❝কাজলদীঘি❞
BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১০৮ নং কিস্তি
—————————
দাদার ঘরে এসে ঢুকলাম। ওখানে দাদাদের সঙ্গে বসে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম। চম্পকদারা কথা দিল আসবে। আমি আবার নিউজরুমে এলাম।
দেখলাম সবাই ব্যস্ত। জোর কদমে কাজ চলছে। মল্লিকদার চেয়ারের পাশে অরিত্র বসে। আমাকে দেখে পেছনে বসে থাকা মেয়টাকে কি যেন বললো। ওমনি মেয়েটা লাফাতে লাফাতে কাছে চলে এলো। কোমড় ধাপাতেই হাতটা চেপে ধরলাম।
মুখে হাসি। সিঁথিতে একচিলতে সিঁদুর। বেশ মিষ্টি। বহুদিন আগে একবার দেখেছিলাম। মুখটা ভুলে গেছি।
তোমার চোখ বলছে, তুমি ঠিক ঠাহর করতে পারছো না?
অর্ক পাশে এসে দাঁড়াল।
আমি অর্কর দিকে তাকিয়ে।
অরিত্রর দিন, থুরি বৃষ্টি।
মেয়েটা মিষ্টি করে হাসছে।
রাত্রি কোথায়?
তোমার পেছনে।
ফিরে তাকালাম।
হাসছে।
একদিন ওদের নিয়ে বাড়িতে আয়।
অর্কর দিকে তাকালাম।
তোমার সময় আছে?
হাসছি।
আমার অনারে ওদের একটু চা খাওয়া।
ওরাই বরং তোমাকে খাওয়াচ্ছে।
আমি নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলাম।
অর্ক আমাকে একটা নিউজপ্রিন্টের প্যাড দে।
কি করবে?
একটু লিখি।
অর্ক চাঁচালো, সন্দীপদা তোমার লিড নিউজ হয়ে গেছে। আর চিন্তা করতে হবে না।
ঘর শুদ্ধু সবাই অর্কর দিকে তাকিয়ে।
সন্দীপ মুখ তুলে তাকাল, কে আনল?
অনিদা লিখতে বসছে।
সন্দীপ চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো। আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বললো।
সত্যি লিখবি!
হঠাৎ একটা সাবজেক্ট মাথায় এলো, তাই অর্কর কাছে প্যাড চাইলাম।
সন্দীপ নিজেই গিয়ে প্যাড আনলো। একটা পেনও এনে দিল।
অর্ক এখন অনিকে কোনও বিরক্ত করবি না।
দেখছো অনিদা সন্দীপদার অবস্থা দেখছো। এতক্ষণ গলা দিয়ে আওয়াজ বেরচ্ছিল না।
নিজেই টেবিল পরিষ্কার করে জায়গা করে দিল।
সবাই সন্দীপের কীর্তি কলাপ দেখে হাসছে।
আমি লিখতে বসলাম।
অনাদির দলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ঠেসে লিখলাম। বেশ ভালো করে অনাদিকে ঠুসলাম, আর অনাদির কেলোর কীর্তিগুলো শুধু টাচ করে গেলাম। যাতে আর্টিকেলটা পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা চাপা ফিস ফাস শুরু হয়ে যায়।
প্রায় আধঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর মাথা তুললাম। আড়মোড়া ভাঙলাম। দেখলাম পাশে চায়ের কাপটা যেমন দিয়েগেছিল তেমনই পরে রয়েছে। নিজে নিজেই হেসে ফেললাম।
অর্ক এসে পাশে দাঁড়ালো।
শেষ?
হ্যাঁ।
দাও।
একটু পড়ে নিই।
পড়তে হবে না। দাদা বসে আছে। বললো লেখা শেষ হলেই নিয়ে আয়, আমি একবার পড়ে দেখে নেব, তারপর কমপোজে পাঠাবি।
খামকা দাদাকে আটকে রেখেছিস কেন?
কে কাকে আটকায়।
সন্দীপ, অরিত্র, সুমন্ত উঠে এলো।
কি লিখলি। সন্দীপ বললো।
দেখ, পলিটিক্যাল লেখা।
সুমন্তর দিকে তাকালাম।
সুমন্ত তোর কাজ শেষ?
একটু বাকি আছে।
আমাকে একটু দ্বীপায়ণের ঘরে নিয়ে চল।
অরিত্র হাসছে।
দাঁড়াও। সুমন্ত নিজের টেবিলের দিকে গেল।
চা খেয়েছো?
মনে ছিলো না।
একটু খাবে?
দ্বীপায়ণের ঘরে গিয়ে খাব।
আমি সুমন্তকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। দোতলায় ওদের রুম। সিঁড়ি দিয়েই নিচে এলাম। অফিস একটু ফাঁকা হয়ে এসেছে। তবে যে দু-চারজন সিঁড়ি দিয়ে ওঠা নামা করছিল তারা দাঁড়িয়ে পরলো। সম্ভাষণ প্রতি সম্ভাষণ বিনিময় হলো।
দোতলার করিডর দিয়ে দ্বীপায়ণের ঘরের সামনে এলাম। দ্বীপায়ণ দেখতে পেয়েছে। নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো।
দরজা খুলে ভেতরে এলাম।
কতদিন পর এ ঘরে এলে খেয়াল আছে?
