কাজলদিঘী (১০৩ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১০৩ নং কিস্তি
—————————

বিশ্বাস করুণ ম্যাডাম এখনও গায়ে কাঁটা দেয় সেই মুহূর্ত টুকুর কথা ভেবে। অর্কর গলাটা ভাড়ি হয়ে গেল। চোখ ছল ছল করে উঠলো। সারাটা ঘর নিস্তব্ধ।

ঠিক বিকেল পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। আমি কপি লিখছিলাম। ফোনটা বেজে উঠলো। মেজাজটা বিগড়ে গেল। দু-বার কেটে দিলাম। একই নম্বর থেকে আসছে। থার্ড টাইম বাজতে ধরলাম।

হ্যালো।

আমি অনিদা বলছি। একটু ফাঁকা জায়গায় এসে এই নম্বরে রিং-ব্যাক কর।

কটাশ করে লাইনটা কেটে গেল।

হঠাৎ বুকের ভতরে কে যেনো সজোরে হাতুড়ীর বারি মারলো। কিছুক্ষণ চলশক্তিহীনের মতো বসে রইলাম। নিমেষে বুকের ধুকপুকুনিটা কয়েকশোগুণ বেড়ে গেল।

কিছুতেই নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছি না। না এ কিছুতেই হতে পারে না। তবু কেন যেন মনে হলো হতেও তো পারে। আশা নিরাশার দোলায় দুলছি।

কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে থম মেরে বসে রইলাম।

কলম থেমে গেছে। যে রিদিমে কপিটা লিখছিলাম নিমেষের মধ্যে সব ভুলে গেলাম। তালগোল পাকিয়ে একবারে খিচুরি হয়ে গেছে।

সন্দীপদার কাছে গিয়ে কপিটা ফেলে দিয়ে বললাম, যতটুকু পেরেছি লিখে দিয়েছি বাকিটা কাউকে দিয়ে লিখিয়ে নাও। আমি একটু বেরচ্ছি।

সন্দীপদা এক ঘর ভর্তি ছেলে মেয়ের মধ্যে আমাকে উদম ঝাড় দিল।

রাত্রিকে দেখলাম টেবিল থেকে একবার মুখটা তুলে আবার মুখ নামিয়ে নিল।

আমার কানে তখন সন্দীপদার কোনও কথা ঢুকছে না। শুধু যেন রিনিঝিনি করে বেজে চলেছে, আমি অনিদা বলছি, একটু ফাঁকা জায়গায় এসে এই নম্বরে রিং-ব্যাক কর।

একটা ঘোরের মধ্যে তখন আমি, নিউজরুম থেকে বেরিয়ে এসে ছাদে চলে গেলাম।

রিং-ব্যাক করলাম।

এতক্ষণ থাকিস কোথায়? অনিদা ঝাঁজিয়ে উঠলো।

সেই গলার তেজ। আরও যেন গভীরতা বেড়ে গেছে।

কপি লিখছিলাম।

শেষ করেছিস?

না।

কেন?

চুপ করে রইলাম।

দেরিই যখন করলি লিখে আসতে পারতিস। যাক শোন। কাল সকালে ইস্পাত ধরবি। হাওড়া থেকে ঠিক ছটা পঞ্চান্নয় ছাড়ে। ফেল করবি না। ঝাড়গ্রামে নামবি। স্টেশন থেকে বেরিয়ে টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়াবি। একটা সাঁওতাল মেয়ে এসে তোর সামন দাঁড়াবে। হাতে একটা আমাদের হাউসের কাগজ থাকবে। সে যেদিকে যাবে তার পেছন পেছন চলে যাবি। বাকিটা তোকে আমার লোক থাকবে বুঝিয়ে দেবে।

ফোনটা কেটে গেল। রেকর্ডিং করেছিলাম। বার বার শুনলাম। কাকে বলবো মনের কথা।

ওই মুহূর্তে নিজেই নিজে ভীষণ ইমোশন্যাল হয়ে পরলাম। চোখ ফেটে জল এসে যাচ্ছে। এতদিন পর দাদার গলা শুনলাম, তাও মিনিট খানেকের জন্য।

কতো কথা হুড়মুড় করে মনে পড়ে যাচ্ছে।

ভাবলাম আপনাকে এসে রেকর্ডিংটা শোনাই। নিচে নেমে আপনার ঘরে এলাম।

হঠাৎ যেন অনিদার কণ্ঠটা কানের কাছে গম গম করে উঠলো।

যে মাটিতে দাঁড়িয়ে সাধনা করবি, সেই মাটি পর্যন্ত জানতে পারেব না তুই কি করত যাচ্ছিস। পারলাম না। আপনাকে প্রণাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।

অফিসে আর থাকলাম না। সোজা গঙ্গার ধারে চলে গেলাম। অনিদার সেই প্রিয় জায়গা। মনে মনে প্রিপারেশন নিলাম।

সারারাত ঘুমতে পারিনি। বিছানায় শুয়ে ছটফট করেছি। রাত্রি আমার অবস্থা দেখে তেড়ে গালাগাল দিল। দোষ করবে আবার কথা শোনালে রাগ। 

ওকে আর মনের কথা খুলে বলতে পারছি না।

পরের দিন ঝাড়গ্রাম স্টেশনে নামলাম। ঘড়িতে তখন পৌনেনটা।

অনিদার কথা অব্যর্থ। একটা মেয়ে এলো তার পেছন পেছন গেলাম। শ্যামদার সঙ্গে দেখা হলো। এবার বুঝলাম, সামথিংস হ্যাপেন। সব বললো। শোনার পর চার্জড হয়ে গেলাম। তখন আমি আর অর্ক নই। অনিদার হাতে তৈরি সাংবাদিক অর্ক। তারপর তো সব ইতিহাস। আপনি জানেন।

অর্ক একটু থামলো। সারাটা ঘর নিস্তব্ধ।

ফেরার পথে দেখা হলো সায়ন্তন, অরিত্রর সঙ্গে। আর আমাদের কাগজের কয়েকজন রিপোর্টার। সন্দীপদা পাঠিয়েছে, সব এক একটা হনু।

তারা কপচে যাচ্ছে, এই হয়েছে সেই হয়েছে। আর আমরা তিনজন কেউ কারুর সঙ্গে কথা বলছি না। তখনও আমরা ঘোরের মধ্যে। চোখের সামনে দেখা। সায়ন্তন তো ভিডিও করেছে।

বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে রাজনাথের ঘটনার কথা। এই হচ্ছে অনিদা।

আমরা তিনজন ট্রেনে কেউ কারুর সঙ্গে একটা কথাও বলিনি। ট্রেন থেকে নেমে যে যার সোজা বাড়ি। আমাদের আর সব ছাগলগুলো অফিসে এসে কপচাল। আমরা তিন মর্কট ঝাড়গ্রাম থেকে ট্রেনে উঠেছি।

