কাজলদিঘী (১০৫ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১০৫ নং কিস্তি
—————————

তারপর মিত্রাকে প্রণাম করে সবাইকে প্রণাম করলো।

মল্লিকদা তখন একটা কাগজ নিয়ে ওল্টাতে শুরু করেছে।

কোন পাতায়রে? আমার দিকে তাকালো।

ন-নম্বর।

ঘরের মধ্যে তখন সুন্দর, অনিসা, অনন্য দাপিয়ে বেরাচ্ছে।

তুই আমাদের কাগজে দিলি না কেন? দাদা বললো।

তোমাকে তো লেখাটা দিয়েছিল। ট্রানস্লেট করাওনি কেনো।

ফ্লেভারটা নষ্ট হয়ে যেত।

আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে মৈনাককে একবার ফোনে ধরলাম।

কোথায় আছিস?

রেডি হচ্ছি, এবার বেরবো। ছেলের লেখা দেখেছিস?

দেখলাম।

কি কথা বলছিস আমাদের শোনা। মিত্রা চেঁচালো।

মিত্রা চেঁচাচ্ছে না?

হ্যাঁ। তোর কথা শুনতে চাইছে।

আমি ভয়েজ অন করলাম।

এক্সাপে ওর ছোট করে বায়োডাটা দিয়ে দিয়েছি। দেখেছিস—

আমি একবার ওপর ওপর চোখ বুলিয়েছি।

আমার এডিটর লেখাটা দেখে বলেই বসলো মৈনাক তুমি এতো ভালো ইংরাজি লেখো না।

হাসলাম।

হ্যাঁরে। তারপর পরিচয় দিলাম। নিজেই বায়োডাটাটা লিখে দিলো। বললো ওকে লিখতে বলো।

দুর ওখানে গেছিল দেখেশুনে একটা লিখে দিয়েছে।

না-রে ডেফৎ আছে। তনুকে ফোন করে বলে দিয়েছি কাগজ কিনে নিতে।

এটা কি হোল ইণ্ডিয়া সার্কুলেশনে বেরিয়েছে?

তাহলে কি ভেবেছিস?

সুন্দর আমার দিকে তাকিয়ে।

নে সুন্দরের সঙ্গে কথা বল।

ফোনটা সুন্দরের হাতে দিলাম।

ইয়েস আঙ্কেল।

সুন্দর শুরু করে দিল। ঘর ময় দৌড় দৌড়ি করে কথা বলছে।

জীবনের প্রথম এ্যাচিভমেন্ট বুঝলি অনি। আমারও ঠিক এরকম দশা হয়েছিল। দাদার সারাটা মুখমণ্ডলে পরিতৃপ্তির ঝলকানি।

কাগজ থেকে চোখটা তুললো।

তখন পার্টি করি আর ঘুরে বেড়াই। সবে মাত্র গ্র্যাজুয়েসন কমপ্লিট করে এমএতে ভর্তি হবার তোর জোড় চলছে। দিন রাত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি। কলকাতার ফুটপাথ বড়াবর আমাকে ভীষণ টানে। সেই যখন প্রথম কলকাতা এলাম তখন থেকে। ফুটপাথেরও যে একটা জীবন আছে সেই সময় পাগলের মতো ঘুরতে ঘুরতে তখন অনুভব করেছিলাম। বিশেষ করে যারা ফুটপাথে রাত্রি যাপন করে তাদের দেখে খুব খারাপ লাগতো। লিখে ফেললাম। আমাদের কাগজের এডিটর তখন মনীশবাবু। ভীষণ খিট খিটে মানুষ। ভয়ে কেউ তার কাছ ঘেঁষতো না।

লেখাটা লিখে একদিন ড্রপ বক্সে ফেলে দিয়ে এলাম। আর প্রতিদিন একবার করে ডেকার্স লেনে গিয়ে কাগজ উল্টে পাল্টে দেখি। লেখাটা বেরিয়েছে কিনা। প্রতিদিন কাগজটা দেখার পর মন খারাপ হয়ে যায়। লেখা বেরোয় নি। সেদিনটা মনে হয় রবিবার ছিল। হোস্টেলের ঘরে পরেপরে ঘুমচ্ছি। নিরঞ্জন ছুটতে ছুটতে এসে ঠেলে তুললো।

দাদা দেখো এই লেখাটা তোমার কিনা?

হুড়মুড় করে উঠে বসলাম। ঘুম চোখে ওর হাত থেকে কাগজটা নিলাম। লেখাটা দেখার পর সমস্ত শরীরের রক্তটা একবার বুকে এসে থমকে দাঁড়াল। সারা শরীরে সে কি কাঁপুনি। ছাপার অক্ষরে নিজের নামটা বার বার দেখি। তখন আমার অন্যান্য বন্ধুরা সব ঘরে ভিড় করেছে। এক নিঃশ্বাসে লেখাটা পড়ে ফেললাম। না একটুও এডিট করে নি। দু-টো ছবিও ছেপেছে।

নিরঞ্জনকে বললাম আর একটা কাগজ নিয়ে আয়।

ও বেরিয়ে গেল। আমি মুখ হাত ধুয়ে জামা কাপর পরলাম।

নিরঞ্জন কাগজ নিয়ে এলো।

নিশ্চই মিনুদির কাছে যাবে। দাঁড়াও জামা প্যান্টটা গলিয়ে নিই।

ও রেডি হয়ে এলো।

দু-জনে নিচে নেমে টেনিয়ার কাছে চা খেলাম। পায়ে পায়ে হেঁদোতে চলে এলাম। নিরঞ্জন গিয়ে তোর বড়োমাকে ধরে নিয়ে এলো। প্রায় এক ঘণ্টা পর।

সময় যেন কাটতেই চায় না। যেন এক বছর ধরে বসে আছি।

তোর বড়োমা অবশ্য আমার আগে নিরঞ্জনের মুখ থেকে সব শুনে নিয়েছিল।

বসে বসে তিনজনে মুড়ি-বাদাম খেলাম।

নিরঞ্জন আবার তোর বড়োমাকে এগিয়ে দিয়ে এলো।

ঠিক দশদিনের মাথায় রাতে হোস্টেলে ফিরে একটা চিঠি পেলাম।

আমাদের অফিসে এসে একবার দেখা করুণ।

পরদিন গেলাম।

ঘরে ঢুকতেই আমাকে দেখে মণীশবাবু দরজার দিকে তাকায়।

অমিতাভবাবু কোথায়?

