কাজলদিঘী (৯৪ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

৯৪ নং কিস্তি
—————————

আমি অনিমেষদার মুখের দিকে তাকিয়ে। শেষ চালটা অনিমেষদা দিয়েছে। আর একটা চালে অনিমেষদা কিস্তি মাত করে দেবে। এতো তাড়াতাড়ি হেরে যাব না। একটা ঘোড়া যাক ক্ষতি নেই। কিন্তু মন্ত্রী কিছুতেই এই মুহূর্তে হারাতে পারবো না।

কি বলছো তুমি! বৌদি বললো।

দাঁড়াও সুতপা, আমি ওর মুখ থেকে উত্তরটা শুনতে চাই।

রাজনীতির ক্ষেত্রে আমি তোমাকে শিশুপাল হিসাবে দেখি। একশোটা ভুল এক্সকিউজ। একশো একটা এক্সকিউজ হবে না। আদার ওয়াইজ তুমি আমার পিতার স্থানে আছো।

আমি যে এই ধরণের একটা উত্তর দিতে পারি, সেটা কেউ কল্পনা করতে পারেনি।

সরাটা ঘর নিস্তব্ধ, কারুর মুখে কোনও কথা নেই।

সবাই অনিমেষদা আর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

এখানেও তুই একটা লাইন ওপেন রেখে দিলি।

এবার তোমার ইচ্ছে মতো তুমি যেভাবে ঘুটি সাজাবে সব তোমার। আমি দেখে যাব।

নীপা।

বলুন।

আমাকে একটু জল দে।

নীপা উঠে গেল।

তোকে কথা দিলাম, আমি আমার এই সম্মানটা ধরে রাখবো। তোর বুকের আগুনকে আমি শ্রদ্ধা করি। আমি বললে ভুল হবে। বিধানবাবু, প্রবীর কার নাম বাদ দেব। প্রবীর যখন আমাকে লাস্ট আপডেট দিল। তখন থেকেই আমি নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করছি। মনে মনে ঠিক করেছিলাম সবার সামনে আজ তোর মুখোমুখি হবো। তোর মুখ থেকে আমি শুনতে চাই। সেখানে আমার স্ত্রী, মেয়ে, জামাইও উপস্থিত থাকবে। জামাইকে আমি ধর্তব্যের মধ্যে আনিনা। ও আর দশটা ছাপোষা অধ্যাপকের মতো। শুদ্ধিকরণ ব্যাপারটাতে এবার জোড় দিতে হবে।

দাদা এখন থাক না। প্রবীরদা বলে উঠলো।

না প্রবীর এই মুহূর্তে আমি রিয়েলাইজ করছি।

গত পনেরো বছর তুমি পার্টির প্রত্যেকটা মিটিংয়ে গলা ফাটিয়েছ।

কেউ পাত্তা দেয়নি। মেজরিটি যেদিকে আমাকে, বিধানবাবুকে সেদিকে হেলে পড়তে হয়েছে। নিজের স্বাধীন মতামত সেখানে এস্টাব্লিশ করতে পারিনি। তোমার সঙ্গে অনির যোগাযোগ যে এতো গভীর ছিল, ঘুণাক্ষরেও আমি তা বুঝিনি। ওগুলো যে অনির কথা তোমাকে দিয়ে বলাচ্ছে তাও বুঝতে পারিনি। সন্দেহ হয়েছে তুমি পাশ কাটিয়ে গেছ। অনুপের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছো, রূপায়ণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছো।

আচ্ছা এগুলো পরে আলোচনা করলে হতো না—

প্রবীর ভুলটা ভুল। ঠিক জিনিষটাকে ভুল করা খুব সহজ, কিন্তু ভুলটাকে ঠিক করতে মেহনত করতে হবে। ও গ্রাসরুটে মেশে, ফলে তাদের মনের কথা ও যতটা জানবে আমি জানবো না। তুমিও অনির কথামতো ওদের সঙ্গে মিশতে। কিন্তু ওখানকার পার্টির নেতাদের রিপোর্টের সঙ্গে তোমার রিপোর্ট মিলতো না। তখন বুঝিনি ওটা ম্যানিপুলেট, এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি।

সুতপা—

বৌদি গম্ভীর মুখে অনিমেষদার মুখের দিকে তাকালো।

তোমার ছেলেকে নতুনভাবে দেখতে পাচ্ছ। ও কিন্তু কোনও কথা গোপন করেনি। সোজাসাপ্টা মুখের ওপর বলে দিয়েছে।

তোমার ভুলের ব্যাপারটা আমি ঠিক ধরতে পারছি না।

পলিসি মেকার আমি। আমার চিন্তাভাবনায় দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। বলতে পার কারও কারও প্রতি আমি অত্যাধিক দুর্বল। এ্যাডমিনিস্ট্রেশনে দুর্বলতার কোনও স্থান নেই। এটা ও আমাকে বহুবার আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে। এমন কি প্রবীরকে দিয়ে বলিয়েছে। তখন আমি কনফিউজড ছিলাম।

এবার আমি উঠি।

সোজা উঠে দাঁড়ালাম।

সবার মুখে কুলুপ আঁটা কেউ কোনও কথা বলছে না।

বৌদি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

আমি সোজা পুকুর ঘাটে চলে এলাম।

আলো জ্বলছে তবে তা ঘাট পর্যন্ত পৌঁছায় নি।

আমি ধীর পায়ে ঘাটে নেমে গেলাম। মুখটা ধুয়ে চোখে মুখে ভালো করে জল দিলাম। পরনের কাপরটা দিয়েই মুছলাম। ঘাট থেকে উঠে এলাম। চিকনা সামনে দাঁড়িয়ে।

চল ওদিকে যাব, একটু কথা আছে।

চিকনার পেছন পেছন বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে পুকুরের এপারে খালের ধারে এলাম। চারিদিক অন্ধকার। ঝিঁ ঝিঁ পোকা একইভাবে ডেকে চলেছে। একফালি চাঁদ মাথার ওপর। তার ক্ষীণ আলো নদীর জলে পরে চিক চিক করছে। জোনাকীরা ইতি উতি উড়ে বেড়াচ্ছে। এক মায়াবী পরিবেশ।

চিকনা পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করলো। মুখটা উত্তেজনায় ভরপুর।

কি হলো তুই খুব টেনশনে আছিস মনে হচ্ছে?

