কাজলদিঘী (ষষ্ঠবিংশ কিস্তি)

“কাজলদীঘি”

BY-জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

ষষ্ঠবিংশ কিস্তি
—————————-

ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল, দেখলাম মিত্রা আমাকে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে, পরনের নাইটির হাল অত্যন্ত খারাপ অবস্থায়। সে প্রায় বিপদ সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে। আমি নিস্তব্ধে নামিয়ে দিলাম। ওর শরীর থেকে মুক্ত হয়ে মিটসেফের কাছে এলাম। ঘড়িটা একবার দেখলাম। পৌনে পাঁচটা বাজে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমলাম। মিত্রার কাছে গেলাম। নিশ্চিন্তে ঘুমচ্ছে। কি ঝড়টাই না ওর ওপর দিয়ে গেল। ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। ওপর থেকে কেউ বুঝতে পারবে না। সবাই ভাববে ওর কিসের অভাব। কিন্তু ওই-ই পৃথিবীর সবচেয়ে অভাবী-অসুখী মানুষ। কুকরে-মুকরে শুয়ে আছে। ওকে সোজা করে শুইয়ে, ওর গাল ধরে নাড়াচাড়া করলাম। চোখ খুলছে না। ভীষণ চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল। ওর কপালে একটা চুমু খেলাম।

মিত্রা।

উঁ।

যাবি নাকি?

ও চোখ খুললো। সচেতন হলো।

হাসলাম। ঠিক করে দিয়েছি।

ও হাসলো।

যাবি?

কোথায়!

চল একটু ঘুরে আসি।

শীত শীত করছে।

বেরলে ঠিক হয়ে যাবে।

মিত্রা উঠে বসে বাইরের দিকে তাকাল।

বাবা এখনও অন্ধকার।

মিত্রা শরীরের সমস্ত অংশ দুমড়ে মুচড়ে আড়মোড়া ভাঙলো। হাই তুললো।

ফাল্গুনের প্রথম দিক শীত শেষের পথে, এখনও ঘণ্টাখানেক বাকি আছে সকাল হতে। কলকাতায় এখন শীতের শ নেই।

মিত্রা উঠে বসলো। চল।

বাথরুমে যাবি না?

ও মাথা দোলাল। যাবে।

যা বারান্দার কোনে গিয়ে করে আয়। জল নিয়ে যাস মুখে দিয়ে আসিস।

মিত্রা উঠে চলে গেল।

আমি পাজামা পাঞ্জাবীটা গায়ে চড়ালাম, সত্যি বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে।

মিত্রা ঘরে ঢুকলো হুটোপুটি করে।

কিরে!

আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, জল দিতে কি ঠাণ্ডা লাগছে।

শীত এখনও যায় নি, ঠাণ্ডা লাগবে না। নে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।

শালোয়াড় পরি।

পর।

আমি আলমাড়ি খুললাম। ও শালোয়াড় বার করলো। আমি আমার দুটো পুরনো চাদর বার করলাম।

ওটা কি হবে!

গায়ে জড়িয়ে নিবি। ঠাণ্ডা লেগে গেলে গণ্ডগোল।

মিত্রা রেডি হয়ে নিল।

আমি বাইরে গেলাম। মুখে জল দিয়ে এলাম। মিত্রা চুলটা আঁচড়ে নিল।

বুবুন।

উঁ।

কোথায় যাবি?

যেখানে গেছিলাম, সেখানেই যাব।

আজ একটা নতুন জায়গায় চল না।

ঠিক আছে আগে বেরই।

দুজনে বাইরের দরজায় সেকল তুলে বেরিয়ে এলাম। খামারে এসে পেছন ফিরে বারান্দার দিকে ঘুরে তাকালাম। সবাই ঘুমচ্ছে। সঞ্জুর ছেলেগুলো লাইট নিভিয়ে দিয়েছে। বারান্দায় বেশ কয়েকটা মশারি টাঙানো আছে দেখলাম। বুঝলাম সুরোমাসি, কাকীমা ওদের ঘর ছেড়ে দিয়ে বারান্দায় এসে শুয়েছে।

তেঁতুল তলার ভেতর দিয়ে, গাঙ্গুলী বাড়ীর পুকুর পাড়ে এসে উঠলাম। পুকুর ধার দিয়ে কিছুটা গিয়ে ধানখেতে এসে পড়লাম। শিশির পরেছে, ধানের ডগাগুলো ভিঁজে ভিঁজে। মিত্রা আমাকে জাপটে ধরে হাঁটছে।

চাঁদের আলো চারিদিকে থিক থিক করছে। ধান শিসে শিশিরের দানা। চাঁদের আলোয় মুক্ত দানার মত চিক চিক করছে। আমরা ধানখেতের মধ্য দিয়ে সরু আলপথে হাঁটছি।

সাবধানে হাঁটিস পা হরকে যেতে পারে। ঘাস ভিঁজে আছে।

কি উঁচু নীচুরে বাবা।

দেখে হাঁট। জ্যোৎস্না রাত, রাস্তা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

সত্যি বুবুন কি মিষ্টি আলোটা।

ইলেকট্রিকের আলোকে হার মানায়।

আচ্ছা আমাদের কলকাতায় এরকম দেখা যায়না কেন বলতো?

পলিউশন। যা গাড়িঘোঁড়ার ধোঁয়া। মানুষ নিঃশ্বাসই ঠিক মতো নিতে পারে না, তায় চাঁদের আলো।

হা হা হা।

আস্তে হাস। এখানে তুই একটু জোড়ে হাসলে অনেক দুর পর্যন্ত শোনা যায়।

আমি বড়মতলার পুকুর ধারে ছোট্ট পেঁপে গাছটা থেকে একটা পাতা ভাঙলাম।

ওটা কি করবি!

আস্তে কথা বলতে বলছি না।

আচ্ছা আচ্ছা। এর থেকে আস্তে কথা বলা যায় নাকি!

যায়। চেষ্টা কর।

আকাশে ঝকঝকে চাঁদের আলোয় তারাগুলো ম্রিয়মান। অন্ধকার পক্ষে আকাশের এই তারা আরও বেশি সুন্দর লাগে। যেন মনে হয় লক্ষ লক্ষ জোনাকি কেউ আকাশের বুকে আটা দিয়ে সেঁটে দিয়েছে।

আমরা বাঁশ বাগানের ভেতর দিয়ে ভূততলায় এলাম।

কিরে ভূত দেখবি?

মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ লোকাল।

কি হলো।

তুই ভূত দেখ, আমি দেখব না।

সামনের দিকে একবার তাকা। দেখতে পাবি।

না তাকাব না। কি অন্ধকার। আমি তোকে ছাড়বো না।

সত্যিরে এই জায়গাটার নাম ভূততলা।

আচ্ছা তোর কি ভূত-প্রেত ছাড়া যাবার জায়গা নেই।

তুই তো বললি নতুন কিছু দেখবো।

তাই বলে ভূত!

পায়রার বুকের মতো ওর বুকটাও থিরি থিরি কাঁপছে। ওর চিবুকটা ধরে একটু নাড়িয়ে দিয়ে বললাম, গ্রামে এটা ছাড়া কি আছে বল। গ্রামের মানুষগুলো তো আর শহরের মানুষের মতো ঝকঝকে নয়। ওরা এখনও ভূত-প্রেত-দত্যি-দানোতে বিশ্বাস করে।

মিত্রা আমার বুক থেকে মুখ তুলে চোখে চোখ রাখলো।

এই জায়গাটার নাম ভূততলা হলো কেন? খালি বাঁশ বন দেখতে পাচ্ছি।

ওই যে ঢিপিটা দেখতে পাচ্ছিস।

হ্যাঁ।

এক সময় ওখানে একটা জোড়া বটগাছ ছিল। এখন একটা আছে আর একটা মরে গেছে। আমার শোনা কথা। গুনিনকাকার কাছ থেকে শুনেছিলাম। আমায় ভীষণ ভালোবাসতেন। এই গ্রামকে নিয়ে আমার যা কিছু গল্প তা গুনিনকাকার কাছ থেকে সংগ্রহ।

তুই কি কোনও মন্ত্র জানিস?

