কাজলদিঘী (১১০ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১১০ নং কিস্তি
—————————

ওঃ গড। আমি কাকে এই ঘরে ঢোকার পার্মিশন দিলাম। যাও তোমরা। এক মুহূর্ত এখানে দাঁড়াবে না। ডাক্তারদাদা চেঁচিয়ে উঠলো।

নীরু।

স্যার।

ফাইভ এমজি প্যাথিডিন নিয়ে এসে চ্যানেলে দিয়ে দে।

ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠছে। চোখের কোল দিয়ে মনে হয় জল গড়িয়ে পড়ছে। মেয়ে আবার তুলো দিয়ে মুছিয়ে দিল।

নীরু মনে হয় চ্যানেলে প্যাথিডিনটা দিল। হাতের শিরাগুলো ভীষণ যন্ত্রণা করে উঠলো।

একটা অব্যক্ত বেদনা আমার চোখে মুখে ফুটে উঠলো। মেয়ে বুঝতে পেরে কপালে হাত রাখল।

আবার আমি ঘুমের দেশে রওনা হলাম।

আজ আমাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হবে। সকাল থেকে সাজো সাজো রব। নীরু, কনিষ্ক এসেছে। পরিচিতদের মধ্যে এরা দুজন। বাকি সব অপিরিচিত। আমি কথা বলতে পারছি না। তবে সব শুনতে পারছি। এই কদিন যে টুকু সময় আমাকে জাগিয়ে রাখা হয়েছে। তাতে মেয়ের মুখটা ছাড়া কারুর মুখ দেখতে পাইনি।

হয়তো সবাই এসেছে। আমাকে দেখছে, তবে ঘুমন্ত অবস্থায়। মেয়ের কাছ থেকেই মিত্রার খবর নিয়েছি। বড়োমার খবর নিয়েছি। আমার সারা শরীর মেসিনের সঙ্গে বাঁধা। ক্যাথিডার লাগান আছে। নাকে নল গোঁজা আছে। দেখে শুনে মনে হচ্ছে। আমার শরীরে যা কিছু ঢোকান হয়েছে। সব পাইপের সাহায্যে।

মাথার ব্যাথাটা এখন অনেকটা কম। বিশেষ করে সারা মুখ মণ্ডলে যে অসহ্য একটা যন্ত্রণা ছিল, তা অনেকটাই কমে এসেছে।

কনিষ্ক কাছে এগিয়ে এলো। জিজ্ঞাসা করলো। আজ কেমন বোধ করছি।

ইশারাতেই উত্তর দিলাম। ভালো।

দু-জনেই আমাকে এক দৃষ্টে দেখে যাচ্ছে। কোনও কথা বলছে না। নিজেদের মধ্যে যে টুকু কথা বলার দরকার তাই বলে চলেছে।

ডাক্তারদাদা ঘরে এলো, সঙ্গে দু-জন। চিনতে পারলাম না। বয়স ডাক্তারদাদার থেকে সামান্য কম।

ইংরেজিতেই কথা বলছে তিনজন। কথার টানে বোঝা যাচ্ছে। এরা সাউথ ইণ্ডিয়ান।

কথাবার্তায় যে টুকু বুঝছি। আমার সম্বন্ধেই কথা হচ্ছে।

আমার চোখ মুখ দেখে ওদের মনে হচ্ছে। আমার বিপদ কেটে গেছে। পুরোপুরি সুস্থ হতে মাস ছয়েক লাগবে।

গলার স্বরটা একটু বসে গেলেও আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।

তবে কি জানেন মিঃ সামন্ত কানটা ঠিক রাখা গেছে এটাই অনেক।

চোয়ালটা ঠিক হয়ে গেছে। আর একজন বললেন।

আজ এক্সরে করলে বুঝতে পারবো। গত সপ্তাহ পর্যন্ত সামান্য চির ছিল।

ওষুধগুলো এ্যাপ্লাই হচ্ছে।

হ্যাঁ।

হাঁটা-চলা করলেই ঠিক মতো বোঝা যাবে আর কি কি সমস্যা আছে।

তারপরেই কনিষ্কর ডাক পড়লো।

আমার ইনস্ট্রুমেন্টগুলো নিয়ে আয়।

কনিষ্ক বেরিয়ে গেল।

আর শোন।

কনিষ্ক দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল।

কেউ যেন এখন না আসে।

কনিষ্ক মাথা দুলিয়ে চলে গেল।

ডাক্তারদাদা কাছে এলো।

এবার তো হাত-পা সব খুলে দিয়েছে। হাতটা একটু তোলার চেষ্টা কর।

চেষ্টা করলাম, ঠিক জোড় পাচ্ছি না। তবু বেশ কিছুটা তুললাম।

ওই দুজন ডাক্তার যেন চোখটা জুম করে দেখছে।

এবার বাম হাতটা তোল।

আমি ডানহাতের থেকে বাম হাতটা একটু বেশিই তুললাম।

গুড ইমপ্রুভমেন্ট ডা. সামন্ত একজন ডাক্তার বলে উঠলেন।

এরপর আমাকে একে একে বাঁ পা ডান পা সব তুলে তুলে দেখাতে হলো। যতোটা সম্ভব তোলার চেষ্টা করলাম। তবে স্বাভাবিক হতে পারলাম না।

কনিষ্ক ডাক্তারদাদার ইনস্ট্রুমেন্ট নিয়ে এসে ঘরে ঢুকলো।

শুরু হলো ডাক্তারদাদার কারসাজি, ঠোকাঠুকি ঘষাঘষি চলছে, মাঝে মাঝে ডাক্তারদাদার মুখটা খুশিতে ভরে উঠছে।

ইউরেকা, সত্যি দারুণ ইমপ্রুভ করেছেরে কনিষ্ক, আমি ভেবেছিলাম বছর খানেক লেগে যাবে।

আমি বোবা। চোখে কথা বলছি।

কনিষ্ক আমার কাজ শেষ। এবার তোরা দুজন প্রেসার পালসবিট ইসিজি একবার চেক করে নে। আমি ওটিতে আছি নিয়ে আয়।

দরজার কাছে গিয়ে বললো, শোন।

বলুন।

নিয়ে আসার পথে একবার এক্সরে আর এমআরআই করে নিবি।

আচ্ছা।

কাজ শেষের পর আমাকে চারজনে ধরে একটা ট্রলিতে শোয়াল। তারপর বার করে নিয়ে আসা হলো ঘরের বাইরে। মাথাটা সত্যি মনে হচ্ছে দশমনিভার। চোখ চারদিকে ঘুরছে। মিত্রা কোথায়? বড়োমা কোথায়?