হ্যাঁ।

কি হয়েছে?

সিনেমা হলটা যার তার মালিককে কারা যেন তুলে নিয়ে গেছে।

কখন!

শ্যামের কাছ থেক ছেলেটা যখন তোকে ব্যাগ দিতে এসেছিল তার কিছুক্ষণ পর।

কোথা থেকে?

চকে গেছিল, সেখান থেকে।

কে খবর দিল?

চক থেকে কেউ এসে খবর দিয়েছে।

তাতে তোর কি?

সঙ্গে আরও দু-জন ছিল। বেধড়ক মেরেছে। ওরা সবাই হাসপাতালে ভর্তি।

এটা খুব বাজে ব্যপার।

ওরা তোকে সন্দেহ করেছে।

কারণ!

আজ সাতবছর ওদের কেউ ছুঁতে পারেনি। এই প্রথম এই তল্লাটে এইরকম ঘটনা ঘটল। অনাদির দয়ায় কম বেশি সবাই তোর প্রোফাইল জেনে ফেলেছে।

তাতে তুই টেনশনে ভুগছিস কেন?

হয়তো রাতের দিকে একটা ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারে।

তুই নিশ্চিন্তে থাক সেরকম কিছু ঘটবে না। তাছাড়া থানার বড়বাবু ওরকম পেন্নাম-টেন্নাম করে গেল। বাড়িতে পুলিশ পোস্টিং আছে। গ্রামের মানুষের কি ভয়-ডর নেই।

ঝামেলাটা কালকের পর হলে বুঝে নিতাম। আমি মীরচাচাকে ব্যাপারটা জানিয়েছি।

কেন জানাতে গেলি। খামোকা একটা টেনশন।

অনাদি খ্যাপা কুত্তার মতো হয়ে গেছে।

এখবর তোকে কে দিল?

তোর পাশে থেকে আমিও একটা টিম করেছি। তারা খবরা খবর দিচ্ছে।

খুব ভালো। তবে কি জানিস ও নিজের জালে নিজে জড়িয়ে পড়েছে। বাঁচবার শেষ চেষ্টা করবে। যা দেখছিস যা শুনছিস এগুলো গিমিক।

অনাদি আমাকে থ্রেট করেছে।

কি বলেছে বল!

আমি সব কথা তখন বলিনি।

আর কি বলেছে?

তোকে কাল কাজ শেষ হয়ে যাবার পর এ্যারেস্ট করবে।

কি কারণে!

তুই এখানে একটা দাঙ্গা বাধাতে চাইছিস হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে। তাই রাতে মুসলমানদের সঙ্গে বৈঠক করেছিস। সাক্ষী থানার ওসি।

আমি কে? কি আমার পরিচয়?

তোকে কেউ হিন্দু বলে মনে করে না। আড়ালে আবডালে অনেকে অনেক কিছু বলে। গ্রামের মানসিকতা বুঝিস তো।

ছাড় তো তুই, যারা বলে তারা হিজরে।

হিজরে গুলোকে নিয়েই তো অনাদি নাচছে।

চল, বেশি টেনশন করিস না।

টেনশন আমি সাধে করছি না।

কোথায় কি হচ্ছে মাথায় রাখিস না। আমি এসেগেছি। তোর ভাবনা কি। তুই তোর কাজ করে যা। বাকিটা আমি বুঝে নেব।

তোকে যদি এ্যারেস্ট করে।

করলে করবে। আমি কি করবো। আমি কি সরকার চালাই।

এইভাবে সকলকে ও হ্যারাস করেছে।

করতে দে, আর কতো দিন করবে।

আমি কিন্তু এবার ছাড়বো না।

পাগলামো করিস না। তুই আমার একটা উপকার কর।

বল।

তুই বলছিলি ওর পার্টির লোকেরা অনেক বাড়ি ওই সময় লুঠপাট করেছিল।

করেছিল তো। এই দিন পনেরো আগেও মানিকড়াতে লুট করেছে।

কাদের কাদের বাড়ি আমাকে একটা লিস্ট দিতে পারবি। কিংবা তাদের একটু খবর দিতে পারবি।

রাতে সব এসেছিল। অনিমেষদার সঙ্গে কথা বলে গেছে।

অনিমেষদা কি বললো?

এককথা, দেখছি কি করা যায়। ক্ষমতায় থকলে কিছু করা যেত।

ঠিক আছে চল, এখন কালকের কথা ভাব। চুলকাটার ব্যাপারে কাকে বলেছিস?

আশ্বিনী জ্যেঠুর ছেলে আসবে বলেছে।

কখন আসবে?

সকাল সকাল আসবে।

আর কাজের ব্যাপারে?

পঞ্চানন তর্কতীর্থ আসবেন।

তিনি আবার কে!

আমাদের স্কুলের নতুন পণ্ডিত মশাই। এখানে বেশ ভালো কাজকর্ম করছেন।

আমাকে চেনে?

নাম শুনেছে দেখবে কি করে।

ভালো করেছিস। কাকার শ্রাদ্ধ কে করেছিলেন?

