কাজলদিঘী (১১৪ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১১৪ নং কিস্তি
—————————

মুঠোর মধ্যে বোতামটাকে চেপে ধরে নিরুর দিকে তাকালাম।

নীরুর চোখে বিষ্ময়।

ঘরের আর সবাই আমর দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে।

নীরু, একটা খালি ছোট শিশি নিয়ে আয়।

নিজের মনেই নিজে হাসলাম। হাঁপাচ্ছি। বটা কেমন যেন অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে।

নীরু ছুটে বেড়িয়ে গেল। অনিকেত স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে।

অনাদি মাথা নীচু করে বসে।

মিসেস প্রিয়দর্শিনী, আপনি অনাদির বিবাহিত স্ত্রী না অন্য কিছু।

আপনাকে তার কৈফিয়ত দিতে হবে।

প্রিয়দর্শিনী চড়া গলায় আমার কথার উত্তর দিল, ততধিক চড়াগলায় আমি বললাম।

আলবাৎ দিতে হবে। নাহলে শেয়াল-কুকুর দিয়ে আপনার তাজা শরীরটাকে ছিন্নভিন্ন করে দেব।

খুব বাড়াবাড়ি করে ফেলছিস। অনাদি চেঁচিয়ে উঠলো।

আর কেউ জানুক আর না জানুক তুই খুব ভালো করে জানিস, আমার মতো বিষধর সাপের ছোবল যে খায়, সে মুহূর্তে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। আমার অনেক কাজের সাক্ষী তুই।

তুই কি বলতে চাস!

জুয়েল, আলতাফ কলকাতায় কেন এসেছিল?

অনাদির চোখ দুটো হঠাৎ দপ করে কেমন যেন নিভে গেল।

ভক্তিবাবু, লতিফসাহেবের গালে কেউ যেন কষে থাপ্পর মারলো।

প্রিয়দর্শিনীর মুখটা কেমন ফ্যাকাশে। চোখদুটো ছোট ছোট হয়ে গেছে।

নীরু ঘরে ঢুকেই আমার হাতে ছোট্ট আইড্রপের খালি শিশিটা দিল।

ভেতরে জলটল নেই?

শুকনো নেকরা দিয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে এসেছি।

ছোট্ট আই পিস ক্যামেরাটা শিসির মধ্যে ঢুকিয়ে ছিপি আটকে দিলাম। বালিসের তলায় শিসিটা চালান করে দিয়ে, অনাদির দিকে তাকালাম।

আমার কথার জবাব দিলি না। এবার তোর কি কি প্রশ্ন আছে করতে পারিস।

আপনি উত্তেজিত হয়ে পরেছেন অনিবাবু একটু শান্ত হোন। লতিফসাহেব বললেন।

থামুন মাশাই, আপনারা আবার সব মন্ত্রী হয়েছেন। ধ্বজাধারী সব। ঝাঁঝিয়ে উঠলাম।

অনাদির দিকে তাকালাম।

প্রিয়দর্শিনীর সঙ্গে কাঞ্চনের পরিচয় করিয়েছিস?

ওরকম ন্যস্টি মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় করার দরকার নেই। প্রিয়দর্শিনী বললো।

অনাদির দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

তোর ছেলেটা কিন্তু বেশ সণ্ডাগণ্ডা তৈরি হয়েছে। আমার তুরুপের তাস তোর ছেলে-মেয়ে।

অনাদি একবার মুখটা তুলে আমার দিকে তাকাল।

আজ বড্ড বেশি করে মনাকাকার কথাটা মনে পড়ে যাচ্ছে। তোর মনে আছে সেই কথাটা।

অনাদি মাথা নীচু করে আছে।

ন চাষা স্বজ্জনায়ঃ।

ভক্তিবাবুর দিকে তাকালাম।

অর্থটা জানেন ভক্তিবাবু।

আমার ফ্যাসফেসে গলার স্বরটাও এই নিস্তব্ধ ঘরে কেমন গমগম করে উঠলো।

তুই একতরফা বলে যাচ্ছিস। অনাদি ঝাঁঝিয়ে উঠলো।

তোর বলার মতো মুখ আছে নাকি। চেয়ারে বসে আছিস, তোর মাস্টার ডগগুলোকে লেলিয়ে দিচ্ছিস, তারা ঘেউ ঘেউ করছে। কেন জানিষ? ওদের তুই খেতে দিচ্ছিস। কালকে তোর পেছন থেকে চেয়ারটা চলে যাবে। খিদের তাড়নায় ওই মাস্টার ডগগুলো তোকে ছিঁড়ে খাবে।

কেউ খাবে না।

মাধবন বেঁচে আছে না মরে গেছে, সেই খবর তোর কাছে এসে পৌঁচেছে?

অনাদি আবার আমার দিকে কট কট করে তাকাল।

তুই বড্ড দুর্বল লবি ধরেছিলি। ও তোর থেকেও ঢেমনা। নিজেরটা আখেরে গুছিয়ে নিয়েছে।

ফালতু কথা রাখ। কাজের কথা বল।

সতপাল রানাকে দিয়ে তুই গেম খেলতে চাইলি। ছেলেটা বেঘোরে প্রাণদিল। মাধবনের সাহায্যে জুয়েল, আলতাফকে হায়ার করে নিয়ে এলি আমাকে মারার জন্য। তিনটেই মরে গেল।

যদিও মাধবনেরটা এখনও কনফার্ম হইনি।

আমার কথা যতো শুনছে নীরুদের চোখ বিষ্ময়ে ফেটে পরছে।

সব মিথ্যে কথা সাজানো।

সত্যিটা তুই এদের সামনে বল। এরা তোর ডানহাত, বাঁহাত আর একজন তোর সহধর্মিনী।

চিবিয়ে চিবিয়ে ভেঙিয়ে এমনভাবে বললাম, অনাদির চোখ দুটোয় আরও আগুন ঝরে পরলো।

তুই কি ভেবে নিয়েছিলি, অনির শিরদাঁড়াটা তুই ভেঙে দিয়েছিস। দাদাকে দেখার পর অনি মুষড়ে পরবে, একেবারে ইঁদুরের গর্তে ঢুকে যাবে, ও আর এই সব নিয়ে মাথা ঘামাবে না। আমি ওর ওপর দিয়ে রোলার চালিয়ে দেব। একেবারে চিঁড়ে চেপ্টা করে দেব।

তুই অর্জুনকে কেন নিয়ে এসেছিলি?