আমি স্যার।

ফাজলামো করছো। দিলো এক ধমক।

কি করা হয় শুনি।

স্যার এবার এমএতে এ্যাডমিসন নেব।

কিছুতেই বুড়োকে মানাতে পারি না আমি অমিতাভ চক্রবর্তী। শেষে একটা সাবজেক্ট দিয়ে বললো, এক ঘণ্টা সময় দিলাম, লিখে দেখাও।

যেন পরীক্ষা দিতে বসলাম।

লিখে দিলাম। বুড়ো বসে বসে পড়ে, আর চশমার ওপর দিয়ে একবার আমাকে দেখে।

তারপর বেল বাজিয়ে একজনকে ডাকলো। দুপ্লেট ঘুগনি আর পাঁউরুটি নিয়ে আয়। কড়া করে দু-কাপ চা।

আমার দিকে তাকিয়ে।

হ্যাঁ হে, র চা খাও তো?

চুপ করে রইলাম।

একটায় দুধ দিয়ে নিয়ে আসিস।

এবার আমার ইতিহাস জানতে বসলো। আমি থাকি কোথায়। আমার বাড়ি কোথায়। নাড়ি নক্ষত্র সব।

তারপর আবার বেল বাজালো।

তখন বেল বলতে পূজোর ঘণ্টা। ঢং ঢং করে বাজতো।

ঘরে হরির মতো একজন ঢুকলো।

এ্যাকাউন্টেট বাবুকে বল একশো টাকার একটা ভাউচার করে নিয়ে আসতে।

প্রথেমে বুঝিনি। তারপর আমাকে একশোটাকা হাতে ধরিয়ে যখন ভাউচারে সই করতে বললো, তখন আমার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। আমার লেখার পারিশ্রমিক। ওই টাকায় আমার চার মাসের হোস্টেল খরচ, এমএতে ভর্তি হওয়ার পয়সা সব হয়ে গেলো।

টাকা পেয়ে বড়োমাকে কোনও গিফ্ট দাও নি!

হ্যাঁরে তোর মতো। বড়োমা দাঁত চিবিয়ে কথাটা বলে আমার কানটা ধরলো।

সবাই এবার হেসে উঠলো।

আমি বড়োমাকে জড়িয়ে ধরেছি।

ডাক্তারদাদা, মল্লিকদারও এরকম এ্যাচিভমেন্ট আছে। একদিনে শুনলে সব বদহজম হয়ে যাবে, আর একদিন শুনবো।

দু-জনেই আমার কথা শুনে হাসছে।

বরুণদা?

দাঁড়াও আমার ঘোরটা এখনও কাটে নি।

মাথাটা একবার জোড়ে ঝাঁকিয়ে নাও ঠিক হয়ে যাবে।

জ্যেঠিমনি আমার কথা শুনে হাসছে।

ইসি, দু-বোনে মিলে একটু চা কর না।

দাঁড়া যাচ্ছি।

ছোটোমা উঠতে গেলো। আমি হাতটা চেপে ধরে বসিয়ে দিলাম।

বয়স হচ্ছে, এবার জায়গাগুলো হাত বদল করো। কতদিন আর আগলে রাখবে।

ছোটোমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বসে পরলো।

তারপর পিকুবাবু খুব গম্ভীর গম্ভীর মনে হচ্ছে। এ্যাড ডিপার্টমেন্টের কেউ কচি সাহেব বলে পাত্তা দিচ্ছে না। খুব সমস্যা।

বেচারা কাল সারারাত ঘুমতে পারে নি। ছোটোমা বললো।

জীবনে প্রথম, বুঝলে ছোটোমা, তাই একটু কষ্ট পেল, এবার থেকে দেখবে প্রুফ হয়ে যাবে। একটা ধাক্কা দরকার। একটা সময় দেখবে, প্রচুর টেনশন মাথায় নিয়ে ও বিন্দাস রাতে বিছানায় শুয়ে ভঁস ভঁস করে নাক ডেকে ঘুমবে।

তুই সব জেনেগেছিস?

আমি যে শিক্ষাটা তোমাদের সবার কাছ থেকে পেয়েছি, এমনকী উনামাস্টার, মনাকাকা, আরও যাঁরা গুরুজন আছেন, সেটা পরিশীলিত ভাবে এদের ওপর এ্যাপ্লাই করি। তাতেই এরা বেসামাল হয়ে টেনশনে রাত জাগে। আর আমার মতো জায়গায় পড়লে, এরা স্যারেণ্ডার করে চলে আসবে। হাত তুলে বলে বসবে, তোরা সব নিয়ে নে ভাই, আমি পিপু-ফিসু, জীবনটা কোনও প্রকারে ডাইনে বাঁয়ে করে চলে গেলেই হলো।

ছোটোমা আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে।

ছোটোমা, আমার শিক্ষা নেওয়ার একটা গল্পবলি। তাহলে হয়তো ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে।

আমি কিন্তু প্রথমেই বলে রাখি আমার ব্যাক্তিগত দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করছি। তোমাদের সঙ্গে নাও মিলতে পারে।

দেখ নটি বিনোদিনীকে আমরা এখনও মনে রেখেছি। কেনো? সে তো একটা গনিকার মেয়ে। কেউ বলে রক্ষিতা, কেউ বলে স্টার আবার কেউ কেউ বলে খুব বড়ো মাপের রঙ্গমঞ্চের অভিনেত্রী।

বিনোদিনীর জীবনে বহু পুরুষ এসেছে। এদের মধ্যে একমাত্র রাঙাবাবুর কাছে বিনদিনী শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পন করেছিল। তাও জীবনের একবারে অন্তিম পর্যায়ে। এর আগে অবশ্য বিনোদিনীর জীবনের প্রথম অবস্থায় রাঙাবাবু এসেছিলেন। কিন্তু বিনদিনী তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। যখন রাঙাবাবুকে গ্রহন করলেন সেই সময় একজন মানব মানবীর তেমন ভাবে পাওয়ার কিছু নেই।

গণিকার জীবনটাকে ধরে রেখেই বিনদিনী তার জীবনটা বেশ ভালোভাবেই কাটিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু গণিকা পল্লীতে যাওয়া আসা করা বাবু রসরাজ অমৃতলালের চোখে একদিন ধরা পরে গেলো বিনদিনী দাসী। জহুরীর চোখ, সোজা গণিকা পল্লী থেকে চলে এলো নাট্যকার গিরীশ ঘোষের পদতলে। শুরু হলো জীবনের ওঠা-পড়া চড়াই-উতরাই। নিমাই চরিত্রে অভিনয় করে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের চোখে পরে গেলেন।

নাট্য জগতে এসে জীবনে নতুন পুরুষের আগমন ঘটলো গুর্মুখ রায়।

অবাঙালী গুর্মুখ রায় বিনোদিনীকে বললো, দেখো বিনোদবিবি তোমাকে লিতে ভি হবে আউর দিতে ভি হবে। স্টার থিয়েটার বানানোর জন্য নিজের জীবনকে পর্যন্ত আত্ম বলিদান দিল বিনোদিনী দাসী।