ব্যাশ দ্বীপায়নদার মাথায় ফার্স্ট ক্লিক করলো। সঙ্গে সঙ্গে ডেকে পাঠাল। সায়ন্তন বললো ছবি দিতে পারি নাম ছাপতে পারবে না। আমি অরিত্র কপি লিখলাম। সন্দীপদা তখন কিছুটা গেইজ করেছে। মুখে কিছু বলতে পারছে না। আগের দিন আমাকে রাম ঝাড়ান ঝেড়েছে।

দ্বীপায়নদা নিজের ঘরে নিয়ে গেল। সব শোনার পর, অনিদার গলা শোনার জন্য হাতে পায়ে ধরলো, রেকর্ডিং শোনালাম। দ্বীপায়নদা কেঁদে ফেললো।

অর্ক থেমেগেল। সারাটা ঘর নিস্তব্ধ।

ওরা দুজনে রেকর্ডিং করেনি! বরুণদা নিস্তব্ধতা ভাঙলো।

আমরা ম্যাসেজ পেয়েছিলাম। সেটা সেভ করে রেখেছি। ম্যাসেজ পাওয়ার পর ফোন করেছি বহুবার, স্যুইচ অফ।

অর্কদার কাছ থেকেই অনিদার গলা শুনলাম। সায়ন্তন বললো।

তাও কি অর্ক যেদিন গেছে, তার আগের দিন সকালে সায়ন্তন গেছে। আমি সেই দিন বিকেলে। তার মানে কি আমরা গেছি কিনা সেই খবর আগে অনিদার কাছে পৌঁচেছে। তারপর অর্ককে ফোন করেছে। অরিত্র বললো।

বিশ্বাস করবেন না বরুণদা গলা শুনতে শুনতে গায়া কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। বার বার চোখের সামনে অনিদার সেই মুখটা ভেসে উঠছে। চোখদুটো যেন গনগনে কয়লার ডেলা। গলার মডিউলেশনে কি হুইপ।

অর্কর সঙ্গে স্টেশনে যখন দেখা হলো, তখন কেউ বিশ্বাস করতে পারছি না আমরা একে অপরকে ঠিক দেখছি কিনা। কেননা সকলেই জানি অনিদা আমাকে একা বলেছে। এমনকি স্পটেও আমরা তিনজনে তিন জায়গায় ছিলাম। সায়ন্তন বললো।

তারপর! মিত্রা বলে উঠলো।

খুব শোনার শখ তাই না।

আমি এমনভাবে বললাম, সবাই হেসে উঠলো।

তোর ছেলে-মেয়ারা এখানে বসে আছে, চোখমুখ দেখেছিস।

ওরা সেই রাতটা দেখেনি। দেখলে প্যান্ট নষ্ট হয়ে যেত। মিলি বললো।

মিলিমনি খারাপ হয়ে যাবে। অনিসা চেঁচিয়ে উঠলো।

শুনছিস তোর বাবার কাহিনী। মা বললে সব গল্প। অর্ক আঙ্কেল বললে সেটা গল্প নয়। মিত্রা বললো।

আমি কি তাই বলেছি। অনিসা মায়ের দিকে তাকাল।

শুভ, অনন্য এক দৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে।

নেপলা।

বলো।

এবার বেরতে হবে।

আমি যাব। অনিসা বললো।

কেন যাবি মা। আমি কাজের কথা বলবো তুই বোড় হবি।

নেপলা তুমি কোন গাড়িটা নিয়ে এসেছো? মিত্রা বললো।

নিচে আবিদদা আছে।

ঠিক আছে আবিদকে বলো রেডি হতে আমিও যাব।

তার মানে! আমি বললাম।

তুই তো এখন বৌদির কাছে যাবি।

হ্যাঁ।

অতো খাবার কে বানাবে। আমি, অনিসা গেলে তবু বৌদির কিছুটা সুরাহা হবে।

আচ্ছা আমরা নিচে যাচ্ছি। তোমরা এসো।

সুন্দর, শুভ, অনন্য বেরিয়ে গেল।

টিনা চেয়ার থেকে উঠে এসে আমার হাতে একটা ফাইল দিল। মিলি দেখলাম ফোন করতে শুরু করলো।

কি হলো কি, কতক্ষণ লাগে।

রেডি আছে ম্যাম।

পৌঁছে দেবে কে?

যাচ্ছি ম্যাম।

দেখছিস মিলি কেমন ধমকাচ্ছে। মিত্রা আমার দিকে তাকাল।

আমি মুখ নীচু করে হাসছি।

একবারে হাসবে না। মিলির মুখে কপট রাগ।

মিলিদি ঠেলার নাম বাবাজী। অর্ক ফুট কাটল।

একবারে কথা বলবি না, বাঁদর ছেলে কোথাকার।

আজকে শুনে যদি এই অবস্থা হয় কালকে তাহলে মিটিংয়ে কি করবে?

দেখবি না এমন স্পিচ দেব, অনিদা পর্যন্ত ভড়কে যাবে।

হরি দিন তো গেলো সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে। অর্ক বেশ গম্ভীর হয়ে গান গাইল।

উঠবো দেখবি। মিলি বললো।

অনিসা, হিমাংশু, বরুণদারা সকলে হেসেই চলেছে।

কতো টাকার ঘোটালা মিলিদি।

এক পয়সাও না।

তাহলে তুমি আমাকে এতো চমকাচ্ছ কেন?

এবার মিলি না হসে পারলো না।

অনিদা, এই যে হাসিটা দিলো মিলিদি, সিওর শর্ট নো ঘোটালা।

মিলিদি একটু চা হবে না। নেপলা এমন ভাবে বললো, মিলি ঘুরে তাকাল।

নিজে নিজে ফোন করো ছিদামকে।

নেপলা মিত্রার দিকে তাকাল।

বলেছি চলে আসবে।

পিকু, বিতান, সুমন্ত, টিয়া ঘরে ঢুকলো।

সুমন্ত আমার কাছে এগিয়ে এলো। হাসছে।

অর্ক, মিত্রা ইসারায় কি যেন কথা বললো।

কি বিতানবাবু স্যার একবারে স্বস্ত্রীক হাজির। আমি বললাম।

আগেই আসতাম, তুমি ব্যস্ত ছিলে। টিনাদি তোমায় সব দিয়েছে?

হিমাংশু দেখলাম টিয়ার সাথে কথা বলছে।

সুমন্ত মালগুলো ছাড়। অর্ক বললো।

কিসের মাল!