উনিই করেছিলেন।

শ্রাদ্ধ করল কে?

নীপা। ওইই মুখাগ্নি করেছিল। তখন অনাদি অনেক হেল্প করেছিল। তারপর মন্ত্রী হওয়ার পরই কেমন যেন হয়ে গেল।

থাক ও সব কথা, তুই শুবি না?

শোবো, সব গুছিয়ে দিই।

পুলিশগুলোকে খাইয়েছিস?

হ্যাঁ।

কি করছে?

তিনজন ঘুমচ্ছে দুজন জেগে বসে আছে।

কোথায়?

রান্নাশালে।

সত্যি সারারাত রান্না হবে!

আনাজপাতি সব কেটে রাখছে। এগারোটা থেকে ব্যাচ শুরু করতে না পারলে চারটের মধ্যে শেষ হবে না। তখন আবার সন্ধ্যে হয়ে যাবে।

চিকনা যেখানে রান্নাহচ্ছে সেখানে চলে গেল, আমি বারান্দা দিয়ে ভেতরে এলাম। বটার দরজা ভেজানো, নক করলাম। বটা মুখ বার করলো।

গুডনাইট।

ভেতরে আসবি না?

এখন থাক ঘুমিয়ে পর।

কনিষ্ক আছে।

একবার গেটের মুখে দাঁড়ালাম। দুজনেই বসে। মিলি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

মেয়ে কোথায়?

ঘুমচ্ছে।

একা?

না।

তাহলে?

সুরো আছে।

এক ঘরে….! হাসলাম। কনিষ্ক শোবে কোথায়?

চিকনাদা ও বাইরের খাটে।

বটা টিনাকে নিয়ে একা?

কেন কাঠি না করলে হচ্ছে না। বটা খিঁচিয়ে উঠলো।

কনিষ্ক হাসছে।

টিনা আমার ঘরে কজন?

তিন বৌ নিয়ে শুবি। আমাদের কি সে কপাল আছে। বটা বললো।

আমি তোরটা নিয়ে আছি, তুই তিনটে নিয়ে শো।

অনিদা। টিনা চেঁচিয়ে উঠলো।

কপালে সহ্য হবে না। বটা স্বগোতক্তির সুরে বললো।

তোমার মেয়ে কোথায় টিনা?

সব বারান্দায়, অনিসাদের সঙ্গে।

কনিষ্ক।

বল।

অবতারদের টিকি পচ্ছি না।

সব গোডাউনে, খাটিয়া পেতে লাট খেয়েছে।

ওরা দিব্যি আছে। মিলি বললো।

কম লোক, প্রায় একশোর ওপর। কনিষ্ক বললো।

না যাই, শুয়ে পর।

লাস্টেরটা হাইড দিয়েছিস। একটা ঝাঁকুনির দরকার ছিল। এবার দেখবি কাজ হবে।

কনিষ্কর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

গুডনাইট।

ওপরে উঠে এলাম। বারান্দায় একবার উঁকি মারলাম। দেখলাম ঢালাও বিছানা হয়েছে। সবাই শুয়ে আছে। আমার মেয়ে, টিনার মেয়ে, নীপার মেয়ে, আরও দু-তিনজনকে দেখলাম বারান্দার একপাশে, ওপাশে সুন্দর, বিতান, বরুনদা, পিকু, শুভ, অনন্য। সব অঘোরে ঘুমচ্ছে।

ঘরের সামনে এলাম, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। নক করলাম।

কে?

চুপ করে রইলাম।

অপেক্ষা করো। মিত্রার গলা।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।

দরজা খুললো। সবার শরীরে রাতের পোশাক। তনু ঢলঢলে পাজামা আর হাফ পাঞ্জাবীর মতো পরেছে। ইসি, মিত্রা ম্যাক্সি পরেছে।

একবার সাড়া দিতে পারতিস। মিত্রা বললো।

তিনজনের দিকে তাকালাম। তনু হাসছে।

আর তাকাতে হবে না। শোয়ার জায়গা পেলাম না। আমি সোফায় শুয়ে পরবো। তনু বললো।

আমি মিটসেফের ওপর মোবাইলটা রাখলাম। জলের বোতলটা নিয়ে একটু জল খেলাম।

মিত্রা।

বল।

এই আলমাড়ির চাবিটা কোথায়?

নীপার কাছে।

আমি সোফাতে বসলাম।

তোদের তিনজনের খাটে হয়ে যাবে। না হলে একজন সোফায় শুয়ে পর। আমি বারান্দায় মেয়ের পাশে শুয়ে পরছি।

কেন লজ্জা করছে। ইসি বললো।

একটুও না।

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে, চোখে হাসির কাজল।

তনু এসে পাশে বসলো।

তিনজনে খুব মস্তিতে আছিস মনে হচ্ছে।

মস্তিতে না থাকার কোনও কারণ দেখছি না তো। মিত্রা বললো।

আমি একটা বিরাট বড়ো হাই তুললাম।

ঘুমলে চোখ গেলে দেব। মিত্রা চিবিয়ে চিবিয়ে বললো।

কাল সারারাত ঠেসে ঘুম মেরেছিস।

কেন তুই আসার সময় ঘুমোসনি।

মাত্র একঘণ্টা।

একটু আগে যে দু-ঘণ্টা ঘুমলি সেটা কে বলবে।

ইসি তোকে বেশ কচি কচি লাগছে।

আটচল্লিশ পেরিয়ে উনপঞ্চাশে পরলাম। তোর বরুনদা ছুঁয়েও দেখে না।

আমি দেখবো।

কেন তোর নেই?