আঠারো বছর কিংবা তার একটু বেশি।
চারিদিকে চোখ মেলে ঘুরে ঘুরে তাকালাম।
তোমার ঘরের কিন্তু খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
না। তবে মেশিনগুলোর পরিবর্তন হয়েছে। মডার্ণ মেশিন নিয়ে আসা হয়েছে।
ওটা আমার মাথায় ঢুকবে না।
খুব ঢুকবে। বলো ঢোকাতে চাই না।
হাসলাম।
কি খাবে বলো?
নিউজরুমে চা খেলাম না। বললাম তোমার কাছে এসে খাব।
তুমি নাকি লিখছিলে?
হ্যাঁ।
পেজ সাজিয়ে ফেলেছিলাম, ভেঙে দিলাম।
কেন?
তোমারটা নাকি লিড নিউজ।
পাগল সব।
তোমার লেখার সঙ্গে কি ছবি যাবে।
অনাদির একটা ভালো ছবি দিয়ে দাও। তাহলেই হবে।
লেখাটা পড়ি আগে। আমার চেয়ারটায় গিয়ে বসো।
না। ওটা সম্পূর্ণ তোমার। আমি তোমার অপজিটে বসছি।
দেখলাম সবাই আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। সিনিয়ার কেউ নেই, হয়তো দ্বীপায়ণের সমসাময়িক দু-একজন আছে।
সুমন্ত বসো, দাঁড়িয়ে আছো কেনো? দ্বীপায়ন বললো।
বসছি। কাল আমার পাতা তৈরি করতে হবে, কখন সময় দেবে।
সানডে না ফিচার।
কাল সানডে, পর্শু ফিচার।
সিডিউল তোমার কাছে পৌঁছয় নি?
আমি ছিলাম না। তুমি সিডিউল করেছো নাকি!
একটা বানিয়েছি। সকলকে পাঠিয়ে দিয়েছি। তোমার টেবিলেও আছে। একটু খোঁজো, পেয়ে যাবে।
তারমানে কাল হবে না।
কালই হবে। টাইমটা ওখানে দেওয়া আছে। এবার থেকে ওই সিডিউল ধরে সব চলবে।
নতুন ইমপ্লিমেন্ট।
হ্যাঁ। তুমি বসবে তো এখন?
দ্বীপায়ণ আমার দিকে তাকালো।
হ্যাঁ।
একজন একটু বাইরে গেছে। ওর স্ত্রীর শরীরটা ভালো নয়।
কি হয়েছে!
ওর স্ত্রী প্রথম ক্যারি করছে।
ঠিক আছে।
দ্বীপায়ন সকলকে ডাকলো। আলাপ হলো। বুঝলাম সুমন্তর সঙ্গে এদের কম বেশি আলাপ আছে।
দ্বীপায়নের হাত দিয়ে আমার কিছু ম্যাসেজ আপনাদের কাছে পাঠিয়েছিলাম, পেয়েছেন।
সকলেই মাথা দোলাল।
ওই ব্যাপারে আপনাদের কিছু যদি বলার থেকে থাকে আপনারা বলতে পারেন।
দেখলাম সবাই চুপ করে গেল।
কোনও অসুবিধে নেই, মন খুলে বলতে পারেন।
একচ্যুয়েলি সারাটা দিন কাগজের কাজ করে মনোটোনাস লাগে। মানসিকভাবে সবাই ভীষণ ক্লান্ত অনুভব করি। সেই মুহূর্তে একটু ব্রেকের প্রয়োজন অনুভব করি। তাই বাইরের কিছু কাজ করি। বলতে পারেন মনের খিদে। একজন বলে উঠলো। সাপোর্ট করলো আরও তিন চারজন।
আমাদের হাউসে কি এই সুযোগ পাওয়া যায় না?
ম্যাগাজিন আর সানডের গল্প।
আমি যদি আপনাদের মনের খোরাক জোগাই।
তাহলে তো কথাই নেই।
আমাকে একটু সময় দিতে হবে।
আপনি মনে করে এটুকু দিলেই হবে।
দ্বীপায়ন একটা কাজ করবে।
বলো।
আমার লেখাটায় অনাদির ছবি দিও না। বরং একটা কার্টুন ব্যবহার করো।
চা এলো। ছিদাম নিজেই নিয়ে এলো। চুমুক দিলাম।
আপনারা লেখাটা পরুন তারপর দেখুন কার্টুন না ছবি কোনটা দিলে ভালো লাগে।
দ্বীপায়ন টেবিলের ওপর থেকে ইন্টার কম ফোনটা তুলে নিলো। ফোন করতে যাবে। ঝড়ো হাওয়ার মতো অর্ক, অরিত্র ঢুকলো। দ্বীপায়ন ফোনটা নামিয়ে রাখলো।
কোথায় ফোন করছিলে? আমি বললাম।
ওদেরকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম।
সত্যি অনিদা তোমার পেনটা কথা বলে।
আগে বোস তারপর কথা বল। দ্বীপায়ন হাসতে হাসতে বললো।
অর্ক একটা চেয়ার টেনে সামনে বসে পড়লো।
তুমি লেখাটা এমন ভাবে লিখেছো যে ধরি জল না ছুঁই পানি, কিন্তু শব্দগুলো এমন চোখা চোখা বেছেছো হাড়ে বিঁধবে। সকলে এবার ফিস ফাস করতে শুরু করবে।
অর্ক ফর ফর করেই চলেছে।
দ্বীপায়নদা বড়োসাহাব বলেছে খুব ভালো করে পেজ মেকআপ করতে। লেখাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
লাস্টের প্যারাটায় অনাদিদাকে একেবারে শুইয়ে দিয়েছ। অরিত্র বললো।
এটাকি লিড নিউজ! আমি বললাম।
তহলে কি?