শেষ বেলায় অফিসে এলি, একবারে খালি হাতে, এটা বিশ্বাস করতে হবে।

অর্ক ওটা রাতে ফোনে ফোনে ডেসপ্যাচ হবে। অরিত্র বললো।

ঠিক বলেছিস একেবারে খেয়াল ছিল না। অর্ক বললো।

সুমন্ত মুচকি মুচকি হেসেই চলেছে।

ওরে অর্ক তুই ওর মুখ দিয়ে একটা কথাও বার করতে পারবি না। আমাদের অনেক আগে সুমন্ত অনিদার কাছে এনট্রান্স পেয়েছে। তাছাড়া অনিদার শরীরের রক্ত ওর শরীরে মধ্যে আছে। তুই খোঁচা মারবি আর ও গল গল করে সব বলে দেবে ভাবছিস কি করে। দেখিস না, মাঝে মাঝেই কিরকম ডায়লগ দেয়, অনিদার রক্ত আমার শরীরে। সায়ন্তন কথা বলছে আর হাসছে।

যা কথা বলার সুমন্ত যখন গেট দিয়ে ঢুকেছে তখন চোখে চোখে বলা হয়ে গেছে। তুই তো চোখ নাড়া দেখিসনি। আমি দেখেছি।

অর্ক আমার গলা জড়িয়ে ধরেছে।

আমরা যেমন তাস খেলতে বসার আগে পার্টনারকে বলি না শোন যখন ডানহাতের হাতা গোটাব তখন বুঝবি আমার হাতে স্প্রেড ভালো আছে। যখন হাই তুলবো তখন বুঝবি হার্টস ভালো আছে।

সায়ন্তন বলছে, সবাই হেসে কুটি কুটি খাচ্ছে।

অনিদা এ অপমান আর সহ্যকরা যাচ্ছে না। এই নাও তোমার কাগজ।

সুমন্ত একটা কাগজের টুকরো আমার হাতে দিল।

অর্ক কাগজটা হাত থেকে ছিনিয়ে নিল। অনেকক্ষণ দেখল। অরিত্র, সায়ন্তন, সন্দীপ তিনজনে অর্কর দিকে ঝুঁকে পরলো।

অর্ক সুমন্তর দিকে তাকাল।

সব কোডে মেরেছিস।

সুমন্ত হাসছে।

কারুর বাবার সাধ্য আছে বোঝার। তুই আর অনিদা ছাড়া কেউ বুঝবে না!

সারাদিনের ফসল।

সে তো বুঝলাম, সন্দীপদা তুমি দেখলে কিছু বুঝলে? অর্ক বললো।

বুঝে কাজ নেই, যে বোঝার সে বুঝলেই চলবে।

কেন, শেখার ইচ্ছে নেই?

এই আবার টোঙা দিলি।

ছিদাম চা নিয়ে ঢুকলো।

দেখি, দাও তো কাগজটা। মিত্রা বললো।

অর্ক কাগজটা মিত্রার হাতে দিল। মিত্রা হাতে নিয়েই পাগলের মতো হো হো করে হেসে উঠলো। ঘরের সবাই চুপ ও শুধু একা একা আমার দিকে তাকিয়ে ফুলে ফুলে হাসছে।

সবাই একটু অবাক।

হাসছেন কেন ম্যাডাম? অর্ক বললো।

এ-তো বুবুনের টোকা কেশ।

তার মানে!

আমি এবার ফিক করে হেসে ফেললাম।

তারমানে নিশ্চই কোনও বড়ো ঘোটালা আছে এর মধ্যে। অর্ক চোখ বড়ো বড়ো করে বললো।

মিত্রা হাসতে হাসতেই মাথা দোলাচ্ছে।

গল্পটা ছারুন।

মিত্রা শুধু হেসেই যায়।

হাসলে হবে না। বলতে হবে। তারমানে অনিদা বিদ্যেটা সুমন্তকে একমাত্র দান করেছে।

মিত্রা মাথা দুলিয়ে হেসেই চলেছে।

সুমন্ত মুচকি মুচকি হাসে আর মিত্রার দিকে তাকায়। ইশারায় না না বলছে।

এটা সর্টটিয়ালি হচ্ছে অনিদা, আমরা কি বানের জলে ভেসে এসেছি। অর্ক বললো।

মা বলো না। অনিসা বললো।

দেখছিস না তোর বাবা কেমন চোখ বড়ো বড়ো করছে।

বাবা চোখ বড়ো বড়ো করুক, তুমি বলো।

ছিদাম সবাইকে চা এগিয়ে দিল।

ম্যাডাম চায়ে চুমুক দিয়ে শুরু করুণ তর সইছে না। অরিত্র বললো।

এখনকার পরীক্ষার সিস্টেমটা কি বলতে পারবো না। তবে তখন টেন ইয়ার্সের কোশ্চেন দেখে সাজেশন করলে অব্যর্থ ভাবে ছটা কোশ্চেন তুই কমন পাবিই পাবি। মিলিদের দিকে তাকিয়ে।

হ্যাঁ। সব পরতো না। তিন চারটে পরতো। মিলি বললো।

দুর আমরা ছটা কমন পেতাম। সাজেশন ও করতো। আমরা ওর কাছ থেকে সাজেশন কিনতাম। কমন না পেলে টাকা ফেরত।

ওরে বাবা এতো মডারেটর? অরিত্র বললো।

এই ব্যবসাও অনিদা করতো! অর্ক বললো।

সেকিগো, তোমরা জানো না! নোট পর্যন্ত বেচতো। একনম্বর, দুনম্বর, তিননম্বর এক নম্বরটা ও কখনও বেচতো না। সেটা ওর নিজস্ব, দামের হেরফেরে দু-নম্বর, তিন-নম্বর বেচতো। আমি নিজে কতোবার কিনেছি। তবে আমাক একনম্বরটা দিতো। হজম করতে পারতাম না।

তারমানে! টুপি খুলে স্যালুট দিতে হয় বলুন। সন্দীপ বললো।

তা দিতে পারেন। ও এসব দিক থেকে মাস্টার পিস ছিল।

আমাদের একটা পেপারের একটা হাফ ছিলো পঞ্চাশ মার্কের রচনা।

এখনও আছে। অর্ক বললো।

দেখলাম ফার্স্ট হাফটা লেখার পর সেকেন্ড হাফের খাতা রচনা লিখতে শুরু করলো।

আমি ওর ঠিক পেছনে। ও একটা করে লিফ লেখা শেষ করে আমি নিয়ে লিখি আবার ওকে ফিরিয়ে দিই।

এবার রচনা টোকা যাবে না। আমি ওকে বললাম কিরে তুই কোন এসেটা লিখবি।

গলা নামিয়ে বললো। সমকালীন উপন্যাস।

আমি ওটা পড়ে আসিনি। অন্যটা লিখছি।

লেখ, ডিস্টার্ব করবি না।

তারপর দেখি ও পকেট থেকে একটা সরু মতো কাগজ বার করলো।

কিরে টুকবি?

হ্যাঁ।

পঞ্চাশ নম্বরের রচনা টুকবি?