বিনোদিনী যদি নাট্য জগতের স্বার্থে গুর্মুখ রায়ের কাছে ধরা না দিত, তাহলে আজ আমরা হয়তো হাতিবাগানের মোরে স্টার থিয়েটারকে পেতাম না।

যার শরীরে প্রতিটা কনিকা দিয়ে গড়ে উঠেছিল এই স্টার থিয়েটার তাকে একদিন অপমানিত হয়ে মাথা নীচু করে চলে যেতে হয় স্টার থিয়েটারের রঙ্গালয় থেকে।

সে অনেক ইতিহাস।

কিন্তু অভিনয় করতে এসে বিনদিনীকে দুটো মানুষ চিনেছিলেন। প্রথম জন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, আর দ্বিতীয় জন রাঙাবাবু।

তোমাদের এর আগেও হয়তো কথা প্রসঙ্গে বহুবার বলেছি।

রামকৃষ্ণের শেষ শয্যায় তার কাছে সবার প্রবেশ নিষেধ। সাহেব সুবো ছাড়া কেউ তাঁর ধারে কাছে যেতে পারে না।

দু-একদিন খালি হাতে ফিরে যাবর পর একদিন বিনোদিনী সাহেবের পোষাক পরে তার কাছে গেছিলেন। কেউ তাকে আটকায় নি। কেউ তাকে চিনতে পারে নি। কিন্তু ঠাকুর তাকে দেখেই ঠিক চিনতে পেরেছিলেন।

এই তো আমার নিতাই এসেছে।

বিনোদিনী ঠাকুরের কথা শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন।

কাঁদতে কাঁদতেই বিনোদিনী বলেছিলেন, ঠাকুর সারাজীবন তুমি মায়ের নাম করলে, তোমার গলায় এই মারণ রোগ কেন?

ঠাকুর উত্তর দিয়েছিলেন, এ-ও তো মায়ের দান। থাক ও কথা, তুই কল্পতরু উৎসবে এসেছিলি? কতোলোক এসেছিলো—

বিনোদিনী কাঁদতে কাঁদতে বললেন।

যার কাছে না চাইতেই সব পাওয়া যায়, তার কাছে চাইতে যাব কেন।

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, এই তো তোর চৈতন্য হয়েছে। গায়ে যখন হলুদ মেখেছিস, আর তোকে কুমীরে ধরবে না।

বিনোদিনী বাড়ি ফিরে এলেন, দেখলেন গেটের মুখে রাঙাবাবু দাঁড়িয়ে। বিষ্ময়ে বিহ্বল বিনোদিনী।

একী রাঙাবাবু তুমি!

আমি কল্পতরু উৎসবে ঠাকুরের কাছে তোমাকে চেয়েছি, ঠাকুর তোমাকে আমায় দিয়েছে।

চুপ করলাম।

আমার প্রশ্নটা এইখানেই ছোটোমা।

আচ্ছা কল্পতরু উৎসবে ঠাকুরের কাছে রাঙাবাবুর কি আর কিছু চাওয়ার ছিল না?

একজন গণিকার মেয়েকে চাইতে হবে? কেন?

সারাঘর নিস্তব্ধ।

কারুর মুখে কোনও কথা নেই। সবাই আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

নিজেই নিস্তব্ধতা ভাঙলাম।

বুঝলে পিকুবাবু, তোমাকে ভাবতে হবে তুমি বিনোদিনী দাসী, শুধু তুমি নয় সবাইকে। তোমার জীবনে গুর্মুখ রায়ও আসবে, আবার রাঙাবাবুও আসবে, একজন অমৃত আর একজন গড়ল। কিছু পেতে গেলে তোমাকে প্রথমে দিতেই হবে।

পিকু দৌড়ে এসে আমার কোলে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।

সবাই কেমন যেন একটু অস্বস্তিতে পরে গেল। বিহ্বল পরিবেশ। আমি ভাবলেশ হীন।

কেঁদে লাভ নেই পিকু, এতটা ইমোসান হলে রুঢ় বাস্তবের সঙ্গে লড়াই করা তোমার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে। কাজের ক্ষেত্রে ইমোসানটাকে বাড়ির আলমাড়ির লকারে তালা বন্ধ করে রেখে যাবে। বুদ্ধিকে আরও শানিত করবে। দেখবে জিতবে।

জ্যেঠিমনি, বড়োমার মুখের দিকে তাকালাম। অসীম প্রশান্তির ছায়ায় চোখ মুখ উজ্জ্বল।

ডাক্তারদা আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে।

একটা পোড়া পোড়া গন্ধ নাকে এলো।

ছোটোমা একটা পোড়া পোড়া গন্ধ ছাড়ছে না।

দিলো সব শেষ করে।

ছোটোমা উঠে দাঁড়াবার আগেই। মিত্রা, ইসি রান্নাঘরের দিকে দৌড় দিল।

কি হলো বলোতো! বড়োমার দিকে তাকালাম।

নেপলা, সাগির রান্নাঘরের কাছ থেকে জোড়ে হাসতে হাসতে এদিকে এলো।

তোমার গল্প শেষ, দুধও শেষ।

কেন!

দুধ নেই শুধু বাটি বসে আছে গ্যাসে।

জ্যেঠিমনি, বড়োমা হাসছে।

মিত্রা রান্নাঘর থেকেই তারস্বরে চেঁচালো, ওকে এই সময় কে গল্প বলতে বলেছিল, চা-টা খেয়ে শুরু করতে পারতো।

দেখলাম ছোটোমা হাসতে হাসতে ফ্রিজ থেকে দুধের প্যাকেট বার করে নিয়ে গেল।

পিকু তখনও আমার পাঞ্জাবীতে চোখ মুছছে।

দরজার সামনে মিলিরা এসে দাঁড়াল।

অনিসা ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো।

তোমরা আর দশমিনিট আগে আসতে পারলে না।

কেন!

বাবা কি সুন্দর গল্প বললো।

আর গল্প, নিজের গল্পই সামলাতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছি।

পিকু ওখানে ও রকম ভাবে বসে আছে কেন বড়োমা। টিনা বললো।

একটু স্নেহের বকা-ঝকা হলো।

শুরু হয়েগেছে! মিলি বললো।

বড়োমা হাসছে।

পিকু উঠে বড়োমার ঘরে চলে গেল।

আমার মেয়েটাকে নিয়ে এলে ভালো হতো বুঝলে বড়োমা। মিলি বললো।

কেন?

