❝কাজলদীঘি❞
BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৯৫ নং কিস্তি
—————————
গ্রাম্য রীতিনীতি অনুযায়ী কাকীমার অনুমতি নিয়ে কাকার কাজে বসলাম। কাজ সারতে সারতে প্রায় দুটো বেজে গেল। পঞ্চানন পণ্ডিতমশাই একটুও ফাঁক ফোঁকর রাখলেন না। বৈদিকশাস্ত্র মেনে সব ডিটেলসে করলেন। জীবনে প্রথম কোনও পারলৌকিক কাজ করলাম ঠাকুর ঘরে বসে। এমনিতে ঠাকুর ঘরে খুব একটা কখনও ঢুকি নি। আমার পেছনে মিত্রা, ইসি, তনু, মেয়ে সব পাটভাঙা শাড়ি পরে ঠায় বসে থাকলো। বড়োমা, ছোটোমা, দামিনীমাসি, জ্যেঠিমনি, সুরোমাসি, কাকীমা গেটের বাইরে। মেয়ে যদিও দু-চারবার উঠে গেছে। ওরা কেউ ওঠে নি।
এরই মধ্যে কতো লোক এসে আমাকে দেখে গেছে তার ইয়ত্তা নেই।
গায়ের আলোয়ান ঘামে ভিঁজেছে, পাটভাঙা গরদের কাপর দুমড়ে মুচড়ে একাকার।
নেড়ামাথায় সকলেই কমবেশি একবার করে হাত বুলিয়ে নিয়েছে। ছোটোমা কতোবার যে থুতনি ধরে নেরে চলে গেছে গুনে শেষ করতে পারিনি।
শাস্ত্রীয় মত পঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পালন করলাম। প্রণাম করে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। পা দুটো ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে। মিত্রাকে ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম।
অনিসা।
মায়ের ডাকে মেয়ে তাকাল।
দিদানের কাছ থেকে সুমন্ত মামার দেওয়া পাজামা পাঞ্জাবীটা নিয়ে আয়।
আমি মিত্রাকে ধরে ধরে ঘরের বাইরে এলাম। কাকার ঘরে গেলাম। কাকীমা, সুরোমাসি বসেছিল। প্রণাম করলাম। দুজনেই জড়িয়ে ধরে কিছুটা কাঁদলো। নীপা ধমক লাগাল।
মেয়ে পাজামা, পাঞ্জাবী নিয়ে এসেছে। সঙ্গে গেঞ্জী জাঙ্গিয়া।
তাই দেখে একবার হাসলাম।
আমি কাকার ঘরে ঢুকে কাপর ছারলাম। ঘরের বাইরে বেড়িয়ে এলাম।
মেয়ে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেলো।
এই লুকটা আমার বাবার লুক। মায়ের জায়গায় আমি থাকলে তুড়িমেরে তোমাকে ঠিক তুলে নিতাম।
হেসে ফেললাম।
ছোটোমা কাছে ছিল, ধ্যুস ধ্যুস করে তেরে এলো।
মেয়ে ছোটোমাকে জড়িয়ে ধরেছে।
তুমি বলো দিদাই এই বয়সে যদি বাবাকে এরকম দেখতে লাগে, তাহলে কলেজ লাইফে কেমন ছিলো বলো। চোখ টিপলো।
তোকে আর পাকামো করতে হবে না।
নীপা গ্লাসে করে লেবুর জল নিয়ে এসেছে।
সত্যি খুব তেষ্টা পেয়েছে, ঘট ঘট করে কিছুটা খেয়ে মেয়ের দিকে এগিয়ে দিলাম।
তুমি না দিয়ে খেতে পার না।
কই দেখি এবার কেমন লাগছে। চিকনা, বাসু ঢুকলো।
আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরলো।
একবারে মার্কামারা অনি। কোনও নকল নয়, একেবারে আসল।
মিত্রার দিকে তাকাল।
গুরুমা তুমি কিছু বলো।
কি বলবো।
আমাদের আসল অনি কিনা?
মিত্রা মিটি মিটি হাসে।
ঘরের বাইরে এলাম। একে একে সবাইকে প্রণাম করলাম।
স্যার প্রণাম করতে মাথায় হাত রেখে কাপড় দিয়ে চোখ মুছলো।
বুঝলি অনি, আজ মনার আত্মাটা শান্তি পেল।
চুপ করে থাকলাম। এর কোনও উত্তর হয় না।
যা এবার একটু কিছু মুখে দে।
রূপায়ণদা, অনুপদা, প্রবীরদা আমার প্রণাম নিল না। হাত ধরে ফেললো।
তোর প্রণাম নেওয়া যাবে না।
হাসলাম।
ইকবালভাই, ইসলামভাইকে দেখতে পেলাম না।
অনিমেষদাকে প্রণাম করলাম।
তাহলে সুতপা, অনিবাবু পনেরো বছরের সন্ন্যাস জীবন ত্যাগ করে এখন গৃহী হলেন।
অনিমেষদা উঠে দাঁড়িয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
তবে কি জান অনিমেষ ওকে সন্ন্যাসীর বেশে চমৎকার লাগছিল। ডাক্তারদাদা বললো।
দাদা, মল্লিকদা চোখের পলক না ফেলেই আমার দিকে তাকিয়ে।
বাইরের বারান্দায় বাবা, মা, কাকার ছবি ফুলের মালায় সাজান। ধুপ জ্বলছে।
খামারে পাড়া-প্রতিবেশি সবাই খেতে বসেছে। একসঙ্গে প্রায় তিনশো জন। ভানু, পচা, পাঁচুকে ছাড়া আর যারা পরিবেশন করছে তাদের চিনতে পারলাম না।
বুঝলি সন্দীপ ফোন করেছিল।
দাদার দিকে তাকালাম।
কলকাতা বেশ গরম, অনেকদিন পর একটা উত্তেজক নিউজ বেরলো।
অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
হাসছে।
কাজ শুরু করে দিয়েছি।
বুঝলি সন্দীপকে কে নাকি খুব ধমক দিয়েছে, এসব আজগুবি নিউজ বার করে মানুষের মনে ভাঙচি দিচ্ছেন কেন। খারপ হয়ে যাবে, এই সব।
দাদার কথা শুনে, অনিসার দিকে তাকালাম।
মা আমার ফোনটা একটু নিয়ে আয়তো।
উঃ বাবা ওটা ফোন নয় পামটপ।
ওই হলো।
তোমার ব্যাগে আছে?
