কাজলদিঘী (৯৭ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

৯৭ নং কিস্তি
—————————

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সঞ্জুর ছেলেরা চারদিকে লাইট জ্বেলে দিয়েছে। বেশ লাগছে। চারদিক আলোয় আলো। বড়োমার দিকে তাকিয়ে হাতটা নেরে, অনাদির বাইকের পেছনে বসলাম। আমার ঠিক পেছনের বাইকে নেপলা, চিকনা, তার পেছনে সাগির, আবিদ, তার পেছনে বাসু, সঞ্জয়।

চারদিকে মিশকালো অন্ধকার। অন্ধকারের বুক চিড়ে বাইকের হেডলাইটের আলোটা আঁকাবাঁকা পথের ওপর আছাড় খেয়ে পরে লাফালাফি করছে। তীরবেগে এগিয়ে চলেছে চারটে বাইক। দু-চারটে রাতপোকা কানের লতিতে ধাক্কামেরে গরম করে দিচ্ছে। নেড়া মাথায় তীব্র হাওয়ার ধাক্কা, এক অনন্য অনুভূতি।

কবে সেই ছোটবেলায় উকুনের জালায় কাকা মাথা নেড়া করে দিত। একটু বড়ো হতে সেটা বন্ধ হয়ে গেল। এরপর কিনা মানার মিলিটারি ছাঁট। মাথার তালুতে সামান্য চুল।

আমরা ভূততলাকে ডাইনে রেখে, বাঁধে বাঁধে নদীর ধারে চলে এলাম। নদী পার হতে হবে। বাইক থেকে নামলাম। শুকনো নদীর ওপর দিয়ে ঠেলে ঠেলে বাইক পার করা হলো। চিকনা অনাদির পেছনে খানিকটা লাগলো।

যাক শালা মন্ত্রী তাহলে বাইক ঠেললো, চর্বি কিছুটা গললো।

অনাদি এই প্রথম মন্ত্রীত্বের খোলোস ছেড়ে বেড়িয়ে এলো। দু-চারটে গ্রাম্য গালাগাল দিলো চিকনাকে। আমি নীরব দর্শক, সঞ্জু, বাসু হাসছে।

শ্মশানকে বাঁয়ে রেখে, মোরাম রাস্তায় উঠলাম। একটু দাঁড়ালাম। মাথার ওপর আকাশ ভড়া তারার মেলা। কোথাও এতটুকু আলো নেই। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ঝিঁ ঝিঁ শব্দটা আরও বেশি তীব্র লাগছে মনে হচ্ছে। আজ মনে হয় অনেক রাতে চাঁদ উঠবে। জোনাকীরা আশপাশ দিয়ে উড়ে চলে যাচ্ছে।

বাসু একটা সিগারেট দে। অনাদি বললো।

বাসু প্যাকেট বার করলো।

পাঁচজনে সিগারেট ধরালাম। নেপলা, সাগির, আবিদ আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে।

প্রথমে কোথায় যাবি? অনাদির দিকে তাকালাম।

বীরকটা থেকে শুরু করি।

তাই কর। স্কুলের খলিফা?

সবার কাছেই নিয়ে যাচ্ছি।

ঠিক আছে চল। আর দেরি করবো না।

সামান্য কথা তবু চিকনার চোখেমুখে বিষ্ময়।

আবার যাত্রা শুরু। বীরকটায় মণ্ডল বাড়িতে আসতে সময় লাগলো মাত্র পাঁচ মিনিট। দূর থেকে দেখলাম ঘরে লাইট জ্বলছে। বাড়িটারও আকার খুব একটা ছোটো নয়। ভেতর থেকে বেশ চেঁচামিচির আওয়াজ ভেসে আসছে।

বাইকটা বাড়ির বাইরে ফাঁকা জায়গাটায় এসে দাঁড়াতেই চিকনা ছুটে কাছে এলো।

এটা তো সেই মণ্ডলের জামাইয়ের বাড়ি!

অনাদি, চিকনার দিকে তাকিয়ে।

হ্যাঁ। কোনও অসুবিধা আছে? আমি বললাম।

তোকে পেলে একেবারে খেয়ে ফেলবে। সকাল থেকে সব খেপচুয়াস হয়ে আছে।

ঠিক আছে, দেখি না।

চিকনার সাথে সামান্য কথা বলার ফাঁকেই পিলপিল করে গোটা কুড়ি লোক এসে আমাদের ঘিরে ধরলো। মুখে টর্চের আলো ফেললো।

এই তো শালা এসে গেছে। সাহস দেখছিস, আজই শালাকে মেরে দেব। উড়ে এসে দাদাগিরি। অনাদিদা তুমি কোনও কথা বলবে না।

অনাদি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। চোখের ভাষায় জয় করার তুলিরটান।

চেঁচা মিচি। হই হই। ধর শালাকে মার শালাকে।

নিমেষের মধ্যে দেখলাম ধুপ ধাপ আওয়াজ। দুটো ছেলে ছিটকে পড়ে গেলো পাঁচ হাত দূরে। কাটা ছাগলের মত ছটফট করছে।

একটা গনগনে গলার স্বর, এক পা এগোলে এখানেই ঠুকে দেব সবকটাকে। সঙ্গে মা-মাসি তুলে কাঁচা খিস্তির ফুলঝুড়ি।

