কাজলদিঘী (৯৩ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

৯৩ নং কিস্তি
—————————

বুঝলি সঞ্জু কি বললাম। তুই আবার এর থেকে একটু বাড়িয়ে বলবি। যেটা বাড়িয়ে বলবি ওটা তোর কমিশন।

আমি মিডিলম্যান হবো। চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো।

তোকে ফোন করলে তুইও বলবি।

আমায় ফোন করলে জুতায় ছাল ছিঁড়ি দেব। ভানু বলে উঠলো।

তোকে ফোন করবে না। চিকনা বললো।

কইলে হলো।

চুপ থা না।

ভানু চুপ করে গেলো।

নীপা আমার কোল থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে।

বেশ একটু আরাম করে নিলে। নীপার দিকে দুষ্টুমি চোখে তাকালাম।

ঘুসি বাগিয়ে এগিয়ে এলো, নোড়া দিয়ে মুখ ভেঙে দেব।

হাসাহাসি চলছেই।

নীপা বড়োমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাল।

তোরা ওরকম করিস বলেই তো ও ওরকম করে।

বড়োমা, দাদারা কোথায়?

ও বাড়ির বারান্দায়। লোকের আসার আর বিরাম নেই।

আবার কারা এলো।

কি করে বলি বলতো।

বড়োমা খাওয়ার জায়গা করি। নীপা বললো।

আগে ওদের খাইয়ে দে। তারপর।

আমরা পরিবেশন করে দিই। ভানু বলে উঠলো।

তোমরা বাইরের বারান্দায় বরং আর যারা আছে তাদের বসিয়ে দাও। নীপা বললো।

কজন আছে বলো তো। নীপার দিকে তাকালাম।

তোর জেনে লাভ। চিকনা বলে উঠলো।

আমি একটু হাত লাগাতাম।

ভানু জোড়ে হেসে উঠলো।

চিকনারে অনি কবে পরিবেশন করেছিল বলতো।

কেন মানিবুড়ি মরে যেতে আমরা সবাই মিলে চিঁড়ে দই খাইয়ে ছিলাম। মনে আছে।

তুই থাম। আর কথা কইস নি। তুই তোর কাজ কর। আমাদের কাজ আমাদের করতে দে। চিকনা বললো।

ও চিঁড়ে দই পরিবেশন করেছিল না নিজে খেয়েছিল। মিত্রা ভানুর দিকে তাকাল।

এ কথা বললে অন্যায় হবে ও কনোদিন নিজে নিয়ে খেত না। আমরা দিলে খেত।

আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে হাসছি।

এখানে খাপ খুলতে পারবি না।

ভানুর দিকে তাকালাম।

ভানু কাল বিচেকলার মলম হবে না।

সেটা আবার কিরে? মিত্রা আমার দিকে তাকাল।

ভানু হাসছে।

আলুভাতে খেয়েছিস।

হ্যাঁ।

বিচেকলাকে শেদ্ধ করে মশলা দিয়ে ওরকম ভাবে মাখা হবে।

বড়োমা আবার একটা নতুন রেসিপি।

উঃ মিত্রাদি তুমি না। নীপা চেঁচিয়ে উঠলো।

আর কি আছে ভানু। মিত্রা জিজ্ঞাসা করলো।

হিঁচড়ের দালনা।

এই দেখো গাঁইয়া ভাষা বেরিয়ে পরেছে। চিকনা বললো।

আমি হাসছি।

মিত্রা বিষ্ময়ে আমার দিকে তাকাল।

গাছবদার তরকারি।

ও বড়োমা দেখছো, হিঁচড়, গাছবদা কি সব বলছে।

তুই জিজ্ঞাসা করছিস কেন। বড়োমা বললো।

ম্যাডাম হিঁচড় হচ্ছে এঁচোড়। আমরা গ্রামের মানুষ, গাছবদা বলি। এখানে মাংসের চল নেই, এঁচড়কে মাংসের মতো করে নিরামিষ রান্না করা হয়। পাকলে সেটা কাঁঠাল। বাসু বেশ ধীর স্থিরভাবে বললো।

শুনলে তনু শুনলে।

শুনলাম, কাল খেয়ে দেখি।

নীপা, ইসি কোথায়? আমি বললাম।

ও বাড়িতে টেনে ঘুম মারছে।

বড়, বৌ দুজনে একসঙ্গে না আলাদা আলাদা।

বরুণদা আড্ডা মারছে।

চলো এবার ওঠা যাক। আমি দাঁড়িয়ে উঠলাম। আসর ভেঙে গেল। সবাই একসঙ্গে উঠলাম। ঝোলা ব্যাগটার ভেতর থেকে পামটপটা বার করে নিলাম।

ভানু বড়োমার হাত ধরে ধরে নামাল।

আমি সবার পেছনে।

চারিদিকে আলো জ্বলছে। বেশ লাগছে।

সঞ্জু রান্না কারা করছে?

সব বৈষ্ণব পাড়া থেকে এসেছে।

কেন আমাদের গ্রামের পাঞ্চানন কাকা।

কবে মরে হেজে গেছে।

ওর ছেলেরা।

সব শিক্ষিত। এসব ছোটো কাজ কখনও করে না।

তাহলে!

বাজারে গিয়ে গুলতানি, আড্ডা, তাশখেলা, বিড়ি ফোঁকা, ভাকু আর পার্টিবাজি। এখন পার্টি করলেই ইনকাম।

সঞ্জুর দিকে তাকালাম।

হ্যাঁরে, চিকনাকে জিজ্ঞাসা কর।

এখন ছোটো মাপের নেতারা, মাসে দু-হাজার টাকা ইনকাম করে। অনাদি এই ব্যবস্থাটা পাকা করে দিয়েছে।

আমি চিকনার মুখের দিকে তাকিয়ে।

বিশ্বাস হচ্ছে না?