গম গম করে উঠলো অনাদির গলা।

এটা তোকে খুলে বলতে হবে।

যে ছেলেটা কলকাতার বুকে আটচল্লিশ ঘণ্টা কাটিয়ে তিন তিনটে মার্ডার করে চলে গেল, তোর এসবি কি করছিল, আমার নামে নাকি তারা তোকে কনফিডেন্সিয়াল রিপোর্ট দিয়েছে।

যা বলছি সেটা সত্যি না মিথ্যে।

সত্যি না হলে তোকে বলছি কি করে এত কথা। তুই কিন্তু মিথ্যে বললি আলতাফ, জুয়েলকে তুই আমাকে মারার জন্য নিয়ে আসিস নি।

আমি ওদের নিয়ে আসি নি।

ওরা নিজে নিজে কলকাতায় এসেছে।

আমি জানি না। আমি একটা রিনাউন্ড চেয়ারে বসে নোংরা কাজ করি না।

মেনে নিচ্ছি। আমাদের ওখানে ভীমপুরের নার্সিংহোমে পেটখালাসের যে কারখানাটা বানিয়েছিস সেটা তোর নিশ্চই অজানা নয়। ওই নার্সিংহোমের তুইও একজন পার্টনার।

ভুল কথা।

আমার কাছে তার ডকুমেন্টস আছে। যে সব কুমারী মেয়েরা এই কাজ করিয়েছে। তার কাগজ পত্রও আছে। উইথ ডাক্তারের কাগজপত্র। আরও বলবো?

অনাদি চুপ করে গেল।

যে অমূল্যর জন্য তোর একদিন রাজনীতির ক্যারিয়ার ডুম হয়ে পরেছিল, তার হাত ধরেই তোর উত্তরণ।

মিথ্যে কথা।

যে দিবাকর রেপ কেশ, খুন কেশের আসামী, সে তোর বিজনেস পার্টনার।

প্রমাণ দেখাতে পারবি।

তুই তো প্রেস কনফারেন্স করে বলে দিয়েছিস আলতাফ, জুয়েল বম্বের বড়ো ব্যবসায়ী।

না আমি বলি নি।

কালকে একমাত্র আমাদের কাগজেই ওদের ছবি দিয়ে বায়োডাটা দেওয়া থাকবে। পাশে ওদের মৃতদেহের ছবি। তোর পুলিসকে বলিস আমি খবরটা পেলাম কোথায় ইন্ট্রোগেসন করতে।

এটা তুই করিস না। প্লিজ। এখুনি ছাপা বন্ধ কর। অনাদি হাতটা চেপে ধরলো।

তুই একটা দায়িত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে আছিস। তুই কখনও এই রিকোয়েস্ট করতে পারিস না। আমি একজন পাতি সাংবাদিক। আমার নামে দেশদ্রোহিতার এলিগেশন আছে।

প্রিয়দর্শিনীর দিকে তাকালাম।

কি ম্যাডাম দেখছেন, আপনার সোয়ামীর কাণ্ড। আপনি তো ওর কোম্পানীর অন্যতম মালিক, দিবাকরের কথা একটু আগেই বললাম। চেনেন তাকে।

না এরকম নামে আমি কাউকে চিনি না।

একি! আপনার গলায় সেই ঝাঁজ কোথায়?

শুনুন, আপনার জ্ঞাতার্থে জানাই, তাকেও আমি বিগত ছয়মাস আমার হেফাজতে রেখেছি। আপনি এবং অনাদি দু-জনেই তার সাথে রেগুলার বাক্যালাপ করেন। তার রেকর্ডিং আমার কাছে আছে। শুনবেন নাকি?

আপনি….!

কিছু বলতে গিয়ে ভদ্রমহিলা থমকে গেলেন।

ফেঁসে গেছেন এই তো।

ভক্তিবাবু, লতিফসাহেবের দিকে তাকালাম।

বিশ্বাস করুণ, আমরা এর বিন্দু বিসর্গ কিছু জানি না।

জানেন না মানে! আপনাদের সব বলিনি। সব আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছেন কেন।

অনাদি আবার ঘেউ ঘেউ করে উঠলো।

বটা, নীরুদের চোখ যেন জ্বলন্ত আগুনের এক একটা কয়লার টুকরো।

সকালে শ্রীধর গোস্বামী, অতীন সান্ন্যাল, অসিত হালদার এসেছিল কেন?

কে পাঠিয়েছিল? অনাদি বললো।

সেটা তোরা বলবি, তোদের দফতরের অফিসার।

ওরা যে এসেছিল আমাকে কেউ জানায় নি।

তোর স্বরাষ্ট্রসচিব একটা খোলা চিঠি দিয়েছে। দেখবি নাকি?

এতোবড়ো সাহস।

সাহসিকতার আরও পরিচয় আছে। শুনলে গা শিউড়ে উঠবে।

দেখা চিঠিটা।

যাক আমার টাকার কি করলি।

কিসের টাকা?