একটা করিডোর দিয়ে বেরিয়ে আসার মুখে, কনিষ্ক চেঁচিয়ে উঠলো।

একবারে না। অনেক কাজ, স্যার জানতে পারলে আমাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।

কে কার কথা শোনে হই হই করে উঠলো।

সবাই আমাকে ঘিরে ধরলো, সবাইকে দেখতে পেলাম, শুধু দাদাকে দেখতে পেলাম না। বড়োমা, ছোটোমা, দামিনীমাসি, জ্যেঠিমনি, মিত্রার চোখ ছলছল। বড়োমা আঁচলটা আমার কপালে ঠেকিয়ে দিল। ছোটোমা আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে। কাউকে শান্তনা দেওয়ার কোনও ভাষা আমার নেই। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া।

কনিষ্করা নিয়ে চলে এলো। ডাক্তারদাদার হুকুম মতো সব করে আমাকে ওটিতে নিয়ে আসা হলো। দেখলাম ডাক্তারদাদ এবং আরও চার পাঁচজন আছে।

আমাকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে কনিষ্করা বেরিয়ে এলো। মনে হয় ড্রেস করে আসতে গেলো।

বেডে তোলা হলো। কয়েকটা মুহূর্ত ওদের চোখ মুখ দেখেছিলাম। তারপর আমার নাকের ওপর একটা বাটি বসিয়ে দেওয়া হলো। আর জানি না।

ক-দিন কতক্ষণ এই অবস্থায় ছিলাম জানি না।

জ্ঞান ফিরতে দেখলাম আমি একটা বেশ সুন্দর ঘরে শুয়ে আছি।

আগের ঘরটার মতো সেইরকম চারদিকে অতো মেশিন নেই। ঘরটা বেশ বড়োসড়ো। একটা সোফা আছে। টিভি আছে। দেখে মনেই হয় না এটা নার্সিংহোমের কোনও ঘড়। অনেকটা বাড়ির বৈঠকখানার মতো। বেশ ডেকরেটেড। দেখলাম একটাই মাত্র বোতল ঝোলান আছে। বুঝলাম স্যালাইন বা গ্লুকোজ জাতীয় কিছু হবে।

মাথাটা হঠাৎ কেমন যেন হাল্কা লাগছে।

না হাত নাড়তে পারছি না। মনে হয় বাঁধা আছে। এদিক ওদিক ঘাড় নাড়াবার চেষ্টা করলাম দেখলাম পারছি। ঘরের মধ্যে একটা মিহি আলো জ্বলছে। নাকে যে নলটা লাগান ছিল দেখলাম সেটা খোলা হয়ে গেছে।

এখন সন্ধ্যে না দিন? ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।

ঘরের পরিবেশ বলছে এখন রাত্রি। ঘরে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।

একটু নড়া চড়ার চেষ্টা করলাম। শরীরটা ভীষণ ভারি ভারি ঠেকছে। ওঠার চেষ্টা করলাম।

করছেন কি আপনি! আপনি আমাকে খুনের দায়ে জেল খাটাবেন।

একজন ভদ্রমহিলা ছুটে এলেন। আমাকে ধরে ফেললেন।

আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে।

কথা বলতে চেষ্টা করলাম, গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। কেমন একটা ফ্যাস ফেসে আওয়াজ।

ভদ্রমহিলা আমার বেডের সাথে লাগান বেলটা বাজালেন। হাঁপাচ্ছেন।

আর একজন কম বয়সী মেয়ে ঘরে ঢুকলো। এই মেয়েটার পরনে নার্সের পোষাক।

সিস্টার একটু কনিষ্কবাবুকে ডাকুন।

বুঝলাম কনিষ্ক ধারে কাছেই কোথাও আছে।

কি অসুবিধে হচ্ছে বলুন। ভদ্রমহিলা বললেন।

একটু উঠে বসতে চাই। নিজের গলা নিজে শুনতে পেলাম না। তবে বললাম।

এখন না বরং আমি একটু খাটটাকে উঁচু করে দিচ্ছি।

তাই দিন। আমার বাড়ির লোক কেউ নেই?

কনিষ্কদা, নীরুদা, বটাদা আছেন।

ডাক্তারদাদা?

বাড়ি গেছেন।

এখন কটা বাজে বলুন?

আড়াইটে।

দিন না রাত?

রাত।

কনিষ্করা সবাই ঘরে ঢুকলো।

কি হলো কনিকা।

উনি উঠে বসতে চাইছেন।

একটু সুস্থ হতে না হতেই লাফাতে শুরু করেছিস।

কনিষ্ক এগিয়ে এলো।

আপনি যান। এবার আমরা আছি। বড়ো লাইটটা জেলে দিন।

বটা দেখলাম তখনও গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। মুখটা কেমন শুকনো শুকনো।

হাতটা তোলার চেষ্টা করলাম পুরোটা পারলাম না। তবু বটাকে ভেতরে আসতে বলছি।

তুই লাফা লাফি কম কর। নীরু বললো।

একটু জল খাবো।

কেন খাচ্ছিস তো। কনিষ্ক বললো।

মুখটা কেমন লাগছে।

বুঝে গেছি। সমস্যা কি হচ্ছে বল?

কিছু না। গলাটা ভীষণ শুকনো শুকনো লাগছে।

কনিকা যাওতো একটু গ্লুকোজ গুলে নিয়ে এসো।

একটু ধরে বসা।

সব এক সঙ্গে হবে না।

একটু।

তুই এখনও সুস্থ নোস।

পিঠটা চিড় চিড় করছে।

কনিষ্ক নীরু দু-জনে ধরে একটু বসালো। দেখলাম ক্যাথিডার এখনও লাগান আছে। হেসে ফেললাম।

কি হলো!

এটা এখনো খুলিস নি?