মাথা দোলালাম।

কয়েকদিন থাক বুঝতে পারবি।

এই বাড়ির বারান্দায় এসে উঠলাম।

সত্যি সত্যি এখনও বেশ কিছু মানুষ অনিমেষদাদের ঘিরে বসে আছে।

এরা বাড়ি যাবে না? চিকনাকে জিজ্ঞাসা করলাম।

খাবে-দাবে, বারান্দায় ঢালাও বিছানা করা আছে, শুয়ে পরবে।

এ বাড়ি না ও বাড়ি।

দু-বাড়িতেই।

বারান্দায় একপাশে দাদারা বসে আছে, সামনে টিভি চলছে। খামারে ইকবালভাইরা একপাশে, আর একপাশে বিতানরা। প্রবীরদাদেরও দেখতে পেলাম না। কনিষ্কদেরও ধারে কাছে দেখতে পেলাম না।

ঘুম হলো।

অনিমেষদা বললো।

হাসলাম।

তোর ওসিটা বেশ করিতকর্মা ছেলে, বুঝলি।

তুমি শুধু আমার আমার করো কেন বলো তো।

বাবা। তোর নাম শুনে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে।

তাহলে তুমি কে?

পাওয়ার লেস সেক্রেটারি।

মিত্রাকে অনাদি ফোন করেছিল। তোমায় বলেছে?

বলেছে।

ডিটেলসে না একটু খানি?

ডিটেলসে।

কি বুঝলে?

তুই যে পথটা চাইছিস সেটা ও বুঝতে পেরেছে।

ঠিক আছে।

কি হলো, সব জানা হয়েগেল?

অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।

দেখ তোকে কিন্তু আমি বেশিক্ষণ ঝোলালাম না। তুই কিন্তু ঝুলিয়ে রেখেছিস।

বসো আমি একটু আসছি।

আমি সোজা খামারের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। খামার পার হতেই ইকবালভাই ডেকে উঠলো।

কোথায় যাচ্ছিস?

একটু বাথরুমে যাব।

বাথরুম তো এদিকে।

বিতানরা হাসছে।

আমি এগিয়ে এলাম। আলো কমতেই সামনেটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। তেঁতুল তলা পেরিয়ে বড়মতলায় এলাম। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। বুঝলাম অভ্যাসটা নষ্ট হয়ে গেছে। বড়মতলার পুকুরধারে সেই হেলা বটগাছের মোটা শিকড়ের ওপর এসে বসলাম।

এই অন্ধকারেই একবার চারদিকটা চোখ বুলিয়ে নিলাম। আশেপাশে কেউ নেই।

একের পর এক ফোন করতে শুরু করলাম। সব খবরা খবর নিলাম। শেষে মুথাইয়াকে ফোনে ধরলাম। অনেকক্ষণ কথা বললাম। লেটেস্ট আপডেট নিলাম।

অনুপকে ফোন করে সব বললাম। কালকে সব কাগজপত্র সঙ্গে করে আনতে বললাম।

হিমাংশুকে ফোন করলাম। নার্সিংহোমের লাস্ট অডিটেড ব্যালান্সসিট আনতে বললাম। প্রিন্টারটা সঙ্গে আনতে বললাম। হিমাংশুর বৌয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললাম।

শেষে হানিফকে ধরলাম। দিবাকরের লেটেস্ট পজিশন জিজ্ঞাসা করলাম।

সাইন করতে চাইছিল না।

কেন!

বহুত ফ্যাঁকরা তুলছিল।

তারপর?

তোমার কাগজ দেখালাম।

কাজ হয়েছে?

সাইন করে দিয়েছে। তবে একটু বিট দিতে হয়েছে। তারপর করে দিয়েছে।

পুরনো সাইনের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছিস?

হ্যাঁ।

সব ঠিক আছে?

আমি এক্সপার্ট দিয়ে দেখিয়ে নিয়েছি।

ভালো করেছিস। আফতাবভাই ফোন করেছিল?

আমি করেছিলাম। তোমার এ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিয়েছে।

ঠিক আছে।

দিল্লীর খবর?

ও কে।

লাইনটা কেটে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। আকাশ ভরা তারা। মিট মিট করে জ্বলছে। কোনওটা বেশ উজ্জ্বল। কোনওটা ম্রিয়মান। কখন চাঁদ উঠবে জানি না। শুক্লপক্ষ কৃষ্ণপক্ষ এখন গুলিয়ে যায়। আগে এগুলো পটাপট বলতে পারতাম। কোনদিন চাঁদের কেমন চেহারা হবে তাও বলতে পারতাম। চর্চার অভাব। অনেকদিন পর আকাশে এতো তারা দেখছি। সেই ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। জোনাকীরা এদিক ওদিক উড়ে বেরাচ্ছে। অন্ধকারকে পেছনে রেখে আবার আলোর দিকে এলাম। খামারে কেউ নেই। সুনসান। বারান্দায় দেখলাম কনিষ্ক, বটা বসে। আমাকে দেখে কনিষ্ক বললো।

কোথায় গেছিলি?

একটু তেঁতুল তলায় গিয়ে বসেছিলাম।

ঘরে জায়গা নেই?

এমনি একটু গেলাম। অনেকদিন এতো গভীর অন্ধকার দেখিনি তাই।

কনিষ্ক হাসছে। অর্থপূর্ণ হাসি।

খাওয়া হয়ে গেছে?

না। ওরা সবাই বসেছে। হয়ে যাক।

খুব বোড় লাগছে না?

কেনো!

কোনও কাজকর্ম নেই। শুধু বসে বসে গা-হাত-পা ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে।

তুই হঠাৎ এসব উজবুকের মতো চিন্তা করছিস কেন?

তোকে দেখে মনে হচ্ছে।

তোকে এবার থরো চেকআপ করতে হবে।

কবে করবি বল?

