কাজলদিঘী (১২২ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১২২ নং কিস্তি
—————————

তুই টাকাটা রাখ। আমি ম্যানেজ করে নেব।

সেরকম হলে তোকে টাকাটা দিতাম না। আমি তোকে অসম্মান করছি না। আমার হয়ে তুই কাজ করবি। বাসে-ট্রামে ভাড়ালাগে।

পদুর পকেটে টাকাটা গুঁজে দিলাম।

চল আমাকে হেঁদোর মুখটা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসবি চল।

পেছন ফিরে তাকালাম।

দুলু আসিগো, পরে দেখা হবে।

দুলু হাত নেড়ে ভেতরে চলেগেল।

তুই কোথায় যাবি? পদু বললো।

ওদের সামনে বলি নি। একবার থানায় যাবো। তারপর বাড়িতে যাবো।

আমি তোর সঙ্গে যাব।

যাবি! ভয় করবে না?

তুই আছিস, আর ভয় পাইনা কাউকে।

হাসলাম। হাঁটতে শুরু করলাম।

ভেঁদোদা তোকে চিনতে পারে?

পারে। মাঝে মাঝে রাস্তা ঘাটে দেখা হলে দাঁড়িয়ে পরে। নিজেরই খাবার জোটে না। ওকে খাবার কিনে দিই কি করে বল। আজ তুই পয়সা দিলি মন শান্তি করে খাওয়ালাম। যতই হোক আমাদের বন্ধুর দাদা।

দুটো সিগারেট নিয়ে আয়। পকেটে হাত দিলাম।

পকেটে হাত দিতে হবে না। আমি নিয়ে আসছি।

পদু বিকাশের দোকানের দিকে এগিয়ে গেল।

আমি একটু দাঁড়ালাম। জটলাটা এখনও কমে নি। কেমন যেন থম থমে পরিবেশ।

সিগারেট নিয়ে কাছে এলো।

বাসে যাবি না হেঁটে যাবি।

কেন!

হেঁটে গেলে তোর সঙ্গে একটু কথা বলতে পারতাম। বাসে গেলে টুক করে চলে যাব।

চল।

দুজনে হাঁটতে আরম্ভ করলাম।

জানিস অনি, অনেকদিন পর আজ নিজেকে পুরুষ বলে মনে হচ্ছে।

একথা বলছিস কেন?

সব জায়গায় হারতে হারতে একেবারে হেরো পার্টি বনে গেছিলাম। পাড়ার লোক থেকে ঘরের বৌ পর্যন্ত সম্মান দিতো না। যে পুরুষ মানুষ মেয়েমানুষের ঘারে বসে খায়, তাকে কে সম্মান দেবে বল।

কিছু করিস না কেন?

কি করবো। পড়াতে গিয়ে প্রেম করে বিয়ে করে ফেললাম। বেশ কিছুদিন ভালো কাটলো। পাড়ায় একটা দুধের দোকান করলাম। ফুটপাথে বসে বেচতাম। শুধু সকালটুকু। বৌয়ের প্রেসটিজে লাগলো। বন্ধ করে দিলাম। তারপর এখানে সেখানে বহু কাজ করলাম। কেউ শালা কাজ করিয়ে মাস গেলে মাইনেটা পর্যন্ত ঠিক টাইমে দেয় না। বৌ কি সেটা বুঝবে। অশান্তি লেগেই থাকতো। তারপর যা হয় একেবারে ঘেও কুত্তা বনে গেলাম। এখন তো বাড়ি থেকে বরো একটা বেরোই না।

একটু থামলো। সিগারেটে খুব জোড়ে জোড়ে তিন-চারটে টান মারলো।

প্রায় মাস তিনেক পর সিগারেট খাচ্ছি। বৌ দিনে পাঁচটা বিড়ি কিনে দেয়। একটা বিড়ি তিনবার করে খাই। তাও শেষটুকু পর্যন্ত নিঃশেষ করে দিই।

পদু বলে চলেছে। আমি ওর পাশে হাঁটতে হাঁটতে কথা শুনে যাচ্ছি।

বহু বছর পর আমার ভালোবেসে বিয়ে করা বৌ দুটো ভালো কথা বললো। সৌজন্যে তুই।

পদুর মুখের দিকে তাকালাম।

এরকম ভাবে বলছিস কেন!

যা সত্যি তাই বললাম। আমার বুকের ভেতরটা তোকে দেখাতে পারবো না।

পদু বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে আমার পাশে পাশে হাঁটছে।

দুলুই আমার কাছে প্রায় হাজার পাঁচেক টাকা পাবে।

কেন!

রেশন নিয়ে পয়সা দিতে পারিনি। এখন শুধু চিনিটা তুলি। ব্ল্যাকে বিকাশের চায়ের দোকানে তিনটাকা বেশি দামে বেচেদিয়ে সেই পয়সায় চাল কিনি। প্রথম প্রথম ভীষণ লজ্জা করতো, এখন গা সওয়া হয়ে গেছে।

আবার একটু চুপ করে থাকলো।

সবচেয়ে বড়ো কথা কি জানিস।

কি।

আমরা বড়দের সম্মান দিতে জানতাম। এখনকার ছেলেরা সেটুকু শিক্ষা পর্যন্ত পায়নি। আমি তুই এখনও সর্বেশ্বরজ্যেঠুকে জ্যেঠু বলি। আর পাড়ার উঠতি ছেলেরা সর্বেশ্বর জ্যেঠুকে সর্বেশ্বরদা বলে। পাশাপাশি আবার দুলুকেও দাদা বলে। বাবা-কাকার জ্ঞান নেই।

হাসলাম।

থানার সামনে চলে এসেছি। পদু বললো।

তুই ভেতরে যা আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি।

কেন!