এবার জ্যেঠিমনি আর না হেসে থাকতে পারলো না।

ওকে শিখণ্ডি দাঁড় করিয়ে দিতাম।

কিরে চা হলো—আমি চেঁচালাম।

অর্ক, এগুলো নিয়ে কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকবো—সায়ন্তন চেঁচালো।

কেন হেঁটে রান্নাঘরে রেখে আসতে পারছো না। কোমরে বাত হয়েছে। অর্ক খিঁচিয়ে উঠলো।

সায়ন্তন রান্নাঘরের দিকে গেল।

দাদা, মল্লিকদার দিকে তাকালাম।

চলো কাজ গুলো সেরে ফেলি।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। ঘরের বাইরে এলাম।

সিঙ্গারা আনার প্ল্যানটা কার রে অর্ক। ইসি রান্নাঘরের বাইরে এসে বললো।

সন্দীপদা। বললো, তুইতো ওপাশ দিয়ে আসছিস। একবার চিত্তরঞ্জনে ঢুঁ মার।

কথাটা বলেই অর্ক আমার পেছন পেছন বেরিয়ে এলো।

অর্ক।

বলো।

সুমন্ত গেলো কোথায়?

আসছে।

আমার মাল পত্র।

সব আছে ঘরের দরজাটা আগে খোলো।

সবাই এলো।

আমি খাটে ওরা সোফায় বসলো।

আগে আমার মালগুলো বুঝিয়ে দে।

অর্ক ব্যাগ থেকে একবাক্স সিডি বার করলো।

সব ওপরে নাম লেখা আছে। দেখলেই বুঝতে পারবে কোনটা কার।

কপি।

আমার কাছে আছে। আর কারুর কাছে নেই।

এগুলো সায়ন্তন তোলে নি?

পাগল হয়েছো। ওরা কেউ দেখেই নি। তবে সবাই জানে মাল আমার কাছে ইনট্যাক্ট আছে।

দ্বীপায়ণ হাসছে।

অরিত্র।

অরিত্র ব্যাগ থেকে ফাইল বার করলো। আমার হাতে দিল।

তোরা এগুলো কোথা থেকে জোগাড় করলি! সন্দীপ বললো।

তোমার জেনে লাভ। ব্যাপারটা আমাদের সঙ্গে অনিদার। এর মধ্যে মাথা গলাচ্ছ কেন।

দাদা, মল্লিকদা ঘরে ঢুকলো। পেছন পেছন মেয়ে একটা প্লেট ভর্তি করে সিঙ্গারা নিয়ে এলো।

এটা খাও, দিদাই বললো চা পাঠাচ্ছে।

প্লেটটা সেন্টার টেবিলে রেখে চলে গেল।

দাদা মল্লিকদা আমার পাশেই খাটে বসলো।

সুমন্ত, সুকান্ত গেটের কাছে এসে দাঁড়াল। আমি উঠে গেলাম।

সুকান্ত তোমাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে।

নিশ্চই দাদা।

তুমি ও ঘরে গিয়ে একটু বসো। আমি এদের সঙ্গে কথা বলে নিই।

আচ্ছা।

আমি নিজে গিয়ে সুকান্তকে ইসলামভাইয়ের সঙ্গে বসিয়ে দিয়ে ফিরে এলাম।

প্রথমেই ওদের কাছ থেকে অফিসের বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলাম। প্রত্যেকেই এক এক করে নিজের মতো করে বললো। আমি মন দিয়ে সব শুনলাম। এরই মধ্যে ইসি এসে চা দিয়ে গেল। চা খাওয়া হলো। আমি শুরু করলাম।

সন্দীপ।

বল।

দাদা, মল্লিকদাকে আমি রিলিফ দিতে চাই।

তার মানে!

দাদা, মল্লিকদা সপ্তাহে পাঁচদিন অফিসে যাবে। বিকেল পাঁচটা থেকে ন-টা। শনিবার, রবিবার সপরিবারে সকলকে আমি কলকাতার বাইরে পাঠাব। কোনও কোনও সপ্তাহে দাদা মল্লিকদা নাও যেতে পারে।

চলবে কি করে?

দাঁড়াও না। কি বলে আগে শোনো না। প্রথম থেকেই নাচানাচি শুরু করেছে। অর্ক খিঁচড়ে উঠলো।

দাদা, মল্লিকদা অফিসে না গেলে নিউজরুম সামলায় কে?

আমি। সন্দীপ বললো।

চিফ ডেস্ক।

অর্ক, অরিত্র দুজনে ভাগাভাগি করে সামলায়। যেদিন অর্ক ডেস্ক দেখে সেদিন অরিত্র রিপোর্টিং দেখে আবার যেদিন অরিত্র ডেস্ক দেখে সেদিন অর্ক রিপোর্টিং সামলায়।

তোরা দু-জন কটা পকেট তৈরি করেছিস? অর্ক, অরিত্রর দিকে তাকালাম।

কিছু তৈরি করেছি।

মল্লিকদা পরীক্ষা নিয়েছে।

জিজ্ঞাসা করো। এখন তুমি যদি বলো তোমার মতো খুঁজতে হবে, সে কি হবে। তবে এদের মধ্যে একজন খুব ডেয়ার ডেভিল। কাছাকাছি তোমার মতো।

সুমন্তকে কি দায়িত্ব দিয়েছিস? সন্দীপের দিকে তাকালাম।

ফিচারের পাতা, সানডের পাতা। ওখান থেকে সুমন্তকে নারাস না। বিপদে পড়ে যাব।

আবার কাঁদুনি গায়। অরিত্র চেঁচালো।

এতদিনের সেটআপ ভাঙলে কাল ঘাম ছুটে যাবে।

তোর সব প্রশ্নের উত্তর অফিসে গিয়ে দেব।

সুমন্ত ফিক করে হেসে উঠলো।

হাসিস না কালকে থেকে যে টেনশনটা খাচ্ছিলাম সেটাই হচ্ছে।

দাদার জায়গা তুই সামলাবি। মল্লিকদার জায়গা অরিত্র সামলাবে সঙ্গে নিউজরুম। অর্ক টোটাল বাইরেটা দেখবে। সুমন্ত যে জায়গায় আছে সেই জায়গায় থাকবে। সুমন্তকে এক্সট্রা একটা দিয়িত্ব দেবো।

সুমন্তর দিকে তাকালাম। পারবি?