কাল খুলে দেব।

তোদের অনেক কষ্ট দিলাম।

বটা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর মুখের দিকে তাকালাম। বুঝলাম সহ্য করতে পারছে না।

নীরু আমার সঙ্গে কথা বলবি না।

কেন বলবো না। তুই একটু ভালো হয়ে ওঠ।

কনিষ্ক খিদে পাচ্ছে।

কনিষ্ক নীরুর দিকে তাকাল। বুঝলাম ইশারায় কথা বললো।

এবার শুয়ে পর।

শুয়েই তো রয়েছি।

কনিষ্ক তবু আস্তে আস্তে ধরে শুইয়ে দিল।

নীরু মনে হয়ে একটা ইঞ্জেকসন দিল ঝোলানো টিউবটার মধ্যে।

প্রথমটা একটা ঘোরের মধ্যে রইলাম। তারপর আবর ঘুমের কোলে ঢলে পরলাম।

এখন অনেকটা সুস্থ। তবে প্রচুর রেস্ট্রিকসনের মধ্যে আছি। মেপে কথা বলা, টাইমে খাওয়া, সব একটা নিয়মের মধ্যে। এই সংবিধানটা মনেহয় ডাক্তারদাদার রচনা। আমাকে এর মধ্যে ধরে ধরে হাঁটান হয়েছে। অনেক রকমের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তারপর সব পরীক্ষায় পাশ করে বাড়ি যাওয়ার পার্মিশন পেয়েছি। আজ সেই দিন।

আমি জানিনা কতদিন এখানে থাকলাম। এই কদিনে সবাই এসেছে। কিন্তু সেই দিনের বিষয় নিয়ে কেউ কোনও কথা বলে নি। কিংবা জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করে নি। সেই দিন বড়োমার মুখ ফসকে সেই কথাটা বেরিয়ে যাওয়া ছাড়া।

ইসলামভাই, নেপলা, সাগির, অবতার, ইকবালভাই, আবিদরা কেউ আসে নি। এলেও আমার সঙ্গে দেখা হয় নি। দাদারা এসেছিল? অনিমেষদারা একদিন এসেছিল।

ভীষণ ভালো লাগছে আজ বাড়ি যাব।

ডাক্তারদাদা বলেছে কিছু চেকিং আছে। ওগুলো করে নিয়ে যাবে।

তীর্থের কাকের মতো সকাল থেকে অপেক্ষা করছি।

বেলা দশটা নাগাদ কনিষ্ক নীরুরা এলো।

কিরে সব ঠিক আছে?

হ্যাঁ। আর এখানে থাকতে ভালো লাগছে না।

নীরু হাসছে।

মিত্রা আসবে?

না।

কেন?

তুই যাবি তাই জন্য বাড়ি ঘড় রেডি হচ্ছে।

মেয়ে?

আসবে হয়তো।

আমার মোবাইলটা কোথায় বলতো?

এখন আর তার প্রয়োজন নেই।

একবার তাকালাম কনিষ্কর দিকে।

কনিষ্ক আমি স্মৃতি শক্তি হারাই নি। তোরা আমাকে সুস্থ করে তুলেছিস। জানিনা আমি এখানে কতদিন ছিলাম। তোদের কাছে আমি ঋণী। ঋণ শোধ করবো না, তবে হিসাবটা আমাকে বরাব্বর করতে হবে।

তুই এখনও সুস্থ নোস। অনেক রেসট্রিকশনে থাকতে হবে।

গ্রামের ছেলে, মাঠে ঘাটে মানুষ, আমার শরীরের সহ্যশক্তি তোদের থেকে অনেক বেশি।

কনিষ্ক, নীরু একে অপরের মুখের দিকে তাকাল।

আমাকে একটা কথা বলতে পারবি?

বল। কনিষ্ক আমার চোখে সরাসরি তাকাল।

আমি এখানে এলাম কি করে একটু বলতে পারবি?

ওটা স্যার বলবে, আমরা বলতে পারব না।

কতদিন এখানে কাটালাম, এটা বলতে পারবি?

একশো পাঁচ দিন।

আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?

বল।

ইসলামভাইদের কাউকে একদিনও দেখতে পাই নি।

কনিষ্ক, বটা, নীরু তিনজনেই মাথা নীচু করলো।

এগুলো কি তোর আজই জানার প্রয়োজন। নীরু বললো।

আমি একটু সুস্থ হওয়ার পর থেকে তোদের লক্ষ্য করেছি।

কি লক্ষ্য করেছিস?

তোরা অনেক কিছু গোপন করে যাচ্ছিস।

ওটা তোর শরীরের জন্য।

আমি এখন সুস্থ।

একটু অপেক্ষা কর সব জানতে পারবি।

এবার বল আমার কি হয়েছিল, কেন আমায় এতদিন এইখানে রাখা হলো।

তোর মাথায় চোট লেগেছিল। একটু বাড়াবাড়ি হয়েগেছিল।

কি এমন চোট যে এতো বাড়াবাড়ি।

স্যারের কাছ থেকে জেনে নিস।

তোর ফোন থেকে মিত্রাকে ফোন করে আমাকে দে।

তুই তো আর ঘণ্টা খানেকের মধ্যে ফিরে যাবি।

অনুপকে আমায় ধরে দে।

অনুপ আসবে।

বুঝেছি বহুত বড়ো ঘোটালা হয়ে গেছে। একটাও বাঁচবে না।

এবার কিন্তু তুই বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছিস। ফিট সার্টিফিকেটে আমি সই করবো না। কনিষ্ক ধমকে উঠলো।

চুপ করে গেলাম।

প্লিজ কনিষ্ক তুই একটা কথা শুধু বল, সবাই ভালো আছে কিনা।

সবাই ভালো আছে। ঠিক আছে।

ডাক্তারদা, অনুপ, হিমাংশু আরও তিনজন ঢুকলো।

কিরে সব ঠিক আছে।

ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকিয়ে।

আমি ঠিক আছি। তোমার সঙ্গে আমার কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে।

এনাদের সঙ্গে তোর পরিচয় করিয়ে দিই।

অনুপ, হিমাংশু আমার দিকে তাকাল।

আমি অপরিচিত তিনজনের দিকে তাকালাম।

ইনি হচ্ছেন ডিআইজি সিআইডি মিঃ নুরুল হাসান, ইনি হচ্ছেন বর্তমানে কলকাতার সিপি সুহৃদ দত্ত, ইনি তোর জেলার এসপি রঘুবীর প্রসাদ।

আমি সবার দিকে তাকিয়ে বুকে হাত তুলে নমস্কার করলাম।

আমরা আপনার কাছ থেকে কিছু জিনিস জানতে চাই। মিঃ হাসান বললেন।

আমি লিখিতভাবে জানাব। আপনারা রিসিভ করে দেবেন।

অবশ্যই।

অনুপ আমাকে কাগজ আর কার্বন এনে দে। আর আপনারা সবাই এক ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করুণ। লেখা শেষ হলে আপনাদের ডেকে নেব।

মিঃ ব্যনার্জী আমরা থাকলে অসুবিধে আছে। মিঃ দত্ত বললেন।

আমার লেখাতে বিঘ্ন ঘটবে। লেখা শেষ হলে, সেটা পড়ে আপনারা যা যা প্রশ্ন করবেন আমি তার যথা যথ উত্তর দেব।

