❝কাজলদীঘি❞
BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১১৭ নং কিস্তি
—————————
ডাক্তারদাদা আমার কথা শুনে হাসছে।
তুই জানলি কি করে?
ছাগলে কিনা খায় বলো। গাছের ডগাটা পর্যন্ত মুড়িয়ে খেয়ে ফেলে।
বল না, এই নিয়ে তুই কি কোনও লেখা পড়েছিস।
হ্যাঁ।
কোথায়!
ওখানে থাকার সময় পড়েছিলাম।
একটা তৈরি করেছিল, বাঁচিয়ে রাখতে পারে নি।
হ্যাঁ।
আমি উপনিষদকে একেবারে ফেলনা হিসাবে ধরছি না। তবে তার ইমপ্লিমেন্ট করা ভীষণটাফ।
এখন সাইন্স অনেক উন্নত।
তা হোক, আমার ব্যক্তিগত অভিমত তোকে বলতে পারি।
বলো।
এখনের থেকে তখনকার সাইন্স আরও বেশি উন্নত ছিল।
তাহলে আলটিমেট কি হলো। তোমরা সব ডাক্তার। মানুষের শরীর নিয়ে কারবার করো, আমার একটা প্রশ্ন মনে জাগলো, তাই তোমাদের বললাম। তার সঠিক উত্তর পেলাম না।
আমাকে একটু পড়াশুনো করতে হবে। তোর অভিমতটা কি শুনি।
আমি উপনিষদের গল্প আওড়াবো।
সেটাই শুনি না। আমি ততদূর গেছি কিনা।
মানুষতো পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্টি এটা নিয়ে কোনও দ্বিমত আছে।
একেবারে না।
মানুষের শরীররে উননব্বইভাগ এ্যানিম্যাল জিন বাকিটা এ্যালিনের, একে তুমি দেবতা থেকে আরম্ভ করে যা খুশি বলতে পারো।
এই এ্যানিমেলটি কে? শিম্পাঞ্জি সম্প্রদায়ের। ডাক্তারদাদা বললো।
তারমানে এ্যালিনের সঙ্গে শিম্পাঞ্জির মিলন?
হাস্যকার মনে হচ্ছে?
এখন কোনও কিছুই হাস্যকর নয়। তবে কি সাইন্স প্রমাণ নির্ভর, তোমাকে পরীক্ষা করে প্রমাণ করতে হবে, এটা করলে এটা হবেই।
আমিতো সাইন্স নিয়ে পড়িনি। আর্টসের ছাত্র।
সেই জন্য তোর মনে এই সব উদ্ভট প্রশ্ন আসে।
সুরো আর দুটো মেয়ে দেখলাম ট্রেতে করে খাবার নিয়ে এসে হাজির। ওই দুটো মেয়েকে চিনতে পারলাম না।
ধরো ধরো তাড়িতাড়ি, বাবা এসেছে। মিত্রা, ছোটোমা উঠে গেলো।
কোথায়? বৌদি বলে উঠলো।
বাইরে গাড়ি থেকে নামছে।
আর কে এসেছে?
প্রবীরকাকু, বিধানজ্যেঠু, ইসলামভাই, ইকবালভাই সব…।
সুরো ছুটতে ছুটতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দাদার জন্য দেখলাম স্যুপ নিয়ে আসা হয়েছে।
তুই তাড়িতাড়ি মেরে ওষুধটা খা বাবা। নীরু বলে উঠলো।
আমি নীরুর দিকে তাকালাম।
এই তো অনিমেষদা চলে এসেছে, ব্যাশ কখন যে উঠবি তার ঠিক নেই।
আমার সঙ্গে কোনও সাঁট-গাঁট নেই।
ডাক্তারদা চামচে করে চাউমিন মুখে তুলে, আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
কথা বলতে বলতেই অনিমেষদা, প্রবীরদা, বিধানদা ঘরে ঢুকলো।
সাহেব মনে হচ্ছে খুব জমিয়ে বসেছে।
আমি তখন চামচে দিয়ে মুখে ন্যুডুলস তুলেছি।
প্রবীরদা হাসছে।
দিদি আপনার ছেলের মেজাজ-টেজাজ ঠিক হয়েছে।
বড়োমা একবার অনিমেষদার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো।
আমি সরে বসলাম, অনিমেষদা, বিধানদা সোফায় আমার দুপাশে এসে বসলো। প্রবীরদা খাটে একেবারে আমার মুখো মুখি।
আর দু-জন গেলো কোথায় মন্ত্রী-সন্ত্রী ঠিক করছে? আমি বললাম।
তোর কাছে লিস্টটা এ্যাপ্রুভ করাতে এসেছি। অনিমেষদা বললো।
বৌদি খুব জোড়ে হেসে উঠলো।
কেন?