হ্যাজাস না তো মটকা গরম হয়ে যাচ্ছে, কনিষ্ক তুইও সেরকম হয়েছিস। বটা বললো।

আমার সঙ্গে বটাকেও একবার চেকআপ কর।

বটার দিকে তাকালাম।

না তোর দ্বারা হবে না, এটা নীরু ভালো পারবে।

ঢ্যামনা।

এই তো খোকার মুখে কথা ফুটেছে।

বটার থুতনিটা ধরে নেড়ে দিলাম।

বটার চোখে মুখে বিরক্তি।

বুঝলি কনিষ্ক তখন দরজায় কড়া নাড়লাম।

আবার শুরু করলি, কৃষ্ণ করলে লীলা আমি করলে বিলা। বটা চেঁচিয়ে উঠলো।

আমি বেশ শব্দ করেই হাসলাম।

বল শুনি, তারপর শেষটুকু আমি বলবো। কনিষ্ক খুব গম্ভীরভাবে বললো।

কেন তুমি করো না। বটা চেঁচিয়ে উঠলো।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, আরি শালা আস্তে আস্তে। কেউ শুনে ফেলবে।

শুনুক, তুই তো শোনানর জন্য বলছিস।

তুই গরম খাচ্ছিস কেন। কনিষ্ক বললো।

অনি গরম খাওয়াচ্ছে, তাই খাচ্ছি।

তোকে কোথায় গরম খাওয়ালাম! আমি বললাম….।

কনিষ্ক আমার কথাটা মুখ থেকে কেড়ে নিল।

অনি কি তোকে বলেছে কৃষ্ণ করলে লীলা, তুই করলে বিলা। তোর জিনিস তুই আটপৌরে করে ব্যাবহার করবি না তোলা কাপর করে ব্যাবহার করবি, ওটা তোর ব্যাপার। অনি যেমন তোলা কাপর হিসাবে ব্যবহার করে।

একেবারে ঠিক। আমি বললাম।

ওমনি চাটা শুরু করলি।

তুই তো মিষ্টি খেতে, তাই চাটছি।

দাঁতে দাঁত চিপে কথাটা বলে, আবার বটার থুতনিটা ধরে নেড়ে দিলাম।

বটা আরও খেপেগেল, আমি কি মেয়ে—

একেবারে কচি—

হারামী—

শালা নীরুর সঙ্গে যখন আটা লাগাও, তখন কিছু হয় না।

অনেকদিন ছেড়ে দিয়েছি।

কনিষ্ক এবার জোড়ে হেসে উঠলো।

তারমানে তুই করতিস। কনিষ্ক বললো।

তাহলে কনিষ্ক, বটা স্বীকার করলো বল।

যাও না যাও মিত্রা, তনু, ইসি আছে তো, আমার পেছনে কেন।

তোর পেছনটা যে মিষ্টি। কনিষ্ক বললো।

প্যান্ট খুলবো দেখবি।

খুলতে পারলেই অনাদির মোগলাই। স্পন্সর আমি। চেঁচিয়ে উঠলাম।

শালা বটা চেঁচাচ্ছে কেন রে অনি। নীরু ভেতর থেকে বাইরে এলো

ওরে নীরু বটা প্যান্ট খুলবে বলছে। আমি হাসতে হাসতে বললাম।

কেন, আয়েন ম্যাডাম খাঁড়া করছি। নীরু বললো।

হ্যাঁরে ঢ্যামনা। তোর মতো তো। বটা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে উঠলো।

নীরু হাসছে।

অনি বটাকে একটু স্ট্রাইক করেছে। বটা বললো আমার পেছনটা কি মিষ্টি। আমি বললাম হ্যাঁ। তখন ও নিজেই বললো প্যান্ট খুলবো। কনিষ্ক বললো।

বটা প্যান্ট খুলবে বলেছে! প্লিজ বটা খোল না। নীরু যাত্রা দলের নায়িকা হয়ে গেল।

নীরু তুই ও দিকটা দেখ আমি এদিকটা দেখি। কনিষ্ক শুধু সিগন্যাল দেবে। তাহলেই অনাদির মোগলাই, স্পন্সর আমি।

বটা প্লিজ, পুরো না, হাফ খোল তাহলেই আমরা মোগলাই পাবো। নীরু বললো।

তুই কি আমাকে কলেজ লাইফের মতো ঘাউড়া পেয়েছিস। বটা চেঁচিয়ে উঠলো।

টিনা, মিলি, মিত্রা, তনু, ইসি, শ্রীপর্ণা যে বারান্দার শেষ প্রান্তে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে এতক্ষণ আমাদের কীর্তিকলাপ দেখছিল বুঝতে পারিনি।

একটা বিকট হাসির আওয়াজে সবাই চুপ করে গেলাম।

বটা গুম মেরে বসে রইলো।

আমিও গম্ভীর হয়ে গেছি।

নীরু একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে।

ওরা হাসতে হাসতে কাছে এগিয়ে এলো।

তুই এতো বিটকেল কেন। ইসি বললো। কাছে এসে আমার পেটে খোঁচা মারলো।

আজ নাকি, সেই কলেজ লাইফ থেকে। এখনও সেই স্বভাবটা যায়নি। বটা চেঁচিয়ে উঠলো।

কনিষ্ক, আমি না পারি হাসতে, না পারি গম্ভীর হয়ে থাকতে।

টিনা হেসে গড়িয়ে পরে।

তুমি দাঁত কেলাচ্ছ কেন। বটা কট কট করে উঠলো।

অনিদা যা বলছে করতে পারতে। মোগলাই পাওয়া যেত। আমরাও একটু ভাগ পেতাম। টিনা বলে উঠলো।

