কাজলদিঘী (৪২ নং কিস্তি)

“কাজলদীঘি”

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

৪২ নং কিস্তি
—————————

আমি আবার ভেতরে এলাম। রতনের হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিলাম।

ও কিছুক্ষণ হুঁ হাঁ হুঁ হাঁ করে গেল। দেখলাম কথা শুনতে শুনতে ওর চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে উঠছে। দাঁত কট কট করছে। ফোনটা রেখেই দাম করে একটা ঘুঁসি মারল আকিবের নাকে। ঝড় ঝড় করে রক্ত বার হতে আরম্ভ করলো। রতন বাজখাঁই গলায় ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ে উঠলো।

খানকির ছেলে তোর জন্য দাদা না খেয়ে চলে এসেছে। নেপলা।

তুমি ছাড়ো রতনদা, তুমি ছাড়ো। আবিদ বললো।

এখন থাক।

নেপলা পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলো।

দাদাকে একটা টুল এনে দে, দুটো চিকেন প্যাটিস আর কোলড্রিংকস নিয়ে আয়।

আমি খাবো না।

দাদা বলেছে। তোমাকে না খাইয়ে এখান থেকে যেতে দেব না।

সবার জন্য আনা।

এই শালার জন্যও।

হ্যাঁ।

নেপলা একটা টুল রেখে দিয়ে বেরিয়ে গেল।

আমি ছোট্টুর দিকে তাকালাম। রক্তে মুখটা লাল হয়ে গেছে। জামাতেও গড়িয়ে পরেছে দু-চার ফোঁটা। খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই, এদের কাছে এটা জলভাত। এককথায় বলা যায় সকালের বেড টী। ছোট্টু আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখটা ফুলে উঠেছে।

এই জন্য তোদের তখন বাঁচিয়েছিলাম। খুব নিচু স্বরে বললাম।

তুমি বিশ্বাস করো অনিদা।

কি বিশ্বাস করবো বল। বিশ্বাসের জায়গাটা কোথায় রাখলি। তখন এনকাউন্টারে মিঃ ঘোষ তোকে মেরে দিলেই ভালো করতো।

আল্লা কসম আমি ইসলামভাইয়ের ক্ষতি হোক চাই না।

একবারে আল্লার নাম মুখে এনে মিথ্যে কথা বলবি না।

তুমি বিশ্বাস করো। রাজনাথবাবুর সামনে আমি না করতে পারিনি। হ্যাঁ বলেছি, কিন্তু আমি কাজটা করতাম না।

তুই, অবতার, সাগির সব এক কথা বলছিস।

আমি মিথ্যে বলছি না।

তুই কাজটা না পারলে, তোর পেছনে কাকে লাগিয়েছে, তোকে মারার জন্য।

আমাকে কেউ মারতে পারবে না।

এতো বড়ো হনু হয়ে গেছিস!

আমি বলছি তোমায়।

আমি তোকে আজই মেরে দিতাম।

তুমি পারো। সে ক্ষমতা তোমার আছে। প্রমাণ পেয়েছি। তাই তোমাকে আমাদের লাইনে সকলে বস বলে ভয় পায়।

আমাকে মারার জন্য কাকে ঠিক করেছিস?

তোমার পায়ে ধরে বলছি, বিশ্বাস করো তোমাকে মারার মতো ছেলে এখনও কলকাতায় জন্মায়নি।

ছোট্টু আমার পায়ে ঝাঁপিয়ে পরলো।

শুয়োরের বাচ্চা বলে কিরে আবিদ! এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। অনিদাকে দেখে গড়গড় করে বলে যাচ্ছে। অনিদা তুমি কি জাদু জানো! রতন আমার দিকে তাকাল।

অনিদা তোদের আগে থেকে আমাকে চেনে। ছোট্টু বললো।

সেতো এখন বুঝতে পারছি। আবিদ বললো।

তাহলে তুই দাদাকে মারার সুপুরি নিলি কেন?

আমার জায়গায় তুই থাকলে তুইও নিতিস রতন।

তুই জানতিস অনিদার সঙ্গে দাদার একটা ভালো সম্পর্ক আছে।

জানতাম।

কিছু হলে অনিদা তোকে রাখবে না এটাও জানতিস?

হলে তো।

তারমানে!

লোকটার পলিটিক্যাল পাওয়ার আছে, তাছাড়া বহুত হারামী।

তোর সঙ্গে কোথায় বসে কথা হয়েছে। আমি বললাম।

পার্টি অফিসে।

কোথাকার?

মোড়ের মাথায় যেটা আছে।

তোকে কে আলাপ করিয়ে দিল?

ওই যে ডাক্তারটা আছে। বিএফের বিজনেস করে।

তোর সঙ্গে ডাক্তারের আলাপ হলো কি করে!

এ তল্লাটে চৌধুরী বাড়িতে যতগুলো বিএফের স্যুটিং হয় আমি করাই।

ভালই লগ্গা আসে বল—

ছট্টু হাসছে, দুই-আড়াই আসে।

নেপলা পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকল। হাতে প্যাটিস, কোল্ডড্রিংকসের বোতল।

একটা প্যাটিস নিলাম। সবাইকে নিতে বললাম। খেতে খেতে ছট্টুকে বললাম।

রাজনাথ তোকে আর কি বললো?

এদেরকে বাইরে যেতে বলো আমি সব বলবো।

ওরা আমার ঘরের লোক, তোর মতো। তুই বলতে পারিস।

যদি লিক করে দেয়?

দিলে দেবে। তোর কি।

আমি হজম হয়ে যাবো।

এই বললি তোকে কেউ হজম করতে পারবে না।

এই লাইনে মুখ না ছোটালে কুত্তায় পেচ্ছাপ করবে।

আমি হাসছি।

ফোনে একটা ম্যাসেজ এলো। বুঝলাম অর্ক। ফোনটা পকেট থেকে বার করে, ম্যাসেজটা পড়লাম। অনেকটা বড়ো ম্যাসেজ।

দাদা অনেক বড়ো লিখে ফেললাম, খুব সিরিয়াস হতে যাচ্ছে ব্যাপারটা।

পড়তে পড়তে মনে পড়ে গেল মুখটার কোনও পরিবর্তন যেন না হয়। হাসি হাসি ভাবটা মুখে ধরে রাখতে হবে। ধরা পরে গেলে গণ্ডগোল। এরা সবাই শেয়ানা টু দা ইনফিনিটি।

আজ সকাল থেকে ডাক্তারের কোনও পাত্তা নেই যেহেতু আমাদের কাগজে ব্যাপারটা ফ্লাস হয়ে গেছে। ডাক্তার এখন ব্যারাকপুরে লাট বাগানের একটা বাড়িতে গা ঢাকা দিয়েছে। ঠিকানা এই। এটা রাজনাথের বাড়ি। ওখানে রাজনাথের রাখেল থাকে।

আমি এখন ফুরফুরা সরিফ থেকে বেরচ্ছি।

এখানে মুজফ্‌ফরপুর থেকে সাতজন এসেছে। দেখে শুনে মনে হচ্ছে টেররিস্ট। প্রচুর আর্মস আছে। রাজনাথবাবু এদের দায়িত্ব দিল।

শুয়োরের বাচ্চা পাগলা কুত্তার মতো আচরণ করছে। তুমি ছাড়াও ইসলামভাইকে ওদের চাইই চাই। আমার বেশ ভয় করছে দাদা। তুমি একটু সাবধানে থেকো। আকিব ওদের দেখিয়ে দেবে ঠেকাগুলো।

ওরা কাজ করে বেরিয়ে যাবে। প্রথমে ওরা আকিবের ঠেকায় যাবে। মাসুদুর বলে একটা ছেলে আকিবের ঠেকায় ওদের নিয়ে যাবে। ওখান থেকে আকিবকে তুলে নিয়ে যাবে।

এই ছক কষা হয়েছে। ওরা আটচল্লিশ ঘণ্টা সময় চেয়েছে। ওরা এখন যে ঠিকানায় আছে তা তোমাকে দিলাম দেখে নিও। আমার মন বলছে ওরা আজ রাতেই কাজ সারতে পারে।

হো হো করে হেসে ফেললাম।

কে গো অনিদা?