জানতে চেয়েছিলাম। শিখতে চেয়েছিলাম। গুনীনকাকা হাসতে হাসতে বলেছিল, মন্ত্র জানলে বংশ থাকে না।

মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল।

তারপর!

জানিস মিত্রা গণিকারা পৃথিবীর সর্বত্র আছে। আমাদের এই আজ গাঁয়েও আছে।

কি বলছিস!

হ্যাঁরে।

এই ভূততলা নামের পেছনেও সেই গণিকার কাহিনী। আজ থেকে প্রায় আশি নব্বই বছর আগের ঘটনা। তখন আমাদের গাঁয়ে তিন মাতব্বর ছিল। নামটা তোকে বলবো না। তবে মনাকাকার কাকা তার মধ্যে একজন। তাদের তখন ভরা যৌবন। গ্রামের মাতব্বর বলে কথা। সবাই ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে। হুঙ্কার ছাড়লে পঞ্চাশজন লোক জড়ো হয়ে যায়।

বয়সের ধর্মে যা হয়। ওরা তিনজনে ভাটপাড়ার এক বিধবা যুবতীর কাছে যাওয়া আসা করতো। গ্রামের দু-একজন লোকে জানলেও মুখে রা-টি করতে পারতো না। একদিন সেই ভদ্রমহিলা সন্তান ধারন করলেন। কি হবে এবার?

সে যুগে আজকের মতো আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। তাই সেই ভদ্রমহিলাকে খুন করে ওই বটগাছের গোড়ায় পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। তারপর একটা রিউমার তুলে দেওয়া হয়েছিল। ওখানে এই তিনজনের কেউ একজন ভূত দেখেছে। গ্রামের সহজ সরল মানুষ তা বিশ্বাস করে নিয়েছে।

সেই ভদ্রমহিলা।

গল্পের পরি বনে গেছে। তাকে নিয়ে কতো গল্প-গাথা লেখা হয়ে গেছে।

সেই থেকে এই পথে অনেকে হাঁটা বন্ধ করে দেয়।

পথ যদি না থাকে। মানুষ চলাচল যদি না করে। যা হয় এখানে ঘন জঙ্গল হয়ে যায়। রাতের অন্ধকারে তা আরও ভয়াবহ লাগে। মানুষ আসে না। একটা ভুলে দুটো প্রাণ চলে গেল। নাম হয়ে গেল ভূততলা।

আমি প্রায় এসে এখানে বসে থাকি। গুনিনকাকা যেভাবে মেয়েটার রূপ বর্ননা করেছিল তার মুখটা ভেবে তাকে দেখতে ইচ্ছে করতো, কোনওদিন তার দেখা পায়নি। আজও পাব না। ভূততলা আছে সেই ভূত আর নেই।

গুনীনকাকা জানল কি করে?

আমি যেভাবে গুনীনকাকার থেকে জেনেছি। গুনীনকাকাও কারুর কাছ থেকে জেনেছে।

মিত্রা আমার দিকে কেমনভাবে যেন তাকিয়ে। চোখে যেন বিশ্বের ক্ষুধা।

চল।

দু-জনে হাত ধরাধরি করে, ভূততলাকে ডান দিকে রেখে আমরা আবার হাঁটতে আরম্ভ করলাম।

মিত্রা আমার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে।

এই জায়গাটা সাবধানে আসিস, দেখছিস তো চারপাশ।

উঁ কি গন্ধ বেরচ্ছে।

হাসলাম।

নীচের দিকে একটু তাকা।

এমাগো পটিতে ভর্তি। এখানে লোকে এসব করে নাকি।

তাহলে কি, তোর মতো টাইলস বসানো বাথরুমে করে।

তুই এখান দিয়ে এলি কেন।

তুই তো বললি নতুন জায়গা দেখবি।

তাই বলে এই পটি করা রাস্তার মধ্যে দিয়ে।

বেশি কথা বলিস না, পা পরে গেলে….।

এমাগো উঁ….।

আমরা ভূততলার ঢিপিকে ডাইনে রেখে নদী বাঁধে এসে উঠলাম।

দাঁড়া কি উঁচুরে বাবা।

সাবধানে আসিসি সারারাতের শিশির পরে একটু হড়কা হয়ে গেছে।

তুই ধর।

আমি ওর একটা হাত ধরলাম।

ধীরে ধীরে বাঁধের ওপর উঠে এলাম।

বাঃ কোথা থেকে কোথায় চলে এলি! কি সুন্দর জায়গা। এটাকী সেই নদী? কালকে যেটা পেরোলাম।

হ্যাঁ। যেখানে যেরকম জল। এখানে মাঝখানে প্রায় তিন মানুষ জল। চওড়াও প্রচুর।

মাঝখানে ওগুলো কিরে।

নৌকো বাঁধা আছে। খড় ধান নিয়ে যায় চকের হাটে। ওই হাটটা এখানের সবচেয়ে বড়হাট। শহরের ব্যাপারীরা আসে।

মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে।

চাদরটা মাথায় দে, ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে।

তুই দে।

আমার সহ্য করার ক্ষমতা আছে। তোর নেই।

মিত্রা আমার কথা শুনলো।

বুবুন।

কিরে।

আবার বাথরুম পেয়েছে।

বসে যা। আমি পেছন ফিরে আছি।

এখানে?

তাহলে কোথায়!

সত্যি তুই না।

এর থেক সুন্দর জায়গা পৃথিবীতে আছে?

মিত্রা আমার দিকে ঘুরে তাকাল। ওদিকে ফের।

আমি নদীর দিকে ফিরে তাকালাম। জল এখন অনেক কম। তবু যতটা আছে তার সৌন্দর্য কম নয়। চাঁদের আলো পড়ে চিক চিক করছে। হালকা উত্তুরে বাতাস বইছে।

চল হয়ে গেছে।

দেখলাম মিত্রা উঠে দাঁড়িয়ে। দড়ি বাঁধছে।

কি রকম মজা পেলি বল। একটা অন্ততঃ থ্যাঙ্কস দে।

ও আমাকে জাপ্টে ধরে গালে চকাত করে একটা চুমু খেল।

নদী বাঁধ ধরে কিছু দূর যাওয়ার পর পদ্মপুকুর পরে।

বুবুন এদিকটা নদী এদিকের এই ফাঁকা মাঠটা।

বিকেল বেলা যে বিলটার ওপর দিয়ে পীরবাবার থানে গেছিলাম এটা তার শেষপ্রান্ত।

এত বড়ো!

এই বিলটার চারদিকে পাঁচটা গ্রাম। তার মধ্যে আমাদের কাজলদীঘি একটা।

এই বিলটা কাদের।

খাস।

খাস মানে!

কারুর নয়, সকলের অধিকার আছে।

এরকম হয় নাকি।

শহরে হয় না। গ্রামে হয়।

এখানে একটু দাঁড়া।

কেন!

ওদিকটা ভালো করে দেখিস কেউ আসছে কিনা।

কেন পটি করবি?

ছাগল।

এটা ধর।

তুই এই পেঁপে ডালটা নিয়ে কি করবি বলতো, তখন থেকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছিস।

এত কথা বলিস কেন।

আমি বাঁধ থেকে নেমে গেলাম। ওদিক থেকে কেউ এলে, ইচ্ছে করে কাশবি।

কেন!

যা বলছি করবি।

ঠিক আছে।

আমি নদীর বুকে নেমে খেঁজুর গাছটার কাছে এলাম। পেছন ফিরে দেখলাম বাঁধের ওপর মিত্রা দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি চাদরটা গা থেকে খুলে কোমড়ে বেঁধে নিলাম। জুতোটা খুলে তর তর করে গাছে উঠে পরলাম। ছোটো হাঁড়ি, নামাতে অসুবিধা হলো না। নামিয়ে নিয়ে দৌড়ে মিত্রার কাছে এলাম।

মিত্রা মিটি মিটি হাসছে। তুই চুরি করলি!