সাত কাণ্ড রামায়ণ পড়ে সীতা কার বাপ।

অনাদি কট কট করে আমার দিকে তাকাল।

বুঝলি অনাদি আমার সঙ্গে টক্কর নিতে গেলে শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতায় হবে না, এটা তোকে বিশ বছর আগে অনেকবার বুঝিয়েছি।

আপনি কি সব বলছেন আমাদের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। ভক্তিবাবু বললেন।

ইসলামভাই কি দোষ করেছিল তাকে তুই এ্যারেস্ট করেছিলি।

অনাদি চুপ করে রইলো।

দাদাকে কেন হেডকোয়ার্টার ডেকে পাঠিয়ে তোর পোষা সরকারী গুণ্ডা অপমান করে? কেন তুই ও বাড়িতে তালা ঝুলিয়েছিলি? আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর তোর অভিধানে নেই। আচ্ছা দেবা যে বাচ্চে সিং নামে বম্বের আন্ডারওয়ার্লডে খ্যাত এটা তোর অজানা থাকার কথা নয়।

অনাদি চুপ চাপ বসে রয়েছে।

শুধু ক্যামেরাটা পাঞ্জাবীর বোতামে লাগিয়ে চলে এসেছিস। এনারা না জানলেও তোর মিসেস মনে হয় বুদ্ধিটা দিয়েছে। এতো বুদ্ধি গ্রামের ঘুঁটে কুড়ুনি কাঞ্চনীর হবে না।

তুই মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্চিস। অনাদি গড় গড় করে উঠলো।

তুই স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী, একটা ফোন করে আমাকে এ্যারেস্ট করাবার ক্ষমতা তোর আছে, সেটাই বরং তোর বাঁচার একমাত্র উপায়, দেখ ভেবে কি করতে পারিস।

আমি এখন উঠি।

অনাদি উঠে দাঁড়াল।

এখন যাস না। ওবিভ্যান নিয়ে সমস্ত ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া নিচে তোর ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। সব চ্যানেল লাইভ দেখাবে। কেন তুই এতো রাতে এই নার্সিংহোমে এসেছিস?

তখনই আপনাকে বারণ করেছিলাম। আপনি বললেন এসবি রিপোর্ট দিয়েছে, ধারে কাছে কেউ নেই। কুল পরিবেশ। এদের আর বিশ্বাস করা যাবে না। ভক্তিবাবু বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন।

তোর আর্মস কেনার স্ক্যামটা এতক্ষণে হয়তো ছাপা হয়ে গেছে।

অনাদি হাতটা তোলার আগেই আমি ছিটকে দূরে সরে গেলাম। কনিষ্কদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেছে। সুবল ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়েই চেঁচা মিচি শুরু করে দিল।

আমি ফোনটা তুলে তাড়িতাড়ি অর্ককে বললাম মিডিয়াকে ওপরে পাঠিয়ে দে।

কনিষ্ক, নীরু অনাদিকে ধরে রাখতে পারে না।

বটা, অনিকেত কেমন স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে।

ভক্তিবাবু, লতিফসাহেব পালাতে গেলেন, পারলেন না, সুবলরা ঘরের দরজা আটকে দাঁড়িয়ে। একটা হই হই পড়েগেল চারপাশে তার মধ্যেই দেখলাম ক্যামেরার ফ্লাশ জ্বলতে শুরু করেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম ঘরের মধ্যে ক্যামেরা চলতে শুরু করেছে।

আমি খাটের আর একপাশে কম্বল গায়ে দাঁড়িয়ে। ফ্লাশের ঝলকানিতে চোখ ধাঁদিয়ে যাচ্ছে।

মুর্হু মুর্হু প্রশ্ন আছড়ে পড়ছে অনাদি, ভক্তিবাবু, লতিফসাহেবের দিকে।

একজন প্রিয়দর্শিনীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে উঠলো, আপনি এতো রাতে এই নার্সিংহোমে কেন, আপনার কোনও পেসেন্ট এখানে ভর্তি আছে নাকি?

কারুর মুখ থেকেই কোনও উত্তর বেরচ্ছে না। সকলেই হাত দিয়ে মুখ ঢাকে।

উনি অসুস্থ আপনারা বাইরে চলুন। ভক্তিবাবু ত ত করে বলে উঠলেন।

উনি অসুস্থ দিনের বেলা দেখতে না এসে গভীর রাতে ওনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন কেন।

ঠেলাঠেলি করে ভক্তিবাবু লতিফসাহেব ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেলেন, অনাদি একবার কট কট করে আমার দিকে তাকিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল।

ক্যামেরার ছেলেগুলো দেখলাম ওদের পিছু পিছু ধাওয়া করলো।

শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে যেন শরীরটা শূন্যে ভাসছে, কপালের দু-পাশটা কেমন টিপ টিপ করছে। চোখ দুটোয় কেমন অন্ধকার অন্ধকার দেখছি।

হামাগুড়ি দিয়ে বিছানায় উঠে এসে শুয়ে পরলাম।

কিরে শরীর খারাপ লাগছে!

কনিষ্ক কথাটা বলেই। টেবিলের ওপর থেকে প্রেসার মাপার যন্ত্রটা নিয়ে কব্জিতে বেঁধে দিল।

চেঁচিয়ে উঠলো, নীরু দৌড়ে যা স্যালাইনের বোতল, গ্লুকোজের বোতল, ইসিজি মেশিনটা নিয়ে আয়। অক্সিজেনের মাক্সটা মাথার শিয়োর থেকে আমার নাকের ওপর বসিয়ে দিল।

এতক্ষণ যে শ্বাসকষ্টটা হচ্ছিল এখন বেশ আরামবোধ হচ্ছে।

মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন দৌড়ো দৌড়ি পরে গেল।

ঝড়ের মতো সব মেশিন গুলো আবার ঘরে ঢুকতে আরম্ভ করলো। মুহূর্তের মধ্যে ওরা চারজন আমাকে সব মেশিনে মুরে দিল।

তোরা ঘাবড়াস না। আমি ঠিক আছি। একটু শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।

একবারে বক বক করবি না। কনিষ্ক খিঁচিয়ে উঠলো।

প্রেসারটা একটু বেড়ে গেছে মনে হয়।

শালা জ্ঞানপাপীরে, একটু চুপ কর না। তোর পায়ে ধরছি। বটা দাঁতে দাঁত চিপে বলে উঠলো।

আমাকে প্যাথিডিন দিস না। আর একটু কাজ বাকি আছে।

ঘরের মধ্যে দেখলাম তিনজন নার্স ইঞ্জেকসনের শিসি ভাঙছে। অল রেডি দুটো বোতল ঝুলে পরেছে। নীল লাল মনিটরগুলোয় কেমন গ্রাফের মতো লাইন ওঠা নামা করছে।