পরে বলবো।

ভেতরে আয়, কিচ্ছু হবে না।

আমি পদু দু-জনেই ভেতরে এলাম।

বেশ ভিড় দেখলাম। এর আগেও এই থানাতে আমি বহুবার এসেছি। তখন আমি গণিকা পল্লীর বাসিন্দা। এই থানার আণ্ডারেই ওই পল্লী।

ভেতরে সেই একই চিত্র।

একজন সাদা পোষাকের ভদ্রলোক সামনে এসে দাঁড়াল। স্যার আসুন।

চিনতে পারলাম না।

ওসি সাহেব আছেন?

হ্যাঁ স্যার, আপনি ভেতরে চলুন।

অনেকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমকে দেখছে।

আপনি আমাকে চেনেন?

আমি স্যারের সঙ্গে গেছিলাম।

চোখ চারদিকে ঘুরছে। ভেঁদোদাকে কোথায় রেখেছে।

এগিয়ে গিয়ে পর্দাটা সরাতেই দেখলাম চাঁদুবাবু বসে আছেন। সঙ্গে আরও তিনজন।

ওসি উঠে দাঁড়ালেন। আসুন স্যার।

আমি ভেতরে এলাম। চাঁদুবাবুরা আমাকে দেখে যেন ভূত দেখেছেন।

ওসি বেল বাজিয়ে দুটো চেয়ার আনতে বললেন।

চাঁদুবাবু উঠে দাঁড়িয়ে গদগদ ভাবে বললেন, সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আপনি দেখবেন আর কোনও সমস্যা হবে না।

কোনও কথার উত্তর দিলাম না।

আর তিনজন দেখলাম আমাকে বেশ ভালোরকম মাপছে।

একজন কনস্টেবল দুটো চেয়ার নিয়ে এসে রেখে গেল। আমি, পদু বসলাম।

ভেঁদোদাকে কোথায় রেখেছেন?

দোতলার বারান্দায় ওর জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছি। চাঁদু বললো।

আপনাদের কথা বলা হয়ে গেছে—

চাঁদুবাবুর দিকে তাকালাম।

না সেরকম কিছু নয়। ভেঁদোর জন্য ওঁকে একটু রিকোয়েস্ট করতে এসেছিলাম। যতই হোক পাড়ার ছেলে বলে কথা।

এইরকম ইস্যু নিয়ে আগে কখনও এসেছিলেন?

চাঁদুবাবু এবার চুপ করে গেলেন।

আপনি ওনাদের সঙ্গে বাকি কথা সেরে নিন। আমি একটু ভেঁদোদাকে দেখতে চাই।

ওসির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

আমাদের কথা শেষ হয়ে গেছে। চাঁদুবাবু বলে উঠলেন।

হেসে ফেললাম।

তাহলে আপনারা আসুন। আমি ওনার সঙ্গে একটু ব্যক্তিগত কথা বলবো।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনজন উঠে দাঁড়ালো। ওসির দিকে তাকিয়ে আছে।

পদু তুই একবার ভেঁদোদাকে দেখে আয়। পারলে একটু খাবার ব্যবস্থা করে দে।

আমরা সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি। চাঁদুবাবু আবার বলে উঠলেন।

আমি চেয়ারে বসলাম, পদু উঠে দাঁড়ালো।

স্যার আপনার একজন লোককে একটু পদুর সঙ্গে পাঠিয়ে দিন না।

উনি বেল বাজালেন।

চাঁদুবাবুরা ঘর থেকে ইচ্ছা না থাকলেও বেরিয়ে গেলেন।

ওসি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন। হাতটা এগিয়ে দিলেন। আমি হাতে হাত রাখলাম।

আমাদের অনেক চাপ বুঝলেন মিঃ ব্যানার্জী।

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।

ওপরের চাপ নিচের চাপ। মাঝখানে পড়ে চিঁড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছি।

মাথা থেকে চাপ সরিয়ে দিয়ে নিজের মতো করে কাজ করুণ। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবেন না। সমস্যা আসবে, দেখবেন তার সমাধানের পথও আপনার সামনে চলে এসেছে। আপনাকে এটুকু এ্যাসুয়েরনস দিতে পারি।

আপনার সম্বন্ধে যতটুকু জানলাম খুব ইন্টারেস্টিং পার্সেন আপনি। বাই দ্য বাই এককাপ চায়ের কথা বলি।

বলুন।

উনি বেল বাজালেন। চায়ের কথা বললেন।

যাকে সঙ্গে করে নিয়ে এলাম তার গল্পটা আপনার মুখ থেকে একটু শুনতে চাই। আপনার মতো লোক প্রেফার করছে। সামথিংস হ্যাপেন।

কি হবে শুনে। ভেঁদোদার পাশে আমি দাঁড়ালাম বলে আজকে ভেঁদোদার একটা গতি হলো বা বলতে পারেন হবে। এরকম অসংখ্য ভেঁদোদা কলকাতার রাস্তায় পড়ে আছে। একটু ভালোবাসা পেলে ওরাও কিন্তু অন্য মানুষ হতে পারে।

আজ আমি একটা শিক্ষা আপনার কাছে নিয়েছি, শুধু পাওয়ার থাকলেই হলো না। তাকে প্রপার ইউটিলাইজ করা দরকার।

হাসলাম।

একজন সেন্ট্রি এসে চা দিয়ে গেল।

কথায় কথায় ভেঁদোদার সঙ্গে আমার সম্পূর্ণ ইতিহাসটা ওনাকে বললাম। এমনকি পদু কে, কি বৃতান্ত সব বললাম।

আমার গল্প শুনতে শুনতে ওনার চোখ মুখের চেহারা বদলে গেল।

আপনার কাছে ডাক্তারবাবুর প্রেসকিপসনটা আছে।

আছে।

আমাকে দিন।

আমি পকেট থেকে ওনাকে বার করে দিলাম।

আপনাকে কথা দিলাম মিঃ ব্যানার্জী এই থানার ওসি হিসাবে আমার নিজস্ব কিছু পাওয়ার আছে। আমি সেটা ইউটিলাইজ করবো। আপনি কালকেই খবর পেয়ে যাবেন।

আমি সেটা চাই। দোষীকে শাস্তি দিন। নির্দোষকে মুক্তি দিন। কারুর প্ররোচনায় পা দেবেন না। সাধারণ মানুষ আপনাদের ওপর অনেক অংশে নির্ভরশীল। যদি আমার সাহায্য লাগে বলবেন যথা সাধ্য চেষ্টা করবো।

পদু ঘরে ঢুকলো।

কি হলো?