কে আমার শাধু পুরুষ রে।

আমি মাটিতে হাঁড়িটা রেখে, পেঁপের ডালটা দুটুকরো করলাম।

পারলে খা। এখুনি এটা আবার ঝুলিয়ে রেখে আসতে হবে।

আমি পেঁপের নলটা হাঁড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে নিস্তব্ধে চোঁ চাঁ টানতে আরম্ভ করলাম। মিত্রা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমাকে দেখল। তারপর বসে পরলো। আমার মতো করে রসের হাঁড়িতে পেঁপের নলটা ঢুকিয়ে টানতে আরম্ভ করলো। আমার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হাসলো। চোখের ইশারায় বললো দারুন। আমি ওকে ইশারা করে বললাম যতটা পারিস তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। বেশি দেরি করা যাবে না। ও অনেকটা খেল। আমিও খেলাম। আবার ছুটে গিয়ে হাঁড়িটা যথাস্থানে ঝুলিয়ে রেখে এলাম। ধীর পায়ে ওর কাছে এলাম।

কি রকম খেলি বল?

দারুন। একবারে এই পর্যন্ত।

মিত্রা গলায় হাত দেখাল।

বমি করবি নাকি।

না। পেটটা কেমন আই-ঢাঁই করছে।

একটু নেচে নে।

কেন!

নিচের দিকে নেমে যাবে। তাহলে হাঁটতে অসুবিধা হবে না।

ধ্যাত।

পেটটা একটু নারা। দেখ ঘট ঘট আওয়াজ হবে।

ও আমার কথা মতো নারালো।

সত্যি খালি পেটে পেট পুরে জল খেলে যেমন আওয়াজ হয় তেমন হলো।

মিত্রা হো হো হো করে হেসে উঠলো।

চারিদিকে ওর হাসির অনুরণন মিহি কুয়াশার মতো ছড়িয়ে পরলো। ও মজা পেল। ডেকে উঠলো বুবুন। আবার সেইরকম হলো।

একটু নাচি।

নাচনা, কে দেখবে, আমি ছাড়া।

আমার কথা মতো খোলা আকাশের নীচে, নদীর মিঠে হাওয়ায় কোমরে চাদর বেঁধে, গুণগুণ গান করে ও একটু ধেই তা ধেই করে হাত পা ছুঁড়ে নাচল।

আমি হো হো করে হাসছি। আবার সেই একই অবস্থা ইকো সাউন্ডের মতো চারিদিকে শব্দ তরঙ্গ ভেসে বেরাচ্ছে। মিত্রা বার বার চেঁচিয়ে উঠছে বুবুন, বুবুন বলে। এই মুহূর্তে ওর মধ্যে একটা ছেলেমানুষী খেলা করছে। আমি ওকে তারিয়ে তারিয়ে দেখছি। ভীষণ ভালো লাগছে। ও থামলো।

কিরে ভালো লাগছে?

হ্যাঁ। এক নিঃশ্বাসে তখন যেভাবে খেয়েছিলাম, যেন গলার কাছে চলে এসেছিল। পেটে আর জায়গা ছিল না।

এখন কি মনে হচ্ছে?

যতোটা খেয়েছি ততটাই খেতে পারবো।

এখনও ভোর হচ্ছে না কেন বলতো! অনেকক্ষণ বেরিয়েছি।

তুই ঘড়ি দেখে বেরিয়েছিলি?

হ্যাঁ। মিটসেফের ওপর তোর ঘড়িটা ছিল।

মিত্রা খিল খিল করে হেসে উঠলো।

হাসছিস কেন!

ওটা বন্ধরে গাধা।

সব্বনাশ। আমি পৌনে পাঁচটা দেখে বেরোলাম।

ওটা গত কালের টাইম।

মোবাইল নিয়ে আসিসনি?

দূর। তুই।

আমিও রেখে এসেছি।

ধ্যুস। এখন কটা বাজে বলতো।

দাঁড়া শুকতারা উঠেছে নাকি দেখি।

আকাশের দিকে তাকালাম। হ্যাঁ উঠেছে। মিত্রা দেখতে চাইল ওকে দেখালাম।

বেশি দেরি নেই এবার ভোর হবে।

কি করে বুঝলি?

শুকতারাটার পজিশন দেখে।

আমাকে বুঝিয়ে দে?

বুঝতে গেলে মাথার ঘিলু লাগে।

বুবুনরে।

আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম চোখমুখ কুঁচকিয়ে আছে।

বল পটি পেয়েছে?

সত্যি।

আমি জানতাম, কুত্তার পেটে ঘি সইবে না।

তুই আমাকে কুকুর বললি?

না তা নয়। আমি ততলিয়ে উঠলাম।

বুঝলাম আলটপকা মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে। কথা ঘোরাবার চেষ্টা করলাম।

খাঁটি জিনিষ তোর সহ্য হবে না। জল মিশিয়ে দিলে ঠিক ছিল।

তুই আগে বল, কোথায় যাব?

আমার মাথায় কর।

মিত্রা হাসছে।

বল না।

নদী সামনে আছে। নীচের দিকে নেমে যা, আমি ওদিকে ফিরে আছি।

জামাকাপর খুলে।

না ওপরটা খুলতে হবে না, নিচটা খুলে যা।

ভেতরেরটা।

ওটাও পরে এসেছিস! কে দেখবে তোকে এই অন্ধকারে?

তুই।

নে খুলে যা। আমি এখানে বসছি। কাশলে উঠে দাঁড়াবি।

আচ্ছা।

মিত্রা কামিজটা খুলে ফেললো। ওইটা পরে যাই ওখানে সামনে খুলে রাখব।

যা পারিস কর।

ও নদীর বুকে নেমে গেল। আমি একবার পেছন ফিরে তাকালাম। হ্যাঁ ঠিক ঠিক যাচ্ছে। মনে মনে বললাম, ঠিক মতো বেগ পেলে ভূতের ভয়, মানুষের ভয়, শেয়ালের ভয়, সব চলে যায়। লোভী। কতটা রস চোঁ চা করে খেল। পটি পাবে নাতো কি হবে।

সিগারেটের প্যাকেটটাও নিয়ে এলাম না। এই সময় একটা সিগারেট খাওয়া যেত। বসে বসে আমি মাটির ঢেলা ছুঁড়তে আরম্ভ করলাম। পূবদিকের আকাশটা সামান্য ফরসা হয়েছে। রিনিঝিনি শব্দে মিত্রার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

বুবুন।

ফিরে তাকালাম।

হাত ধবো কি করে।

নদীর কাদা মাটি নিয়ে হাতে ঘোষে নে। মনে কর ওইটা তোর লিকুইড সোপ।

ও কিছু একটা বললো। আমার কাছে এসে পৌঁছল না। বুঝলাম গজ গজ করছে।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি।

নীচু হয়ে হাত ধুলো। জলশৌচ মনে হয় হয়ে গেছে। হাত ধুয়ে পা ধুলো। পা ঝাড়ছে। বুঝলাম পায়ে কাদা লেগেছে। আমি হাসছি। ঠেলার নাম বাবাজীবন। ধীরে ধীরে উঠে এলো। হাতে প্যান্টি।

আমি হাসছি।

হাসিসনা।

কিরে ওটা পরিসনি?

ভিঁজে আছে না। আগে তোর পাঞ্জাবীটা দিয়ে মুছি।

কেন তোর অতো বড়ো ঝুল জামাটা।

পেছনটা ভিঁজে গেছে।

ঠিকমতো ধুয়েছিস না দেখতে হবে। না দেখতে হবে।

ধ্যাত।

আমার কাছে এসে সত্যি সত্যি পাঞ্জাবী দিয়ে পাছু মুছলো। দিলাম এক চিমটি।

উঃ।

হাসছি।

আমাকে ধর।

কেন!

পরতে গিয়ে যদি উল্টে যাই।

আমি ধরলাম।

ও প্যান্টিটা পরলো কামিজটা পরলো। মিটি মিটি হাসছি।

হাসছিস কেন?

