কাজলদিঘী (১২১ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১২১ নং কিস্তি
—————————

এতদিন পর আমার কথা মনে পরলো। তোর লেখা প্রতিদিন চায়ের দোকানে বসে পড়ি। সবাইকে তোর কথা বলি বুঝলি। সবাই বলে আমি নাকি বিশ্ব চিটিংবাজ, ঢপবাজ, বাওলি দিই সকলকে। কেউ বিশ্বাস করে না। তুই যে আমার এক কালের বন্ধু ছিলি….।

নিমেষের মধ্যে ঘিরে ধরা ভিড়টার রং বদলে গেল। দুটো বয়স্কা মেয়ে ছুটে চলে গেল বাড়ির ভেতর। হয়তো খবর দিতে।

পদু কিছুতেই আমাকে ছাড়তে চায় না। ভিড়ের মধ্যে এবার হাসাহাসি শুরু হয়েছে। এই প্রথম মনে হয় কেউ পদুর সঙ্গে দেখা করতে এসে ওকে মারধোর করলো না।

যা জামাটা পরে আয়। হরিদার দোকানে বসে একটু চা খাই।

হরিদা মরে গেছে। দোকানও উঠে গেছে।

আসার সময় দেখলাম যে দোকানটা।

ওটা এখন হরিদার নেই। পার্টির একটা ছেলে জোর করে দখল করে নিয়েছে।

ওর দিকে তাকলাম!

ভেতরে চল।

আজ না। একটু তাড়া আছে। আর একদিন এসে জমিয়ে সবার সঙ্গে আলাপ করবো।

আর আসছিস। তিরিশ বছর পর সময় পেলি। আবার কবে তোর সময় হবে কে জানে।

একটা বছর ষোল মেয়ের দিকে তাকালো।

ও অজন্তা তোর মাকে একবার ডাক, আমার একটা জামা নিয়ে আয়।

মেয়েটা নাচতে নাচতে ভেতরে গেল।

আমি যেন আলিপুর চিড়িয়াখানার দ্রষ্টব্য জীব। সবাই আমার দিকে সেরকম ভাবেই তাকিয়ে আছে। বিশ্বাসের নাম গন্ধ তাদের চোখে লেখা নেই।

একজন ভদ্রমহিলা ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন।

তারও শরীরের অবস্থা সবল নয়।

একসময় যৌবন ছিল। এখন দারিদ্র ঝড়ে একেবারে বেশো কাঠ। চোখ গুলো বেশ টানা টানা পান পাতার মুখটায় হাড় বেরিয়ে পড়েছে….।

দেখো ছায়া আমি বিশ্ব চিটিংবাজ কিনা। তোমাদের কতোবার বলেছি অনি আমাদের এককালের বন্ধু ছিল। ওই রাস্তায় কতো ক্রিকেট খেলেছি ওর সঙ্গে। আজ বিশ্বাস হচ্ছে।

আমার দিকে তাকাল।

জানিস অনি, মেয়েটা লেখাপড়া করে, সে ভি পর্যন্ত বিশ্বাস করতে চায় না, তুই আমার বন্ধু। বলে সব ফালতু।

আমি বুকের ওপর হাত তুলে নমস্কার করলাম।

মেয়েটার গালটা একটু টিপে দিলাম।

ঘরে আসুন।

আজ থাক। একটু তাড়া আছে। আর একদিন আসবো।

মেয়ের হাত থেকে জামাটা নিয়ে পদু গলালো।

ওদিক দিয়ে নয়, এদিক দিয়ে চল।

আমি হাঁটতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম।

কেন!

অসুবিধে আছে।

পদুর পাশে পাশে হাঁটতে আরম্ভ করলাম।

ঝুনের বাড়িতে গেছিলাম।

ওরা এখান থেকে চলে গেছে।

কোথায়?

মধ্যমগ্রাম। বাড়ি করেছে।

একটা ভালো খবর দিলি।

ঝুনের বাবা মারা গেল। ঝুনে একটা সরকারি চাকরি পেয়ে গেল। সংসারটা রক্ষা পেল।

ওর দাদারা যে ছিল।

সব শালা হারামী। বুঝলি।

পদুর দিকে তাকালাম।

ওর ওপর চার বোনকে গছিয়ে দিয়ে ফেটে পরলো। একভাইয়ের তো এখন তোর মতো বেশ নাম ডাক হয়েছে।

কে বলতো?

ওই যে, যে নাটক করতো।

ওর সেজদা?

হ্যাঁ। এখন তো টিভিতে সিরিয়াল করছে চুটিয়ে। আবার নাটকের দলও করেছে।

সংসারে কোনও কনট্রিবিউট করে না?

ছাড়। আগে করতো কখনও।

চুপ করে থাকলাম।

একটু নাম ডাক হতেই ফেটে পরলো। বলে কিনা এরকম জায়গায় কেউ থাকে নাকি।

মনে মনে ভাবলাম পদুর কথা বার্তা এখনও পরিবর্তন হয় নি। পরিবেশের দোষ। সে যাক।

বোনেদের বিয়ে দিয়েছে?

ছোটটা বাকি আছে। বোনের বিয়ে না দিয়ে নিজে বিয়ে করতে পারছে না।

বড় রাস্তায় এসে পড়লাম।

ওকে বলেছি। এই বুড়ো বয়সে তোকে কেউ মেয়ে দেবে না।

পদু কল কল করছে। না বলা কথা এক নিমেষে উগরে দিতে চাইছে।

তোকে দেখে ভীষণ ভালো লাগছে।

অনেকদিন পর তোকে দেখেও ভালো লাগছে। এখানে থাকার সময় তোদের দুজনের সঙ্গেই বেশি মিশতাম।

তুই বিয়ে করেছিস?

মিথ্যে কথা বললাম। মেয়ে পাচ্ছি না।

চারদিকে এতো মেয়ে গিজ গিজ করছে আর মেয়ে পাচ্ছিস না!

