আফিম খেয়ে শুধু বাতেলা।
দামিনীমাসির ছাদে শুয়ে ব্যাপারটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবলাম। না, হতেও পারে—
প্রথম কয়েকদিন বুড়োর কথা হজম করতে কষ্ট হলো। কিন্তু হাল ছারলাম না।
এবার বুড়োকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করতে শুরু করলাম। বুড়ো একটা একটা বলে আমি তার শব্দের ব্যাখ্যা জানতে চাই, বুড়ো খুব মন দিয়ে বোঝায়, দেখ ওই ইউনিটের কোথাও একটু সমস্যা হলে তুই এই শব্দগুলো পাবি। ইত্যাদি ইত্যাদি।
অকাট্য সত্য। মাঝে মাঝে আমি ফুট কাটা শুরু করলাম। লাগে তাক না লাগে তুক। দেখলাম লাগতে শুরু করেছে। যতো লাগে তত নেশায় পেয়ে বসে।
এবার কাগজের হিসাব শিখি। হাতে ধরে আমাকে কাগজ চেনাল, কোনটা কতো জিএসএম, তার স্ট্রেংথ কতো, কতো স্পিড উঠলে কাগজ ছিঁড়ে যেতে পারে। একটা রিলে এক টন হলে কতো কাগজ বেরবে। জিএসএম অনুযায়ী কাগজ মোটা পাতলা হয়। কাগজ যদি একটু বেশি জিএসএম হয় তাহলে কাগজ কম বেরবে, আবার জিএসএম যদি কম হয় তাহলে কাগজ বেশি বেরবে। নানারকম হিসাব। অতীশবাবু এগুলো বুড়োর কাছ থেকে শিখেছিল।
তরপরেই দাদা আমাকে চাকরিটা দিয়ে দিল, আমার কাজ শেখা ডকে। তার পরপরেই বুড়ো টেঁসে গেল। বুড়োর জায়গায় নিয়ে আসা হলো সুতনুবাবুকে। অতীশবাবু তখন হেড মসিন ম্যান।
এই হলো আমার কাগজ চেনা, মেসিনে কাজ শেখার ইতিহাস।
সবাই একদৃষ্টে আমার মুখের দিকে তাকিয়, মিলি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।
তোমার এরকম আরও কতো স্টক আছে। বরুনদা বললো।
বরুণদার দিকে তাকালাম। বলতে পারবো না বরুণদা। তবে নতুন কিছু শেখার ইচ্ছেটা আমার প্রবল। এখনও যদি তোমার কাছ থেকে নতুন কিছু পাই, আমি সব ফেলেফুলে তোমার পাশে বসে পরবো।
তবে একটা জিনিষ কি জানো বরুণদা, সব কিছুর মধ্যে একটা সাধনা আছে। বুড়ো যেমন মেশিনটাকে তার সাধনার বস্তু করেছিলেন। আমি বুড়োর সান্নিধ্যে এসে যেটুকু ছিটে ফোঁটা পেয়েছিলাম, আজ দেখ কাজে লাগিয়ে দিলাম। এটাও বা কম কিসের—
আর একটা জিনিষ বুড়োকে দেখে শিখেছিলাম।
কি—
ম্যানেজমেন্ট কেন বুড়োকে ওই বয়সেও কাঁড়ি কাঁড়ি পয়সা দিয়ে রেখেছিল।
কি বলো তো? বরুণদার দিকে তাকালাম।
অভিজ্ঞতা।
একেবারে ঠিক।
তাই তুমি সনাতনবাবু, চম্পকদা, সুতনুবাবুকে বার বার আসার জন্য অনুরোধ করেছো।
হ্যাঁ বরুণদা, কাজের থেকেও ওরা যদি স্রেফ বসে থাকে, তাহলেও উপকার। দেখলে না। কাগজটা হাতে ধরাতেই চম্পকদা কেমন পটাপট ধরে ফেললো। মিলি পারতো না। আবার মিলি যেগুলো ধরতে পারবে পিকু, বিতান পারবে না। কিন্তু তোমার শেখার ইচ্ছেটা যদি প্রবল থাকে, তবে তুমি কিছু পাবে।
সেই সকালের কথার পুনরাবৃত্তি। কিছু দিতে ভি হবে কিছু লিতে ভি হবে।
বরুণদার দিকে তাকিয়ে হাসলাম, কথার গুরুত্বটা কোথায় বুঝলে।
তবে এখানের ব্যাখ্যাটা একটু অন্য রকম।
কি রকম।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ গিরিশ ঘোষের থিয়েটার দেখতে এসেছেন। হই হই পরে গেল।
শালা দক্ষিণেশ্বরের ভণ্ড সন্ন্যাসী এখানে কেন।
গিরিশ ঘোষ এলেন। ঠাকুরকে দেখে পরীক্ষা করার ইচ্ছে হলো।
টিকিট কেটেছেন?