ভেঁদোদা কাঁদছে। তোকে একবার দেখতে চায়।

চিনতে পেরেছে?

বললাম তো সব। আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে শুধু কেঁদে যাচ্ছে। বার বার বলছে ওকে ডাক।

খাইয়েছিস?

দুধ আর বিস্কুট খেয়েছে। পাঁউরুটি ডিম কলা ঝোলায় ঢুকিয়ে রাখলো।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। আবার বুকের ভেতরটা কেমন চিন চিন করছে।

ওসি সাহেবের দিকে তাকালাম। হাততুলে নমস্কার করলাম। উনি হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। আমিও হাতে হাত রাখলাম। ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। উনিও আমার পেছন পেছন ওপরে এলেন।

ভেঁদোদা দোখলাম গুটিসুঁটি মেরে শুয়ে রয়েছে।

আমি কাছে গিয়ে বসলাম। ওসি সাহেব অযত্নে রাখেন নি।

একটা তোষাক জোগাড় করে দিয়েছেন তার ওপর একটা চাদরও পাতা রয়েছে।

ভেঁদোদা উঠে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো।

বাবা মরে গেছে।

আমি ভেঁদোদার দিকে তাকিয়ে কোনও কথা বলতে পারলাম না। কান্না ভেঁজা মুখটার দিকে করুণভাবে তাকিয়ে থাকলাম।

ওরা আমাকে শুধু শুধু মারে।

আমি তাকিয়ে আছি। কোনও কথা বলতে পারছি না। গলাটা যেন রুদ্ধ হয়ে গেছে।

অনেক কষ্টে বললাম, কেঁদো না। তোমাকে কেউ আর মারবে না। তুমি এখন কয়েকদিন এখানে থাকো। পদু সব ব্যবস্থা করে দেবে।

তুই আসবি না।

আসবো।

তুই না এলে ওরা মারবে।

কেউ মারবে না। এখানে পুলিশ আছে। তোমাকে মারতে এলে ওরা মারবে।

ভেঁজা চোখে ভেঁদোদা তখনও আমার হাতদুটো শক্ত করে ধরে আছে।

অনেক রাত হলো, এবার আমি যাই। তুমি একটু ঘুমবার চেষ্টা করো।

ভেঁদোদা আমার হাতটা ছেড়ে দিল।

উঠে দাঁড়ালাম।

ওসি সাহেব গোমরা মুখে পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।

আপনার কাছে প্রেসকিপশনটা আছে?

আমার টেবিলে রেখে এসেছি।

পদুকে একটু দিন ওষুধগুলো নিয়ে এসে ওকে খাইয়ে দিয়ে যাক। কাল সকালে ও আবার আসবে। ওর ভাইকে ডেকে আনতে বলেছি।

ওসি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

আপনাকে কোনও রিকোয়েস্ট করবো না। একটা অসহায় মানুষকে যতটা সহায়তা দেওয়ার দরকার ততটুকু দেবেন।

ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলাম। পেছন ফিরে আর ভেঁদোদার দিকে তাকালাম না।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ওসি বললেন আপনি একটা জায়গায় একটু সই করে দিয়ে যাবেন?

আপনি এফ.আই.আর লিখেছেন?

হ্যাঁ।

দিন, করে দিয়ে যাচ্ছি।

নিচে এসে একজন কনস্টেবলকে প্রেসকিপশনটা দিয়ে জেরক্স করে আনতে বললো।

তারপর একজন অফিসারকে ডেকে বললেন, ডাইরীটা লেখা হয়েছে।

হ্যাঁ স্যার।

যে ভাবে বলেছিলাম সেইভাবে লিখেছেন।

আপনি একবার পড়ে দেখুন, তিনমাসের আগে বেল পাবে না।

ছেলেগুলো কেমন?

সব কটা নেশাভাঙ করে। রাতে মেয়েবাজি। আর বলবেন না। চাঁদুবাবুর সব পেয়ারের লোক। ধরে আনবো, উনি ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন। যতো ঝার আমার ওপর।

আপনি তুলে আনুন, কথা দিলাম কেউ আপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না।

ডাইরীটা একবার ভালো করে পড়ে নিয়ে সই করলাম। তারপর পদুকে সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে থানার বাইরে এলাম।

ওসি সাহেব বাইরে এলেন।

আপনি বাড়ি যাবেন?

হ্যাঁ।

পৌঁছে দিই—

না না আমি চলে যেতে পারবো। সামনের রাস্তা থেকে একটা ট্যাক্সি ধরে বেরিয়ে যাব।

দাঁড়ান। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা কনস্টেবলকে একটা ট্যাক্সি ডেকে আনেতে বললো।

কনস্টেবলটা গেল আর এলো।

আমি ওদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।

রাস্তায় আসতে আসতে কতো কিছু দেখলাম। শহর কলকাতার রাতের রূপটা ভারি মায়াবী। মাঝে ট্যাক্সি ওয়ালা জিজ্ঞাসা করেছিল স্যার কোথায় যাবেন। ওকে বুঝিয়ে বলে দিয়েছিলাম।

বাড়ির গেটের মুখে ট্যাক্সি থেকে নামতে দেখলাম গেটটা আধ ভেজানো।

পয়সা মিটিয়ে গেট দিয়ে ঢুকতে গিয়ে দেখলাম মেয়ে বারান্দা থেকে নেমে ছুটে চলে এলো।

কোথায় গেছিলে তুমি! চোখে মুখে বিস্ময়।

একটু হাসলাম।

আমাকে জড়িয়ে ধরে কপালে গায়ে হাত দিল।

শরীর ঠিক আছে?