হাসলাম। বুড়ো হয়েগেছি।

তবু তোকে দেখলে অনেকে মেয়ে দেবে।

হঠাৎ একটা বুড়োটে মার্কা লোকে ছুটতে ছুটতে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমাকে বাঁচাও। আমি আর করবো না।

সামনে তাকিয়ে দেখি দুটো বছর তেইশের ছেলে হাতে জুতো নিয়ে তেড়ে আসছে।

শুয়োরের বাচ্চা। কতদিন বলেছি, ওখানে তুই লুঙ্গি তুলে শুবি না। মা বোনেরা রাস্তা দিয়ে চলতে পারে না।

সপাং সপাং করে জুতোর বাড়ি মেরেই চলেছে।

ঘটনা পরম্পরায় সম্বিত ফিরতে সামান্য সময় লাগলো।

তাকিয়ে দেখলাম যে আমাকে জড়িয়ে ধরে রয়েছে তার নাক মুখ দিয়ে রক্ত ঝড়ছে। মুখটা এরই মধ্যে বেশ ফুলে গেছে।

হারামী চিটিংবাজটাও রয়েছে দেখছি। ক্যালা শুয়োরের বাচ্চাটাকে।

ভয়ার্ত চোখে পদু আমার পেছনে লুকিয়েছে।

দিগবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে সজোরে একটা থাপ্পর মারলাম। ছেলেটার গালে।

ছিটকে পরে গেল ছেলেটা। আর একজন তেড়ে আসতেই একটা ঘুসি মারলাম।

মাটিতে আছাড় খেয়ে পরলো।

উঠে পড়েই দুজনে দৌড় লাগাল।

শুয়োরের বাচ্চা, কতোবড়ো দাদা হয়েছিস দেখছি দাঁড়া। একবাপের ব্যাটা হলে এখানেই দাঁড়াবি। অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিতে দিতে ছেলেগুলো চলেগেল।

অনি তুই চলে যা। এরা পার্টির ছেলে।

তাতে কি হয়েছে?

একটা হেস্ত নেস্ত করেই ছাড়বে। তোকে মারধর করবে।

ভয়ার্ত মুখে পদু আমার দিকে তাকিয়ে। চোখ মুখ মুহূর্তের মধ্যে শুকিয়ে গেছে।

থাম তুই। চেঁচিয়ে উঠলাম।

মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে গেল। নিজেরই কেমন লাগছে।

অনেকেই দেখছি আমার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে। কেউ কাছে এগিয়ে আসছে না।

লোকটা তখনও আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। ভয়ে থর থর করে কাঁপছে।

ফোনটা পকেট থেকে বার করে লোকাল থানায় ফোন লাগালাম। নিজের পরিচয় দিতেই থানার সেই ভদ্রলোক স্যার স্যার করে উঠলো।

জায়গার নাম বলে বললাম আমি এখন এখানে দাঁড়িয়ে আছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুলিস ফোর্স পাঠান। নাহলে যা ব্যবস্থা নেওয়ার তা আমি নেব।

আমার রুদ্রমূর্তি দেখে দেখলাম দু-চারজন আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো।

কি শুরু করেছে বলতো এরা। যাকে যখন খুশি মারধোর করবে, অপমান করবে আর আমাদের চুপ চাপ মুখ বুঁজে সহ্য করতে হবে।

মনে মনে বললাম সব ব্যাটার আস্ফালন পেছনে।

পকেট থেকে রুমালটা বার করে পদুর হাতে দিয়ে বললাম, যা তো এটা ভিঁজিয়ে নিয়ে আয়। দেখি ওদের ঘাড়ে কটা মাথা আছে।

আমার কথা শুনে পদু মনে হয় একটু সাহস পেল।

আমি লোকটাকে ধরে ধরে ফুটপাথে নিয়ে এসে বসালাম।

আমাকে ঘিরে ভিড়টা একটু একটু বাড়ছে।

কতদিন থেকে লোকটা এই পাড়ায় আছে। তোদের একটু মায়া দয়া হয় না। ও যদি সুস্থ থাকতো, তাহলে কি এরকম করতো। বলিহারি ওদের বাড়ির লোককেও।

পদু রুমালটা সামনের চায়ের দোকান থেকে ভিঁজিয়ে আনলো।

তখনও ওর হাত কাঁপছে।

অনি।

ওর দিকে কটকট করে তাকালাম। তারপর সেই বুড়োটে মার্কা লোকটার দিকে তাকালাম। লাইট পোস্টের আলো মুখে এসে পড়েছে।

এবার ভালো করে লক্ষ্য করলাম। তিরিশ বছর আগের দেখা নাদুস নাদুস থল থলে চেহারার ভেঁদোদা নয়, এ একবারে ভাঙাচোড়া মুখ। না খেতে পেয়ে শুকিয়ে বাসি রুটির মতো হয়ে গেছে। আমার দিকে কেমন যেন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো।

পদু ভিঁজে রুমালটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। ফিস ফিস করে বললো, পার্টি অফিস থেকে দলবল নিয়ে ওরা আসছে।

ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালাম।

আমার পরনের গেঞ্জিতে ভেঁদোদার ফাটা ঠোঁটের কয়েক ফোঁটা রক্তের দাগ লেগেছে।

আমি রুমাল দিয়ে মুখটা মুছিয়ে দিলাম। ভেঁদোদার হাত-পা কাঁপছে।

এখানে কি করতে মরতে পরে রয়েছো?

সবাই আমার কথায় কেমন ভাবে যেন তাকাচ্ছে।

ভেঁদোদাও আমার দিকে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। ঠোঁটটা আগের থেকে অনেক বেশি ফুলে গেছে।

তুই চিনতে পেরেছিস! পদু বললো।

হ্যাঁ। ঝুনে নিয়ে যেতে পারে নি।

বহুবার নিয়ে গেছে। ধরে রাখতে পারেনি। ঠিক পালিয়ে এসেছে। দোকানটা ভেঙে বাড়ি হওয়ার পর ওর পাগলামোটা কেমন যেন বেড়ে গেছে। মেসোমশাই মারা গেলেন। সর্বেশ্বর জ্যেঠুর স্ট্রোক হলো। দোকান থেকে ওর চাকরি গেল। সহ্য করতে পারলো না বেচারা। দিশেহারা হয়ে পড়লো।

তোরা পাড়ার ছেলেরা কি করছিলি?

