কাজলদিঘী (৯৬ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

৯৬ নং কিস্তি
—————————

বুবুন কোথায়? মিত্রা বললো।

খেয়েদেয়ে দুই বন্ধু মিটিং-এ বসেছে।

কিছু খবর পেলে?

না। ঘর বন্ধ।

এসপি, ওসি?

বাইরে বসে অনিমেষদার সঙ্গে কথা বলছে।

কি বুঝছো।

একেবারে কুল। নো টেনশন।

ব্যাপারটা কি বলো?

আমার মাথায় ঠিক ঢুকছে না মামনি।

কেন!

ও যে কোথায় কোনটা খেলে রেখেছে। বোঝা মুস্কিল।

ইকবালভাই?

মীরের সঙ্গে কথা বলছে।

ম্যাডাম নিচে চলো খামারে বসে সব আড্ডা মারি। কনিষ্ক ঢুকলো।

দাঁড়াও অবতার সবে বলতে শুরু করেছিল।

কি?

বুবুনের কথা।

কিরে ব্যাটা পার্মিশন নিয়েছিস, নাহলে….? কনিষ্ক, অবতারের দিকে তাকাল।

অনিদা কিছু বলবে না। বললে নেপলাকে সামনে ঠেলে দেব, অনিদা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

কেন?

নেপলা অনিদার সঙ্গে ভালো যুদ্ধ করে, আমরা পারি না।

কনিষ্ক হেসে উঠলো।

ওটা কোথায়?

একটু ভালো করে দেখ, ও ঠিক অনিদার কাছা কাছি আছে। ওকে হাটানো খুব মুস্কিল। অপরিচিত লোক অনিদাকে ছুঁতে চাইলে আগে নেপলাকে ছুঁয়ে যেতে হবে।

একটু আগে যেটা ঘটলো।

ওটা নেপলার কাছে পুরনো, তাই ধারেকাছে ছিল না। বারান্দা থেকে অনিদা যখন খামারের দিকে যাচ্ছিল তখনই চোখ মেরে বললো, ফেটে যা না হলে ঝাড় খাবি। আমি, সাগির ফেটে বাঁশবাগানে চলে গেলাম।

কনিষ্ক হেসেই চলেছে।

হ্যাঁগো কনিষ্কদা, নেপলা অনিদার খুঁটিনাটি খুব ভালো বোঝে।

তোরা?

বুঝিনা বললে ভুল হবে, তবে নেপলা আমাদের আগে ধরে ফেলে।

ওখানে তোমরা কি করতে? মিত্রা বললো।

এখান থেকে দুবাইতে গিয়ে প্রথম এক বছর খেয়েছি, ঘুরেছি আর পড়াশুনো করেছি।

পড়াশুন! কনিষ্ক হেসে উঠলো।

কনিষ্কদা তুমি হাসবে না। অনিদা বইখাতা কিনে দিয়েছিল। প্রথম কয়েকদিন অনিদা নিজে সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছিল। তারপর আমাদের ছেড়ে দিল। এলাকা দেখা, আলাপ পরিচয় করা।

পড়াশুনো করতিস কখন?

সারাদিন কোনও কাজ ছিল না। সব সময়ই পড়াশুনো করতাম।

মিত্রা, তনু, ইসি, মিলিরা হেসেই চলেছে।

রাতে অনিদা ফিরতো, টাস্ক দেখতো, তবে কলকাতার সঙ্গে রেগুলার যোগাযোগ ছিল।

অনি কোথায় যেত?

সে প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারবো না।

কেন?

জিজ্ঞাসা করার সাহস আছে।

কনিষ্ক হাসছে।

তবে কলকাতা থেকে টাকা যেত।

কে পাঠাত?

বলতে পারবো না। মাস ছয়েকের মাথায় নেপলা প্রথম একটা কাজ পায়। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্সে, তারপর আমরা পাই। তখনই অনিদার মাথায় এই খেলাটা ঢোকে।

অবতার। নিচ থেকে আবিদ চেঁচিয়ে ডাকল।

নিশ্চই কলকাতার খবর আছে। অবতার উঠে দাঁড়াল।

সবাই নিচে নেমে এলো।

মিত্রারা যে যার খামারে চলে গেল।

দরজায় কেউ নক করতে আমি খাট থেকে উঠে গেলাম। দরজাটা খুললাম। সামনে নেপলা দাঁড়িয়ে।

কি হয়েছে?

রতনদা একবার কথা বলতে চায়।

ডাক।

তোমার কথা বলা শেষ?

কেন।

চিকনাদা একবার আসতে চাইছে।

ডাক। একটু চায়ের কথা বল।

এই তো সবে মাত্র ভাত খেলে।

অনেকক্ষণ হয়ে গেছে।

নেপলা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। ভেতরে এসে খাটে বসলাম।

চিকনা কিছু জানে? অনাদির দিকে তাকালাম।

না।

কেন জানাস নি?

তখন সেই পজিসন ছিল না।

একদিনে সব হয় নি?

মানছি।

রাজনীতি করছিস আগাম আঁচ করতে পারিস নি কেন?