থ্যাঙ্কস।

সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমাকে কাগজ পেন দেওয়া হল।

আমি সেদিনকার সমস্ত ঘটনা একে একে লিখলাম একেবারে ধরে ধরে।

প্রায় পাঁচ পাতার গল্প, গল্পের ছত্রে ছত্রে এটুকু বোঝাতে চাইলাম, আমাকে ওরা এনকাউন্টার মারার পরিকল্পনা করেছিল। আমি বাধা দিতে তারপর ওরা আমাকে মেন্টাল টর্চার করে এবং আমাকে শারীরিক অত্যাচার করা হয়।

শেষে আমার মুখে এমন ভাবে আঘাত করা হয়, আমি জ্ঞান হারাই, তারপর আমি আর কিছুই জানি না। এবং আমি বিশ্বাস করি এটা করিয়েছে মন্ত্রী অনাদি চন্দ্র, মন্ত্রী ভক্তিভূষণ বর যিনি দক্ষিণবঙ্গ উন্নয়ণ পরিষদের দায়িত্বে আছেন, মন্ত্রী সুলতান লতিফ কৃষি দপ্তরটা যিনি দেখেন, আর স্বরাষ্ট্রসচিব।

লেখা শেষে খাটের গায়ে ঝোলা বেলটা টিপে ওদের ডেকে পাঠালাম।

একে একে সবাই এলেন।

লেখা শেষ মিঃ ব্যানার্জী? মিঃ নুরুল হাসান বললেন।

আপনারা তিনজনে এই কাগজটাতে সই করুণ।

মিঃ হাসান এবার হাসছেন।

আমরা এটাকেই এফআইআর হিসাবে ট্রিট করবো। আপনার চিন্তার কোনও কারণ নেই।

আপনার নেই, আমার আছে মিঃ হাসান।

এইভাবে এটা রিসিভ করা যায় না।

তাহলে আমি এখান থেকে বেরিয়ে সোজা হাইকের্টে যাব। ওখানে জাজের সামনে জবানবন্দি দেব।

আজ সেই সময় চলে গেছে।

তাহলে কাল আমি রিলিজ নেব। আজ নয়।

আমাদের কিছু জিজ্ঞাস্য আছে।

ওটা কালকের পরে করবেন, কোর্টে দাঁড়িয়ে আপনাদের প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর আমি দেব।

ডাক্তারদাদ ওনারা যে এখানে এসেছেন তার কোনও ডকুমন্টস তোমাদের কাছে আছে?

আছে।

ঠিক আছে আপনারা এখন যান কাল কোর্টে দেখা হবে।

প্লিজ মিঃ ব্যানার্জী।

মিঃ হাসান আমাকে রিকোয়েস্ট করবেন না। তাহলে আপনাদের অনুরোধ করবো আমাকে এ্যারেস্ট করার জন্য।

মিঃ হাসান এবার উঠে চলে গেলেন, ঘরের এক কোনায় গিয়ে কার সঙ্গে নিচুস্বরে কথা বললেন। মনে হয় আইজির সঙ্গে।

তারপর কাছে এগিয়ে এলেন। এটা আমরা তিনজনে রিসিভ করে নিলে আপনি খুশি।

আমার খুশিতে কিছু যায় আসে না মিঃ হাসান, আইন খুশি থাকলে আমরা সবাই খুশি।

একবার পড়ে দেখতে পারি।

সে আপনাকে দেখতে দিতে পারি।

মিঃ হাসানের হাতে কাগজটা দিলাম। আর দু-জন ওনার পাশে এসে দাঁড়ালেন।

দেখলাম মিঃ হাসান খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন।

মাঝে মাঝে আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন আর মুচকি মুচকি হাসছেন।

পড়া শেষ হতে মিঃ হাসান হেসে বললেন।

মিঃ ব্যানার্জী আপনি কি কোনওদিন আইন নিয়ে পড়েছেন।

না। তবে আইনটা বোঝার চেষ্টা করেছি।

এটা রিসিভ করার ক্ষেত্রে আমাদের অসুবিধে আছে।

তাহলে আপনারা এখন আসুন।

তা কি করে হবে। আপনি সুস্থ। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে পারি। তার ডকুমেন্টস আমরা এখানে জমা দিয়েছি।

ডাক্তারদাদা তুমি কি ফিট সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছো?

ওটা কনিষ্ক দেবে, তুই কনিষ্কর আণ্ডারে।

কনিষ্ক সাইন করেছিস?

না।

কাল সাইন করিস।

মিঃ ব্যানার্জী ব্যাপারটা মনে হয় আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের আপনি ঠিক বুঝতে চাইছেন না।

আপনার কাছে, আমার কাছে নয়। আর আমি যদি সত্যি সুস্থ থাকি অবশ্য আপনার কথা মতো, তাহলে আপনি আমাকে এ্যারেস্ট করে কোর্টে তুলতে পারেন। তার আগে আপনাদের সরকারী হাসপাতালে, সরকারী ডাক্তারদের সহায়তায় আমাকে চেকআপ করিয়ে প্রয়োজনীয় ইনটরোগেশন শুরু করতেই পারেন।

মিঃ হাসান আবার হাসলেন।

ঠিক আছে আপনি দিন, আমরা তিনজনে রিসিভ করে দিচ্ছি।

আমি চিঠিটা এগিয়ে দিলাম। ঘরের সবাই আমার দিকে তাকিয়ে।

তিনজনেই রিসিভ করে দিলেন। আমি কপিটা হাতে নিয়ে একটু দেখে নিলাম। বললাম, প্রত্যেকের ডিজিগনেশনগুলো এখানে লিখে দিন।

তিনজনেই কাগজটা নিয়ে আবার আমার কথা মতো কাজ করলেন।

ইচ্ছে করেই হঠাৎ বিছানায় ধুপ করে পড়ে গেলাম। কনিষ্ক ছুটে কাছে এলো।

কি হলো! এনি প্রবলেম।

কনিষ্করদিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম। চোখের মনি স্থির।

কি সমস্যা হচ্ছে বল!