এ পাড়া কি সেই পাড়া আছেরে।

একটা হই হই শব্দ এগিয়ে আসছে।

পদুর চোখের চেহারা বদলে গেল। আস্তে করে বললো।

অনি আমি যাই।

একবারে যাবি না। এখানে দাঁড়িয়ে থাক। এক একটার টুঁটি টিপে ছিঁড়ে দেব। দেখি ওদের কটা বাপ আছে। আমার তারস্বর চিৎকারে পদু থমকে গেল।

চেঁচামিচির শব্দে ভিড়টা কিছুটা ফাঁকা হলো, কিছুটা রয়ে গেল। ভেঁদোদা উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে আবার জাপ্টে ধরেছে।

তোমার ভয় নেই তোমাকে কেউ মারবে না। আমি আছি।

ওরা মারবে। প্রতিদিন মারে। শুতে দেয় না।

চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।

অকথ্য ভাষায় গোটা পনেরো ছেলে কাঁচা কাঁচা খিস্তি দিতে দিতে এগিয়ে এলো।

আমার কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। কয়েকজন তখনও তরপে চলেছে।

শালাকে মেরে দে, দরদী হয়েছে।

একজন এসে কলারটা ধরতে যাবার আগেই পুলিশের গাড়ির হুটার বেজে উঠলো।

পদু ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে আমার পেছনে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশকে কোন শুয়োরের বাচ্চা খবর দিল। আজ শালা পুলিশের গাড়িই ভাঙ। তারপর এই শুয়োরের বাচ্চাকে দেখবো। একজন বলে উঠলো।

গাড়িটা এসে ঠিক ভিড়ের সামনেই দাঁড়ালো। কেউ তরপাচ্ছে কেউ চুপ করে আছে।

আপনাকে কে খবর দিল? একজন মাতব্বর গোছের ছেল বলে উঠলো।

তোদের বলতে হবে নাকি। কথাটা বলতে বলতে ওসি গাড়ি থেকে নামলেন।

অবশ্যই। না হলে গাড়ি আর থানায় ফিরে যাবে না।

মেরে পোঁদের ছাল তুলে দেব।

ক্ষমতা থাকে করে দেখান। এই চাঁদুদাকে ডাক তো।

ওসি সাহেব চুপ করে রইলেন, আমার দিকে তাকালেন।

ভেঁদোদা তুমি ছাড়ো, কোনও ভয় নেই আমি আছি।

ওরা মারবে।

কেউ মারবে না।

ভিড়টা ক্রমশঃ বাড়ছে।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে হাতজড়ো করে নমস্কারের ভঙ্গিতে এগিয়ে এলাম।

উনি প্রীতি নমস্কার করলেন।

আপনার নাম শুনেছি, আগে কখনও দেখিনি। তাই নিজে এলাম।

এরা কোন পার্টির ছেলে?

একটা ছেলে তেরে এসে আমার কলার ধরতে গেল।

ওমনি ওসির চওড়া হাতের একটা থাপ্পর সজোরে পরলো ছেলেটার গালে। তারপর ভ্যান থেকে কয়েকজন পুলিস নেমে বেধড়ক পেঁদাতে আরম্ভ করলো। নিমেষের মধ্যে দেখলাম একটা হইচই পড়ে গেল।

ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন। সরি।

এবার দেখলাম। ছেলেগুলোর তরপানি সামান্য থেমেছে। তবু কেউ কেউ তরপে চলেছে।

গায়ে হাত তুললেন, ব্যাপারটা ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। কাল থানা ঘেরাও হবে।

ওসি আমার দিকে তাকালেন।

আপনি বললে, আমি এ্যারেস্ট করে নিয়ে যাচ্ছি।

চাঁদু কে?

এখানকার এলসি।

ওকে একবার ডাকুন?

না মানে, বোঝেনই তো। ওসি তোতলাচ্ছে।

পকেট থেকে ফোনটা বার করলাম।

পদু কাছাকাছি কোনও ডাক্তার থাকলে একবার ডাক।

পদু আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।

তোর গায়ে যদি হাত পরে তার নামটা আমাকে বলবি, তারপর দেখবো কতো বড়ো পার্টির নেতা আছে তাকে বাঁচায়।

এবার সকলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।

আপনি ফোন করবেন, না আমি ফোন করবো।

এবার দেখলাম চেঁচামিচি একেবারে থেমে গেছে।

ওসি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

আমি ফোনটা ডায়াল করে কানে ধরলাম।

চারদিক নিস্তব্ধ। যে ছেলেগুলো তেড়ে এসেছিল তারা দেখলাম দু-চার-ঘা মার খেয়ে সব চুপসে গেছে।

হ্যালো।

বল। অনুপদার গলা পেলাম।

কি করছো?

এই একটা মিটিং সেরে বেড়োলাম।

হঠাৎ আমার পুরনো পাড়ায় ঘুরতে এসেছিলাম। এখানে এসে দেখলাম তোমার পার্টির ছেলেরা প্রশাসন চালাচ্ছে, পুলিসের আর দরকার নেই।

হেঁয়ালি না করে কি হয়েছে বল।

পার্টির ছেলেদের কি পাগলদের মেরে ফেলার দায়িত্ব দিয়েছ।

ঠিক আছে আমি ওখানকার ওসি আর এলসিকে খবর পাঠিয়ে দিচ্ছি।

লাইনটা কেটে গেল।

ফোনটা পকেটে রাখলাম।

চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছি। বেশ হুলুস্থূলুস পড়ে গেছে।

কে ওকে মারছে, কেন মারছে, কি দোষ করেছে ও। কাঁদতে কাঁদতে একদঙ্গল মেয়ে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে এলো। দেখলাম পদুর বৌ আর মেয়েও তার মধ্যে আছে।

দাদা ও কোথায়, পদুর বৌ কাঁদতে কাঁদতে আমার হাতটা ধরে জিজ্ঞাসা করলো।

ওসির ফোনটা দেখলাম বেজে উঠেছে কানে চেপে ধরেছে।

আমার চোয়াল দুটো মুর্হু মুর্হু শক্ত হয়ে উঠছে।

ওকে ডাক্তার ডাকতে পাঠিয়েছি।

কেন! ওকে কে মেরেছে?