তোরা সত্যি খেপেছিস।
একটুও না।
একটা ফিচারধর্মী পলিটিক্যাল লেখাকে তোরা লিডনিউজ বানিয়ে দিচ্ছিস। বুঝেছি তোদের নিউজের আকাল পড়ে গেছে।
সবার দিকে তাকালাম।
আপনাদের আর বিরক্ত করবো না। আমি উঠছি। পরে বাকি কথা হবে।
অরিত্র লেখাটা দ্বীপায়নের হাতে দিল।
কার মেসিনে আছে।
সন্দীপদা মনেহয় তোমার মেসিনে ট্রান্সফার করেছে। একবার দেখে নাও। ফাইল নম্বর আছে।
আমরা চারজনে উঠে দাঁড়ালাম।
ঘরের বাইরে এসে অরিত্রকে বললাম কটা বাজে রে।
অরিত্র ঘড়ি দেখে বললো, সাড়ে সাতটা।
সাড়ে সাতটা! কোথা থেকে যে সময় চলেগেল বুঝতেই পারলাম না।
ওদেরকে বললাম তোরা যা, আমি একটু আসছি।
আবার কোথায় খোঁচাতে যাবে।
একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে।
বুঝেছি যাও।
পায়ে পায়ে ছিদামের ক্যান্টিনে এলাম। এখন বেশ ফাঁকা ফাঁকা। যে দু-একজন আছে তাদের চিনতেই পারলাম না। চেনার কথাও নয়। আমিও যেন কত চিনি সবাইকে।
আমি সোজা ছিদামের ভেতরের ঘরে চলে এলাম। ওর খাটটাতে টান টান হয়ে শুলাম।
ছিদাম এলো।
চা খাবে।
আগে একটা সিগারেট দে তারপর চা খাবো।
ছিদাম চলে গেলো। আমি শুয়ে। এ্যাজবেস্টারের চাল। একটা পাখা তার শরীরটা অনবরতো হেলিয়ে দুলিয়ে ঘুরে চলেছে। একটা খটা খট শব্দ। অন্য সময় হয়তো বিরক্ত লাগতো, এখন একটুও বিরক্ত লাগছে না।
ছিদাম ঢুকে একটা সিগারেট দিয়ে চলে গেলো।
তুমি সিগারেট খাও। আমি একটু নিউজরুম থেকে আসছি। ডাক পড়েছে।
আর কেউ নেই?
সাতটার সময় ওদের ছেড়ে দিই। রাতে একটা ছেলে আসে। এখনও আসেনি।
ঠিক আছে যা।
উঠে বসে সিগারেট ধরিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম।
সত্যি পাখাটা মাথা দুলিয়ে অনবরতো ঘুরে যেতে কোনও বিরক্তি নেই। এটা মনে হয় আমাদের অফিসের মানধাতা আমলের পাখা। চারটে কাঠের ব্লেড। শরীরটা দশাশই।
কেন যেন মনে হলো আমি যা করছি বা যা করতে চলেছি তা কি ঠিক?
এতদিন একটা রিদিমে চলে এসেছি। আমার ভালোবাসার মানুষকে যারা যন্ত্রণা দিয়েছিল তাদের শাস্তি দিতে হবে।
এরই ফাঁকে চিন্তা করে এসেছি তাদের স্থায়িত্ব।
কিন্তু মিত্রাকে আমি কি ঠিক সুখী করতে পেরেছি? বিয়ে করেছি। আমাদের দুজনের মিলিত ভালোবাসায় ওর শরীরে আমাদের সন্তান বড়ো হয়ে উঠেছে। তারা এখন সব প্রাপ্ত বয়স্ক। তাদেরও কিছু চাহিদা আছে। আমি তার কতটা পূরন করতে পেরেছি?
আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না কেন সকলে আমাকে ভয় করে, সমীহ করে?
আমি কি খুব খারাপ লোক? আমি কি খুব হিংস্র? সর্বোপরি আমি কি খুব স্বার্থপর? নিজেরটা ছাড়া কিছু বুঝি না?
এরই মাঝে তনুকে জীবনে জড়িয়ে ফেলেছি। সুন্দরকে নিয়ে গিয়ে তনুর হাতে সঁপে দিয়ে কিছুটা শান্ত করেছি। সে একটা সময় গেছে।
ওদেরও কিছু চাহিদা আছে।
তনু অনেক বার আমাকে ওর শরীরের সঙ্গে আষ্টে পৃষ্ঠে বেঁধে হাপুস নয়নে কেঁদেছে। আমি কি অন্যয় করেছি। একটা সন্তান চেয়েছি, তুমি সুন্দরকে এনে দিয়েছো।
মেয়েদের এই একটা বড়ো সমস্যা। নিজের শরীরের শেষ বিন্দু দিয়ে একটা নতুন প্রাণের মুখ দেখতে চায়। অপরাধ ওদের নয়। প্রকৃতি ওইভাবে ওদের তৈরি করেছে। মাতৃত্বে নারীর পরিপূর্ণতা। ইচ্ছে করলে হয়তো তনুকে একটা সন্তান দিতে পারতাম। কিন্তু আর একজনকে ঠকানো হতো।
আমার সবচেয়ে বড়ো সমস্যা আমি কাউকে ঠকাতে চাইনি, কষ্ট দিতে চাইনি, কেউ কষ্ট পাবে সেটাও চোখের সামনে সহ্য করতে পারি না। ভগবান হতে চেয়েছি? সর্বংসহা?
