কাজলদিঘী (৯৮ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

৯৮ নং কিস্তি
—————————

বারান্দায় এসে বড়োমার পাশে বেঞ্চিতে বসলাম।

ছোটোমা হাসছে।

অনিমেষদা চেয়ারে বসে আছে, আর কাউকে দেখতে পেলাম না। অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। আমি হাসলাম।

কিছু উদ্ধার হলো?

সব নয়।

সুবীর দেখলাম মন দিয়ে বাক্স ঘাঁটতে বসে গেছে।

তাই!

হ্যাঁ। মনে হচ্ছে সারারাতের কাজ দিয়েছিস।

আর কে আছে?

তোর দুই সাগরেদ অনুপ আর হিমাংশু।

খেয়ে শুয়ে পড়তে পারতে।

তা পারতাম। ইচ্ছে করলো না।

বড়োমার গলা জড়িয়ে ধরলাম।

অনেক কিছু উদ্ধার হলো বুঝলে। আর একটা জিনিষ উপলব্ধি করতে পারলাম গ্রামের মানুষের কাছে ক্ষমতা এলে, এরা ধরাকে সরাজ্ঞান করে।

গ্রামের মানুষ শহরের মানুষ বলে নয়…।

আমি অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

ক্ষমতা এমনই একটা বস্তু প্রপার ইউটিলাইজেশন খুব কম হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মিস ইউজ হয়। অনিমেষদা বললো।

কই আমি কখনও করি নি।

নিজের সঙ্গে সবাইকে গুলিয়ে ফেলছিস কেন।

ইসলামভাই হাসছে। সামনের চেয়ারে বেশ গুছিয়ে বসেছে।

মিত্রা ভেতর থেকে বাইরে এলো। বড়োমার দিকে তাকাল।

ছেলে ছেলে করছিলে, ফিরেছে।

তুই আর খ্যাচ খ্যাচ করিস না বাপু।

এতক্ষণ তুমি কি করছিলে।

ঠিক আছে, আর জিজ্ঞাসা করবো না।

সুবীর দেখলাম ও বাড়ি থেকে হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে এসে আমাকে একটা পেন্নাম করে ফেললো।

কিরে সুবীর ঘটা করে পেন্নাম করলি। ছোটোমা বললো।

চাকরিতে ঢোকার পর যা চোখে দেখিনি, আজ তা প্রথম চোখে দেখলাম।

পেয়েছিস! ইসলামভাই বললো।

হ্যাঁ ভাইদা সব পেয়েছি। আমারটুকু আমি গুছিয়ে নিয়েছি, বাকিটা অনুপদা, হিমাংশুদা ঘাঁটছে।

আর কে আছে সুবীর? অনিমেষদা বললো।

দেবাদা আর নির্মাল্যদাকে কাজ লাগিয়েছে হিমাংশুদা।

বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকাল।

খামারে দুটো বাইক এসে থামলো। দেখলাম নেপলা, আবিদ, সাগির, বাসু নামল। অনাদি গেল কোথায়? সঞ্জুকেও দেখতে পেলাম না।

ওরা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। মিত্রা ওদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।

ম্যাডাম জল খাব, ভীষণ জল পিপাসা পেয়েছে। নেপলা বলতে বলতে বারান্দায় উঠলো।

দিচ্ছি, কি রাজ কার্য করে এলে শুনি।

নেপলা ফিক করে হেসে ফেললো, বিশ্বাস করুন একটু ঘুরতে গেছিলাম।

আবিদ, সাগির মুখ ঘুরিয়ে নিল।

আমি বাসুর দিকে তাকালাম।

ঠিক মতো কাজ সেরেছিস?

হ্যাঁ।

বাসু, সুবীরের দিকে তাকাল।

তুই একবার এদিকে আয়।

দুজনে আবার ও বাড়ির দিকে গেল।

মিত্রা, নেপলার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

সত্যি বলছি। অনিদার সঙ্গে ঘুরতে বেশ মজা লাগে।

আঠারো বছর ঘুরছো এখনও সখ মিটলো না?

দাদার সঙ্গে যতো ঘুরবো ততো নতুন নতুন জিনিস জানতে পারবো, শিখতে পারবো।

মিত্রা ভেতরে চলে গেল।

ইসলামভাই সগিরকে ইসারা করছে, সগির হাসছে।

ইসলাম এইভাবে জিজ্ঞাসা করলে ওরা কি তোমায় বলবে, নেপলাকে দেখলে না কি সুন্দর অবলীলায় বলে দিল, ঘুরত গেছিলাম, আর আমরা এখানে বসে যা খবর পেলাম সব মিথ্যে।

অনিমেষদা চিবিয়ে চিবিয়ে বললো।

আবিদ মুচকি মুচকি হাসছে।

মিত্রা ভেতর থেকে একটা কোল্ড ড্রিংকসের বড়ো বোতল এনে নেপলার হাতে দিল।

ঠিক করে খাও, না হলে বিষম লাগবে।

নেপলা হাতে নিয়ে ছিপিটা খুলে আমার দিকে তাকাল, একটু খাও।

তোরা খা।

নেপলা কিছুটা ঢক ঢক করে খেয়ে সাগিরের হাতে দিল। একটা ঢেকুর তুললো।

ম্যাডাম বহুত খিদে লেগেছে।

ওদিকে চলে যাও টেবিল পাতা রয়েছে। বসে যাবে।

বড়োমা, ম্যাডাম রাগ করে আছে।

রাগ করবে না, ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা বলছিস, কাকে মরে এলি।

বিশ্বাস করো, কাউকে মারি নি।

পাঁচু এসে যা বললো, সব মিথ্যে।

ও কাকে না কাকে দেখেছে, আমাদের নামে দোষ দিয়েছে।

মিত্রা, নেপলার দিকে হাসি হাসি চোখে তাকিয়ে।

অনি যা বলে তোরা তাই করিস, তাই না? বৌদি তাকাল নেপলার দিকে।

আজ পর্যন্ত অনিদাকে কোনওদিন অন্যায় কাজ করতে দেখি নি। তাই যা বলে অন্ধের মতো করি।

কি করে বুঝলি।

অনিদা অন দ্যা স্পট সব প্রমাণ করে দেয়, অনিদা মিথ্যে কোনও জোর জুলুম করে না। যে টুকু নিজের প্রাপ্য সেটুকু নিয়ে বাকিটা ফিরিয়ে দিয়েছে।