মিত্রা, তনুর দিকে তাকালো।
দাঁড়া। মিত্রা বললো।
আঁচল থেকে একটা চাবি বার করে তনুকে দিলো।
তুমি ওর সঙ্গে যাও। সকালে কোথায় রেখেছি, তুমি দেখেছো। একটু বার করে দাও।
অনিসার দিকে তাকাল।
তনুমনির সঙ্গে যাও, বার করে দিচ্ছে।
আবার তনুর দিকে তকাল।
চাবি তোমার কাছে রাখবে।
তনু, অনিসার সঙ্গে গেল।
আমি পায়ে পায়ে খামারে এলাম। সবাই খাচ্ছে। কাউকে চিনতে পারলাম না। হাতজোড় করে বললাম, আমি সময় মতো আসতে পারিনি ক্ষমা করবেন। সবাই হাঁই হাঁই করে উঠলো।
ঠিক আছে, ঠিক আছে ছোটোবাবু।
গ্রামের ঋীতি মেনে এটুকু কাজ আমাকে করতে হবে।
ঘুরে ঘুরে সবার কাছে গেলাম। মেয়ে এসে মোবাইলটা দিয়ে গেল।
মা, অনুপ আঙ্কেল, হিমাংশু আঙ্কেল আসেনি? আমি বললাম।
কখন এসে গেছে।
দেখতে পাচ্ছি না।
ব্যাঙ্কে গেছে কি কাজ করতে।
ঠিক আছে।
আমি খামার ঘুরে আমার বাড়ির বারান্দায় এলাম। দেখলাম মীরচাচা বসে আছে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। সাঙ্গপাঙ্গরাও উঠে দাঁড়িয়েছে।
খেয়েছো?
হ্যাঁ। তোর সঙ্গে দেখা করবো বলে বসে আছি।
কেন চাচা আবার কি অন্যায় করলাম।
তুই সব সময় এইভাবে কথা বলিস কেন বলতো?
পাশে যারা ছিল হাসছে।
অনিমেষদার সঙ্গে কথা হয়েছে?
হ্যাঁ। আজকে কাগজ দেখলাম। সবাইকে পড়ে শুনিয়েছি।
কি বুঝলে?
এইবার তোর অনুমতি পেলে কাজ শুরু করবো।
ওই ব্যাপারটা তুমি অনিমেষদার কাছ থেকে জেনে নাও। আমার থেকে অনেক বেশি অভিজ্ঞ।
তুই একটু ভেতরে চল।
হাসলাম।
ভেতরে এসে চিকনার খাটে বসলাম। চাচা পাশে বসলো।
কাল রাতে চিকনা ফোন করেছিল।
আমাকে বললো। কি হচ্ছে এসব বলো তো?
থানার বড়োবাবুর সঙ্গে অনাদির খুব জোড় লেগেগেছে।
আবার কি হলো!
চিকনা যা বলেছে তাই ঠিক। বড়োবাবু রাজি নয়। বলেছে কিছু হলে আপনি সামলাবেন, অঢেল মানুষকে আটকাবার জন্য আমার কাছে এতো ফোর্স নেই।
তুমি এতো খবর পেলে কি করে!
তুই কি ভাবিস আমাদের লোকজন নেই?
যা পারে করুক।
মানবো কেন?
আচ্ছা ঠিক আছে। তোমাদের ওখানকার যারা ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়েছিল তাদের অবস্থা কি?
যারা নিজেরা হাতে পেয়েছিল, তারা কিছু কিছু শোধ করেছে, অনাদি যেগুলো বকলমায় নিয়েছে সেগুলো একটাও শোধ হয়নি।
আমাকে সেই নামগুলো বরং দাও। আমার দুই বন্ধু এসেছে, ওরা সামলে দিয়ে যাক।
সকালে ব্যাঙ্কে দেখা হয়েছিল। ইমামসাহেব আলাপ করিয়ে দিয়েছেন, আমাদের কথা সব বলেছি। কি কাজ করছিলেন, বলেছেন রাতে একবার আসুন জেনে নেব।
তাই এসো চাচা। সবার সঙ্গে একবার দেখা করি।
চাচা চলে গেল।
আমি এ বাড়িতে এলাম। বৌদি প্লেটে করে চারটে রসোগোল্লা নিয়ে এলো। দেখেই মনে হলো এখানকার নয়। কলকাতার।
কে নিয়ে এলো বৌদি?
দামিনী অর্ডার দিয়ে রেখেছিল, অনুপ, হিমাংশু নিয়ে এসেছে।
দুটো খেয়ে একটু জল খেলাম।
দাদাদের খাওয়া হয়ে গেছে?
সকাল থেকে কতোবার খেয়েছে ঠিক আছে।
হাসলাম।
তুমিও শেষ পর্যন্ত বড়োমার মতো শুরু করলে।
হ্যাঁরে, বুড়ো বয়সে এতো খাই খাই ভালো নয়।
সহ্য করতে পারলে খাবে না কেন?