ছট্টুর দিকে তাকালাম।

আমার এক বান্ধবী। লণ্ডনে থাকে। ম্যাসেজ করেছে। কলকাতায় আসছে আজ রাতের ফ্লাইটে আমাকে পিক আপ করতে বলছে। হোটেলে একসঙ্গে রাত কাটাতে হবে।

ছোট্টুর দিকে তাকিয়ে কথাটা বললাম। দেখলাম ছোট্টুর চোখ স্থির। বুঝতে চাইছে কথাটা কতটা সত্যি।

তোমার সেই ফটো গ্রাফার বান্ধবী।

বাবা খুব মনে রেখেছিস?

বাঃ অনিদা বাঃ একা একা। ছোট্টু হাসতে হাসতে বলে উঠলো।

কি করবো বল। তুই তো জোগাড় করে দিলি না, তোকে কতোবার বলেছি। তুই ব্যানার্জীর স্যুটিংয়ের ব্যবস্থা করে দিবি আর মাল কামাবি।

আজ থেকে যাও। হয়ে যাবে।

ওই বাড়িতে?

হ্যাঁ।

কজন আসবে।

সাতটা চামকি আসবে।

এখানকার?

না। ইউপি থেকে।

আমি ঠিক সময় পৌঁছে যাব।

আসবে তো?

কথা যখন দিচ্ছি, তখন আসবো।

তোমার বান্ধবীর কি হবে?

আজ রাত একা হটেলে থাকবে? কাল সময় দেব।

এদের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও।

রতন ওকে ছেড়ে দে। ছট্টু খুব ভালো ছেলে। তোরা যেমন আমার খুব ক্লোজ ছট্টুও।

তুমি দাদাকে একবার ফোন করো।

ফোন করতে হবে না।

আবিদ-নেপলা থাক। আমি দাদার কাছ থেকে পার্মিশন নিয়ে নিই।

কিরে ছট্টু তাই হোক, আমি তোকে আর আটকে রাখছি না।

ছট্টু অবিশ্বাসের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে।

একটা সত্যি কথা বললে সেটাও মাফ হয়ে যাবে। বলবি।

তুমি বলো, আমি সত্যি কথা বলবো।

আচ্ছা এই কদিনে তুই কোথাও ঘাই মারিস নি ইসলামভাইয়ের জন্য?

মেরেছি।

কোথায়?

দামিনীর ওখানে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। ইসলামভাই নেই।

আর কোথায়?

তোমার কাগজের এডিটরের বাড়ি। ওখানে দামিনীকে দেখলাম রং করাচ্ছে।

তারপর?

তোমার ফ্ল্যাট।

কি পেলি?

কোথাও নেই। শুনলাম ইসলামভাই তার গ্রামের বাড়িতে ঘুরতে গেছে।

সেখানে ঢুঁ মারিস নি?

জায়গাটা ডেঞ্জার গো ঢোকা যাবে বেরনো যাবেনা।

কেন তুই খোঁজ করেছিলি?

ইসলামভাইকে বলার জন্য।

গুরু রাজনাথ আমাকে তোমার সুপুরি দিয়েছে।

হ্যাঁ।

নেপলা। ষাঁঢ়ের মতো চেঁচিয়ে উঠলাম। মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখেমুখের চেহারা বদলে গেলো। তখন আমি একবারে অন্য মানুষ।

আমার ডাকেই ছট্টু বুঝতে পেরেগেছে এবার কিছু একটা ঘটবে। রতন থতমত খেয়ে গেছে। অবিদ এতক্ষণ আমাদের কথায় হাসাহাসি করছিল। উঠে দাঁড়ালো।

দাদা। নেপলা পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলো।

নাইলন দড়ি। আর লিউকো প্লাস কিনে আন।লিউকো প্লাস চিনিস তো?

হ্যাঁ।

হাউমাউ করে ছট্টু আমার পা ধরে ফেললো। আমি মিথ্যে কথা বলেছি অনিদা। তুমি ঘোষ সাহেবকে ফোন করোনা।

তোর বাবা রাজনাথ তোকে বাঁচাবে।

আমার চোখে মুখের চেহারা মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে।

দাঁড়িয়ে রইলি কেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসবি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে কাজ সেরে চলে যাব।

আবিদ কোমড় থেকে রিভালবার বার করলো। খুপরিতে ঢেলে দিই।

না। আমার অনেক কাজ বাকি আছে। তোর মোবাইল কোথায়?

আমার কাছে নেই।

কার কাছে আছে?

দাম করে সজোরে একটা লাথি মারলো আবিদ ছট্টুর বুকে।

রতন ওর মুখ বেঁধে দে।

আমার এই অবস্থা ওরা সেদিন আমার বাড়িতে দেখেছিল। যখন ডঃ ব্যানার্জীকে মেরেছিলাম। আমার কথা শেষ হবার আগেই আবিদ ছট্টুর মুখ চেপে ধরলো।

রাজনাথ তোর বড়ো বাবা, তাই না।

আজ রাতের মধ্যেই তোর খেলা শেষ।

অনিদা দাদাকে একবার ফোন করি। রতন বলে উঠলো।

একবারে ফোন করবি না।

ওরা আমার গলার স্বরে থতমতো খেয়ে গেছে।

নেপলা দড়ি লিউকো প্লাস নিয়ে চলে এসেছে।

ভালো করে বাঁধ, মুখে লিউকোপ্লাস আটকে দে। তোরা এখান থেকে ফেটে যা। কাছা কাছি থাক, এই ঝুপড়ির ওপর লক্ষ্য রাখ। ইসলামভাইকে একটা ফোনও করবি না তাহলে তোরা পর্যন্ত ওর সঙ্গে আজ হজম হয়ে যাবি, মনে রাখবি চারদিকে আমার লোক নজর রাখছে।

রতন আবিদ আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।

নেপলা আমাকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসবি চল।

আমার কথাবার্তায় ওদের চোখমুখ শুকিয়ে গেছে। আমার মুখের দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে।

ছট্টু কাটা ছাগলের মতো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছে।

আমি নেপলার বাইকের পেছনে বসলাম। ও আমাকে বড়ো রাস্তায় ছেড়ে দিল।

শোন।

বলো দাদা।

একটা কাজ করতে পারবি?

কি!

পকেট থেকে ফ্ল্যাটের চাবিটা নেপলার হাতে দিয়ে বললাম, এখুনি ইসলামভাইকে এটা পৌঁছে দে আমাকে একটা রিং করতে বলবি।

আচ্ছা।

আমি অর্ককে ফোন লাগালাম।

কোথায় আছিস। দাদা আমি অফিসে ঢুকেছি। মাল এখন তার জায়গায়। সারাদিন টেনসন গেল রিলাক্স করছে। তুমি ঠিক আছো?