নেপলা চুপ করে থাকল।

সত্যি কথা বলতে কি বৌদি অনিদাকে আজও পর্যন্ত কোনওদিন কারুর চোখের জল ফেলতে দেখিনি। আজও সেই সত্যিটা আমরা সবাই চোখের সামনে দেখলাম। আমি এই গ্রামের কাউকে চিনি না, আপনি চিকনাদা, বাসুদা, সঞ্জুদাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। একফোঁটা মিথ্যে কথা বলছি কিনা। যে দোষ করেছে, অনিদা তাকে শাস্তি দিয়েছে, আর বাড়ি শুদ্ধ সবাইকে আশ্রয় দিয়েছে। আমরা যেমন আশ্রয় পেয়েছি। এমন কি ওই গ্রামের যে কটা মানুষ ওদের পাল্লায় পরে সব হারিয়ে বসেছিল, বলে এসেছে তাদেরটাও ফেরত দেবার ব্যবস্থা করবে। এবার বলুন অনিদার কথা শুনে খুব অন্যায় করেছি?

বৌদি বেঞ্চ থেকে উঠে গিয়ে নেপলার মাথার চুল গুলো ঘেঁটে দিল।

আমি কি তাই বলেছি—

না বৌদি, আমার জন্ম শিয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, ছোটোথেকে স্টেশনেই বড়ো হয়েছি, একসময় কুকুর-বেড়ালের মতো জীবন কাটিয়েছি। পেটের জ্বালায় কি না করিনি ওই ছোটো সময়ে। তারপর দাদাভাইয়ের কাছে আশ্রয় পেয়েছি, দাদাভাইয়ের কাছ থেকে অনিদার কাছে। বাবা-মাকে এখন ঠিক মনে পড়ে না। বাবা-মার মুখটাও ভুলে গেছি। দাদাভাইকে একভাবে দেখেছি, অনিদাকে আর একভাবে। দাদাভাই যা পারেনি, অনিদা তা করে দেখিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বড়ো কথা অনিদা আমার বাবা-মার শূন্য জায়গাটা পূরণ করে দিয়েছে।

এই আঠার বছরে অনেক ঘটনা ঘটেছে, আপনি সাগির, অবতারকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন, কিন্তু অনিদা তার আঁচ আমাদের শরীরে স্পর্শ হতে দেয় নি। বার বার বলেছে নিজেরা তৈরি হ, সামনে অনেক বড়ো জীবন পড়ে রয়েছে, এটার দরকার আছে, তবে এটাই সব নয়, মাথায় রাখবি। অনিদার প্রত্যেকটা কথা আমরা তিনজনে অন্ধের মতো অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। আজ ফল পাচ্ছি। হয়তো ভাইদাদার থেকেও আমাদের অনেক বেশি টাকা, সেটাও অনিদার জন্য। অনিদা নিজে হাতে সব গুছিয়ে দিয়েছে। কখনও এক পয়সা চায় নি। ফ্ল্যাটে এসে কখনও কখনও লুকিয়ে অনিদার পার্স খুলতাম, দেখতাম একটা পয়সা নেই, মুখ ফুটে কোনওদিন চাইত না। আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে পার্সে পয়সা রেখে দিতাম। জিজ্ঞাসা করলে বলতাম তুমি সব ভুলে যাও, আর শুধু শুধু আমাদের নামে দোষ দাও। পরে এই নিয়ে তিনজনে কতো হাসি হাসি করেছি।

যা পুরনো কাসুন্দি আর ঘাঁটতে হবে না। জামাকাপর ছেড়ে নে, খিদে লেগেছে। আমি বললাম।

নেপলা চুপচাপ মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। সবাই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে। ইকবালভাই, ইসলামভাই-এর চোখ দুটো কেমন ছল ছলে। মীরচাচা কেমন থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে।

তনুরা ভেতর থেকে বাইরে এসেছে, সবাই চুপ চাপ বসে আছে। কারুর মুখে কোনও কথা নেই। গম্ভীর পরিবেশ। ওরা সবার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে। ঠিক ঠাহর করতে পারছে না।

নেপলা মাথা তুললো। চোখ দুটো ছল ছলে।

আপনি আর কোনওদিন অনিদার সম্বন্ধে কিছু বলবেন না।

নেপলা আর দাঁড়াল না। হন হন করে হাঁটতে হাঁটতে নতুন বাড়ির দিকে চলে গেল।

আবিদরাও আর দাঁড়াল না। খামারের দিকে চলে গেল।

বৌদি কিছুক্ষণ ওর চলে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। তারপর আবার স্থবিরের মতো বেঞ্চিতে এসে বসলো। কপালে কিছুক্ষণ হাত বোলাল। সবাই নিস্তব্ধ।

ছোটোমা, বড়োমা, জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি, বৌদির দিকে তাকিয়ে আছে।

ইসলাম কিছু বুঝলে। অনিমেষদা নিস্তব্ধতা ভাঙলো।

হ্যাঁ দাদা ও যা বললো, সব সত্যি। আবতারের কাছ থেকে কিছু কিছু শুনেছি।

ইসলামভাইয়ের গলাটা কেমন ধরা ধরা।

সুতপা।

বৌদি তাকাল অনিমেষদার দিকে।

তুমি কি নেপলার কথায় কষ্ট পেলে?