তুই থাকলে হয়তো একটা সাপোর্ট পেতাম।

সেই জায়গাটা তুই নিজেই তাহলে আগে নষ্ট করে বসেছিলি?

আমাকে সবাই ভুল বুঝেছিল।

তালি এক হাতে বাজে না।

রতন ঘরে ঢুকলো, পেছন পেছন আবিদ, চিকনা। বুঝলাম ওরা নিচেই অপেক্ষা করছিল। তিনজনেই আমার পাশে এসে বসলো। নেপলা গেট থেকে উঁকি মেরে দেখলো।

তুই ওখানে দাঁড়া। চা এলে নিয়ে ঢুকবি।

নেপলা দরজাটা ভেজিয়ে দিল।

অনাদি তাকিয়ে আছে।

বল রতন।

এখানে বললে কোনও অসুবিধে নেই?

না। চিকনা একটা সিগারেট দে।

চিকনা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে আমাকে দিল। নিজে একটা নিয়ে পকেটে প্যাকেটটা ঢুকিয়ে দিল।

অনাদিকে দে।

মন্ত্রীরা এই সিগারেট খায় না।

অনাদি, চিকনার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

খাবি। চিকনা অনাদিকে বললো।

দিয়ে দেখ, খাই কিনা।

আবিদ হাসছে।

চিকনা আবার পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে অনাদিকে একটা দিল।

নেপলা চা নিয়ে ঢুকলো।

চিকনা।

বল।

চা খেয়ে দুটো বাইকের ব্যবস্থা কর। আমি অনাদি একটায় তুই নেপলা একটায়। একটু বেরবো।

চিকনা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।

রতন, আবিদও একটু অবাক।

নেপলা সবাইকে চায়ের কাপ দিল।

রতন বল কি হয়েছে?

আনোয়ারের ছেলেরা চাঁদের কাছে গেছিল।

কি বলছে।

আবার টাকা চেয়েছে।

চাঁদ দেয় নি?

তোমার কথা মতো দিয়েছে।

অনাদির দিকে তাকালাম।

চায়ের কাপটা সেন্টার টেবিলে নামিয়ে রাখলো।

কতো টাকা নিয়েছে রতন। অনাদি বললো।

পনেরো।

অনাদি পকেট থেকে ফোনটা বার করে রিং করলো।

নিস্তব্ধ ঘর।

চাঁদের কাছ থেকে কতো টাকা নিয়েছিস….ঠিক আছে যা নিয়েছিস তার ডবল ফেরত দিয়ে আয়….যা বললাম তাই করবি। ফোনটা কেটে দিয়ে পকেটে রাখলো।

আর কি সমস্যা হয়েছে রতন। অনাদি তাকাল রতনের দিকে।

তোমার লোকজন ফার্ম থেকে মাল বার করতে ডিস্টার্ব করছে। দেবাদা, নির্মাল্যদা এখুনি ফোন করেছিল।

অনাদি আবার ফোন ধরে রিং করলো।

ফার্মে কে ডিস্টার্ব করছে….আজ থেকে ওখানে আমাদের কোনও লোক কোনও ডিস্টার্ব যেন না করে। আমার কথা না শুনে যদি ডিস্টার্ব করে, তার জন্য যা এ্যাকসান নেওয়ার কর্তপক্ষ নেবে, আমি তাতে কোনও বাধা দেব না। এবার তোমরা যা ভালো বোঝ করবে।….না না আমি যা বলার তা বলে দিয়েছি। আর কিছু বলবো না। মালগুলো শুষ্ঠভাবে যেন যায় তার ব্যবস্থা করে দাও।

রতন, আবিদ এক দৃষ্টে অনাদির দিকে তাকিয়ে আছে। চিকনা একবার আমাকে দেখে, আর একবার অনাদির দিকে তাকায়।

আর কিছু আছে রতন?

না।

উঠে দাঁড়ালাম। অনাদির দিকে তাকালাম।

তুই এই পরে বাইক চালাতে পারবি।

পারবো।

না হলে আমার একটা পাজামা, পাঞ্জাবী পরতে পারিস।

অনাদি চুপ করে রইলো।

আমারটা পরতে ইচ্ছে না করলে কাঞ্চনকে বলছি বাড়ি থেকে নিয়ে আসুক।

তাই বল।

সেগো, চুলকুনি এখনও যায় নি। চিকনা বলে উঠলো।

হেসে ফেললাম।

অনাদিও মাথা নীচু করে হাসছে।

রতন, আবিদ মুচকি হেসে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল।

আমি নিচে নেমে এলাম। এ বাড়ির বারান্দায় তখন তুমুল আড্ডা চলছে। দিলীপবাবু বারান্দায় কিন্তু সুকান্তকে দেখলাম খামারে বসে আছে।

আমাকে দেখে ছোটোমা বেঞ্চি থেকে উঠে এলো। বড়োমা, বৌদি, জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি তাকিয়ে আছে। অনিমেষদা, দিলীপবাবুর চোখ স্থির। বুঝলাম মুখটা পড়ার চেষ্টা করছে।

আমার পেছন পেছন অনাদি আর চিকনা হাসতে হাসতে ঢুকলো।

ছোটোমার গলাটাকে জড়িয়ে ধরেই কাছে এলাম। বড়োমার মুখের দিকে তাকালাম। ভাষা ভাষা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে।