কেন জানি না মাঝে মাঝে মনে হয় আমি মেসিনের মতো কাজ করে চলেছি। এটা আমার দায়িত্ব, এটা আমার কর্তব্য, এটা আমাকে করতে হবে। মনে হয়, মন রে তুই মিথ্যে বড়ো।
আচ্ছা অনিসা যদি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে সরাসরি জিজ্ঞাসা করে, বাবা আমার এই আঠারো বছরের জীবনে তোমার কাছ থেকে কি পেলাম। সুন্দর তবু কিছুটা তোমাকে পেয়েছে। আমি দাদা কিছুই পাই নি।
কি উত্তর দেবো? তোমার মার শরীরটা নিয়ে যারা একদিন ছিনিমিনি খেলেছিল তাদের শাস্তি দিলাম। নিশ্চই বাঁকা হাসি হাসবে, বলবে—
কি হবে এই উত্তর শুনে। মায়ের ব্যাপারটা তোমার আর মার। আমরা তোমার সন্তান। এটা অস্বীকার করতে পারো। হয়তো বলেই বসলো তুমি আমার জায়গায় আমি তোমার জায়গায় বলো এবার তুমি কি উত্তর দেবে।
চুপ করে থাকা ছাড়া আর কোনও উত্তর এই সময় মনে পড়ছে না।
আমাকে ঘিরে কতো চেনা মুখ। দাদা, মল্লিকদা, বড়োমা, ছোটোমা, মিত্রা, অনিসা, অনন্য, কাকীমা, সুরোমাসি, নীপা, তনু, সুন্দর সর্বোপরি শুভ। এছাড়া দামিনীমাসি, ইসলামভাই, ভজু, চিকনা দূর কতো নাম মনে করবো।
এদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ডিমান্ড আছে আমার কাছে। লিখতে বললে দিস্তে দিস্তে কাগজ উধাও হয়ে যাবে। কিন্তু আমি কী পারবো এদের চাহিদা মতো রসদ জোগাতে?
মিত্রা এসে যদি দাঁড়িয়ে বলে, বুবুন আমার কিসের অভাব, আমি শুধু তোকে চেয়েছিলাম। নিভৃতে একান্ত আপন করে নিয়ে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলাম। তোর যা আছে তাই দিয়ে কি তুই এটুকু দিতে পারতিস না।
মেয়েদের তোর মতো বিশাল বিশাল স্বপ্ন থাকে না। তাদের স্বপ্নগুলো ছোটছোট। সুখের স্বপ্ন। তুই কতোটা তার সামিল হতে পেরেছিস।
ঘর চেয়েছি।
তুই দাদাদের সংসারে আমাকে ঠাঁই দিয়েছিস।
আমি অস্বীকার করবো না কখনও দাদা-বড়োমা, মল্লিকদা-ছোটোমা আমাকে দূরছাই করেছে। বরং আমার বাবা-মা আমার জন্য যা করেনি, বড়োমা, ছোটোমা তাই করেছে, আমাকে বুকে করে আগলে রেখেছে।
তাহলে?
এরপরও মেয়েদের কিছু চাওয়ার থাকে। সেটা তার একান্ত আপন। সেখানে তুই ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
তাহলে আমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেল। তারপর সবাই এক এক টুকরো নিয়ে চলে যা।
তোকে বোঝানো যাবে না।
তুই বলবি তোকে বোঝান যাবে না। তনু বলবে তোমাকে বোঝান যাবে না। তাহলে আমি কি করতে পারি বল। আমি অন্যায়টা কি করছি বল।
কখনও বলেছি তুই অন্যায় করছিস। তুই যা কিছু করছিস আমাদের জন্য। আমাদের ভালো থাকার জন্য।
তাহলে?
তুই কখনও তোর মেয়েকে যখন আমি বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলাম, দেখেছিস? তোর মেয়ে যখন কচি কচি ঠোঁটে আমার দুধে কামর দিচ্ছিলো, আমার সারা শরীরটা শির-শিরানিতে কেঁপে কেঁপে উঠছিল তখন আমার মুখের এক্সপ্রেশনটা দেখেছিলি? সেই এক্সপ্রেশনে তোর মুখটা কেমন দেখতে লাগতো তা আমাকে দেখার সুযোগ দিয়েছিস? দিসনি। ঠিক ওই মুহূর্তে তুই কি বলতিস আমি শুনিনি। ছেলে-মেয়ে আমার একার সম্পত্তি নয়। আমাদের দুজনের।
তুমি এখনও শুয়ে আছো?
ঘুরন্ত পাখা থেকে চোখ সরিয়ে পায়ের দিকে তাকালাম।
ছিদাম দাঁড়িয়ে আছে।
কি ভাবছিলে ওরকম ভাবে!
কিছু না। এবার একটু চা দে।
উঠে বসলাম।
বাইরে কেউ আছে না চলে গেছে।
কে থাকবে এই সময়। সব ঘর থেকে ফোন আসে। বেশিরভাগ নিউজরুম থেকে। প্রেসের লোকেরা বাইরে থেকে চা আনিয়ে নেয়।
চুপ করে থাকলাম।
রাত দেড়টার পর সব বন্ধ আবার সাতটা থেকে শুরু হয়ে যায়।
তুই কখন যাস?
কাগজ বেরিয়ে যাবার পর একটা গাড়ি আমাদের ওপাশে যায়, ওদের সঙ্গে চলে যাই।
কখন আসিস?