হাসি পাচ্ছে।

হাসি পাচ্ছে। মিত্রা মুখ ভ্যাঙচালো।

এখন ভালো লাগছে।

কি আরাম।

নতুন জায়গা ঘুরলি, আবার খাজনাও দিয়ে গেলি।

যাঃ  ৷ অসভ্য কোথাকার। দেব না একটা ঘুসি।

মিত্রা কিল তুললো। আমি হাসছি।

ওই দেখ সানরাইজ। দূরে আকাশটা যেখানে ঝুপ করে নীচু হয়ে মাটির সঙ্গে মিশেছে, সেখান থেকে কমলারংয়ের গোল বলটা উঁকি মেরে আমাদের দেখল।

ইস মোবাইলটা থাকলে তোলা যেত।

আর একদিন এসে তুলিস। চল সামনে পদ্মপুকুর, কতো পদ্ম ফুটে আছে দেখবি।

আমি মিত্রা বাঁধের রাস্তা ধরে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে আমরা হেঁটে চলেছি। সামনে একজনকে আসতে দেখছি, কাছাকাছি আসতেই বললো, কে গো অনি না।

আমি মুখের দিকে তাকালাম, ঠিক চিনতে পারছি না।

কাল তোমার ঘরকে গেছলাম। তুমার দেখা পাইলামনি, জেলা সভাপতিকে একটা পেন্নাম করলি।

আমি মুখের দিকে তাকিয়ে আছি, ঠিক চিনতে পারছি না।

আমি রামপুরার শশধর শাসমল গো। তুমানকার খেতটি ভাগে চাষ করি। তুমি দেখছো, মনে করতে পারতিছ না। মনামাস্টার জানে।

তবু আমি মনে করতে পারছি না।

তুমি এত সকালে কোথায় যাচ্ছ? আমি বললাম।

কয়েকটা গাছে রস দিছি, নাম করতে যাচ্ছি।

কোথায় গো?

হা সে নদী ধারে।

মিত্রা আমার হাতটা চেপে ধরলো। আমিও ওর হাতটা চেপে ধরে প্রতি উত্তর দিলাম।

বাবা পারও বটে তোমরা। মিত্রা বললো।

পারলে একটু রস খাইও। আমি বললাম।

গাছ থেকে নামি নিয়ে তুমার ঘরকে যাব। জেলা সভাপতি খাতি চাইলেন।

যাও।

আমরা এগিয়ে গেলাম। মিত্রা একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। আমাকে জড়িয়ে ধরে হো হো করে হেসে উঠলো।

বুবুনরে তুই সত্যি কত ছলনা করতে পারিস।

চুপ কর। শুনতে পেলে খারাপ ভাববে।

দাঁড়া আজ গিয়ে তোর হচ্ছে। বড়োমার ভালোছেলে বলে কথা।

আর কোনওদিন নিয়ে আসব না।

আচ্ছা আচ্ছা বলবো না।

মনে থাকে যেন।

আমরা হাঁটতে হাঁটতে বাঁধ বরাবর সোজা পদ্মপুকুরের ধারে চলে এলাম। মিত্রা দেখে অবাক। চারিদিকে জল আর জল। ঝিলের ধার বরাবর নানারকমের গাছ। গ্রামের ঘরে আম, জাম, কাঁঠাল, বেলগাছ সবচেয়ে বেশি। এরপর অর্জুন, বট, অশ্বত্থ। এই সব গাছ কাউকে পুঁততে হয় না। আপনা থেকেই প্রকৃতির আপন খেয়ালে যেখানে সেখানে গজিয়ে ওঠে। দীঘির কাঁচের মতো পরিষ্কার জলে সকালের সূর্যের কমলা রং ঢেউ তুলেছে। মাঝখানে কিছু বক, সরাল, পানকৌড়ি, শামুক খোলা মাঝেমাঝে দীঘির বুকে মুখ লুকিয়ে মাছ ধরে খাচ্ছে। পাখির কিচির মিচির শব্দে চারিদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছ। কোথাও গাছের ফাঁকে বসে ফিঙে পাখি লেজ নারছে। কাঠ বিড়ালি ল্যাজ তুলে এ মাথা থেকে ও মাথা ছুটে বেড়াচ্ছে। কোথাও তিতির তি তি করে সুর তুলে ডাকছে। চারিদিকে এক অদ্ভূত মায়ার খেলা। মিত্রা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারদিকটা দেখল। ওর চোখের পলক পড়ে না।

বুবুনরে এ তুই কোথায় নিয়ে এলি! সত্যি কি দারুন জায়গা। তোর দীঘাআড়ি একরকম সুন্দর। এর রূপ আর একরকম।

পদ্মপুকুর এই নদীর সঙ্গে মিশে আছে। বলতে পারিস এটা আমাদের গ্রামের রিজার্ভার। গ্রীষ্মকালে এর জল চাষের কাজে লাগে। গ্রামের লোকেরাই এর সংস্কার করে। ওই পাশে একটা লক গেট আছে। বর্ষাকালে জল ভর্তি হয়েগেলে লক গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কয়কটা পদ্ম তুলে দে।

চল।

আমরা পায়ে পায়ে নিচে নামলাম। এখানে দাঁড়া আমি একটা গাছের ডাল ভেঙে আনি।

কেন?

এতোটা জলে নামা যাবে না। ডালটা দিয়ে ফুলগুলো কাছে টেনে আনতে হবে।

তাহলে নিম ডাল ভাঙ দাঁতনও হবে।

কাছা কাছি দেখছি না। চল দেখি ওদিকে পাই কিনা।

আমরা আবার ওপরে উঠে এলাম। পুকুরের পাড় দিয়ে হাঁটছি। জনমানব শূন্য। সড় সড় করে একটা আওয়াজ হলো। মনে হলো কেউ যেন ছুটে চলে গেল। মিত্রা আমার হাতটা চেপে ধরল। আমি ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম। একজন পটি করতে বসেছে। ঝোপের আড়ালে। সে উঠে দাঁড়িয়ে আর একটু গভীরে চলে গেল।

মিত্রা আমার দিকে ভয়াতুর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে।

কিরে!

তোর মতো নিশ্চিন্তে বসেছিল। আমরা যে এসে পরবো বুঝতে পারেনি।

বুঝলি কি করে?

এ তো মহা মুস্কিল। বোঝাতে গেলে তোকে গ্রামে দশ বছর থাকতে হবে।

দেবনা একটা গাঁট্টা।

চল।

আবার একটু এগিয়ে এলাম। একটা নিমগাছ পাওয়া গেল। আমি ডাল ভাঙলাম। আর ওদিকে নয়। চল এগিয়ে যাই ওপাশের ঘাট থেকে পদ্ম তুলে দেব। তারপর বাঁধ থেকে নেমে পরবো।

কেন, চলে যাবি?

না।

তাহলে!

এই পথে যখন এসেছি একবার পাঠশালায় যাব। অনেকদিন যাইনি।

তোর?

হ্যাঁ।

মিত্রা আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। তুই পাঠশালায় পড়েছিস!

মাথা দোলালাম, দেখ তোর বুবুনের প্রাথমিক শিক্ষার সূতিকা গৃহ কেমন ছিল।

আমরা নিম দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে এগিয়ে গেলাম। এখন আর সকালের মতো ততটা শীত করছে না। আমি চাদরটা কোমরে বেঁধে নিলাম। আমার দেখা দেখি মিত্রাও কোমরে বেঁধে নিল। আমরা পদ্মপুকুরের পূর্ব ঘাটে চলে এলাম। মিত্রা বললো একটু দাঁড়াই দাঁড়া।

কেন।

মনে হচ্ছে আর একবার হবে।

কিরে দু-দিনের রি-এ্যাকসন নাকি!

কি জানি।

কি জানি মানে! তোকে নিয়ে মহা মুস্কিল। এখানে শরীর খারাপ করে মাথা খারাপ করবি না। সিধে কলকাতায় নিয়ে চলে যাব।

সকালে কতটা রস গেলালি।

আমি গেলালাম! তুই লোভের মারে খেয়ে নিলি। আবার বলে কিনা দাঁড়া আর একটু টেনে নিই।

মিত্রা হাসছে।

কি হলো?

না একটু বাথরুম করলে মনে হয় ঠিক হয়ে যাবে।

দেখ এরকম বোনবাদার আর পাবি না। জলও পাবি না। পেলে করে নে। এরপর ফাঁকা মাঠ। গাছের পাতা দিয়ে মুছতে হবে।

তুই ভয় দেখাস না।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে।

কতটা রস খাওয়ালি, কতটা হাঁটালি বল।

ওর মুখের চেহারা দেখে, আমার রাগও হচ্ছে, হাসিও পাচ্ছে। বেশ বুঝতে পারছি অতি কষ্টে চাপার চেষ্টা করছে।

ঠিক আছে, একটু করে নিই।

জামা-কাপড় খুলে সামনের ওই ঝোপের মধ্যে চলে যা। বেশি দূরে যাস না।

কোনদিকের ঝোপে যাব বল।

ঘাটের দিকে নেমে ডানদিকের ঝোপের মধ্যে বসে পর। কেউ দেখতে পাবে না।

ধোবো কোথায়?