ছোটোমাকে ছেড়ে বড়োমার মুখটা পদ্মফুলের মতো তুলে ধরলাম।

আমি একটু বেরবো। ফিরতে রাত হবে।

আজ কোথাও যাওয়া হবে না।

আমার সঙ্গে নেপলা আর চিকনা থাকবে।

বড়োমা চুপ করে গেল।

চিকনা।

আমি কাঞ্চনকে বলে দিয়েছি। আনতে পাঠিয়েছে।

দিলীপবাবুকে আটকে রেখে লাভ আছে। অনাদির দিকে তাকালাম।

তুই বোস আমি কথা বলে নিচ্ছি। অনাদি বললো।

অনুপকে বলে দিচ্ছি। ও জামিনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। গ্যারেন্টার দরকার হলে মিত্রা সাইন করে দিচ্ছে। আর যদি কারুর দরকার হয়….।

তার দরকার হবে না।

দরকার আছে। যা বলছি শোন।

ঠিক আছে।

অনাদি ভক্তিবাবু, লতিফসাহেব আর দিলীপবাবুকে নিয়ে খামারের দিকে গেল।

নেপলা।

বলো।

অনুপদাকে ডেকে আন একটু বেরবো, তুই তৈরি হয়ে নে আমার সঙ্গে যাবি।

আমি বেঞ্চের একেবারে শেষ প্রান্তে অনিমেষদার নাকের ডগায় দামিনীমাসির পাশে বসলাম।

অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে। প্রবীরদা, অনুপদা হাসছে।

কাজ মিটলো।

না। আজ থেকে নতুন ভাবে শুরু করছি।

বৌদি হেসে ফেললো।

দেখ তোর বৌদির হাসিতে কতোটা টিজ করার ভঙ্গি।

ওটা তুমি বুঝতে পারবে, আমি পারবো না। আমার থেকে তুমি বৌদিকে আগে দেখেছো।

নীপা একটা প্লেটে কয়েকটা মিষ্টি আর জলের গ্লাস নিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল।

এটা আবার কিসের জন্য?

তখন তুমি ভাত খাও নি। সব ফেলে গেছ।

এটা আবার কে খবর দিল?

আমার মেয়ে।

সব একেবারে পাকা গিন্নী হয়ে গেছে। যাও নিয়ে যাও, পারলে একটু চা খাওয়াও।

নীপা প্লেটটা বড়োমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল।

তুমি কি কাল সকালে বেরচ্ছ। অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

হ্যাঁ।

পর্শুদিন বিকেলে আমি তোমাদের সঙ্গে একটু বসবো।

কোথায় বসবি বল?

তোমার বাড়িতে।

আমি কিন্তু পরটা আলুভাজা করতে পারবো না। সুরকে বলে দে, ও যদি পারে। বৌদি গনগন করে উঠলো।

আমি বানিয়ে নেব।

ডাক্তারদাদা আমার মুখের দিকে একবার তাকায় আবার চোখ সরিয়ে নেয়।

খামারে অনুপ, হিমাংশুকে দেখলাম সুকান্ত আর দিলীপবাবুর সঙ্গে কথা বলছে।

নেপলা এসে বারান্দার ঠিক নিচে বাইরেটায় দাঁড়াল। ইশারায় কাছে যেতে বললো।

আমি উঠে গেলাম।

আবিদদা, সাগির সঙ্গে যাবে বলছে।

নেপলার মাথাটা ধরে ঝাঁকিয়ে দিলাম।

সঞ্জুদা, বাসুদাও সঙ্গে যাবে।

আমি কি বিয়ে করতে যাচ্ছি, বরযাত্রী সঙ্গে নিবি।

নেপলা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে।

ঠিক আছে রেডি হতে বল।

নেপলা চলে গেল।

আমি আবার নিজের জায়গায় এসে বসলাম।

নিরঞ্জনদা।

বল।

কালকে বড়োমার সঙ্গে কলকাতা যাবে। কয়েকদিন ওখানে থাকতে হবে। সেইভাবে বাড়িতে ফোন করে দাও।

নিরঞ্জনদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

মিষ্টিটা খা।

বড়োমা আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো।

ওই ভাবে বললে ও খাবে না। তুমি আমার হাতে দাও।

ছোটোমা মিষ্টির প্লেটটা বড়োমার হাত থেকে নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।

একটা খাব।

দেখলাম গুটগুট করে মিলির মেয়ে, সুরোর ছেলে খামার থেকে এদিকে এগিয়ে আসছে। সঙ্গে আর একটা। ওদের সমবয়সী হবে। সাইজ এক।

ওই দেখো আমার বন্ধুরা আসছে।

ছোটোমা পেছন ফিরে তাকাল।

তিনটেই কাছে এসে দাঁড়াল।

আমি গালটিপে দিলাম।

তুমি এখন বেড়াতে যাবে?

মাথা দোলালাম, হ্যাঁ।

আমাদের নিয়ে যাবে?