দশটা নাগাদ।
তোর ছেলেরা?
তার আগেই চলে আসে।
নিচে সুবল ঘড়ুই বলে একটা ছেলে আছে। গেটে থাকে। ওরা নাকি চারজন রাতে ছাদে শোয়।
হ্যাঁ। ওরা ওপাশে থাকে নিজেরা রান্নাকরে খায়।
ছেলেগুলো কেমন রে?
আমার সঙ্গে আছে।
আর কি খবর?
অনাদিদা ভেতর ভেতর এখানে একটা ইউনিয়ন বানাতে চাইছে।
সুতনুবাবুদের ইউনিয়ন?
ওটা প্রথম থেকেই আছে।
এটা কারা বানাতে চাইছে?
সার্কুলেসনের কিছু ছেলে আর প্রসের কয়েকজন।
অফিসে এদের মদত কে দিচ্ছে?
এ্যাড ডিপার্টমেন্টের দু-একজন আছে।
সুতনুবাবু জানে?
এখনও ফিস ফাস চলছে। চা খেতে এসে সবাই আলোচনা করে শুনি।
নামটা একটু জেনে বল।
তবে আজকে এ্যাড ডিপার্টমেন্টকে তুমি যা দিয়েছ, সারা অফিস রাষ্ট্র হয়ে গেছে। আমাকে যে কতজন এসে জিজ্ঞাসা করলো তোমাকে চিনি কি না, কি বলবো।
কি বললি?
অনিদা আমাকে এই অফিসে চাকরি দিয়েছে তাকে চিনবো না তো কাকে চিনবো। তবে সবাই আস্তে আস্তে সির হয়ে যাচ্ছে। আমারও কিছু নিজস্ব লোক আছে।
আজ এ্যাড ডিপার্টমেন্ট আর প্রেসকে একটু রগড়ে দিয়েছি। আর্ট ডিপার্টমেন্টকে একটু ছুঁয়েছি।
শুভদীপদা খুব ঝেড়েছে সকলকে। শুভদীপদা খুব ভালো ছেলে। চম্পকদার কেমন যেন আত্মীয় হয়। তোমাকে আজ প্রথম দেখল। আমার কাছে তোমার গল্প শুনেছে। চা খেতে এসে বলছিল।
বুঝলি ছিদাম তোর বাবুটা এমন ভাব দেখায়, যেন ভাজামাছ উল্টে খেতে জানে না।
তারপর আর কি। তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বললো আমি এতদিন যা ধরতে পারিনি। উনি ঠিক ধরে ফেলেছেন। দিমাকটার বহুত দাম।
আমি হাসছি।
আমিও মনে মনে বললাম, সবে কলির সন্ধ্যে অনিদাকে তোরা এই প্রথম দেখলি আমি আঠারো বছর ধরে জানি। কোথা থেকে যে কি করে ফেলবে তোরা ঘুণাক্ষরেও টের পাবি না।
ছিদামের কাছে এককাপ গরম চা খেলাম। আরও কিছুক্ষণ ছিদামের সঙ্গে কথা বললাম। তারপর নিচে নেমে এলাম।
অফিস পুরো শুনসান।
নিউজরুমে ঢুকলাম। ভিড়টা এখন অনেক কম। আমাকে দেখে সন্দীপ এগিয়ে এলো।
কোথায় ছিলি?
অফিসেই ছিলাম।
ছিদাম বললো, তুই ওপরে যাসনি।
নিচে ছিলাম।
ফোনটা স্যুইচ অফ করে রাখিস কেন?
কেন কি হয়েছে?
দাদা কতোবার ফোন করলো। নেপলা খুঁজছে।
আমি নিজের চেয়ারে এসে বসলাম। অর্ক, অরিত্র, সুমন্ত এসে পাশে দাঁড়িয়েছে।
তোর সঙ্গে একটু আনন্দটা শেয়ার করবো তার জো নেই।
কাগজ বেরিয়ে গেছে?
ছাপতে পাঠিয়েছি।
চা খাবে। অরিত্র বললো।
না।
লেট নাইট এডিসনের জন্য কে থাকবে?
আমরা চারজন। আর রাতের শিফ্টে কয়েকজন আছে তারা থাকবে।
আমার ফোনটায় ব্যাটারি মনে হয় শেষ হয়ে গেছে। একবার নেপলাকে ফোন কর।
সন্দীপ মোবাইলটা বার করলো।
অরিত্র?
বলো।
তোর বৌ চলে গেছে?
হ্যাঁ।
সায়ন্তনের সঙ্গে দেখা হলো না।
তোর জন্য অপেক্ষা করে করে চলে গেল।
হ্যাঁ নেপলা, অনি নিউজরুমে এসেছে। তুই কোথায়….ঠিক আছে আমি বলে দিচ্ছি।
ফোনটা পকেটে রাখতে রাখতে।
শোন নেপলা নীচে তোর জন্য অপেক্ষা করছে।
তুমি কিছু বললে না। অরিত্র বললো।
কি বলতো!