পেছন ফিরে তাকালাম, তিনজনের হাতেই পিস্তল ঝলসে উঠেছে। যে দুটো মাটিতে পরে ছটফট করছে তাদের ওঠার শক্তি নেই। কুঁকড়ে-মুকড়ে মাটিতে পরে কাতরাচ্ছে। মোক্ষম জায়গায় ওষুধ দিয়ে দিয়েছে নেপলা।

যারা তেড়ে এসেছিল তারা সরে দাঁড়িয়েছে। দু-চারজন দৌড়ে পালাতে গেল।

ওরে মাইরে দিবে রে ভাগ ভাগ।

একপাও কেউ নরবি না, নরলেই মেরে দেব।

পেছন ঘুরে দেখলাম সাগিরের হতে একটা ছেলে তখনও খাবি খাচ্ছে।

আবিদদা তুই দাদার সঙ্গে থাক, বাইরেটা আমি সাগির বুঝে নিচ্ছি। নেপলা গড়গড় করে উঠলো।

দুজনে দুটোকে হিড় হিড় করে টানতে টানতে অন্ধকারে নিয়ে চলে গেল।

আমি নির্বিকার। চারদিক দেখছি। অনাদি আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।

নেপলার এই গলার স্বর চিকনার একেবারে অপরিচিত। এই অন্ধকার রাতে ঘরের ভেতর থেকে যে টুকু আলো ঠিকরে বাইরে এসে পরেছে, তাতে চিকনার মুখে বিস্ময়ের ছোঁয়া, ব্যপারটা ওর ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।

নিমেষের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে যাওয়ায় সবাই কিংকর্তব্যবিমূড়। অনাদির মুখ শুকনো।

চিকনা একবার আমার দিকে তাকায়, একবার নেপলার দিকে তাকায়।

বাসু, সঞ্জয় বাইকে ঠেসান দিয়ে গুম হয়ে দাঁড়িয়ে।

সাগির, নেপলা চারিদিকটা যেন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

লোকগুলো সব ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে এক জায়গায় বসে পরেছে।

এই অনাদিদা এখানে কার সঙ্গে কথা বলতে এসেছো, তাকে ডাকো। নেপলার বাজখাঁই গলা চারদিক গম গম করে উঠলো।

সাগির পকেট থেকে ফোন বার করলো। ডায়াল করলো।

রিং হচ্ছে, সবাই শুনছে।

বইল সাগির। খেলা শুরু কইরেছিস।

তুই কোথায় আছিস?

তুদের কাছা কাছি আছি চিন্তা করিস লাই। বেশি গড়বড়ি করলি আইজই সঅব কুটাকে জাঁততা গাড়ি দিবো। শুন—

বল।

মইনে রাখবি অনিদাকে কেউ যেন ছুঁতেক না পারে। তাইলে খুব খারাপ হয়ে যাবেক।

কথায় পাক্কা সাঁওতালী টান।

চারিদিকের হইচই স্তব্ধ হয়ে গেছে। শিবুর কথা সবাই শুনেছে। চিকনার চোখ গোল গোল।

বাসু, সঞ্জু আমার কাছে এগিয়ে এলো।

সাগির পকেটে মোবাইলটা রেখে অনাদির দিকে তাকালো, কাকে ডাকবে তারাতারি ডাকো। না হলে ভেতরে গিয়ে সবকটাকে গিড়িয়ে দেব।

অনাদি, সাগিরের দিকে তাকিয়ে। ভেবে পাচ্ছে না খানিকক্ষণ আগে পর্যন্ত এরা কতটা সাধারণ ছিল। হাসছিল ইয়ার্কি ফাজলামো মারছিল সবার সঙ্গে।

চিকনাদা।

নেপলার গলাটা খ্যাড় খ্যাড় করে উঠলো।

বল।

বাইকের ডিগ্গি থেকে এসএলআর-টা বার করে দাও।

চিকনা এগিয়ে গিয়ে ডিগ্গী খুলে বার করে আনলো। নেপলার হাতে দিল।

নেপলা ঠিক ঠাক করে নিয়ে দু-হাতে দুটো নিয়ে দাঁড়াল।

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের দেখে যাচ্ছি। আমি নেপলাকে বলেছিলাম তৈরি হয়ে নে, ও যে এতটা বেশি তৈরি হয়ে আসবে ভাবতেও পারিনি। নিজে থেকে শিবুকে ফোন করেছে। কথা বলেছে, এখানে ডেকে নিয়ে এসেছে।

তুই একটা দেশী নিয়ে মজা দেখাবি কইছিলু, ঢ্যামনা। দু-হাতে দুটা বন্ধুক লিছে দেখছু।

ভিড়ের ভেতর থেকে কে যেন চেঁচিয়ে উঠলো।

আমি কইছিলাম? নিতাইদা কাল দশহাজার টেকা দিয়ে লিয়ে আসছে। এউটাতেই নাকি তান্যে ভড়কি যাবে।