অনেক দূরে যাব।

আম খাবে।

বৌদি জোড়ে হেসে উঠলো। আসল কথাটা বলে ফেলেছে। কাল থেকে এই দুটোকে আমে পেয়েছে। শুধু আম আর আম।

সুরোর ছেলে তাকিয়ে আছে।

এই নতুন বন্ধুকে চিনতে পারলাম না।

পুলিশ আঙ্কেলের সঙ্গে এসেছে। সুরোর ছেলে বললো।

কার গো?

সুকান্তর।

ছোটোমার দিকে তাকালাম।

ওর বৌ এসেছে।

হাসলাম। আবার ওদের দিকে তাকালাম।

মিষ্টি খাবি।

মাথা দোলালো।

আর কাউকে চিনুক আর না চিনুক তোকে ঠিক চিনেছে। অনিমেষদা বললো।

আমি ছোটোমার হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে ওদের সামনে নামালাম।

রসো! মিলির মেয়েটা লাফিয়ে হাততালি দিয়ে উঠলো।

উঃ পাকা বুড়ী একেবারে। ছোটোমা কচকচ করে উঠলো।

চামচেটা দিয়ে কেটে কেটে রস নিংরে তিনজনকে দিলাম। বেশ কুট কুট করে তিনজনে খেলো। খাওয়া শেষ হতে আমার গ্লাস থেকে জল খেলো। তারপর মিলির মেয়েটাকে ইসারায় আমার গালটা দেখিয়ে বললাম হামি দে।

আজ কিন্তু হামি দিয়ে মুখ মুছলো না। তিনজনেই গালে গাল ঠেকালো।

নীপা সবার জন্য চা নিয়ে এলো।

আমার হাতে খালি প্লেট।

ছোটোমা এগিয়ে গেলো।

কে খেলো, খালি ধমকানি না, কি মনে করো নিজেকে। নীপা কটকট করে উঠলো।

ও খেলো নাকি—ছোটোমা বললো।

আমি হাসছি।

তাহলে।

সাকরেদগুলোকে দেখছিস না সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

একটাও খায় নি!

একটা খেয়েছে।

নীপা মুখ টিপে হাসলো।

ছোটোমা পট থেকে চা ঢেলে ঢেলে সকলকে দিল।

ওরা তিনজন জুল জুল করে আমার দিকে তাকিয়ে।

ওটাও খাবি নাকি, যা ভাগ। ছোটোমা ওদের দিকে তাকিয়ে বললো।

আমার কাছ থেকে গুটি গুটি পায়ে তিনজনে বৌদির কাছে চলে গেল।

দেখলি ছোটো দেখ। ওখানে হবে না, তো এখানে চল। ঠিক পাবো।

দাদা চায়ে চুমুক দিয়ে বললো, আমার লেখাটা লিখেছিস, পর্শুদিনের পর আর নেই।

মরণ, বলার আর সময় পেলে না। বড়োমা হাঁকড়ে উঠলো।

সবাই হেসে উঠলো। হাসতে গিয়ে প্রবীরদার গায়ে গরম চা পড়ে গেল।

তুমিও দিদি আর বলার সময় পেলে না। রূপায়ণদা চেঁচিয়ে উঠলো।

খালি লেখা আর লেখা। পর্শু ছেলেটা এসেছে, সেই থেকে একটু বসার সময় পেয়েছে, নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছে। বড়োমা চিবিয়ে চিবিয়ে বললো।

দাদা, ডাক্তারদার দিকে তাকাল।

তুমিও মাঝে মাঝে স্থান-কাল-পাত্র ভুলে যাও। ডাক্তারদাদা বললো।

তা বলে আমার লেখাটা হবে না?

ও কি দেবেনা বলেছে। তুমিও নিজে লেখো। ওর জায়গায় তুমি যদি থাকতে চেষ্টা করলেও একলাইন লিখতে পারতে।

পারতাম না বলেই তো ও অনি আর আমি অমিতাভ।

দাদার চোখে মুখে অনাবিল সরলাতা মাখা। ডাক্তারদাদা হেসে ফেললো। ছোটোমা,  দামিনীমাসি, জ্যেঠিমনি মুখ টিপে হাসছে।

বড়োমার মুখের দিকে তাকালাম। মিত্রারা দেয় নি?

আমার কাছে আছে।

দাদা মুচকি মুচকি হাসছে।

মিত্রারা দেখলাম খামারের দিক থেকে হেঁটে এদিকে আসছে। সঙ্গে একজন নতুন অতিথি। গেইজ করলাম এইই হয়তো সুকান্তর স্ত্রী। দেখতে অনেকটা বিতানের বৌ টিয়ার মতো। মুখটা বেশ মিষ্টি।

ওরা কাছে এলো। পেছন পেছন ইকবালভাই, ইসলামভাই।

বেশ মিষ্টি, চা সাঁটাচ্ছিস।

মিত্রার দিকে তাকালাম।

প্লেটে একটু ঢেলে দে।

কেন পটে আছে ঢেলে নে। বড়োমা বললো।

মিত্রা হাসছে।

সে তো আমি জানি। তুমি তো জানো ভাগ না পেলে মন ভরে না।

বড়োমা মুখ ঘুরিয়ে নিল।

আমি সুকান্তর বৌয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। সত্যি মুখটা বেশ মিষ্টি।