স্যারকে বলে এখান থেকে উঠে যাব।

চুপ করে গেলাম। আমি লিখছি। মাঝে মাঝে ওর দিকে তাকাই দেখি ঝেড়ে লিখে চলেছে। কাগজটা টেবিলের ওপর রাখা।

এ্যাঁ।

লুকিয়ে চুড়িয়ে নয় ওপেন।

বলছেন কি! সন্দীপ বললো।

আগে শোনো না। অনিসা বলে উঠলো।

অর্ক, অনিসার গালটা টিপে দিল।

অনিসা মুখ টিপে হাসলো।

স্যার মানে আমাদের পল্লববাবু বার বার এসে ঘুরে যাচ্ছেন।

ও কিন্তু এক মনে লিখে যাচ্ছে।

সমকালীন উপন্যাস মানে বুঝতে পারছিস, সেই বৃটিশ প্রিয়েড থেকে শুরু করে একেবারে কারেন্ট উপন্যাস ধরে ধরে তোকে ব্যাখ্যা করতে হবে। মোটামুটি হলে ফিস ফিস করে খবর নিয়ে দেখলাম একমাত্র ওইই লিখছে এই রচনাটা। আর কেউ লিখছে না। আমি লিখছিলাম বাংলার নাট্যালয়। দু-একবার জিজ্ঞাসা করেছি বলে দিয়েছে।

পরীক্ষা শেষ হতে তখন আধঘণ্টা বাকি। দেখি আমার ঠিক পাশে বুবুনের ঠিক পেছনে এসে পল্লববাবু দাঁড়াল। এক দৃষ্টে ওর খাতাটা লক্ষ্য করছে। মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে থাকার পর ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

অনি।

বলুন।

ও কিন্তু লিখতে লিখতেই স্যারের সঙ্গে কথা বলছে।

তুই টুকছিস?

হ্যাঁ।

তুই টুকছিস? স্যার এবার বেশ জোড়েই বললো।

বললাম তো টুকছি।

এবার সারাটা ঘর ওর দিকে হুমড়ি খেয়ে তাকিয়ে। সব স্যারেরা এক্সপেক্ট করে আছে ও ফার্স্ট ক্লাস পাবেই। পার্ট ওয়ানের রেজাল্ট তাই বলছে। আর সেই ছেলে টুকছে। আমার তখন বুক ধুক পুক করছে।

জানিস তোকে এক্সপেল করে দিতে পারি। সারাজীবনের মতো আর পরীক্ষা দিতে পারবি না।

আপনার ক্ষমতা থাকলে করে দেখান।

টুকছিস আবার মুখে বড়ো বড়ো কথা বলছিস। এই তোর ভালো ছেলে হওয়ার নমুনা।

এতক্ষণ ও লিখছিল আর কথা বলছিল, এবার দেখলাম উঠে দাঁড়াল।

আপনাকে এক্সপেল করতে হবে, না হলে যে সময়টা আমার নষ্ট করছেন, সেই সময়টা আমাকে লেখার জন্য দিতে হবে।

ঘরের সবাই তখন লেখা থামিয়ে পল্লববাবু আর বুবুনের দিকে তাকিয়ে।

দু-জনের তর্কাতর্কি শুরু হয়ে গেল। সে তুমুল তর্ক। তারপর সেই টুকরো কাগজ আর খাতা নিয়ে পল্লববাবু গট গট করে বেরিয়ে গেল। বুবুন স্যারের পেছন পেছন।

আমাদের সবার মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছেলেটার জীবন নষ্ট হয়ে গেল।

যাক আমরা আবার লেখায় মন দিলাম।

মিনিট কুড়ি পর দেখলাম খাতা সমেত বুবুন হাজির, আবার লিখতে বসে গেল।

পরীক্ষা শেষের ঘণ্টা বেজে গেল। বুবুন লিখে চলেছে।

পল্লববাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, অনি ছাড়া সবাই খাতা জমা দিয়ে দাও।

আমরা খাতা জমা দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলাম।

তারমানে পল্লববাবু ওকে এক্সপেল করতে পারেনি। আর ও যা বলেছিল, এক্সপেল করতে না পারলে আমার লেখার সময় যেটা নষ্ট হবে আমাকে দিতে হবে। বরং এক্সট্রা সময় লেখার জন্য ওকে দিচ্ছে? এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে নিচে নামলাম।

আমরা যারা ক্লোজ বন্ধু বান্ধব সবাই নিচে এসে দাঁড়িয়ে আছি। ব্যাপারটা কি জানতে হবে। বাবু এলেন আধাঘণ্টা পর।

আমরা ঘিরে ধরলাম। কেশটা কি বল।

মুখ বেঁকিয়ে বললো, এতই সহজ এক্সপেল করা। পরীক্ষাটা কি স্যারের পৈতৃক সম্পত্তি।

এক কথায় ভিড় পাতলা হয়ে গেল। দু-জনে বাড়ি ফিরছি।

খোঁচা মারা শুরু করলাম। এক খোঁচায় কোনওদিন কিছু পাইনি।

বাসে উঠলাম আবার কনুইয়ের গুঁতো।

মুখ খুললো।

দেখ এক্সপেল তোকে তখনই করবে যখন দেখবে যেটা দেখে তুই টুকছিস সেটার সঙ্গে তোর খাতার লেখা হুবহু মিলে যাবে। যদি তা না হয় তোকে এক্সপেল করা সহজ নয়। আমি যদি আইনের রাস্তা ধরি স্যারের চাকরিটা পর্যন্ত চলে যেতে পারে। একটা ফাইন্যাল ইয়ারের ছাত্রের জীবন নিয়ে তুমি ছিনি মিনি খেলছো, এটা হয় না।

আমার চোখ ছানাবড়া। বুবুন বলে কি!

পকেট থেকে কাগজটা বার করলো। এটা দেখে তুই বলতে পারবি আমি সত্তর পাতা একটা রচনা লিখলাম।

কাগজটা দেখার পর আমার মাথায় হাত, সত্যিতো?

দেখলাম টুকরো কাগজটায় লেখা আছে, অ ম তি এ ন না একটা ইয়ার, স ব বি, পু না ই মা ব এরকম হযবরল প্রায় সত্তরটা। সব কমা দিয়ে দিয়ে লেখা।

তুই এটা দেখে সত্তর পাতা লিখলি!