কেন পারবো না। বলো।

তুই অর্কদা আর অরিত্রদাকে ম্যান পাওয়ার সাপ্লাই করে ফিডব্যাক দিবি। তুই ফিচার দেখিস তার মানে তোর হাতে ভালো ছেলেপুলে আসে।

ঠিক।

ওখান থেকে সাপ্লাই লাইন তৈরি কর। মাঝে মাঝে টেম্পোরারি নিউজ তৈরি করতে পাঠিয়ে দে। পারলে ডেস্কেও বসিয়ে দে। তোকে সবাই চিনবে, অর্কদা, অরিত্রদাকে কেউ চিনবে না। ওরা ইনভিসিবিল পার্সেন।

বুঝে গেছি। অরিত্র বলে উঠলো।

হ্যাঁরে অর্ক তোদের বউদুটো কাজ করে না।

যাঃ তুমি এভাবে বোলো না।

বল না। ওদের কি দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিস।

সন্দীপদা ডেস্কে দিয়ে রেখেছে। মাঝে মাঝে বাইরে যায়।

ওদের কাজে লাগা।

সন্দীপের দিকে তাকালাম।

সন্দীপ।

বল।

দাদা, মল্লিকদা অফিসে ঢুকলে দুজনকে ফিডব্যাক দেওয়ার দায়িত্ব তোর। দাদা, মল্লিকদার দায়িত্ব হলো, প্রথমে দ্বীপায়ণের সঙ্গে বসবে তারপর কি নিউজ যাবে কি যাবে না তা দেখে দেওয়া। বলতে পারিস কাগজের প্রথম পাঠক। দুজনে দুটো এডিটোরিয়াল লিখবে।

তুই তো একেবারে গলা পর্যন্ত চালিয়ে দিলি।

দু-জনকে এতদিন রিলিফ দিয়েছিস? কোনও দিন কোনও কাজ নিজের ঘারে নিয়েছিস। দাদাকে না দেখিয়ে কোনও কাজ নিজে একা একা ছেড়েছিস। কেন? কতো বছর হলো।

এই তুই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে শুরু করলি।

মাথায় রাখবি এবার থেকে কমবেশি রেগুলার আমি অফিসে যাব। তারপর গলা পর্যন্ত কিভাবে চালাতে হয় সেটা দেখবি। সব খবর আমার কাছে আছে।

আমাকে বলবি না। অর্ক, অরিত্র জানে।

কেন অর্ক, অরিত্রকে বলবো, আমার ঘরের বিড়াল কেন পরের ঘরে খেতে যাবে। আমার ঘরে খাবার নেই।

এই তো অনিদা ঠিক জায়গায় ধরে ফেলেছে। দাও সন্দীপদাকে।

সন্দীপ গম্ভীর হয়ে গেল।

গম্ভীর হয়ে লাভ নেই। পই পই করে বলেছি, বলে কিনা ছাড়তো, ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হবে না। অরিত্র চেঁচালো।

ও ওই কেশটা। ধ্যুস ওরকম কতো আছে, তুই কটা চাস বল না। সন্দীপ বললো।

ওইটা না, একটু ভেবে দেখো। অর্ক বললো।

কোনটা বলবি তো!

তুমি আমাদের অনেক আগে থেকে দাদার সঙ্গে রয়েছো। শুনেছি অফিসে দাদার একমাত্র বন্ধু তুমিই ছিলে। তাহলে দাদা হ করলে হাওড়া বোঝ না?

সত্যি বলছি অর্ক ওকে এখনও সেইভাবে বুঝে উঠতে পারিনি। তোদের কতো গল্প বলেছি ওর সম্বন্ধে বল। একটা সময় তো ভয়ে মরতাম।

ঠিক আছে অফিসে চলো বুঝিয়ে দেবো।

দ্বীপায়ণ, আমাদের আর্ট ডিপার্টমেন্টের কিছু সমস্যা রয়েছে।

আছে।

সরাসরি স্বীকার করে নিলে। সুমন্ত বললো।

কি করবো বল, ডাটা নিয়ে বসেছে। ফাঁকি দিলে ফাঁকে পরে যাব।

তোমার ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা, ঘরের কাজের থেকে বাইরের কাজে মন বেশি। কেন আমাদের হাউস কি কম মাইনে দেয়?

সত্যি কথা বলতে কি অনিদা, আর্ট ডিরেক্টর রিটায়ার করার পর অলিখিত ভাবে আমি চালাচ্ছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে সমস্যা হচ্ছে না তা নয়। তবে যতটা আমার সাধ্যে কুলয় চেষ্টা করি। তবে সবাই না, সে কথা আমি বলতে পারি।

তোমার ডিপার্টমেন্টের স্টাফ কজন।

এখন চোদ্দজন।

তোমাকে নিয়ে?

না।

তার মানে পনেরো জন।

হ্যাঁ।

তোমার শরীর খারাপ হলে কে সামলায়।

দু-জনকে তৈরি করেছি। তারা সামলে দেয়।

সবাইকে আজ থাকতে বলবে। আমি ছ’টা থেকে সাতটা বসবো। আর যারা থাকবে না। তাদের কাল থেকে ছুটি দিয়ে দেবে। হাতের কাজগুলো তার আগে একটু সেরে নেবে।

দ্বীপায়ণ হাসছে।

হাসছো কেনো।

ভাবছি ঠিক তুমি ওই টাইমটা বাছলে কেন?

ভাবো উত্তর পেয়ে যাবে।

দ্বীপায়ণদা, অনিদা একবারে গোড়ায় কোপটা মেরেছে না। অরিত্র বললো।

হ্যাঁ।

সায়ন্তন।

বলো।

তুই তো চিফ ফটোগ্রাফার।

না। আমি শুধু মাত্র ফটোগ্রাফার।

সবাই হেসে উঠলো।

বুঝলি অনি ও আর রিক্স নিল না। মল্লিকদা বললো।

শুনবে কীর্তি।

বল শুনি। এতক্ষণ তো সব শুনছি আর ভাবছি। এই যা মন্দের ভালো। দাদা বললো।

ওর টিমের ছেলেরা প্রেস ক্লাবে আড্ডামারে। আর এর ওর কাছ থেকে ছবি নিয়ে মেকআপ দেয়।

এ অপমান আমি কিছুতেই সইব না। তুমি বলতে পারো সব এ্যাসাইনমেন্ট করতে পারি না। কিন্তু ছবি দিতে হবে, আমাদের ফটো গ্রাফারদের মধ্যে এরকম একটা অলিখিত চুক্তি আছে। আমরা দেওয়া-নেওয়া করি।

তা বলে নেগেটিভ উল্টে প্রিন্ট করে এনে দিবি!

হতেই পারে না।

অর্ক ও ঘর থেকে টাইমস অফ ইণ্ডিয়া, আর আমাদের কাগজটা নিয়ে আয়।

অর্ক দৌড় লাগালো।

আজকের কাগজে! মল্লিকদা বললো।

দেখো না মজাটা তাহলে বুঝবে। ভাগ্যিস কাগজটা কিনেছিলাম।

গেটের মুখে দেখলাম মিলি, টিনা এসে দাঁড়াল।

আমরা এগোচ্ছি।

খেয়েছো?