বটা এবার হেসে ফেললো।

দেখলি তুই। বটা আমার দিকে তাকাল।

একেবারে গ্যামাকসিন মেরে দিলি।

নীরুকে বললে এতক্ষণ খুলে ফেলতো। কনিষ্ক বললো।

তুই একবার মুখে বল অনি আমি ছুটে খামারে চলে যাব। নীরু যাত্রাদলের নায়িকার মতো করে বললো।

বটা তাড়া করলো নীরুকে। হারামী বয়স হয়েছে এখনও চ্যাংরামি যায়নি।

নীরু আমার পেছনে।

কনিষ্ক দাদুর মতো গলা করে বললো, আচ্ছা বটা, বয়েস তো তোরও হয়েছে, তুই কোথা থেকে কোথায় চলে গেলি।

মেজাজ ঠিক ছিল না।

তোর মেজাজ কোন দিন ঠিক থাকে।

টিনা রাতে মেজাজটা ঠিক করে দিও। আমি গম্ভীর হয়ে বললাম।

দেখলি দেখলি কনিষ্ক আবার কাঠি করলো। বটা চেঁচিয়ে উঠলো।

কি অন্যায় বলেছে অনি। অনি আমি সবাই রাতে মেজাজ ঠিক করি, তাতে অসুবিধে কোথায়।

আমিও করি। নীরু বলে উঠলো।

বটা লাথি তুললো।

অনিরে গেলাম, ওরকম গোদা পা পেটে পরলে পেট ফেটে যাবে। নীরু আবার আমার পেছনে।

মিত্রারা কেউ আর গম্ভীর হয়ে নেই ঠমকে ঠমকে সকলে হেসে উঠছে।

সেই বিকেল থেকে এঁটুলে পোকার মতো লেগেছিস। বটা আমার দিকে তাকাল।

লাগিনি, নক করেছি। বলতেই পারতিস বিজি আছি। আমি বললাম।

ইসি আমার মুখটা চেপে ধরলো। টিনা, মিলি, তনু, মিত্রা হেসে চলেছে।

নীরু এবার ক্যারিকেচার শুরু করে দিয়েছে। বটা চুপচাপ বসে আছে।

খামোকা তুই খেপে গেলি। কনিষ্ক পিন করলো।

জানিষ কনিষ্ক জ্যোতিষিরা ভোরবেলায় হাত দেখলে নাকি সব ঠিক ঠিক কথা বলে।

হ্যাঁরে….তারপর….বটা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ঠোঁট নেড়ে গালাগাল করতে শুরু করলো।

ওই সময় নাকি হাতের রেখাগুলো স্পষ্ট থাকে, হয়তো কোন ক্যামিকেল রি-অ্যাকসান থাকতে পারে। ওটা তুই আমার থেকে ভালো বলতে পারবি।

কিন্তু বটার আবার…. তুই তো আবার হাত না অন্য কিছু দেখে ডিটেলস বলতে পারিস। অনিকেতকে একবার বলেওছিলি। কনিষ্ক আমার দিকে তাকিয়ে গুরু গম্ভীর গলায় বললো।

কনিষ্ক কথা শেষ করতে পারল না। বটা চেঁচিয়ে উঠলো।

হ্যাঁরে ঢ্যামনা।

গালাগাল করছিস কেন, দুদিন পরে মেয়ের বিয়ে দিবি। শ্বশুর হবি। আমি বললাম।

মিত্রারা হেসে কুটি কুটি। বটা দাঁত কিড়বিড় করছে।

কিরে এতো হাসি কিসের। ছোটোমা ভেতর থেকে এসে বারান্দায় দাঁড়াল।

তুমি তো এতক্ষণ এলে না। দেখতে তোমার ছেলের কীর্তি। মিত্রা বললো।

বটা গম্ভীর থাকার চেষ্টা করলো, কনিষ্ক ঠোঁট মুখ চেপে হেসে চলেছে।

তোমায় বলবো। মিলি বললো।

কেন না বললে চলছে না। বটা ভেঙচিয়ে উঠলো।

গুরুতরো কিছু। ছোটোমা বললো।

না।

অনি চুপচাপ বসে আছে কেন।

হাঁপিয়ে গেছে। তনু বললো।

আমি তনুর দিকে তাকালাম।

সরি, বুঝে গেছি, আমি জানি এরপর তুমি কি বলবে। আর বলবো না।

তোরা ওর কথা সব বুঝে যাস! ছোটোমা বললো।

উঃ তোমাকে আর খোঁচাতে হবে না। তুমি অনিদাকে জান না। টিনা বললো।

মিলি হির হির করে ছোটোমাকে টেনে ভেতরে ঢোকাতে গেল।

ওরে জায়গা হয়ে গাছে আয় খেতে বসবি। ছোটোমা ভেতরে যেতে যেতে বললো।

ছোটোমা ভেতরে ঢুকতেই আমি বটাকে জড়িয়ে ধরে গালে একটা চুমু দিলাম। নীরু গালটা একটু টিপে দিলো।

সুন্তু মনা, সুন্তু মনা…।

কেন আমায় কেন। যাও না….।

আবার একচোট হাসি। আমি উঠে ভেতরে চলে এলাম। তখনও ওরা হেসে চলেছে।

আমি বাইরের বারান্দা পেরিয়ে ভেতর বারান্দায় এলাম।

অনিসাদের কাউকে দেখতে পেলাম না। বুঝলাম খেয়েদেয়ে সব শুতে চলে গেছে। অনিমেষদা, প্রবীরদা আর অনুপদাকে দেখলাম। বিধানদা আর ডাক্তারদাদাকে দেখতে পেলাম না। দাদারাও নেই। ইসলামভাই, ইকবালভাই এক সঙ্গে বারান্দার ওইপাশে বসে। অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

তোমার খাওয়া হয় নি?