ঠিক আছে অফিসে থাক, আমি যে কোনও সময় ফোন করতে পারি।

আচ্ছা।

ট্যাক্সি ধরলাম। সোজা নিজাম প্যালেসে চলে এলাম। মুখার্জীর ঘরে ঢুকলাম। আমাকে দেখেই মুখার্জী অবাক হয়ে গেছে।

সাহেব আমার ঘরে! কি সৌভাগ্য আমার।

এক গ্লাস জল খাওয়াবেন।

এ কি কথা বলছেন! বেল বাজালেন। একটু গরম চা।

হলে খারাপ হয় না।

আপনার কাজ করে দিয়েছি। কোনও নিউজ হলো না।

দরকার ছিল।

আর দরকার নেই। লেবু বেশি নিংরোলে তেঁতো হয়ে যাবে।

আপনার পাওনা গণ্ডা কি হলো?

ফাইল প্রসেস হলো। এবার দেখি কি হয়।

আর একটা কাজ আজ রাতের মধ্যে ঝেড়ে দিতে পারবেন।

আবার কি!

এনকাউন্টারে যেতে হতে পারে। হাতে সেরকম মাল আছে। না ঘোষকে বলবো।

এই তো, এখানে এসে ঘোষের কথা বলেন, ঘোষের কাছে গিয়ে আমার কথা বলেন।

আপনি না পরলে ঘোষকে বলবো।

আমি কি আপনার কোনও কাজ করে দিইনি।

সাতটা টেররিস্ট আছে ফুরফুরা সরিফের কাছে। ইউপি দিয়ে কলকাতায় ঢুকেছে।

দাঁড়ান দাঁড়ান হজম হচ্ছে না।

ঢক ঢক করে একগ্লাস জল কঁত কঁত করে খেয়ে নিলেন।

আমার ইন্টেলিজেন্স খবর পেল না, আপনি!

তাহলে ছেড়ে দিন। আমি উঠে দাঁড়ালাম।

এ কি মশাই বাঘকে চিতল হরিণ দাখালেন, আবার কেরেও নেবেন।

কি করবো?

আমি এখুনি একটা খবর নিই।

নিতে পারেন, পাবেন না, পলিটিক্যালি ব্ল্যাক আউট করা আছে।

কি বলছেন আপনি!

যা বলছি সত্যি। কাজ হয়ে যাবার পর সব আপনাকে বলবো। আমার লোক যাবে আপনার সঙ্গে।

সত্যি!

মুখার্জীর চোখ চক চক করে উঠলো।

কজন আছে?

সাতজন। সঙ্গে প্রচুর আর্মস।

মুখার্জীর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।

কি হলো?

আমার এনকাউন্টারের ছেলেগুলোকে একটু দেখে নিই তৈরি আছে কিনা।

না থাকলে এখুনি ডেকে নিন। দেরি করা যাবে না।

একটু সবুর করুন।

খবরটা আমি কাল ছাপবো। শুধু একটা লোককে বাঁচিয়ে রাখতে হবে যে আপনাকে নিয়ে যাবে। তাও প্রয়োজন হলে।

আমি প্রমিস করছি।

আমার একজন সাংবাদিক একজন ফটোগ্রাফার যাবে আপনার সঙ্গে, আমিও যেতে পারি।

তাহলে তো কোনও চিন্তাই নেই।

চলুন বেরিয়ে পরি।

দাঁড়ান।

মুখার্জী ফোন ঘোরাল, নিচু স্বরে কার সঙ্গে কথা বললো, আমি টেবিলের এপার থেকে শুনতে পেলাম না। ফোনটা রাখলো।

আমি বুলেট প্রুফ গাড়িতে বসবো। সাদা কাঁচ থাকবে ছবি তুলবো।

সব কটা বুলেট প্রুফ গাড়ি থাকবে।

আর একটা ব্যাপার।

বলুন।

আজ রাতেই এক জায়গায় নীল ছবির স্যুটিং হবে সেখানে বড় বড় রাজনৈতিক চাঁই জড়িয়ে আছে ধরতে পারবেন?

টাফ ব্যাপার, খুব সেন্সেটিভ।

তাহলে এই দায়িত্বটা অন্য কাউকে দিই।

এই তো, এক যাত্রায় পৃথক ফল ভালো লাগে।

তাহলে বলুন।

আমাকে মিনিট দশেক সময় দিন।

ওখানে একটা টিমকে ঘাপটি মেরে থাকতে বলুন। বামাল সমেত তুলবেন।

তাই হবে।

আমি দেরি করছি না শান্তিনিকেতন বিল্ডিং-এর সামনে দাঁড়াচ্ছি। আপনি আপনার কাজ গুছিয়ে নিয়ে রেডি থাকুন। আমি আপনাকে ফোন করবো।

আচ্ছা।

চা।

পরে খাওয়া যাবে।

আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

মোবাইলটা স্যুইচ অফ করাছিল খুললাম।

দেখলাম অনেক মিস কল। তার মধ্যে বড়োমা, ছোটোমা, মল্লিকদা, মিত্রা, ইসলামভাই সকলে আছে।

ইসলামভাইকে ফোন করলাম।

তুই কোথায়? ইসলামভাইয়ের গলা কাঁপছে।

আমাকে খুঁজে পাবে না।

তুই এরকম করিস না। তোর পায়ে পরছি।

কোনও কথা বলবে না। রতনদের যেখানে দাঁড়াতে বলেছিলাম, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে?

আমি ওখানে চলে এসেছি।

নেক্সট যখন ফোন করবো তুমি ওদের নিয়ে ওখান থেকে সরে যাবে। মনে থাকে যেন।

প্লিজ তুই আমার কথা শোন। এই কাজ তোর নয়।

শেষ বারের মতো বললাম, আমার কাজে বাধা দেবে না। মনে থাকে যেন। আমার কাজ আমাকে করতে দাও। সবাইকে ফোন করে দাও, আমাকে যেন ডিস্টার্ব না করে।

তুই এসব কি করতে যাচ্ছিস!

যা করছি ভালোর জন্য করছি।

প্লিজ অনি তুই আমার ভাই। তোর কিছু হলে বড়দি, ছোটদি, মামনির কাছে মুখ দেখাতে পারবো না।

দেখাতে হবে না।

ফোনটা কেটে দিলাম।

অর্ককে ফোন লাগালাম।

হ্যাঁ দাদা বলো।

তুই এখুনি একজন ফটোগ্রাফারকে নিয়ে চলে আয়। আমি শান্তিনিকেতন বিল্ডিংয়ের তলায় দাঁড়িয়ে আছি।

সন্দীপদাকে বলে যাব।

না। চুপকে ফেটে আয়। ট্যাক্সি করে।

আচ্ছা।

আমি একটা সিগারেট ধরালাম। বার বার মনটা খচ খচ করছে, যা করতে যাচ্ছি ঠিক করতে যাচ্ছি কিনা। কিন্তু এই সময় ভেবে কোনও লাভ নেই। আগে নিজে বাঁচি তারপর সকলের কথা ভাববো।

মিনিট দশেকের মধ্যে অর্ক চলে এলো। ট্যাক্সি থেকে নেমে আমাকে দেখে হাসলো।

কিরে কেউ জানতে পারেনি তো?

না।

আমি মুখার্জীকে ফোন লাগালাম।

রেডি স্যার, বেরবো।

হ্যাঁ চলে আসুন। আমি আমার ফটোগ্রাফার আর সাংবাদিক আপনার গাড়িতে বসবো।

ঠিক আছে।

কিগো অনিদা!

কোনও কথা বলবি না। চুপচাপ দেখা যা। তুই যা যা ম্যাসেজ করেছিস সব সত্যি।

সব সত্যি।

ঠিক আছে। ওখানে কাউকে ফিট করে এসেছিস।

না।

জায়গাটা চিনতে পারবি।

পারবো।

চুপ চাপ যা বলবো করে যাবি। অর্কর সঙ্গে আসা ছেলেটির দিকে তাকালাম।

তোমার নাম কি ভাই?