পেট ভরে খাই নি। যদি বমি করাও।

মিলিদি, সায়ন্তন কেশ খেয়েছে। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে অর্ক বললো। মিলি, টিনা অর্কর পেছন পেছন ভেতরে এলো।

কাগজ দুটো খুলে ছবি দেখিয়ে দিলাম।

আজই ওর চাকরি খাব দাঁড়াও। আমাকে এসে বললো অতি কষ্টে একটা ছবি পেয়েছি সায়ন্তনদা, কাউকে দিই নি, বলতে পার এক্সক্লুসিভ।

মিলি, টিনা হাসছে।

কে রে সায়ন্তন—অরিত্র বললো।

বিঁচকে টা—আবার কে—

সুগতো।

হ্যাঁ।

তোর চেলা! আমি বললাম।

সায়ন্তন মাথা নীচু করে হাসছে।

তোকে কেশ খাইয়ে দিল?

কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না।

এতদিনে তুই সার কথাটা বুঝলি। এই রকম ঘটনা আগেও বহুবার ঘটেছে।

চোখে পরে নি। পরলে নিশ্চই ধরতাম। এবার থেকে শির হয়ে যেতে হবে।

তাহলে তুই চিফ ফটোগ্রাফার মানছিস।

সায়ন্তন হেসে ফেললো। সঙ্গে অর্ক, অরিত্র হেসে গড়াগড়ি খায়।

মিলিরা হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল।

আমি দাদার দিকে তাকালাম।

আমি কি চাই সব বললাম। এবার তুমি তমার ঘুঁটি কিভাবে সাজাবে সাজিয়ে নাও।

তুই তো সব সাজিয়ে দিলি। কিরে মল্লিক তোর কোনও অসুবিধে আছে।

একবারে না। সত্যি বলতে কি জানিষ অনি, মাঝে মাঝে শরীর আর টানতে চায় না। এটা বরং বেশ ভালো। ঘণ্টা তিনেকর জন্য। তাতে কিছু নতুন লেখাও লিখতে পারবো।

আমি উঠে দাঁড়ালাম।

তোমরা কথা বলো, আমি একটু আসছি।

ঘরের বাইরে আসতেই দেখলাম রতনরা বাগানে দাঁড়িয়ে আছে। আমায় ঘর থেকে বেরতে দেখে রতন এগিয়ে এলো।

কোথায় যাচ্ছ?

ও ঘরে।

আগে আমার কথা শুনে যাও। পেট ফুলে যাচ্ছে।

তোর আবার কি হলো।

ওদিকে চলো।

একটু চা খাই।

নেপলা আনছে। তুমি এসো।

আমি বাগানে নেমে এলাম।

রতন হাত ধরে হিড় হিড় করে টেনে বাগানের পেছনে নিয়ে এলো।

কি হয়েছে বলবি তো!

আবিদ তোমায় কিছু বলেছে।

বললো তুই কি সেটেল করতে গেছিস।

হ্যাঁ।

করেছিস?

তোমার পার্মিশন ছাড়া কথা দিই কি করে।

কি হয়েছে বল?

আনোয়ার আর সাকিলের পরিবার ওর সব প্রজেক্ট বেচে দিতে চাইছে। ওদের লোকজন আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চাইছে।

দেখ আমি শুনেছি আনোয়ার যে সব প্রজেক্ট করেছে তা কেউ কিনতে চাইছে না। সব গণ্ডগোল আছে। তুই আগে অরিজিন্যাল জমির মালিককে খুঁজে বার কর। যাদের কাছ থেকে আনোয়ার নিয়েছে। তারপর কাগজপত্র দেখ। যদি ঠিক আছে দেখিস তাহলে হাত দিবি। না হলে ওর সম্পত্তি ওর থাকুক।

আমি কিছু কাগজপত্র দেখেছি।

কি বুঝলি?

কম পয়সায় নিয়েছে। যা হয় আর কি।

তাহলে তাদের প্রাপ্যটাকা তাদের দিতে হবে। তারপর আইনের ব্যাপারটা আগে হিমাংশুর সঙ্গে বসে ঠিক কর।

হিমাংশুদাকে কাল কয়েকটা ফাইল দিয়ে এসেছি।

সবচেয়ে ভালো হয় জয়েন্ট ভেঞ্চারে কাজ করে যা। তাতে রিক্স কম। মালিক সঙ্গে থাকলে ঝুট ঝামেলা খুব তাড়াতাড়ি সাল্টে নেওয়া যাবে।

নেপলা চা নিয়ে এলো। একটা সিগারেট আমার হাতে দিল।

অবতারের প্রজেক্টের ব্যাপারে চাঁদ কি বলছে।

ওটা নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। আরও অনেক কাজ আসছে। চাঁদ সব খেয়ে নেবে বলছে। সাগিরও লাফাচ্ছে।

আমি কি বললাম, হিমাংশু আর অনুপ যদি দেখে বলে হ্যাঁ এটা ঠিক ভাবে কনট্রোল করা যাবে তাহলে হাত দে। নচেৎ দিস না। সামনে অনেক বড়ো কাজ আসছে। তার জন্য রেডি হ। চাঁদকেও বোঝা।

চাঁদকে বলেছি।

তাহলে এতো ছটফট করছে কেন।

এতোগুলো ছেলেকে চালাতে হবে তো।

ঠিক আছে ফ্রেস যা বেরবে নিয়ে নে। ঝামেলা বেশি আছে সে জিনিসে হাত দিস না।

থার্টি পার্সেন মতো ফ্রেস আছে।

তাহলে আগে সেগুলো নিয়ে কাজ শুরু কর। বাকিটা হিমাংশুরা দেখুক তারপর এগোন যাবে।

অবতার যা বলেছিল তার জন্য তিনটে জায়গা দেখেছি। তার মধ্যে দুটো ফ্যাক্টরি আর একটা বাড়ি। ফ্যাক্টরি দুটো বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।

কতোবছর হলো।

বছর সাতেক হবে। আমি মালিককে বলে দিয়েছি, ও সব ব্যাপার আপনি সামলাবেন। আমরা ফ্রেস জমি চাই।

কি বলেছে?