খুব আস্তে করে বললাম। ওনাদের সঙ্গে এই মুহূর্তে কথা বলতে পারবো না। বড্ড কষ্টহচ্ছে মাথায়।

কনিষ্কর চোখমুখ শুকিয়ে গেল।

ওদের বল আমি একটু সুস্থ বোধ করলে আসবেন।

মাথার কোন দিকটা কষ্টহচ্ছে বল—

কাটা জায়গাটা। ওদের বল আমার যা বলার আমি লিখিত ভাবে বলেছি। ওনাদের কি কি জানার আছে লিখিত দিতে বল, আমি প্রতিটা প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে দেব।

চোখের পাতাটা বুঁজে এলো।

কনিষ্ক এগিয়ে এলো। মুখটা শুকনো।

আপনারা প্লিজ একটু বাইরে যান।

ডাক্তারদাদার চোখ চক চক করছে। ধরতে পেরেও ঠিক ধরতে পারছে না। অনুপ, হিমাংশু এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে। আমার বিহেভিয়ারে একটু অবাক, তবু কোনও কথা না বলে ওদের সঙ্গে ওরাও বাইরে চলে গেল।

কনিষ্ক দরজা বন্ধ করে আমার মুখের কাছে মুখটা নিয়ে এলো।

কিরে কোথায় সমস্যা হচ্ছে!

সব বেরিয়ে গেছে? চোখ চাইলাম।

হ্যাঁ।

একটা প্যাথিডিনের প্রেসকিপসন কর, বাইরে বলে দে আমার রাইগার শুরু হয়েছে, সবাইকে ডেকে চেঁচামিচি শুরু করে দে। ট্রলি আনতে বল। চারদিকে একটা হই হই ফেলে দে। ইমিডিয়েট আমার স্ক্যান, এমআরআই করা প্রয়োজন। তোদের ডাক্তারি শাস্ত্রে যা যা আছে থরো চেকআপ শুরু কর।

কনিষ্ক ভ্যাবলার মতো আমার দিকে তাকিয়ে!

লোকাল থানায় একটা ফোন কর, ওসিকে ডেকে পাঠা, একটু ভালো করে চমকা, একটা রিপোর্ট লিখে সাইন করিয়ে নে, ওরা তিনজন এসে আমাকে প্রেসার করেছে জবানবন্দী লিখতে, আমার শরীর এই ট্রেসটা এই মুহূর্তে নিতে পারেনি, তাই আবার আমার শরীর ডিটরিয়েট করেছে।

ওরা আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে।

হ্যাঁ করে দেখছিস কি!

ভাবছি তুই ঠিক বলছিস না ভুল বকছিস।

দিলাম তেরে খিস্তি।

নীরু হেসে ফেললো।

যা বলছি গুছিয়ে কর। ডাক্তারদাদাকে এখন কিছু জানবি না। আমি কনটিনিউ এ্যাকটিং করে যাব। কেউ ধরতে পারবে না। মনে রাখবি আমি এখন সন্ন্যাসী হয়ে নীরুর ভূত ছাড়াচ্ছি। বটা কোথায়?

ওর শুকিয়ে গেছে।

কাগজ তৈরি করে এখুনি দেবার ব্যবস্থা কর, আমার লাগবে। আমাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে চল। আমি মরার মতো পরে আছি।

ধন্য তোকে।  তুই এখনও সুস্থ নোস।

দিলাম গালাগাল।

নীরু হেসেই চলেছে।

বাকিটা অনুপের সঙ্গে কনসাল্ট করে নে।

আমার ইনস্ট্রাকসন মত কাজ শুরু হয়ে গেল। আবার হুরো হুরি পড়ে গেল।

চারদিকে হই চই শুরু হয় গেল। করিডরে নার্সদের দৌড়োদৌড়ি। ডাকাডাকি চেঁচামিচি।

আমাকে ধরাধরি করে নিয়ে আসা হল ওপারেসন থিয়েটারে।

আসার সময় অজ্ঞানের ভান করে চোখ স্থির করে ট্রলিতে পরে রইলাম। দেখলাম ডাক্তারদাদা পেছন পেছন আসছে।

কনিষ্ক বললো, আমি সামলে নিচ্ছি স্যার। আপনি একটু পরে আসুন।

হিমাংশু, অনুপের মুখ শুকিয়ে গেছে।

ডাক্তারদাদা মনে হয় কাউকে ফোন করছে।

সুপার্ব এ্যাক্টিং করলাম।

আমার স্ক্যান হলো, এমআরআই হলো, রক্ত নেওয়া হলো সব রকমের পরীক্ষার জন্য।

বুঝতে পারছি বাইরে একটা হুলুস্থূলুস কাণ্ড চলছে।

নীরু নীরুর পার্টে খুব সুন্দরভাবে খেললো, কনিষ্ক তার নিজের পার্টে দুর্দান্ত খেললো।

আমার কাছে কনিষ্ক, নীরু ছাড়া কারুর প্রবেশ নিষেধ।

আমি একা অপারেশন থিয়েটারের লাগোয়া ঘরে পড়ে আছি।

শুয়ে শুয়ে সব গেমপ্ল্যান তৈরি করলাম।

বেশ কিছুক্ষণ পর, কনিষ্ক এলো।

কিরে তোর মুখ শুকিয়ে গেছে কেন? আমি বললাম।

বাইরে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেছে।

হতে দে। শোন একটা কাজ করতে পারবি?

কি বল।

নীরু কোথায়?

ওসির বাপ বাপান্তর করে রিপোর্ট লেখাচ্ছে।

কি বলছে?

শালা নীরু যা বলছে তা লেখে নাকি।

ওই তিনটে মর্কট আছে না চলে গেছে?

আছে। ফোনা ফুনি চলছে। তুই গেমপ্ল্যান করছিস, ওরাও গেমপ্ল্যান রেডি করছে।

এখানে আইসিইউ আছে?

আছে। দুটো ভিআইপি চেম্বার আছে। একটায় তুই ছিলি।

গুড।

নার্সিংহোমের সিকুরিটি আছে?

আছে।

বিশ্বস্ত না পোঁদপাকা?

তুই যা চাইছিস এখানকার মাল দিয়ে হবে না।

বটার থেকে আমাদের মধ্যে হারামী কে। এই মুহূর্তে সেই রকম নার্ভ ধরে রাখতে পারবে।

আমার থেকে তুই ভালো জানবি কাকে দিয়ে কাজ চলবে।

হারামী।

কনিষ্ক হাসছে।

হাসিস না।

হাসবো না।

হ্যাঁ রে শালা।

কেউ মরে, কেউ হরি হরি বলে।

এছাড়া উপায় নেই। অনাদি অন্য খেলা খেলেছে।

অনিকেতকে ডেকে নিই।

তাই নে। আর একটা কাজ কর।

বল।

অর্ককে একটু খবর দে।

অর্ককে পাবি না।

বুঝে গেছি। অরিত্র।

পাবি।

ওকে ফোনে ধরে আমাকে দে। বল বাইরে বেরিয়ে এসে তোকে রিং করতে। অন্যের মোবাইল থেকে ওর মোবাইল থেকে নয়।

আচ্ছা।

কনিষ্ক আমি যা বললাম সেইভাবে অরিত্রর সঙ্গে কথা বলে নিল।

কিরে কি বললো?