মন্ত্রীত্বে শপথ নেওয়ার পরদিনই দেখবো তুই বিশাল একটা লেখা লিখে বসলি, এই মন্ত্রীটার এই দু-নম্বরী ব্যবসা, ওই মন্ত্রীটা মাফিয়াদের নেতা….।
আমার কাজ নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা। আমি আমার পেশার থেকে একটুও সরবো না।
তাতে তোর একেবারে কোনও স্বার্থ থাকে না।
সবাই নিজের স্বার্থ নিয়েই চলে। তুমি চলো না।
আমি অস্বীকার করছি না।
পুকুর চুরি করছো না। এটা বলতে পার।
এবার বিধানদা হেসে উঠলো।
সুরো ট্রেতে করে তিনজনের জন্য খাবার নিয়ে এলো।
আজ তোর দায়িত্ব। প্রবীরদা সুরোর দিকে তাকিয়ে বললো।
বাবু প্রেসকনফারেন্স করে বেশ জমিয়ে গল্প করতে বসেছেন, রসোভঙ্গ করি কেন।
বুঝলি সুরো, তোর এই ন্যুডুলসে নুনটা একটু কম আছে।
সুরো তেড়ে এলে।
খাওয়া শেষ করে নুন কম আছে।
যা বাবা এতো কষ্ট করে করলি প্রথমেই যদি বলতাম নুন কম আছে তাহলে কান্নাকাটি শুরু করে দিতিস।
নীরুর দিকে তাকালাম।
ওষুধগুলো দে, গিলি।
নীরু টেবিলের কাছে এগিয়ে গিয়ে ব্যাগ থেকে তিনটে ট্যাবলেট বার করে নিয়ে এলো।
হাতে নিয়ে মুখে ফেলে ঢক ঢক করে একগ্লাস জল গলধকরণ করলাম।
বুঝলি সুরো জলটা বেশ ভালো খেলাম, এবার এককাপ গরম চা দিলে বেশ জমবে।
অনিমেষদা, প্রবীরদা মুচকি মুচকি হাসছে।
এর আগে কোনওদিন প্রেসকনফারেন্স করেছিস? অনিমেষদা বললো।
তুমি দেখেছ?
তোকে প্রশ্ন করতে বলেছি? উত্তর চেয়েছি।
আমার প্রশ্নটাই উত্তর।
মিত্রা দাদাকে চামচে দিয়ে স্যুপটা খাইয়ে দিচ্ছে। বাচ্চাদের মতো গলায় একটা টাওয়েল জড়িয়ে দিয়েছে। চোখ চলে গেল। বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠলো।
অনিমেষদারা খালি প্লেটটা টেবিলের ওপর রাখলো। বুঝলাম সকাল থেকে খাওয়া-দাওয়া বিশেষ একটা জোটে নি। ইকবালভাই, ইসলামভাই খেতে খেতেই ঘরে এসে ঢুকলো। আমাকে দেখেই হেসে ফেললো।
ওরকম মুড়ি-শুড়ি দিয়ে বসে আছিস কেন?