আমি এখনও কুমার। আমার কোনও বৌ নেই।

মিত্রা এসে আমার আর একপাশে বসলো। ইসি খাটে বসে হাসছে।

গায়ের থেকে কাপরটা খোলতো।

কেন!

তুই আসল না নকল একটু দেখি।

তনু হাসছে।

কালকে সারাদিন সারারাত গেল, আজ সারাদিন গেল হঠাৎ এই কানারাতে তোর মনে পড়লো?

তোকে একা পাই নি—

এখন কি তুই আমাকে একা পেয়েছিস?

হ্যাঁ।

ইসি আছে, তনু আছে।

থাক।

ঠিক আছে মেনে নিলাম, এবার বল তুই আমার শরীরের কি এমন বিশেষ একটা মার্কিং মনে রেখেছিস?

তোর বগলে একটা জরুল আছে।

কোন দিকে, ডানদিকে না বাঁ দিকে?

মিত্রা চোখ বন্ধ করলো। তারপর ঝট করে উঠে খাটে চলে গেল। একবার শুয়ে পরলো। চোখ বন্ধ করলো। উঠে বসেই বললো।

ডানদিকে।

হাসলাম।

তোল।

কি তুলবো।

তোর হাতটা তোল।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি।

তনু ওর হাতটা তোলো তো।

তনু কেন তুই আয়।

মিত্রা নিচে নেমে এলো। পাশে এসে বসলো। নিজে নিজেই হাতটা তুলে দেখলো। আমি বাধা দিলাম না। তারপর আমার বুকে কান দিল।

হার্টটা কোনদিকে আছে বোঝার চেষ্টা করছিস।

মিত্রা আমার চোখে চোখ রাখলো। ঠোঁটটা চিমটে ধরে বললো।

দেবো না এমন। বুঝতে পারবি।

ইসির দিকে তাকা। চোখ দুটো দেখেছিস, ভাবছে সত্যি সত্যি এটা অনি তো, না নকল অনির সঙ্গে রাত কাটাতে হবে।

মিত্রা কাঁধে মাথা রেখেছে।

তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো সত্যি কথা বলবি।

জানলে বলবো।

তোর এ্যাক্সিডেন্টের সময় তাপস তোর সঙ্গে ছিল। তারপর সুস্থ হয়ে আমাদের অফিসের গাড়ির ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব নিল। হঠাৎ একদিন সব ছেড়ে দিয়ে কোথায় হারিয়ে গেল খুঁজে পেলাম না। ও কোথায় আছে বলতে পারবি?

বেঁচে আছে। আজ কালের মধ্যে চলে আসবে।

ঘটনাটা কি তোর ক্রিয়েটেড ছিল।

এখন মনে হচ্ছে। তখন মনে হয়নি কেন?

আমি বিশ্বাস করিনি। আর সবাই বিশ্বাস করেছিল।

এখন থাক এসব কথা, বলতে ভালো লাগছে না।

তোর ছেলেমেয়ে সব জেনেছে।

আমি যতটুকু জানার সুযোগ দিয়েছি, ততটুকু জেনেছে।

তুই কি করে বুঝলি?

ওটা তনু জানে তনুর কাছ থেকে জেনে নিস।

আমার ব্যাপারটা আমি দিদিভাইকে বলেছি।

ওটা সম্পূর্ণ তোর, ওই ব্যাপর নিয়ে আমি কোনওদিন মুখ খুলবো না।

গতকাল সকালবেলা তুই ছেলেকে ওইভাবে বললি যে?

ও কিছুটা জেনেছে, বুড়ীমাসির কাছে ও যায়।

তিন জনেই আমার দিকে তাকিয়ে।

তুই কি অন্তর্যামী? মিত্রা বললো।

না। লোকে খবর দেয়। ছেলে বুড়ীমাসির কাছ থেকে সব শোনার পর ওর চলাফেরা বদলে যায়। এমন কি ডা. ব্যানার্জীর বাড়ি পর্যন্ত ও ধাওয়া করেছিল।

মিত্রা মাথা নীচু করলো।

আর কি জানতে চাস বল।

আর একটা কথা তোকে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করছে। জানি তুই বলবি না। তবু মনের ইচ্ছাটা জানাচ্ছি। ইচ্ছে হলে বলিস।

বল।

তাহলে ওই বডিটা কার ছিল।

এখনই জানতে হবে?

না তুই যখন মনে করবি জানাবি।

একটুক্ষণ চুপ করে রইলো।

তোকে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করে।

সব কথা তোকে বলবো। এটুকু মাথায় রাখবি এখন তুই সেফ। তোকে ছোঁয়ার মতো যার ক্ষমতা ছিল, তাকে আমি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।

অনিমেষদাকে তুই ওইভাবে বললি, বৌদির মন খারাপ হয়ে গেল।

আমি বলিনি। তোরা সবাই ছিলি সব শুনেছিস, তাছাড়া যা সত্যি তাই বললাম।

তার মানে!

ওই কথার অর্থ কি তাই তো? বোঝার চেষ্টা কর। যে বোঝার সে ঠিক বুঝেছে।

আমাদের ধোঁয়াশাটা কাটা।

ফিজিক্যালি নয়। রাজনীতিগত ভাবে তার জীবন শেষ হয়ে যাবে।

তনু, মিত্রা দুজনেই জড়িয়ে ধরলো। ইসির দিকে তাকালাম।

তুই বাদ রইলি কেন সামনেটা খালি আছে। ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যাবে।

ইসি ঘুসি পাকাল।

তনু, মিত্রার হাত থেকে মুক্তি পেলাম। সোফা থেকে টেবিলে এসে ব্যাগ থেকে নিউজপ্রিন্টের প্যাড আর পেন বার করলাম।

তুই কি লিখতে বসবি নাকি? মিত্রা বললো।

লেখাটা শেষ করি, না হলে দাদা মন খারাপ করবে।

তোমার দম আছে। তনু বললো।

দম ঠিক নয়, তবে ওই আর কি। তোমরা লাইট অফ করে দাও, আমি একটু নীচ থেকে আসি।

মিত্রা হেলে শুয়েছিল। তড়াক করে উঠে বসলো। চোখ মুখ কুঁচকে বলে উঠলো, কোথায় যাবি?