কনিষ্ক স্টেথটা কানে গুঁজে আমার কব্জিতে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

আবার কেমন যেন গাটা শিড় শিড় করতে শুরু করেছে।

কনিষ্ক শীত করছে।

মুখে লিউকো প্লাস আটকে দেব।

বলছি কিছু হয় নি। আমি ঠিক আছি। স্বজ্ঞানে বলছি। আবল-তাবল বকছি না।

নীরু লিউকোপ্লাসটা নিয়ে আয়।

প্যাথিডিন দিলেও আমার এখন ঘুম আসবে না।

ওরে ভগবান, মুখটা একটু বন্ধ কর না। নীরু প্রায় কেঁদে উঠলো।

আমি নীরুর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম।

তোরা এতো টেনসন করছিস কেন আমি এতো সহজে মরবো না। অনেক কাজ বাকি আছে।

কনিষ্ক একবার কট কট করে আমার দিকে তাকাল।

নীরু ওই সিরামটা সালাইনের শিশিতে পুশ করেছিস।

করেছি।

তুই একটু ঘুমবার চেষ্টা কর। নাহলে প্যাথিডিন দিতে বাধ্য হব।

এতক্ষণ ঘুমলাম ঘুম আসে।

বুঝলাম ওরা ইসিজি করলো। নিজেরা আঁকাবাঁকা লাইন গুলো দেখছে। কথা বলছে। কি কথা বলছে বুঝতে পারছি না। কানে আসছে। কেমন ঝিমুনি ঝিমুনিভাব। কনিষ্ক হাসছে।

যা ভেবেছিলাম ঠিক তা নয়, কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। খুব বাঁচান বেঁচে গেছি। সিরামটা তুরির দান কাজ করেছে।

চোখে অন্ধকার নেমে আসছে। কনিষ্কদের মুখটা কেমন  আবঝা দেখছি।

তারপর আর কিছু জানি না।

চোখ মেলে যখন তাকালাম, তখন দেখলাম ছোটোমা আমার ডানহাতটা ধরে বসে আছে। পায়ের কাছে বড়োমা, দামিনীমাসি। ঘরে আরও অনেক চেয়ার দেখলাম। সেখানে সুরো, বৌদি, মিত্রা, মেয়ে বসে।

আমি চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবার দিকে তাকালাম।

মেয়ের দিকে চোখাচুখি হতেই ঘরের বাইরে বেড়িয়ে গেল।

একটু ওঠার চেষ্টা করলাম।

ছোটোমা উঠে দাঁড়িয়ে বুকের ওপর হাত রেখে ধরে ফেললো।

একদম না।

আমি ভালো আছি। বিশ্বাস করো।

মিত্রা, সুরো উঠে দাঁড়িয়ে কাছে এগিয়ে এলো।

তুই খারাপ আছিস কে বললো।

ছোটোমার দিকে তাকালাম।

মিত্রার চোখ ছল ছল আমার কপালে হাত দিল।

আমি ওর হাতটা ধরলাম। বেশ ঠাণ্ডা।

কাল যে মেশিনগুলো দেখেছিলাম সেগুলো এই মুহূর্তে ঘরে নেই। স্যালাইনের বোতল এখনও ঝুলছে। বৌদির দিকে তাকালাম। চোখদুটো কেমন ফোলা ফোলা। স্থবিরের মতো বসে আছে।

সুরোর মুখটা কেমন শুকনো শুকনো।

একটু জল দিবি। মিত্রার দিকে তাকালাম।

কনিষ্ক আসুক। গলাটা বেশ ভারি।

তুই দে-না, কিছু হবে না।

খালি হেঁপি মারা অভ্যাস।

বড়োমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম।

দামিনীমাসি বড়োমার হাতটা ধরেছে।

নীরু, কনিষ্ক ঢুকলো। পেছনে মেয়ে।

দু-জনের মুখটাই বেশ ফ্রেস লাগছে। আমাকে দেখে হাসলো।

শরীর ঠিক আছে।

দাঁতটা মাজবো, এগুলো খুলে দে।

নীরু জোড়ে হেসে উঠলো।

তোকে একটা তোরই ডায়লগ ঝাড়তাম সবাই আছে বলে দিলাম না।

মেয়ে হাসছে।

নীরু সকাল বেলা আর চার্জ করেছিলি? কনিষ্ক বললো।

না।

করতে পারতিস।

সব চেক করে দেখলাম না দিলেও চলবে তাই দিলাম না। নীরু বললো।

অনেক জল ঢুকিয়েছিস এবার বন্ধ কর। আমি বললাম।

বক বক করিস না।

ওকে ধরে তোরা আচ্ছা করে ঘা-দুই দিতে পারছিস না। বড়োমা বললো।

তুমি বললে এখুনি তোমার সামনে দিয়ে দিতে পারি। নীরু বললো।

আমার সামনে কেন।

ছোটোমা হেসে ফেললো।

কনিষ্ক কিন্তু নিজের মতো করে দেখে চলেছে।

নীরু, বটা আর ইসিজি করেছিল?

না।

ড্রিপটা বন্ধ করে দে।

আমার দিকে তাকাল।

একা একা উঠে বসতে পারবি।

হ্যাঁ।

কই ওঠ দেখি।

তুই এগুলো খোল।

খুলে দেব, তুই আগে উঠে বসে দেখা।

বড়োমা, দামিনীমাসি, বৌদি উঠে দাঁড়িয়েছে।

আমি ডানহাতের ওপর ভর দিয়ে এককাত হয়ে উঠে বসলাম। মাথাটা সামান্য চক্কর দিল।

কনিষ্ক হাসছে।

হাসছিস কেন?

কোনও সমস্যা হলো না?

না।

মাথাটা একটুও চক্কর দিল না?