হ্যাঁ। তোর খুপরিতে এসব ঢুকবে না। ছাড়।

কাগজটা আমার হাত থেকে নিয়ে নিল।

অনেক বার খোঁচানর পর বললো।

শোন অ ম তি এ ন না মানে অদ্বৈত মল্লবর্মন তিতাস একটি নদীর নাম। স ব বি মানে সমরেশ বসু বিবর, পু না ই মা ব মানে পুতুল নাচের ইতিকথা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

আমার চোখ তখন ঠেলে বেরিয়ে আসার উপক্রম।

মিলির দিকে তাকাল।

তুই একবার ভাব মিলি। এই রকম ব ম আ ই দিয়ে সত্তরটা উপন্যাসের খালি নাম লেখা রয়েছে আর কোন ইয়ারে বেরিয়েছে সালটা লেখা রয়েছে তাও সেটা কোডে। ধর একচল্লিশ। সেটা ফোর বাই ওয়ান কোন ইয়ার টিয়ার নেই। ও ওটা দেখছে আর উপন্যাসগুলোর চরিত্র নিয়ে আলোচনা করে যাচ্ছে।

ফার্স্ট ক্লাসতো পেয়েছিলোই, সেই বছর ওই পেপারটায় ও ইউনিভার্সিটিতে হায়েস্ট মার্ক পেয়েছিল, পঞ্চাশে বিয়াল্লিশ।

এইটি ফোর পার্সেন মার্ক! মিলি বললো।

রেজাল্ট বেরবার দিন ওর সঙ্গে দেখা হয়নি। তখন আমি জীবন যুদ্ধে ক্ষত বিক্ষত।

মিত্রার গলাটা সামান্য ভাড়ি ভাড়ি লাগলো।

বন্ধুদের মুখ থেকে শুনলাম আমাদের কলেজে কুড়ি বছর পর কেউ ফার্স্টক্লাস পেলো। পল্লববাবু নাকি সকলের কাছে গল্প করেছে টুকলে অনির মতো টুকবি। ওর কলজের দম আছে।

মেয়ে চকাত করে গলা জড়িয়ে ধরে গালে একটা চুমু খেয়ে নিল।

ম্যাডাম এবার কাগজটা দিন একটু দেখে নিই। অর্ক বললো।

না। এবার যার কাগজ তাকে ফেরত দিয়ে দাও।

দাঁড়ান আমার যেটুকু মাথায় ঢুকিয়ে রেখেছি সেটা বলছি।

বলো।

অর্ক মিত্রার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে একবার ভালো করে দেখে নিল।

প্রথমটা লেখা আছে রা ব হাজার পঁয়ত্রিশ।

মিত্রা মাথা দোলাচ্ছে।

তারমানে রাইটার্স বিল্ডিং দশটা পঁয়ত্রিশ।

এই তো তুই ধরতে পেরেছিস। সন্দীপ বললো।

অর্ক কাগজটা নিয়ে সুমন্তর হাতে দিল।

দাদাকে দে। ওটা আর আমার কাজে লাগবে না। সুমন্ত বললো।

যাক তোর এই কাগজ কেশে আর একটা মাল পাওয়া গেল।

অর্কর কথায় সুমন্ত হাসছে।

কি খাওয়াবে অর্কদা। সুমন্ত তাকাল।

তোকে খাইয়ে ছোটো করবো না। তুই এমনি খেতে চাইলে তোকে খাওয়াব।

আমি উঠে বাইরে এলাম। সন্দীপকে বললাম কাল সকাল সকাল আসবি।

ওরা নিউজ রুমে চলেগেল।

আমি মেয়ে লিফটে নিচে নামলাম। সুমন্ত সঙ্গে এলো।

সুকান্ত এসেছে। আমার বাড়িতে এসে উঠেছে।

ওর আবার কি হলো?

তুমি জান, আমি কি করে বলবো!

কালকে নিয়ে আয়। কথা বলা যাবে।

মা বলছিলো একবার যাবে না?

যেতে হবে, তোর বউ বাচ্চাটাকে দেখতে হবে।

সুমন্ত হাসছে।

শরীর এখন কি রকম?

ভালো, তবে রেসট্রিকশনের মধ্যে রয়েছি। খুব একটা খারাপ লাগছে না।

শারীরিক অন্যান্য সমস্যা আসেনি?

না।

নিচে নামতেই সেই মেয়েটা উঠে দাঁড়াল।

স্যার।

থমকে দাঁড়ালাম।

অনিসা হাসছে।

তুমি বাবাকে চিনতে পেরেছো।

মেয়েটি মাথা দোলাচ্ছে।

স্যার মা একবার আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।

কাল সারাদিন অফিসে থাকবো। তখন বলবো, কেমন।

ঠিক আছে স্যার।

বাইরে বেড়িয়ে এলাম। আবিদ কার সঙ্গে কথা বলছিল এগিয়ে এলো। সূর্যের আলো হেলে পড়েছে। এখন তার রং অনেকটা কমলা।

বেরবে?

হ্যাঁ।

অনন্যরা সব গাড়িতে বসে।

ওরা আবার কোথায় যাবে?

তোমার সঙ্গে।

মহা মুস্কিল।

কেউ কেউ যে আমাকে দেখছে না তা নয়। গেটের সেই ছেলেটিও আড় চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। অনিসা আমার হাতটা ধরে রয়েছে। বুঝলাম আবিদকে ছেলেটি চেনে।

নেপলা, মিত্রা একসঙ্গে নামল।

আমরা এগিয়ে এলাম। ছেলেটি আমায় দেখে মাথা নীচু করে নিল।

তোমার নাম কি?

স্যার।

নাম কি?

সুবল ঘড়ুই।

নিশ্চই মেদনিপুর।

হ্যাঁ স্যার। কি করে বুঝলেন?

তোমার টাইটেল। কোথায়?

ভগবানপুর।

ভগবানপুরের কোথায়?

আপনি চেনেন স্যার।

মিত্রা হাসছে।

শিব বাজার।

শিব বাজারে নেমে কোনদিকে।

একটু সামনের দিকে।

মনসামন্দিরের কাছে।

হ্যাঁ স্যার মন্দিরের ঠিক পেছন দিকে। আপনি ওখানে থাকেন স্যার!

না যাওয়া আসা আছে। তুমি এখানে কোথায় থাক?

ছাদে, আমরা কয়েকজন মিলে থাকি।

সবাই ওখানকার।

হ্যাঁ স্যার।

আমি অফিসে আজ থেকে চাকরিতে ঢুকলাম। কাল থেকে আবার যেন আটকিও না।

না স্যার আমি সব শুনেছি। রিসেপশনিস্ট ম্যাডাম বলেছেন।

সব শোনা হয়েগেছে!

ছেলেটি মাথা নীচু করলো।

আমি বেরিয়ে এলাম।

গাড়িতে উঠলাম।

নেপলা সামনের সিটে বসলো।

ছেলেরা সব পেছনে বসেছে।

মাঝে আমি, অনিসা, মিত্রা।

আবিদ গাড়ি স্টার্ট দিল। জানলার কাঁচ বন্ধ এসি চালাল।

নেপলা কটা বাজে বল।

সাড়ে পাঁচটা।

কোথায় যাব জানিস?