শীত করছে।
তোর আবার শীত করে নাকি? গ্রামের ছেলে বলে কথা।
মুখ টিপে হাসলাম।
ওরা খাটের আর একপাশে বসলো।
বুঝলাম অনিমেষদা বেশ ভালো করে আমাকে মাপছে। প্রবীরদাও কমতি যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে আমার ঘুটিগুলো শেষ পর্যন্ত এরা নাড়াচাড়া করে নিয়েছে। চিকনা সেই বিকেলের পর এখনও পর্যন্ত আমার সঙ্গে দেখা করলো না। নিজে থেকে ফোন করে জানব তার কোনও উপায় নেই।
দেখে শুনে মনে হচ্ছে এরা বেশ গুছিয়ে হোমওয়ার্ক করে এসেছে।
সুরো চা নিয়ে এলো। সবাইকে দিল।
এক ঘর ভর্তি লোক। সুমন্ত ঘরে এসে ঢুকলো।
অনিমেষদা ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো।
কাজ সেরে এসেছিস?
হ্যাঁ, আজকের মতো ছুটি।
বুঝলি অনি প্রবীরকে সিএম করার ব্যাপারে আমরা পার্টির তরফ থেকে মনস্থির করেছি।
অনিমেষদার দিকে তাকালাম। কিসের ইঙ্গিত—
অনিমেষদাও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের মনি স্থির। ভাষা বোঝা দায়।
হঠাৎ আমাকে এই কথাটা বলার উদ্দেশ্য—
তোকে ভালোবাসি তাই বললাম।
তাহলে ঠিক আছে।
তুই কিছু বলবি না।
হাসলাম।
এবার শ্যামকে বল বাচ্চাগুলোকে ছেড়ে দিতে।
সরাসরি অনিমেষদার চোখে চোখ রাখলাম। চোখের পাতা নড়ছে না। সারাটা ঘর নিস্তব্ধ। সকলের চোখ আমাদের দুজনের দিকে, ডাক্তারদাও আমাদের দুজনের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
আমি বললে শ্যাম ছেড়েদেবে এই কথাটা তোমায় কে বললো?
আমি জানি—
মনে মনে ঠিক করে নিলাম, যুদ্ধটা এখান থেকেই শুরু করে দিতে হবে। নাহলে পরবর্তীতে অনেক সমস্যা তৈরি হবে। সুযোগ যখন পাওয়া গেছে। আমিই বা ছাড়ি কেন।
তোমার লাভ—
অনিমেষদা হেসে ফেললো। তুই বহুত ধড়িবাজ—
বাঃ কথাটা আমি তুলি নি। তুমি তুলেছো। আমার জায়গায় তুমি থাকলে কি বলতে।
আমাদের তো নিশ্চই একটা লাভ হবে—
আমি কি পাবো—
প্রবীরদা এবার হেসে উঠলো।
তুমি হাসছো কেনো! প্রবীরদার দিকে তাকালাম।
তুই সওদার কথাটা খুব সুন্দর ভাবে রিপ্রেজেন্ট করলি তাই।
আমি এবার পেছনদিকে হেলান দিয়ে গুছিয় বসলাম। অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। হাসছে।
তোর সব মায়েরা এখানে বসে আছে।
তারা কেউ ব্যবসা করে না, সংসার চালায়। আমার অনেক পোষ্য। খরচও খুব একটা কম নয়। এদের থেকেও আমার সংসারটা বেশ বড়ো।
কি চাস?
তোমাদের পার্টির খুব ক্লোজ রিলেটেড একজন ব্যবসায়ী আছে। বারো নম্বর কোর্টে তার নামে প্রায় পঞ্চাশটা ওয়ারেন্ট ঝুলে আছে। পুলিশ তাকে খুঁজে পায় না। কিন্তু তিনি দিব্যি পুলিশের সঙ্গে বসে আড্ডা মারেন, আটশো কোটি টাকা স্টেটের কর ফাঁকি দিয়েছেন। আমার কাছে ডকুমেন্টস আছে। চইলে দেখাতে পারি। প্রবীরদা সিএম হওয়ার পর প্রথমে ওই ফাইলে সই করবে, তাকে এ্যারেস্ট করার জন্য।
প্রবীরদা চমকে আমার দিকে তাকাল। ঘরের সবাই কেমন যেন একটু নড়েচড়ে বসলো।
তুই গুলিয়ে ফেলছিস, ওরা নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।
আমি গুলিয়ে ফেলিনি, দুজনেই সমান দোষী। ওকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করছো না কেন?