একটু।

কনিষ্ক ড্রিপটা বন্ধ করে স্যালাইনটা খুলে দিল।

নিজে নিজে বাথরুমে যেতে পারবি।

পারবো।

ছোটোমা সরে যাও, কেমন যেতে পারে দেখি।

ছোটোমা সরে দাঁড়ালো।

মাথায় রাখবি কারুর হেল্প নিতে পারবি না।

আমি নামতে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। বেশ টাল খাচ্ছি।

তবু বিছানার একপাশ ধরে উঠে দাঁড়ালাম।

নীরু ধরবে, না যেতে পারবি।

দেয়াল ধরে চলে যেতে পারবো।

তাই যা। বাথরুমের দরজা বন্ধ করবি না। টাইম ওভার হয়ে গেলে নীরু ঢুকে পরবে।

আমি একবার হাসলাম।

মাজন আর ব্রাশটা দে।

মিত্রা টেবিলের ওপর থেকে ব্রাশটা নিয়ে মাজন লাগিয়ে দিল।

আমি বাথরুমে গেলাম।

তলপেটটা ভীষণ টন টন করছিল। বাথরুম করে মুখে-হাতে ভালো করে জল দিলাম। এরই মধ্যে নীরু তিন-চারবার ডেকে ফেলেছে।

বাথরুমের বাইরে বেরিয়ে এসে নিজের পাঞ্জাবীতেই মুখটা মুছে নিলাম।

মেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তেড়ে এলো।

কনিষ্ক হাসতে হাসতে বললো।

ন চাষা স্বজ্জনায়ঃ।

হেসে ফেললাম।

মিত্রা দাঁত কিড়মিড় করতে করতে হাসলো।

ও মিত্রা ওকে পাজামা-পাঞ্জাবী দে। বড়োমা বলে উঠলো।

দিয়ে কি হবে। ওটাই পরে থাক।

আমি খাটে বসলাম।

মা একটু জলের বোতলটা দে তো।

মেয়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে গিয়ে একটা গ্লাসে জল ঢেলে এনে দিল।

তোর অনেক কাজ এখনও বাকি, এবার শেষ করতে হবে।

কনিষ্কর দিকে তাকালাম।

সকাল থেকে খুব ভালো ব্যাট করছিস। একটা বলও মিস করছিস না।

বড়োমার দিকে তাকালাম। দাদা কেমন আছে?

তোর জেনে লাভ, তুই তোর তালে আছিস। সবার খোঁজ নিয়ে তোর কি হবে।

মিত্রা ট্যাক ট্যাক করে উঠলো।

তোকে জিজ্ঞাসা করেছি?

কনিষ্কর দিকে তাকালাম।

একটু চা খাওয়াবি।

চা হবে না। বোর্নভিটা, হরলিক্স দুটোর একটা পাবি।

যা হোক একটু দে। বড়োমাদের চা দিয়েছিস?

বড়োমারা এখানে চা খেতে আসে নি।

তোরা সবাই কেমন বাঁকা বাঁকা কথা বলছিস কেন বলতো?

তোকে সোজা করার জন্য।

কুকরের লেজ কোনওদিন সোজা হয়।

আমি খাটে উঠে বসলাম।

নে, কি উত্তর দিবি। বৌদি স্বগতোক্তির সুরে বললো।

মিত্রা আমার কোলের ওপর পাজামা পাঞ্জাবীটা ছুঁড়ে দিল।

ছেড়ে নে।

বটা দরজা ঠেলে ঢুকলো।

এখনও রেডি করিস নি। নিচের মালগুলো পাগলা কুত্তা বানিয়ে দেবে।

তুই গিয়ে নিশ্চই বলেছিস ও রেডি। কনিষ্ক বললো।

আমার বলার অপেক্ষা রাখে। কাঁঠাল ভেঙেছিস মাছি এখন ভন ভন করবে।

কারা এসেছে?

আমি বটার দিকে তাকালাম।

সুবলকে একটু ওর জন্য হরলিক্স পাঠাতে বল। আর সবার জন্য চা নিয়ে আয়। কনিষ্ক বললো।

সুবল নেই এটা আর একটা, সুবলের থেকে এক কাঁটা উঁচুতে। মাছি গলতে দিচ্ছে না। ভার্গিস ম্যাডাম পেসেন্ট দেখতে এই ফ্লোরে আসছিল তাকে পর্যন্ত ভাগিয়ে দিয়েছে। অল টাইম ফোনে কথা বলে চলেছে। বটা বললো।

আমি মাথা নীচু করে হাসছি।

বটা তবু ছেলেটাকে ডেকে বলে দিল।

দরজা ফাঁক করে ছেলাটা আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো।

আবার কি সিগন্যাল দিলি! কনিষ্ক তাকাল।

আরে বাবা হাসতেও মানা করবি—

তোকে বোঝা মুস্কিল।

মা, দাদা কোথায়রে। মেয়ের দিকে তাকালাম।

বাড়িতে দুদুনের কাছে।

ডাক্তার দাদাই।

সবাই বাড়িতে।

অনিমেষ দাদাই।

সকালে একবার এসেছিল, তোমাকে দেখে চলে গেছে।

আমার লেখাটার কি রি-অ্যাকাসন রে।

মেয়ে চুপ করে মিটি মিটি হাসে।

ইসলামদাদাই কোথায়?

বাড়িতে।

তোরা কখন এসেছিস?

ভোর চারটের সময়। তোমাকে কাল টিভিতে দেখলাম, তারপর চলে এলাম।

এসে দেখলি বাবা পটকে গেছে।

তুমি ঘুমচ্ছিলে।

হুঁ। এটা নিশ্চই অর্কর কাজ।

অর্কর দোষ কি। ওকে যা দায়িত্ব দিয়েছিলি পালন করেছে। তুই বুড়ো বায়সে মারপিট করছিলি, বললো টিভিতে একবার দেখো তাই দেখলাম। মিত্রা খুব নিঃস্পৃহ ভাবে বললো।