বৌদি হাসছে।
আমার বন্ধুরা।
কে কোথায় আছে বলতে পারবো না। তবে পেছন পেছন লোক আছে।
ব্যাশ তাহলেই হলো। সামনে পুকুর, পেছনে পুকুর। ধারে কাছে যেন না যায়।
বৌদি চলেগেল, সবাই যে যার মতো ব্যস্ত।
সুন্দরদের ধারে কাছে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। খামারের দিকে তাকিয়ে দেখলাম এই ব্যাচটা উঠলো, আবার বসার জন্য রেডি হয়ে আছে। সামনের খেতে সব জড়ো হয়েছে। এক একটা পাড়া ধরে ধরে সব চলছে।
আমি পায়ে পায়ে রান্নাশালে এলাম। চিকনা এগিয়ে এলো।
লাস্ট ব্যাচ, বাকিটা শাল্টে দিয়েছি।
কটা ব্যাচ শাল্টালি।
সাত নম্বর বসছে।
কতো লোক হয়েছে।
বাড়ি বাদ দিলে দু’হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
বাড়ির লোক জন?
সত্তরভাগ হয়েগেছে।
এতো লোক!
তবু কম।
আমি হাসছি। বড়োমারা?
বড়োমারা সবে মাত্র মিষ্টি জল খেল। একটু বসতে দে।
ব্যাঙ্কের লোকজন?
এসেগেলেই বসিয়ে দেব। ও হ্যাঁ কালকের থেকে আজকে বেশি জমা পরেছে।
কতো।
তা জানি না। বাসু বললো এই মাত্র ব্যাঙ্কের লোকজন এসেছিল টাকা পয়সা গোনাগুনি করে নিয়ে গেল। ওরা সব বন্ধ করছে এবার চলে আসবে।
বাসুর বৌ, ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি না।
তুই চিনতে পারছিস না। বড়োটা বাইরে পরিবেশন করছে, ছোটোটা আশেপাশে কোথাও আছে। বাসুর বৌ ভেতরে নীপা, কাঞ্চনের সঙ্গে হেঁসেল সামলাচ্ছে।
নীপার স্কুল থেকে কেউ আসে নি?
এসেছিল, তুই তখন স্যারের কাজ করছিলি, খেয়ে চলে গেছে।
দেখা হলো না।
ভানু কাছে এসে দাঁড়াল। চিকনা কয়টা বিড়ি দে।
কেন, এখুনি এক বান্ডিল দিয়েছি।
এতক্ষণ চলে। নেশা করার লোক কম আছে।
চিকনা এগিয়ে গিয়ে একটা প্যাকেট থেকে এক বান্ডিল বিড়ি এনে দিল।
একটু দোক্তাপাতা দে।
শালা আমাকে খা।
ছেলেগুলান খাটতিছে টুকু দোক্তাপাতা বিড়ি দিবি নি।
চিকনা আবার গিয়ে দোক্তাপাতা এনে ভানুর হাতে দিল। ভানু হাসছে।
অনিকে একটু ধোঁকা খাওয়া, শেষেরটা ভালো বানাইছে।
চিকনা গিয়ে কলাপাতায় করে দুটো ধোঁকার বড়া নিয়ে এলো। বেশ গরম।
নীপাকে দেখলাম তিনচারটে বড়ো গামলা নিয়ে এলো।
তোর আবার কি হলো? চিকনা তাকাল নীপার দিকে।
তরকারি তুলে দাও। ভাতটা ভেতরে বসিয়ে নিয়েছি।
যা ওখান থেকে নিয়ে নে। আর কতোজন বাকি আছে।
আমরা কয়েকজন আছি।
কতোজন।
এখনও তিরিশজন হবে।
চিকনা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো।
ভানু আবার ঘুরে এলো। হাঁপাচ্ছে। আমি একটা ধোঁকার বড়া নীপার দিকে এগিয়ে দিলম।
আমি হাপ খাচ্ছি। ওটা তুমি খাও।
চিকনাকে একটু ভেঙে দিলাম। চিকনা ভানুর দিকে তাকাল।
তোর আবার কি হলো? চিকনা খেতে খেতে বললো।
শালা অনাদি আসছে, পুলিশকে সঙ্গে লিয়ে।
চিকনা আমার দিকে তাকাল।
হাসলাম।
তুই তোর কাজ কর। ওদিকে যাসনি। ধরে নিয়ে যাবে। চিকনা ভানুর দিকে তাকিয়ে বললো।
বললেই হলো। বাঁধে মীরচাচার দল হাজির হয়েইছে। একটু এদিক ওদিক হলি একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে।
চিকনা পকেট থেকে মোবাইলটা বার করলো।
আমি খেতে খেতেই হাসছি।
নীপা আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।
মালপত্র বার করে সব রেডি থাক। বাড়াবাড়ি করলে, ঝেড়ে দেব যা থাকে কপালে।
চিকনার দিকে তাকালাম।
ফোনটা অফ করে পকেটে রাখলো।
কেন ঝুট ঝামেলায় যাচ্ছিস। কিচ্ছু হবে না।
ভানু চলে গেল।
তুই কি যাবি নাকি?
চিকনার দিকে তাকালাম।
দাঁড়া ডাকতে আসুক। বাইরে রিসেপসনের লোকজন আছে।
বলতে বলতেই খিড়কি দরজার কাছ থেকে মিত্রার গলা পেলাম।
নীপা বুবুন কই রে—
পেছন ফিরে তাকালাম।
মিত্রা ত্রস্তপায়ে এগিয়ে আসছে। কাছে এলো। চোখেমুখে উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট।
কি হলো?