অনিমেষদার বাড়িতে।

হ্যাঁ। সাতটার সময় যাওয়ার কথা। এতো তাড়িতাড়ি গিয়ে কি হবে।

তাহলে।

একবার ইকবালভাইয়ের কাছে চল। ওখান থেকে বরং যাব। আবিদ।

বুঝেছি তোমাকে আর বলতে হবে না। আবিদ বললো।

বাবা বললো, আর তুমি বুঝে গেলে। মেয়ে ফুট কাটল।

তোর জন্মের আগে থেকে তোর বাবাকে দেখছি।

ইকবালভাই।

নেপলা দেখলাম কানে ফোন গুঁজেছে।

তোমার ওখানে যাচ্ছি….ধরো আধাঘণ্টা….।

ফোন কান থেকে নামাল।

ওমনি তুমি ফোন করে দিলে! অনিসা বললো।

তুই বুঝবি না।

বোঝাও আমাকে।

অপেক্ষা কর বোঝাব।

অবিদ গাড়িটা কল্পতরু মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড় করালো।

নেপলা। আবিদ বললো।

আমি পকেট থেকে মানি পার্সটা বার করলাম।

ওটা তোমার পকেটে রাখো।

কেনো রে!

যা বললাম করো না। অনেক তো করেছো, একটু করতে দাও।

নেপলা আঙ্কেল। অনিসা বললো।

বুঝেছি। পাঠিয়ে দিচ্ছি।

তুই আবার কি খাবি! মিত্রা বললো।

নেপলা আঙ্কেল জানে।

না একদম না। দিদাইকে বলে দেব।

উঁ হুঁ কেন তুমি এরকম করো।

মায়ের খ্যাচ খ্যাচানিতে মেয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল।

পেছন থেকে দেখলাম ওরা তিনজনও নেমে গেল।

সব মালাই খেতে গেল। মিত্রা বললো।

তাই!

আবিদ হাসছে।

নেপলা এরইমধ্যে দুবার খাইয়ে নিয়ে গেছে।

সবাইকে?

হ্যাঁ।

দেখলাম মেয়ে একটা প্লেটে করে দুটো মালাই আনলো।

তাড়াতাড়ি ধরো গলে যাবে।

কার জন্য?

তোমার আর মার জন্য।

আমি খাব না।

নেপলা আঙ্কেলকে বলো।

ঠিক আছে নেপলা আঙ্কেলকে বল একটা কম নিতে আমি এটা আবিদ আঙ্কেলকে দিয়ে দিচ্ছি। আমি মার থেকে একটু খেয়ে নেবো।

না তুমি গোটা খাও। উঃ ধরো না।

বাধ্য হয়ে নিলাম।

বুঝলি এবার, তোর মেয়ে মহা তেঁদড়। দিদাইকে যদি বলে দিই বলবে বাবাও খেয়েছে।

আমি হাসছি।

নেপলা মিষ্টির প্যাকেট পেছনে এনে রাখলো। মিত্রা দেখছে আর হাসছে। শুভরা নেপলাকে সাহায্য করছে।

খাওয়া শেষ, আবিদ আবার গাড়ি স্টার্ট দিল।

আবিদ।

বলো।

রতন কোথায়?

ওদিককার কাজ সারছে।

সমস্যা মিটেছে না যেমন ছিল তেমন আছে।

সব স্যারেন্ডার করেছে। রতনদা একটা রফা করতে গেছে। ওরা বলেছে আমাদের সঙ্গে কাজ করবে।

মাথা যেন চাঁদই থাকে।

সেই জন্যই গেছে।

কিছু খবর পেয়েছিস?

না।

বাবা ওইযে তোমার বেঞ্চি।

জানলা দিয়ে তাকালাম। গঙ্গার ধার দিয়ে তীর বেগে গাড়ি চলেছে। মেয়ে ঠিক বলেছে।

আমি আবিদ আঙ্কেলের সঙ্গে এসেছি।

বলবো তোর বাবাকে, সেদিন তুই কি করেছিলি। আবিদ বললো।

বলো না, আমি কি না বলেছি।

আমি মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসছি।

শুভ।

বলুন।

দাদু কেমন আছে?

ঠিক আছে।

গণ্ডগোল করছো না?

শুভ চুপ করে রইলো।

সুন্দর।

ইয়েস ড্যাড।

মার সঙ্গে কথা বলেছো?

হ্যাঁ। মা এখন অনুপ আঙ্কেলের বাড়িতে।

তুমি সারাদিন কি করলে মাকে জানিয়েছ?

ইয়েস।

আমরা ইকবালভাইয়ের মসজিদের সামনে এলাম।

নেপলা, আবিদ গাড়ি থেকে নামলো।

তুই আগে কোনওদিন এসেছিস। মিত্রার দিকে তাকালাম।

দু-তিনবার এসেছি। বহুদিন আগে। তোর ছেলেমেয়ে তখন ছোটো ছিল।

ঝাড়াতে নিয়ে আসতিস?

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

গাড়ি থেকে নামলাম।

ইকবালভাইকে দেখতে পেলাম না।

সবাই নামাজ পড়ে বেরচ্ছে।

দেখলাম জায়গাটার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বলা যায় অনেক বেশি ডেভেলপ হয়েছে।

মসজিদটাকে কেন্দ্র করে অনেক লোকের রুটি রুজির সংস্থান হয়েছে।

যখন এই মসজিদটা তৈরি হচ্ছিল তখনই ইকবালভাইকে বলেছিলাম। ধর্মের অনুশাসন সকলকে মানতে বলবে কিন্তু গোঁড়ামিট যতটা পারো এড়িয়ে চলো। তাহলে দেখবে মানুষের মধ্যে তুমি নতুন একটা দিশা দিতে পেরেছো।

ইকবালভাই আমার কথা শুনে হেসেছিল। কেন বলছিস?

প্রত্যেক ধর্মের মধ্যে অনুশাসন আছে। সেটা তুমি ধর্ম পুস্তকে পাবে। কিন্তু গোঁড়ামিটা তুমি তৈরি করবে, তোমার ব্যক্তিগত স্বার্থে, সেটা কোরো না। সবাই যা করে তুমি তার বাইরে থাকার চেষ্টা করো।

আমাকে যুক্তি দিয়ে দেখা।

জানিনা ধর্মের সৃষ্টি কর্তা কারা। তবে যিনিই হোন তিনি তোমার আমার মতো অশিক্ষিত নন। তারা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। ভবিষ্যত দ্রষ্টা। তারা মানুষের ভালো মন্দ জানেন। তার ওপর ভিত্তি করেই কিন্তু এই ধর্মের অনুশাসন। যাকে বলতে পারো জীবনের সু-নির্দিষ্ট আইন শৃঙ্খলা। এই ব্যাপারটাকে হাতিয়ার করেই তোমার আমার মতো লোক তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য গোঁড়ামির সৃষ্টি করেছেন।

তোর কথাটা মাথায় রাখব।

পিঠে কেউ যেন হাত রাখলো। ফিরে তাকালাম। ইকবালভাই দাঁড়িয়ে আছে। মুখে একগাল হাসি। আশেপাশে মিত্রাদের কাউকে দেখতে পালেম না।

ওরা কোথায় গেলো!