বড়োমার দিকে তাকালাম।

তুমি আমার মারপিটের অংশ দেখেছ।

বড়োমা মুচকি মুচকি হাসছে।

বুঝেছি গল্পের গরু একেবারে গাছে উঠে বসে আছে।

মেয়ের দিকে তাকালাম।

দেখ আমাদের কাগজটা বাইরে কারুর কাছে আছে কিনা।

আমার ব্যাগ থেকে এনে দে। সুরো বললো।

যাক এতক্ষণে তোর গলা পেলাম।

তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

এলি কেন, কে আসতে বলেছে।

তুমি কি আমার সঙ্গে ঝগড়া করবে। সুরোর গলাটা ভাড়ি ভাড়ি ঠেকলো।

সুরোর দিকে তাকালাম। কোথায় যেন একটা তাল কেটে যাচ্ছে বার বার।

চুপ করে গেলাম।

অনিসা কাগজটা বার করলো।

আমি পাজামা পাঞ্জাবীটা নিয়ে খাট থেকে নেমে ধীরে ধীরে বাথরুমে এলাম।

কালকে কি অনাদিকে রাতে রাঘবনের লোকেরা এ্যারেস্ট করেছে? করা উচিত। এতবড়ো একটা স্ক্যাম। নিশ্চই অনিমেষদারা সরকার গড়ার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে।

এটাই স্বাভাবিক। যে লেখা আমি লিখেছি। তাতে চারদিক তোলপাড় পরে যাবে।

মৈনাকের সঙ্গে কাল থেকে কথা হয় নি। যদি ও সত্যি সত্যি ওর কাগজে বের করে থাকে, তাহলে সেন্ট্রালের চোখ পড়ে যাবে। রাজনীতিতে একটা ঝড় নিশ্চই উঠবে।

অর্ক নিশ্চই সব কিছু ঠিক ঠাক ম্যানেজ করবে। একমাত্র ওইই সব ঘাঁত ঘুঁত জানে।

সুবলের কাছে সেই বাক্সটা এখনও রয়েছে। নেওয়া হয়নি।

কিরে ঘুমিয়ে পরলি নাকি। কনিষ্ক দরজা খট খট করলো।

গায়ে মাথায় হাল্কা করে একটু জল দিলাম। বেশ ভালো লাগছে। বাথরুমে ঝোলানো টাওয়েলটা দিয়ে মুছে নিয়ে পাজামা পাঞ্জাবীটা ছেড়ে বাইরে এলাম।

কনিষ্ক আমার দিকে তাকিয়ে বললো।

গায়ে জল ঢাললি নাকি।

একটু খানি।

কেন সুস্থ থাকতে ভালো লাগছে না।

তুই আমাকে রিলিজ দিয়ে দে।

কেন দেশে যাবি?

কনিষ্কর দিকে কট কট করে তাকালাম।

ও বুঝি তোকে তাই বলেছে। বড়োমা বললো।

না দিলে তুই ফাঁসবি।

সে তুই যা খুশি করতে পারিস, ওড়া-উড়ি থেকে ঠোকা-ঠুকি, মেয়েটাকে ঠিক-ঠাক বিয়ে দিয়ে দিস, ল্যাটা চুকে যাবে।

কনিষ্ক এমনভাবে বললো, গম্ভীর পরিবেশেও সবাই হাসলো।

মিত্রা আমার দিকে একবার ট্যারা চোখে তাকাল।

ছোটোমার দিকে তাকালাম।

দাদা বাড়িতে একলা রয়েছে। তোমরা এবার বাড়ি চলে যাও।

তাতে অ-কাজ কু-কাজের সুবিধে হবে তাই না। বড়োমা খ্যাঁক করে উঠলো।

ছোটো ওকে আচ্ছা করে দে। বড়োমা দাঁতে দাঁত চিপলো।

অনিসা জোড়ে হেসে উঠলো।

দিদান তুমি কিন্তু এই নিয়ে চারবার বললে।

তাতেও তোর বাপের শিক্ষে হয়।

তাহলে বোলছো কেন।

আমি খাটটা একটু তুলে দিয়ে হেলান দিয়ে বসলাম। বালিসের তলায় হাত ঢুকিয়ে দেখলাম মোবাইলগুলো ঠিক ঠাক আছে কিনা।

কনিষ্ক হেসে ফেললো।

যখের ধন।

একটা কাজ করতে পারবি—চা তো এলো না। একটা টাইমস অফ ইণ্ডিয়া কিনে আনবি।

নিচে সেই কাগজের লোক বসে আছে। চলে যা কিনতে হবে না।

মা যা একটা কাগজ নিয়ে আয়।

সুরো পিসির কাছে আছে।

সুরোর দিকে তাকালাম, কাগজটা দে একটু দেখি।

কি হবে দেখে, দেশ উদ্ধার করেছো।

একবারে না, নিজেকে উদ্ধার করেছি।

তুমি সাংবাদিক না হয়ে প্রফেসার হলে ভালো হতো।

তাহলে তোর বৌদিকে পেতিস না। ভাইপো, ভাইঝিকে পেতিস না।

অনিসা, মিত্রা, বৌদি, ছোটোমা, বড়োমা, দামিনীমাসি হাসছে।

তোমার যদি কিছু হয়ে যেত।

এতক্ষণে অরিন্দম কহিল বিষাদে।

সুরোর মুখের দিকে তাকালাম। ওর চোখ ছল ছল করছে। আমার দিকে তাকাতে পারলো না। মুখ নামিয়ে নিল।

বুঝলি সুরো এতক্ষণে ব্যাপারটা মাথায় ঢুকলো। সূত্রটার উত্থাপন কোথায় কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মাঝে মাঝে সার্চ ইঞ্জিনটা ফেল করে যায়। নিশ্চই কনিষ্কদা রসিয়ে রসিয়ে কাল রাতের গল্পটা ঝেরেছে।

কনিষ্কদা বলতে যাবে কেন। কনিষ্কদা ছাড়া বলার আর কেউ নেই। সুরোর গলাটা সামান্য ভাড়ি ভাড়ি।

অবশ্যই আছে, নুলো নীরু, মথামোটা বটা আর হাঘরে অনিকেত।

দেখলি সুরো তোর জন্য কি ডায়লগ শুনতে হলো। বটা বলে উঠলো।

বলতে দাও না। মুখটা আছে বলে রক্ষে, নাহলে সারমেয় পর্যন্ত মুখে….।

হিসি করে দিত। তুই একেবারে সাধুভাষা ঝাড়লি, মাঝে মাঝে চলিতে ছাড়।

বুঝলাম ঘরের আর সবাই বেশ খুশবু নিচ্ছে।

যাক এইসব শুনে তোর বরের কাপর-চোপর নষ্ট হয় নি।

দুষ্টুমি চোখে সুরোর দিকে তাকালাম।

দেবনা ঘার মুটকে। সুরো তেরে এলো।

বুঝেছি আমার মৃত্যুটা তোর হাতেই লেখা আছে।

দেখলাম একটা আয়া ট্রেতে সাজিয়ে চা আর আমার হরলিক্স নিয়ে ঢুকলো।

পেছন পেছন চিকনা।

তুই!