একবারে না। আমি শুধু ওর ডেডিকেশনের কথা ভাবছি। অনির প্রতি ওর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা কতটা গভীর। অনিকে ওরা ভগবান বলে পূজো করে।

ঠিক বলেছেন বৌদি। ইসলামভাই বললো।

তার মানে তুমি বলো ইসলাম, আমি ছাড়া অন্য কেউ যদি এই কথা বলতো, তাহলে তাকে ও ছিঁড়ে খেয়ে ফেলতো। বৌদি বললো।

তুমি ঠিক বলেছো সুতপা। ও কিন্তু নিজে থেকে ভেবেচিন্তে কথাটা বলেনি। ওর ভেতর থেকে আপনা হতেই কথাটা বেরিয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে তোমারও এরকম হয়। অনিমেষদা বললো।

অনির ক্ষেত্রেই হয়েছে। প্রবীরকে আমি যা নয় তাই বলেছি।

একেবারে আমার মনের কথাটা বলে ফেলেছ। এটা একদিনে আসেনা সুতপা। বহু পরিশ্রম স্বার্থত্যাগের ফসল। আমি সারা জীবনে যা করতে পারলাম না। ও তা করে দেখিয়ে দিয়েছে।

তুমি শিবুর কথাটা একবার ভাবো। পাঁচু এসে কি বললো। বৌদি বললো।

তুমি আমার মুখের কথাটা একেবারে কেড়ে নিলে।

অনিমেষদার চোখমুখ চকচক করে উঠলো।

কোথায় ভালোপাহাড়ের একটা সাঁওতাল। নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এখানে অনি পা রাখার পর থেকে ওর প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে আশে পাশের কোন বন বাদারে লুকিয়ে রয়েছে। অনিদার যাতে কোনও অসুবিধে না হয়, তার জন্য নেপলাদের সঙ্গে ঘন ঘন যোগাযোগ রাখছে। বেরবার আগে নেপলাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেছে।

তুমি বলবে রাজনীতি? কিছু পাইয়ে দেওয়া? না, একেই বলে নিখাদ ভালোবাসা। ওরা গুরু প্রণাম দিতে এসেছে। তার মানে গুরু নিশ্চই ওদের জন্য স্বার্থত্যাগ করে।

তুমি কাঞ্চনিমাসি বলে ওই ভদ্রমহিলার কথাটা একবার ভাবো। এখানে এসে দুপুরে পেট পুরে খেয়ে গেছে। আমরা কেউ চিনতে পেরেছি? সুরোদি বললো ও দু-চারবার দেখেছে মনাদার কাছে আসতে। সে পর্যন্ত অনির সম্বন্ধে কি বলেছে।

আমার দিকে তাকিয়ে গালটা টিপে দিল।

সত্যি তোকে দেখে হিংসে হচ্ছে। বুঝতেই পারছি না তুই এতদিন ছিলি না।

বহুতখুন ধরে লেকচার শুনে যাচ্ছি। একটা কথাও বলিনি, এবার কিন্তু সত্যি খিদে পেয়েছে, পেটের নাড়িভুড়ি চচ্চড়ি হয়ে যাচ্ছে।

বৌদি আমার গলাটা জড়িয়ে ধরেছে।

তনু দেখো কিরকম আদর খাচ্ছে। তোমার আমার কপালে জুটবে? মিত্রা বললো।

বৌদি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বেঞ্চ থেকে উঠে গিয়ে মিত্রা, তনুকে জড়িয়ে ধরলো।

ওকে না পেলে তোদের পেতাম। রাগ করিস কেন। আগে ও তারপর তোরা।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। ইসির দিকে তকালাম।

তোদের খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে?

এই তো সবে উঠলাম।

এবার আমাদের দিয়ে দে। অনেক রাত হলো, দেরি করে আর লাভ নেই।

সবাই মিলে ভেতরে এলাম। ও বাড়ি থেকে হিমাংশু, অনুপরাও এলো। সবাই মিলে একসঙ্গে খেতে বসলাম।

সকাল বেলা বৌদির ডাকে ঘুম ভাঙলো। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলাম বৌদির সাজুগুজু হয়ে গেছে। একেবারে টিপটপ।

তোমরা বেরিয়ে পরেছো নাকি?

কটা বাজে খেয়াল আছে।

জানলা দিয়ে তকালাম। বেশ কড়া রোদ উঠেছে। উঠে বসলাম।

আমাকে আগে ডাকনি কেন?

শুনলাম কাল সারারাত লিখেছিস।

পাঞ্জাবীটা গায়ে চড়িয়ে বৌদির সঙ্গে বেরিয় এলাম।

নীচে এসে দেখলাম কম বেশি সকলেই রেডি।

কটা বাজে বলো।

দশটা।

করেছো কি, আমি এতক্ষণ পড়ে পড়ে ঘুমলাম। তোমরা কি সবাই চলে যাচ্ছ?

মোটা মুটি।

যাও আমি যাচ্ছি।

আমি পেছন পাশ দিয়ে পুকুরঘাটে এলাম। বাথরুম করে দাঁত মেজে বাইরের বারান্দায় এলাম। দাদারাও দেখলাম রেডি।

বেঞ্চিতে বসলাম। দেখলাম দাদা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।

বড়োমার দিকে তাকালাম, হাসছে কেন?

তোর লেখা পেয়ে গেছে তাই।

ও।

সেই জন্য আগে আগে যাচ্ছি, না হলে তোর বড়োমার সঙ্গে যেতাম।

নীপা চা নিয়ে এলো। দাদার দিকে তাকালাম, ইশারায় বললাম খাবে?

এই তো ভাত খেলাম।

এরই মধ্যে ভাত খাওয়া হয়ে গেছে!

দারুণ প্রিপারেশন বুঝলি অনি, সকাল বেলা পুকুরে মাছ ধরা হলো আমি, ডাক্তার….।

আর লেকচার দিতে হবে না। অনেক হয়েছে। বড়োমা গলা বার করলো।

দিলে তালটা কেটে, জীবনে কিছু শিখলে না।

কোনওদিন শেখাতে চেয়েছো, সারাটা জীবন আমার ঘারের ওপর দিয়ে চালিয়ে গেলে।

শুরু হয়ে গেল।

ডাক্তারদাদা, বিধানদা, অনিমেষদা মুখ ঘুরিয়ে হাসছে।

ভেতর থেকে মেয়ে এসে বড়োমার মুখ চেপে ধরলো। ধমকে উঠলো।

থামবে।

তোর দুদুনকে বলতে পারছিস না। বড়োমা চেঁচাল।

আরও কিছুক্ষণ হওয়ার পর আপনা থেকেই থেমে গেল।

তোরাও যাচ্ছিস নাকি?

কাল কলেজে একটা এক্সাম আছে।

মা?