কেউ মারে নি।

সবাই যে বললো ওকে মেরেছে, আপনার সঙ্গে মারপিট হয়েছে।

কিছু হয় নি তো বললাম। চেঁচিয়ে উঠলাম।

পাশে দাঁড়াও। আমার গলার স্বরটা কর্কশ শোনাল।

আমি ওসির দিকে তাকালাম।

চোখে হাসি মুখ গম্ভীর।

কি বললো?

আপনি যে ভাবে ব্যবস্থা নিতে বলবেন। সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার এলাকার এলসিকে ডাকুন।

এখুনি এসে পরবেন।

ভিড়টা সামান্য পাতলা হচ্ছে।

যে ছেলেদুটোকে আমি মেরেছিলাম তাদের কিছুক্ষণ আগেও এই ভিড়ের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম এখন আর দেখতে পাচ্ছি না।

একটা ছোটো ব্যাপারকে এরকম ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড়ো করলে চলে। তোদেরও বলি কেন ঝামেলায় জড়াতে যাস।

এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক ভিড় ঠেলে ভেতরে এলেন। আমার দিকে তাকিয়েই গদো গদো হয়ে হাত জোড় করলেন। ওসির দিকে তাকালেন।

আপনাকেও বলি। এলাকার গণ্ডগোলটা আপনি দেখবেন, না কি আমি দেখব।

আমার দিকে হাতজোড় করে এগিয়ে এলেন।

আপরাধ নেবেন না।

সকলে অবাক হয়ে ভদ্রলোকের কীর্তি দেখছেন।

পদু একজনকে নিয়ে ভিড় ঠেলে ভেতরে এলো।

চিটিংবাজটা আবার কোথা থেকে এলো। চাঁদু বলে উঠলো।

পদু এবার তরপে উঠলো।

ওকে চেনেন। আমার বন্ধু। ওর কথায় ডাক্তারবাবুকে ধরে নিয়ে এলাম।

ভদ্রলোকের চোখের রং বদলে গেলো। ব্যাপারটা এরকম! তাই নাকি!

ওর গায়ে চিটিংবাজ কথাটা লেখা আছে।

না মানে। ভদ্রলোক এবার তোতলাতে শুরু করলেন।

আপনি কতদিন এই তল্লাটে এসেছেন।

পোনেরো বছর।

ভেঁদোদাকে চেনেন।

ওর নাম ভেঁদো নাকি? পাগল ছাগলদের নাম কি করে মনে রাখা যায় বলুন।

যে কজন মারতে তেড়ে এসেছিল সবকটাকে থানায় পাঠিয়ে দিন। নন বেলেবেল অফেন্স। আর যে দুটো ভেঁদোদাকে মেরেছে তাদের এ্যাটেম্পট টু মার্ডার কেসের আসামী বানাবে। নাহলে তাদের মদত দেওয়ার অপরাধে আপনাকে তুলে নিয়ে যেতে বলবো।

এ আপনি কি বলছেন!

কার ফোন পেয়ে এখানে এসেছেন?

ভদ্রলোক এবারে পুরো তোতলাতে আরম্ভ করেছে।

আবার ভিড়ের মধ্যে একটা হই হই শব্দ।

আপনার চেলাদের বলে দিন। হই হই বন্ধ করতে, এখনও মিডিয়াতে খবর দিই নি। দিলে আপনি হালে পানি পাবেন না।

ওসির দিকে তাকালাম।

কাছাকাছি কোনও এ্যাম্বুলেন্স থাকলে একটু ডেকে পাঠান।

আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। চাঁদু বলে উঠলো।

আপনাকে কিছু করতে হবে না। আপনাকে যে দায়িত্ব দিলাম তার ব্যবস্থা করুণ।

আমি ভেঁদোদার দিকে এগিয়ে গেলাম।

ডাক্তারবাবু ভালো করে দেখছেন।

ডাক্তারবাবু মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন।

যেমনটি দেখছেন আপনি রিপোর্টে তাই লিখবেন বাড়িয়ে লিখবেন না। আবার কমিয়েও লিখবেন না। আমি এখুনি হাসপাতালে পাঠাবো। সেখানে আপনার রিপোর্টের সঙ্গে গড়বড় হলে আপনার রেজিস্ট্রেসনটা ক্যানসেল হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।

ভদ্রলোক আমার দিকে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ।

চাঁদুবাবু এগিয়ে এলেন।

হতচ্ছাড়াগুলো এইভাবে মেরেছে। হ্যাঁরে তোদের বাড়িতে কি ভাই-দাদা নেই।

ওসি সাহেবের দিকে তাকালাম।

আপনি যা দেখলেন যা শুনলেন নোট ডাউন করে নিন আমি সই করে দেব।

স্যার একবার থানায় গিয়ে একটু ঠাণ্ডা মাথায়….।

আমি জীবনে খুব কম কমপ্রমাইজ করেছি। আপনি না পারলে আমাকে সিপিকে ফোন করতে হবে।

না না স্যার আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

পদু ছেলে দুটোর নাম কিরে।

পদু তরতর করে বলে দিল।

যেগুলো তেড়ে এসেছিল।

পদু গড়গড় করে সব নাম বলে যাচ্ছে।

এলসি চাঁদুবাবুর মুখ শুকিয়ে আমশি হয়ে যাচ্ছে।

ওসির দিকে তাকালাম সব নাম নোট করে একটা কপি আমাকে দিন। যে ভাবে বললাম সেইভাবে জেনারেল ডাইরী না এফআইআর করুণ।

ভিড় কিন্তু এবার আগের থেক অনেক বেড়ে গেছে।

পার্টির হম্বিতম্বি করা ছেলেগুলোকে ভিড়ের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি না।

আমি ফোনটা পকেট থেকে বার করলাম।

স্যার আর ফোন-টন করবেন না। আমরা সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। চাঁদু বলে উঠলো।

এই ছেলেটার দায়িত্ব নিতে পারবেন?