চিকনা ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

তারপর আমার পায়ে মাথাটা গুঁজে দিল।

ঠিক আছে, ঠিক আছে এবার ওঠ।

তোকে কতোদিন পর দেখলাম। অনাদি লৌটিইছে।

তুই কখন এসেছিস?

দুটো কুড়ির ট্রেন ধরেছি।

তোকে কে খবর দিল?

অর্ক।

নিচে আছে! ওকে একবার ডাকতো।

অর্কদা ল্যাঙোট খুলতে গেছে। মেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো।

এবার বড়োমা, দামিনীমাসি জোড়ে হেসে উঠলো।

আমি মেয়ের দিকে একবার তাকালাম। মুচকি মুচকি হাসছি।

হ্যাঁ-গো বাবা।

তুই সকলকে একেবারে ল্যাঙোট পড়িয়ে ছারলি। দামিনীমাসি বললো।

সতি বলছি বিশ্বাস করো। দিদান, দিদাই, কুটি দিদাই সবাই অর্ক মামাকে কাল পেন্নাম করেছে।

তুই করিস নি?

আমি দিদাইকে বলেছিলাম সব বুজরুকি। মা বললো একবারে বক বক করবি না। মুখ দেখে সব কেমন গড় গড় করে বলে দিচ্ছে দেখেছিস। তখনই আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছিল। ভাবলাম আজকে এসে সাধু ব্যাটাকে ধরবো, ও মা! সব ভোঁ ভাঁ।

মিত্রার দিকে তাকালাম। এরইমধ্যে চিকনা সকলের পায়ে মাথা ঠুকে ফেলেছে।

একবার সন্দীপকে ফোনে ধরে আমাকে দিবি।

সব নীচে আছে। কাউকে ফোন করতে হবে না। মিত্রা বললো।

চোখে হাসি মুখ গম্ভীর।

ওরা চায়ে চুমুক দিয়েছে, আমি হরলিক্সে চুমুক দিলাম।

সুরো তোর ছেলেটাকে আমাকে দিয়ে দে।

আমি চাই না ও তোমার মতো হোক।

তুই চাইলেও ও প্রফেসার হবে না।

না হোক তবু তোমাকে দেব না।

তুই না চাইলেও ও আমার কাছে আসবে।

বললেই হলো।

চিকনা হাসছে।

ওখানকার খবর কি রে।

কাল রাত পর্যন্ত খুব ভালো ছিল না। তোর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারছি না। পৌনে একটা নাগাদ অর্ক ফোন করলো। অনিদার খেলার সমাপ্তি হলো, তুমি গর্ত থেকে বেরিয়ে এখানে চলে আসতে পার।

ব্যাশ সবাইকে জাগিয়ে তুলে খবরটা দিয়ে বাইক নিয়ে বেরিয়ে এসেছি। ওখানে কি হচ্ছে জানি না। হাওড়ায় এসে বাসুকে একবার ফোন করলাম। বললো, তুই আগে গিয়ে অনির খবর দে, এদিকের কথা ভাবতে হবে না।

এখানে এসে দেখলাম তুই পটকে গেছিস।

আমি পটকাই নি, কনিষ্করা ইচ্ছে করে পটকে দিয়েছে।

কনিষ্কদা বললো তোর মাথার যন্ত্রণা করছিল।

মানুষের মাথার যন্ত্রণা করে কেন? বুঝিস—

চিকনা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

খুব যখন পরিশ্রম হয়, শরীর মাথাকে ঠিক মতো অক্সিজেন সাপ্লাই করতে পারে না। তখন মাথার যান্ত্রণা করে। ফাঁকা জায়গায় গিয়ে বেশ জোড়ে জোড়ে কয়েকবার নিঃশ্বাস নিবি, দেখবি মাথার যান্ত্রণা কমেগেছে। আর পেট ভর্তি করে জল খাবি।

কনিষ্ক ডাক্তারি ছেড়েদিয়ে চল দু-জনে মিলে বালিগঞ্জ বাজারে আলু বেচি।

বটা এমনভাবে বললো, সবাই জোরে হেসে উঠলো।

ওই যে বললাম না, মুখটা ছিল বলে। সুরো বলে উঠলো।

বুঝলে সুরো আগেকার দিনে ডাক্তাররা নারী টিপে নিদেন দিতেন। তোর আয়ু বেশি নেই, তুই মরে যাবি, কিংবা তুই এই এইগুলো কর দেখবি ভালো হয়ে যাবি। কনিষ্ক বললো।

তুমি ছাড়ো। সুরো বলে উঠলো।

চিকনা কিরকম ভালো শ্রোতা বলো। মিত্রা বললো।

ও ঠিক কথা বলে। চিকনা হেসে হেসে বললো।

আমি গ্লাসটা চিকনার হাতে দিলাম। মুখে দিয়ে ঢক ঢক করে গিলে নিল।

আমার দিকে তাকাল। ঠান্ডা হয়ে গেছে।

নীরু ঘরে ঢুকলো। বটার দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠলো।

তোকে পাঠালাম, আর তুই এখানে এসে জমে গেছিস।

অনি ডাক্তারি করছে।

ওর মুখ লিউকোপ্লাস আটকে দে।

আবার হাসি।

ছোটোমাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, বাড়ি যাও। আমি দুপুরে গিয়ে সবার সঙ্গে একসঙ্গে খাব।

ছোটোমা কনিষ্কর দিকে তাকাল।

ওরা আমাকে রাখতে পারবে না। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, যাব।

কি খাবি?