সায়ন্তন।

কতগুলো রিল আছে।

আনলিমিটেড এমনকি মুভি পর্যন্ত করা যাবে।

হেসে ফেললাম। ডিজিট্যাল।

হ্যাঁ।

ও তো অনেক পয়সা দাম, এখনও সবাই ব্যবহার করে না।

ছেলেটি মাথা নিচু করলো।

ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই মুখার্জীর গাড়ি আমার সামনে এসে দাঁড়াল। ধবে ধবে সাদা এ্যামবাসাডর। পেছনে দেখলাম আরও পাঁচটা। আমরা তিনজন পটাপট গাড়িতে উঠে বসলাম। আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছি।

আমরা প্রথমে এলাম ছট্টুর ডেরায়। আসার সময় ফোন করে ইসলামভইকে বলে দিলাম তোমরা ওখান থেকে সরে যাও। ধারে কাছে কেউ যেন না থাক।

ফোনটা কেটে দিলাম।

কাকে ফোন করলেন।

টিপারকে রেখে এসেছি, ওটাকে তুলতে হবে। ওকে সঙ্গে নিয়ে যাব। তাছাড়া এই ভেঞ্চারের সমস্ত কিছুর ইনফর্মেশন এই ছেলেটা দিয়েছে। আমার মতো তৈরি করছি। নাম অর্ক।

মুখার্জী পেছন ফিরে তাকাল।

নিউজটা কোথায় পেলিরে বাবা?

বলা যাবে না। তবে ঘটনাটা সত্যি।

বাবা তুই তো অনিবাবুর থেকে এক কাঁটা ওপরে।

গাড়ি এসে ঠিক জায়গায় থামলো।

অর্ককে বললাম যা তুলে নিয়ে আয়। ওর ঝুপরিতে বেঁধে রেখে এসেছি।

তুমি এসেছিলে এখানে!

হ্যাঁ।

অর্ক, সায়ন্তন গাড়ি থেকে নামলো। একটা গাড়ি ওদের ভেতরে নিয়ে গেল। সবার হাতেই এসএলআর। ফুল ড্রেস করা। আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা ছট্টুকে তুলে নিয়ে চলে এলো।

সায়ন্তনকে বললাম জায়গাটার ছবি তুলেছিস।

হ্যাঁ।

এবার আমরা রওনা দিলাম ফুরফুরা সরিফের দিকে। অর্ক পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি যেন হাওয়ায় ভাসছে। জীবনে কোনওদিন এনকাউন্টারের সাক্ষী থাকিনি। যতবার এনকাউন্টার করিয়েছি সব ঘোষ সাহেবকে দিয়ে, শুধু জায়গা বলে দিয়েছি। কাজ করে চলে এসেছে। কাগজে লিখেছি। ওদের নাম ফেটেছে। ইনক্রিমেন্ট হয়েছে। রিওয়ার্ড জুটেছে কপালে।

আমরা যখন স্পটে পৌঁছলাম তখন সাড়ে সাতটা বাজে। চারিদিকে ঘুট ঘুটে অন্ধকার।

একেবারে গ্রামের পরিবেশ। এরই মধ্যে মনে হচ্ছে যেন নিশুতি রাত। দূরে একটা পোড়ো বাড়ি দেখা যাচ্ছে। তার সামনে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। মুখার্জীর গাড়ি থামলো। পেছন পেছন সব গাড়ি থামলো। মুখার্জী অর্কর কাছ থেকে সব কিছু জেনে নিয়ে ছক কষে নিল। এই টিমে কুড়িজন আছে। সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ সিম্পল। নো টেনসন ডু ফুর্তি।

ব্যাপারটা এরকম অনেকদিন পর খাবার পাওয়া গেছে। হরির নামে খাবলা খাবলা করে খেতে হবে। মুখার্জীর নির্দেশ পেতেই নিমেষের মধ্যে ষোলজন ছেলে রেডি হয়ে হাওয়া হয়ে গেল।

আমরা যাব না? সায়ন্তন বলে বসলো।

দাঁড়ান মশাই, তাড়াহুড়ো করলে হবে। পাখি ফুরুত হয়ে যেতে পারে।

আমরা সবাই চুপচাপ। চারদিকে ঘন অন্ধকার। ঝিঁঝি পোকার ডাক। আকাশ ভরা তারা। কারুর মুখে কোনও কথা নেই। শুধু মুখ চাওয়া চাওয়ি। সামান্য শীত শীত করছে।

মুখার্জীর ফোনটা বেজে উঠলো।

স্যার খবর পাক্কা। মালগুলো টের পেয়ে গেছে। আপনি অনুমতি দিলে অপারেশন স্টার্ট করতে পারি।

ওদের ফার্স্ট ডিস্টার্ব করো। কি রিটার্ন দেয় দেখো। সেই বুঝে পজিশন নাও। পারলে ধরবে, না হলে মেরে দেবে।

ঠিক আছে স্যার।

অর্ক, সায়ন্তন গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছে।

কিরে!

আমরা ওখানে যাব, ছবি তুলবো! সায়ন্তন বললো।

মুখার্জী এক ধমক দিল।

পেছনে কিসের একটা আওয়াজ হলো।

একজন ছুটে চলে গেল। তারপর দেখলাম ছট্টুকে আধমরা করে ফেললো। একটা কথা ভেসে এলো, অনিদা তোমাকে রাজনাথ ছাড়বে না।

মুখার্জী আমার দিকে তাকাল।

এটা কি রাজনাথের স্কিম।

আমি হাসলাম।

আপনি মশাই বহুত ঘাঘু লোক। দেখবেন, আমাকে যেন না ফাঁসায়।

কেন ওই কেসটার কথা আপনার মনে নেই।

আছে। ওটা আমি অন্য ভাবে মেটাব।

সে সুযোগ আর পাবেন না।

কেন!

কালকেই সাসপেনসনের চিঠি ধরাবার ব্যবস্থা করবো।

অনিমেষবাবু জানেন?

জানে না। জেনে যাবে।

আপনি একটু আমাকে দেখবেন।

এই তো দেখছি। মলের কেশের ফাইল প্রসেস হচ্ছে। তারপর এইরকম একটা হাই-ভোল্টেজ ফাইল প্রসেসে যাবে।

মুখার্জী হেসে ফেললো।

গুলির আওয়াজ পেলাম।

একটা দুটো তারপর পটকার মতো ফাটতে লাগল।

নিস্তব্ধ রাতের মেদুরতা গুলির শব্দে খান খান হয়ে ভেঙে পড়ছে। দূরে কোথাও আলোর ছটা দেখতে পাচ্ছি। হাল্কা একটা হই হই শব্দ। প্রয় আধ ঘণ্টা। তারপর হঠাৎ কেমন যেন সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মাঝে মাঝে থেমে থেমে গুলির আওয়াজ ভেসে আসছে। মুখার্জীর ফোনটা ব্লিঙ্ক করে উঠলো। বুঝলাম ভাইব্রেশন মুডে আছে। নিচু স্বরে কথা বলে আমার দিকে তাকালেন।

চলুন গাড়িতে উঠুন। কাছে যাবেন তো। মুখার্জীর গলা পেলাম।

শেষ।                                                                  

হ্যাঁ।

চলুন।

আমরা গাড়িতে উঠলাম।

সয়ন্তন ক্যামেরা অন করেছে।

অর্ক আমার পাশে সিঁটিয়ে বসে আছে।

আমি সন্দীপকে ফোন করলাম।

কিরে তুই কোথায়!