কোথাও না, একটা সিগারেট খাব।

এখানে খা।

আমার কাছে নেই, চিকনা কিংবা কনিষ্কর থেকে নিই।

মিত্রা মুচকি হাসলো।

আমি দরজাটা খুলে বাইরের বারান্দায় এলাম। নীচে নীচুগলায় কথাবলার আওয়াজ ভেসে আসছে। মনেহচ্ছে মীরচাচা আর চিকনার গলা। নীচে নেমে এসে দেখলাম, চিকনার খাটে কনিষ্ক ঘুমচ্ছে।

পেছনের দরজাটা সাবধানে খুলে একটু ফাঁক করতেই দেখলাম, বাঁশঝাড়ে কেউ যেন বসে আছে। এই অন্ধকারে বিড়ির আগুন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। তারমানে বাড়ির চারদিকে পাহাড়াদার নিযুক্ত করা রয়েছে।

চিকনা, মীরচাচার গলাটা এখন বেশ স্পষ্ট।

না না মোর মনে হয়ঠে, কাজটা অনি করাইছে। মীরচাচার গলা।

তাহলে আমি একবার টের পেতাম।

তুই কি সব টের পাইছু। ও কইলে পাইছু।

তা ঠিক। তবে কি চাচা, ছেলেগুলোর যা নাম ধাম জানলাম, তারা কেউ এই এলাকার নয়।

এলাকার হতি হবে তার কি মানে আছে।

মণ্ডলের জামাই ফিরে এসেছে?

হ ফিরে আসছে, শুনলি ভুল বকতিছে, বনাইয়ের সেই গুণীনকে লেই আসতি গ্যাছে।

মোবাইলের আওয়াজ পেলাম, পরপরই চিকনর গলা।

বলো গুরুমা….তাই….দাঁড়াও দেখি…..না না নীচে নামে নি। পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়েছে কিনা দেখি….সেটি হবার নয় চারদিকে লোক রয়েছে….আমার কাছে ঠিক খবর চলে আসবে। রাখো রাখো….ঠিক আছে।

কি হলো! মীরচাচার গলা।

অনি নাকি নীচে নেমেছে।

বড়ো মুস্কিল….।

ও যে কতো বড়ো নম্বরি তুমি জানো না।

আমি পায়ে পায়ে খিড়কি দরজাটা আলগোছে খুলতেই চিকনার সঙ্গে ধাক্কা খেলাম। দেখলাম মীরচাচা নেই।

কোথায় বেরচ্ছিস!

তোর কাছে যাচ্ছিলাম।

কেন?

একটা বিড়ি দে। বুদ্ধির গোড়ায় একটু ধোঁয়া দিয়ে লিখতে বসবো।

চিকনা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।

তাকিয়ে রইলি কেন?

তোকে দেখছি। বিড়ি নেই, সিগারেট খা।

তাই দে।

চিকনা পকেট থেকে সিগারেট বার করে আমার হাতে দিল।

তোর রান্নাঘর চালু না সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে।

না ওরা আছে।

সিগারেট খেতে খেতে ওদিকে যাওয়া যাবে।

চিকনা মুচকি হাসলো।

কথা বলতে বলতে চিকনাকে সিগারেটের প্যাকেট ফেরত দিয়ে সিগারেট ধরালাম।

যাবি।

চল।

চিকনা সামনের দিকে হাঁটতে আরম্ভ করলো। আমি ওর পেছনে।

ঘুম আসছে না।

না। লেখাটা রাতে শেষ করে দাদাকে দিয়ে দেব।

এখন লিখতে বসবি?

হ্যাঁ।

রান্না যেখানে হচ্ছে সেখানে এলাম। চিকনার চোখ বনবন করে ঘুরছে বেশ বুঝতে পারছি, মজাও লাগছে। মীরচাচাকে ধারেপাশে দেখতে পেলাম না। চিকনা নিজে একটা সিগারেট বার করে ধরাল।

লাস্ট কোনও আপডেট পেলি?

এখনও পাই নি।

পুলিশ দুটোকে দেখতে পাচ্ছি না?

এই তো গিয়ে একটু শুলো।

কোনও অসুবিধে নেই?

চিকনা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।

হাসছিস কেন?

তোকে দেখছি।

কেন, আমি কি মেয়েছেলে?

সিগারেট খেতে তুই নিচে নামিসনি।

বিশ্বাস কর।

ওটা গুরুমাকে বোঝাস।

ঠিক আছে, আমি ওপরে চলে যাচ্ছি। তুই কখন শুবি?

আরও আধঘণ্টা।

দাঁড়ালাম না। চলে এলাম। বুঝলাম চিকনা আমাকে ভালো করে মেপে যাচ্ছে।

পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকেই কয়েকটা ম্যাসেজ করলাম। তারপর ওপরে উঠে এলাম। দেখলাম তিনজনেই অঘোরে ঘুমচ্ছে। নিউজপ্রিন্টের প্যাডটা টেনে নিয়ে লিখতে বসলাম।

চোখ খুলতে কিছুতেই ইচ্ছে করছে না। তবু বৌদির ধাক্কার চোটে চোখ খুললাম। জানলার আলো সোফাতে এসে পরেছে। বুঝলাম যথেষ্ট বেলা হয়েছে।

ওঠ। কাজে বসতে হবে।

উঠে বসলাম। বৌদি পাশে বসলো। গলাটা জড়িয়ে ধরলাম। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে মেরে গেছে। মনে হচ্ছে রাতে ঘুমোয়নি। খাটে ছোটোমা, বড়োমা। মেঝেতে একটা মাদুরে মিলি, সুরো, টিনা বসে। মিত্রাদের দেখতে পেলাম না। বুঝলাম আড্ডা চলছিল।

কখন শুয়েছিস?