প্লেটে একটু চা ঢেলে কাপটা মিত্রার দিকে এগিয়ে দিলাম।

এতটা খাব না।

নে নে অনেক ভাগ, শুধু কি তুই একা।

মিত্রা হাসতে হাসতে কাপটা নিল।

তুই কতো বুঝিস।

আমার দিকে তাকিয়ে বললো।

সুকান্তর বৌ। তিন্নী।

দূর থেকে দেখে সেটাই বড়োমাকে বলছিলাম।

তিন্নী নীচু হয়ে পায়ে হাত দিতে গেল।

হাত ধরে ফেললাম।

থাক থাক।

সুমন্তর মাসির মেয়ে। মিত্রা বললো।

হাসলাম।

হসলি যে?

এলাকার জিনিষ কেউ এলাকার বাইরে যেতে দেবে না।

ইসি, তনু শব্দ করে হেসে উঠলো। তিন্নীও হাসছে।

উত্তরটা তিন্নীর খুব মনে ধরেছে বুঝলি মিত্রা।

তুই কি?

বৌদি বললো।

আমি উড়ে গিয়ে জুড়ে বসেছি। রাজ্য, রাজকন্যা সব আমার। এখন সব বে-হাত।

কি বললি? মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।

কিছু না।

তনুর দিকে তাকালাম।

তনু ম্যাডাম সুন্দরবাবু কই।

ল্যাপটপ নিয়ে বসে গেছে, কি লিখছে।

যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই? মিত্রা বললো।

বলতে পারবো না। তনু বললো।

একা না সাগরেদরা আছে।

একা।

কোথায়?

নতুন বাড়িতে।

তুই এখন কোথায় যাবি?

মিত্রা আমার চোখে চোখ রেখেছে।

দেখি কতদূর যাওয়া যায়।

অনিমেষদা হাসলো।

আমি একবার ছেলেমেয়েদের নিয়ে মায়ের ওখানে যাব।

ভয় পাবি না?

নীপা বললো, এখন ভয়ের কিছু নেই।

তাহলে যাস।

তুই যাবি না।

ফেরার পথে যদি সময় পাই যাব।

কে একটা ছেলে এসে গোটা কয়েক চেয়ার সামনে রেখে চলে গেলো। মিত্রারা সকলে বসলো।

তুমি জিজ্ঞাসা করেছো কোথায় যাবে? মিত্রা বড়োমার দিকে তাকাল।

জিজ্ঞাসা করলে বলে কখনও। বড়োমা তরপে উঠলো।

তুই তো জিজ্ঞাসা করলি তোকে উত্তর দিল।

আমি খামারের দিকে তাকিয়ে হাসছি।

ফিরে এলে জানা যাবে। জ্যেঠিমনি বললো।

সারাটা জীবন শুধু টেনশন নিলি আর সবাইকে টেনশনে রাখলি।

কথাটা শুনে মিত্রার দিকে তাকালাম। একটা বড়ো করে নিঃশ্বাস ছারলাম।

আর একটু বাকি আছে।

আঠারো বছর ধরে তোর আর একটু আর শেষ হবে না। এখন তুই বলতে পারবি না, তুই আমাকে জোড় করে সব চাপিয়ে দিয়েছিস। তাই বইতে হচ্ছে। এখন তোর কাছে কিছুই নেই, সব ফিরিয়ে দিয়েছিস। যাদের জিনিষ তাদের এবার বুঝতে দে।

অনিমেষদা হাসলো, কোন শব্দ করে নয়।

মিত্রা, অনিমেষদার দিকে তাকাল।

তোমরাও ওকে বাধা দিতে পারছো না। আবার একটা নিয়ে জড়াতে যাচ্ছে।

অনিমেষদা একবার মিত্রার দিকে তাকাল, একবার আমার মুখের দিকে তাকাল।

আমি যেটুকু বুঝলাম, অনাদি ওকে ধরে বাঁচার সিঁড়ি বানাল।

না রে মিত্রা শুধু অনাদি নয়, আমরাও জড়িয়ে আছি। বলতে পারিস স্বার্থপরের মতো নিজেকে ফের এস্টাব্লিশ করার জন্য।

অনিমেষদা ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকাল।

আমার দিকটা একবার ভাবলি না। মিত্রা নিজে স্বগোতক্তির সুরে বললো।

আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকলাম।

আমার আর কিছু চাই না। আমাকে একটু সময় দে। সেই কলেজ লাইফে তোকে পেয়েছি। মাঝে কয়েকটা মাস এক পশলা বৃষ্টির মতো তোকে পেলাম। তারপর তুই হারিয়ে গেলি, আবার….।

মিত্রার গলাটা ধরে এলো।

আমি উঠে দাঁড়ালাম।

মিত্রা আমার চোখে চোখ রাখলো। ছল ছল করছে না। তবে জল টলটলেও না।

কাছে গিয়ে কাঁধটা ধরে ঝাঁকুনি দিলাম।

ভেবে নে আমার জায়গায় তুই, তোর জায়গায় আমি। তাহলে কি করতিস?