কথা বলার সময় নেই।

প্লিজ।

শোন কাগজ এখন প্রেসে পাঠাবি না। আমি না যাওয়া পর্যন্ত।

কেন!

প্রশ্ন করবি না।

দাদা রাগ করছে। খুব টেনসনে আছে।

থাকুক।

অর্ক নেই, সায়ন্তন নেই।

তোকে তার কৈফিয়ত দিতে হবে।

কিরে গুলির আওয়াজ পাচ্ছি!

শুনে যা, কুত্তার মতো চেঁচাচ্ছিস কেন।

কেরে, অনি? মল্লিকদার গলা পেলাম।

বুঝতে পারলাম। মল্লিকদা সন্দীপের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

তুই আমাকে ফোনটা দে। তোকে কথা বলতে হবে না।

তুই কোথায়? মল্লিকদার গলা ভেসে এলো।

যেখানেই থাকি জানতে হবে না। আমি না যাওয়া পর্যন্ত কাগজ বেরবে না।

প্লিজ তুই বল। সবাই কান্নাকাটি করছে।

আমি মরতে এসেছি। হয়েছে।

রাগ করছিস কেন।

এখন কথা বলার সময় নেই।

কিরে গুলির আওয়াজ পাচ্ছি।

গুলি চলছে, তাই।

কেটে দিলাম।

আসল কাজ শুরু হলো। আমরা সেই বাড়িটা থেকে প্রায় একশো মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ভেতর থেকে প্রচণ্ড পরিমানে রেসপন্স এলো।

একঘণ্টা ধরে রুদ্ধশ্বাস গুলির লড়াই চললো। আমরা তিনজনে অন্ধকারে গাড়ির ভেতর চুপচাপ বসে আছি। ভেতরে একটা চাপা টেনসন।

মুখার্জীকে ধারে কাছে দেখতে পাচ্ছি না। অর্ক আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। দুজনের চোখে অপার বিষ্ময়। বেশ কিছুক্ষণ পর আমাদের গাড়িটার সামনে একটা ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নামতেই, মুখার্জী আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

সাতজনের মধ্যে ছটাকে ঝেড়ে দিলাম একটা বেঁচে রইলো।

পর পর দেখলাম অন্ধকারের বুক চিরে আরও বেশ কয়েকজন এগিয়ে এলো।

সবাই আমার সঙ্গে এসে হ্যান্ডসেক করলো।

আপনাদের কারুর কোনও ক্ষতি হয়নি?

অন্ধকার ছিল বলে কাজটা স্মুথলি হলো। মুখার্জী বললো।

ব্যাটারা ঠিকমত প্রিপেয়ার্ড ছিলনা। সবেমাত্র গন্ধ পেয়েছিল। আর একটু হলেই হাতের বাইরে চলে যেত।

সত্যি বলেছেন অনিবাবু, প্রচুর আর্মস সঙ্গে আছে।

মুখার্জীর দিকে তাকালাম। আপনার ইনটেলিজেন্স?

কালকে কথা বলতে হবে।

একটা রিকয়েস্ট করবো?

বলুন।

যেটাকে নিয়ে এলাম ওটাকে ইন্ট্রোগেশন করেছেন?

অনেক আগে কাজ সেরে নিয়েছি।

ঠুকে দিন।

অর্ক আমার দিকে চমকে তাকলো। সায়ন্তন ঠক ঠক করে কাঁপছে।

আপনার কাজে লাগবে না!

হাসলাম। না।

অর্ক তখনও আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।

সায়ন্তন ঢোক গিলছে।

মুখার্জী ইশারা করলো।

একজন এগিয়ে গেল। আর একটা গাড়ির দিকে। অন্ধকারে শুধু শুনতে পেলাম।

যা কাজ হয়ে গেছে, যা তোকে ছেড়ে দিলাম।

ঘন অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেলাম। বাঁচার জন্য ছট্টু গাড়ি থেকে নেমে তীর বেগে দৌড়তে শুরু করলো। একটা ছোট্ট আওয়াজ শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে মাটিতে আছাড় খেয়ে পরলো। অর্ক সায়ন্তন চোখ বন্ধ করলো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম। ছট্টুর বডিটা টেনে হিঁচড়ে আমাদের সামনে দিয়ে নিয়ে চলে গেল।

তোরা দাঁড়িয়ে রইলি কেন প্রত্যেকটা ছবি তুলে নে। আমি সায়ন্তনের দিকে তাকালাম।

ওরা দৌড়ে চলে গেল।

আমি মুখার্জীকে বললাম, এবার একটা সিগারেট দিন।

মুখার্জী সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে আমাকে দিল। নিজে একটা নিল। আমি সিগারেট ধরালাম।

লোকাল থানায় খবর দিয়েছেন?

আগে দিইনি, এখন দিলাম।

কেন?

ঘি ওরা খেয়ে নিত।

আপনার টিম লিস্টটা আমাকে দিন। প্রত্যেকের ছবি নিয়ে নিচ্ছি।

কেন!

কালকে এটাই কাগজের মেন স্টরি। কতটা মাইলেজ পাবেন বলুন।

কিন্তু রাজনাথের কি ব্যবস্থা করবেন?

ওটা দ্বিতীয় মল।

বলেন কি!

ঠিক বলছি।

তাহলে ঝেড়ে দিই?

তার আগে তিনটে ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্ট আপনাকে দেব। মুজাফফরপুরের। ওটা শিল করেদিন।

দিন।

অফিসে আছে। কাজ শেষ হলে আপনি একটা ফোন করবেন।

ঠিক আছে।

আমাদের একটু আগে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করুণ। গিয়ে নিউজটা করি।

অর্ক ছুটতে ছুটতে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। ওর হাত পা সব ঠাণ্ডা।

কিরে ঠাণ্ডা মেরে গেছিস একবারে।

দারুণ এক্সপিরিয়েন্স।

মালটা সাজিয়ে নে গিয়েই নামাতে হবে।

সায়ন্তন?

দাদা লাইভ ছবি তুলেছি।

অর্ক একটা ফোন মেরে দে অফিসে, আমরা ঘণ্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি।

ঠিক আছে দাদা।

মুখার্জীর ফোনটা আবার ব্লিঙ্ক করে উঠলো। কানে তুলেই…

হো হো করে হাসছেন। তাই। ঠিক আছে আমাদেরও কাজ শেষ। আমরাও বেরচ্ছি।

মুখার্জী আমার দিকে তাকাল।

আপনাকে আর ছাড়া যাবে না মশাই।

কেন!

এক দিনে দুটো এ্যাসাইনমেন্ট, কে দেবে বলুন।

ওটা কি মাল এবং বামাল সমেত।

অবশ্যই।

ওই মালটা পাব কি করে?

আপনি অফিসে যান, পৌঁছে দিচ্ছি।

এবার ফেরার ব্যবস্থা করুণ।

আমার গাড়িটা নিয়ে চলে যান। আমাদের যেতে যেতে মিড নাইট হয়ে যাবে।

আপনি যা পারেন করুণ, আমাকে গিয়ে নিউজ ধরাতে হবে। হ্যাঁ রে সায়ন্তন সবার ছবি নিয়েছিস?

হ্যাঁ দাদা।

নামের গণ্ডগোল করবি না তো?

সব লিখে নিয়েছি।

আমরা মুখার্জীর গাড়িতে চেপে বসলাম। গাড়ি ছারলো। ঘরির দিকে তাকালাম সাড়ে দশটা।

একটা সিগারেট ধরালাম।

অনিদা তুমি একটা ফোন করো এবার। সবাই খুব টেনসনে।

কি করে বুঝলি?