ঘড়ি দেখিনি। লেখাটা শেষ করেই শুয়ে পরলাম।

ছোটোমা মুচকি হাসলো। বড়োমার চোখ হাসছে।

হাসছো কেন?

এমনি।

তুমি নাকি আমার ওপর রাগ করেছো? বৌদির মুখের দিকে তাকালাম।

করেছিলাম।

কেন?

না বুঝে।

এখন?

তোর দাদার মুখ থেকে সব শোনার পর, তোর দাদাকে মুখ করলাম।

কেন করলে, তুমি দাদার চাপটা বোঝ না? তুমি তো মিত্রা নও।

বৌদি আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

তোমাকে কোনওদিন আমি কোনও কথা গোপন করিনি। হয়তো বড়োমা, ছোটোমাকে অনেকদিন পর সে কথা বলেছি। কিন্তু তোমাকে গিয়ে প্রথমে বলে এসেছি।

আমার ভুল হয়ে গেছে। গলাটা ভাড়ি হয়ে এলো।

তোমার ভুল হয়নি। তোমার আত্মাভিমান তোমাকে কাজটা করতে বাধ্য করিয়েছে।

বৌদি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, চোখ ছল ছল।

আমি যদি তোমার গর্ভে আশ্রয় পেতাম, আর ঠিক এইভাবে যদি বলতাম, তুমি কি বলতে।

বৌদি আমার মুখটা চেপে ধরলো। কাঁধে মুখ গুঁজে দিল। সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। বৌদির হাতটা আমার মুখের থেকে সরে গেল। স্খলিত হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। চোখ বন্ধ। চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।

জানো বৌদি তোমাকে একটা গল্প বলি। এটা আমার শোনা কথা। আমার এক বৃদ্ধ লেখক বন্ধু কথায় কথায় গল্পের ছলে আমাকে একদিন বলেছিল। এ ও বলেছিল পারলে নিজের জীবনে ইমপ্লিমেন্ট করিস। দেখবি কাজ হবে।

সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজকে তাঁর ঘনিষ্ঠরা কিঙ্করদা বলে ডাকতো। অনেকে আবার পাগল শিল্পী বলেও ডাকতো।

দেখলাম মেয়ে, মিত্রা, তনু, ইসিরা সবাই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকলো। বৌদির থমথমে মুখ, ভেঁজা ভেঁজা চোখের পাতার দিকে তাকিয়ে ওদের মুখটাও কেমন যেন শুকনো হয়ে গেলো। কারুর মুখে কোনও কথা নেই। সবাই একবার করে আমার মুখের দিকে তাকায় একবার বৌদির মুখের দিকে।

তা বুঝলে বৌদি। কিঙ্করদা একটু খ্যাপাটে ধরণের মানুষ ছিলেন। শোনা কথা রবীন্দ্রনাথ নাকি ওনাকে একটা অজ গ্রাম থেকে ধরে এনেছিলেন, মাটির পুতুল খুব ভালো গড়তে পারে বলে।

একবার ছাত্রদের স্কাল্পচারের পরীক্ষা হচ্ছে। যে যার মডেল বানাচ্ছে। পরীক্ষা একেবারে শেষের দিকে। কিঙ্করদা ঢুকলেন। পরীক্ষক ঘুরে ঘুরে দেখছেন। একটি ছাত্র ঘোড়া বানিয়েছে।

কিঙ্করদা ঘুরতে ঘুরতে সেখানে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ এক দৃষ্টে ঘোড়াটাকে দেখার পর। কি খেয়াল হলো, ধ্যুস এটা একটা ঘোড়া হয়েছে, দিলেন ঘোড়ার পেছনে এক ধাক্কা।

কাঁচা মাটির পুতুল সে গেলো বেঁকে। ছাত্রটি কান্নায় ভেঙে পরলো। পাগল স্যার এ কি করলো। পরীক্ষার শেষ মুহূর্ত, এতো সময় নেই আবার নতুন করে সে বানাতে পারে।

ছাত্রটির কান্না আর থামে না।

আমি পরীক্ষায় ফেল করে যাব। আমার একবছর নষ্ট হয়ে গেল।

অন্যান্য ছাত্ররাও তাকে সাপোর্ট করলো। সে এক হই হই ব্যাপার তখন বিশ্বভারতীতে।

কিঙ্করদা কিন্তু ঘটনার পর আর এক মুহূর্ত ওখানে থাকেন নি।

গট গট করে হলের বাইরে চলেগেছেন।

ভবঘুরে মানুষ, একটা ঘড় থাকলেও তার নিজের থাকার ঠিকানা নেই। সব সময় নিজের কাজে ব্যস্ত। জানেনও না এই রকম একটা ঘটনা ঘটে গেছে।

কিঙ্করদা মাঝে মাঝে বিশ্বভারতীতে আসেন, ছাত্রদের কি ভাবে পুতুল গড়তে হয় দেখান, আবার চলে যান। নিজের খেয়ালে নিজে চলেন।