আমাকে ডাকলে যে।
থাক পরে বলবো। দেখনা কাগজ ছাপা হলো কিনা।
ফার্স্ট ইমপ্রেশন দাদা নিয়ে চলে গেছে। এখন সেকেন্ড ইমপ্রেশন চলছে।
আমার লেখাটায় কি ছবি দিলি।
তুই তো কার্টুন বলে এসেছিলি। দারুণ নামিয়েছে, দ্বীপায়ণের চ্যালাটা।
হ্যাঁ, ওদের মনে মনে খুব ক্ষোভ দেখলাম। ক্রিয়েটিভ কাজ করার সুযোগ ওরা পায় না।
রাখ তুই। এক একটা গল্পে যা ইলাস্ট্রেশন করে না। তোর মাথা গরম হয়ে যাবে। সুমন্ত প্রায়ই আমার কাছে কমপ্লেন করে।
ঠিক আছে এবার একটু একটু করে নিউজেও ইলাসট্রেশন ঢোকা না। বিশেষ করে ফিচার ধর্মী লেখাগুলোতে।
একবারে কেঁচিয়ে দেবে।
আমারটা কেঁচিয়ে দিয়েছে।
দ্বীপায়ণ টাচ করেছে।
ঠিক আছে। একটু চেষ্টা করে দেখ তৈরি হয়ে যাবে। মাঝে মাঝে তোরাও কনসেপ্ট দিয়ে দে। আমি এই ভাবে ইলাস্ট্রেশনটা চাইছি।
সুমন্ত কালকেই তোর পেজে তিনটে ফিচার আছে না?
সুমন্ত মাথা দোলাল।
ওটায় ইলাস্ট্রেশন দিলে খারাপ লাগবে?
দেখলি, বললাম বলে সবেতেই ইলাস্ট্রেশন দিতে হবে।
ওটায় ইলাস্ট্রেশন দিলে খারাপ লাগবে না।
তোকে এই নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। ওটা সুমন্ত আর দ্বীপায়ন বুঝে নেবে।
উঠে দাঁড়ালাম।
আমি আসি।
কাল কখন আসছো? অর্ক বললো।
দেখি চলে আসবো।
নিজেই বেরিয়ে এলাম।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে ইচ্ছে করলো না। লিফ্টের সামনে দাঁড়িয়ে বোতাম টিপলাম।
ফাঁকাই উঠে এলে লিফ্টটা নিচ থেকে।
আমি ভেতরে উঠে দরজা বন্ধ করলাম। হুস করে নিচে নেমে এলো। রিসেপশনে গাঁক গাঁক করে টিভি চলছে। একটা ছেলে বসে ছিলো আরও চার পাঁচজন চেয়ারে বসে। আমাকে দেখে কেমন চমকে উঠলো। উঠে দাঁড়ালো। ওর দেখা দেখি সবাই উঠে দাঁড়ালো।
আমি একবার তাকিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। চিন্তে পারলাম না।
গেটে আজকে সুবল বলে ছেলেটা দাঁড়িয়ে।
আমাকে দেখে হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো।
ভালো আছো।
হ্যাঁ স্যার। নেপলাদা একটু বাথরুমে গেছে। আপনাকে দাঁড়াতে বলেছে।
গাড়ি কোথায় রেখেছে?
সামনে আছে।
নেপলা এলে আসতে বলো, আমি গাড়ির কাছে আছি।
আচ্ছা স্যার।
আমি বাইরে বেরিয়ে এসে সিগারেটের দোকান থেকে কয়েকটা ক্যান্ডি কিনলাম। একটা ছিঁড়ে মুখে দিলাম।
তারপর গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম।
নেপলা হন্তদন্ত হয়ে এলো।
কাজ শেষ হলো?
হ্যাঁ। পকেট থেকে একটা ক্যান্ডি বার করে ওকে দিলাম।
হাসছে।
সত্যি তোমার নেসা। ফোনটা স্যুইচ অফ করে রেখেছো কেনো।
না-রে চলছিলো। হয়তো ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে। বাড়িতে গিয়ে চার্জ দিতে হবে।
চার্জার থাকলে গাড়িতেই চার্জ হয়ে যেতো।
আবিদ কোথায়?
দেবাশিসদা ডেকে পাঠাল। কি দরকার আছে।
ওখানে মাল পৌঁছে গেছে?
আজ সকালে জাহাজ পোর্টে ভিড়েছে, কাল মাল নামবে।
এলসি ক্লিয়ার হয়ে গেছে?
হ্যাঁ।
ওখানকার খবর নিয়েছিলি?
ওটা সাগির ঠিক মেইনটেইন করছে।
গাড়িতে উঠে বসলাম।
এসি চালাবি নাকি?
তুমি বললে চালাবো।
থাক।
তাহলে কাঁচ নামিয়ে দাও।
নেপলা গাড়ি স্টার্ট দিল।
সারাদিন এখানে বসে বসে কি করলি?