তোর জন্য বসে আছি।

বিধানদা।

ওদের খাইয়ে শুতে পঠিয়ে দিয়েছি।

তুমি খেয়ে নিতে পারতে।

লাস্ট আপডেটটা মিস হয়ে যেত।

ইসলামভাই হাসছে।

কোনও আপডেট নেই খেয়ে শুয়ে পরো।

নীপা রান্নাঘরে কাজ করছে। ওকে বললাম।

চিকনারা কোথায় নীপা?

খেয়েদেয়ে একটু রান্নাশালে গেছে।

ওখানে আবার কি করতে গেছে?

তুমি কোনও খোঁজ খবর রাখো। ঝাঁঝিয়ে উঠলো।

চুপ করে গেলাম।

সুরো কোথায় বৌদি?

বিছানা করে আসছে।

আমি কোথায় বসবো। নীপার দিকে তাকালাম।

এদিকে এসে বসো। ধমকানোর সুর।

বড়োমা হাসছে।

দিদি আমি একটু অনির কাছা কাছি বসবো। অনিমেষদা বড়োমার দিকে তাকাল।

বৌদি হাসছে।

রাত্রিবেলা বিরক্ত করতে পারবে না। আমি বললাম।

একটু কথা বলবো। সকাল থেকে তোর সঙ্গে দুটো কথা বলতে পেরেছি? তুই বল।

প্রবীরদারা হাসছে।

আমি বসে পরলাম। মিত্রারা হাসতে হাসতে এলো।

তোরা এতো হসছিস কেন বলতো। ছোটোমা বললো।

হাসির রোগ হয়েছে। আমি বললাম।

ছোটোমাকে বলি। মিত্রা কাছে এসে বললো।

বল, যদি মনে করিস এটা ছোটোমাকে বলা যায়, বলবি।

মনে রাখিস, আমরা তিনজন তোর মুখ থেকে হিডিন গল্পগুলো শুনতে চাই।

হিডিন গল্প! অনিমেষদা বললো।

তুমি ওদের কথার মধ্যে মাথা ঢোকাচ্ছ কেন। বৌদি বললো।

যদি কোনও সূত্র খুঁজে পাই।

পাবে না।

অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।

সবাই বসলো।

আমি, বড়োমা, ছোটোমা, জ্যেঠিমনি, আর দামিনীমাসি লুচি আর সবাই ভাত।

নীরু দরজার সামনে হেলান দিয়ে বসে। বুঝলাম ও আগেই সাঁটিয়ে দিয়েছে।

খাওয়া শুরু হয়েছে। ছোটো ছোটো ঠাট্টা ইয়ার্কি চলছে।

নীরু। অনিমেষদা নীরুর দিকে তাকাল।

একবার চিকনাকে ডাকতো।

নীরু উঠে গেল।

ইসলাম।

হ্যাঁ দাদা, বলুন।

অনি খুব ভালো উর্দু বলতে পারে তাই না?

বলতে পারবো না। তবে সাগির, অবতার, নেপলা ভালো বলতে পারবে।

বাবাঃ তুমি তো প্রথমেই এমন ডিফেন্স করলে বল পায়ের গোড়াতেই পরে রইলো।

ইকবালভাই গম্ভীর।

নীরু এলো। সঙ্গে চিকনা। অনিমেষদা চিকনার দিকে তাকাল।

আমায় ডেকেছেন দাদা।

হ্যাঁ। একটু বোস।

চিকনা বসে পরলো।

চিকনা।

হ্যাঁ দাদা।

তখন অনাদি তোকে ফোন করে কি বললো?

কাল আসবে।

আর কি বললো?

অনি যে কাজটা করতে চাইছে ভালো করছে না।

তুই কি বললি?

তুই অনিকে বল।

তাতে অনাদি কি উত্তর দিল?

কালকে এলে ব্যাপারটা ও ব্যক্তিগত ভাবে বুঝে নেবে।

শুনলি চিকনা কি বললো। অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।

শুনলাম, এবার তুমি বলো।

আমি কি বলবো, তোর কাছ থেকে শুনতে চাই।

প্রশ্ন তুমি যখন করেছো। উত্তরটাও তোমার জানা।

তুই আজকাল তামিল ভাষায় লোকের সঙ্গে কথা বলছিস। উর্দু, তামিল আরও কতো ভাষা যে তুই শিখেছিস কি করে জানবো।

হুঁম। চুপ করে থাকলাম।

তুই বড়ো বাইরে গেছিলি না ছোটো বাইরে গেছিলি?

তনুরা এতো জোড়ে হাসলো আমি পর্যন্ত চমকে উঠলাম।

বৌদি হাসছে। আমার দিকে তাকিয়ে বললো।

তোর এইরকম চিবিয়ে চিবিয়ে কথা শুনতে ভালো লাগছে?

না লাগার কি আছে। আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। এমন তো নয় প্রথমবার শুনছি। এরকম কথা এর আগেও বহুবছর শুনেছি।

দিবাকরটা জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিল শুনেছিলাম। ওটা আবার জুটলো কোথা থেকে?

আমি চুপ করে খেয়ে যাচ্ছি। কোনও উত্তর নেই।

মুথাইয়া কেরালীয়ান। ত্রিচুরে থাকতো জানতাম। আমাদের ওখানকার পার্টির সঙ্গে ভালো রিলেশন। তোর সঙ্গে ওর যোগাযোগ কবে থেকে?