নেপলা বাজখাঁই গলায় চূড়ান্ত খিস্তি দিয় উঠলো। মা-মাসি কিছু বাদ রাখল না।

থামবি।

সঞ্জু মুখ চাপা দিয়েছে।

বাসু ইশারায় ওকে হাসতে বারণ করছে।

অনাদি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল।

মিনি মিনে গলায় বলে উঠলো, নিতাই বাইরে এসো।

অনাদির গলা দিয়ে যেন স্বর বেরচ্ছে না।

ভেতর থেকে কোনও শব্দ নেই।

এই অনাদিদা, ওকে বলে দাও পালাবার চেষ্টা করলে শিবু ওকে কুত্তার মতো মেরে দেবে। সাগির বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠলো।

অনাদি, সাগিরের দিকে তাকাল। চোখমুখ একবারে শুকিয়ে গেছে।

শুনলে ওর কথা।

নেপলার বাজখাঁই গলা আবার গঁ গঁ করে উঠলো।

আমি চুপ চাপ দাঁড়িয়ে, আমার পাশে আবিদ, চিকনা। চারিদিকে চোখ খেলা করে বেরাচ্ছে।

অনাদি আবার ডাকল।

এইবার মনে হয় নেপলার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো। ভিড়ের মধ্যে থেকে একটাকে ঘাড় ধরে টেনে আনলো। মাথায় রিভালোবার ঠেকিয়ে অকথ্য ভাষায় খিস্তি করলো, পেছনে সজোরে একলাথি মারল। ছিটকে পড়েগেল ছেলেটা।

যা ভেতর থেকে তোদের বাপকে ডেকে নিয়ে আয়।

আর করবো নি, মাফ করুণ।

নেপলা আবার মুখ খিস্তি করলো।

ছেলেটা তবু নড়লো না।

নেপলা ফায়ার করলো। আবার হই হই। অনাদি চমকে পেছনে তাকিয়েছে। ওই ভিড়ের মধ্যে বসে থাকা ছেলেগুলোর চোখ পাংশু।

আমি বুঝলাম ফল্স কিন্তু ছেলেটা ভয়ের চোটে ছিটকে পড়েগেল।

নেপলা ধরার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা বাবাগো মাগো করে চেঁচিয়ে বাড়ি মাত করে দিল।

অনাদি ভেতরে গেল। মিনিট খানেকের মধ্যেই একজনকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে এলো। সঙ্গে আরও পাঁচ-সাতজন।

ভদ্রলোক ছুটে এসে আমার পায়ে পড়ে গিয়ে মরা কান্না জুড়ে দিল।

আমি তখনও স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে।

অনাদির দিকে তাকালাম।

কোনটা তোর মণ্ডলের জামাই?

অনাদি মাথা নীচু করলো।

বলবি তো?

পালিয়ে গেছে।

মরে গেলে আমাকে কিছু বলতে পারবি না। আমার কাগজপত্র?

তার কাছে আছে।

নে গাড়িতে ওঠ স্টার্ট দে। নেক্সট কোথায় যাবি বলেছিলি সেখানে চল।

অনাদি তবু দাঁড়িয়ে রইলো।

এই অনাদিদা ফালতু কেন ঝামেলা করছো, এরা হয়তো দাদাকে সে ভাবে জানে না। তুমি জানো, তোমার পুলিস এখন তমার কথা শুনছে না, এটাও তুমি ভালো করে বুঝে গেছ। তাহলে ফালতু কেন ঝামেলা বাড়াচ্ছ, দাদা যা চাইছে দিয়ে দাও না।

আবিদ খুব নরম গলায় কথা বললো।

এই আবিদদা তোর কথায় চিঁড়ে ভিঁজবে না।

নেপলা তেড়েফুঁড়ে কাছে চলে এলো। আমার পায়ের কাছে বসে থাকা লোকটার মাথায় রিভালোবারের নল ঠেকালো।

এতক্ষণ যে আমার পায়ের সামনে বসে ঝুল পেড়ে কাঁদছিল, ঝট করে সে উঠে দাঁড়াল, দাঁড়াও বাবু আমি তাকে নিয়ে আসছি।

এটা কে এতক্ষণ কাঁদছিল। আমি অনাদির দিকে তাকালাম।

মণ্ডলের শ্বশুর।

তোর সেক্রেটারীর বাড়ি কতদূর।

উনি স্কুলের সেক্রেটারী। অনাদি একজনের দিকে আঙুল তুললো।

আমি বুকের ওপর হাত জড়ো করে নমস্কারের ভঙ্গিতে বললাম।

আমি অনি। এই গ্রামের ছেলে।

জানি বাবু, আপনার নাম শুনছি। একেবারে গদো গদো গলা।

এরা কারা।

স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির মেম্বার।

আপনি কোন পাড়ায় থাকেন?

আমি উনামাস্টারের বাড়ির পশ্চিম দিকে থাকি।

পশ্চিমদিকে তো একটাই বাড়ি ছিল চক্রবর্তীদের বাড়ি। দীননাথ চক্রবর্তী। দীনুকাকা।

দীনুকাকাদের সম্পত্তিটা উনি কিনেছেন। চিকনা বললো।

আমি চিকনার দিকে তাকালাম।

অতোবড়ো প্রপার্টি!

সে অনেক কথা তুই ছিলি না জানবি কি করে?

দীনুকাকার মেয়ে?