বাইরে বেরিয়ে এসে পাবলিক বুথ থেকে ফোন করছে।

এবার আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবি।

তোর কিছু হলে আমি কিন্তু স্যুইসাইড করবো। কনিষ্ক প্রায় কেঁদে ফেলে।

ঘাবড়াস না। আমার কিছু হবে না।

তোর প্রেসার ঠিক নেই।

আমার প্রেসার সব সময় হাই।

কনিষ্ক চুপ করে রইলো।

ইসলামভাইকে জেলে ঢুকিয়েছে না বাইরে আছে।

ঢুকিয়েছিলি রাখতে পারেনি। অনুপ বার করে নিয়েছে।

সাগির, নেপলা, অবতার।

অনুপ দুবাই পাঠিয়ে দিয়েছে।

কেন, ওরা এদেশের নাগরিক নয়। তাছাড়া ব্যবসার খাতিরে ইণ্ডিয়াতে এসেছে।

অনাদি ওদের নামে হুলিয়া বার করেছিল।

কেন!

ক্ষমতা হাতে থাকলে জানিস তো ভূতের বাবারও শ্রাদ্ধ হয়। সবাই কি আর তুই। গুলিয়ে ফেলিস কেন।

রতন, আবিদ, ইকবালভাই।

এখনও কন্টিনিউ লড়ে যাচ্ছে।

বাইরে না ভেতরে।

কিছুদিনের জন্য ভেতরে ছিল।

অনিমেষদারা।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয় রেগুলার খুন যখম চলছেই।

চিকনা।

গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে।

শ্যাম, শিবু, দারু।

ওরাই তো গণ্ডগোলটা পাকাল।

কেন!

তোর এই অবস্থা শোনার পর ওরা পাগলের মতো হয়ে গেল। ওদিকে পুরো আগুন জ্বলছে।

প্রশাসন।

ঠিক রাখতে পারছে না। শ্যাম এখনও রেগুলার টিভিতে বক্তব্য রাখছে।

কিসের!

তোকে ওরা ভগবান বলে মনে করে। ব্যাশ অনাদি মওকা পেয়ে গেল।

ওদের ধরতে পেরেছে।

ওই পাহাড়ী এলাকায় ঘন বনজঙ্গলে ওদের ধরবে। তাহলে এয়ারফোর্সকে ডাকতে হবে।

করেছেটা কি?

নিজাম প্যালেসের ওই তিনজন যারা তোকে ইনটরোগেট করছিল তাদের বাচ্চাগুলোকে তুলে নিয়ে চলে গেছে।

সব্বনাশ! ছেড়ে দিয়েছে?

ছাড়বে কি তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলাচ্ছে তারা নাকি দিব্যি ভালো আছে। শ্যামের একটা কথা ওই তিনজনকে দাও, বাচ্চা নিয়ে যাও। নাহলে বাচ্চা গুলোকে জঙ্গি বানিয়ে দেব।

তোর চেলাগুলো এখন ভালোপাহাড়ে যাচ্ছে না?

যেমন যাওয়ার তেমনি যাচ্ছে। ওদের একবার ধাওয়া করেছিল অনাদির লোক। ওরা ওদের মতো ওখানে গিয়ে কাজ করেছে, পরে জানতে পারলাম, তিনটে আইবির লোককে স্পট করে দিয়েছে। তারপর আর কেউ ভয়ে ওই এলাকায় পা মারাচ্ছে না।

ছেলেগুলোকে কিছু বলে নি?

কি বলবে ওরা এনজিওর লোক সপ্তাহে একদিন ফোঁকটসে পরিশ্রম করতে যাচ্ছে, কার কি বলার আছে।

আমি চুপ করে রইলাম।

শ্যাম তো কয়লার গাড়ি নিয়ে কলকাতায় এসেছিল। বড়োমার পায়ে ধরে শপথ করে গেছে। অনিদার কোনও ক্ষতি হলে অনাদিকে পর্যন্ত উড়িয়ে দেব। দু-জনকে পাশা পাশি চিতায় জ্বালাব। এই কদিনে কত কাণ্ড ঘটলো।

তোর সঙ্গে শ্যাম কথা বলে না?

রেগুলার রাতে তোর খবর নেবে। একেবারে পাই টু পাই। একটু ভুলভাল বললেই বলবে, কনিষ্কদা তুই গুল মারছিস, আমার কাছে অন্য খবর আছে। কে যে ওর লোক বোঝা মুস্কিল।

অনিমেষদারা এই মওকাটা কাজে লাগাতে পারছে না।

বলতে পারিস পুলিশ দিয়ে সন্ত্রাস চালাচ্ছে।

অনাদি এসেছিল?

একবার। মরা কান্না কাঁদলো। তারপরই বেরিয়ে গিয়ে শুরু করে দিল।

ইসলামভাই এখন কোথায়?

কলাকাতাতেই আছে।

তোর সঙ্গে যোগাযোগ?

একটু আগে ফোন করেছিল। সত্যি কথা বলে দিয়েছি। কিছু করার নেই। ওকে আটকে রাখা যাচ্ছে না। অনিমেষদা কোনও প্রকারে আটকে রেখেছে।

অনিমেষদা এখন কোথায়?

স্যার সবাইকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে চলে এসেছে।

আমার মোবাইলটা কোথায়?

মনে হয় ম্যাডামের কাছে।

বাড়িতে একবার কাউকে পাঠাতে পারবি?

শিল করা আছে।

তার মানে!

সবাই এখন ম্যাডামের ওই বাড়িতে রয়েছে।

কেন!

আইনের কি ব্যাপার স্যাপার আছে। ওই বাড়ি নাকি অবৈধ অনেক কিছুর খনি। তোর বয়ানের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তাই সেদিন থেকে সবাইকে বার করে দিয়ে শিল করে দিয়েছে।

জগন, ছগনলাল?

ওরা আছে। বাইরের গেটে পাহাড়া দিচ্ছে। কোর্টের অর্ডার।

পুলিশ আছে নাকি?

না।

বুঝেছি।

কনিষ্কর ফোনটা বেজে উঠলো।

কানে দিয়েই বললো। অরিত্র।

দে।

অরিত্র।

আমার গলা শুনে অরিত্র ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেললো।

অনিদা কখনও কাঁদে না। শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে লড়ে যায়।

তবু অরিত্র ফুঁপিয়ে চলেছে।

আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?