আমি খবর নিই নি। তবে এটুকু শিওর আজ তোমাদের কারুর না কারুর সঙ্গে উনি যোগাযোগ করেছেন। হয়তো খবরটা শোনার পর উৎসাহের বশে মিষ্টির প্যাকেট সঙ্গে নিয়ে তোমাদের রাজভবনেও চলে এসেছেন।
ওটা এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পার্টের ব্যাপার পার্টির ব্যাপার নয়।
তারমানে আমাকে বুঝে নিতে হবে পার্টির কোনও লোক এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পার্টে আসছে না।
পার্টি আর সরকার দুটো আলাদা সেগমেন্ট। পার্টি পার্টির মতো চলবে, সরকার তার মতো।
পার্টির কোনও নিয়ন্ত্রণ সরকারের ওপর থাকবে না?
অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। মুখে মৃদু হাসি।
ব্যাপারটা পরিষ্কার করো, তুমি তো জনসভায় বক্তৃত্বা দিচ্ছ না। সবার সামনে আমার সঙ্গে কথা বলছো। এই গাওনাটা তুমি প্রথমেই গেয়ে নিয়েছো। এটা একেবারে ঘরোয়া কথাবার্তা। এখানে তর্কযুদ্ধ হতেই পারে—
ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর।
যদি প্রমাণ করে দিই তোমাদের পার্টির….না থাক—
বল কি বলতে চাইছিলি—
না থাক, আমি কর্ণের মতো দানবীর হতে চাই না।
তুই বল না, এটা তো পার্টির মিটিং নয়।
হাসলাম, বাজাচ্ছো—
তোকে আবার বলছি সেন্ট্রাল ওদের সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, আজ নয় কাল আমাদরেও সেটা মানতে হবে।
উনিশো সাত সালে এক বাঙালীর হাত ধরে এই সংগঠনটার জন্ম, উনিশো একান্ন সালে প্রথম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপর পার্টিটার নাম তিনবার পরিবর্তন হয়েছে। তিনবারই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এবারও নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো, আবার কয়েকদিন পর আর একটা নামে সংগঠনটা আত্মপ্রকাশ করবে। ব্যাপারটা কি এবং কেন তুমিও ভালোকরে জানো, আমিও জানি। অতএব নিষিদ্ধ ঘোষণার গল্প আমাকে শুনিয়ে লাভ।
আর একটা ব্যাপার শ্যাম, শিবু, দারু এরা চুনো পুঁটি বলতে পারো একটা ব্যাটেলিয়ানের এরা কনস্টেবল পর্যায়ের লোক, হাবিলদার, ক্যাপ্টেন, মেজর জেনারেলদের টিকিটিও সরকার পায় নি। সরকার জানে না এটা বিশ্বাস করি না। আমার বিশ্বাস তারা কিন্তু পার্লামেন্ট হাউসের ঠাণ্ডা ঘরে বসে বেঞ্চ বাজায়।
অনিমেষদা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
তুমি পরিশীলিত পড়াশুনো করে বামপন্থী ভাবধারায় ভাবিত, তুমি এই ইতিহাস জানো না! এটা বিশ্বাস করতে পারি না। তুমিও জানো এরা কারা, আমিও জানি এরা কারা।
ঘরে পিন পরলে শব্দ হবে। বিধানদা আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে। প্রবীরদার মুখটা থম থমে। অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
তুমি নিজে মুখে সবার সামনে স্বীকার করো, তুমি কিছু জানো না। এমনি এমনি পার্টির সর্বেসর্বা হয়ে বসে আছো।
পার্টির মাথায় বসলেই এই সব ইতিহাস জানতে হবে এর কোনও কারণ আছে?