কেন, এত জল তোর চোখের সামনে।

তুই চেয়েচেয় দেখবি।

না চোখ বন্ধ করে থাকবো।

ও দৌড় লাগাল।

আমি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁতন চিবিয়েই চলেছি। একবার করে তাকাই। কিছুক্ষণ পর দেখলাম মিত্রা ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো।

কি-রে, নরম না শক্ত।

শক্ত।

বাঁচালি। কলকাতায় খেলি এখানে এসে খাজনা দিলি।

দাঁড়া তোর ঘাড় মটকাচ্ছি গিয়ে। ওদিকে ফের।

আমি পেছন ফিরে দাঁড়ালাম। দুষ্টুবুদ্ধি মাথায় খেললো। হঠাত ঘুরে তাকাতেই, মিত্রা জল থেকে সটাং উঠে দাঁড়াল।

শয়তান। আমি জানতাম।

যাব নাকি।

এলে চোবাব।

তুই কি রেহাই পাবি।

ঘোর না।

এখনও হয়নি?

আর একটু বাকি আছে।

আমি আবার ঘুরে দাঁড়ালাম।

চিরিদিক নিস্তব্ধ। ঝির ঝিরে হাওয়া গাছের পাতায় দোলা দিচ্ছে। একটা মিষ্টি শব্দ চারদিকে কুয়াশার মতো ঝড়ে পরছে। দুম করে পিঠে একটা ঘুসি পরলো। আমি একটু অভিনয় করে মাটিতে পরে গিয়ে কাতরাতে আরম্ভ করলাম।

মিত্রার মুখটা শুকিয়ে আমশি হয়ে গেল। আমি কাতরাতে কাতরাতে লক্ষ্য করছিলাম ও পেন্টিটা পরেছে কিনা। দেখলাম ও পরেনি। আমি ঝপ করে ওর মুন্তিতে হাত দিয়ে দিলাম। ও লাফিয়ে উঠল। জায়গাটা ভিজে একেবারে সপ সপে হাত দিতেই ও আমার পেটের ওপর উঠে বসলো।

শয়তান। অভিনয়।

এখুনি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি। আমার তলপেটের ওপর বসে দিলো দুবার মুন্তিতা ঘসে। আমি হাসছি।

মোছা হয়ে গেছে, এবার নাম।

না।

চারিদিকে কেউ নেই, দেবো এখানে ফেলে….।

দেনা, আমি কি না বলেছি।

ওঠ ওঠ বেলা হয়েছে। অনেকটা পথ ফিরতে হবে। দেরি হয়ে গেলে আবার পাঠশালায় যাওয়া যাবে না।

ধর।

কেন।

পরি।

মিত্রা প্যান্টিটা পরে কামিজটা পরলো, আমরা দুজনে দীঘির জলে নেমে মুখ ধুলাম। পাজামাটা গুটিয়ে, গোটা দশেক পদ্মতুলে মিত্রার হাতে দিলাম। তারপর আবার হাঁটা পথে বাঁধ থেকে নেমে ধানখেত।

সোনালী ধানে মাঠ ভরে আছে। কোথাও কাটা হয়েছে। কোথাও এখনও কাটা হয়নি। কেউ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ তার সন্তানের ভারে মাটির সঙ্গে নুয়ে পরেছে। দেখতে দেখতে ধানখেতের মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ধরে আমার পাঠশালায় এসে পৌঁছলাম।

আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে, আমার শৈশব এখানে বন্ধক রেখে গেছি।

কইরে তোর পাঠশালা।

ওই তো খরের ঘরটা।

যাঃ।

হ্যাঁরে, ওটাই তোর বুবুনের প্রাথমিক স্কুল।

কেউ নেই!

থাকবে কেন?

তারমানে!

গ্রীষ্মকালে সকালে স্কুল। আর শীতকালে দুপুরে।

কি রকম স্কুলরে?

এ কি তোদের কিন্ডার গার্ডেন?

মিত্রা আমার দিকে তাকাল।

আমরা মাথা নীচুকরে স্কুল বাড়িতে ঢুকলাম। একটা মাত্র লম্বা ঘর। মিত্রা চারিদিক চেয়ে চেয়ে দেখছে।

এটা তোদের স্কুল।

হ্যাঁ।

বেঞ্চ কোথায়?

বেঞ্চ! ওসব ভুলে যা, এই ঘরটা দেখছিস এটা থ্রি আর ফোরের ক্লাস হয়। এই পাশটা থ্রি। ওই পাশটা ফোর। বারান্দার ডানদিকে ক্লাস টু আর আমরা সামনে ওই গাছতলায় বসতাম। ওটা ক্লাস ওয়ান। বাম দিকের বারান্দায় স্যারেরা মাদুর পেতে বসে কেউ এলে তাদের সঙ্গে গল্প করে। গার্জেনরা এলে কথা বলে।

বৃষ্টি পরলে?

সব এই ঘরে একসঙ্গে মুরগির পোল্ট্রির মতো কঁকড় কঁকড় কঁ করতাম।

অফিস ঘর!

স্যারের বাড়িতে।

তুই কোথায় বসতিস?

আয়।

আমি মিত্রাকে বাইরে নিয়ে এলাম। সেই শিরিষ গাছটা এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ওই গাছের তলায় ওকে নিয়ে গেলাম। আমি এখানে বসতাম। গাছের গোড়ার নির্দিষ্ট স্থানটা দেখালাম। আমার এই পাশে বাসু বসতো আর এইখানে অনাদি। সামনে চিকনা বসতো। প্রচুর মার খেতো আমার হাতে।

কেন রে?

মাথায় উকুন ছিল। আমার মাথায় ঢুকতো। মনাকাকা বেধড়ক মারতো, কেন আমার মাথায় উকুন ঢুকেছে। কি জবাব দেব। আমি এসে চিকনাকে পিটতাম। তারপর অনেক বেশি বয়স পর্যন্ত আমার মাথায় চুলই ছিল না। ন্যাড়া মাথা। উকুনের হাত থেকে বেঁচে গেলাম।

মিত্রা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

ভাবছিস বুবুন তোকে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছে।

মিত্রার চোখের পলক পড়ছে না।

না-রে একটুও মিথ্যে নয়। সেই অনি তোর সঙ্গে কলকাতার নামজাদা কলেজে পড়েছে। স্টার পেয়েছে। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে। এই সিরিষ গাছের তলা থেকে তার জীবন শুরু।

মিত্রার বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

ও আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।

জানিস মিত্রা এই গাছের তলাতেই আমার জীবনের প্রথম অঘটন ঘটে।

মিত্রার চোখে বিষ্ময়।

সেদিন খেয়ে দেয়ে স্কুলে এসেছিলাম। মনাকাকা জোড় করে স্কুলে পাঠাল। মার শরীর খারাপ, বাবার শরীর খারাপ। চারিদিকে বন্যা হয়ে গেছে। জল একটু নেমেও গেছে। স্কুল খুলেছে। আমরা সবাই স্কুলে এসেছি। দুপুরের দিকে মনাকাকা লোক পাঠাল নিতে। পোকা মাস্টার স্কুল ছুটি দিয়ে দিল। কে যেন আমাকে কোলে করে নিয়ে গেল। এখন ঠিক মনে করতে পারি না। বাড়িতে পৌঁছতেই দেখলাম মনাকাকা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কিছুক্ষণ কাঁদল, এরপর আমি মৌসুমিমাসির কাছে ছিলাম। তারপর আমাকে কোলে করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলো।

মিত্রার চোখদুটো ছল ছল করে উঠলো।

একমাসের ওপর আর স্কুলে আসিনি। কাকা আমকে নিয়ে কতো কাজ করলো। কাকার কয়েকজন বন্ধুও সঙ্গে ছিল। একমাস পর যেদিন প্রথম স্কুলে এলাম, কি রিসেপশন পেয়েছিলাম জানিস না। আমার এখনও আবঝা আবঝা মনে আছে সেই দিনগুলোর কথা। আমি যেন স্কুলের হিরো। যদি আকাশের চাঁদ চাইতাম, হয়তো তাও আমাকে এনে দেবার ব্যবস্থা হতো।