মা, তনুমনি সবাই যাচ্ছে।

ও বাড়ি থেকে একে একে সবাই বেরিয়ে এলো।

নীপার মেয়েটা এসে বললো, তোমাকে মনিমা ডাকছে।

সেটা আবার কে রে!

ছোটোমা বললো, মিত্রাকে মনিমা বলে।

এ বাড়িতে এলাম।

টিনা, মিলি, সুরো, টিয়ারা, সব রেডি। একে একে সব বাক্স-পেঁটরা বার করছে।

তুই কখন ফিরছিস। কনিষ্ক বললো।

বিকেলের দিকে রওনা দেব।

কিছুক্ষণ কনিষ্কর মুখের দিকে তাকালাম।

তোরা যে চলে যাবি বলিস নি তো?

আমরা থাকবো এই কথাটাই বা কে বলেছিল?

তা ঠিক।

শিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম।

ওমনি তোর রাগ হয়ে গেল। কনিষ্ক পেছন থেকেই বললো।

ওপরে উঠে এলাম। দেখলাম দরজা ভেজান।

নক করলাম।

কে?

আমি।

দরজার শিকল খোলার আওয়াজ পেলাম।

ভেতরে আয়। মিত্রার গলা।

দরজা ঠেলে ভেতরে এলাম। আবার ভেজিয়ে দিলাম।

দেখলাম তনু, মিত্রা দুজনেই কাপর পড়ছে।

আমি সোফায় গিয়ে বসলাম। ওদের দিকে তাকিয়ে আছি।

দু-জনে বেশ মানিয়ে নিয়েছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে যেটা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দায়ক। আমার সামনেই ব্লাউজ পরা অবস্থায় শাড়ি পরছে। দুজনে দুজনকে সাহায্য করছে।

আমি সন্ধ্যের ফ্লাইটে দিল্লী যাব। তনু বললো।

ফোন করেছিলে?

হ্যাঁ।

বৌদি কি বললো?

গেলে সব কথা হবে।

একেবারে ঝামেলা করবে না। নিজের স্বত্ব ছেড়ে দিয়ে চলে আসবে। তোমার যা আছে তাতে সুন্দরের সারা জীবন চলে যাবে। তারপর আমি রইলাম।

কেন, সুন্দরকে আমি কিছু দিতে পারি না? মিত্রা বললো।

তোরা মা। তোরাই ওকে সব দিবি। আমার কি আছে, আমি শুধু ভবিষ্যতটা দিতে পারি।

মিত্রা হাসলো।

কবে ফিরবে? তনুর দিকে তাকালাম।

দিন সাতেক লাগবে। আরও কিছু কাজ আছে। একবার প্রেস ইনফর্মেসন ব্যুরতে যাব।

দিল্লীর মায়া একেবারে ত্যাগ করবে?

ধরে রেখেই বা লাভ কি?

অনুপ কাল যাবে।

অনুপদার সঙ্গে কথা হয়েছে।

সুন্দর যাবে নাকি?

বলেছিলাম। যেতে চাইছে না। দঙ্গলের মধ্যে আছে, থাক। তারপর এই ক দিনে কি একটা লেখা লিখেছে সেই নিয়ে মল্লিকদার সঙ্গে ফাটাফাটি করছে।

কেন?

লেখাটা ছাপতে হবে।

তুমি পড়েছো?

একটু একটু। দাদা, মল্লিকদা পড়েছে। বললো খুব ভালো লিখেছে।

কি লিখেছে?

দ্যা গড আই স হিম।

আরি বাবা মারাত্মক হেডিং।

তোমাকে নিয়ে। আসার পথে তোমাকে যেমনটি দেখেছে তাই বেশ গুছিয়ে লিখেছে।

অনিসা তাকে আবার এডিট করেছে। মিত্রা বললো।

তুই পড়েছিস।

একটু একটু। তোর ছোঁয়া লেগেছে।

ওর কথাটা একবার ভাব। ভাসিলা ভেড়িতে জন্ম। মানুষ হলো লণ্ডনে। আদব কায়দা সব বৃটিশদের মতো, লণ্ডনে ও গ্রাম দেখেছে। তবে এরকম নয়। এই গ্রাম ওর মনে একটা আলাদা রকমের ছাপ ফেলবেই। এটাই স্বভাবিক।

একা একা অনন্য আর শুভকে নিয়ে তোর স্কুল থেকে আরম্ভ করে তোর প্রিয় জায়গাগুলো সব দেখে এসেছে। গ্রামের লোকের সঙ্গে যেচে যেচে গল্প করেছে। ছবি তুলেছে। দো-ভাষী অনন্য আর শুভ। ও সবচেয়ে বেশি ইমপ্রেসড দীঘাআড়ি দেখে।

ও মল্লিকদার সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করেছে, বলেছে তোমরা কেউ না ছাপলে আমি লণ্ডন মিররে ছাপার ব্যবস্থা করবো। আর ব্লগে লিখবো। তনু বললো।

হাসলাম। তোমরা গেছিলে?

আজ সকালে আমি, তনু, দিদিভাই গেছিলাম। মিত্রা বললো।

যেখানে পটি করেছিলি সেই জায়গাটা দেখিয়েছিস?

দেখলি তনু।

তুমি ছাড়ো না ওর কথা।

সুন্দরকে যা বলে, শুনলে তোমার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবে।

তোর কি বয়স হবে না?

কে বললো হয়নি। হয়েছে বলে তুই ঠিক চিনতে পারছিস না, ছুঁতে লজ্জা করছে।

যাবো দেখবি।

তনু তবু একটু আধটু ছুঁতে দেয়।

খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি। তনু চেঁচিয়ে উঠলো।

দেবনা দুটোকে চটকে দেখতে পাবে।

মিত্রা আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে হাসলো।

তুই যাবি এটা আমাকে বলেছিস?

তুই কে, যে বলতে হবে।

তা ঠিক মাথায় রাখলাম।

মাথায় রাখ সময় মতো মাথাটা ভাঙবো। তুই কখন বেরবি।

তোদের সঙ্গে যেতে ইচ্ছে করছে।

অনুপ, হিমাংশু বললো যে তোর দরকার আছে এখানে। যাওয়া যাবে না। বিকেলে ওদের সঙ্গে যাবি। তাই বড়োমারা সব থেকে গেল।

জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি?