মারা গেছে।

কি হয়েছিল?

অনাদিকে জিজ্ঞাসা কর বলতে পারবে।

কিরে অনাদি?

পরে তোকে সব বলছি। কাঁপা কাঁপা গলা।

তারমানে!

অনাদি মাথা নীচু করে নিল।

আমি যা বলেছিলাম ওনাকে তা বলেছিস?

বলেছি।

কি বলেছে।

রাজি নন।

কেন?

দেখলাম গোটা দশেক কালো কাপরে ঢাকা মুখ অন্ধকারের বুক চিড়ে কাছে এগিয়ে এলো।

সবাই অবাক হয়ে দেখছে।

একজন এসে নীচু হয়ে পা ছুঁলো।

তুই চইলে যা অনিদা। তুর ভালোমানষী এখানে খাটবেক লাই, এই কয়বৎসরে এদের বহুত তেল হইছে, একটু গাইলে দিই, দেখবি সব গড় গড় কইরে বইলে দেবে।

সেই সাঁওতালী টানে বংলা।

আমি শিবুকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।

কেমন আছিস?

ভালো।

ওদিককার খবর সব ঠিক আছে?

হ্যাঁ।

শ্যাম আসবে বললো।

মোকে পঠাইছে। সেঠি তুর লোক গিছে।

ও।

সবকটার পেছনে আধুনিক রাইফেল সাঁটানো।

আমি ভিড়ের মধ্যে চারদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছি। ভয়ে সকলের মুখ শুকিয়ে গেছে। যারা সামনে দাঁড়িয়ে তারাও যে কাঁপছে না তা নয়।

তুর জন্যি মন্ত্রীটা বেঁইচে গেছে।

আমি শিবুর কাঁধে হাত রেখে হাসলাম।

এই কাল্লু।

একটা চিমড়ে মার্কা ছেলে কাছে এসে দাঁড়াল।

কাইল যেউটাকে ইখানে ছেইড়ে দিয়ে গেছলু, সেউটাকে ভিতর নু ধরি লি আয়। খুলিটা ফুটাই দিই।

ছেলেটা ঘুরে দাঁড়াবার আগেই, একজন বেশ গাঁট্টা গোঁট্টা লোক ছুটে এসে আমার সামনে দাঁড়াল। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ।

আগে জানলে কাইলি তোকে কাইটে কুঁচি কুঁচি করে সুবর্ণরেখার জলে ফেইলে দিতাম।

শিবু ছেলেটার দিকে তাকিয়ে গড় গড় করে উঠলো।

এটা মণ্ডলের জামাই? চিকনার দিকে তাকালাম।

চিকনা মাথা দোলাল।

তুই আগে দেখিস লাই। বড়ো নম্বরী হইছে। শিবু হাসছে।

অনাদির দিকে তাকালাম।

কোথা থেকে বেরোল?

বিশ্বাস কর।

আমার কাগজপত্র নিয়ে আয়।

আমার একটা সর্ত আছে।

সজোরে একটা ঘুসি আছড়ে পরলো নিতাইয়ের মুখে। ছিটকে পড়ে গেলো মাটিতে। ওঠার শক্তি নেই। নাকমুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোতে আরম্ভ করলো।

নেপলার হাতটা চেপে ধরলাম।

অনাদির দিকে তাকালাম।

এরা আমার পরিচয় জানে?

না।

জেইনে লিবে। অনিদা তুই চইলে যা। ওদের একটুক জাইনে দিই। শিবু বলে উঠলো।

আমাদেরও কিছু কথা ছিলো আপনার সঙ্গে। কর্কশ গলায় সেক্রেটারী বল উঠলো।

এই সেক্রেটার কম কুথা বইলবি, চককতীর মায়াঝিটার শরীলে আগুন লাইগা মারছিস, তোরেও অখন খড়গাদায় ঢুইকা আগুন লাগায়ে দিব।

শিবুর কথাটা কানে আসতেই, কেউ যেন আমার গালে ঠাস করে একটা চড় মারলো।

আমি শিবুর দিকে তাকালাম।

আমি ঠিক কথা বইলছিরে অনিদা, তুই চিকনাদারে জিগা।

চিকনার দিকে তাকালাম। চিকনা মাথা নীচু করে নিল।

সরির মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। দুধে আলতা গায়ের রং। আমাদের থেকে দু-ক্লাস নীচুতে পড়তো। তখন মনে হয় ক্লাস এইটে পরি। সবে মাত্র কৈশোর ছেড়ে যৌবনে পা রাখছি। পানপাতার মতো সরির মুখটায় টানা টানা দীঘল চোখ।

সেই সময় সরিকে দেখার জন্য মনে একটা নেশা ধরেছিল।

উনা মাস্টারের কাছে যখন ভোরবেলা পড়তে যেতাম তখন সরি সাজী ভরে গাছ থেকে পুজোর ফুল তুলতো। সরির ভালো নাম সরস্বতী। আমরা সরি বলে ডাকতাম।