তারপর সব আবার থিতিয়ে গেল। সেই গতানুগতিক জীবন। মানুষ খুব তাড়াতাড়ি সব ভুলে যায় জানিস। ভুলে যায় বলেই তারা সুখে ঘর সংসার করতে পারে। আর যারা ভুলতে পারে না, তাদের ভীষণ কষ্ট। সব কেমন যেন বুকের মধ্যে দলা পাকিয়ে যায়।

আমিও ভুলে গেছি বাবা-মার মুখটা। চেষ্টা করলেও মনে করতে পারি না। কাল বড়োমাকে জড়িয়ে ধরে যখন কেঁদে ফেলছিলাম, মায়ের মুখটা বার বার মনে করার চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি। বুকের ভেতরটা কেমন দলা পাকিয়ে উঠেছিল। ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। তারপর সামলে নিলাম।

মিত্রা আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

আমি জানি তোরও অনেক কষ্ট। তাই তোকে আর কষ্ট দিতে চাই না। তোর মতো বড়োমারও কষ্ট আছে, ছোটোমারও কষ্ট আছে, দাদারও আছে, মল্লিকদারও আছে।

কিছুক্ষণ দুজনে ওই ভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারিদিক নিস্তব্ধ। শুধু পাখির ডাকে চারিদিকে ম ম করছে।

চল। যখন থ্রিতে পরি তখন কোথায় বসতাম দেখে নে।

হ্যাঁরে বুবুন এই এবরো খেবরো মেঝেতে তোরা বসতিস কি করে।

হেসে ফেললাম। আমার সব কিছুতেই একটা না একটা গল্প আছে বুঝলি। আমার বললে ভুল হবে আমার মতো যারা এসব পাঠশালা থেকে মানুষ হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের। কেউ গুছিয়ে বলতে পারে, কেউ বলতে পারে না।

কাকা দুটো স্যান্ডো গেঞ্জি আর দুটো ইলাস্টিকের কালো ইজের প্যান্ট কিনে দিয়েছিল। এটা আমার গ্রীষ্মকালীন পোষাক। আর শীতকালে ফানেলের একটা ফুল হাতা জামা। আর শান্তিপুরের গামছা দেখেছিস, ওই রকম একটা পাতলা চাদর। ব্যাশ শীত গ্রীষ্ম কেটে যেত। মিত্রা আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।

পরনে ইজের প্যান্ট, গেঞ্জি, বগলে একটা একহাতি মাদুর, আর বাজারের ব্যাগের মধ্যে একটা স্লেট, তাও সেটা গোটা নয়, বর্নপরিচয় আর সহজপাঠ প্রথম ভাগ। ক্লাস ওয়ান পাস। ক্লাস টু সহজপাঠ দ্বিতীয় ভাগ, হাসিখুশি, আর এ বি সি ডি শেখার বই। ক্লাস থ্রিতে এসে ইংরাজি বানান শেখার একটা বই, কিশলয়, অঙ্কের বই, স্বাস্থ্য ও সামাজিক আর ছাত্রবন্ধু। ক্লাস ফোর পর্যন্ত এরকম ছিল। তারপর ফাইভ থেকে সেই পীরবাবার থানের ওখানে যে স্কুল সেই স্কুল। এক নতুন জগত। এক নতুন অনুভূতি, সব কিছু নতুন। একটু একটু করে নিজেকে পাল্টাতে আরম্ভ করলাম।

তাহলে যেখানে প্রোগ্রাম হলো ওখানে যে স্কুলটা আছে ওটা কি?

ওটা এই হালে হয়েছে। ওটা নাকি জুনিয়র হাই স্কুল। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ান হয়।

ক্লাস থ্রি মানে আমরা এই স্কুলের সিনিয়ার হলাম, মানে তোদের ওখানে নাইন-টেন বলতে পারিস।

মিত্রা হাসছে।

আমি এই জানলাটার ধারে বসতাম। তুই বোস।

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে!

বোসনা, একটা জিনিষ দেখাব।

মিত্রা আমার কথা মতো জানলার ধাপিতে উঠে বসলো। ওর ঠিকমত জায়গা হচ্ছে না।

একটা ছোটোখাটো মানুষ এই জানলাটায় বেশ ভালোভাবে বাবু হয়ে বসতে পারতো। বেশ আরাম করে ঠেসান দিয়ে।

মিত্রা মাথা দোলাচ্ছে। এবার তুই চোখ বন্ধ করে কল্পনা করে নে, তুই সেই ছোট্ট বুবুন, তোকে মাস্টার লিখতে দিয়েছে, তুই জানলা দিয়ে পাশের ওই ঝোপে টুনি পাখি, চড়াই পাখি, শালিক পাখি, বুলবুলি পাখি, টিয়া পাখির ঝগড়া দেখছিস। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকা বুঝতে পারবি।

আমি মিত্রার পাশে গিয়ে থেবড়ে বসে পরলাম।

মিত্রা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বাইরের দিকে তাকাল।

কি দেখছিস?

মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমার গালে একটা চুমু খেয়ে বললে, সত্যি বুবুন তোর চোখ আছে। এই জায়গায় বসলে আমিও বুবুন হয়ে যেতাম।

শুধু তোর ইমোসনটাকে ঠিক ঠিক কাজে লাগাতে হবে। দেখবি প্রকৃতি মানুষের ওপর ভীষণ ভাবে প্রভাব বিস্তার করে। আমরা তার কাছে অতি নগন্য। তুচ্ছা তি তুচ্ছ প্রাণ।

বুঝতে পারছি নিজেও ভীষণ ভাবে ইমোশন্যাল হয়ে পরেছি। বারে বারে আমার ফেলে আসা অতীতকে খোঁজার চেষ্টা করছি।

ওই জামগাছটা দেখছিস।

হ্যাঁ।

ওই বকুল গাছটা দেখছিস।

হ্যাঁ।

এদের বয়সের কোনও গাছ পাথর নেই।

গ্রীষ্মকালে জাম গাছের তলাটা কালো হয়ে ভরে যায়, খেয়ে শেষ করা যায় না।

আমরা বকুল গাছটায় উঠে বকুল ফল পেরে আগে খেতাম। তারপর বিচিটা দিয়ে বাঁশি তৈরি করে বাজাতাম।

আমাকে একটা বানিয়ে দিবি। মিত্রার চোখ চক চক করে উঠলো।

দেব।

পায়ে পায়ে ঘরের আর একপাশে গেলাম দেখলাম মিত্রা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে।

এদিকে আয়।

মিত্রা ধীর পায়ে উঠে এলো।

এই জানলাটা ক্লাস ফোর। এখানে বসে দেখ তুই সেই এক ছবি দেখতে পাবি।

স্কুলটার নাম কিরে।

আশাপুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়।

তোদের মাস্টারের নাম কি ছিল।

প্রকাশ মাইতি। সবাই তাকে পোকা মাতি বলে ডাকত। আমরা বলতাম পোকা মাস্টার।

একজন মাস্টার।

না।

তাহলে।

আরও দুজন ছিলো, একজন অনাধি ভট্টাচার্য, আমি ডাকতাম অনাধিদাদু বলে।

কেন!

মনাকাকা অনাধি মাস্টারকে কাকা বলতো, তাই আমি দাদু বলতাম। আর একজন ছিলেন মেঘনাথ পড়েয়া। সবাই ডাকতো মেঘি পইড়্যা বলে। এরা সবাই আমাদের বাড়িতে প্রায় যেত।

এখন এঁরা কোথায়?

কেউ বেঁচে নেই।

মিত্রার মুখটা কেমন যেন হয়ে গেল।

আয় বাইরে আয়, বকুল গাছটার তলায় যাই।

মিত্রা আমার হাত ধরে বেরিয়ে এল।

কি নিস্তব্ধ চারিদকটা।

বিশ্বভারতী গেছিস।

একবার।

ঠিক আছে তোকে নিয়ে যাব। আমি বিশ্বভারতীর যেখানে গিয়ে একলা বসে থাকি তোকে সেই জায়গাটা দেখাব।

কবে যাবি?