না।
টিকিট না কাটলে থিয়েটার দেখা বন্ধ।
ঠাকুর রামকৃষ্ণরে দুজন চেলা ছিল, রাখালে আর রাম। তাদের ডাক পরলো।
তারা তো ঠাকুরকে দেরেমুসে গালাগাল দিচ্ছে। থিয়েটার কি ভদ্রলোকে দেখে।
ঠাকুরের কোনও হুঁস নেই। বলে গেঁজেটা খোল না। দেখবি ঠিক টিকিটের পয়সা হয়ে যাবে।
হোলোও তাই। একআনা দুআনা করে ঠিক ষোলআনা রাখালে আর রাম দিল।
গিরিশ ঘোষ কেঁদে ফেললেন। ঠাকুরের পা জড়িয়ে ধরে বললেন, ঠাকুর তুমি আমাকে ষোলআনা দাও। আর আমার যা কিছু সব তুমি নাও।
এই ষোলআনাটা কি জিনিষ জানো, নিজেকে নিঃশর্ত ভাবে আত্মসমর্পণ।
একটা শিক্ষিত প্রতিপত্তিবান নাম-যশ-খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ একটা অশিক্ষিত ভণ্ড সন্ন্যাসীর পায়ে আত্মসমর্পণ করছে।
রামকৃষ্ণ এই বিদ্যেটা শিখেছিলেন মানুষ দেখে।
সারাটা ঘর নিস্তব্ধ।
জলের গ্লাসে চুমুক দিলাম।
তখনও বেশ কিছুটা ধোঁসা প্লেটে পড়ে রয়েছে। খেতে ভালো লাগলো না। মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম।
একটু নে।
আমার পেট ভরে গেছে, আর পারবো না।
দেখলি তোদের জন্য ওর খাওয়া হলো না। মিত্রা কপট রাগ করে মিলিদের দিকে তাকাল।
মিলি প্লেটটা টেনে নিল।
অনিদা এটুকু খেলো না ঠিক, তবে এর থেকে কি তুমি কম খাবার পেলে, বলো?
মিলি হাসতে হাসতে মিত্রার দিকে তাকাল।
মিলি একা খাবি না। তিনভাগ কর। অদিতি চেঁচাল।
দেখলে, পরে পাওয়া চোদ্দ আনার কদর। মিলি মিত্রার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
কিরে বিতান বসে বসে তো গিললি। কিছু শিখলি? টিনা বললো।
দাঁড়াও টিনাদি সকাল থেকে গিলেই যাচ্ছি। কখন যে যাবর কাটবো ঠিক করতে পারছি না।
টিয়া একটা ফাইল নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
ইস টিয়া তুমি কি মিস করলে। বিতান বললো।
কেন!
আজ অনিদার কাছে থেকে তিনটে কালেকশন করেছি, তুমি কিছু ছারলে আমি দেব। নাহলে আমার কাছে থাকবে।
আমি অনিদার কাছ থেকে জোগাড় করে নিতে পারবো।
দেখলে অনিদা।
তুই তো আমার থেকে অনেক ছোট, তাই এর সঠিক উত্তরটা দিতে পারলাম না। তবে মিলিদের মতো হলে তোকে উত্তর দিয়ে দিতাম।
আর বলতে হবে না। মিলি বললো।
টিয়ার দিকে তাকিয়ে, বসতে বললাম।
বরুণদা। টিয়া বললো।
অনিকে দাও। ওটা অনির লাগবে।
আগে বলবেন তো—
কেন!
আর একবার ভালো করে চেক করে নিতাম।
বরুণদা হাসছে।
বোচন একবার ছিদামদাকে ফোন কর। মিত্রা বললো।
তোমার ভয় হচ্ছে। বরুণদা টিয়ার দিকে তাকাল।
ঠিক তা নয়। অনিদার সঙ্গে কোনওদিন কাজ করিনি। একটু….।
কনফিডেন্টের অভাব বোধ করছো। বরুণদা টিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
তবে? কাল রাতে বহু ফট ফট করেছিলে। বিতন গড়গড়িয়ে উঠলো।
টিয়া একবার লাজুক দৃষ্টিতে বিতানের দিকে তাকাল।
আমার হাতে ফাইলটা দিল।
বোস।
টিয়া আমার পাশে বসলো।
আমি পকেট থেকে চশমাটা বার করলাম।
অনিসা।
মিত্রার ডাকে মেয়ে মুখ তুলে তাকালো।
ফেরার সময় বাবাকে এসপ্লানেডের ওই চশমার দোকানটায় ঢোকাবি।
তোকে আর উপকার করতে হবে না। আর মেয়েকেও নাচাতে হবে না।
চশমাটা পরে তোকে শেয়াল পণ্ডিতের মতো লাগছে।
লাগুক।
টিয়ার দেওয়া ফাইলটাতে চোখ রাখলাম।
ছিদাম চা নিয়ে এলো। খাওয়া হলো। কিছুটা এলোমেলো গল্প হলো। আমি বেরিয়ে এলাম।
আমরা কিন্তু চলে যাব। ঠিক বেরোবার মুখে মিত্রা বললো।
ঠিক আছে।
চলবে —————————
from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/UG5Ow3V
via BanglaChoti
Comments
Post a Comment