আমি ফোন করেছিলাম। দাদা, মল্লিকদা সবাই আমার কথা শোনার জন্য ছুটে এসেছিল।

ঠিক আছে আগে সিগারেটটা খেতে দে।

তোমার কোনও টেনসন হচ্ছে না?

একবারে না।

সত্যি জীবনে প্রথম লাইভ এ্যাকসন দেখলাম।

কিরকম লাগলো বল?

গিয়ে লিখে প্রকাশ করবো।

সায়ন্তন।

দাদা আমাকে একটু আপনার পাশে থাকতে দিন।

আছিস তো।

আমি খুব ভাগ্যবান। আপনার কথা শুনেছি, আপনার সঙ্গে প্রথম কাজ করলাম। তাও টেররিস্ট ভার্সেস স্পেশ্যাল টাক্স ফোর্স।

দাদা এরা সব সাদা পোষাকে কেন? অর্ক বললো।

ড্রাইভার সাহেব বলে উঠলেন। সাদা পোষাক না হলে পাখি উড়ে যাবে। গাড়ি গুলো দেখেছো কোনও বোর্ড নেই শুধু একটা করে নম্বর লেখা রয়েছে।

সত্যি!

হ্যাঁ।

আপনি চালাতে পারেন?

প্রয়োজন পরলে চালাই।

এইরকম কেশ এর আগে হ্যান্ডেল করেছেন?

না। এই প্রথম।

আগে পাননি?

আমাদের কাছে খবর আস্তে আস্তে পাখি উড়ে যায়।

কেন?

নিজেদের মধ্যেই খেয়োখেয়ি আছে।

আমি মোবাইলটা বার করলাম। ছোট্ট একটা ম্যাসেজ লিখলাম।

আমি মরিনি, অক্ষত শরীরে আছি। কোনও টেনসন করার দরকার নেই। ম্যাসেজটা সেন্ড করে মোবাইল অফ করে দিলাম।

অফিসে যখন পৌঁছলাম গেটের মুখে বেশ ভিড় দেখলাম। একটু অবাক হলাম। সন্দীপ নিচে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে এগিয়ে এলো।

কিরে! সব ঠিক আছে।

কি দেখছিস চোখে, নেবা হয়েছে? ভিড় কেন?

সবাই অফিসের স্টাফ।

এখানে ভিড় করেছে কেন?

কাগজ দেরি করে বেরবে। কেন বেরবে?

কে বলেছেন? গলাটা একটু চড়া হতেই দেখলাম ভিড়টা পাতলা হতে শুরু করলো।

স্যার আপনি অনিবাবু।

ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। হ্যাঁ।

মুখার্জী বাবু এই চিপটা দিতে বললেন।

আর কিছু দেন নি?

সরি স্যার।

ভদ্রলোক ছুটে চলে গেলেন। গাড়ি থেকে একটা ফাইল এনে আমার হাতে দিলেন।

সব ইনফর্মেসন এখানে আছে।

অসংখ্য ধন্যবাদ, ভেতরে এসে একটু কফি খেয়ে যান।

সায়ন্তন।

দাদা।

দেখতো তোর ক্যামেরায় ঢোকে কিনা।

আমার কাছে চিপ হোল্ডার আছে, ঢুকলে কপি করে নেব।

মেরিটে জায়গা থাকলে করে নে। না হলে ওপরে চল। দ্বীপায়ণের ল্যপটপে নিয়ে নিচ্ছি। সন্দীপ এনাদের জন্য একটু জল আর কফির ব্যবস্থা কর।

ওনাদের দিকে তাকিয়ে, আপনারা পাঁচমিনিট একটু বসে যান। আমি একটু নিউজটা লিখে ফেলি।

ঠিক আছে স্যার।

সোজা ওপরে চলে এলাম।

নিউজরুমে ঢুকতেই দাদা, মল্লিকদা এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

সবাইকে কেন কষ্ট দিস।

আমি কাউকে কষ্ট দিইনি। অর্ক লিখতে বসে যা। তুই নিউজ কর, যা দেখেছিস যেমন দেখেছিস। আমি গল্প লিখছি।

অরিত্র।

দাদা।

তোর কাজ শেষ?

অরিত্র মুখ নিচু করে হাসলো।

এই নে তোর ফাইল। ফটাফট নামিয়ে দে।

আমি একটা স্টরি করে রেখেছি। দেখে নাও একবার।

ছবি তুলেছিস?

তুলেছি।

মোবাইলে?

মাথা দোলাল।

দ্বীপায়নকে ডাক।

এখানেই আছে, টয়লেটে গেছে।

সায়ন্তন।

দাদা।

ছবিগুলো চটপট রেডি করে দাদাকে দেখিয়ে নে।

দাদার দিকে তাকিয়ে বললাম, কিছু খাওয়াবে?

মল্লিকদার দিকে তাকালাম।

তুমি ওরকম ভাবে তাকিয়ে আছো কেন?

মল্লিকদা কোনও কথা বলছে না।

আমি আমার টেবিলে বসে গেলাম।

অর্ক আমার পাশে। অরিত্র তার পাশে।

সায়ন্তন।

ছুটে আমার কাছে এলো।

দাদা।

তুই মল্লিকদাকে গল্পটা বল আর ছবিগুলো দেখা। তুই যা দেখেছিস তুই নিজে একটা লেখা তৈরি কর। তোর এ্যাঙ্গেল থেকে।

ঠিক আছে।

আমি লিখতে বসে গেলাম। যেন পরীক্ষা দিতে বসেছি। হাতটা ঝড়ের মতো চলতে শুরু করল। এক একটা পাতা রাখছি নিমেষে চলে যাচ্ছে কমপোজের জন্য। যখন লেখা শেষ করলাম তখন রাত সাড়ে বারোটা। অর্ক তখনও লিখে চলেছে। অরিত্রও দেখলাম মুখ তুলছে না।

কিরে, আর কতো লিখবি!

থামছে না।

তোরা কি উপন্যাস লিখছিস।

কি করবো, শেষ হচ্ছে না।

শেষ কর, শেষ কর।

আমি মল্লিকদার টেবিলে এসে বসলাম। আমার লেখার প্রুফ দেখছে। আমার দিকে তাকাল। মিটি মিটি হাসছে।

কি হলো হাসছো যে?

কলকাতায় পা দিয়েই বোমা ফাটালি।

তোমরা খামকা টেনসন নিলে।

বাড়িতে একবার ফোন কর।

করবো না।

কেন!

একটু কষ্ট পাক।

তুই তোর দিকটা দেখছিস।

এই জায়গাটায় আনি খুব সেলফিস। বলতে পার একরোখা।

যদি কোনও অঘটন ঘটতো।

ঘটলে ঘটতো। পৃথিবীতে কারুর জন্য কিছু থেমে থাকে?

মল্লিকদা হাসি হাসি চোখে আমার দিকে তাকিয়ে।

কেমন নামালাম বলো।

তুই যে কোনও কাগজের এ্যাসেট।

গ্যাস মারতে শুরু করলে। দেখো দাদা চা খাওয়াল না।

তোর টেবিলটা দেখ।

টেবিলটার দিকে তাকিয়েই, জিভ বার করলাম।

কখন দিয়ে গেছে!

অনেকক্ষণ। তোকে কেউ ডিস্টার্ব করেনি।

দাঁড়াও ঠাণ্ডা চা-ই খাই।

যাঃ তা হয়। মালিক বলে কথা।

ছোটো মনে হয় আজকাল এইভাবে কথা বলতে বলেছে?