তোকে ছেড়ে যাবে ভেবেছিস। তার ওপর কালকে কি ঘটিয়ে এসেছিস।

তুই যেন ভাজামাছটা উল্টে খেতে জানিস না।

নিঃসন্দেহে তোর মতো পারি না।

মিত্রাদি ওর ব্যাগ। তনু বললো।

ও হ্যাঁ। তোর ব্যাগটা আলমাড়িতে আছে।

এক কাজ কর ওটা নিয়ে যা।

তনু ব্যাগটা বার করো।

আমার জামা কাপর?

যেটা কাল পরেছিলি ওটা নিয়ে যাচ্ছি। নীপাকে সব বুঝিয়ে বলে দিয়েছি। তারপর ছোটোমা আছে।

হ্যাঁরে, বুঁচকি তার বাপকে খুব গালাগাল দিচ্ছে তাই না।

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।

যাক এই যে তোর মনে পড়েছে, এইটাই যথেষ্ট। তারা এতদিন তাদের বাপের গল্প শুনেছে, এখন সব চাক্ষুষ দেখছে।

মিত্রাদি।

তনুর ডাকে মিত্রা তাকাল। ব্যাগটা দেখাল।

হ্যাঁ। তোমার ব্যাগে ঢুকিয়ে নাও।

তনু আমার এতোদিনের সাইড ব্যাগটা ওর বড়ো ব্যাগটায় ঢুকিয়ে নিল।

টাকা পয়সা সঙ্গে আছে না দেব।

তুই তো আঠারো বছর মাইনে দিস নি, কতোটাকা জমা আছে জানিস।

তনু চোখ পাকিয়ে ফিচলেমি করলো।

যে চাকরি করতো সে মরে গেছে, তোকে এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দিই তারপর।

আমি সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। মিত্রা, তনুর পেছনে লুকিয়েছে।

দুটোকে একসঙ্গে….।

প্লিজ আমাকে না মিত্রাদিকে। তনু হাসছে।

আমি মায়ের ফটোটার সামনে এসে দাঁড়ালাম।

জান তনু, এই ঘরটা আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। বলতে পারো মিত্রা আমাকে হাতে ধরে উত্তরণের শিঁড়িটা দেখিয়েছিল।

মায়ের ফটোটা থেকে ওদের দিকে ফিরে তাকালাম।

এই খাটটায় বসে মিত্রা প্রথম বিদ্রোহিনী হয়ে উঠেছে। আমার কথা মতো জীবনে প্রথম ড্রাস্টিক এ্যাকসান নিয়েছে।

এই খাটে শুয়েই আমাকে জড়িয়ে ধরে, আদর করে, মিত্রা প্রথম আমার কাছ থেকে আমার জীবনটা চেয়ে নিয়েছে।

এই আলমাড়ি থেকে মায়ের হারটা বার করে ওর গলায় প্রথম পরাতে চেয়েছি ও পরে নি। ওকে প্রথমে ভুল ভেবেছিলাম, তারপর সব জানার পর ওকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতে শিখেছি।

তারপর অবশ্য ঠিক সময়ে হারটা সঙ্গে করে মিত্রা নিয়ে গেছিল। কাকার মুখ থেকে শুনেছি, আমার বাবা-মা সখ করে তার ছেলে বৌ-এর জন্য এই ঘরটা বানিয়েছিল।

দূর, কপালে নেই কো ঘি ঠক ঠকালে পাবে কি।

আবার মায়ের ফটোটার দিকে তাকালাম।

জীবনটাকে একভাবে কাটাবো ভেবেছিলাম। এ জীবনে মনে হয় তা আর হবে না। তোমরা দুজনে আমার জীবনটাকে ভাগাভাগি করে নিলে। একজনকে শারীরিক ভাবে ছুঁতে পারি, আর একজনকে মানসিক ভাবে।

মিটসেফটায় ভর দিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়ালাম।

মিত্রা কাছে এসে আমার মুখটা তুলে ধরলো।

তুই এরকম করলে আমি তনু যাব না।

না-রে মিত্রা তোদের দুজনকে আমার অনেক কিছু বলার আছে। সময় পাচ্ছি না। এবার দেখবি ঠিক সময় করে নেব।

তুই মন খারাপ করবি না। তুই মন খারাপ করলে আমরা দুজনেই কষ্ট পাব।

না-রে, আমি মন খারাপ করছি না। মাঝে মাঝে ভাবি আমি একজন দাগী আসামী। আমি দুটো….।

মিত্রা আমার মুখটা চেপে ধরে বুকে মথা রাখলো। তনুও পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরলো।

কেন তুই মাঝে মাঝে এরকম হয়ে যাস বলতো?

জানিস মিত্রা যখনই আমি মানসিক ভাবে একা হয়ে যাই। তখনই তোরা দুজনে এসে আমাকে ঘিরে ধরিস। তোদের কতো প্রশ্ন। আমি পাগল হয়ে যাই। তোরা চলে যাস।

আমার ভেতর থেকে কে যেন রিনিঝিনি করে বলে ওঠে, অনি তুই তোর দায়িত্বটা ঠিক মতো পালন করলি না। সারাটা জীবন ফাঁকি মেরে গেলি। একসঙ্গে দুটো জীবন নষ্ট করার অধিকার তোর নেই।

মিত্রা আমার বুক থেকে মুখ তুললো।

তুই আমাদের সঙ্গে চল।

মিত্রাদি আমি টিকিট ক্যানসেল করে দিচ্ছি।

না তনু এরকম কোরো না। এই কাজটা তুমি অনেক দিন আগে থেকে ঠিক করে রেখেছ। সামান্য এইটুকুর জন্য….।

তাহলে তুমি এইরকম করছো কেন।

বলতে পারবো না। চলো ওরা তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

আমি দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এলাম।

তনু, মিত্রা দুজনেই বাবা-মার ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম করলো। আমি একটা ব্যাগ হাতে, আর একটা ব্যাগ কাঁধে নিলাম।

তোমাদের জিনিষপত্র কিছু ফেলে গেলে না।

ফেলে গেলে থাকবে।

মিত্রার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

শিঁড়ি দিয়ে তিনজনে নিচে এলাম। দেখলাম খামারে চার পাঁচটা ট্রলি দাঁড়িয়ে আছে।

আমি ভেতরে এসে নীপার কাছ থেকে একটা পাজামা, পাঞ্জাবী চেয়ে নিয়ে পরলাম।

কোথায় যাবে?