আমি ভাববার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি।

এই জায়গায় থেমে গেলে, ভবিষ্যতে যারা দায়িত্ব নিচ্ছে। তারা চূড়ান্ত সমস্যায় পরবে, তুই কি চাস? তাহলে বল কালকেই থেমে যাব।

আমি এর আগেও তোকে বহুবার থামতে বলেছি, তুই থেমেছিস?

আর একটা চান্স দে, শেষ চান্স। কথা দিচ্ছি।

সবার সামনে বলছিস।

কথা দিচ্ছি, সবার সামনে বলছি।

সবাই চুপ, এবার ডাক্তারদাদা জোড়ে হেসে উঠলো।

সবাই ডাক্তারদাদার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে। এইরকম একটা ভাব গম্ভীর পরিবেশে ডাক্তারদাদা ওইরকম অট্ট হাসি হেসে উঠবে কেউ ভাবতেই পারে নি। আমি ডাক্তারদার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে আবার নিজের জায়গায় বসলাম।

ডাক্তারদাদা হাসতে হসতে আপন মনে বলে চললো।

মামনি তুই ঠিক জায়গায়টায় সময় মতো ঘা দিয়েছিস, তাই ফল পেলি। নাহলে ও ঠিক পিছলে বেড়িয়ে যেত।

মিত্রা ডাক্তারদার দিকে তাকিয়ে হাসলো, অনিমেষদা ডাক্তারদাদার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। দাদা সিগারেট ধরিয়েছে। আমি আমার নিজের জায়গায় বসলাম।

সবারই চোখে বিষ্ময়। বড়োমা, জ্যেঠিমনি,  দামিনীমাসি, বৌদি হাঁ করে ডাক্তারদাদার মুখের দিকে তাকিয়ে।

মিত্রা তখনও ডাক্তারদাদার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হেসে চলেছে। ইশারায় বলছে এখন কিছু বলো না। ডাক্তারদাদা হাসির মধ্যেই ইশারায় উত্তর দিল বড়ো মজার জিনিষ বুঝলি মামনি, এটা এদের জানা উচিত।

ডাক্তারদাদা হাসি থামাতে অনিমেষদা ইশারা করলো। ব্যাপারটা একটু বলুন।

জানো অনিমেষ, তুমি অনিকে একভাবে স্টাডি করো, আমি করি আর একভাবে।

কি রকম?

ও যখন ওর কাকার কাজ শেষে ঘরের বাইরে বেড়িয়ে এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল, তখন ওকে লক্ষ্য করেছো।

হ্যাঁ। খুব সাধারণ।

না। ঠিক ওই মুহূর্ত থেকে ওর চোখ কাউকে খুঁজছিল। ও স্বাভাবিক ছিল, ওর চোখ দুটো স্বাভাবিক ছিল না।

অনিমেষদার চোখদুটো ছোটো ছোটো হয়ে গেল।

ও মেয়েকে ফোনটা চেয়েছে। মিত্রা তনুকে সঙ্গে পাঠিয়েছে।

হ্যাঁ।

তারপর থেকে মিত্রাকে তুমি ওর কাছা কাছি কখনও দেখেছ।

খেয়াল পড়ছে না।

আমার মনে হয় অনাদি আসতে মিত্রা একবার ওর কাছে গেছিল। একটু হয়তো কান্না কাটিও করেছে। বান্ধবী হয়তো পরিষ্কার বলতে পারবে। কেননা বান্ধবীকে আমি তারপর থেকে মামনির সঙ্গে ঘুরতে দেখেছি। মামনি হয়তো কোনও হিন্টস বান্ধবীকে দেয়েছিল।

মিত্রা, ডাক্তারদার মুখের থেকে চোখ নামিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।

বড়োমা, ডাক্তারদার মুখের দিকে তাকিয়ে।

বিধানবাবু তখন আপনাকে হিন্টস দিয়েছিলাম। মিত্রা কিছু একটার গন্ধ পেয়ে গেছে।

বিধানদা হাসছে।

প্রবীর ফলো করো ভালো করে। কাজে লাগবে। অনিমেষদা বললো।

ডাক্তারদার দিকে তাকিয়ে।

আপনি কনটিনিউ করুণ। শেখা হচ্ছে।

আমি মিটি মিটি হাসছি ডাক্তারদার দিকে তাকিয়ে।

আমি শিওর ছিলাম, তনু, মিত্রা দুজনে ওর ফোনটা অপারেট করে ফেলেছে। তাই ওদের চোখে মুখে কোনও টেনশন ছিল না। যতোটা তোমার, প্রবীর, আমার মধ্যে ছিল।

আমি মিত্রার চোখের দিকে তাকালাম। চোখাচুখি হতে চোখ নামিয়ে নিলো, হাসছে।

খামারে ঘটনা ঘটছে মিত্রা ওই বাড়ির বারান্দায়, এটা তুমি কখনও ভাবতে পারবে!