একটু সময় করে নিই।

আমরা স্কুলের পেছনের বকুল গাছটার তলায় এলাম।

এই দেখ বকুল ফল পরে আছে। খাবি।

দে।

মিত্রা দাঁতে কেটেই থু থু করে ফেলে দিল।

কিরে।

ইস কি কষ্টে।

তোর মুখ নেই তাই কষ্টে লাগছে, আমি দু-তিনটে কুড়িয়ে খেয়ে নিলাম।

মিত্রা আমাকে তারিয়ে তারিয়ে দেখছে।

দাঁড়া দেখি পাথরটা আছে কিনা। আমি স্কুলের দেয়ালের ধারে গেলাম। দেখলাম হ্যাঁ এখনও আছে সেইভাবে দাঁড় করানো অবস্থায়। মিত্রাকে ডাকলাম। ও কাছে এলো।

এই পাথরটা দেখছিস।

ও আমার দিকে তাকাল।

আমি যখন ক্লাস ওয়ানে তখন থেকে ওখানেই দেখছি।

তার মানে।

এখানে হাতিম মীড়ের একটা ধানকোটা আর গম ভাঙানর কল ছিল। প্রায়ই পাথর বদল হতো। এটা তার একটা পাথর। তারপর সেই ধানকুটা কল অভাবের তাড়নায় উঠে যায়।

কেন?

গ্রামের মানুষ ধান কুটে ঠিক মতো পয়সা দিত না। ছয় পয়সার বদলে পাঁচ পয়সা দেবে এক পয়সা নিয়ে তুমুল ঝগড়া করবে।

এই পাথরটা কি কাজে লাগে।

বর্ষাকালে মাঠ ঘাট সব কাদা হয়ে যায়। স্কুলে আস্তে গেলে পায়ে কাদালাগে। এই পাথরটাতে পা ঘোষে ঘোষে কাদা তোলা হয়। তারপর ওই টিউবওয়েলের জলে পা ধুয়ে স্কুলে ঢোকা। আর আমরা বকুল বিচি এতে ঘষে ঘষে বাঁশি তৈরি করতাম। পাথরটা আমাদের খুব কাজে লাগতো।

বাঁশি কি করে তৈরি করবি!

দাঁড়া দেখাচ্ছি।

আমি একটা বকুল বিচি কুরিয়ে নিয়ে এসে পাথরটার ওপর তার একপাশ ঘসে ঘসে একটু চ্যাপ্টা করলাম। দেখলাম বিচির ভেতর শাসটা দেখা যাচ্ছে।

মিত্রার দিকে তাকালাম। ও আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে।

তোর কাছে সেফটিপিন আছে।

ও ঘাড় নাড়ল, নেই।

কিরে তুই, মেয়ে মানুষের কাছে সেফটিপিন চাইলাম বললি নেই।

আমি ব্যবহার করি না।

উঠে দাঁড়ালাম।

কোথায় যাচ্ছিস।

দাঁড়া।

আমি সোজা সামনে একটা বাবলা গাছের কাছে এলাম।

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

একটা বাবালা কাঁটা তুলে আনি।

সেটা আবার কি রে!

দেখ না।

আমি বাবলা গাছ থেকে একটা বড় বাবলা কাঁটা ভাঙলাম।

কাঁটা দিয়ে কি করবি।

খালি বক বক।

মিত্রা হাসছে।

কাঁটা দিয়ে বিচির ভেতরের শাঁসটা খুঁটে খুঁটে বার করে আনলাম। ফুঁদিয়ে ভালকরে পরিষ্কার করলাম। তারপর দু-আঙুলের ফাঁকে রেখে জোড়ে ফুঁ দিলাম। শিস দেওয়ার মতো আওয়াজ হলো। মিত্রা শব্দ করে হেসে উঠলো।

চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়েছে এক অনাবিল আনন্দের অনুভূতি।

আর একবার বাজা।

আমি বাজালাম।

দে আমি একটু বাজাই।

আমি ওর হাতে দিলাম। প্রথমবারটা বাজাতে পারলো না। আমি ওর দু-আঙুলের ফাঁকে ঠিক মতো রেখে বললাম ঠোঁটে আঙুলটা ছুঁইয়ে ফুঁ দে। হাতে ধরে দেখিয়ে দিলাম। ও তাই করলো, পিঁ করে বাঁশী বেজে উঠলো। মিত্রার চোখে বিষ্ময়।

আমি পেড়েছি বুবুন, আমি পেড়েছি।

নে তুই বাঁশি বাজা। আমি আর কয়েকটা বানাই।

আমি বাঁশি বানাতে বসলাম। মিত্রা ঘুড়ে ঘুড়ে ফুঁ দিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে। ওর বাঁশি বাজানোর শব্দে জাম গাছে বসে থাকা পাখিরাও ডেকে উঠছে। ও আরও মজা পেয়ে গেল, ও ওই ভাবে বাঁশি বাজায়, শিস দেয়। আমি ওকে লক্ষ্য করছি।

মিত্রা যেন এক নতুন জগতের সন্ধান পেল। প্রকৃতির সঙ্গে মিলনের প্রথম স্বাদ।

বকুল বিচি ঘষতে ঘষতে কান পেতে শুনলাম একটা মোটর বাইকের আওয়াজ ধীরে ধীরে এদিকেই এগিয়ে আসছে।

মিত্রা।

ফিরে তাকাল। কি?

শোন।

কাছে এল।

পাশে বসে চোখ পাকিয়ে বললো, কি হয়েছে!

একটা মোটর বাইকের আওয়াজ হচ্ছে না।

একটুক্ষণ চুপ থেকে বললো, হ্যাঁ।

শোন ভালো করে আওয়াজটা, এদিকেই এগিয়ে আসছে না।

হ্যাঁ! মনে হচ্ছে খুব কাছে, আমাদের এই রাস্তাতেই এগিয়ে আসছে।

কাজ সেরেছে।

কেন!

মনে হচ্ছে লোক বেরিয়ে পড়েছে খুঁজতে।

মিত্রা হাসল।

দারুন মজা লাগছে।

কেন?

আমাদের খুঁজতে বেরিয়েছে।

এইরকম ভাবে হারিয়ে যেতে ভালো লাগে না?

ভীষণ ভালো লাগে।

তাহলে আমি পাগল নয় বল।

কে বলে তুই পাগল। তোকে যারা চেনে না, তারা পাগল।

তুই চিনলি?

আজ না। সেই কলেজ লাইফ থেকে। তাই তোর জন্য আমিও পাগল।

হাসলাম।

আওয়াজটা একেবারে সামনে এসে আছাড় খেল।

দুটো বাইক এসে থামল বকুল গাছটার তলায়। বাইক থেকে নামল অনাদি আর বাসু।

অনাদি গম্ভীর, বাসু হাসছে।

আমি হাসছি।

মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে।

হাসবি না। তোর হাসি দেখলে গা জ্বলে যায়। অনাদি বললো।

বাবাঃ কি রাগ। মিত্রা বলে উঠলো।

বাসু জোরে হেসে উঠলো।

তোরা দুটো কি মানুষকে পাগল করে দিবি?

কেন!

কখন বেরিয়েছিস বাড়ি থেকে?

মিত্রার ঘরিতে তখন পৌনে পাঁচটা বাজে। তাও মিত্রা রাস্তায় এসে বললো, কাল থেকে ঘড়িটা বন্ধ হয়ে পরে আছে।

তারমানে কখন বেরিয়েছিস জানিস না।

না।

তুই পাগল এটা মেনে নিয়েছি। ম্যাডামকে পাগল করছিস কেন?

মিত্রা ফুঁদিয়ে বাঁশি বাজিয়ে উঠলো।

অনাদি আর গম্ভীর থাকতে পারলো না। হেসে ফেললো। বাসুও হাসছে।

এখানে বসে বসে এই সব করছিস।

হ্যাঁ। মিত্রা বললো।

তুই কি ক্লাস ফোরে পরছিস?

মিত্রাকে দেখাচ্ছিলাম।

দেখলেন ম্যাডাম, আপনার বুবুনের আঁতুর ঘর।

সঙ্গে তোমাদেরটা ফাউ।

আমাদেরটাও দেখিয়েছে!