একটু বাজারে যাই, ওদের তুলে দিয়ে আসি।

শুধু চা খেলে কিছু খাবে না?

এখন থাক ফিরে এসে খাব।

মা রাগ করবে। কিছু অন্ততঃ মুখে দিয়ে যাও।

ঠিক আছে একটা মিষ্টি আর এক গ্লাস জল দাও।

নীপা মুখটা গম্ভীর করে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর প্লেটে করে মিষ্টি নিয়ে ফিরে এলো। আমি খেয়ে জল খেলাম।

কোথায় যাবে এখন?

ব্যাঙ্কে বসবো। কিছু কাজ আছে। বিকেলের দিকে ফিরে আসব। তারপর বেরবো।

বুঝেছি ফিরতে ফিরতে সেই চারটে।

না তার আগে ফিরবো। কলকাতায় যেতে হবে।

আজই ফিরবে?

হ্যাঁ। তুমি স্কুলে যাবে না?

আজ যাব না, ছুটি নিয়েছি। কাল থেকে যাব।

বেরিয়ে এলাম।

বড়োমারা সব খামারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মিত্রা, ইসি, তনু দাঁড়িয়ে আছে। একটাই ট্রলি বুঝলাম আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কাকীমা, সুরোমাসি রয়েছে।

কাছে যেতে বড়োমা বললো, কখন ফিরবি?

তোমরা সব রেডি হয়ে থাকবে। আমি এসেই দুটো খেয়ে বেরিয়ে পরবো।

তুই না এলে খাব না।

এই তো লেজুড় জুড়লে।

ইসি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

কেনো এরকম করিস—সুরোমাসি আমার গায়ে মাথায় হাত বুললো।

আমি ট্রলিতে উঠে বসলাম। ওরাও বসলো। বাঁধের ওপর দিয়ে ট্রলি চলেছে। নদীর জল কোথাও শুকনো কোথাও ছিটেফোঁটা রয়েছে। বাজারে এসে পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগলো। এই সময়েও বেশ ভিড় দেখলাম। যে যার গাড়িতে উঠে বসেছে। আমি সবার সঙ্গে দেখা করলাম।

মেয়ে গাড়ি থেকে নেমে এসে জড়িয়ে ধরে বললো, বাবা তুমি নাকি আমার ওপর রাগ করেছো।

কেনো!

আমি চলে যাচ্ছি বলে।

একটুও না।

অনন্য, শুভ, সুন্দর তিনজনেই নেমে এলো। প্রণাম করলো।

দাদুকে ফোন করেছো। শুভর দিকে তাকালাম।

হ্যাঁ। দাদুকে জানালাম আমরা রওনা হচ্ছি।

এবার আর অন্যদিকে মাথা ঘামাবে না। শুধু পড়াশুনো। মনে থাকবে।

শুভ মাথা নীচু করে নিল।

তনুর দিকে তাকালাম, তোমার সঙ্গে দেখা হবে না, ফোন করবে।

অনন্য।

বলো।

তুমি, সুন্দর দুজনে গিয়ে তনুকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেবে।

রতন এগিয়ে এলো।

তোমার সঙ্গে কাল রাতের পর কথাই বলা হলো না।

হাসলাম।

আবিদ কোথায়?

ব্যাঙ্কে।

যাবে না?

ও, নেপলা, সাগির রয়ে গেছে। তোমার সঙ্গে যাবে।

কেন!

তোমাকে একা ছেড়ে ওরা যাবে না।

ইসলামভাই?

দাদাভাই, ইকবালভাই দুজনেই রয়েছে।

ঠিক আছে যা। কাল সকালে আসিস।

অবতার হাসতে হাসতে সামনে এসে দাঁড়ালো।

লক্ষ্মী কই?

গাড়িতে।

মাল পোর্টে পৌঁছে গেছে?

জাহাজে উঠে গেলো। এই তো কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিল।

আমাকে কয়েকটা টাকা দে।

অবতার জড়িয়ে ধরলো।

তোমাকে টাকা দেওয়ার সাহস আমার নেই।

তনু, মিত্রা হাসছে।

অবতার, চাইছে যখন দাও। গরিব মানুষ বলে কথা। মিত্রা বললো।

নেপলা দেবে।

দেখলাম লক্ষ্মী হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে।

কিরে আর বসে থাকতে পারলি না?

তুমি কি নালিশ করছো শুনতে এলাম।

তোকে বেশ সুন্দরী লাগছে।

খেলাম-দেলাম ঘুমোলাম, সুন্দরী হবো না।

অবতার চোখে চোখে রাখিস আবার কেউ ভাগিয়ে নিয়ে চলে গেলে বিপদ।

সবাই হাসছে।

ওরা যে যার গাড়িতে গিয়ে বসলো।

দেখলাম ইসলামভাই, ইকবালভাই ব্যাঙ্কের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত নারছে।

একে একে সব গাড়ি ছেরে দিল। বাঁকের মুখ অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে রইলাম। এই মোরাম রাস্তাটুকু পার হতে পারলেই পিঁচের রাস্তা। বাঁকের মুখে গাড়িটা আসতে মিত্রা হাত নারলো, আমিও হাত নারলাম। ওরা চলে গেলো।

আমি ফিরে এলাম। বাসুর দোকানের সামনে এসে একবার উঁকি মারলাম। দেখলাম একটা নতুন ছেলে বসে আছে। কয়েকজন কাস্টমারও রয়েছে। আর ভেতরে ঢুকলাম না। একটু দূরেই সঞ্জুর দোকান। সেখানেও একবার উঁকি মারলাম। দেখলাম একটা বছর ষোলোর ছেলে বেরিয়ে এলো।

কাকু ভেতরে এসো।

তুই বড়ো না ছোটো?

আমি বড়ো।

বাবা কোথায়?

ব্যাঙ্কে গেছে টাকা জমা দিতে।

ভাই কোথায়?

বাড়িতে, স্কুল যাবে।

তুই যাবি না?