কতো কাজ করলাম। তবে তুমি গাড়ির ব্যাপারটা হাইড দিয়েছ। ধরলে কি করে বলো।
এর আগের দিন ট্যাক্সি করে রাসবিহরী থেকে এসেছিলাম।
দেখি ট্যক্সিতে পঞ্চাশ টাকার মিটার উঠলো। ব্যাটা বললো ডবল। তর্ক করলাম না দিয়ে দিলাম। বহুদিন কলকাতায় ট্যাক্সি চাপিনি। মিটার দেখলাম তেরো কিলোমিটার। কেমন যেনো খটকা লাগলো। ফেরার সময় তোদের গাড়িতে ফিরলাম। দেখলাম নয় কিলোমিটার। তাও অনিমেষদার বাড়ি হয়ে গেছি।
রাতে অদিতির বিল দেখে চক্ষু চড়ক গাছ। তাপসের গাড়ি থেকে আবিদের লোকটার গাড়ির তেল খরচ বেশি কাছাকাছি ডবল। কেমন যেন সন্দেহ হলো।
ওই বুদ্ধিটা কাজে লাগিয়ে দিলে।
হ্যাঁ।
দেখ কাকতালীয় ভাবে মিলেও গেল। অদিতির ফাইলটা নিয়ে যখন বসলাম তখন ভাবতেই পারিনি এরকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু ঘটলও ঠিক তাই।
ট্যাক্সি ওয়ালাকে তোমার একশোটাকা দেওয়া সার্থক।
তা যা বলেছিস। ওই ব্যাটা মাথাটা খারাপ না করলে এটা ধরাই পড়তো না।
নেপলা শরীর নাচিয়ে হেসে চলেছে।
তোর তো স্টিয়ারিংয়ের সঙ্গে ভুঁড়ি ঠেকে গেছে।
সকালবেলা উঠে বাগানে দৌড়চ্ছি। দেখো না পনেরোদিনের মধ্যে কিছুটা কমিয়ে দেব।
রাক্ষসের মতো খাস না। খাওয়াটা কমা।
কি খাই বলো। তুমি যা খাও আমিও তাই খাই। বড়োমা তোমার জন্য আলাদা আমার জন্য আলাদা রান্না নিশ্চই করে না।
ওই তো দুপুরে দেখলাম মাংস, ফ্রাইডরাইস গোগ্রাসে গিললি।
আবিদদা বললো।
সামনে কোনও মিষ্টির দোকান পড়বে?
কেন বলো।
একটু দই নে।
মিষ্টি না টক।
দুটোই নে হাফ হাফ। আর একটু নোনতা নোনতা ঝুড়ি ভাজা।
বুঝেছি।
নেপলা রাসবিহারীর মুখে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর জিনিষপত্র কিনে ফিরে এলো। আমি বসে বসে কতো রকমের মানুষ দেখলাম।
ম্যাডাম ফোন করেছিল।
কেনো!
তুমি বর্তমানে কোথায় আছো?
বলেছিস।
হ্যাঁ।
চল। কটা বাজে বল।
দশটা।
এতো বেজে গেছে!
নেপলা গাড়ি ছোটাল। মিনিট খানেকের মধ্যে পৌঁছেও গেলাম।
বাড়ির গেটটা দেখলাম আধভেজানো। গাড়ির হেডলাইটের আলো পড়তেই দরজা খুলে গেল। দেখলাম ভজুরাম দরজা খুলছে।
সামনে দুটো এ্যাম্বাসাডার। আবার কারা এলো?
গাড়ি থেকে নমলাম।
ভজু কারা এসেছে?
অনিমেষদা।
মনে মনে বললাম, এতো রাতে অনিমেষদা, আবার কি হলো?
ভজু এগুলো নিয়ে যা।
কিগো অনিদা।
দেখ, নেপলা বার করছে, নিয়ে আয়।
আমি বাগানের রাস্তা পেরিয়ে বারান্দায় উঠলাম। ঘরের ভেতর থেকে অনিমেষদা, বিধানদা, ডাক্তারদার গলা পেলাম।
আমি সোজা ঘরে ঢুকলাম। একেবারে ডাক্তারদার মুখোমুখি পড়ে গেলাম।
আয় আয়। ছোটো, বাবু এসে পরেছেন।
অনিমেষদা, বিধানদা ঘুরে তাকাল।
আমি ডাক্তারদার পাশে গিয়ে বসলাম।
তোমরা এই সময়!
কেন আসতে পারি না?
সে কথা বলছি না, সে তো আসতেই পারো।
অমিতাভদা আর উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারেনি তাই বললো, দেখে যাও লেখাট। চলে এলাম।
ছোটোমা।
ভজুর ডাকে ছোটোমা রান্নাঘর থেকে মুখ বার করলো।
ওগুলো আবার কি রে?
নেপলা দই-মিষ্টি এনেছে। ফ্রিজে তুলে রাখি।
এখানে জায়গা নেই, দিদির ঘরেরটায় নিয়ে গিয়ে রাখ। অনিদাকে একটু নুনচিনির জল গুলে দে।
কাউকে দেখছি না কেন ছোটোমা, কোথায় গেল সবাই?
ছোটোমা একবার আমার দিকে তাকিয় মুচকি হাসলো।
আশেপাশে গেছে কোথাও, চলে আসবে। ডাক্তারদাদা বললো।
সবাই।
বান্ধবী, এডিটর, মল্লিক, আর মিত্রা গেছে।
অনিসারা।
ওপরে পড়াশুনো করছে হয়তো।
অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
লেখাটা পড়েছো?
হ্যাঁ। সঙ্গে একটা কাগজ নিয়েছি তোর বৌদিকে পড়াব বলে।
এ্যাডভান্স এডিসন।
অনিমেষদা হাসছে।
ফোনে নিশ্চই জানিয়ে দিয়েছো।
তা দিয়েছি।
দাও তোমার ফোনটা দাও। নেপলা ঘরে ঢুকলো।
ফোনের আবার কি হলো? অনিমেষদা বললো।
ব্যাটারি শেষ, সেই দুপুর থেকে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। জানেই না। নেপলা বললো।
সেই জন্য তোর বৌদি ফোনে না পেয়ে সেই রাগটা আমার ওপর ঝেড়ে দিল।
নেপলা ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। ভজু জলের গ্লাস দিল।
নেপলাকে দিয়েছিস?