তোকে এ্যারেস্ট করতে এসেছে—
কে?
অনাদি তোর ওসি সুকান্ত আর এসপি। কতো পুলিশ সঙ্গে এনেছে।
মিত্রার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকালাম।
তুই হাসছিস!
কি করবো—কাঁদবো? তুই জানলি কি করে এ্যারেস্ট করতে এসেছে?
সুকান্ত অনিমেষদার হাতে ওয়ারেন্টটা দিয়েছে। অনিমেষদা পড়ে দেখেছে।
তাতে লেখা আছে অনি ব্যানার্জীকে এ্যারেস্ট করতে এসেছে।
অনি ব্যানার্জী না অনিন্দ ব্যানার্জী।
ভালো। এখন কি করতে হবে, যেতে হবে?
মিত্রা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
আমার কি হবে—
মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
অনেক বয়স হয়েছে। বোকা বোকা ভাব করবি না।
দেখলাম খিড়কি দরজা দিয়ে বড়োমা, ছোটোমা, দামিনীমাসি, জ্যেঠিমনি শুকনো মুখে এগিয়ে আসছে।
আমি আবার হাসলাম।
মিত্রা চোখ মুছছে।
ইসি, তনু কাছে এলো।
অনাদি কি অকথ্য ভাষায় কথা বলে যাচ্ছে। মিত্রা বললো।
ইসির দিকে তাকালাম।
কেউ কিছু বলছে না? আমি বললাম।
না। অনিমেষদাকে পর্যন্ত পাত্তা দিচ্ছে না। তনু বললো।
সময় হলে দেবে। চলো। পুরনো বন্ধুর সঙ্গে একটু হিসাব করি।
চিকনাকে আশেপাশে কোথাও দেখতে পেলাম না। পিলপিল করে অনেক মানুষের ভিড় দেখলাম চারপাশে। ভেতর বারান্দা দিয়ে বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম।
কাঞ্চন এসে জড়িয়ে ধরে অঝোড়ে কেঁদে উঠলো। ওর মাথায় হাত রাখলাম।
কিচ্ছু হবে না।
দেখলাম অনাদি চারপাশে পুলিশ নিয়ে খামারে দাঁড়িয়ে। ক্ষমতার দর্প ওর চোখে মুখে। এখান থেকেই ওর চোখে চোখ রাখলাম। অনিমেষদা, প্রবীরদা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। হিমাংশু, অনুপকে দেখতে পেলাম না। দাদা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা চেয়ারে বসে আমাকে লক্ষ্য করছে। চোখাচুখি হতে অনাদি চোখ নামিয়ে নিল।
আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম।
কাছে গিয় হাসি মুখে হাতজোড় করলাম।
এতো দেরি হলো আপনাদের আসতে?
দিলীপবাবু, সুকান্ত আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
কি স্যার অনিন্দ ব্যানার্জীকে চিনতে পারছেন না?
অনাদির দিকে তাকালাম।
ভেতরে আয়। সব কথা এখানে দাঁড়িয়ে হয় নাকি। কাজের বাড়িতে এসেছিস। ভাত না খাস একটু মিষ্টি খা।
তোর নামে ওয়ারেন্ট আছে।
অনাদির চোখে চোখ রাখলাম। হাসিমুখটা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে গেল।
আমার নামে!
হ্যাঁ। তুই এখানে মুসলমান পাড়াকে খেপিয়ে রায়েট বাধাবার চেষ্টা করছিস। তোকে অনেকবার বারন করেছিলাম। শুনলি না আমার কথা।
নিজেকে চেক করে নিলাম। খুব ঠাণ্ডা গলায় বললাম।
এ খবর তোকে কে দিল?
এসবির রিপোর্ট তাই বলছে।
খুব ভালো। নিশ্চই ওয়ারেন্ট সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস।
এসপি সাহেব ওকে ওয়ারেন্টটা হাতে দিন।
দিলীপবাবু একটা কাগজ আমার হাতে দিল।
আমি এলিগেশনগুলো দেখে নিলাম। মুখটা আরও কঠিন হয়ে গেল।
দিলীপবাবুর মুখের দিকে তাকালাম।
এখুনি যাব না দুটো ভাত মুখে দিয়ে আপনাদের সঙ্গে যাব।
অনিমেষদা, প্রবীরদা আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
এ কি বলছেন আপনি! দিলীপবাবু বললেন।
তাড়া থাকলে নাও খাওয়া যেতে পারে। আমার কোনও অসুবিধা নেই।
না না আমরা অপেক্ষা করছি।
আপনারা একটু মিষ্টি জল মুখে দিন।
না অনিন্দবাবু।
দিলীপবাবুর চোখে চোখ রাখলাম। চোখের ভাষা অন্য কথা বলছে।
অনাদির দিকে তাকালাম, তুই—
তোর এখানে খেতে আসিনি।
আমার ফোনটা বেজে উঠলো। পকেটে হাত দিলাম।
রিসিভ করবি না। অনাদি চেঁচিয়ে উঠলো।
এই ক্ষমতাটা তোর নেই। আমার ফোন বাজছে, রিসিভ আমি করবো। আর তুই যদি জোড় করে আটকাতে চাস, তাহলে আমার থেকে তোর ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হবে। খুব বেশি হলে তুই শুনতে পারিস, কার সঙ্গে কথা বলছি কি কথা বলছি।
অনাদির চোখে আগুন।
দিলীপবাবু আপনার মতামত—
আপনি রিসিভ করুণ।
অনাদি কট কট করে দিলীপবাবুর দিকে তাকাল।
ভয়েজ অন করলাম সাউণ্ডটা বাড়িয়ে দিলাম।
বল অর্ক।
তোমার মন্ত্রীবন্ধু আনাদি, হারামীগুলোকে নিয়ে তোমাকে এ্যারেস্ট করতে গেছে?