কিছু কর্মচারীকে কাজে নিতে হবে।

কোনও লেখা লিখি থাকবে না। কমপেনসেশনের ব্যাপারটা মালিক দেখবে। আর কর্মচারী কাজ পাবে না। পাবে তার ছেলেমেয়েরা। তাও আমাদের চাহিদা অনুযায়ী যদি বায়োডাটা ঠিক থাকে।

এটা আমরা আলোচনার সময় উল্লেখ করতে পারি।

অবশ্যই পারিস। আলোচনার সময় ইসলামভাই আর ইকবালভাইকে সঙ্গে নিবি।

ঠিক আছে। আবিদ একটা নতুন ধান্দা করতে চাইছে।

কী।

একটা ট্যুরিজম কোম্পানি করতে চাইছে।

নিশ্চই নেপলা বুদ্ধিটা দিয়েছে।

আমি না বিশ্বাস করো। নেপলা হাসছে।

আমাকে একটু ভাবতে দে।

আর একটা কথা আছে।

তোদের কথা তো শেষই হচ্ছে না।

এটা শেষ।

কি বল।

আবিদের জন্য একটা মেয়ে দেখেছি।

আবিদের দিকে চোখ চলে গেলো। মাথা নীচু করে মিটি মিটি হাসছে।

তুমি দেখে ফাইন্যাল করলে তারপর দাদাভাই, ইকবালভাইকে নিয়ে যাব।

এবার সত্যি সত্যি আমি জোরে হেসে উঠলাম।

তোরটা।

আমি করবো না।

তুই করবি না। নেপলা করবি না। ব্যাপারটা কি? সাগির নয় একটা ঠিক করে রেখেছে। কিন্তু সে বলেছে সাগিরকে বিয়ে করবে না।

তোমায় পরে বলবো।

তাহলে কাল পরশুর মধ্যে একটা সময় কর। সন্ধ্যের দিকে।

ঠিক আছে।

আবিদ তোর লোকজন আফিসের গাড়ির ব্যাপারটা দেখে না।

হ্যাঁ। কেন?

একটা গাড়ির কথা বলতো আমি যাবো।

কোথায়!

অফিসেই যাব।

আমার গাড়িতো আছে!

থাক না। আমি যদি ওই গাড়িটা করে যাই অসুবিধে আছে। তুই আমার পেছন পেছন যাবি।

নেপলা স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে।

আমি চলে এলাম। ঘরে ঢুকতেই দেখলাম। সবাই টেবিলে খেতে বসে গেছে।

সুকান্ত কোথায়?

ওপরের ঘরে ইসলামভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছে। মিত্রা বললো।

আমি দাঁড়ালাম না। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে এলাম।

ছোটোমার ঘরে বসে কথা বলছে দুজনে। ঢুকলাম।

দেরি হয়ে গেল সুকান্ত।

ঠিক আছে দাদা। আমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। ইসলামভাইয়ের সঙ্গে বসে কথা বলছি।

তুমি কি সোজা বাড়ি থেকে, না সুমন্তর বাড়িতে ছিলে?

কাল রাতে সুমন্তদার বাড়িতে এসেছি।

তোমার পরিবারের খবর।

সব ভালো আছে দাদা।

তারপর ওদিকের খবর কি বলো।

সুকান্ত এ্যাটাচি খুলে একটা ফাইল বার করে দিল।

এর মধ্যে আপনি যা যা চেয়েছেন সব আছে। আপনি একবার দেখে নেবেন।

অনাদির খবর?

গতকাল সকালের দিকে একবার এসেছিলেন, বললেন মণ্ডলবাবুর জামাই আর সেক্রেটারীর কেশটা একটু হাল্কা করে দিতে। যাতে ওরা তাড়িতাড়ি জামিন পায়।

তুমি কি বললে?

এসপি যদি লিখিত অর্ডার দেয় করে দেব। আপনি একটু এসপি সাহেবকে বলে দিন।

ঠিক বলেছো, সব বল এখন এসপির কোর্টে ঠেলে দেবে। ট্রান্সফারের ব্যাপারে কি হলো।

কোনও সাড়াশব্দ নেই। কেমন থম থমে।

মাথায় রাখবে এই মুহূর্তে কোনও ভুল কাজ করবে না।

সুকান্ত মাথা দোলাল।

আর একটা ব্যাপারে লক্ষ্য রাখবে। পার্টি গতো মিটিং মিছিল নিয়ে তোমার ওপর প্রেসার আসতে পারে। খুব ট্যাক্ট ফুললি ট্যাকেল করবে।

সে বলতে। আপনি যেদিন এলেন তার পরদিন স্কুল নিয়ে প্রচুর ঝামেলা হয়েছে। সারা গ্রাম স্কুলের সামনে। সবাই প্রধানশিক্ষাকার অপসারণ চান।

কেন!

আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন।

হাসলাম।

বিশেষ করে অভিভাবকরা। আমাকে গ্রামের মানুষ এই মারে সেই মারে। আমি অনাদিবাবুর দালাল। সব শুনে ওপরে রিপোর্ট করে দিলাম। এসপি সাহেব এসেছিলেন সব শুনলেন। তবে আপনি ফিরে আসতে মীরচাচা অক্সিজেন পেয়ে গেছে।

খুব ভালো লোক বুঝলে। একসময় ওই তল্লাটে একমাত্র মীরচাচার ধানভাঙার মেশিন ছিল। স্কুল লাইফে মাথায় ধানের বস্তা নিয়ে ধান ভাঙতে যেতাম।

তাই!

অনাদিও গেছে। এখন সব গল্প। মানুষ তার ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য কি না করে।

কই আপনার কোনও পরিবর্তন হয়নি। অনাদিবাবুর থেকে আপনার খুব একটা কম নেই। বরং কোনও কোনও ক্ষেত্রে অনেক বেশিই আছে।

হাতের পাঁচটা আঙুল সমান হয় না সুকান্ত।

সুকান্ত আমার সঙ্গে কথা বলছে ঠিক কিন্তু ভীষণ উসখুশ করছে। ইসলামভাই বুঝতে পেরেছে।

তোরা কথা বল, আমি স্নানটা সেরে নিই।

একটা সিগারেট দিয়ে যাও।

ইসলামভাই প্যাকেটটা বার করলো।

একটা।

রাখ না।

রাখার জায়গা নেই।

বাধ্য হয়ে একটা সিগারেট দিয়ে চলে গেল।

চলো বাইরের বারান্দায় দাঁড়াই। অসুবিধে আছে।

একেবারে না।

ছোটোমার ঘরের বারান্দার সামনে এসে দাঁড়ালাম।

বলো।

আমার কাছে একটা খবর এসেছে।

কি, বলো?

আপনার ফার্ম সিলিং বহির্ভূত জমি দখল করে রয়েছে। একচুয়েলি চব্বিশ একরের বেশি রাখা যায় না। আপনি সেখানে কাছা কাছি তিনশো একর জমি রেখেছেন। বিএলআরও এবং জেএলআরও কে দিয়ে প্রেসার করে কাগজ পত্র বার করার চেষ্টা চলছে।

কে করছে?

অমূল্যবাবু।

অনাদি করাচ্ছে?

হ্যাঁ। এটাকে একটা রাজনৈতিক ইস্যু করতে চাইছে। নিজের জমি ফিরে পেতে।

তোমাকে একটা টিপ দেবো। তুমি অমূল্যকে এ্যারেস্ট করতে পারবে।

আপনি বললে আমি কালই এ্যারেস্ট করতে পারি। ওর অনেক কেলোর কীর্তি আমি জানি।

সেগুলো আর একটু সঠিক ভাবে কালেকশন করো। আমি আগামী সপ্তাহে একটা আর্টিকেল ঝেড়ে দেব। তারপর ওখানে একটা ক্যাওস তৈরি হবে, তোমার এ্যারেস্ট করতে অসুবিধে হবে না।

আপনি কবে যাচ্ছেন?