হ্যাঁ।
ছোটোমা।
চা বানানো হচ্ছে। একটু অপেক্ষা করো।
প্রম্পট উত্তর। বিধানদা বললো।
কাগজটা দাও একটু, আমিই এখনও দেখিনি।
তুই দেখিসনি! ডাক্তারদা বললো।
না। লিখে ওপরে চলে গেলাম কথা বলতে, ফিরে এসে দেখি কাগজ ছাপা হয়ে গেছে।
অনিমেষদা হাসছে।
দ্বীপায়ণ কার্টুনটা জবরদোস্ত দিয়েছে। একেবারে লেখার সঙ্গে মানানসই। প্লেসও করেছে খুব সুন্দর জায়গায়। আবার ভেতরের পাতায় টান রেখেছে। ইদিক নেই উদিক আছে। কাগজটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছি।
নিউজটা দেখেই কাল সকালে অনাদি এসে হাজির হবে। অনিমেষদা বললো।
হলে হবে, কি করবো।
ছেলেটা একটা মিউচ্যুয়াল আন্ডারস্ট্যানডিংয়ে যেতে চাইছে।
চাইলেই হবে কি করে। তার আগে যে শর্তগুলো দিয়েছি মানতে হবে। এত তারাতারি ব্যাপারটা মিটবে না বুঝেছো। তুমি একটা উপকার করতে পারবে—
কি বল।
আমাদের অফিসের ইউনিয়নটা এখন কে দেখে?
সুতনু এখনও দেখছে, তবে ওর হয়ে দুটো ছেলে কাজ কর্মগুলো করে।
ইউনিয়নের পজিসন কি?
কেন বলতো!
আমাদের অফিসে একটা নতুন ইউনিয়ন ফর্ম করছে। শুনেছো?
অনিমেষদা, বিধানদার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকাল।
কি বিধানবাবু আমার কথাটা মিললো।
আমার দিকে তাকিয়ে।
তোকে খবরটা কে দিল বল?
জেনে লাভ, আমি যা বললাম সত্যি না মিথ্যে।
তোর চেলাগুলো সত্যি তোকে প্রাণদিয়ে ভালোবাসে। তোর ক্ষতি কে করবে। তুই যেমন তাদের জন্য করিস, তারাও তোর জন্য বুক চিতিয়ে করে।
তারমানে সত্যি।
হ্যাঁ।
বিধানবাবু আজ সকালেই প্রবীর কি বলছিল। অনির কানে এখনও খবরটা পৌঁছয়নি। পৌঁছলে একবার আমাদের কানে তুলতই। অনুপ আবার তাকে সাপোর্ট করলো।
কারা করছে, কিছু জানাতে পারবে।
ওটা আমি প্রবীরকে আটকানর জন্য দেখতে বলেছি। তোকে ভাবতে হবে না।
তোমার রাজনীতি, আমার রাজনীতির মধ্যে পার্থক্য আছে।
সেই জন্য আজকে আর্টিকেলটা নামালি।
চুপ করে রইলাম।
ছোটোমা চা নিয়ে এলো। অনিমেষদার দিকে তাকাল।
দাদা, নিশ্চই গণ্ডগোল।
এতবড়ো একটা সাম্রাজ্য চালাবে গণ্ডগোল থাকবেনা তা কি হয়?
আর একটা ইনফর্মেশন আমাকে দিতে পারবে।
দাদারা সবাই ঘরে ঢুকলো।
ছোট চা নিয়ে এসো। দাদা বলতে বলতে এসে সোফায় বসলো।
ছোটোমা মনে হয় দাদার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করলো। দাদারা সবাই চুপ করে গেল। আস্তে আস্তে এসে গোল হয়ে সবাই বসলো। বড়োমা আমার পাশে যে টুকু জায়গা ছিল সেখানে এসে বসলো। মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
কোন ব্যাপারে বল। অনিমেষদা বললো।
তোমরা যখন সরকার চালাচ্ছিলে, তখন ফার্মের জমিটা আমি নিয়েছিলাম। আমার যতদূর মনে আছে, সেই সময় সেখানকার জমির দাম যা ছিল সেই দামেই আমি জমিটা সরকারের কাছ থেকে কিনেছিলাম।
এই খবরটার জন্ম তিনদিনও হয়নি। তোকে কে দিল!
যেইই দিক আমি যেটা জানতে চাইছি সেটা বলো?
হ্যাঁ। একজনের নামে জমিটা নেই। যারা ওই ফার্মের ডিরেক্টর তাদের সবার নামেই আছে।
সিলিংয়ের বাইরে আছে না ভেতরে আছে?
দুটো বাইরে ছিল। আমরা থাকাকালীন সেটাও ঠিক করে দিয়েছি।
তার রেকর্ড তৈরি হয়েছিল, না পেন্ডিং আছে?
যতদূর জানি আপটুডেট আছে। তবে দেবাশিস ভালো বলতে পারবে।
বৌদি ওখানকার ডিরেক্টর?
হ্যাঁ।
কাল পরশুর মধ্যে আমি একটা ডিড করবো। বৌদিকে বলবে জমিটা অংশু আর সুরোর নামে ট্রান্সফার করে দিতে। আমি একফাঁকে গিয়ে বৌদিকে নিজে বলে আসবো।
কেন আমি বললে হবে না?
বড়োমা হাসছে।
ওটা নিয়ে ওরা গণ্ডগোল করবে না।
অমূল্য তোমাদের হাতে আছে না বেরিয়ে গেছে?
অনুপ দুদিন সময় চেয়েছে। আমি এখনও হাত দিইনি। হাত লাগালে অমূল্য বেঁচে ফিরবে না।
চলবে —————————
from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/4ThYdH3
via BanglaChoti
Comments
Post a Comment