ট্যাংরা মাছের বেশ মাখো মাখো করে ঝোল করবে। মাসি ধোঁকার ডালনা করবে। বড়োমা ডালটা বানাবে বেশ জব্বর করে একটু কারি পাতা দেবে। বৌদি আলুর দম, একদম কষা কষা। বিকেলে জ্যেঠিমনির লুচি, বাটিচ্চড়ি। তুমি জিরে আর সামান্য ঘি দিয়ে রাইসটা বানাবে।

তোমার ছেলের খাওয়ার চার্ট দেখেছো। মিত্রা বড়োমার দিকে তাকাল।

তুই খাবি না? বড়োমা কট কট করে উঠলো।

কেন খাব না!

তাহলে বলছিস কেন।

তোমরা এবার যাও। আমার আর একটু কাজ বাকি আছে সেরে নিই।

সেটাই আসল, তাই বল। বৌদি বলে উঠল।

সুরো ছেলেটাকে নিয়ে আসিস। সুরো আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকাল।

মিত্রা।

বল।

মিলির মেয়েটাকে দিয়ে যেতে বলিস।

ওটা কনিষ্কর নয়?

ওই হলো।

কনিষ্ক হাসছে।

তুই চাইলে আমি লিখিত-পরিত ভাবে দিয়ে দিতে পারি।

তুই চাইলেও মিলি দেবে না।

দিয়ে দেবে রাজি করাবার দায়িত্ব আমার।

কেশটা কি বলতো? নীরু বললো।

তোকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে বলবো। আমি বেশ ধীরে সুস্থে বললাম।

তোর কাছ থেকে শুনতে চাই না।

তাহলে শুনতে হবে না।

ওরা সবাই উঠে দাঁড়াল। আমি খাট থেকে নেমে দাঁড়ালাম। মনে হলো মাথাটা কেমন চিড়িক করে উঠলো। একটু বসলাম।

নীরু ব্যাটা ধরে ফেলেছে।

কিরে মুখটা কেমন করলি যেন!

না পাটা কেমন ঝিঁ ঝি ধরেগেছে।

তোকে যেতে হবে না। ছোটোমারা দিব্যি নিচে চলে যেতে পারবে।

মিত্রা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।

হেসে ফেললাম।

একটা সাধারণ ব্যাপার নিয়ে এতো গভীরভাবে ভাববি না। মাথা ফুটো হয়ে যাবে।

কিছু বাকি আছে?

অনেক বাকি আছে, সবে কলির সন্ধ্যে। আমার কাগজপত্র একটু গুছিয়ে রাখিস। বাড়িতে গিয়ে তোর সঙ্গে খেয়েদেয়ে বসবো।

আমার আর দম নেই।

দম দিয়ে নেব।

অনিসা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

যা মা দিদানদের একটু হেল্প করিস।

ওরা একে একে সবাই বেরিয়ে গেল।

কনিষ্ক।

বল।

পেটটা মনে হয় কাঁদছে, কিছু ব্যবস্থা কর না।

কড়া করে বাটার টোস্ট একটা অমলেট আর দুধের কথা বলি।

তোদের এখানে আর কিছু পাওয়া যায় না।

এটা বাড়ির ড্রইংরুম নয়। হুকুম করবি আর পেয়ে যাবি।

ঠিক আছে ভাই আর বলবো না। চিকনা।

বল।

শ্যাম এখন কোথায়?

ওর জায়গাতে।

বাচ্চাগুলো কেমন আছে।

তারা বেশ মজায় আছে। খাচ্ছে দাচ্ছে খেলা করছে।

কোনও অসুবিধে নেই?

একেবারে না। ওদের বোঝান হয়েছে তোরা এখানে হোস্টেলে পড়তে এসেছিস।

মীরচাচার খবর।

মাঝে বেসামাল হয়েগেছিল, বুঝিয়ে শুনিয়ে অনেক কষ্টে ধরে রেখেছি।

অনাদির চামচেগুলো।

কিছু এদিক ওদিক ছিটকে চলে গেছে মার খাওয়ার ভয়। যে কটা আছে তারা এখন আমাদের সঙ্গে আছে। ওরাই খবরা খবর জোগাড় করছে।

ব্যাঙ্কের কাজ কর্ম।

ওই জায়গাটায় কেউ হাত দেয় নি। তাহলে হয়তো আগুন লাগতো।

আমার ফার্মের পজিসন।

দেবাদা বলছিল সরকার থেকে কিসব চিঠি ইস্যু করেছে। দেবাদা সেই নিয়ে চারদিকে দৌড়োদৌড়ি করছে।

থেমে নেই?

না, তা নেই। একটা খারাপ খবর আছে।

কি!

পরিদা মারা গেছে।

এ্যাঁ।

মাস দেড়েক হলো।

কলকাতায় নিয়ে এসেছিলাম, বার বার তোর কথা বলছিল, তোকে দেখবে, তারপর পরিদার ছেলে পরিদাকে ব্যাপারটা সব বলেছিল, তার কয়েকদিন পর মারা গেল।

বোকনার কিছু ব্যবস্থা করেছিস?

মণ্ডলের ছেলেকে পাঞ্জাব থেকে তুলে এনে এ্যারেস্ট করা হয়েছে। এখনও ভেতরে আছে।

পরিদা সেটা জেনে গেছে?

এ্যারেস্ট করা হয়েছে সেটা জেনে গেছে।

ভীমপুর নার্সিংহোম?

মাঝে দু-তিনবার ভাংচুর হয়েছে। এখন বন্ধের মুখে।

অমূল্য।

তিনবার ঘর লুট করেছে মীরচাচার লোকজন। এখন গ্রাম ছাড়া। মণ্ডলদের পরিবারেরও কেউ নেই। তবে মেয়েরা সব রয়েছে। দিব্যি আছে কেউ গণ্ডগোল করে না।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/L32mvpH
via BanglaChoti

Comments