চুপ করে গেল।

মানসিক হাসপাতালের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ আছে। ওসির দিকে তাকালাম।

আমরা সেখানে পাঠাবার দায়িত্ব নিচ্ছি।

মুখে বলছেন না কাজে করে দেখাবেন।

আবার ভেঁদোদার দিকে এগিয়ে গেলাম।

কেমন দেখলেন ডাক্তারবাবু।

আপনাকে দেখে কথা-বার্তা শুনে মনে হচ্ছে আপনি খুব সজ্জন ব্যক্তি। নতুন করে কি বলবো। আগেও ওকে অনেকবার দেখেছি।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে মানিপার্টস থেকে আমার ভিজিটিং কার্ডটা ওনার হাতে দিলাম।

আমার কি সৌভাগ্য। যাকে প্রতিদিন কথার মাধ্যেমে দেখেছি আজ তাকে চাক্ষুষ সামনা সামনি দেখতে পাচ্ছি।

আপনি আমার একটা উপকার করবেন।

বলুন।

একটু পাভলভে নিয়ে গিয়ে ভেঁদোদাকে ভর্তি করে দিয়ে আসবেন। টাকা পয়সা যা লাগে আমি আপনাকে দিচ্ছি।

আপনি যদি আমাকে একটু বিশ্বাস করেন।     

বলুন।

ও সেরকম পাগল নয়। আমি যতটা ওয়াচ করেছি। ওকে ঘরে থাকতে দিলেও ও থাকবে না। আমার বাড়ির শিঁড়ির তলায় যদি ও থাকে।

আপনি বলছেন, আপনার পরিবার হয়তো মেনে নেবে না। জায়গাটা নোংরা করবে। প্রতিদিন কে পরিষ্কার করবে বলুন।

ঠিক বলেছেন।

আপনি ওকে পাভলভে ভর্তি করুণ। পারলে একটু দেখভাল করবেন। আমি বলছি ও সুস্থ হয়ে উঠবে। একসময় ও আমাদের সঙ্গে খেলতো। একশো কেজির বস্তা লড়ি থেকে নামিয়ে পিঠে করে সর্বেশ্বরজ্যেঠুর দোকানের ভেতরে রেখে আসতো।

আপনি গড় গড় করে অনেকক্ষণ থেকে অনেক কথা বলছেন, আমি শুনছি। আপনি কি এই পাড়ায় থাকতেন?

সে বহুবছর আগে, আমার কলেজ লাইফে। একদিন এসে গল্প করবো।

পদুর দিকে তাকালাম।

মানিপার্টস থেকে টাকা বার করলাম। পদুর হাতে দিয়ে বললাম। একগ্লাস গরম দুধ, ডিম, কলা পাঁউরুটি জোগাড় করে ভেঁদোদাকে খাওয়া।

পদুর বউটাও দেখি ফুটপাথের ওপর থেবড়ে বসে পরেছে। আমার মুখের দিকে কেমন ভাবে তাকিয়ে। মেয়েটার অবস্থাও এক। সঙ্গে যারা এসেছে তারা ভাবছে সিনেমা দেখছি।

তখনও দেখছি ওসি, চাঁদুবাবু দুজনে কাকে ফোন করে চলেছে।

কি ডিসিসান নিলেন?

এবারটার মতো স্যার ক্ষমা করে দিন। আপনাকে কথা দিচ্ছি আর কোনওদিন হবে না। চাঁদু এগিয়ে এলো।

আপনার ওই ছেলেদের ডাকুন কোন মা-বোন ওর জ্বালায় রাস্তা-ঘাটে হাঁটতে পারে না তাদের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতো ভাবে একবার কথা বলবো।

চ্যাংড়া ছেলে ভুল করে ফেলেছে।

সেই জন্যই পনেরোদিন ঘানি ঘুরিয়ে আসুক, পোঁদে একটা দাগ পরুক। নাহলে আপনি আপনার গদি রক্ষা করতে পারবেন না। আপনার পেছনে লেগে যাব। সবিশেষ আমার পরিচয় দেওয়ার আর দরকার নেই।

একি বলছেন স্যার। চাঁদুবাবু আমার হাত চেপে ধরলেন।

ভিড় কখনও পাতলা হচ্ছে কখনও ঘন হচ্ছে। অনেকেই বেশ মজা লুটছে।

ডাক্তারবাবু উঠে আমার কাছে এগিয়ে এলেন।

প্রেসকিপশনটা দিন।

আমি চেম্বারে গিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

আপনি কি ব্যবস্থা করতে পারবেন?

আপনি বললে নিশ্চই যাব।

ওসিকে বললাম পাভলভে ফোন করে একটা এ্যাম্বুলেন্স চেয়ে পাঠান।

ডাক্তারের দিকে তাকালাম।

আপনার ভিজিট ফি।

লাগবে না। সামাজিক কাজকর্ম আমরাও কিছুটা করি।

ডাক্তারবাবু বিদায় নিলেন।

পদু কথা রেখেছে। যা যা বলেছিলাম জোগাড় করে এনে ভেঁদোদাকে খাওয়াল। দেখলাম ওর বউ মেয়ে যারা সঙ্গে এসেছিল, তারাও ভেঁদোদাকে শুশ্রুষা করছে।

আমি ওকে থানায় নিয়ে যাচ্ছি। আপনি একবার কাল হাসপাতালে ফোন করবেন, দেখবেন সব কাজ হয়ে গেছে। আপনাকে কথা দিচ্ছি ওর কোনও অসুবিধে হবে না। ওসি হাতজোড় করলেন।

পদুকে ডাকলাম। উঠে এলো।

তুই ঝুনেদের বাড়িটা চিনিস?