আমার পরীক্ষা আগামী সপ্তাহ থেকে। বাবা এলে চলে যাবো।

ঠিক আছে পরে আসবো।

ব্যাঙ্কে দেখলাম বেশ লাইন পরেছে। গেটের মুখেই মীরচাচার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো।

এতো ভিড় চাচা?

অনুপবাবু একটা অফার দিয়েছে।

আবার কিসের অফার?

যারা লোন নিয়েছিল কিন্তু দিতে পারেনি। তারা যদি লোনের পঁচিশভাগ আজ জমা দেয় তাহলে ইন্টারেস্ট দিতে হবে না। বাকিটা বারো মাসে শোধ করতে হবে। যদি ছয়মাসে কেউ শোধ করে দেয়, তাদের আবার ডবল লোন দেওয়া হবে।

তুমি খুশী?

খুশী মানে। গ্রামের সবাই খুশী। সবাইকে বলেছি, যা পারবি শোধ দিয়ে দে। যদি লোন পেতে চাস। তবে কিছু লোককে লোন দেওয়ার কথা বলেছি, না হলে তারা শোধ করতে পারবে না।

শোধের দায়িত্ব তুমি নিলে লোন দেওয়া যেতে পারে—  

একশোভাগ দায়িত্ব নেব।

কথা দিলে—

তোর সম্বন্ধে আগে একটু একটু শুনেছিলাম এখন পুরোটা জেনে ফেলেছি।

হাসলাম।

মিন্তুচাচার শরীর ভালো আছে?

কালকে তোর কথা বলছিলাম। কেঁদে ফললো।

কেন? তুমি নিশ্চই বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলেছো?

একটুও না বিশ্বাস কর। বার বার বলছিলো, ছেলেটার মা-বাপ বেঁচে থাকলে খুশী হতো।

সে আর কি করা যাবে চাচা। সবার ভাগ্যে সব লেখা থাকে না।

সঞ্জু এসে পাশে দাঁড়াল।

টাকা জমা দেওয়া হলো?

তোকে কে বললো!

তোর বড় ছেলে।

অনুপদা একটা স্কিম দিয়েছে লুফে নিলাম।

তোরও বাকি আছে?

অবস্থা খুব খারাপ ছিল। এবার মনে হয় একটু ফিরবে। 

এর জন্য তোদেরও লড়তে হবে।

প্রথমে লড়াইটা ঠিক ছিল, জিজ্ঞাসা কর চাচাকে, গ্রামের কেউ বলতে পারবে না ব্যাঙ্ক থেকে উপকার পায় নি। তারপর যা হবার তা হলো।

এখন আবার ঠিক হবে?

না হলে এতো লোক টাকা দিতে আসবে কেন?

আমি এক সপ্তাহ বাদে আসবো, তোমাকে একটা বুদ্ধি দিয়ে যাবো চাচা, যদি লাগাতে পার, মাত্র এক বছরের জন্য, দেখবে এই গ্রামে সোনা ফলিয়ে দেব।

তুই এখুনি বলে যা।

দাঁড়াও ওপরে গিয়ে দেখি সাহেব-শুবরা কি করছেন।

যা তুই, আমি একটু পরে আসছি।

ওপরে এলাম, দেখলাম বাসু, চিকনা কাউন্টারে বসেছে।

আমাকে দেখে একবার হাসলো।

বড়োমা ফোন করেছিল, তুই খেয়ে আসিস নি। চিকনা বললো।

উত্তর দিলাম না।

সুবীর কমপিউটারে বসে সব আপডেট করছে, আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো।

ঘরে যান হাতের কাজ সেরে যাচ্ছি।

আরও তিন চারজন নতুন মুখ দেখলাম চিনতে পারলাম না।

আমি আসার দিন যে ঘরে এসে বসেছিলাম সেই ঘরে এলাম।

দেখলাম ইসলামভাই, ইকবালভাই বসে আছে। আর একজন অপরিচিত মুখ।

তুই খেয়ে আসিস নি। দিদি ফোন করেছিল। ইসলামভাই বললো।

বাবাঃ গ্রাম শুদ্ধু সবাই জেনে ফেলেছে।

ইকবালভাই জোরে হেসে উঠলো।

দেখোনা, সত্যি, এরা কি ভাবে বলো তো?

তুই বা খেয়ে আসিস নি কেন। ইকবালভাই বললো।

তখন ওরা বেরচ্ছিল। সঙ্গে চলে এলাম।

বাসুর বৌ ফোন করেছিল। ইসলামভাই বললো।

কেন?

দিদি বলেছে তাই। ও খাবার রেডি করেছে, তুই যাবি, না ও পাঠিয়ে দেবে।

পাঠিয়ে দিতে বলো। অনুপ, হিমাংশু কোথায়?

বিডিও অফিস, থানা, রেজিস্ট্রি অফিসে কাজ সারতে গেছে।

কে নিয়ে গেলো?

ভানু আর পচা।

কিসে গেলো?

দুটো বাইকে দুজনে বসলো।      

আমি বার বার অপরিচিত ভদ্রলোকের দিকে তাকাচ্ছি। ইসলামভাই বুঝতে পেরেছে।

চিনতে পারছিস না?

মাথা দোলালাম, না।

আমাদের এখানকার স্টেট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। টাকা নিতে এসেছেন।

উনি বুকের ওপর হাত তুললেন, আমিও হাত তুললাম।

আপনার নাম শুনেছি। আজ পরিচয় হওয়ার সৌভাগ্য হলো।

ইসলামভাই ফোন কানে তুলেছে বুঝলাম বাসুর বৌকে এখানে পাঠাবার জন্য হুকুম করছে।

আপনার বাড়ি কোথায়?

বাঘাযতীন।

ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেন?

না। সপ্তাহে তিনদিন যাই।

এখানকার পরিস্থিতি কেমন বুঝছেন?

কয়েকদিন দেখছি আমূল চেঞ্জ।

আপনারা একটু সঙ্গে থাকবেন, তাহলে দেখবেন অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবো।

ইসলামভাই-এর মুখ থেকে সব শুনেছি।

আজ মণ্ডলের এ্যাকাউন্টে আরও এগারো লাখটাকা জমা করেছি। ইসলামভাই বললো।

কোথা থেকে পেলে?