হ্যাঁরে, আমি ভালো আছি।

মাসিদিদা চিন্তা করছে। রতন আঙ্কেলকে পাঠালো তোমাকে খুঁজতে।

ফোন করতে পারতিস—

তোমার ফোন স্যুইচ অফ। এখন বুঝছি মা কেন তোমাকে নিয়ে এতো চিন্তা করে।

মার সঙ্গে কথা বলেছিস?

একটু আগেও দিদুন ফোন করেছিল। তুমি ফিরেছো কিনা।

কি বললো?

গজ গজ করলো, বাইরে এসেও শান্তি নেই।

হাসলাম।

মেয়ে জড়িয়ে ধরেছে।

জগন ভাই।

হ্যাঁ ছোটদা।

দরজাটা ভেজিয়ে দাও।

দিচ্ছি।

ওই অবস্থায় হাঁটতে হাঁটতে বারান্দায় এলাম। এতক্ষণ যে কষ্টটা বুকের মধ্যে রিনি রিনি করে বাজছিল সেটা এই মুহূর্তে অনেকটা কমে গেছে।

আজ কেউ আসে নি?

এসেছিল। চলে গেছে। কাল সাটারডে সবাই সকালে আসবে বলেছে।

তারমানে আজকে আমি, তুই, ভজুমামা আর মাসিদিদা।

আবিদ আঙ্কেল, রতন আঙ্কেল।

থাকবে বলেছে?

হ্যাঁ।

দাঁড়া ঝপ করে মুখ হাতটা ধুয়ে নিই তারপর জম্পেশ করে খাবো। বহুত খিদে লেগেছে।

মেয়ে ও ঘরে গেল। আমি এ ঘরে এসে বাথরুমে ঢুকলাম। কোনওপ্রকারে গেঞ্জিটা খুলে আগে জলে ভিঁজিয়ে দিলাম। ভাগ্য ভালো ওর চোখে পড়ে নি। কেলোর কীর্তি হতো।

তারপর ভালো করে ফ্রেস হয়ে বেরোলাম।    

দেখলাম বিছানার ওপর সব রেডি করে রাখা।

এখন চুলটা বেশ বেড়েছে। চিরুনি দেওয়ার দরকার হয়ে পড়েছে।

আমার ধ্বজামারা আলমাড়িটার সামনে দাঁড়ালাম। আয়নাটা কিন্তু এখনও বেশ ঝক ঝকে। মাঝে মাঝে একটু আধটু পাড়া উঠে গেছে। টেবিল থেকে চিরুনিটা নিয়ে চুলটা আঁচড়ালাম।

এখনও হয় নি! তোমার তো আমার থেকে বেশি সময় লাগে। মেয়ে এসে তাড়া লাগাল।

আমি হাসলাম।

মা যে তোমাকে নিয়ে কি করে চলে বুঝি না। সব রেডি।

হ্যাঁ। আর দু-মিনিট।

মেয়ে চলে গেল। আমি কোনওপ্রকারে পাজামা পাঞ্জাবীটা গলিয়ে চলে এলাম।

রতনবাবু, আবিদবাবু হাজির।

আমাকে দেখে হাসলো।

তোরা আজ এই বাড়িতে, ওই বাড়িতে কে শোবে।

তোমাকে ভাবতে হবে না।

আমি টেবিলে এসে বসলাম।

মেয়ে ওষুধ আর জলের গ্লাস নিয়ে এসে হাজির। হাতে নিয়ে ঢক ঢক করে গিলে নিলাম।

আমি, মেয়ে, দামিনীমাসি একপাশে, আর একপাশে আবিদ, রতন। ভজুরাম নিচে।

মাসি সব নিয়ে চলে এসো, আর ওঠা-উঠি করতে হবে না।

ইদানীং আমি রাতে আর ভাত খাচ্ছি না। রুটি খাই। তাও গোনাগুন্তি। তবে ডাক্তারদাদার প্রেসকিপশন, দিনে হাফ লিটার দুধ গলধকরণ করতে হবে। পারলে বারাও।

খাওয়া শুরু হয়ে গেলো।

রতন।

বলো।

ইসলামভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে?

হ্যাঁ।

ওরা কবে দুবাই আসছে?

আগামী সপ্তাহে।

তারমানে অনিসারা গেলে?

হ্যাঁ। তারপর সাতদিন নেপলাদের কাছে থেকে এখানকার ফ্লাইট ধরবে।

নেপলা, অবতার, সাগির ঠিক আছে?

সাগির বললো, নেপলা মাঝে কোথায় কয়েকদিনের জন্য গেছিল। সেখানে কি সব করতে চায়। ইসলামভাই গেলে সব দেখাবে। তারপর তোমার পার্মিশন পেলে ইনভেস্ট করবে।

তোর জাহাজ ছেড়েছে?

গতকাল ছেড়েছে।

সময়ে পৌঁছবে?

হ্যাঁ।

এখন রতন আঙ্কেলের সঙ্গে নয়, আমার সঙ্গে কথা বলতে হবে। মেয়ে তরবড় করে উঠলো।

বলছি তো।

মাসি মুখ টিপে হাসলো।   

কোথায় গেছিলে?

একটু ঘুরতে গেছিলাম।

আমার সঙ্গে দেখা করলে না কেন?

তোর সঙ্গে!

কেন, তুমি ইচ্ছে করলে দেখা করতে পারতে না?

কি করে দেখা করবো। তুই এক জায়গায়, আমি এক জায়গায়!

আবার মিছে কথা বলছো। তুমি আজ কলেজে যাও নি?