চোখদুটো হঠাৎ কেমন জ্বালা জ্বালা করে উঠলো।

স্যারের বাড়িতে এসে আমার প্রথম কাজ ছিল বাইরের বারান্দাটায় সামান্য জল দিয়ে ঝাঁট দেওয়া তারপর মাদুর পাতা। কখনও আমি করতাম, না হলে বেশিরভাগ দিন ভানুই করতো, প্রায় দিনই আমি দুধ আনতে যেতাম দীনুকাকার বাড়ি।

দীনুকাকাদের অনেকগুলো গরু ছিল। আধসেরী গ্লাসে একগ্লাস দুধ। দুধ আনলে স্যার চা খেতেন। তারপর আমাদের নিয়ে পড়াতে বসতেন। এটা আমার নিত্য দিনের কাজ।

সরি কখনও ফ্রক পরে ফুল তুলতো না হলে কাকীমার একটা শাড়িকে কোনওপ্রকারে পেঁচিয়ে পরে ফুল তুলতো। আনাড়ি হাতে কাপর পরাটা ঠিক মতো হতো না। ফলে আদল-গা ফর্সা শরীরটা প্রায়ই দেখা যেত। তখন সবেমাত্র সরির শরীরে বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে। এলোচুল পিঠে লুটোপুটি খাচ্ছে। আমারও তখন কাঁচা বয়স। সরিকে দেখতে বেশ লাগতো। ভানু প্রায়ই আমার পেছনে লাগতো, আজ তুই ঝাঁট দে, আমি দুধ আনতে যাই। আমি ভানুর ওপর খেপে যেতাম। ভানু খিক খিক করে হাসতো।

একটু দেখব, তাতেও ভানু ভাগ বসাবে।

আমার তাকানোতে মনে হয় কোনও যাদু ছিলো, সরিও আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসতো। আমিও হাসতাম। ফিরে আসার পথে বারে বারে পেছন ফিরে তাকাতাম, দেখতাম সরি ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে।

কোনও কোনও দিন ভাবতাম আজ সরির দিকে তাকাবো না। মাথা নীচু করে গট গট করে চলে আসবো। দূর কে কার কথা শোনে। অটোমেটিক ঠিক সরির দিকে চোখ চলে যেত।

সেই সরি আগুনে পুরে ঝলসে মরে গেছে!

চোখ ফেটে জল আসতে চাইছে নিজেকে সামলে নিলাম।

অনাদির দিকে তাকালাম।

একে তুই স্কুলের সেক্রেটারী বানিয়েছিস? আর লোক পেলি না। গলার স্বর বদলে গেছে।

এরা মিছে কথা বলছে।

সেক্রেটারী ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম।

আমার তাকানতে মনে হয় আবিদ কোনও অর্থ খুঁজে পেল।

সজোরে সেক্রেটারী ভদ্রলোকের কলার চেপে ধরে রিভালোবারের নলটা মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, দেব না এখুনি দানা ভরে কথা বন্ধ হয়ে যাবে।

ও বাপ তোমরা এরকম করো কেন, আমরা কি দোষ করছি, ওই অনাদিটা যতো লষ্টের গোড়া। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা লিয়ে এসব নিতাইকে দিয়ে কইরেছে।

একজন বুড়ী লাঠি ঠুকতে ঠুকতে ঘরের ভেতর থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসছে, পরনের কাপর মাটিতে লুটচ্ছে। পেছনে আরও তিন চার জন মেয়ে।

ও ঠাকুমা তুমি যেওনি ওন্যে ডাকাত, গুলি করে মারি দিবে। পেছন থেকে আর এক মহিলার ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর।

আমি এগিয়ে গেলাম। বুড়ীর হাতটা চপে ধরলাম।

মিশকালো গায়ের রং। তখন আরও চক চকে ছিল, এখন বয়সের ভাড়ে ফিকে হয়েছে, চামড়ায় ফুটিফাটার চিহ্ন স্পষ্ট, স্যারের কাছ থেকে পড়ে আসার পথে কাঞ্চনিমাসির খেত থেকে আমরা কড়াই শুঁটি চুড়ি করে খেতাম। কলাই শাক তুলে নিয়ে চলে আসতাম। দুমুড়ো গালাগাল দিতো। তারপর যখন জানতে পারতো অধীপের ছেলে অনি নিয়ে গেছে, তখন কাকার কাছে এসে পা জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না। আমার মুখে কেন পক্ষাঘাত হয় না। বড়কত্তা তুমি আমাকে অভিশাপ দাও। দুটো কলাই শাক তুলেছে বলে আমি ছেলেটাকে এরকম গাল দিলাম।

সেই কাঞ্চনিমাসি কম বয়সে বিধবা হয়েছিল।

শশী মেশো মাছ ধরতে গিয়ে সাপ কাঠিতে মারা গেছিল, মনাকাকা তখন দৌড়োদৌড়ি করে সব কিছু সামলে ছিল। হ্যাঁ ঠিক ধরেছি, এ কাঞ্চন মাসি না হয়ে যায় না।

মনাকাকার কাছে প্রত্যেক দিন সকালে নদীর থেকে গলদা চিংড়ি ধরে বিক্রী করতে আসতো। সেই সময় কাঞ্চনিমাসিকে নিয়ে অনেক মুখরোচক রটনা রটে ছিল। কাকী কিছুতেই মাসিকে বারান্দায় উঠতে দিতো না।

কে বাবা?