বলো।

অর্ক কোথায় আছে?

কিছুদিন হলো গা ঢাকা দিয়ে আছে। ওকে সিআইডি খুঁজছে। অনাদিদার সেই সিডি চাইছে। বার বার ধরে হ্যারাস করছে।

বুঝেছি। তুই এক কাজ কর।

কি করবো।

ছাদে চলে যা। ছিদামের ফোন থেকে আমাকে ফোন কর, সঙ্গে সন্দীপকে রাখবি। যা যা বলবো করে যাবি।

ঠিক আছে।

শোন।

বলো।

আমার দুটো নতুন সিম চাই, একটা হাজার দেড়েক টাকা দামের ফোন।

জোগাড় করে দিচ্ছি।

ঘণ্টা খানেকের মধ্যে চাই।

ফোনটা কেটে দিলাম।

কনিষ্কর দিকে তাকালাম।

কনিষ্ক আমার কব্জিতে হাত দিয়ে পাল্‌স বিট দেখছে।

এতদিন দেখছিস, ঘাবড়ে গেলে চলে, মিত্রাকে একবার ডাক।

কেন!

বলেছি না এখন কোনও কথা বলবি না। নীরু মালটা রেডি করলো কিনা দেখ। অনুপকে দিল কিনা দেখ। লাস্ট আপডেট দে। আর ওই মালগুলো চলে গেছে কিনা সেই খবরটা নে। অনিকেতকে আসতে বল।

কনিষ্ক বেরিয়ে গেল।

খাটে সোজা হয়ে শিরদাঁড়া টান টান করে বসলাম। বুঝেছি অনাদি অনেক বড়ো খেলা খেলে দিয়েছে। এই মওকায় ওকে থামাতে না পরলে ও সব শেষ করে দেবে। ও মনে মনে নিশ্চই ভেবে নিয়েছে, আমি এসব শুনলে মানসিক ভাবে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পরবো। ওর কাছে গিয়ে স্যারেণ্ডার করবো, ও গোঁফে তা দিয়ে আমাকে চুষবে।

শালা কিছুতেই বোঝে না ক্ষমতা বাপের নয় দাঁপের। যার যত দাপট তার তত ক্ষমতা।

অনাদি ভেবেছেটা কি, ধরাকে সরাজ্ঞান করছে। ও জানে না এক নিমেষের মধ্যে ওকে ধুলিস্যাৎ করে দিতে পারি। পাঁচ-হাজার কোটি টাকার ঘোটালা, কম নয়, না এখন লেখা যাবে না। একবার টোপ দিই, যদি গিলে ফেলে, তবে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না।

এখন মনে হচ্ছে ও আমার সমস্ত কানেকসন নষ্ট করে দিতে চেয়েছে। হয়তো ফোন ট্যাপিং পর্যন্ত করতে পারে। সেন্ট্রালে রাঘবনের এ্যান্টি মাধবন ওর ঘুঁটি। যেটা এতদিন গেইজ করছিলাম এখন সেটাই সত্যি হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু অনিমেষদারা এর ফয়দা তুলতে পারলো না কেন? এই মওকায় সোর মাচিয়ে দিতে পারতো। ওরা এতটা দুর্বল হয়ে পরলো কেন? তাহলে কি পার্টিগত গলদ।

মিত্রা মেয়ে এসে ঘরে ঢুকলো। মেয়ে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। মিত্রা তখনও গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। চোখ জল টল টল করছে।

কাঁদিস না মা, বাবা ঠিক আছে। মেয়ের মুখটা বুক থেকে তুলে ধরলাম।

জানিস মা, গ্রামের ঘরে একটা কথা আছে। মেয়েদের প্রান কই মাছের জান। তোর বাবারটাও ঠিক তাই। আমাকে সহজে কেউ মারতে পারবে না বুঝেছিস।

সবাই বলাবলি করছে তোমার শরীর খারাপ হয়েছে।

তুই তো নিজের চোখে দেখছিস। ওই দেখ তোর মা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেঁদেই চলেছে।

দিদাই, দিদান, দিদুন সবাই কাঁদছে।

দাদা।

গম্ভীর হয়ে রয়েছে। ও তো কাঁদে না। ভেতর ভেতর গোমড়ায়।

তোকে একটা কাজ করতে হবে।

কি বলো।

বাইরে গিয়ে তোকে বলতে হবে। বাবার শরীরটা ভালো নয় দেখলাম বিছানায় চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। কিরে এই কথাটা বাইরের সকলকে বিশ্বাস করাতে পারবি।

মেয়ে চুপ করে রইলো।

পারবি না?

ফ্যাল ফ্যাল চোখে মায়ের দিকে তাকাল।

মাকে ভর্সা করতে পারবো না। তোর মার পেটটা বড়ো পাতলা। তোর ওপর ভর্সা করতে পারি।

মেয়ে আস্তে করে মাথা দোলাল।

আমি তোর কাছ থেকে বাহাত্তর ঘণ্টা সময় চাইছি। দেখবি তার মধ্যেই সমস্ত সিচুয়েসন নর্ম্যাল করে দেব।

তুমি ম্যাজিক জানো।

ঠিক ম্যাজিক না, তবে ক্ষমতাবান মানুষের দুর্বলতা কোথায় কোথায় থাকে তার হদিস রাখি, বলতে পারিস ওগুলো আমার নখোদর্পনে। সময় বুঝে ওই দুর্বল জায়গায় কষে ঘা দিই, তখনই সব বেসামাল হয়ে যায়। আমি আমার কাজটা করে বেরিয়ে যাই। সবাই বলে আমি ভগবান, ম্যাজিক জানি।

জানিস মা, এই জগতে কোনও মানুষ পরিপূর্ণ নয়। এমনকি তোর বাবাও নয়। কারুর লোভ বেশি কারুর লোভ কম। যার যতো বেশি লোভ, সে ভেতর ভেতর তত বেশি দুর্বল। তোকে সেই দুর্বল জায়গাটা খুঁজে বার করতে হবে। তারপর ঝোপ বুঝে কোপ মারো। না হলে, ওই দুর্বল জায়গাটাকে একটু খুঁচিয়ে ঘা করে দাও।

ময়ে আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।

ব্যাশ কেল্লাফতে।

সুন্দর কোথায়রে মা?

অনুপ আঙ্কেল ওদের ইণ্ডিয়ার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে।

ওর সঙ্গে কথা বলিস?