আমি মুখ তুলে অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

তুই এতো খবর রাখতে পারিস, আমি রাখলেই দোষ।

আমি হাসছি।

সারাদিন ধরে একটা কাজ আমি খুব মন দিয়ে করেছি। তোর আঠারো বছর আগেকার ইতিহাসটা বেশ ভালো করে জোগাড় করেছি। আর মনে মনে স্টাডি করেছি। কাউকে অবশ্য একটি কথাও বলিনি।

আমি এবার সোজা হয়ে বসলাম।

তোর মনে আছে। বিয়ের সময় একজন ভদ্রমহিলা এসেছিলেন। তিনি তোর মাস্টার মশাইয়ের ছাত্রী। মীনাক্ষী মনে হয় তার নাম। তিনি আবার সেই সময় আমাদের সরকারের তথ্য জনসংযোগের ডিরেক্টর ছিলেন।

দাঁড়াও দাঁড়াও মনে পড়ে গেছে। ওনার মেয়ের নাম রিমঝিম। মিত্রা বললো।

ঠিক বলেছিস।

ভদ্রমহিলার মুখের চেহারাটা তোর মনে আছে।

না। তবে ছবি আছে। ভিডিও আছে। দেখলে চিনতে পারবো।

ওনার আর একটা মেয়ে আছে। তার নাম জানিস।

তখন ওর মুখ থেকে শুনেছি, এখন মনে পড়ছে না।

প্রবীর কি নাম ভদ্রমহিলার।

ঝিমলি।

ডাক্তারবাবুকে বললাম চিনতে পারলেন না। কনিষ্ক তুই চিনিস?

কোথায় আছে বলুন?

তোদের বারাসাতের নার্সিংহোমের সঙ্গে এ্যাটাচড। তবে সেই ভদ্রমহিলার তোদের সব নার্সিংহোমেই যাতায়াত। ভদ্রমহিলা কলকাতায় পেড্রিয়াটিকে বেশ ভালো নাম করেছেন।

কেমন দেখতে বলুন তো! নীরু বললো।

তাহলে তোদের জিজ্ঞাসা করবো কেন। তোদের বারাসাতের নার্সিংহোমের সমস্ত নিউজ তিনি পাঠাতেন অনির কাছে। বলতে পারিস তোদেরও সকলের ডেলি রিপোর্ট। আমি একটা উদাহরণ দিলাম। এরকম প্রত্যেকটা নার্সিংহোমে ওর পেটোয়া লোক আছে। যারা নির্ভেজাল ডাক্তার কিন্তু ভতরের সমস্ত খবর রাখেন। এবার তোরা লোকেট কর।

এক সেকেন্ড দাঁড়ান, ম্যাডাম তোমার ফোনটা দাও তো। নীরু বললো।

মিত্রা পাশ থেকে ফোনটা দিল। আমি যেন আসামী। আমার বিচার চলছে। বড়োমা আমার দিকে তাকিয়ে। ব্যাপারটা এরকম তুই ভীষণ তেঁয়েটে।

অনিকেতের নম্বর এখানে আছে।

আমারটা থেকে কর। কনিষ্ক এগিয়ে দিলো।

তোর থেকে করলে এখন ধরবে না। ম্যাডামের থেকে করলে ধরবে।

বুবুন পার্সোন্যাল ফ্রেন্ড লিস্টে পেয়ে যাবে। মিত্রা বললো।

কনিষ্ক চুপ করে গেল। নীরু ফোন করলো।

আমি ম্যাডাম না, নীরু…. শোন না ভ্যাজ ভ্যাজ করিস না, এখানে সব গুরুজনেরা বসে আছে…. না ভয়েজ অন করিনি….

মিত্রারা খিক খিক করে হাসছে।

শোন না….প্যাড্রিয়াটিকের ওই ভদ্রমহিলার নাম কি-রে….আরে সল্টলেকে নতুন বাড়ি করেছে ওনার হাজব্যান্ড নিওরোলজিস্ট মাঝে মাঝে নীরুদা নীরুদা করে আমার কাছে পেসেন্ট পাঠায়….জয়ন্তী শ্রীনিবাসন….হাজব্যান্ডের নাম….সঞ্জয় শ্রীনিবাসন….পরে তোকে সব বলছি। তুই জয়ন্তী ম্যাডামের অন্য কোনও নাম আছে কিনা জানিস….কি নাম বলতো, ….ঝিমলি….বিয়ের পর জয়ন্তী নাম হয়েছে….ঠিক আছে তোকে একটু পরে ডিটেলসে সব জানাচ্ছি।

অনিমেষদা হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকাল।

ধরা পড়ে গেছিস।

কনিষ্কর দিকে তাকাল। এবার তুই বলতে পারবি।

জয়ন্তীর সঙ্গে আমার খুব ভালো রিলেশন। আমাদের সব কটা নার্সিংহোমের সঙ্গেই দু-জনে যুক্ত, এমনকি আমাদের এনজিওতেও ওরা দুজনে যায়। স্যারের খুব কাছের মানুষ দু-জন। সঞ্জয় তো স্যার বলতে অজ্ঞান। নার্সিংহোমের যে কোন ব্যাপারে ডাকলেই এগিয়ে আসে।

অনি এই ঝিমলিকে ভাইজ্যাকে ডাক্তারী পড়াবার ব্যবস্থা করেছিল। মুথাইয়া তখন কেরালা থেকে তাড়া খেয়ে ভাইজ্যাকে সেল্টার নিয়েছে নতুন নাম নিয়েছে মারান। হানিফ বলে একটি ছেলের আশ্রয়ে তখন থাকে। আমার মন বলছে এই হানিফ অনির খুব প্যায়ারের লোক, হানিফকে বলে মারানকে ও তখন সেল্টার দিয়েছিল। ঝিমলিকে মুথাইয়া বোনের মতো ভালোবাসে ডিউ টু অনি।

ও তো তখন ভাইজ্যাকে ইলেকশন কভার করতে গেছিল! মিত্রা বললো।

আমার যাবার কথাছিল ওর সঙ্গে, তখন অফিসে প্রচণ্ড গণ্ডগোল। তনু বললো।

এই তো তোদের গড় গড় করে মনে পড়ে যাচ্ছে।

ও ফিরে এলো, কলেজ লাইফের পর দ্বিতীয় বার ওকে তখন এত কাছ থেকে দেখলাম। মিত্রা আমার দিকে তাকাল।