আমার মুখের দিকে তাকাল।

চোখদুটো কেমন ঘোলাটে। চোখের মনি দুটো কেমন সাদাটে মেরে গেছে।

আমি অনি।

কে অনি?

মনা মাস্টারের….।

তুই মনা মাস্টারের ভাইপো অনি! ছোটকত্তার ছেলে?

হ্যাঁ মাসি।

তুই তো আজ মনা মাস্টারের ছেরাদ্দ করলি!

হ্যাঁ। তুমি যাও নি কেন?

গেছলাম তো কতো খেলাম। তুই এখানে এয়েছিস কেন বাবা?

আমি মাসির সামনে বসে পরলাম।

আগে বলো তুমি এখানে কেন?

নিতাই মোর সম্পর্কে নাতন হয়।

তোমার নাতি অন্যায় কাজ করেছে।

তোকে কে বলছে?

বেড় ভেতরে সবাই জানে।

তোকে আমি জম্মাতে দেখছি, তোর মা-বাপ ছোট বয়সে মরে গেছে। আমি জানি তুই কখনও মিছে কথা বলিস না। ও চম্পা ইদিকে আয়।

চম্পা কে?

আমার নাতবৌরে।

তোবড়া গালে বুড়ী ফরফর করে উঠলো। একজন ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলো। মাথায় একহাত ঘোমটা, মুখ দখা যায় না। গ্রামের মেয়েদের যেটা রীতি।

কাছে এসেই আমাকে ঢিপ করে একটা প্রণাম করলো।

অনি কি কথা কয় শুন। তোন্যে মোকে কইসনি। কইলি কান্যে নিতাইকে মারতি এয়েছে।

মেয়েটি চুপ করে রইলো।

সেক্রেটারী আবার তরপে উঠলো।

তোমাকে মিছে কথা বলছে।

মাসি খিঁচিয়ে উঠলো।

থাম তোন্যে, তোনকার থাকতে তাকে আগে চিনি। ওর জন্ম দেখেছি। আমি মৌসুমি ওর আঁতুড় তুলছি। মনামাস্টার মরছে পনেরো বৎসর আগে, দেশে ছিলনি বলে ফিরে এসে মনামাস্টারের ছেরাদ্দ করেছে। তোরা করতিস?

বুড়ী খ্যানখেনে গলায় চেঁচিয়ে উঠলো।

তাও মনামাস্টারের ছেলে নয়, ছোটকত্তার ছেলে। গ্রামের লোকের ভালো করার জন্য ব্যাঙ্ক করে দিছে, নিজের সম্পত্তি বাসন্তীমাকে দিছে, পীরবাবার থানে দিছে। তোরা দিতিস।

তোমার নাতি ব্যাঙ্কের কাগজ চুড়ি করেছে, বাসন্তীমায়ের জমি বকলমে কিনে নিয়েছে।

হা বাসন্তীমা, অনি কি কথা বলে! বুড়ী কপালে হাত ঠেকাল।

আমি মাসির দিকে তাকিয়ে।

তাহলে যে আমাকে বলে অনাদি ওকে সব ব্যবস্থা করে দিছে।

তুমি জিজ্ঞাসা করো। আমি মিছে কথা বলছি কিনা।

ও নিতাই ইদিকে আয়।

তোমার নিতাই আসবে না। আমি ওকে সঙ্গে নিয়ে যাব, আমার কাগজপত্র না দিলে আমি ওকে ছাড়বো না, তুমি আমাকে বাধা দেবে না।

চম্পা, অনি মিছে কথা বলে, না সত্যি কথা বলে?

বুড়ী তরপে উঠলো।

চম্পা চুপ করে রয়েছে।

তুই জানিস নিতাই কাগজ কোথায় রেইখিছে? বাসন্তীমার জমি নিজের নামে করে লিছে!

আবার হই হই।

পেছন ফিরে তাকালাম, লোক গিজগিজ করছে। আমার পাশে চিকনা, আবিদ দাঁড়িয়ে। একটু দূরে সেক্রেটারী, নিতাই মাটিতে থেবড়ে বসে আছে। অনাদিকে ভিড়ের মধ্যে দেখতে পেলাম না।

বুড়ীর দিকে তাকালাম। শীর্ণ হাতটা থিরিথিরি কাঁপছে। আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রয়েছে।

দীনুকাকার মেয়ে সরিকে তুমি দেখেছ।

সে তো অসতী হয়েগেছল। গায়ে আগুন দিছে। দেনায় পড়ে স্কুলের সেক্রেটারকে সব সম্পত্তি বেচে দিছে।

তোমার সেক্রেটার সরিকে অসতী করেছিল, আমি জেনেছি।

এ্যাঁ! ও চম্পা অনি কি কথা বলে?

আমি এ ঘরের ঝিউড়ি (বৌ) সব কথা তোমায় বলি কি করে।

চারিদিক নিস্তব্ধ।

মাসি আমি এবার যাব। তোমরা মেয়েরা এবং বাচ্চারা বরং আমার সঙ্গে চলো। আমার ওখানে থাকবে। এরা ঠিক তোমার নাতির কাছ থেকে কাগজ বার করে নেবে।

মাসি চুপ করে রইলো। ঠোঁট দুটো কাঁপছে। আমি মাসির গালে হাত দিলাম।

তুই ওকে মাইরে দিবি?