তুই জানিস না!

না।

কাল তাহলে কি করতে গেছিলি?

ব্যাঙ্কের কাগজপত্র উদ্ধার করতে।

চিকনা মণ্ডলের জামাইয়ের বাক্স থেকে ক্যাশ পেয়েছে এগারো লাখের ওপর। আমরা এগারো লাখ জমা করে বাকিটা রেখে দিয়েছি।

ওদের কাল এ্যারেস্ট করেছে?

নন-বেলেবেল অফেন্স। চোদ্দ দিনের পিসি হয়েছে। সুকান্ত বেশ ভালো অফেন্স এনেছে।

তুমি জানলে কি করে?

আমি সুকান্তকে ফোন করেছিলাম, সকালে কোর্টে তুলেছিল।

সুবীরকে একবার ডাকো।

আমি এমনভাবে কথাটা বলে ফেললাম ইসলামভাই বিষ্ময়ে আমার দিকে তাকাল।

কেনো বলবি তো!

আগে ডাকো পরে বলছি।

ইসলামভাই বিরক্ত হয়ে উঠে গেলো।

তুই সুবীরকে ডাকতে বললি কেনো? ইকবালভাই বললো।

নিশ্চই টাকাটা আজকের ডেটে জমা করেছে?

হ্যাঁ। না হলে কবে করবে?

এখুনি একটা গণ্ডগোল হয়ে যেত।

কেন?

ওকে কাল পুলিস এ্যারেস্ট করলো, আর আজ ও টাকা জমা দিতে ব্যাঙ্কে এলো। হয় কি করে?

কারুর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে?

এতদিন ব্যাটা টাকা দিল না। কাল এ্যারেস্ট হয়ে যাবার পর আজ কারুর হাত দিয়ে ভয়ের চোটে টাকা জমা দিতে পাঠিয়ে দিল। তাও আবার এক-দুটাকা নয়, এগারো লক্ষ টাকা। তোমার ক্ষেত্রে হলে তোমার ল-ইয়ার কি বলতো?

ইকবালভাই বড়োবড়ো চোখ করে আমার দিকে তাকাল।

সত্যি তো ব্যাপারটা একেবারে খেয়াল করিনি।

ইসলামভাইয়ের মাথাটাও সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে গেছে। ব্যাটা এই গ্রাউণ্ডে বেকসুর খালাস হয়ে যেত।

ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের দিকে তাকালাম।

আপনি মশাই এখানে বসে আছেন, সব শুনছেন, এটা মাথায় এলো না।

বিশ্বাস করুণ এই ব্যাপারটা একেবারে ভাবি নি।

আপনার ব্যাঙ্ক হলে কি করতেন?

কপালে দুঃখ ছিল।

দেখলাম ইসলামভাই, সুবীর, নেপলারা ঘরে ঢুকলো।

কিরে! তোরা কোথায় ছিলি?

বাসুদার বাড়িতে। নেপলা হাসতে হাসতে বললো।

আবিদ, সাগিরও হাসছে।

কি করছিলি?

টিভি দেখছিলাম।

হাতে ওটা কি এনেছিস?

বৌদি দিলো, বললো তুমি খেয়ে আসো নি।

তোরা খেয়েছিস?

বহুত।

ইসলামভাই, ইকবালভাই, ম্যানেজার সাহেব, সুবীর তিনজনে নিচু গলায় কথা বলছে।

কখন বেরিয়েছিলি?         

তিনজনেই হেসে উঠলো।

আগে ঝাড়বে না বলো। নেপলা বললো।

ঝাড় খাবার কাজ করলে নিশ্চই ঝাড় খাবি।

সকালবেলা ম্যাডামের সঙ্গে বেরিয়েছিলাম গ্রাম দেখতে, ঘুরতে ঘুরতে এপাশে তোমার সেই স্কুলটা দেখে বাসুদার বাড়িতে ঢুকে পরলাম।

তারপর আর বাড়ি যাস নি!

না।

ইসলামভাইয়ের দিকে তাকালাম।

শুনলে সব কথা?

বুঝেছি বয়স হয়ে গেছে।

সুবীর।

আমারও চোখ এড়িয়ে গেছে দাদা।

জমা দেওয়ার স্লিপে নিচে কার সই আছে।

কারুর নেই।

ওটা নিয়ে এসো। আর একটা পেন নিয়ে এসো। পারলে নতুন একটা স্লিপ নিয়ে এসো।

ইসলামভাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

নেপলার দিকে তাকালাম।

দাদাভাই নিশ্চই গুবলেট করেছে?

দাদাভাই কাজ না করে করে মাথাটা ঝামা করে ফেলেছে। দু-টোকেই অবতারের সঙ্গে ওখানে পাঠিয়ে দেব। কয়েকমাস থেকে আসুক।

দারুণ হবে। সাগির বলে উঠলো।

তোর খুব মজা। ঝামেলা পোহাতে হবে না।

দুটো মাস রেস্ট দাও।

নেপলা একবার শিবুকে ফোন করতো।

নেপলা মোবাইল বার করলো। ফোন করে শিবুর সঙ্গে প্রথমে কথা বললো।

ধরো দাদা কথা বলবে।

আমার হাতে ফোনটা দিল।

শিবু।

বইল।

সব ঠিক ঠাক আছে?

তুকে ও লিয়ে চিনতা করতে হবেক লাই।

শোন সেদিন রাতে কতো টাকার সই করিয়েছিস?

পইনেরো লাইখ।

কাগজটা কোথায়?

নেপলাকে দিয়ে এইছি।

ঠিক আছে আমি পাঁচটার দিকে বেরবো।

আইচ্ছা।

নেপলার হাতে ফোনটা দিলাম।

কাগজ কোথায়?

ম্যাডামের কাছে দিয়েছি।

আমার কাগজ ম্যাডামকে দিয়েছিস কেন?

তখন তোমার মাথার ঠিক ছিল না।

নেপলার কথায় সবাই হেসে উঠলো।

কেন যে অবতার বলে তোকে নেপলাই ঠিক করতে পারে, এখন বুঝছি। ইসলামভাই বলছে আর হাসছে।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/vn9ADu0
via BanglaChoti

Comments