শনিবার।

আমি রাতে দেখা করবো।

নার্সিংহোমগুলোর কি ব্যবস্থা করলে?

সব ওই ফাইলে আছে।

লক্ষ্য রাখছো?

রাখছি। তবে আমার থেকে আপনার টিম ভীষণ স্ট্রং।

কবে ফিরবে?

বিকেলে ফিরে যাব।

পরিবার?

এখন সুমন্তদার বাড়িতেই থাকবে। ওখানের ঝামেলাটা একটু মিটুক তারপর নিয়ে যাব। আমাকে এখন খুব দৌড়ো দৌড়ি করতে হচ্ছে।

কিরে একদিনে সব সারলে হবে, খেপে খেপে সারতে হবে।

দেখলাম সুমন্ত এগিয়ে আসছে।

তোরা রেডি?

হ্যাঁ। বেরিয়ে যাচ্ছি। তুমি কখন আসবে?

এই তো খেয়েদেয়ে বেরিয়ে যাব।

চলো, ম্যাডাম ডাকছে।

সুকান্তর দিকে তাকাল।

মা তোর জন্য বসে আছে। বেশি দেরি করিস না।

সবাই নিচে নেমে এলাম।

দেখলাম ছেলে, মেয়ে, সুন্দর কেউ নেই। মিত্রা, দাদা, মল্লিকদা গাড়ির সামনে, বেরচ্ছে। ওরা মনে হয় সব আগে আগে চলে গেছে।

আমি বারান্দা থেকেই চেঁচিয়ে বললাম তোরা যা আমি যাচ্ছি।

সুমন্তর দিকে তাকালাম।

ওদের কাউকে সুকান্তকে একটু ছেড়ে দিয়ে আসতে বল।

ওরা বাগানে নেমে গেল, আমি ঘরে এসে ঢুকলাম। দামিনীমাসি এসেছে।

আমাকে দেখে এগিয়ে এলো।

সকালে কতো ভালো ভালো কথা বলেছিস, দিদি বললো।

হাসলাম, কখন এলে।

তুই তখন ওই ঘরে দাদাদের সঙ্গে কথা বলছিলি।

আজকে তোমার কাপরটা কেমন কেমন যেন লাগছে।

তোকে আর দেখতে হবে না।

বড়োমা সবাই এক সঙ্গে বসবো। চেঁচালাম।

আমরা কোনওদিন এতো তাড়িতাড়ি খাই।

আজ না হয় খাবে।

বড়োমা কোনও উত্তরদিল না।

আমি একটু আসছি।

কোথায় যাচ্ছিস?

রেডি হয়ে আসছি।

এ ঘরে এলাম। দেখলাম আলমাড়ির হুকের হ্যাঙারে আমার প্যান্ট গেঞ্জি টাঙানো। বাথরুমে ঢুকে হাতমুখ ধুয়ে চেঞ্জ করে নিলাম। ফুলহাথা গেঞ্জিটা অনেকটা সার্টের মতো। জিনসের প্যান্টের রংটাও জব্বর। স্টোন গ্রে। একবার আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালাম চেনাই যাচ্ছে না।

কাগজপত্র, মানিপার্টস পকেটে রেখে তনুকে একবার ফোনে ধরলাম।

যাক অনিবাবুর তাহলে সময় হয়েছে।

মেলা বোকো না। দু-জনে মিলে আমার প্যান্টের প্লাস্টিক ঢিলে করে দিচ্ছ।

তনু হাসছে।

ছেলের লেখা দেখলে?

আমাকে আগে বলো নি—

ভেবেছিলাম মৈনাক ব্যাটা ছাপবে না। তারপর কাল মাঝ রাতে ফোন করলো।

তুমি তখন জেগেছিলে!

কেন তোমার সখী সকাল থেকে কোনও রিপোর্ট করে নি?

তনু আবার হাসলো।

তোমাদের খুব মিশ করছি।

কেন?

সুন্দর বলছিলো, বাবা কি সুন্দর গল্প বলছে মা। আমি তো বাংলা ভালো বুঝি না। বোনের কাছ থেকে সব শুনলাম। অফিসে গিয়ে ল্যাপটপে লিখে ফেলবো।

চেষ্টা করলে, তোমার থেকে ভালো লিখবে।

কার সান্নিধ্যে বড়ো হয়ে উঠছে দেখতে হবে।

ওখানকার লাস্ট আপডেট বলো।

অনুপদা রেডি করছে।

টাকা পেলে কোথায়?

তোমায় বলবো কেন। তুমি অনুমতি দিয়েছো এটাই যথেষ্ট।

সত্যি বলো না।

মিত্রাদি চেক পাঠিয়ে দিয়েছে।

বাবাঃ। এতো।

হুঁ মশাই। দু-জনের নামে রেস্ট্রি করবো।

আমি বাদ!

তুমি কে হে মশাই।

বুঝেছি। সময় আসুক ভালো করে বোঝাব।

শোনো না।

বলো।

আমার কাজগুলো হবে না।

কেন?

এই সময় কেউ করতে চাইছে না।

তুমি অনুপকে বলো, সব একদিনে হয়ে যাবে। রেস্ট্রি করে এখানে আসবে। প্রয়োজন হলে আমি মিত্রাকে ওখানে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

মিত্রাদি আজ তোমার সঙ্গে কথা বলবে।

তুমি এখন কোথায়?

বহুদিন পর আমার এক বন্ধুর বাড়িতে এসেছি। এখান থেকে পাসপোর্টের অফিসে যাব।

কাজ সেরে নাও। আমাকে আবার এখুনি বেড়তে হবে। অফিসে মিটিং। নিজেই দেরি করে বেরচ্ছি।

সকাল থেকে মিটিং করেই চলেছো।

কি করবো। একটু গুছিয়ে দিই। চোখের সামনে দেখছি সব অগোছাল ভাবে পড়ে আছে।

খেয়েছো।

না বড়োমাকে বললাম খেতে বসবো। জামাকাপর ছাড়লাম।

কোনটা পরেছো, স্টোন গ্রে কালারের প্যান্ট আর ফুলহাতা গেঞ্জি?

ভালো ব্রিফিং। খুব মনে আছে দেখছি। একেবারে রং পর্যন্ত।

দু-জনের পছন্দের জিনিষ।

বুঝেছি। রাতে কি হলো জানাবে।

আচ্ছা।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/vCU94ut
via BanglaChoti

Comments