একচ্যুয়েলি কিঙ্করদাও ওদের মাস্টারমশাই ছিলেন। কিন্তু পাগল মাস্টার।

যথা সময়ে রেজাল্ট বেরোল। দেখা গেলো বাঁকা ঘোড়া বানানো ছেলে ফার্স্ট হয়েছে।

সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। নিস্তব্ধ ঘর। পিন পরলে শব্দ হবে।

বিশ্বাস করো কোনও ম্যানিপুলেট নয়। তখনকার দিনে এসব ছিলও না।

সত্যি ছেলেটি ফার্স্ট।

আবার বিশ্বভারতীতে হই হই পরে গেল। এ কি রকম হলো।

সেই ছাত্রটি ও অন্যান্য ছাত্ররা দল বেঁধে কিঙ্করদার কাছে এলো।

তখন তিনি তাঁর মাটির পুতুল তৈরি করার মধ্যে নিমগ্ন। ধ্যানমগ্ন ঋষি।

ওই সময় কে স্যারকে গিয়ে ব্যাপারটা বলবে ভেবে পাচ্ছে না।

সবাই চুপ চাপ দাঁড়িয়ে, নিজেদের মধ্যে ফিস ফাস করছে।

হঠাৎ কিঙ্করদার খেয়াল হলো একদল ছেলে-মেয়ে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে।

ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে সেই নির্মল হাসি। ভেতরে ডাকলেন।

সেই ছেলেটি প্রথমে এগিয়ে গেল। স্যারকে নীচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। দেখাদেখি সবাই প্রণাম করলো।

কিঙ্করদার মুখে শিশু সুলভ হাসি। কিরে সব পাশ করেছিস।

স্যার আমি ফার্স্ট হয়েছি।

সেকিরে! তাই! আমি ভাবলাম তুই ফেল করবি কেন, তোকে পাশ করিয়ে দিলাম, তুই একেবারে ফার্স্ট!

এবার সবাই চেপে ধরলো, স্যার ওর ভাঙা ঘোড়া কি করে ফার্স্ট হলো।

কিঙ্করদার মুখে আবার সেই শিশু সুলভ অনাবিল হাসি।

তোদের চোখটা এখনও তৈরি হয়নি, বুঝলি। তোরা না দেখা জিনিষ গল্প শুনে শুনে তার একটা অবয়ব মনে মনে তৈরি করে নিস। তারপর তাকে তোদের মতো গড়ে তুলিস। শিব গড়তে, বাঁদর হয়।

আমি তোদের পুতুলগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম।

ও ঘোড়াটা মন্দ তৈরি করেনি। বেশ ভালো তৈরি করেছিল, তা আমি দেখলাম ঘোড়াটা দৌড়চ্ছে ঠিক, কিন্তু তাতে কোনও গতি নেই, সে দিকে ওর কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই। গতি বিহনে ঘোড়াটা যে কোনও সময়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে পারে, দিলাম এক ধাক্কা, ওমনি ঘোড়াটা টাট্টু ঘোড়ার মতো দৌড়তে শুরু করলো।

বৌদি আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ের কাছে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো।

সারাটা ঘর নিস্তব্ধ।

তনু, ইসি, মিত্রা, মিলি, সুরো, কনিষ্করা আমার মুখের দিকে ফ্যল ফ্যাল করে চেয়ে রয়েছে। সবার চোখে-মুখে বিষ্ময়।

বড়োমা, ছোটোমার চোখ ছলছল করছে।

আমি স্থানুর মতো বসে।

বেশ কিছুক্ষণ পর আমি নিস্তব্ধতা ভাঙলাম।

এবার তোমায় কান্না থামাতে হবে। অনেকক্ষণ কাঁদবার সুযোগ দিয়েছি।

বৌদি আমার ঘাড় থেকে মুখ তুললো। কাপরের আঁচল দিয়ে চোখ মুছলো।

আমি বৌদির থুতনিটা ধরে মুখের কাছে তুলে ধরলাম, এবার একটু হাসো।

বৌদি চোখের পাতা নামিয়ে নিল।

সুরোর দিকে একবার তাকাও, আমাকে মনে মনে এ্যায়সা গালাগাল দিচ্ছে না, আমার চোদ্দগুষ্টি স্বর্গথেকে নিচে এসে লাইন করে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

সবারই ঠোঁট দুটো একটু নারাচারা করলো তবে সেটা মরা হাসি।

সুরো বসেছিল এগিয়ে এসে আমার পায়ের কাছে বসলো। কোলে মুখ গুঁজলো।

দেখ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শুধু লেকচার দিয়ে যাচ্ছি। এখনও বাথরুমে যাই নি।

সুরো এবার জড়িয়ে ধরলো।

অঘটন যদি ঘটে মা-মেয়ে দায়ী থাকবি।

এবার হাসিটায় কিছুটা স্বতঃস্ফূর্ততা দেখলাম।

সুরো আমার কোমরে আলতো করে চিমটি কাটল।

আমার শরীরের সব রোগ তোর শরীরে চলে যাবে।

অনেক চেষ্টা করছি, পাচ্ছি কই। একটুও যদি পেতাম নিজেকে ধন্য মনে করতাম।

আমি ওর গালটা ধরে একটু নেড়ে দিলাম।

আমাকে মিত্রাদি সব বলেছে।

রয়টার যখন বাড়িতে আছে নিউজ পাবিই। তাছাড়া পিটিআই তার দোসর, অন্যথা হয় কখনও।

দেখছো মিত্রাদি তোমাকে আমাকে কাল রাতে কি ভাবে বললো। তনু বললো।

ছারো ওর কথা, আমার বোঝা হয়ে গেছে, কাল রাতে আমাদের কিভাবে বলেছে, আর আজ কিভাবে বৌদিকে বললো, নিজের কানে শুনলে।

কি মিলিদি একেবারে থম মেরে গেলে। মিলির দিকে তাকালাম।

তোমার প্রচুর স্টক, একটু ধার দাও না।

দিতে পারি, ইন্টারেস্ট?