হেসে ফেললাম। আমার সঙ্গে মাসিও হাসছে।

তুই কি ওকে মিত্রা পেয়েছিস। বুজুংবাজুং দিয়ে পার পেয়ে যাবি। আমাকে ফিরেই জিজ্ঞাসা করেছে মাসিদিদা বাবা বাড়ি ফেরে নি। তখনই বুঝেছি ও নিশ্চই কিছু জেনেছে। না হলে ও জানবে কি করে তুই বেরিয়েছিস।

তুমি কি বললে?

যা সত্যি তাই বললাম। মেয়ের কতো হিসাব, কখন বেরিয়েছে, কে সঙ্গে ছিল….।

কলেজ থেকে বেরিয়ে তুমি তোমার পুরনো হস্টেলে যাও নি?

আমি হাসছি।

তোকে এসব খবর কে দেয় বল তো।

তুমি তাহলে কোথায় গেছিলে?

কাছা কাছি গেছিলাম।

তুমি কলেজের অডিটোরিয়ামে দাঁড়িয়ে বাংলা ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলো নি?

বুঝেছি খিদের চোটে তোর পেট চোঁ-চা করছে।

তুমি সত্যি কথা না বললে আমি কিন্তু উঠে চলে যাব। খাব না।

আমি মেয়ের হাতটা ধরলাম। তোর মায়ের মতো অতো রাগ করলে চলে।

মা মোটেও রাগ করে না। মা তোমার সব কথা মনে নেয়।

ঘেঁচু। কুটকুট করে দিদাই আর দিদানকে লাগায়।

মেয়ে কপট গম্ভীর মুখে আমার দিকে তাকিয়ে।

তোকে কে বললো আমি কলেজে গেছিলাম?

তিনটের সময় শুভ এসে বললো, আঙ্কেলকে ডাফ হস্টেলে দেখলাম।

ও ওখানে কি করতে গেছিল?

ওর বন্ধুর সঙ্গে বসে নোট তৈরি করছিল।

তুই যে বললি বাংলা ম্যাডাম বলেছে।

ক্লাস ছিলো বলে যেতে পারি নি। ক্লাস শেষ হতে আমার হেড ডিপ প্রফেসারস রুমে ডেকে পাঠালেন। গেলাম। বললেন মিসেস সেন এই হচ্ছে অনি ব্যানার্জীর মেয়ে।

তারপর উনি সব বললেন।

ছুটতে ছুটতে আমি আর শুভ ডাফ হস্টেলে গেলাম। সুপারের সঙ্গে দেখা করলাম। উনি বললেন, তুমি কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছ।

মেয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো কিছু খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। ধরা পড়ে গেছি।

আমি মাথা নীচু করে খেতে থাকলাম। সবাই খাচ্ছে।

বাবা।

মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম।

তোমার খুব কষ্ট, তাই না!

কেন বল—

তুমি তোমার ঘরে ঢুকে কাঁদছিলে কেন?

দেখলাম সবাই খাওয়া থামিয়ে দিয়েছে। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

বলো না। আমি যদি তোমায় কিছু সাহায্য করতে পারি ভালো লাগবে।

রতনরা ফ্যাকাসে মুখে আমার দিকে তাকিয়ে। মেয়ের চোখে অনেক জিজ্ঞাসা।

না-রে, সেরকম কিছু নয়। ওই ঘরটায় আমার অনেক স্মৃতি লুকিয়ে আছে। ঘরে ঢুকতেই হুড়মুড় করে সব মনে পড়ে গেল। তাই একটু মনটা খারাপ হয়ে গেল।

মার মুখ থেকে শুনেছি, তুমি এর থেকেও অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পরেছো তোমার চোখে কেউ জল দেখে নি, কি এমন তোমার মনে এলো তুমি কাঁদে ফেললে।

ওই ঘরে ঢুকে আমার জীবনের একটা হারানো অধ্যায়কে আজ তিরিশ বছর পর খুঁজে পেলাম। অনেক যত্ন নিয়ে তাকে এতদিন লালিত পালিত করেছিলাম।

তুমি তো কাউকে কিছছু বলো না। একটু বলো প্লিজ।

মেয়ে এমনভাবে কথাটা বললো, নিজের আবেগকে আর ধরে রাখতে পারলাম না।

গড় গড় করে এতক্ষণ যে ঘটনার সাক্ষী ছিলাম সব ওদের বললাম।

কখনও ওদের ভুরু কুঁচকে উঠেছে কখনও ওরা বিষ্ময়ে আমার দিকে তকিয়েছে।

মেয়ে কেঁদে ফেললো। চোখ থেকে চশমা খুলে ফেললো।

দামিনীমাসিও চোখ মুছছে। আবিদ, রতনের চোখ ডগডগে লাল।

একটুক্ষণ থামলাম।

কাঁদলে তোর বাবার মনটাকে কি করে ছুঁবি। তোর বাবার কত স্মৃতি এরকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এগুলোই তোর বাবার জীবনের বেঁচে থাকার ইনস্পিরেসন।

ভেঁদো জ্যেঠু এখনও থানায় আছে।

ওকে ঘুম পারিয়ে রেখে এসেছি। পদুকে বলেছি কাল সকালে একবার দেখা করে ঝুনেকে নিয়ে এ বাড়িতে আসতে।

আচ্ছা ওর সব থাকতেও ও কেন ওই পাড়ায় পড়ে রয়েছে?

মানুষের মনটা বড়ো অদ্ভূত জানিস মা। বোঝা মুস্কিল। তবে ভেঁদোদা এখনও বিশ্বাস করে ও ওই পাড়ার বাসিন্দা। ওটা ওর জন্মভূমি। ছোটো থেকে ওখানে বড়ো হয়েছে। শেকড় কেটে একটা বড় গাছকে যদি অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে পোঁতা যায়, সে বেশিদিন বাঁচে না, মরে যায়। যে কয়দিন বাঁচে সেও বড়ো কষ্টের।

সর্বপোরি ওর বাবা ওর সবচেয়ে বড়ো বন্ধু ছিলো। এখনও সর্বেশ্বরজ্যেঠুর দোকানে ভেঁদোদা ওর বাবাকে দেখতে পায়। এটা ওর বিশ্বাস। তুই এটা ওর মন থেকে উবড়ে ফেলবি কি করে—তাই ঝুনে ওকে নিয়ে চলে গেলেও, ও বার বার ওর পুরোনো পাড়ায় ফিরে এসেছে। ও ওখানেই মরবে।

আমাকে একবার ভেঁদো জ্যেঠুর কাছে নিয়ে যাবে?