তখনই যেন কার মুখে শুনলাম, ও নাকি একবার রান্নাঘরে অনির কাছে গিয়ে বলেছিল, তোকে এ্যারেস্ট করতে এসেছে, শুনে অনি হেসেছে। তুমি বন্ধবীকে জিজ্ঞাসা করো ও নিশ্চই এই বার্তাটা ওদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল, তোমরা কেউ কাছে যাবে না, ওর ব্যাপার ও বুঝে নিক।

কি বান্ধবী আমি ঠিক বলছি? ডাক্তারদা বড়োমার দিকে তাকাল।

বড়োমা হাসছে।

কোন মনটায় মিত্রা ধাক্কা মারলো সেটা বলো, এবার থেকে আমিও চেষ্টা করবো। বড়োমা বললো।

মন! সটা আবার কিগো দিদি। প্রবীরদা বলে উঠলো।

বড়ো জটিল অঙ্ক বুঝলে প্রবীর, কিন্তু একা একা বসে ভাবলে, কোনখান দিয়ে যে ফুরুত করে সময় কেটে যায়, তুমি নিজেও বুঝতে পারবে না।

আমি যেদিন এই গাঁয়ে প্রথম পা রাখলাম সেদিন অনেকগুলো ঘটনা একসঙ্গে ঘটেছিল, এখানে এলাম, একদিন দুপুরে ওর সঙ্গে ফ্রয়েড নিয়ে বেশ খানিকটা আলোচনা হয়েছিল, সেদিন ওর গভীরতা পরখ করেছিলাম।

যেমন ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই, বলতে পারো ওর কাছ থেকে শেখা, প্রথম প্রথম খুব উদ্ভট মনে হতো, তারপর একটু ভাবলাম, না কথাটার যুক্তি আছে।

কিরকম? অনিমেষদা বললো।

ওর কথায় শিব হচ্ছে কমিউনিস্ট, আর বিষ্ণু হচ্ছে ক্যাপিটালিস্ট।

অনিমেষদা হো হো করে হেসে চেয়ার থেকে পড়ে যায় যায় এমন অবস্থা।

দারুণ দিয়েছিস তো, প্রবীরদা আমার দিকে তাকাল।

একদিন খেতে বসে ওর বড়োমাকে বললো, জানো বড়োমা মা মনসা, শীতলা, বনবিবি এরা হচ্ছে সিডুল কাস্টদের দেবতা। চেপে ধরলাম, ব্যাখ্যা হলো দেখো সব নীচু জাতের ঘরে ঘরে মনসাপূজো হয়। তারপর তো চাঁদ সওদাগরের গল্পটা বললো। তার মধ্যেও নতুনত্ব পেলাম।

বলতে পারো ওর মতো করে ও ব্যাখ্যা দেয়।

দেখলাম বারান্দার সামনে সব পরিচিত মুখগুলো ধীরে ধীরে ভিড় করছে।

শিব কেশটা কি সামন্তদা। প্রবীরদা বললো।

শিবের কাছে আমজনতা পৌঁছতে পারে। কিন্তু বিষ্ণুর কাছে আমজনতা পৌঁছতে পারে না। শিবের পয়সাগড়ি বিশেষ একটা নেই। কিন্তু বিষ্ণুর প্রচুর পয়সা।

প্রবীরদা, রূপায়ণদা, অনুপদার হাসি আর থামে না।

সেই তখন থেকে আমি মার্ক করছি। ও যে কাজটা করে সেটা খুব কংক্রিট। না ভেবে একপাও ও ফেলবে না। আর ইনটিউসনটা ভীষণ স্ট্রং। বলতে পার তোমাদের পুলিশের যে কুকুরগুলো আছে ওরকম। ভজুকে একটু লক্ষ্য করো ধরতে পারবে, একেবারে মাস্টার ডগ।

ইদানিং নেপলাটা সেরকম তৈরি হয়েছে। ভজু তোমার কথা বুঝবে না, কিন্তু অনি হাঁ করলে ও হাওড়া বুঝে যাবে।

দামিনীমাসি হাসছে।

কিগো দামিনী আমি ঠিক বলছি?

দামিনীমাসি মাথা দোলাচ্ছে।

ওর মুখ থেকে তোমরা প্রায়ই একটা কথা শুনে থাকবে অনি চোখ দিয়ে শোনে, কান দিয়ে দেখে।

রাইট, প্রায়ই বলে। অনিমেষদা বললো।

কেন? তোমরা সোজা কথা কখনও উল্টো করে ভাবো?

না।

ও সব সময় ব্যাক ক্যালকুলেশন করে।

ঘরে যদি সাপের উপদ্রব হয় তার থেকে বাঁচার জন্য কার্বোলিক এ্যাসিডের শিশির মুখটা খুলে রাখা হয়, ঘরের লোক কোনওদিন ওই এ্যাসিডের গন্ধ পায়?

না।

সাপ পায় কি করে?

অনিমেষদা হাসছে।

তোমরা ভাবছো পাগলামি। একটুও না। এটাও একটা সাইন্স।

কিরকম? বৌদি বললো।

সাপের কেমোরিসেপটার বলে একটা অর্গান আছে, অনেকটা রেডারের মতো, যেটা সিগন্যাল ট্রানজাক্সন করে। সাপ যতো তাড়াতাড়ি বিপদের গন্ধ পায় অন্য কোনও প্রাণী অতো তাড়াতাড়ি পায় না। সাপের চোখটা মারাত্মক। মনে রাখবে সাপের কান নেই।

অনিমেষদা, ডাক্তারদার দিকে তাকিয়ে!