তুই জানলি কি করে!
সত্যি এরকম ছাগল মন্ত্রী আমার এতদিনের সাংবাদিকতার জীবনে এই প্রথম দেখছি। তুমি কি করলে না করলে জানার দরকার নেই, আমি সায়ন্তন নিউজ চ্যানেলগুলোকে ডেকে পাঠিয়েছি।
কেন শুধু শুধু ঝামেলা করছিস—
মেয়েছেলে নিয়ে ফুর্তির ক্লিপিংসগুলো আর এক ঘণ্টা পরে সব চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ, এক্সক্লুসিভ নিউজ হিসাবে দেখতে পাবে বাংলা তথা সারা ভারতবর্ষ, তারপর দেখব অনাদির কটা বাবা আছে, ওর মন্ত্রীত্ব টেঁকায়।
ঘাউড়ামি করিস না। ও আমার বন্ধু। ওর সম্মান নষ্ট মানে আমারও সম্মান নষ্ট।
রাখো তোমার বন্ধু। তোমাকে কোনওদিন খিস্তি করিনি তাই তোমার বন্ধুকে খিস্তি দিলাম না, দিলে ওর মাগ-ভাতার সব শ্মশান থেকে উঠে আসবে।
তুই তো সব বলে গেলি, বাকি কি রাখলি, আমাকে কিছু বলতে দে—
তোমার ওই গান্ধীগিরি সহ্য হবে না। ওই এসপিটা গেছে?
হ্যাঁ।
ওর বউ যে বিউটি পার্লার করেছে তার পেছনে কি হয় তার ভিডিও করেছি। আমি নিজেই ক্লায়েন্ট সেজেছিলাম। আজকের এপিসোড অনাদি, কালকের এপিসোড এসপির বৌ।
দিলীপবাবু চমকে আমার দিকে তাকাল। অনাদির মুখ চোখ মুহূর্তে বদলে গেছে।
অর্ক তোরা আমাকে ভালোবাসিস। তোরা আমার ছোটো-ভাই।
তোমার ঘুঁটিবাজি রাখো। তোমার ক্ষমতা থাকে আটকাও। আঠারো বছর হয়ে গেল পেছনে কড়া পরে গেছে, শীতকালে ফেটে যায়, লোসান লাগাতে হয়। আর কিছু শুনতে চাও।
অনিমেষদা, প্রবীরদা আমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল।
প্লিজ ভাই আমার, আমাকে দাদা বলিশ, তুই দশ মিনিট পর ফোন কর। দাদা হিসাবে আমার শেষ রিকোয়েস্ট টুকু রাখ।
আমি পারবো না।
প্লিজ।
ম্যাডামকে দাও।
ম্যাডামের নম্বরে ফোন করে নে।
লাইনটা কেটে গেল।
অনাদির দিকে তাকালাম।
সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, আপনারা একটু অপেক্ষা করুণ খেয়ে বেরচ্ছি।
তোর সঙ্গে আমার পার্সোনাল কথা আছে। অনাদি বললো।
থানায় যাচ্ছি তো, ওখানে বসেই কথা হবে।
সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। চাপা টেনশন চারদিকে। মীরচাচাকে দেখলাম মানির ঢিপিতে দাঁড়িয়ে। ঠাণ্ডা মুখে চারিদিকে লক্ষ্য রাখছে।
বী স্টেডি একফোনে এতটা ঘবড়ে গেলে চলে, তুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে কথা। তোর হাতে কতো পাওয়ার। একবার ভেরিফাই করে নে না। অর্ক মিথ্যে কথাও বলতে পারে। তারপর ওকে কাগজের অফিস থেকে এ্যারেস্ট করে নে।
অনাদি আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
তবে কি জানিস, সবাই বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে। তুই আমার হাত থেকে বাঁচার জন্য লড়ছিস, অর্ক আবার তার বসকে বাঁচাবার জন্য লড়ে যাচ্ছে।
আমি কথা বলে চলেছি অনাদি আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে।
আমার সঙ্গে একসঙ্গে খাবি, না এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবি।
আমি তোর সঙ্গে খাব।
দিলীপবাবু মাথা নীচু করে হেসে ফেললো। সুকান্ত মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ভক্তিবাবু, লতিফ সাহেব এলেন না?
অনিমেষদা, প্রবীরদা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ওনারা ওখানে আছেন।
সুকান্তর দিকে তাকালাম, আপনি একবার ওনাদের আনার ব্যবস্থা করুণ।
সুকান্ত আবার দিলীপবাবুর দিকে তাকাল। দিলীপবাবু ইশারা করলেন। আনার ব্যবস্থা করতে।
চারিদিকে একটা চাপা গুঞ্জন।
এই অনাদি গ্রামে যখন ঢুকেছিস, আমাদের ব্যাপারটা সমাধান করে যাবি।
বাজখাঁই গলায় মীরচাচা মানির ঢিপি থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
সকলে হই হই করে উঠলো। হঠাৎ গর্জনে সকলে চমকে উঠলো। পুলিশগুলো যে যার পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
আমি দিলীপবাবুর দিকে তাকালাম।
ওনাদের রিল্যাক্স করতে বলুন। কিচ্ছু হবে না। আমি আমার গ্রামের মানুষকে চিনি।
অনাদির দিকে তাকালাম।
তুই একটা বারুদের স্তূপের ওপর বশে আছিস। হঠাৎ তোকে এই বুদ্ধিটা কে দিল?
অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে, চোখের পলক পরছে না।
পুলিশ নিয়ে তুই কতদিন বাঁচবি—
আর এত মানুষকে সামলাবার মতো তোর পুলিশ আছে। অঘটন যদি কিছু ঘটে সামলাতে পারবি?
অনাদি মাথা নীচু করলো।
এরপর তোকে এরা পিটিয়ে মেরে দেবে। তখন কে বাঁচাবে?
সবাইকে নিয়ে তোর সঙ্গে কথা বলা যাবে না। তোর সঙ্গে আমি ব্যক্তিগত ভাবে কথা বলতে চাই।
তোর আর দুই মন্ত্রী—
তারাও থাকবে না—
চিকনা, বাসু আমাদের বন্ধু। আমরা একসঙ্গে পড়াশুন করেছি—
ওরাও থাকবে না—
আমি অনাদির চোখে চোখ রাখলাম।
ঠিক আছে—
কোথায় বসবি? তোর বাড়িতে না আমার ঘরে?
তোর ঘরে—
মাঠের রাস্তায় মটোর বাইকের শব্দ পেয়ে তাকালাম।
অনুপ, হিমাংশু, ইসলামভাই, ইকবালভাই, সুবীররা এসে হাজির হলো। সবার চোখে মুখে উত্তেজনা ছড়িয়ে পরেছে।
অনুপ ইসলামভাইয়ের পেছন থেকে নেমেই বললো, দেখি কি ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছে।
আমি অনুপের দিকে তাকালাম।
তাকিয়ে আছিস কেন, দেখা—
তারাহুড়ো করছিস কেন—
রাঘবনকে ফোন করেছিলি?
নামটা শুনেই দিলীপবাবু, সুকান্ত, অনাদি তিনজনেই অনুপের দিকে তাকাল।
হাসলাম।
হাসছিস যে!
এতো ছোটো ব্যাপার নিয়ে কেন ফোন করবি?
এদের এতো বড়ো সাহাস, সুপ্রীম কোর্টের অর্ডারটা এরা পড়েনি।
অন্য কারণেও তো ওয়ারেন্ট বেরতে পারে—
সেটাই তো দেখতে চাইছি।
অনাদি আমার পাশে দাঁড়িয়ে অনুপকে দেখছে।
ঠিক আছে ভেতরে চল। আমাকে এ্যারেস্ট করলে, তুই তোর কাজ করবি।
মিটে গেছে—
মেটে নি, মিটে যাবে—
হিমাংশু হেসে ফেললো।
অনুপ আমার দিকে তাকিয়ে হিমাংশুর দিকে তাকাল।
অনুপ তুমি আমার থেকে ওকে আগে দেখেছো। হিমাংশু বললো।
তা দেখেছি। তবে কি জানো হিমাংশু। এতো বছরেও ঠিক বুঝে উঠতে পারি নি।
দিলীপবাবু চলুন তাহলে। আমি বললাম।
না স্যার, আপনি যান। আমরা বাইরে আছি।
ইসলামভাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
এসো।
আমি এগিয়ে এলাম। ওরা আমার পাশাপাশি হেঁটে বারান্দায় এলো।
উনামাস্টার চেয়ারে বসে ঝিমিয়ে আছে।
কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, স্যার অনাদি এসেছে।
তাই নাকি, শুনলাম ওর নাকি অনেক বড়ো ল্যাজ গজিয়েছে।
স্যার একবার অনাদির দিকে ভাষা ভাষা চোখে তাকাল। অনাদি প্রণাম করলো।
থাক থাক, মন্ত্রী হওয়ার পর মনে হয় প্রথম প্রণাম করলি।
অনাদি চুপ করে আছে।
নতুন বৌমাকে নিয়ে এসেছিস?
অনাদি মাথা নীচু করে নিল।
বুঝেছি অধঃপাতের শেষ রাস্তায় চলে গেছিস। এখন ছোটো নোস যে বেত মারবো। তবে তুই আমার ছাত্র। তাই একটা উপদেশ দিতে পারি। তোদের আগেও বলেছি, এখনও বলছি। অনি গ্রামের সেরা ছাত্র। পারলে ওর উপদেশ নে, যদি বাঁচতে চাস।
স্যার আমি অনেক অন্যায় করেছি।
মানুষ অন্যায় করে, আবার শুধরে নেয়। অনি কি অন্যায় করে নি? করেছে—
স্যার একবার অনাদির মুখের দিকে তাকাল।
অনি নিজের জন্য কিছু করে নি, তোদের জন্য করেছে। তোরা যাতে ভালো থাকিস। কই অনিকে আমি কিছু বলি নি। তোদের জন্মাতে দেখেছি। তোর বাপ এসে আমার পায়ে ধরে কেঁদেছে। কিছু বলতে পারি নি।
স্যার থামলো। সবাই স্যারের কথা শুনছে। চারিদিক নিস্তব্ধ।
আমাদের গ্রামে আগে কখনও পুলিশ ঢুকতে দেখি নি। তোদের বয়সটা আমাদেরও ছিল। এখন ঘনঘন পুলিশ ঢোকে। কেন? তুই নাকি পুলিশমন্ত্রী?