একবার গেছি।

কাল ওকে নিয়ে আমার অফিসে একবার যাবি। ভেঁদোদাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে চায়ের দোকানে একবার আয়।

আপনি যদি একটু পার্টি অফিসে যেতেন। চাঁদু হাতজোড় করলেন।

কেনো আমি কি আপনার পার্টির সদস্য।

ভদ্রলোক আমার কথার টোনে কেমন চুপ করে গেলেন।

ভদ্রভাবে পার্টিটা করুণ না হলে নাঙ্গা করে এই পাড়াটা ঘুরিয়ে দেব।

এতো লোকের মাঝে এই ভাবে যে ওনাকে বলতে পারি সেটা বুঝতে পারে নি।

কেমন থতমতো খেয়ে গেল।

আমি সোজা হাঁটতে হাঁটতে চায়ের দোকনাটায় চলে এলাম।

সেখানেও দেখলাম বেশ ভিড় একটা বছর পঁচিশের ছেলে চা বানাচ্ছে।

আমাকে দেখে ভিড়টা কেমন ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে গেল। যে দু-চারজন বসে রইলো। তারাও দেখলাম মুখে কুলুপ আঁটলো।

ভাই একটু চা খাওয়াবেন।

ছেলেটি আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকালো। ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।

বেঞ্চিতে বসলাম। জলের মগটা নিয়ে একটু জল খেলাম।

পুলিশের গাড়িটা দেখলাম চলতে শুরু করেছে। ভিড়টাও দেখলাম একটা চাপা স্বরের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে পাতলা হয়ে গেল।

পদু এগিয়ে আসছে। পেছেনে দেখলাম আরও দু-চারজন।

পদুর পা যেন আজ মাটিতে পড়ছে না। ওর চলন বলন সেই কথাটাই বার বার উচ্চারণ করছে। কাছে এসেই চেঁচিয়ে উঠলো।

বিকাশ একটু গরম গরম চা খাওয়া। স্পেশ্যাল।

ছেলেটা হয়তো অন্যদিন হলে কিছু বলতো, আজ একবারে কিছু বললো না।

আস্তে করে বললো, বসো বানাচ্ছি।

পদু এসে আমার পাশে বসলো।

তুই এদের চিনতে পারছিস।

আমি অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকালাম।

চিনতে পারছিস না?

না।

তখন আমাদের সঙ্গে একসাথে খেলতো। একে একে সবার নাম বলে গেলো।

আমি একটা নামও মনে করতে পারলাম না।

পদুদা সবার জন্য চা হবে।

হ্যাঁ।

ছেলেটা একটা থালার ওপর চায়ের ভাঁড় বসিয়ে কাছে এগিয়ে এলো।

আমি একটা তুলে নিলাম।

বাইরেটা দেখলাম ইতি উতি জটলা পেকে আছে।

একটা ঢেউ যে এই মুহূর্তে এই পাড়ায় আছড়ে পড়েছে সেটা বুঝতে পারলাম।

ঠোঁটে গরম চা ছোঁয়ালাম। ছেলেটা চা-টা ভালো বানিয়েছে। একটু এলাচ দিয়েছে।

বিকাশ দুটো করে বিস্কুট দে।

বিকাশ একবার পদুর দিকে বাঁকা চোখে তাকাল।

ব্যাপারটা এরকম, সব বুঝতে পারছি।

পদু তেড়ে তখনকার দিনের গল্প করা শুরু করেছে।

সবাই ওর কথায় হ্যাঁ হুঁ করছে।

একটা ছেলে হন্তদন্ত হয়ে দোকানের সামনে এস দাঁড়াল।

অনিদা কে আছেন?

চা খেতে খেতে ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম।

সেই ছেলেটা। সর্বেশ্বরজ্যেঠুর দোকানে বসে যে পরিচয় দিয়েছিল আমি ওনার ছেলে।

কেনরে দুলু। পদু বলে উঠলো।

বাবা একবার ডাকছেন ওনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চান।

পদু আমার দিকে তাকাল।

সর্বেশ্বরজ্যেঠুর ছেলে। এখন ওইই দোকানের সর্বেসর্বা।

আমি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছি। খুব চালাক ছেলেটা, আমার চোখের দিকে বেশিক্ষণ চোখ রাখতে পারলো না। চোখ নামিয়ে নিল।

তুই যা ও পড়ে যাচ্ছে।

ছেলেটা আর দাঁড়াল না। চলে গেল।

আমি চা খেয়ে একটা সিগারেট চাইলাম।

বিকাশ ছেলেটি আমার দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিল। সঙ্গে একটা দেশলাই দিল।

আমি সিগারেট ধরালাম।

মনটা কেমন যেন খচ খচ করছে। এরা কি এখনও তাহলে শোধরায় নি?

উঠে দাঁড়ালাম। মানি পার্টস থেকে একটা একশো টাকার নোট নিয়ে বিকাশের হাতে দিলাম। ছেলেটি ব্যালেন্স ফেরত দিল।

পদুর দিকে তাকালাম।

তুই একবার ডাক্তারের কাছ থেকে প্রেসকিপশানটা নিয়ে সর্বেশ্বরজ্যেঠুর বাড়িতে আয়।

ঠিক আছে।

তুই এলে আমি বেড়োব।

আচ্ছা।

আমি রেশন দোকানটার সামনে এসে দাঁড়ালাম।

দেখলাম সাটারটা নামান একটু এদিক ওদিক তাকালাম।

দুলু কাছে এসে দাঁড়াল।

সরি অনিদা তখন আপনাকে চিনতে পারিনি।

তুমি তো আমাকে আগে কখনও দেখনি, চিনবে কি করে।

সেটাও ঠিক। তখন ঝামেলার সময় আপনার পরিচয় পেলাম। কি মনে হলো, দোকান বন্ধ করে বাবাকে গিয়ে বললাম, এরকম একজন লোক তোমার নাম ধরে খুঁজতে এসেছিল। তারপর বাবাকে ঘটনাটা বললাম।

বাবা সব শুনে বললো, এ সেই ছেলে, দেখ ওকে খুঁজে পাস কিনা। একবার নিয়ে আয়, চোখের দেখা দেখি একবার। কতো গালাগাল দিয়েছি তখন।

বাড়ির গেট খুলে দুজনে ঢুকলাম। বাইরে থেকে বোঝা যায় না ভেতরটা এতো বড়ো। নিচটা গাড়ি রাখার জায়গা। আবার লিফ্টও আছে।

দুজনে লিফ্টে উঠলাম।

পদুদার সঙ্গে কি আপনার সেই সময়ে আলাপ?