সবারটা।

বাঃ বাঃ তাহলে এখানে অনেকক্ষণ আছিস বল।

আনাদি আমার দিকে তাকাল। আমি কোনও উত্তর দিলাম না। বাঁশী বানাচ্ছি।

তা জানি না, ঘড়ি নেই। মিত্রা বললো।

মোবাইল।

বাড়িতে রেখে এসেছি।

মানে কেউ যেন আপনাদের নিষিদ্ধ কাজে বিরক্ত না করে।

বাবাঃ তুমি হেডমাস্টারের মতো কথা বলছো। বাসু, অনাদিকে বকো তো।

অনাদি হাসছে।

সত্যি অনি, তোকে নিয়ে আর পারা যাবে না।

পদ্মপুকুর থেকে কখন এলি?

ওখানে যাইনি। আমি বললাম।

আবার মিছে কথা বলছিস। শশধর কাকা তোদের দেখেছে।

তাহলে সবই তো জানিস।

না বললে জানতেই পারতাম না কোথায় গেছিলি। প্রথমে ওখানেই যাই। চারিদিক শুনশান দুজনের কেউ কোথাও নেই। কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। এরপর তোদের গতিবিধি কোথায় হতে পারে। ভাবলাম ফিরে গেছিস।

ছোটোমাকে ফোন করলাম। বললো না ফিরিসনি। তখন বাসুই বললো, দেখ এখান থেকে কাছে, দুটো জায়গা আছে। বাজার, নয়তো স্কুল। প্রথমে বাজারে গেলাম। তারপর এখানে এলাম। সকাল থেকে কত কিলোমিটার গাড়ি চালালাম বল তো?

কতো হবে, মাইল দেড়েক।

মাইল সম্বন্ধে তোর জ্ঞান আছে।

অনেকদিন গ্রামের বাইরে আছি, ভুলে গেছি।

বাসু হেসেই চলেছে। আমি অনাদির সঙ্গে কথা বলছি বাঁশী বাজাচ্ছি। মিত্রা মাটিতে থেবড়ে আমার পাশে বসে।

তুই থাম অনাদি, আর হেজাস না। চল, দুজনে দুটোকে তুলে গ্যারেজ করি।

বুবুন আমার পদ্ম!

মিত্রার দিকে তাকালাম।

আমি কি করে জানব!

বাসু অবাক হয়ে তাকাল। পদ্ম আবার কি!

আমার পদ্মফুল।

তুই যে বললি, পদ্মপুকুরে যাস নি! অনাদি বললো।

আমি হাসছি।

মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, যা স্কুলবাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখ।

মিত্রা আমার কথা শেষ হবার আগেই উঠে দৌড় দিল।

বাসু ওর পেছন পেছন গেল।

অনাদি আমার দিকে কটকট করে তাকিয়ে আছে। আমি মুচকি মুচকি হাসছি।

মিত্র ওর ফুলের গোছা নিয়ে ফিরে এলো।

এতো ফুল তুললি কি করে!

গাছের ডাল ভেঙে নিলাম।

তোকে আর কিছু বলা যাবে না। তুই যে কি করে এত বড় বড় স্কিম করিস, আমার মাথায় ঢোকে না।

বুবুন আমি বাসুর বাইকে বসি। তুই অনাদিরটায় বস।

কেন!

না হলে অনাদি আমাকে বকতে বকতে নিয়ে যাবে। তুই অনাদির কাছে বকুনি খা। মিত্রা বললো।

অনাদি কিছুতেই গম্ভীর থাকতে পারছে না। বার বার হেসে ফেলছে।

মিত্রা, বাসুর দিকে তাকাল।

বাসু আসতে চালিও। না হলে দেখবে তুমি বাড়ি পৌঁছে গেছ। আমি রাস্তায় উল্টে পরে আছি।

বাসু হাসছে।

মিত্রার কথা মতো, আমি অনাদির বাইকে উঠলাম।

মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম।

অনাদি খামারে বাইক রাখলো। আমি নেমে দাঁড়ালাম। মিত্রা বাইক থেকে নামলো। বাইরের বারান্দায় নিরঞ্জনদা, কাকা বসে আছে। আরও অনেকে। আমি বারান্দায় উঠলাম।

নিরঞ্জনদা হেসে ফললো।

তুই তো মানুষকে পাগল করে দিবি।

আমি মাথা নীচু করে হাসলাম।

তুই আগে দাদাকে ফোন কর।

কেন!

ওখানে হুলুস্থূলুস কান্ড বেঁধে গেছে।

সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখের জিওগ্রাফি মুহূর্তের মধ্যে চেঞ্জ হয়ে গেল।

এতবড়ো একটা কাজ করলি, তোর সঙ্গে শেয়ার করবে না।

আর কিছু। গলার স্বর কর্কশ।

না তেমন কিছু নয়, আমি ম্যানেজ করে দিয়েছি।

অনাদি আমার পেছনে। ও আমার চোখে মুখের চেহারার পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে।

মিত্রা বুঝে গেছে হাওয়া গরম। ও ভেতরে চলে গেল।

আমি হন হন করে এবাড়িতে চলে এলাম। মিটসেফের ওপর ফোনটা দেখতে পেলাম না। নিচে নেমে এলাম। আসার মুখে দেখলাম, মিত্রা ও বাড়ি থেকে এ বাড়িতে আসছে।

এই নে তোর ফোন।

সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা নিয়ে দাদাকে ধরলাম।

দাদার ফোন স্যুইচ অফ। অনাদি-বাসু এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। মিত্রা আমার সামনে।

মল্লিকদাকে ফোনে ধরলাম। হ্যালো করতেই বললাম।

বলো কি হয়েছে?

তুই কোথায়?

এই ফিরলাম। খবর বলো। ভাল না খারাপ?

বাবা তোকে বেশ গম্ভীর গম্ভীর মনে হচ্ছে। সকাল বেলা হনিমুনে গেলি। কি করলি একটু ছাড়।

এখন ওটা বলার মতো মুড নেই। আগে বলো খবর খারাপ না ভালো।

ভালো।

দাদার ফোন বন্ধ কেন?

দাদা সকাল থেকে আর পারছে না। বাধ্য হয়ে ফোন বন্ধ করে রেখেছে।

আমার ফোন নম্বর দাওনি কেন?

তুই ফোন নিয়ে যাস নি তাই।

যার দরকার সে আমাকে খুঁজে নেবে। আমি কারও তাঁবেদারি করতে যাইনি।

দাদা একবার ভেবেছিল, তারপর বললো অনির পার্মিশন না নিয়ে দিই কি করে।

কারা ফোন করেছিল?

সেক্রেটারিয়েট থেকে ঘন ঘন ফোন আসছে। কর্পোরেশনের মেয়র ফোন করেছিল। কতো বলি বল।

ঠিক আছে, দাদাকে দাও।

ভয়েজ অন করা আছে?

না, বলো।

তুই যা তা করে দিলি। দাদার গলা পেলাম।

কেন!

যা লিখেছিস সকলের ঘুম কেরে নিলি।

কি বলতে চায়?

মোদ্দা কথা ক্রমশঃ লেখা যাবে না। আজ যা বেরিয়েছে বেরিয়েছে, কাল স্টপ করুন।

তুমি কি বলেছো?

আমি বলে দিয়েছি, মালিক কাম এডিটর কলকাতার বাইরে। যে লিখেছে সে কলকাতার বাইরে। আমি ভারপ্রাপ্ত এডিটরের কাজ সামলাচ্ছি।

কারা বলছে স্টপ করতে?

শেষে চিফমিনিস্টারের সেক্রেটারি।

কি বলেছো?

যা বললাম তোকে।

নো কমপ্রমাইজ। বলে দাও আমাকে ফোন করতে ডকুমেন্ট ঠিক করে রাখবে। পারলে দশটা জেরক্স করাও। যদিও অরিজিন্যাল আমার কাছে। ফোন অফ করবে না। যদি ভেজারাম ভেজারাম করে বলে দাও কেস করতে। আমি বুঝে নেব। মলের লাস্ট আপডেট?

সকাল পর্যন্ত খবর ভেন্টিলেশনে আছে।

কাগজ দেখে মুখার্জী ফোন করেছিল?

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/Jon6Aep
via BanglaChoti

Comments