হঠাৎ স্যার কেমন দপ করে জ্বলে উঠলেন। খ্যারখেরে গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন। সেই স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের মতো।
যা দূর হয়ে যা আমার চোখের সামনে থেকে। তোর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ঘেন্না করে তোকে আমার ছাত্র বলে পরিচয় দিতে। সাপের পাঁচ পা দেখেছ।
ঘসা কাঁচের ভেতর দিয়ে পরিষ্কার লক্ষ্য করলাম স্যারের চোখ ছল ছল করছে।
উপস্থিত সকলের চোখমুখ কেমন থমথমে।
অনি।
হ্যাঁ স্যার।
বাবা একটু ধরতো। মনার খাটে গিয়ে একটু শুই।
আমি স্যারের কাঁপা কাঁপা হতটা ধরলাম। স্যার লাঠিতে ভর করে উঠে দাঁড়ালেন।
বুঝলেন ডাক্তারবাবু, হাঁটু দুটোয় আর আগের মতো জোর পাই না।
স্যারকে ধরে আমি কাকার ঘরে এলাম। নীপা খাটটা ঠিক করে দিল। আমি স্যারকে ধরে কাকার খাটে শুইয়ে দিলাম।
তুই খেয়েছিস?
এবার খাব।
যা খেয়ে নে, অনেক বেলা হয়ে গেল।
ঘরে গিজ গিজ করছে লোক। বড়োমা, মিত্রাদের ধারে কাছে দেখতে পেলাম না।
স্যারকে শুইয়ে আমি ভেতর বারান্দায় এলাম।
ওখানে খাওয়া দাওয়া চলছে।
কাঞ্চন, বাসুর বৌকে দেখলাম। আর যারা পরিবেশন করছে চিনতে পারলাম না। যারা খাচ্ছে তারা প্রত্যেকেই গ্রামের পরিচিতদের কারুর না কারুর বৌ।
কাঞ্চন, বড়োমা কোথায়?
নতুন বাড়িতে। তুমি ওখানে যাও। ওখানে খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে চিকনাদা।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। নীপা পথ আটকে দাঁড়াল। চোখ দুটোয় না বলা অনেক কথা ভেসে আছে। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
কি হলো!
চোখ নামিয়ে নিলো। জল গড়িয়ে পরলো। ওর দুই কাঁধে হাত রাখলাম।
কেঁদ না।
মশাই থাকলে তার ভাইপোর কীর্তি দেখে খুশি হতো।
মশাই নেই, তোমরা আছো। তোমাকে একদিন ওই ঘরে একাকী বলেছিলাম একবিন্দু মাটি বিনা যুদ্ধে ছেড়ে দেবে না। অন্যায়কে কোনওদিন প্রশ্রয় দেবে না। চোখ মোছো।
নীপা চোখ মুছলো।
বড়োমারা খেয়েছে?
বসতে চাইছিল না, জোড় করে ওই বাড়িতে বসিয়েছি।
কাকীমা, সুরোমাসি?
সবাইকে এক সঙ্গে বসিয়েছি।
অনাদি কোথায়?
বাইরে কাদের সঙ্গে কথা বলছে।
চেনো না।
সেদিন রাতে যারা অনাদিদার সঙ্গে গেছিল। তারা এসেছে।
বুঝলাম ভক্তিবাবু, লতিফসাহেব এসেছেন।
সুবীর কোথায়?
সব শুনে মন খারাপ হয়ে গেছে।
পাগল কোথাকার।
যারা এসেছেন তাদের একটু খাওয়ার ব্যবস্থা করো।
বাসুদা ব্যবস্থা করছে।
আমি ভেতরের ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
বারান্দার বেঞ্চে অনাদি, অনিমেষদার সঙ্গে কথা বলছে। অনুপ, হিমাংশুও আছে। ভক্তিবাবু, লতিফসাহেব একটা চেয়ার দখল করে বসে আছেন। ইসলামভাইদের ধারেকাছে দেখতে পেলাম না। অনিমেষদাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লাম। অর্থটা এরকম তোমরা একটু বসো আমি ও বাড়ি থেকে আসি।
বাইরে আসতেই আবার ধাক্কা। মীরচাচা, ইকবালভাই দাঁড়িয়ে হেসে হেসে কথা বলছে।
আমাকে দেখে কাছে এগিয়ে এসে ইকবালভাই জড়িয়ে ধরলো।
তোর টিমটা এতো ভালো, কি বলবো।
কেন! তোমারটা খারাপ নাকি?
যে নেপলা, সাগির, অবতার আগে একটা কথা শুনলে রাগে গড়গড় করতো এখন কিছু বললেই খিল খিল করে হাসে।
হাসলাম।
আমি জিজ্ঞাসা করতে বললো, তুমি খেলা দেখে যাও ইকবালভাই। এই গাছের শেকড় যে কতদূর পর্যন্ত আছে তুমি জানো না। খুঁজলেও পাবে না। এই আঠারো বছরে কতো ধমকানি, চমকানি দেখলাম। বেলুনে পিন পরলে সব ফুস হয়ে যাবে।
তাহলে বলো তিনজনকে অন্ততঃ জীবনে তৈরি করতে পেরেছি।
স্বীকার না করে উপায় কি।
ওদের মধ্যে কোয়ালিটি ছিল বুঝলে ইকবালভাই, শুধু গাইডেন্সের অভাব ছিল।
ইকবালভাই আমার দিকে তাকিয়ে!