কি তেজ, আমাকে বললো, আমার একটা ঠ্যাঙ অফিসে থাকে, আর একটা অফিসের বাইরে থাকে। প্রয়োজনে ওটাও বাইরে বার করে নেব।

তখনই ও কতো ডেয়ার ডেভিল বল। অনিমেষদা বললো।

আমি তার কয়েকদিনের মধ্যে রিজাইন দিয়ে বিবিসিতে চলে গেলাম। তনু বললো।

তখন তুই বিবিসিতে চান্স পেয়েগেছিস এই তো। অনিমেষদা বললো।

হ্যাঁ।

ইলেকশান কভার করতে গিয়ে মুথাইয়ার সঙ্গে ওর আলাপ, এখনও সেটা অটুট। তোরা একবার ভাব। একজন সাধারণ সাংবাদিক কিভাবে লিঙ্কম্যানের কাজ করে। মুথাইয়ার সঙ্গে ম্যাড্রাস সিএমসি হাসপাতালের খুব ভালো রিলেশন।

মুথাইয়ার কথায় ঝিমলি ওখানে চান্স পায়। আলাপ হয় শ্রীনাবিসনের সঙ্গে। তারপর মুথাইয়া ওদের দুজনকে অনির কথা মতো তোদের নার্সিংহোমের সঙ্গে যুক্ত হতে বলে। তখন তোদের নার্সিংহোমের খুব করুণ অবস্থা।

সেটা আট-ন-বছর আগেকার ঘটনা। তাই না ম্যাডাম? কনিষ্ক বললো।

হ্যাঁ। শেষ মুহূর্তে ও ফোন করলো।

তনু তুমি জানতে? অনিমেষদা তনুর দিকে তাকাল।

না দাদা। তখন ও বছরে দু-বার লণ্ডনে যেত, দু-মাস থাকত। ইদানিং ঘন ঘন যেতো।

কাগজের কাজকর্ম?

ওই দু-মাসে পুরো প্ল্যান করে দিয়ে চলে আসতো। আমি সামলাতাম। খুব দরকার পরলে ফোনে কিংবা চ্যাটে।

মিত্রার সঙ্গে তোমার কথা হতো না?

না। এককথায় বলতে পারেন ওখানে একটা অফিস আছে, তার দায়িত্বে আমি, আমাকে সামলাতো সন্দীপদা।

তোমার সঙ্গে যে অনির যোগাযোগ আছে এটা মিত্রা জানতো?

না।

তাহলে!

বছর চারেক আগে জানতে পেরেছে। তখন থেকে মিত্রাদির সঙ্গে আমি কথা বলতাম।

এইসব কথা তোমাকে কখনও বলতো না?

পাত্তাই দিত না। কতো কান্নাকাটি হাতে-পায়ে ধরার পর সুন্দরকে পেয়েছি। সুন্দরকে পাওয়ার পর প্রত্যেকদিন একবার করে ফোন করতো। না হলে চ্যাটে কথা হতো ঘণ্টা খানেক। একটু বড়ো হতে সুন্দরের সঙ্গেও কথা হতো। মা-ছেলে দুজনে একসঙ্গে চ্যাটে কথা বলতাম।

অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল—এবার তুই বল?

আমি কি বলবো, গল্পটা খুব সুন্দর লাগলো।

গল্পের নায়ক, নায়িকারা।

ভীষণ লাইভ। খুব জীবন্ত ভাবে চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তুলেছে।

মীনাক্ষীদেবী তোর বিয়েতে এসেছিল এটা নিশ্চই গল্প নয়।

তোমরা বলছো বটে আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। আঠারো বছর আগেকার ব্যাপার। কতো লোক এসেছিল মনে রাখি কি করে বলো। সব কেমন ফ্যাকাশে।

আমি যে তোর বিয়েতে উপস্থিত ছিলাম তোর রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটে সাক্ষী হিসাবে সইও করেছিলাম এটা মনে আছে?

এবার সবাই হেসে উঠলো।

বল তুমি অনি ব্যানার্জীর বিয়েতে উপস্থিত ছিলে অনিন্দ ব্যানার্জী বিয়েই করেনি। এখনও কুমার।

আবার সবাই হাসছে।

দিবাকরকে দিয়ে তুই কি সাইন করালি?

চিকনা। চেঁচিয়ে উঠলাম।

চিকনাকে তোর পেছনে লাগাইনি। এখানে আমি মিত্রার পলিসি এ্যাপ্লাই করেছি। আমার থেকে ও তোকে ভালো করে চেনে। দ্বিতীয় হচ্ছে তনু। এই দুজন ছাড়া বড়দি, ছোটো তোকে চেনেই না, তোর বৌদির কথা ছেড়েই দিচ্ছি। এরা তোক অন্ধের মতো ভালোবাসে। তুই এখনও ওদের কাছে দুধের শিশু।

নীপা দুটো লুচি দাও তো। আমি বললাম।

গল্প শুনে সব হজম হয়ে গেছে? নীপা বললো।

আমি হাসছি।

কথা ঘোরাস না। আজকে তুই বলতে পারবি না তোর খাওয়া হয়ে গেছে, খুব ক্লান্তি লাগছে, এবার উঠি। সব পথ বন্ধ করে দিয়েছি। সকালে তোর মুখ থেকে কথাটা শোনার পর আমরাও কয়েকটা নির্দিষ্ট প্ল্যান করেছি। তোর সাহায্য চাই।

সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

ওদিকে তাকিয়ে দেখলাম ইসলামভাইরা মাথা নীচু করে মুচকি মুচকি হাসছে।

তোর প্ল্যান প্রোগ্রাম কেউ জানে না। শুধু একটু একটু আভাসে ইঙ্গিতে বুঝতে পারি।

বলো কি জানতে চাও। একটু গম্ভীর হয়ে বললাম।

সে তুই আমার ওপর রাগ করতে পারিস, অভিমান করতে পারিস, মুখে যা খুশি আসে বলতে পারিস। আমার কিছু যায় আসে না। আমার এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। একটা সুযোগ পেয়েছি, এটাকে কিছুতেই হাতছাড়া করবো না। ক্যাশ করতে হবে।