ওকে একটু সুস্থ হতে দে।

ভজু দেখলাম খেতে খেতে দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

মাসি অনেক রাত হলো। এবার চলো উঠে পরি। ভজু বেচারা ঘুমিয়ে পড়েছে।

আমি উঠে দাঁড়ালাম।

মাসিদিদা আজ বাবার কাছে শোব, তোমার কাছে শোব না।

মাসি হাসছে।

তোর বাবা আর কোনও গল্প বলবে না।

মাসি গিয়ে ভজুকে ডাকলো। আমি বেসিনে মুখ ধুয়ে এ ঘরে এলাম। মেয়ে কিছুক্ষণ পর রাতের পোষাক পড়ে এ ঘরে এলো।

রাতের ওষুধ আছে খেতে হবে।

উঃ ওষুধ খেতে খেতে পেটে কড়া পড়ে যাবে।

মেয়ে হাসছে।

শোবে না।

মেয়ে বেরিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর ভজুরাম ঢুকলো মেয়ের ল্যাপটপ নিয়ে।

ভজুবাবু আজ খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে।

সারাদিন বাগান পরিষ্কার করেছি। কি নোংরা হয়েছিল। ভজু হাই তুলতে তুলতে বললো।

আবিদ যে নতুন ফুলের চাড়াগুলো নিয়ে এসেছিল পুঁতেছিস?

আজকে সব ঠিক করলাম কালকে পুঁতবো। তুমি তখন আমাদের ওখানে গেছিলে?

কাছাকাছি গেছিলাম।

কবিতা এসে মাকে বললো, কে একজন স্যুইসাইড করেছে।

তাই!

মা কাঁদছিল।

ছোটদিদিমনি জানে না তো?

ভজু ঘার দোলালো। না।

কাল এক ফাঁকে তোর কাছ থেকে শুনবো।

আচ্ছা।

তুমি মাকে বলো না যেন।

না না কেন বলবো।

ভজু চলে গেলো।

আমি বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পরলাম। শীতের মরশুম, বছর শেষ হয়ে আসছে। আর মনে হয় সপ্তাহ খানেক বাকি আছে।

বাবার শরীর ঠিক আছে….এই তো ওষুধ নিয়ে এলাম….শুয়ে আছে, তুমি কথা বলবে….ধরো।

মেয়ে কানে ফোন গুঁজে ঘরে ঢুকলো। আমার হাতে ফোনটা দিলো।

মিলি মনি। এই নিয়ে সিক্সথ টাইম।

হাসলাম।

হ্যালো।

সত্যি তুমি আর মানুষ হবে না।

ছিলাম কবে।

ফোনটা বন্ধ করে রেখেছিলে কেন?

মিত্রা নেই বলে খালি ধমকানো তাই না। আসতে দাও একবার।

মিলি হাসছে।

বিশ্বাস করো, কখন বন্ধ করেছি খেয়াল নেই। কনিষ্ক কোথায়?

আজ বাবু নার্সিংহোমে থাকবেন। কাল সকালে তোমার বাড়িতে ডাইরেক্ট চলে যাবেন।

তুমি একা!

না। কাজের মেয়েটা আছে। তাছাড়া ওর মামা-মামী এসেছেন। আজ রাতটুকু থেকে কাল সকালে চলে যাবেন।

কেন!

ডাক্তার দেখাতে এসেছিলেন।

যাক শ্বশুর-শাশুড়ির কিছুটা সেবা করলে বলো।

তা একটু আধটু করতে হলো।

পুঁচকে কোথায়?

পাশে। ঘুমচ্ছে।

বড়োটা।

ও ঘরে। সোমবার প্রজেক্ট জমা দিতে হবে কাজ করছেন।

শুয়ে পরো, কাল এসো কথা হবে।

শরীর ঠিক আছে?

হ্যাঁ।

গুডনাইট।

রাখো।

মেয়ের হাতে ফোনটা দিলাম। মেয়ে আমার হাতে ওষুধ ধরিয়ে দিয়ে টেবিলের কাছে গেল, জলের বোতলটা নিয়ে এলো। আমি জলের বোতলটা ওর হাত থেকে নিয়ে ওষুধগুলো কোনওপ্রকারে গলধঃকরণ করলাম।

ওষুধ খেতেও তোমার কষ্ট।

জীবনে কোনওদিন এত ওষুধ খাইনি। প্রথম খাচ্ছি। মন হচ্ছে সারা জীবনেরটা একেবারে উসুল করে নিচ্ছে।

আমি টান টান হয়ে বিছানায় শুলাম।

বোতলটা টেবিলে রেখে এসে মেয়ে আমার মাথার শিয়রে বসলো। এই কয় মাসে পাঁচ-ছয়দিন আমার কাছে শুয়েছে। মাঝে একটু ঠাণ্ডা লাগিয়ে ফেলেছিলাম জড় জড় হয়েছিল।

তুই শুবি না?