আমি শুধু ওই টুকু করেছি।
তবে তনুর কাছে আমি ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ। ও আমাকে যথেষ্ট মেন্টাল সাপোর্ট দিয়েছে। তার ওপর তোমাদের দরাজ হাতের সাহায্য।
আমরা আর কি করলাম। বরং নিয়েছি, দিইনি কিছু।
একথা বলো না ইকবালভাই। খেয়েছো—
খেয়েদেয়েই তো অনুপদের নিয়ে ব্যাঙ্কে গেছিলাম। তারপর শুনলাম এই অবস্থা।
যাই, বড়োমা, ছোটোমাকে একটু দেখে আসি।
খেতে বসেছে।
তুমি মীরচাচাকে একটু বোঝাও।
বলেছি।
মীরচাচা হাসছে।
আমি নতুন বাড়িতে এলাম। কাল থেকে এ বাড়িতে আসা হয় নি। দূর থেকে দেখেছি।
দোতলায় আসতেই দেখলাম টানা বারান্দায় সকলে খেতে বসেছে। আমি সোজা গিয়ে বড়োমার সামনে বাবু হয়ে বসে পরলাম।
দাও।
হাঁ করলাম।
বড়োমা মাথাটা ধরে নীচু করে একগাল আমার মুখে পুরে দিল।
মিত্রা টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছে। আর হাসছে।
মরকটটা আছে না গেছে—বড়োমা মুখচোখ বেঁকাল।
আছে, একসঙ্গে খেতে বসবো।
একবারে বসবি না। তখন কি ট্যারা ট্যারা কথা। অর্ক ফোন করলো বলে।
তুমি কি ভাবো অর্ক এমনি এমনি সব জেনে গেল। মিত্রা বললো।
ও কখন জানাল?
ও জানাবে কেন, লোকের অভাব।
আমি ছোটোমার পাতে চলে গেলাম। একটু খেলাম, তারপর বৌদির পাতে, জ্যেঠিমনির পাতে, দামিনীমাসির পাতে খেলাম। ভানু পরিবেশন করছে।
ভানু চিকনা কোথায়?
সে পাশে টেবিল চেয়ার পাততিছে, মন্ত্রী খাবে।
আমি হাঁ করে ভানুর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
হ্যাঁ-রে তুই সেউঠি উঁকি মেরে দেখ।
কারা কারা বসবে।
তোরা চারজন, তিনমন্ত্রী আর তুই। চিকনা বলেছে নিজে পরিবেশন করবে।
আমি ভানুর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
ওমনি ছক কষা শুরু করলি। মিত্রা বলে উঠলো।
তনু হাসছে।
তুমি একবার ওর চোখটা দেখো বড়োমা।
হ্যাঁরে কেমন কুত কুতে হয়ে গেল। ইসি বললো।
ধ্যুস।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। তোমরা খাও।
আর একবার নিয়ে যা। বড়োমা বললো।
মুখ বাড়িয়ে দিলাম।
মেয়ে কোথায়? খেতে খেতে মিত্রার দিকে তাকালাম।
বাবার কীর্তি দেখছে। এতদিন গল্প শুনেছে এখন বাস্তবে দেখছে।
আমি সিঁড়ি দিয়ে নামছি, চিকনা ওপরে উঠছে। থমকে দাঁড়াল।
মন্ত্রীদের ডাক, আমারা শালা চাকর-বাকর মানুষ।
হাসলাম।
দুজনে নিচে নেমে এলাম।
খাওয়া দাওয়ার পর খুব জোড় আড্ডা বসেছে নতুন বাড়িতে।
মিত্রার ফোনটা বেজে উঠলো। পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিল।
কে গো মিত্রাদি? তনু তাকাল।
অর্ক।
আবার!
হয়তো ওকে ফোনে পাচ্ছে না।
আমরা শুনবো। বড়োমা বললো।
হ্যাঁ বলো।
অনিদা কোথায় ম্যাডাম—
এই তো এখুনি খেতে গেল—
দাদা এখনো খায়নি!
খাবে কি করে।
এখন কি পজিশন।
ঠিক আছে তো দেখছি।
আমার লোককে এখুনি একটা অন্য কাজে পাঠিয়েছি। সেরকম কিছু হলে আপনি একটা মিস কল মারবেন।
আচ্ছা।
আপনার হাতের কাছে রতনদা কিংবা আবিদদা আছে?
হাতের কাছে নেই, ডাকতে হবে।
ওরাও কি দাদার মতো হয়ে গেছে, ফোন অফ।
কি করে বলবো, তুমি তোমার দাদা জান। দাঁড়াও দাঁড়াও ইসলামভাই এসেছে।
ইসলামভাইকে দিয়ে হবে না।
দাদাভাই একবার রতন কিংবা আবিদকে ডাকো না। অর্ক ফোন করেছে।
ইসলামভাই বারান্দা থেকেই নিচের দিকে তাকিয়ে ডাকলো। কাছে এগিয়ে এলো। মিত্রা ফোনটা ইসলামভাইয়ের হাতে দিয়ে দিল।
বল অর্ক। খবর কি?
সব ঠিক আছে।
ইসলামভাই হেসে উঠলো।
হাসলে যে।
তুই তো তোর দাদার থেকে বড়ো দাদা।
দাদা হতে গেলে যা কোয়ালিটি দরকার, তার এক তিলার্ধ আমার নেই।
মালটা পেলি কি করে?
দাদার টিপ। কোথ থেকে যে পায় কে জানে। শুধু ফলো আপ করলাম। এগুলো কি আমার ঘটে থাকার কথা।
আচ্ছা তোকে ও কখন ফোন করে বলতো?
এই তো রাজার ঘরের বোড়ে এগিয়ে দিয়ে লোভ দেখাচ্ছ।
মিত্রা, তনু দুজনেই হেসে উঠলো।
মামনি অর্কর কথা শুনছিস। এতদিন ভিজে বেড়ালের মতো ঝিমিয়ে ছিল।
ম্যাডাম শুনছে নাকি?
হ্যাঁ, সবাই শুনছে।
জান ইসলামদা, না থাক পরে বলবো।
বলনা।
রতনদা কি এখনও আসে নি?
শোন তুই রতনের ফোনে ফোন কর। মনে হয় ফোন অন করেছে। অর্ক লাইনটা কেটে দিল। ইসলামভাই ফোনটা মিত্রার হাতে দিল।
চলবে —————————
from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/HGO3FIC
via BanglaChoti
Comments
Post a Comment