ভেতরে। তোকে ডেকেছিল শুনতে পাস নি।

একটু সময় পেলাম চলে এলাম।

ভালো করেছিস।

তোমার এখানটা আগের থেকে অনেক বেশি ভালো লাগছে।

তোর ইচ্ছেগুলো একটু একটু করে করার চেষ্টা করছি। একবারে তো পারবো না।

তোমার অনেক প্রতিবন্ধকতা। তার মধ্যেই তোমাকে লড়ে জায়গা করে নিতে হবে।

ইকবালভাই হাসছে।

আগের সমস্যাগুলো মিটেছে।

হ্যাঁ। সরকার থেকে জায়গাটা পেয়ে গেছি। স্কুলটা এখন কোনও প্রকারে চালাচ্ছি। তারপর দেখি সিফ্ট করবো।

এবার তোমার পরবর্তী জেনারেশন তৈরি করো।

কারুর ইচ্ছে নেই বুঝলি। জোড় করে আর কতটা করবো। তবু দুটো ছেলে খুব খাটছে।

পায়ে পায়ে একবারে মসজিদের পেছনে ইকবালভাই-এর ঘরে এলাম।

বাবা কাজুর সরবত। অনিসা গ্লাস দেখাচ্ছে।

হাসলাম।

কি খাবি।

শ্রেফ চা, আর কিছু নয়।

কতদিন পর এলি একটু মিষ্টি আর সরবত খা।

তাহলে চা খাব না।

ঠিক আছে।

ইকবালভাইয়ের আদেশে মিষ্টি আর সরবত এলো।

কিছুক্ষণ সময় ওখানে কাটিয়ে বেরিয়ে এলাম।

আবিদকে অনেকেই চেনে। সবাই এসে আবিদের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে।

আমি শুক্রবার একবার তোর ওখানে যাব।

শুক্রবার তোমার ভীষণ চাপ থাকবে।

এদের সামলাতে বলেছি। পীরসাহেবের থান নিয়ে মীর একটা মিটিং ডেকেছে। আমাকে অতি অবশ্যই যেতে বলেছে।

ওখানকার ইমাম?

উনিও থাকবেন।

এখনও অনেক দেরি আছে।

গাড়িতে উঠলাম।

আবার পথ চলা শুরু। আবিদ গাড়ি চালাচ্ছে।

বাবা তোমাকে সকলে খুব ভালোবাসে না?

মেয়ের দিকে তাকালাম।

কি করে বুঝলি?

ইকবালদাদাইয়ের কাছে যারা আসছিল তার সবাই তোমার কথা বলছিল।

কই আমি শুনলাম না।

তুমি তখন ইকবালদাদাইয়ের সঙ্গে ভেতরের ঘরে কথা বলছিলে।

মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে।

বলো না।

কি বলবো।

তোমাকে সবাই ভালোবাসে?

হবে হয়তো।

দেখলাম নেপলা আবিদ সামনে বসে ফিক ফিক করে হাসছে।

দেখছো, আবিদ আঙ্কেল কিরকম হাসছে।

অনিদা, চিকনাদা ফোন করেছিল। নেপলা বললো।

কেনো?

স্কুলের হেডমিস্ট্রেস নিজে থেকে রিজাইন দিয়েছে। ম্যাডাম তোমাকে বলে নি?

বলবো কখন, কথা বলার ফুরসত পেয়েছি। একটার পর একটা জড়িয়ে চলেছে।

কি বললো কি চিকনা?

সকাল থেকে বেশ ঝামেলা হয়েছে। যা হয় আর কি। স্কুল বন্ধ। ম্যানেজিং কমিটি ভেঙে গেছে। নীপাদিকে এখন টেম্পোরারি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নেপলা বললো।

আবার একটা সমস্যা তৈরি হলো।

চিকনাদা বুঝে নেবে বলেছে। তোমায় খবরটা কানে তুলে দিতে বলেছে।

তনু ফোন করেছিল? মিত্রার দিকে তাকালাম।

হ্যাঁ। তুই যা ঠিক করেছিস ওর বাড়ির লোক তা মেনে নিয়েছে।

তুই জানিস?

তনু বলেছে। অনুপের কাছে গেছিল অনুপ ফোনে কথা বলেছে।

কবে ফিরবে বললো।

এই সপ্তাহের শেষে।

অনিমেষদার বাড়ির গেটের কাছে আসতেই অনিসারা নেমে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল।

আবিদ গাড়িটাকে ভেতরে নিয়ে এলো। আমরা একসঙ্গে ওপরে এলাম।

বৌদি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। জড়িয়ে ধরলো।

দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম সুরোর ছেলেটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।

তোমার নাতিকে দেখেছো। কিরকম ভাবে তাকিয়ে আছে। ভাবছে বুড়ো লোকটা দিদাইয়ের সব আদর নিয়ে নিলো।

আসার পর থেকে জ্বালিয়ে পুরিয়ে মারছে।

কেন?

ওকে সেই আমে ভেটেছে।

সুরো এসেছে।

হ্যাঁ আমি এসেছি। তোমার অসুবিধে আছে?

সুরো ঘর থেকে মুখ বার করলো।

বুঝলে বৌদি একেবারে গিন্নীবান্নী হয়ে গেছে।

ভেতরে এলাম। সুরোর ছেলেটাকে কোলে নিলাম।

আঙ্কেল কলা খাবে জয় জগন্নাথ দেখতে যাবে। সুরোর ছেলেটা বললো।

মিত্রা শব্দ করে হেসে উঠলো।

ঠিক লোককে চিনেছে। বৌদি বললো।

আমি সুরোর ছেলেটার দিকে তাকিয়ে।

হাসছি না আবার গম্ভীরও নয়।

তুই কলা খেয়েছিস?

মা দেয় নি। বলেছে হুনুমান খায়, তুই কি হুনুমান?

সেই জন্য তুই আমাকে বললি।

সুরোর ছেলে মাথা দোলাচ্ছে।

দাদা এখনও ফেরে নি। বৌদির দিকে তাকালাম।

নেপলা বসো। বৌদি বললো।

হ্যাঁ বৌদি।

আমার দিকে তাকিয়ে।

এখুনি ফোন করেছিল আসছে।

তুমি আঙ্কেলকে হামি দাও। সুরোর ছেলে বৌদির দিকে তাকাল।

কেনরে? আমি বললাম।

এখন তুই হচ্ছিস ওর এনিমি। ওর মার আমার সব আদর নিয়ে নিচ্ছিস।

সুরো খাবর ব্যবস্থা কি করেছিস?

মণ্ডা মিঠাই।

বৌদি ও কেন এসেছে?

সকালবেলা বললাম। তোর দাদার আজ আসার কথা। সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছে।

অংশু কোথায়?

এবার সেও এসে পরবে।

আঙ্কেল দিদাইকে বকো।

কেন!

দিদাই হামি খায় নি।

ঠিক আছে আমি দিদাইকে হামি খাচ্ছি।

আমি বৌদিকে জড়িয়ে ধরলাম।

সুরোর ছেলে হাসছে।

অনিসাকে দেখলাম বাথরুমের দিক থেকে আসছে।

তুই কোথায় গেছিলি?