মারব না, তবে গ্রাম ছাড়া করবো। এই ঘরবাড়ি সব আগুন লাগিয়ে দেব।

বাচ্চাগুলা যাবে কুথা?

ওদের দায়িত্ব আমার।

ওকে মারিস নি।

বাসন্তীমায়ের জমিটা যখন লিখে নিয়েছিল তখন একথা গুলো তোমার নাতির মনে ছিল না। তোমার নাতির বড়ো ছেলে আরও একটা অন্যায় কাজ করেছে। সেটাও আমি জেনেছি।

না বাবু সেটা সে করে নি। তার নামে দোষ চাপান হছে। চম্পা বলে উঠলো।

তোমার ছেলে বলে বলছো। সে যে নিজে মুখে দোষ স্বীকার করেছে।

সে ফোন করছিল, তাকে জোড় করে দোষ স্বীকার করান হছে।

আমি তোমাদের সামনে এনে তাকে ভজিয়ে দেব।

চম্পা চুপ করে গেল।

তোমার বড় তোমায় মিছে কথা বলেছে। তোমার বড় আরও খারাপ কাজ করে।

তবু সে মোর সোয়ামী।

আমার জায়গায় তুমি থাকলে কি করতে?

আমি নেখাপড়া জানিনি মোকে তুমি জিজ্ঞাসা করোনি বাবু। নীচু হয়ে আমার পা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পরলো।

কাঁদলে কিছু হবে না। শাস্তি ওকে পেতে হবে। না হলে আমি যা বলবো তা শুনতে হবে।

তুমি বলো, আমি করবো।

তোকে জাঁততা গাড়ি দিব।

নিতাই চেঁচিয়ে উঠলো।

নেপলা দড়াম করে একটা লাথি নিতাইয়ের মুখে মারল। ছিটকে পেছনে পড়ে গেল।

ও বাবু তাকে মারতে বারন করো।

তোমাকে ওইভাবে বললো কেনো, তারমানে তোমাকেও ও মারধোর করে।

চম্পা চুপ করে রইলো।

সেক্রেটারী ঘামতে আরম্ভ করেছে।

তুমি আমার সঙ্গে চলো আমি দেখি দিচ্ছি ও জিনিষ কুথায় রাখে।

আমি যাব না, চিকনা, বাসু, সঞ্জয় যাচ্ছে।

মাসী

বল।

তুমি সঙ্গে যাও।

চিকনার দিকে তাকালাম, সুবীরকে একটা ফোন কর।

চিকনা আমার দিকে তাকিয়ে।

ফোন করে আমাকে দে।

চিকনা পকেট থেকে ফোনটা বার করে ডায়াল করে আমার হাতে দিল।

সুবীর।

হ্যাঁ দাদা।

মণ্ডলের জামাইয়ের কাছ থেকে ব্যাঙ্ক কতটাকা পাবে ?

এখনো লাখ দশেকের বেশি পাবে।

ঠিক আছে।

চিকনাকে ফোনটা ফেরত দিলাম।

বাক্সে যতো টাকা থাকবে নিয়ে আসবি। তারপর দেখছি।

চিকনা, সঞ্জু, বাসুকে নিয়ে ভেতরে চলে গেল।

আমি সেক্রেটারীর সামনে এসে দাঁড়ালাম, মাটিতে থেবড়ে মুখ নীচু করে বসে আছে।

আপনি কি করেন?

ভদ্রলোক আমার মুখের দিকে তাকালেন।

ধানের কেনা বেচা করি।

কোথায়?

চকে।

আর কি করেন?

চুপ করে রইলো।

চোলাইয়ের ব্যবসাটা কে করে আপনি না নিতাইবাবু।

আমি টাকার যোগান দিই নিতাই করে।

শালা মিছে কথা বলবি না, সব ফাঁস করে দেব। নিতাই চেঁচিয়ে উঠলো।

ঠিক আছে ঠিক আছে, আর বলতে হবে না, বুঝে গেছি, আর কি করেন?

একটু আধটু মহাজনী কারবার করি।

জমিজমা, সোনাদানা সব?

ভদ্রলোক মাথা নীচু করে নিল।

বাবাঃ তাহলে অনেক পয়সা আপনার। স্কুলে কে পড়ে?

আমার ছোটো মেয়ে।

কটি সন্তান?

সাতটি।

বাঃ।

আবিদ হাসছে।

দীনুকাকার সম্পত্তিটা কতো দিয়ে কিনেছেন?

চুপ করে রইলো।

নেপলা, অনাদি কোথায়? চেঁচালাম।

আমি এখানে।

দেখলাম কিছুটা দূরে অনাদি কাদের সঙ্গে যেন কথা বলছে। কাছে এগিয়ে এলো।

সেক্রেটারী কোথাকার লোক?

আগে পূর্বসাইতে থাকতেন।

হাসলাম।

খুব ধড়িবাজ লোক তাহলে বল। শেষ পর্যন্ত নিজের গদি ঠিক রাখার জন্য এগুলোকে জোটালি? গ্রামে আর ভালো লোক পেলি না, না বিশ্বাস করতে পারলি না?