যা চাইবে।

কনিষ্ক যাবে কোথায়?

কনিষ্ক হাসছে।

নীপা দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। ঘরের আবহাওয়াটা একবার দেখল। ঠিক পরিচিত ঠেকল না।

ম্যাডাম একটু চা হবে নাকি। আমি বললাম।

নীপা সবার দিকে একবার তাকাল। ঠিক কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না।

ওরা সকলে চলে এসেছেন কাজে বসবে তো?

একটু চা হবে না।

দিচ্ছি।

দেখলে বড়োমা ওর কথা শুনলে, মুখ ধুয়েছে? মিত্রা বললো।

মুখ না ধুয়ে চা খেতে তেমার ভালো লাগে। সুরো তাকালো।

কি মধু তোকে কি করে বোঝাই।

আমার বোঝার দরকার নেই, আগে ওঠো।

উঠে দাঁড়ালাম। ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম।

খিড়কি দরজা দিয়ে সোজা চলে এলাম পুকুরপারে। বাঁশগাছের ছায়া পুকুরে হুমড়ি খেয়ে পরেছে। বাঁধের ওপর জমগাছটায় কালো হয়ে জাম হয়েছে। নিচে জাম পরে পরে মাটির রং বেগুনী। বাঁশঝাড়ের আড়ালে গিয়ে প্রকৃতির কোলে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিলাম। তারপর পেয়ারা গাছ থেকে একটা ডাল ছিঁড়ে চিবতে শুরু করলাম।

গ্রামের সকালটা সত্যি মন ভালো করে দেয়। ঝিরিঝিরি বাতাস, পাখীর ডাক, অপার নিস্তব্ধতা সব যেন মিলে মিশে একাকার। নদীর ধারে গিয়ে একটু বসলাম। নদীর ওপারে সিংয়ের বাড়ির খেতে আঁখ আর মাদুর কাঠির চাষ হয়েছে। আঁখগুলো বেশ বড়ো বড়ো আর মোটা। আট দশটা আঁখ নিয়ে এক একটা ঝাড় করে বেঁধে রাখা হয়েছে।

এখন মনে হয় গ্রামের ছেলেগুলো বেশ ভদ্র সভ্য হয়ে গেছে। আমাদের সময় হলে কবে বউনি করে দিতাম। মনে হলো আঁখ গাছগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকছে অনি আয়, অনি আয়। আর কিছুদিন পরেই আঁখ কাটার মরসুম চলে আসবে।

নিজের মনে নিজেই হাসলাম।

নদীর ওপারে বাঁশঝাড় গুলো বেশ ঘনো, আর লম্বায় প্রায় আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে। হাওয়ায় দুলছে। আমি এপারে বসে তার ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দ শুনতে পাচ্ছি। শাল গাছটা বিশাল লম্বা হয়েছে। বড়ো বড়ো শুকনো পাতা নদীর জলে পড়ে হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। এক সময়ে এই শালপাতায় নারকেল পাতার কাঠি দিয়ে নৌকো বানাতাম। তারপর পুকুরের জলে ভাসিয়ে ঢিল মারতাম। জলের ঢেউয়ে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যেতো। তারপর স্নান করতে এসে সাঁতরে তাকে নিয়ে চলে আসতাম। একটা পাটের দড়ি দিয়ে বেঁধে ঘাটের ধারে বেঁধে রাখতাম। জলপোকা গুলো মাঝে মাঝে নৌকোয় উঠে দোল খেতো। ভাড়ি ভালো লাগতো দেখতে।

অনি। তারস্বর চেঁচানিতে ফিরে তাকালাম।

দেখলাম পুকুরের ওধারে চিকনা দাঁড়িয়ে।

আমাকে দেখতে পেয়ে এপারে এলো।

কখন থেকে তোকে খুঁজছি।

এই তো ঘুম থেকে উঠলাম।

বড়োমা বললো।

তুই ওপরে গেছিলি?

হ্যাঁ।

ও বাড়ি থেকে সব চলে এসেছে?

হ্যাঁ।

তোর নাপিত আর পঞ্চানন পণ্ডিত।

চলে এসেছে, তুই রেডি হলেই কাজ শুরু করে দেবে। ওরা কেউ বসে নেই। গোছগাছ করছে।

উঠে দাঁড়ালাম।

চল তাহলে, মুখটা ধুয়ে একটু চা খেয়ে নিই।

খবর আছে।

কি?

কাল মণ্ডল বাড়ির জামাই মাঝরাতে ফিরে এসেছে। শুনলাম তারপর থেকে কারুর সঙ্গে কথা বলছে না। শুধু বলছে অনাদিবাবু আমার অনেক ক্ষতি করে দিল। আমি ওকে ছাড়বো না।

কোথা থেকে এসব খবার পাস বলতো।

নিজের চোখে দেখে এলাম, তাই বলছি।

ব্যাঙ্কের খবর বল।

সকাল থেকে ভিড় লেগে গেছে। টাকা জমা পরছে।

কালকের থেকে বেশি না কম।

বলতে পারবো না। বাসুকে ফোন করেছিলাম। ও শুধু এটুকু বললো।

তুই একটু চা নিয়ে আয়, আমি এখানে বসে খেয়ে নিই।

চিকনা চলে গেলো।

আমি পুকুর ঘাটে নামলাম ভালো করে মুখ ধুলাম চোখে মুখে জল দিলাম।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/TD3KNht
via BanglaChoti

Comments