হ্যাঁ।

উনি কতদূর পড়াশুনো করেছেন?

তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়তো সিটি কলেজে। তবে পাশ করেছে কিনা বলতে পারবো না।

ভেঁদোদাকে এ পাড়ার সকলে ইলট্রিট করে।

তোমরা কিছু বলতে পারো না?

কি বলবো। জোড় যার মুলুক তার। তবু সকালে দোকানের সামনে এসে বসলে খাবারটা দিতাম।

তুমি ওর সম্বন্ধে কিছু জান?

বাবার মুখ থেকে শুনেছি।

ওকে দোকানে রাখ নি কেন?

মাঝে ওরা চলে গেল। বাবা যতদিন বসতেন ততদিন ছিল, বাঁশীজ্যেঠু মারা যাওয়ার পরও দোকানে রাখা হয়েছিল। বাঁশীজ্যেঠু মারা যাওয়ার পর ভেঁদোদা কেমন যেন হয়ে গেল। সারাটা দিন দোকানের সামনে এসে বসে থাকতো। তাই একটা কাজের লোক রাখা হয়েছিল। তারপর সব কেমন যেন বদলে গেল। ওরাও এখান থেকে চলে গেল।

লিফ্ট এসে চারতলায় দাঁড়াল। আমরা নেমে এলাম।

লিফ্ট থেকে নেমে বাঁদিকের ঘরটা সর্বেশ্বর জ্যেঠুদের।

তোমরা এতো উঁচুতে ফ্ল্যাট নিলে।

প্রমোটার যেমন দিয়েছে। বাবা দোতলায় চেয়েছিলেন। অনেক পয়সা চাইল। বাবা দিতে পারেন নি। চারতলারটা কোনও প্রকারে নিয়েছি। ব্যাঙ্ক লোন। এখনও শোধ করতে পারি নি। রেশনিংয়ের অবস্থা জানেন। লোকে শুধু চিনিটা নিতে আসে। খোলা বাজারে রেশন দোকান থেকে কম দামে ভালো চাল পাওয়া যায়। লোকে কেন কিনবে বলুন।

আমি দুলুর দিকে তাকালাম।

বেল বাজালো।

একজন কম বয়সী মেয়ে দরজা খুলে দাঁড়ালো। দেখে বুঝলাম এ হচ্ছে দুলুর বৌ।

আসুন। মেয়েটি বললো।

আমার স্ত্রী জুন। দুলু বললো।

মেয়েটি হাতজোড় করে নমস্কার করলো।

আমি ভেতরে ঢুকে জুতো খুললাম।

বাবা কোন ঘরে জুন?

টিভি দেখছেন যাও।

থ্রি বেড রুমের ফ্ল্যাট। বেশ সাজান গোছান। আমি দুলুর পেছন পেছন ভেতরের ঘরে এলাম।

সর্বেশ্বরজ্যেঠু একটা আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে টিভির নিউজ দেখছেন।

আমি গিয়ে প্রণাম করলাম।

থাক বাবা থাক।

আমার মুখের দিকে তাকালেন।

তোকে চিনতেই পারছি না। খোকা এসে বলতে বুঝলাম তুই সেই অনি। তোর লেখা কাগজে পড়ি। পদুটা এই পাড়ার রয়টার, মাঝে মাঝে এসে বলতো। বিশ্বাস করতুম না। তারপর খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম তুই সেই ছেলে।

আমি হাসছি।

বুকে স্পেস মেকার বসানো, নিচে যেতে পারি না। মাঝে মাঝে একটু এদিক ওদিক ঘুরতে যাই।

আমি জ্যেঠুর দিকে তাকিয়ে। কতো বয়স হবে। দাদার মতো। তবে দাদার থেকে অনেক তরতাজা আছে। অন্ততঃপক্ষে ঈশ্বর পঙ্গুতো করে দেয় নি।

বৌমা অনিকে একটু মিষ্টি দিয়ে জল দাও।

জ্যেঠু আমার দিকে তাকাল।

তুই আজকে একটা ভালো কাজ করলি। এতদিন আমাদের করা উচিত ছিল।

আমি দাঁড়িয়ে আছি।

বোস না। তুই যতো বড়ো হোস, আমার কাছে সেই অনিই আছিস।

হ্যাঁ জ্যেঠু, আমি আপনাদের চোখে সেই অনিই থাকতে চাই।

এদিকে কোথায় এসেছিলি?

অনেক দিন পর একবার কলেজে এসেছিলাম। নিজের ছাত্র জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করার জন্য।

আমি জ্যেঠুর পাশে একটা চেয়ারে বসলাম। দুলু আর একটা চেয়ারে বসলো।

জুন চারটে রসোগোল্লা একটা প্লেটে করে নিয়ে এলো।

আপনি আমাকে একটু চিনি দিন।

সর্বেশ্বর জ্যেঠু হেসে ফেললো।

ওকে আপনি বলছিস কিরে তোর হাঁটুর বয়সী।

আমার দিকে ফিরে।

তোর এখনও চিনি খাওয়ার লোভ আছে!

হ্যাঁ জ্যেঠু, সেই দিনগুলোর কথা এখনও ভুলতে পারিনি। এখানে এসে আপনার দোকানে প্রথমে উঁকি মেরেছিলাম। দেখলাম আপনি নেই। দুলু বসেছিল। ভাবলাম ওকে চাই। তা ও-তো ভেঁদোদা নয়, আপনার এ্যাবসেন্সে একমুঠো চিনি দেবে।

জ্যেঠু হাসছে—

তোদের মতো ছেলে পাওয়া এখন সত্যি বিরল। কতো ছেলে এই হস্টেলে পড়তে এলো। তিরিশ বছরে কতো ছেলে আমার দোকান থেকে চিনি খেলো তার ইয়ত্তা নেই। তোর মতো কেউ ফিরে আসে নি।

জুন তখনও প্লেটটা নিয়ে দাঁড়িয়ে। মুচকি মুচকি হাসছে। আমি একটা তুলে নিলাম।

আর একটা।

না।

একটু চা করি।

এই খেয়ে এলাম। তাছাড়া আমি অনেকক্ষণ আগে বেরিয়েছি। এবার ফিরে যেতে হবে।

কয়েকমাস আগে আপনার ইন্টারভিউ দেখছিলাম টিভিতে। সেই মুখের সঙ্গে এই মুখের অনেক পরিবর্তন।

তখন আমি সদ্য নার্সিংহোম থেকে ফিরেছি। ওইদিন বিকেলে ওরা নিউজটা করলো।

আপনাকে দেখে মনেই হচ্ছে না, আপনি অতোবড়ো কাগজের একজন পার্টনার।

এ্যাঁ, কি বললে বৌমা! আর একবার বলো!