আমি মনে করি আছে, না হলে ছেড়ে দাও। কে মাথার দিব্যি দিয়েছে।
চুপ করে থাকলাম। ওরা আমার দিকে তাকিয়ে।
রেভোলিউসন ডাজ নট মার্চ ইন এ স্ট্রেইট লাইন, ইট ওয়াণ্ডার হয়ার ইট ক্যান রিট্রিট বিফোর সুপিরিয়র ফোর্সেস, এ্যাডভানসেস হয়ার ইট হ্যাজ রুম টু এ্যাডভান্স এ্যান্ড ইট পসেসড অফ এনারমাস পেসেন্স। কথাটা কার বলো—
অনিমেষদা হাসলো।
ব্যাপারটা এতো সহজ। একটা লোক গ্রন্থাগারের একজন সাধরণ কর্মী হিসাবে জীবন শুরু করেন, তারপর মিলিটারি শিক্ষায় শিক্ষা নিয়ে মিলিটারিতে যোগদেন, এরপর ধীরে ধীরে দেশের কর্ণধার তৈরি হন, এমনি এমনি নয়। সবাই মিলে তোমরা তাকে নিয়ে ছেলেখেলা শুরু করে দিয়েছে। তিনি কিন্তু আমাদের বেদ, পুরাণ পরে দেশ চালাতেন। তাঁর লেখার মধ্যেই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে পাই, পাই কৌটিল্যকে। আর তোমরা সব দু-চ্ছাই করে দূরে সরিয়ে রেখেছ। এরাও বলে তাঁর ভাবধারায় ভাবিত। ক্ষতি কি। এরা তো ডানপন্থী নয়। এর পেছনে কি ইতিহাস আছে সেটা আলাদা বিষয় বস্তু। সেটা নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো। তোমার কথা মতো সরকার আর পার্টি দুটো আলাদা সেগমেন্ট।
একটু থামলাম।
মাঝে মাঝে কি বলতে ইচ্ছে করে জান, সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ।
সারাটা ঘর নিস্তব্ধ। সবাই আমার কথা শুনছে। অর্ক, সুমন্ত আমাকে যেন চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। ইসলামভাই, ইকলবালভাইয়ের চোখ স্থির। অনন্য, অনিসা মিত্রার দু-পাশে বসে। দুজনে মায়ের দুহাত ধরে রয়েছে।
প্রবীরদা তুমি সিএম হচ্ছ তোমার হাতে অগাধ ক্ষমতা। আমি তোমাকে তিনটে সমস্যার কথা বলবো, এটা আমি ওদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশেছি বলে জানতে পেরেছি, তারপর হাঘরের মতো পড়াশুনো করেছি। সমাধান করতে পারবে?