অফিসে।

খোঁজ নিতে হবে।

সন্দীপ কাছে এসে দাঁড়াল।

বটাদা চা নিয়ে এলো। সবাইকে দিল।

রাজ্য জয় করে এলে। বটাদা গজ গজ করছে।

তুমি খেপে যাচ্ছ কেন?

তোমার কিছু হলে আমরা না খেতে পেয়ে মরবো।

গুরু আমাকে নিয়ে যেতে পারতিস। সন্দীপ বললো।

তোর বৌ বিধবা হলে কাকে জবাবদিহি করতাম।

ইস। এইসব বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলো আছে।

একবার সার্কুলেসনের ভদ্রলোককে খবর দে।

দাদার ঘরে এসে হত্যে দিয়ে পড়ে আছে। সব কিছু দেখে বলে এক লাখ ইমপ্রেসন বেশি দেবে।

দাদা কি বলছে?

পঞ্চাশের বেশি উঠতে চাইছে না।

হাসলাম।

মল্লিকদার ফোনটা বেজে উঠল। নামটা দেখেই বললো, তোকে চাইছে।

মহা মুস্কিল।

একবার কথা বল না। মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।

দাও।

বল।

লেখা শেষ হলো।

হ্যাঁ।

আমরা সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছি।

ঘুমিয়ে পর।

কেন।

আমি ফিরব না।

প্লিজ।

দেখছি।

মল্লিকদাকে দে।

ধর।

আমি মল্লিকদার হাতে ফোনটা ধরিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। নিউজরুম এখন গিজ গিজ করছে। যাদের নটায় ডিউটি শেষ তারাও রয়ে গেছে। রাতের যারা তারাও আছে। আমি এরই মধ্যে অর্ককে ইশারায় ডেকে নিলাম। নিজের টেবিলে বসে কালকের ফলো আপটা করতে বললাম। এও বললাম খুব সাবধানে। ও মাথা নেড়ে গেল। অরিত্রর সঙ্গে চোখের ঈশারায় কথা সারলাম।

দ্বীপায়ন কাছে এসে দাঁড়াল।

ছবি দেখে নাও।

সবাই দেখেছে।

দ্বীপায়ন মাথা দোলাল।

কি রকম হয়েছে।

খুব আপশোষ হচ্ছে।

কেন!

যদি তোমার সঙ্গে যেতে পারতাম।

সায়ন্তন কোথায়?

দাদার ঘরে।

হয়ে গেছে।

অর্ক আমার মুখের দিকে তাকাল।

কিরে ওর আমাশার ধাত নেই তো?

বলতে পারবো না!

তাহলে কি চুজ করলি?

তখন হাতের কাছে পেলাম, নিয়ে চলে গেলাম।

যা যা ডেকে আন।

দাদা যদি রাগ করে।

রাগ করলে করবে। বল আমি ডাকছি।

দ্বীপায়ন হাসছে।

তোমার সবদিকে চোখ।

না থাকলে তোমরা মরে যাবে।

ছবিগুলো দেখলাম। একেবারে লাইভ।

কাগজটা কেমন সাজিয়েছ।

বেরলে দেখবে।

প্রেসে চলে গেছে।

ছাপা শুরু হয়ে গেছে।

নিয়ে এসো।

সায়ন্তন এলো। সঙ্গে অর্ক।

কিরে।

তোমার কথাই ঠিক ওর আমাশার ধাত আছে।

ট্যাবলেট দিয়ে দিস। আমার সঙ্গে কাজ করতে গেলে আমাশা রুগী হলে চলবে না।

সায়ন্তন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।

আশেপাশের সবাই হাসছে।

যা এবার কিছু খেয়ে নে।

সায়ন্তন চলে গেল।

আজকে নিউজরুমের অবস্থাটা দেখে দারুণ ভালোলাগছে, সবাই এক সঙ্গে কাজ করছে, দারুণ চনমনে। দাদা আবার নিউজরুমে এলো। দূর থেকে আমাকে লক্ষ্য করে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো। মল্লিকদার দিকে তাকালাম। হেসে ফেললো। দাদার পেছন পেছন সন্দীপ, অর্ক, সায়ন্তন। কাছে আসতেই সন্দীপ চেয়ার এগিয়ে দিল। দেখলাম মল্লিকদা চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো।

দাদা বসতে বসতে আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।

লেখা তো ছেপে দিলাম, ডকুমেন্ট দে।

কেন সায়ন্তন দেয়নি?

ছবি দিয়ে কি হবে। এরা যে টেররিস্ট তুই কি করে জানলি।

যারা কেশ করবে, তারা প্রমাণ করবে।

সে বললে হয়।

তুমি কি সায়ন্তনের পেটে কিল মেরেছ?

একটু।

কিছু পাবে না। ওটা নীরব দর্শক।

এই খেলাটা কি সেদিন থেকে খেলছিস?

জেনে কি করবে।

দাদা হাসছে।

কালকে একমাত্র তোমার কাগজ এই স্টোরিটা করছে। মাথায় রাখবে এক্সক্লুসিভ।

ওরা কেউ জানে না!

জানবে না। আর কোনওদিন কেউ জানতেও পারবে না।

দাদা আমার দিকে হাসি হাসি চোখে তাকিয়ে।

তোমরা সরো এখান থেকে, ভিড় করে আছ কেন, কাজ নেই।

তাকিয়ে দেখলাম বটা দা।

এটা খেয়ে নাও। চা নিয়ে আসছি।

আমার একার।

সবার গেলা হয়ে গেছে।

দাদার।

দাদা খাবে না।

তুমি নিউজ পেয়ে গেছো?

তোমার জন্মের আগে থেকে আছি।

সবাই হো হো করে হাসছে।

ডিম পাঁউরুটি নিয়ে এসেছে বটাদা। দেখলাম অনেকগুলো নিয়ে এসেছে। সকলের হাতে আছে।

সার্কুলেসন থেকে কাগজ চলে এলো। একটা হই হই শব্দ। নিমেষে ভিড়টা সামনে থেকে পাতলা হয়ে গেল। সন্দীপ দাদার হাতে একটা কাগজ দিল। দাদার মুখটা খুশিতে চক চক করে উঠলো।

মল্লিকদার হাতে কাগজ, উল্টে পাল্টে দেখছে।

তুমিও জিজ্ঞাসা করবে?

তোকে নিয়ে আমি রিসার্চ করবো।

হাসলাম।

তোর বড়োমাকে ফোন করেছিস? দাদা বললো।

না।

খুব কষ্ট পাচ্ছে।

আমার মতো ছেলে যার, তাকে একটু কষ্ট পেতেই হবে।

চল এবার বেরিয়ে পরি।

তোমরা যাও। আমার আর একটু কাজ আছে।

তাহলে বসি, তোর কাজ শেষ কর, তারপর যাব।

কেন!

তোর বড়োমা তোকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে বলেছে।

এই তো গণ্ডগোল করলে।

তুই ফোন করে বলে দে।

আমি বলে এসেছি।

আমার সামনে বল।

বসো।

দাদা হো হো করে হাসছে।

উঠে দাঁড়ালাম। সন্দীপকে কাছে ডেকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম।

চাবি কোথায়?

কিসের চাবি!

হারামী, গান্ডু।

খামকা গাল দিচ্ছিস।

মিত্রার ঘরের চাবি।

সন্দীপ জিভ বার করলো।

সরি।

জেরক্স।

আমার ড্রয়ারে।

নিয়ে আয়।

আমি করিডরে দাঁড়িয়ে রইলাম।

সন্দীপ নিজের ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে এলো।

এই ক-দিন ঘড় খোলা হয়নি?

কে খুলবে!

তুই।

কেন?