তোমার মাথাটায় একটু হাত বুলিয়ে দিই।

ওর মুখের দিকে তাকালাম। একবারে মায়ের মুখের আদল। কিছুটা ইসির দিকেও যায়। চোখে কালো ফ্রেমের চশমায় বেশ গাম্ভীর্য পূর্ণ মুখ। কথার মার-প্যাঁচ এরই মধ্যে খুব ভালো শিখে ফেলেছে। রক্তের দোষ, যাবে কোথায়।

দে। ভীষণ ক্লান্তি লাগছে।

চোখ বন্ধ করলাম। মেয়ে কপালে হাত রেখেছে।

মেয়ের শরীরের গন্ধ নাকে এসে লাগছে। অনেকটা ওর মায়ের শরীরের গন্ধের মিশেল তবু কোথায় যেন একটা বিশেষত্ব আছে। অদ্ভূত, কোনও নেশা জাগছে না! না কোনও অনুভূতি! একেই মনেহয় বলে সন্তান-পিতার কেমেস্ট্রি। ওর মা হলে এতক্ষণে হয়তো কিছুটা দুষ্টুমিও করে ফেলতাম। আমি চোখ বন্ধ করে টান টান হয়ে শুয়ে আছি। মেয়ের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। বুঝতে পারছি ও আমার দিকে অপলক নয়নে চেয়ে আছে।

বাবা।

চোখ চাইলাম।

তুমি মাকে খুব ভালোবাসো তাই না?

মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকলাম। পরের প্রশ্নটা কি করতে পারে, তার একটা সূত্র খোঁজার চেষ্টা করলাম। আমার মতো কোনও ফাঁদ পাতছে কিনা?

বলো না?

বেশি না, একটু।

আমাকে?

তোর মার থেকে একটু বেশি।

এক্কেবারে মিথ্যে কথা।

কেন!

তাহলে তুমি আঠারো বছর সময় নষ্ট করতে না।

মনে হচ্ছে ভুল চাল দিয়ে ফেললাম। আসল ঘুটিগুলোর দিকে না তাকিয়ে চাল দিয়ে ফেলছি।

আমি মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তুমি আমার কাছে লুকিয়ো না। আমি সব জানি। শুধু তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।

বুঝলাম এই গেম থেকে রিব্যাক করা একটু মুস্কিল হবে।

মিঃ নীতিন বাজোরিয়ার অরিজিন্যাল নাম মিঃ টোডি। মায়ের জীবনে যে সবচেয়ে বড়ো ক্ষতিটা করেছিল। তুমি ব্যাপারটা কখনও কোনওদিন মন থেকে মেনে নিতে পার নি।

তাহলে কি মেয়ে ওর মায়ের সিডিটা দেখে ফেলেছে! না তা হবে কি করে! ওটা আলমাড়ির চোরা কুঠরীতে আছে, মিত্রা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তি জানে না।

আমি জানি তার প্রমাণ তোমার হাতে আছে। মা, মাসিদিদা আমাকে সব বলেছে।

ঘাম দিয়ে যেন আমার জ্বর ছাড়লো। যতই হোক মায়ের এই দৃশ্য কোনওদিন তার সন্তান দেখলে সহ্য করতে পারতো না। আমি যদি ওই জায়গায় থাকতাম আমিও পারতাম না।

জানো বাবা, এক এক সময় আমি তোমাকে নিয়ে খুব স্টাডি করি।

আমি মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে।

তুমি কোন গ্রহের মানুষ?

কোনও উত্তর দিলাম না। মুচকি হাসির রেখা আমার ঠোঁটে।

সাধারন মানুষ, যাদের নর্মাল বিহেভ তারা কখনও এই ধরণের কাজ করতে পারে না। তারা যেটুকু না করলে নয় সেটুকু করেই থেমে যায়।

আমার দাদুর একটা ছোট্ট ভুলের খেসারত তোমাকে আজও দিয়ে যেতে হচ্ছে।

ওঃ ভগবান, মেয়ে কি তাহলে জ্যেঠিমনির ব্যাপারটাও জেনে ফেলেছে?

মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ব্যপারটা ভালো করে বোঝার চেষ্টা করলাম।

সত্যি মিত্রার মতো গর্ধভ পৃথিবীতে একটার বেশি দুটো নেই। এই ঘটনা আমি, মিত্রা, বড়োমা, ছোটোমা ছাড়া কেউ জানে না। খুব বেশি হলে দামিনীমাসি। কিন্তু দামিনীমাসির মুখ থেকে এই কথা বার করা খুব মুস্কিল। তাহলে মেয়ে জানলো কি করে! কে বললো ওকে?

আচ্ছা বাবা, আমি যাকে বিয়ে করতে যাব তার সম্বন্ধে আগে থেকে একটু খোঁজ খবর নেব না, তার সঙ্গে আর কারুর রিলেশন আছে কিনা। যেখানে দেখাশুন করে বিবাহ হচ্ছে। আমি বলবো দিদান ঠিক করেছে। দিদানের জায়গায় আমি হলেও তাই করতাম।

যাক বাবা, একবারে কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। মনে মনে মিত্রার ষষ্ঠীপূজো করতে শুরু করেছি। বেরিয়ে গেল বলি কি করে, কতদূর এগোয় আগে দেখি।

আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।

জ্যেঠিদিদার সঙ্গে একদিন খুব ঝগড়া করেছি। একমাত্র পিসিদিদা আমাকে সাপোর্ট করেছিল।

বোবার শত্রু নেই।

তুমি আর দাদু গর্ত খুঁড়ে রেখেছো বাবা সারাজীবন ধরে তা বুঁজিয়ে চলেছে। কেন? তোমরা কি তার সাতকুলের আত্মীয়। একটা গ্রামের ছেলেকে পেয়ে, তার নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে নিচ্ছ।

আর গম্ভীর থাকতে পারলাম না। এবার হেসে ফেললাম।

মেয়ে আমার বুকে মাথা দিয়ে পাশে শুল।

জানো বাবা, মায়ের থেকেও দিদান আর দিদাই তোমাকে বেশি ভালোবাসে। তোমার কিছু হলে দু-জনে কেমন যেন পাগল পাগল হয়ে যায়। জ্যেঠিদিদা, ভালোদিদা, মাসিদিদার কথাই বা বাদ দিই কেন। এরা এক একজন এক এক রকম। এর মধ্যে মাসিদিদা টেরিফিক। তোমার কিছু হলে মাসিদিদা চারদিকে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। সেবার ভালোদাদাই (অনিমেষদা) অনেক রিকোয়েস্ট করে মাসিদিদাকে সামলিয়েছিল। তোমার জ্ঞান না আসা পর্যন্ত মাসিদিদা হাসপাতালে ছিল। তখন মাসিদিদাকে দেখে বেশ ভয় লাগতো। আমাদের কারুর সঙ্গে বিশেষ একটা কথা বলতো না।