প্রতিদিন।

আমার কথা জিজ্ঞাসা করে না?

ফোন করলেই প্রথমে তোমার কথা বলে।

তনুমনি।

একটু আগে মায়ের সঙ্গে কথা বলেছে। মা আবার তোমার শরীর খারাপের কথা বললো।

বাহাত্তর ঘণ্টা তোকে সবাইকে বলতে হবে, আমার শরীর খারাপ। বাহাত্তর ঘণ্টা পর তুই সবাইকে জানাবি আমার শরীর ভালো হয়ে গেছে। আমি নিজে চোখে বাবাকে দেখে এসেছি।

নেপলা আঙ্কেল সকালে ফোন করেছিল।

কোথা থেকে!

বম্বেতে আজ সকালে এসেছে।

সবাই না ও একা?

সবাই। বললো শেষ দেখা একবার দেখবে সবাইকে।

বাবার কথা জিজ্ঞাসা করলে বলবি, বাবার শরীরটা এখন খারাপ। পারবি বলতে?

মেয়ে মাথা দোলাল। না।

পারবি না! কেন?

নেপলা আঙ্কেল কষ্টপাবে, তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে। এখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে গেছে। মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন রাতে এক ঘণ্টা কথা বলতো।

ঠিক আছে ফোন নম্বরটা দে?

মার কাছে আছে।

মিত্রা কাপরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে এগিয়ে এসে আমার পাশে বসলো।

আমি ওর দিকে তাকালাম।

কিরে কথা বলবি না?

মিত্রা মাথা নীচু করে রইলো।

আমার জন্য তোদের অনেক কষ্ট। আর একটু সহ্য কর। মনে হচ্ছে এটাই আমার শেষ কাজ হবে। তারপর হাত গুটিয়ে দুজনে খালি ঘুরে বেড়াব।

মিত্রা মুখ থেকে একটি শব্দও বের করলো না।

দেখছিস মা, তোর মা আমার ওপর বেজায় চটে গেছে। কি করি বলতো।

কনিষ্ক ভেতরে এলো।

কিরে সব কুল। আমি বললাম।

ওই মাল তিনটে এখন ভাগলো। অনুপের সঙ্গে কিছুক্ষণ আইনের কচকচানি হলো। অনেকদিন পর অনুপকে দেখলাম ছক্কা, চার মারতে।

যাক মালটা এতক্ষণ বাদে খেলাটা ধরতে পেড়েছে। গাড়ি স্টার্ট নিয়ে নিয়েছে বুঝলি কনিষ্ক, আর চিন্তা নেই।

অনুপ ভেতরে আসতে চাইছে।

আমাকে আইসিইউতে ট্রান্সফার কর।

হেঁটে যাবি না শুয়ে যাবি।

কিসে গেলে ভালো হয়।

বাইরে সব দাঁড়িয়ে।

চ্যানেল করে স্যালাইনটা ঝুলিয়ে দে। নাকে অক্সিজেন মাক্সটা লাগিয়ে দে। এতেই কাজ হবে।

কেন!

এতক্ষণ বাদে মিত্রা কথা বললো।

কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে, সং না সাজলে ভিক্ষা পাওয়া যায় না বুঝলি।

কনিষ্কর দিকে তাকালাম।

আমার কাগজপত্র।

সে তো অনুপ নিয়ে নিলো, বললো আমার কাছে থাক। এতদিন আইনত লড়ার জায়গাটাই পাচ্ছিলাম না, ঠুটো জগন্নাথের মতো বসে ছিলাম।

শুনলি কনিষ্কর কথা, এবার একটু হাস।

মিত্রার গালটা ধরে একটু নারিয়ে দিলাম।

মেয়ে মুচকি হাসলো।

ভেতরে প্রচুর কষ্ট তবু একটু হাঁসার চেষ্টা করলো।

আমার ফোনটা কোথায়?

আমার কাছে আছে।

দে।

বাইরে ব্যাগের মধ্যে।

কনিষ্কর হাতে দিয়ে দে, কেউ যেন দেখতে না পায়।

মেয়ের দিকে তাকালাম।

এবার যা মা। পরে আবার ডেকে পাঠাব।

দুদুন, দিদানের সঙ্গে কথা বলবে না?

পরে বলছি।

একবার বলো।

আগে ওই ঘরে যাই তারপর বলছি।

সত্যি সত্যি তোকে স্যালাইন আর অক্সিজেন দেবে!

মিত্রা দ্বিতীয়বার অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো।

যে কেউ যখন তখন নিতে পারে অসুবিধে হবে না।

মিত্রা, কনিষ্কর দিকে তাকাল।

আমাকে কিছু বলো না। আমি শুধু হুকুম তামিল করছি। ওর অসুবিধে হয় এমন কোনও কাজ করবো না, তোমাকে কথা দিলাম।

মা যা যা বললাম মাথায় রাখবি।

আচ্ছা।

ওরা চলে গেল। কনিষ্ক তার নিজের কাজে মন দিল।

নীরু কোথায়?

বাইরে সামলাচ্ছে।

ডাক্তারদাদা।

মনে হয় ধরতে পেরেছে সামথিংস হেপেন। পাকা মাথা বুঝেছিস, মুখে কিছু বলছে না। সবার চোখে চোখ রেখে ওয়াচ করে যাচ্ছে।

অনিকেত?

এখুনি চলে আসবে।

বটা কোথায়?

ব্যাটা হঠাৎ কেমন যবুথবু হয়ে গেছে।

কেন!

তোর ব্যাপারগুলো সহ্য করতে পারছে না। মনে মনে গজরাচ্ছে।

হ্যাঁরে মিলি, বাচ্চাটা ঠিক আছে?

হ্যাঁ।

শালা একটু আস্তে ফোটা লাগছে।

মেয়ে তো শুধু আঙ্কেলকে খুঁজছে। হঠাৎ একদিন মাঝ রাতে উঠে বলে আঙ্কেলের কাছে যাব। তখন তুই একুশদিন পরে চোখ খুলেছিস। রাখতে পারি না। কোনও প্রকারে সকালে ম্যাডামের কাছে নিয়ে এলাম। তিনদিন থাকলো তারপর শান্তি। বাড়িতে ঢুকেই ওপর নীচ তোলপাড় করে তোকে খুঁজলো। এ বাড়ি ও বাড়ির মতো নয়। তারপর যাক এখন ঠাণ্ডা।

তোর হলো আমার প্রচণ্ড লাগছে।

আর একটু।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/F1COBHb
via BanglaChoti

Comments