এমনি।

শালা ঢেমনামো হচ্ছে।

চল দরজা খোল।

সন্দীপ গিয়ে দরজা খুললো।

আমি সন্দীপ ভেতরে ঢুকলাম।

তাড়াতাড়ি ফাইলটা বার কর।

জেরক্সটা নে।

সন্দীপ একটা চেয়ার নিয়ে গিয়ে ফাইলটা বার করে নিয়ে এলো।

আমি ধুলো ঝেড়ে নিলাম। ফাইলটা খুলে জেরক্সটা ভেতরে রাখলাম।

অরিজিন্যাল?

ফাইলের মধ্যে।

কেন?

জেরক্স করে ফাইলের মধ্যে রেখে দিয়েছি।

তার মানে তুই দ্বিতীয়বার ঢুকেছিলি।

হ্যাঁ। সেই রাতেই।

ভাল করেছিস। একবার উঁকি দিয়ে দেখে নে। ফেটে যাব।

সন্দীপ উঁকি দিয়ে দেখে নিল। আমরা দুজনে বেরিয়ে এলাম। নিউজরুমে ঢুকলাম। দাদা মল্লিকদা বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলোর সঙ্গে খুব হাঁসা হাঁসি করছে।

অর্ক কাছে এলো।

কিরে বাড়ি যাবি না?

পকেট খালি।

আমি মানি পার্টস থেকে একটা হাজার টাকার নোট ওকে দিলাম। আমার কাছে আর নেই। কাল আয় বিকেলে নিয়ে নিবি। কত খরচ হয়েছে?

অনেক।

এক না দুই?

দুয়ের একটু কম।

এতো পেলি কোথায়!

সব ধারে।

কাল আয় তোর এ্যাকাউন্টে ফেলে দিতে বলবো সনাতনবাবুকে।

আচ্ছা।

আমি যতক্ষণ তোকে না বলছি ততক্ষোণ ওর পেছন ছাড়বি না।

আচ্ছা।

ডাক্তারের পাত্তা লাগা। এই কেশটা হয়ে যাবার পর, ডাক্তার জায়গা চেঞ্জ করতে পারে।

ঠিক আছে।

যা ভেগে যা।

অর্ক নাচতে নাচতে চলে গেল।

আমি দাদার কাছে এলাম।

তোর বড়োমা অস্থির হয়ে পড়ছে। আমাকে গাল দিচ্ছে।

এতদিনে একই কথা শুনতে শুনতে তোমার সয়ে যাবার কথা।

অরিত্রর দিকে তাকালাম। যা বাড়ি চলে যা।

যাচ্ছি।

দাদার দিকে তাকালাম।

চলো।

এটা কিরে?

সব ব্যাপারে তোমার ইন্টারেস্ট কেন।

তুই নিজেই একটা ইন্টারেস্টিং পার্সেন তাই।

দেরি করো না।

দাদা উঠে দাঁড়াল।

সবাই একসঙ্গে বেরলাম।

নীচে নেমে দেখলাম বেশ ভিড়। রবীন এগিয়ে এলো।

কিরে আজ তুই!

ম্যাডাম বলেছেন।

হাসলাম। সবাই রবীনের গাড়িতেই উঠে বসলাম। আমি সামনে বসলাম। দাদা মল্লিকদা পেছনে। আস্তে আস্তে দেখলাম, ধর্মতলায় কাগজ নিয়ে মারপিট হচ্ছে।

দাদার দিকে তাকালাম।

কিরে অনি!

একটু বেশি ছেপেছো।

পঞ্চাশ হাজার।

সামাল দিতে পারবে তো?

আমি কি করে জানব। যদি রিটার্ন হয়।

মল্লিকদা হো হো করে হাসছে।

তুই হাসলি কেন?

অনি এক লাখের কথা বলেছিল।

তুই বলেছিলি?

তখন তোমার প্রিন্ট অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে।

তাহলে ছাপতে বলে দিই।

না থাক। আমি বললাম।

ভবানীপুর, রাসবিহারী, হাজরাতেও একই অবস্থা। আমরা বাড়ির গেটে এসে দাঁড়ালাম। ছগনলাল দরজা খুললো। দেখলাম বারান্দায় লাইন করে সবাই দাঁড়িয়ে।

ইসলামভাই, দামিনীমাসি, ছোটোমা, বড়োমা, ভজু, কবিতা, নীপা, মিত্রা, ডাক্তারদাদা।

নাও, তোমার ছেলে সবাইকে কাঁদিয়ে বিশ্বজয় করে এলেন। মিত্রা ক্যাট ক্যাট করে উঠলো।

আমি হাসছি।

হাসিসনা। এই মানুষগুলোর মুখের চেহারা দেখেছিস।

সত্যি সকলের শুকনো মুখ। চোখের কোলে জল জমে শুকিয়ে গেছে।

দেখি তোর মোবাইলটা।

না।

তোকে দিতেই হবে।

আচ্ছা, দিচ্ছি দাঁড়া।

মিত্রা আমার পকেট থেকে জোড় করে মোবাইলটা বার করে নিল।

বড়োমার মুখের সামনে গিয়ে ধরলো।

দ্যাখো স্যুইচ অফ কিনা।

বড়োমা, ছোটোমা, দামিনীমাসি, ইসলামভাইয়ের চোখ ছল ছল করছে।

বারান্দার এক কোনে দেখলাম রতন, আবিদ, নেপলা বসে আছে।

আমি বড়োমার কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম।

ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমাকে পেতে গেলে একটু টেনসন নিতে হবে সবাইকে।

ইসলামভাই দাদার হাত থেকে কাগজটা প্রায় ছিনিয়েই নিল। সামনের পাতাটা দেখে চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। ছোট্টুর মৃতদেহের ছবি ছাপা হয়েছে। আমার দিকে তাকাল। চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

তাহলে এডিটর অনিবাবু টাইমের আগেই কাজ সারল। ডাক্তারদাদা বলে উঠল।

তুমি জান আর অনিবাবু জানে। আমাকে কিছু বলেনি।

কেন ও ডেট লাইন দিয়েছিল মঙ্গলবার।

আমি মাথা নিচু করে।

চল ভেতরে চল। ডাক্তারদাদা বললো।

তোমরা যাও, আমি আসছি।

ইসলামভাই। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।

কিরে মামনি!

এদিকে এসো।

বুঝলাম মিত্রা লাস্ট ম্যাসেজটা খুঁজে পেয়ে গেছে।

আমি রতনদের কাছে এলাম।

কিরে তোরা কখন এসেছিস?

সেই তখন থেকে, যখন তুমি আকিবকে তুলে নিয়ে গেলে।

তোরা দেখেছিস?

পাশের ঝুপরিতে ছিলাম।

দামিনীমাসি, ইসলামভাই ছুটে এসে আমাকে সামনে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেললো।

একি তোমরা কাঁদছো কেন!

রতন, নেপলা, আবিদ উঠে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামভাই কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো, রতন আজ অনির জন্য বেঁচে গেলাম। এদের হাত থেকে আমিও হয়তো বাঁচতাম না।

তুমি কি বলছো দাদাভাই!

রতনের গলা কাঁদো কাঁদো।

আবিদের চোখ ছল ছল। নেপলা বুঝে উঠতে পারছে না। রাগে ফুঁসছে।

এই দ্যাখো, খালি কাঁদে।

ওরা অনিকেও ছারত না।

কি বলছো কি তুমি!

ওরা কেউ এখানকার নয়। মিত্রা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। চোখমুখ বেঁকেচুড়ে দুমড়ে গেছে।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/Zuv9CKL
via BanglaChoti

Comments