মানুষের তিনটে মন, চেতন, অচেতন, অবচেতন। ইংরাজীতে কনসাস, সাব-কনসাস, প্রি-কনসাস। তোমরা প্রায়ই একটা কথা বলো, আসলের থেকে সুদের দাম বেশি। কি বলো কিনা?

অনিমেষদা মাথা দোলাচ্ছে।

অনির কাছে মিত্রার থেকে বুঁচকি আর বোচনের গুরুত্ব অনেক বেশি।

অনিমেষদা হেসেফেললো।

আর মা তার সন্তানের সেফটি সবচেয়ে বেশি চায়।

একেবারে ঠিক কথা। প্রবীরদা বললো।

সেটা অনি পর্শু সকালে বাড়িতে ঢুকেই বুঝিয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে বোচনের প্রতি ওর স্নেহ সুলভ ব্যবহার। তখন তোমরা ছিলে না। আমি ছিলাম। মিত্রা সেই দুর্বল জায়গাটায় ঘা মারলো। বলতে পারো সাপের কাছে কার্বলিক এ্যাসিডের বোতলটা এগিয়ে দিল সাপও শুর শুর করে বস মেনে গেল।

মিত্রা ওর থার্ডসেন্সটা, প্রি-কনসাস মাইণ্ডটায় একটু উঁকি মারলো। এ্যাকচুয়েলি মিত্রা তাকে সময় দিতে বলেনি। ছেলেমেয়েকে সময় দিতে বলেছে। আমাকে না দিস ক্ষতি নেই, তোর কিছুটা সময় ওদের দে।

আপনি এতো তলিয়ে দেখেন! অনিমেষদা বললো।

কেন জানিনা ওর প্রত্যেকটা পদক্ষেপ আমি স্টাডি করি। আপাতঃ দৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় এ্যাবনর্মাল, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখ, দেখবে কংক্রিট ডিসিসান আছে।

ইকবালভাই চেয়ার থেকে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

আমি হাসছি।

ডাক্তারদাদা তোকে ঠিক স্টাডি করেছে।

জানেন দাদা, প্রথম প্রথম আমার কাছে যখন ও যেত চুপ করে বসে থাকতো। সব শুনতো কোনও কথা বলতো না। ওঠার সময় বলতো ইসলামভাই আগে কেনো তারপর বেচবে। ভাবতাম ব্যাটা লেখে, তাই এই কথা বলছে।

এখন মাঝে মাঝে কথাটা ভাবি, আর সিউরে উঠি। কি মারাত্মক কথা। ও তো ঠিক কথা বলতো, না কিনলে বেচবো কি করে। তখন থেকে শুধু শুনতাম আর হজম করা অভ্যাস করলাম। দেখলাম বেশ উপকার হচ্ছে।

ইকবালভাই আমার কপালে চুমু খেলো।

আজ রাতে নমাজ পরে উঠে তোর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া প্রার্থনা করবো।

সবাই আমাকে, ইকবালভাইকে দেখছে।

আমি ইকবালভাইয়ের হাত থেকে মুক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বড়োমার মুখের দিকে একবার তাকালাম। ছোটোমা মুচকি মুচকি হাসছে। তনুর চোখেমুখে ছড়িয়ে পরেছে প্রগাঢ় প্রশান্তি।

আমি বারান্দা থেকে নেমে খামারে এলাম। অনাদিরা দাঁড়িয়ে ছিল। কাছে গেলাম। অনাদির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম। ধুতি পাঞ্জাবী ছেড়ে প্যান্ট জামা লাগিয়েছে।

চিকনা এগিয়ে এলো।

তোরা রেডি। আমি বললাম।

হ্যাঁ। তোর জন্য অপেক্ষা করছি।

দিলীপবাবুর কাজ হয়ে গেছে? অনাদির দিকে তাকালাম।

অনুপদা, হিমাংশুদা করিয়ে নিচ্ছে। আবিদ কথাটা বলেই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

ওনাদের দেখতে পাচ্ছি না।

ও বাড়িতে গিয়ে বসেছেন।

ওদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেছিস?

তোকে ভাবতে হবে না। চিকনা বললো।

অনাদি।

বল।

কাজ সেরে দিলীপবাবুকে চলে যেতে বলেছিস?

দিলীপবাবু চলে যাবেন, সুকান্ত থাকবে।

চল তাহলে।

অনাদি আমার মুখের দিকে তাকাল।

চল।

আমি অনাদি একটা বাইকে বসলাম। ওরা যে যার মতো নিজেরা বাইকে বসলো। অনাদি বাইক ছাড়ার আগে একবার পেছেন ফিরে তাকালাম। দেখলাম বড়োমা, ছোটোমা, দামিনীমাসি, জ্যেঠিমনি, বৌদি বারান্দায় দাঁড়িয়ে।

হাত নারলাম। দিলীপবাবু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন চোখের পলক পরছে না।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/CUonIW0
via BanglaChoti

Comments