আর ভজুমামা—

কিছু করতে পারে না তো। সারাটা বাড়ি দাপিয়ে বেড়ায়। বলে কি, আমাকে একটা ভোজালি দাও আমি সব ব্যাটাকে বুঝে নেবো।

মেয়ে নিজেই নিজেই হাসছে।

কতদিন ভজুমামাকে আমগাছের তলায় বসে তোমার নাম করে কাঁদতে দেখেছি। ও-তো কাউকে কিছু বলতে পারে না। আমার কাছে এসে তোমার গল্প করতো। তোমার খবর জানতে চাইতো। যতক্ষণ ওর মনের মতো বলতে না পারছি ততক্ষণ ও গ্যাঁট হয়ে মুখের সামনে বসে থাকতো।

বুক থেকে মাথাটা তুলে মুখের দিকে তাকাল।

ভজুমামা সব বোঝে, এক্সপ্রেস করতে পারে না। অনেকটা ভেঁদোজ্যেঠুর মতো, তাই না?

আমি মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে।

ভজুমামা আমাকে ভাইদাদাইয়ের গল্প বলেছে। পুরোটা নয় একটু। মেরিনাআন্টিকে ভাইদাদাই খুব ভালোবাসতো। মেরিনাআন্টি তেমার কাছে লেখা পড়া করতে আসতো। তুমি ভাইদাদাইকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়েছো। ভাইদাদাইয়ের হয়ে কোর্টে সাক্ষী দিয়েছো। কবিতামাসিকে থাপ্পর মেরেছো। সব।

এই মুহূর্তে শুনে যাওয়া ছাড়া আমার কোনও গতি নেই। বুঝলাম মেয়ে আমাকে নিয়ে বেশ ভালো হোমওয়ার্ক করেছে।

জানো বাবা, মাসিদিদাইয়ের বুকের ভেতরটা পাথর চাপা দেওয়া। তুমি কোনও মতেই পাথরটা সরাতে পারেব না।

আমি মেয়ের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছি।

দূর তুমি শুধু শুনেই যাচ্ছ কিছু বলছো না। অন্ততঃ পক্ষে একবার হ্যাঁ-হুঁ করো।

তুই তো বলছিস, আমি মন দিয়ে শুনছি।

ওই জন্য ডাক্তারদাদাই বলে, তোর বাবা হচ্ছে খুব ভালো শ্রোতা।

আমার নাকটা চেপে ধরলো।

বাবা তুমি চোখ দিয়ে শোনো, কান দিয়ে দেখ!

হেসে ফেললাম।

বলো না।

কি বলবো।

সত্যি কিনা।

তোর বিশ্বাস হয়।

ডাক্তারদাদাই যে বলে।

ডাক্তারদাদাইকে জিজ্ঞাসা করবি।

মেয়ে আবার আমার বুকে থুতনিটা রাখলো।

জানো বাবা ভেঁদোজ্যেঠুর ঘটনাটা আমাকে ভীষণ রিএ্যাক্ট করেছিল তাই কেঁদে ফেলেছিলাম। গল্প শুনতে শুনতে আর একদিন কেঁদেছিলাম।

মেয়ে বুকের থেকে মুখ তুলে আমার চোখে চোখ রাখলো।

কবে বলোতো?

চোখের ইশারায় বোঝাবার চেষ্টা করলাম, কি করে বলবো।

যেদিন তুমি মিঃ ব্যানার্জীর মুখে সজোরে লাথি মেরেছিলে।

বুকের ভেতরটায় আবার কাঁপন শুরু হলো। এ ঘটনা মেয়ে জানলো কি করে? এ ঘটনা মিত্রা ছাড়া, ছোটোমা, বড়োমা জানে। হ্যাঁ দামিনীমাসি ঘটনাটা জানে। তাহলে কি….? মেয়ের চোখে মুখে ফুটে উঠলো জিঘাংসার চিহ্ন।

তোমার জায়গায় আমি থাকলে সেদিন ওকে খুনই করে ফেলতাম। তুমি গ্রামের ছেলে তাই ওইটুকু দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলে। রতন আঙ্কেল, আবিদ আঙ্কেল চেয়ে চেয়ে দেখল, কিছু বললো না! মেয়ের গলাটা মনে হয় সামান্য ভারি হয়ে এলো।

আমি নির্বাক শ্রোতা।

মেয়ে আমার বুকে মাথা রাখলো।

কিছুক্ষণ পর দেখলাম বুকটা কেমন ভিঁজে ভিঁজে লাগছে।

মেয়ের পিঠে হাত রাখলাম। কাঁদিস না।

তোমার অনেক কষ্ট, তাই না বাবা?

চুপ করে রইলাম।

তুমি সবাইকে সারাজীবন শুধু দিয়েই গেলে। কারুর কাছে তোমার চাইতে ইচ্ছে করে না? মেয়ের কান্না ভেঁজা গলা।

আমি নির্বাক।

মেয়ে বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে রয়েছে। বুঝতে পারছি ওর চোখের জলে আমার বুক ভিঁজে যাচ্ছে। ওকে কাছে টেনে নিলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। মেয়ে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রয়েছে। চোখদুটো ভীষণ টন টন করছে। মনে হচ্ছে যেন চোখের মনিদুটো ফেটে বেরিয়ে আসবে। চোখ বন্ধ করলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/4p53gNC
via BanglaChoti

Comments