উনি ওই কাগজের একজন মালিক।

বলো কি! দুলু বললো।

তুমি কি করে জানলে বৌমা?

আমার এক আত্মীয় ওই কাগজে কাজ করেন।

কোন ডিপার্টমেন্টে। আমি বললাম।

সার্কুলেশন। ওনার মুখ থেকে আপনার অনেক গল্প শুনেছি। মনে মনে ভবাতাম ওটা বড়ো লোকেদের একটা খেয়াল।

জুন একটু থামলো।

এখন দেখছি, না সত্যি। ভেঁদোদাকে আপনি হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন। আর কেউ মনে রাখুক না রাখুক আপনি তো ভেঁদোদাকে মনে রেখেছেন।

জুন আবার একটু থামলো। মনে হলো একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ওর বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।

গত কয়েকদিন ধরে খুব কষ্ট পাচ্ছিল ভেঁদোদা। আপনি সবাইকে আজ উচিত শিক্ষা দিলেন।

সবার কথা বলতে পারব না জুন। এই যা তুমি বলে ফেললাম।

হ্যাঁ তাই বলুন। আপনার মুখ থেকে তুমি শুনতে ভালো লাগবে।

আজ থেকে তিরিশ বছর আগের ভেঁদোদার সেই ইনোসেন্ট মুখটা এখনও চোখে ভাসে। ভেঁদোদার পেছনে লাগতাম। ভেঁদোদা জ্যেঠুকে এসে নালিশ করতো। জ্যেঠু আমাদের বকাবকি করতো। চিনি খেতে এসে ভেঁদোদার কাছে ক্ষমা চাইতাম।

যখন মার খাওয়ার ভয়ে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো, তখন খেয়াল করিনি। তারপর ফুটপাথে বসিয়ে ওর মুখটা যখন দেখলাম খুব কষ্ট হলো। যাকে এসে আমি এই তল্লাটে খুঁজছিলাম তাকে ওই অবস্থায় দেখবো, ভাবতে পারি নি।

আমি ওই ভিড়ের মধ্যে আপনাকে দেখে বাবাকে এসে বলেছিলাম। লোকটা নিশ্চই পাগল।

তখন তো এতো সব জানতাম না। তারপর ওর মুখ থেকে আপনার নাম শুনলাম।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। এবার যেতে হবে জ্যেঠু।

মানিপার্টস থেকে আমার কার্ডটা বার করে জ্যেঠুর হাতে দিলাম।

আবার কবে আসবি?

এপাশে এলে অবশ্যই আসবো।

ভেঁদোকে কোথায় ভর্তি করলি।

পাভলভে। ওখানে আমার কেউ পরিচিত নেই। তবে খুঁজে বার করে নেব। আশারাখি ও সুস্থ হয়ে উঠবে।

ঈশ্বর তোর মঙ্গল করুণ।

আমি জ্যেঠুকে প্রণাম করে বেরিয়ে এলাম।

জুন ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলো। জুতো পরবার ঠিক আগে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।

আমাদের কি সৌভাগ্য আপনার মতো মানুষ আমাদের ঘরে এসেছেন।

আমি কিন্তু ওই বস্তির ভেতর থেকে এখুনি ঘুরে এসেছি। এই পাড়ায় আমার দুটো বন্ধু ছিল একজন ভেঁদোদার ভাই ঝুনে, আর দ্বিতীয় জন পদু।

ঝুনেদা আপনার বন্ধু! দুলু বললো।

হ্যাঁ। পদু বললো মধ্যমগ্রামে কোথায় বাড়ি করে উঠে গেছে।

ওরা দুজনে আমার দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে। ঝুনেকে খুঁজে পেলাম না। পদুকে পেয়েছি।

পদুদাটা এখন কেমন হয়ে গেছে।

অভাব, বুঝলে দুলু।

হ্যাঁ।

দেখবে আবার ঠিক হয়ে যাবে। ওতো চুরি, ছিনতাই, মাস্তানি করে না।

না না সেরকম কোনও রেকর্ড নেই।

আজ আসি, তোমরা যদি কখনও ওপাশে যাও দেখা করবে। ট্র্যাঙ্গুলার পার্কে নেমে একটুখানি।

নিশ্চই যাব।

দুলু আমাকে নিচ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল।

বাড়ির বাইরে এসে দেখলাম পদু দাঁড়িয়ে আছে। পরনে এখন আর লুঙ্গি নেই, একটা ভালো প্যান্ট পড়েছে, গায়ে একটা ভালো জামাও চড়িয়েছে।

কিরে একবারে চকচকে হয়ে গেছিস।

হাসলো।

বৌ বললো, অতোবড়ো একটা লোকের সঙ্গে ঘুরবে একটা ভালো জামা-প্যান্ট পড়ো।

নিয়ে এসেছিস?

পকেট থেকে প্রেসকিপসনটা আমার হাতে দিল।

মানি পার্টস থেকে ওর হাতে পাঁচশোটাকার একটা নোট দিলাম।

এটা রাখ। কাল একবার থানায় যাবি। বড়বাবু কিংবা মেজবাবুর সঙ্গে দেখা করবি। ভেঁদোদার কি ব্যবস্থা করলো একটু দেখবি। তারপর ঝুনেকে নিয়ে আমার বাড়ি যাবি।

ওর হাতে আমার ভিজিটিং কার্ডটা দিলাম।

পদুর চোখটা ছল ছল করে উঠলো।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/GLXiQrW
via BanglaChoti

Comments