চুপ করে থাকলাম।

একটু আগে খবর পেয়েছি সিপি আনোয়ারকে বাঁচিয়ে রাখে নি।

আমি মুখ তুলে তাকালাম।

সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।

গতকাল সাকিল, আজ আনোয়ার।

কার অঙ্গুলীহেলনে এটা হয়েছে, এতদিন পার্টি চালিয়ে সেটা বোঝার বয়স হয়েছে।

সিপির জায়গায় যাকে নতুন সিপি করার চেষ্টা হয়েছিল তা তুই আটকে দিয়েছিস।

নাঃ এদের দিয়ে হবে না। সবকটার আমাশা রোগ।

আবার হাসির রোল।

ইসলামভাইরা ওদিকের থেকে আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো।

আমি দিল্লীতে ফোন করেছিলাম। ওরা কনফার্ম নিউজ দিয়েছে তোর সঙ্গে মুথাইয়ার খুব ভালো রিলেশন। তুই তার বাড়িতে গিয়ে বহুরাত কাটিয়েছিস। তবে ওরা কনফিউজড অনি না অনিন্দ।

আমি চুপ করে বোবার মতো বসে আছি।

দুবাইয়ে আফতাব হোসেনের সঙ্গে তোর খুব ভালো রিলেশন, এটা আমি তনুর কাছ থেকে কনফার্ম করেছি। তুই জিজ্ঞাসা করতে পারিস, এ ছাড়া বাড়তি কোনও কথা জিজ্ঞাসা করি নি।

তনুর দিকে তাকালাম।

আমি কি করবো। দাদা যদি প্রেসার করে।

ফটো তুলবে। ওই জন্য জীবনে সাংবাদিক হতে পারনি। ঘট একটা।

অনিমেষদা হাসছে।

ইসলাম কিংবা ইকবালও আমাকে কিছু বলেনি। আমার ব্যাক্তিগত সোর্স আর ফোনা ফুনিতে যে টুকু জোগাড় করতে পেরেছি।

এখন কোনও কথা বলতে পারবো না। কাল অনাদি এলে সব জানতে পারবে। বেশি কিছু হলে আর সাতদিন অপেক্ষা করতে হবে। তোমরা যেমন ভাবে চলার তেমনভাবে চলো। ঠিক সময়ে আমি মুখ খুলবো।

আমি ভুল কিনা সেটা বল।

না তুমি ঠিক পথে চলছো। এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।

তুই তো মুখ ফুটে কিছু বলবি না। প্রবীরকে তোর প্রয়োজন হতে পারে।

ঠিক সময়ে প্রবীরদাকে আমি বলে দেব।

অনিমেষদা হাসছে।

যেমনি বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুল। বড়োমা বললো।

না দিদি ওর প্রতিটা স্টেপকে আমি সমীহ করি, একটুও ফাঁক ফোঁকর নেই। প্রবীর, অনুপ, রূপায়ণ সারাদিন কতো ফোন করেছে বলতে পারবো না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় রিপোর্ট করে, দেখি তার পরমুহূর্তে চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। সে গল্প পরে বলবো।

আমার দিকে তাকাল।

প্রবীর যে অপারেশন শুরু করেছে তার খবর তোর কাছে চলে এসেছে।

ঠিক চলছে, ভুল কিছু নয়।

অনুপ, রূপায়ণকে যে দায়িত্ব দিয়েছি—

এখনও পর্যন্ত ঠিক আছে। অনুপদা দুটো ভুল কাজ করেছে আমি শুধরে দিয়েছি।

অনুপের ভুলটা বল?

বেহালা চত্বর আর পোর্ট চত্বর নিয়ে বেশি ঘাঁটা ঘাঁটি না করাই ভালো।

অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

বড়োমা আমার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে।

বুঝলাম ইসলামকে তুই একেবারে সরিয়ে দিয়েছিস, যে টুকু সাহায্য নিস সেটা রতন, আবিদ করে দিতে পারে, ইকবালকে তুই সাইডলাইনে বসিয়ে রেখেছিস কেন।

ইকবালভাই নিজের মতো কাজ করছে। এখনও কোন ভুল করেনি।

তুই নিজে বলেছিস তুই রাজনীতি করিস না। এখন দেখছি তুই রাজনীতির ঊর্দ্ধে গিয়ে কাজ করছিস।

আমি ব্যবসা করি, ওটা ভালো বুঝি। যেখানে ব্যবসা আছে সেখানে আমি আছি। তার প্রয়োজনে যতটুকু রাজনীতি করতে হয় করি। ম্যাসেলম্যানদের সঙ্গেও ওঠাবসা করি। তবে আমার লোকজনরা কেউ তথাকথিত মাস্তান নয়।

সেটা বুঝেছি বলেই তোর সঙ্গে বসে কথা বলছি। তাও গোপনে নয়। পরিবার নিয়ে।

অনিমেষদা জলের গ্লাসে চুমুক দিল।

আনোয়ারকে সরালি কেন?

ঝিকে মেরে বৌকে শিক্ষা দিলাম। বারাবারি করলে তোমার গায়েও হাত উঠতে পারে। তার চেয়ে নিজে থেকে সাবধান হয়ে যাও।

সাবধান হওয়ার জায়গা যদি না থাকে।

তাহলে মার খেতে হবে। প্রয়োজনে মরতে হতে পারে।

আমি যে অন্যায়গুলো করেছি।

সবাই এবার আমার মুখের দিকে তাকাল।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/UDR7pkn
via BanglaChoti

Comments