উঃ বলেছি না সব দিকে নজর দেবে না।

সেই জন্য ছুটে সবার আগে ওপরে উঠে এলি।

দিদা একটা জিনিষ দেখবে।

অনিসা আমার পকেটে হাত ঢোকাল।

মানি পার্টস?

হ্যাঁ।

তোর দিদাই ফোন করেছিল।

আমাকে বলতে পারতে, বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসতাম, অবশ্য ইন্টারেস্ট রেটটা একটু বেশি হতো। সুরো বলছে আর হাসছে।

মিত্রার ফোনটা বেজে উঠলো। দেখে আমার দিকে তাকাল।

বলো। কার খোঁজ নেবে, ছেলে না আমার।

অনিসা ফেরে নি। বড়োমার গলা।

সবাই সঙ্গে আছে।

আসুক আজকে, একটা ফোন করবে তো।

কেন আমি তো দুদুনকে ফোন করে বলেছি। অনিসা চেঁচালো।

শুঁড়ীর সাক্ষী মাতাল।

আর দুটো মর্কট।

ওরাও সঙ্গে আছে।

শুভর দাদু ফোন করেছিল।

শুভ সঙ্গে আছে।

কেউ বাড়িতে একটা ফোন করে না। সব সাপের পাঁচ পা দেখছে।

শুভ। মিত্রা চেঁচালো।

যাই মনি।

শুভ ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

দাদুকে ফোন করো নি?

হ্যাঁ।

তাহলে দাদু ও বাড়িতে দিদানের কাছে ফোন করেছিল।

মাথা খারপ করে দেবে।

শুভ ভেতরে চলেগেল।

শুনলে কথা।

শুনলাম। অনি কোথায়।

আমার সামনে দাঁড়িয়ে, আমরা এখন অনিমেষদার বাড়িতে।

সুতপাকে দে।

মিত্রা ভয়েজ অফ করে বৌদির হাতে ফোনটা দিল। বৌদি ভেতরে চলেগেল।

আমি সোফাতে গিয়ে আবিদ আর নেপলার মাঝখানে বসলাম।

কিরে সুরো খেতে দে। এখানে খাবো বলে রাস্তাঘাটে কিছু খেলাম না।

পেটে ঘুসি মেরে মালাই বার করে নেব। সুরো রান্নাঘর থেকে চেঁচালো।

আমি হাসছি।

দেখলাম মেয়ে রান্নাঘর থেকে ট্রেতে করে সরবতের গ্লাস নিয়ে বাইরে এলো।

মিত্রা রান্নাঘরে সুরোর সঙ্গে গোঁতাগুঁতি করছে।

বেল বাজলো।

নেপলা উঠে গিয়ে গেট খুললো।

অনিমেষদারা সবাই ভেতরে এলো।

আমার দিকে তাকাল।

এই এলি বুঝি।

না, প্রায় আধঘণ্টা হলো।

কিরে তুই একেবারে পাকা গিন্নী হয়ে উঠেছিস। খালি প্যান্ট আর পাঞ্জাবীটা ছেড়ে একটা কাপর পড়তে হবে।

প্রবীরদা তাকাল অনিসার দিকে।

ধরো ধরো একটা তুলে নাও আগে। অনিসা বললো।

জুতোটা খুলি আগে।

পরে খুলবে। ট্রে-টা হাল্কা করো আগে। বড্ড ভারি।

অনিসার কথায় রূপায়নদারা হাসছে।

সবাই টেবিলটায় বসলো। নিরঞ্জনদাও আছে।

বৌদি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

শুনেছো, তোমাদের অনিবাবুর কীর্তি।

আবার কি করলো।

অনি আজকে বড়দির কাছ থেকে পঞ্চাশটাকা ধার করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে।

বৌদির কথা শুনে প্রবীরদারা হাসছে। বৌদি ফোনটা মিত্রার হাতে দিল।

অনিমেষদা মাথায় হাত বুলোচ্ছে, আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

এটা একটা বলার মতো কথা হলো। আমি বললাম।

বিধানবাবু শুনছেন। ও যদি ধার করে তাহলে আমরা কি করবো।

সুতপাকে কথাটা আগে শেষ করতে দাও। বিধানদা বললো।

আবার বলে কিনা আমি বিজনেস ম্যান। বৌদি বললো।

মোটেও একথা বলি নি।

তোর সাগরেদগুলোকে জিজ্ঞাসা কর। শুনলাম তোর নাকি কোটি কোটি টাকা। একটা ফোন করলেই ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার হয়ে যাবে।

আমার না। ওদের আছে। আমার কোনও টাকা পয়সা নেই। চাকরি খুঁজছি। পারলে একটা জোগাড় করে দাও।

কবে থেকে জয়েন করবি বল, কাল থেকে? অনিমেষদা বললো।

চুপ করে রইলাম।

কিরে চুপ করে রইলি কেন?

কাল সকালে বলবো, মিত্রা বলেছে একটা চাকরি দেবে, যদি না দেয় তখন বলবো।

একথা শুনলে তোর তেল কোম্পানির মালিক নির্ঘাৎ হার্টফেল করবে।

নেপলা হাসছে। আমি চুপ করে আছি।

সুরো খেতে না দিস নেপলা যে মিষ্টি নিয়ে এসেছে, তাই দে।

উঃ যেন রাহুর খিদে নিয়ে ঢুকেছে। সুরো চেঁচিয়ে উঠলো।

তুই তো জানতিস।

জানতাম বলে কি ঠাণ্ডা দেবো।

গরম দিতে হবে না।

ঘরে কে?

অনিমেষদা উঁকি মারলো।

অনন্য, সুন্দর, শুভ। আমি বললাম।

তুই কি পুরো পরিবার সমেত এসেছিস? প্রবীরদা বললো।

ওরা আসতে চাইল।

কাল কখন ফিরলি?

দশটা হবে।

প্রবীরদা এক দৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে।

সুরো একথালা লুচি আর বাটি চচ্চড়ি নিয়ে এলো।

তোমরা হাত মুখ ধোবে না। সুরো, প্রবীরদার দিকে তাকিয়ে।

ধুচ্ছি তুই রেডি। অনুপদা বললো।

অনেকক্ষণ।

আমি খেতে শুরু করে দিয়েছি।

অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে।

সত্যি তোর খিদে পেয়েছে।

একটা ধোসায় কতক্ষণ টানা যায় বলো।

খাস নি কেন?

চুপ করে রইলাম।

এখন অভ্যেস অনেক বদলে ফেলেছে। নেপলা বললো।

কি রকম!

একমাত্র চা ছাড়া বাইরের কোনও জিনিষ খুব একটা খায় না। তার ওপর ভেজিটেরিয়ান হয়ে পরেছে।

আবার বেল বাজলো।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/ufcevis
via BanglaChoti

Comments