অনাদি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।

তুই জানতিস না, এই সব ব্যাপার?

অনাদির মুখে কোনও কথা নেই।

শিবু।

বইল।

সেক্রেটারীকে তুলে নিয়ে যা। ওর ঘরে যা কাগজপত্র আছে তুলে নিয়ে আয়। বেশি কিছু তেণ্ডাইমেণ্ডাই করলে সবকটাকে ঘরে তালা বন্ধ করে পরিবার শুদ্ধু ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিবি। সরি যেভাবে মরেছে, এরাও সেভাবে মরুক।

সেক্রেটারী এবার আমার পায়ে ধরে ফেললো।

বিশ্বাস করুণ।

অনিদা আমাদের নামে ব্যাঙ্কের লোন করিয়ে সব টাকা নিতাই লিয়ে লিছে। মোদের মুনিস খাটিয়ে টাকা দেয়নি। বলে ব্যাঙ্কে শোধ দিছে। আমান্যে খোঁজ লিছি টাকা ব্যাঙ্কে জমা পরে নি।

কে যেন ভিড়ের মধ্যে থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।

চল উঠ, আট বছরে অনেক কামায়ে লিছিস, এবার একটু খরচ কর।

শিবু কলার ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে দাঁড় করালো। সেক্রেটারী হাত জোড় করে আছে। ভয়ে থর থর করে কাঁপছে।

অনিদা যা বলে দিয়ে দে, বেঁইচে যাবি।

আমি সব দেব, আমাকে প্রাণে মারবেন না।

অনাদি সঙ্গে যা। শিবু সব দেখে শুনে নিয়ে আসবি।

চিকনা গেলে হতো না।

অনাদির দিকে তাকালাম।

অনিরে এ শালার বন্ধকী ব্যবসাও আছে। এটা আগে জানতাম না।

তাকিয়ে দেখলাম একটা বড়ো ট্রাঙ্ক নিয়ে ওরা তিনজনে নামছে।

কাছে এলো।

দেখেছিস।

অ্যাতো দেখা যায়। চিকনা বললো।

তালা খুলেছিস।

ভেঙ্গে দিয়েছি।

তুই একবার শিবুর সঙ্গে সেক্রেটারীর বাড়ি যা। ওর ঘরে যা কাগজপত্র আছে ধুয়ে মুছে নিয়ে আয়। সঙ্গে অনাদি যাচ্ছে। আমি এখানে অপেক্ষা করছি।

বাসুর দিকে তাকালাম।

সুকান্তকে একটা ফোন কর। জিপটা নিয়ে আসুক। নিতাই আর সেক্রেটারীকে তুলে নিয়ে যাবে।

এটা আবার কেন করছেন স্যার। আমি সব দিয়ে দিচ্ছি।

সেক্রেটারীর দিকে তাকালাম।

আরি বাবা, একেবারে স্যার!

মাসি এগিয়ে এলো। আমার হাতটা চেপে ধরলো।

এদের মারবিনি।

মারব না, তবে বাড়িতে ফিরতে কয়েকদিন দেরি হবে। তোমাকে কথা দিলাম।

পাপের ফল ভোগ করুক, সব সম্পত্তি বনাইছে। বাসন্তীমার সম্পত্তি লিছে, পীরবাবার সম্পত্তি লিছে, মরুক।

মাসি লাঠি ঠুকতে ঠুকতে ভেতরে চলে গেল।

কাজ গুছিয়ে বাড়ি ফিরতে একটু রাত হলো। আমি চিকনার গাড়িতে ফিরলাম। বাইক থেকে খামারে নামতেই দেখলাম বড়োমারা সব বারান্দায় বসে গল্প করছে।

ইকবালভাই এগিয়ে এলো সঙ্গে ইসলামভাই, মীরচাচা।

তুই গেলি আমাকে বললিনা কেন, শালাদের পিট্টে ছাল খিঁচি নিতাম। মীরচাচা রাগে বলে উঠলো।

আমি হাসলাম।

মীর এসব ছোটোখাটো ব্যাপারে তোমাকে আমাকে ডাকবে না। বড়ো ব্যাপার হলে তোমাকে ডাকবে। ইকবালভাই বললো।

ইসলামভাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

কাজ মিটলো?

হ্যাঁ। কিছুটা হলো।

যা দিদি মুখ গোমড়া করে বসে আছে। চিকনাদা।

ভাইদাদা খারাপ হয়ে যাবে।

তোমাদের কে খবর দেয়—আমি বললাম।

তোর সর্ষের মধ্যে কিছুটা ভূত লুকিয়ে রেখেছি। বলতে পারিস তারাও তোর ভালো চায়।

খাওয়া দাওয়া করেছো?

তুই আসিসনি হবে কি করে।

আমার জন্য কি সবাই বসে আছো?

সবাই না, আমরা কয়েকজন।

চিকনা আমার বাড়ির পথ ধরে রান্নাশালের দিকে গেল।

মীরচাচা।

বল।

সব যখন শুনেছো ওদিকটায় একটু খেয়াল রাখো।

তোকে আর কইতে হবে নি। গলায় অভিমানের সুর স্পষ্ট। হাসলাম।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/O6hbfJN
via BanglaChoti

Comments