প্রবীরদা আমার দিকে তাকিয়ে।
অনিমেষদা মনে হয় প্রবীরদাকে কিছু একটা ইশারা করলো। চোখ এড়াল না।
একবার অনিমেষদার মুখের দিকে তাকালাম, ভাবলেশহীন মুখ।
তুমি সিএম হতে চলেছো, তোমার এই গল্পগুলো খুব কাজে লাগবে। বামপন্থী বইপত্র তোমরা যতো পড়োছো, এই ধরণের বইপত্র তোমরা ততটা পড়ো নি, এককথায় তোমাদের ততটা সময় নেই।
আমি এদের নিয়ে স্টাডি করেছি। কিন্তু সমস্যার সমাধান করতে পারি নি।
সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
একবার শ্যাম, শিবু, দারুকে নিয়ে কলকাতা দেখাতে নিয়ে এলাম। শহর দেখার সখ। তোমাদের পার্টির মিটিংয়ে এসে অনেকেই শহর দেখতে বেরোয়। তা ওদের খিদে পেয়েছে। এক নামজাদা রেস্তোরাঁয় বসে চারজনে খাচ্ছিলাম। সব দামি দামি ভালো ভালো খাবার। সেই রেস্তোরাঁর বসে থাকা অনেক ব্যাক্তিই কালো কালো তিনটে সাঁওতালের সঙ্গে বসে আমাকে খেতে দেখে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছিল।
আমরা নিজেদের মতো খেয়ে চলেছি। গল্প করছি হাঁসা হাঁসি করছি।
খাওয়া দাওয়া শেষ। হাতমুখ ধুয়ে পয়সা মিটিয়ে একটু মিছরির দানা সহযোগে মৌড়ি মুখে ভরে রেস্তোরাঁ থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
শ্যামকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন খেলি।
খুব ভালো খেলাম অনিদা। সংক্ষিপ্ত উত্তর।
একটু থেমে বললো, আচ্ছা অনিদা তোর এই খাবার দোকানে ইঁদুর পোড়া, পান্তা পাওয়া যায় না—
ঘরের সকলে আমার কথা শুনে হেসে গড়া গড়ি যায়।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। অনিমেষদা, প্রবীরদা আমার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। ব্যাপারটা এরকম তুই কি আমাদের সঙ্গে ফাজলামো করছিস।
আমি অনিমেষদার দিক তাকিয়ে হাসলাম।
ভাবছো অনি ট্র্যাকটাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যেতে চাইছে।
না তোর গল্প শুনছি।
তাহলে আর একটা গল্প বলি।
বল।
রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে। ওদের সখ হলো আলিপুর চিড়িয়াখানা দেখবে।
তথাস্তু। গড়িয়াহাট থেকে একটা ট্যাক্সি ধরলাম। সোজা আলিপুর চিড়িয়াখানা।
টিকিট কেটে চারজন ঢুকলাম। বাঘ, সিংহ, শিম্পাঞ্জী, জিরাফ, জেব্রা দেখে ওরা খুশী। বাঁদর, হাতি, ভাল্লুক দেখে ওরা ততটা খুশী হতে পারলো না। কথায় কথায় বললো, এর থেকে অনেক বেশি বাঁদর, হাতি, ভাল্লুক আমাদের ওখানে দেখা যায়।
সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। চিড়িয়াখানার বাইরে বেরিয়ে এলাম।
এতটা হাঁটার পর ওদের মনে হয় পা ব্যাথা করছিল, বাইরে বেরিয়ে এসে তিনজনেই রস্তার ওপর থেবড়ে বসে পরলো। আমি রে রে করে উঠলাম।
কলকাতারে ছাগল এ তোদের ভালোপাহাড় নয়।
শ্যাম উঠে দাঁড়াল শিবু, দারু কিন্তু রাস্তাতেই বসে রইলো।
গড় করি তুদের কইলকাতাকে, তার থেকে মোদের ভালোপাহাড় ভালো। শিবু বললো।
আচ্ছা অনিদা, দরুর দিক তাকালাম।
তোর এই চিড়িয়াঘরে সব দেখলি, কুত্থা শুকুন দেখলি নি। এন্যে কি শুকুন পোষে নি।
আবার এক চোট হাসির রোল।
অনিমেষদা, প্রবীরদা, বিধানদা এবার বেশ প্রাণখুলে হাসলো।
হাসি থামতে আমি বললাম, এদের কাছে নিষিদ্ধ আর সিদ্ধ কথার অর্থ একটাই পেট।
কেন এদের নিয়ে মাতামাতি করছো। বরং যে মাথাগুলোকে নিয়ে মাতামাতি করার দরকার তাদের নিয়ে মাতামাতি করলে বরং অনেক লাভ।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
একটু ঘরের চারপাশে তাকালাম, আগের থেকে ভিড় বেরেছে। রতনরা এসে যে যার জায়গা দখল করে বসে পড়েছে।
অনিমেষদা সুরোর দিকে তকিয়ে বললো, মা একটু চা কর না। তোর অনিদা যা শুরু করেছে….।
তোমরা শুধু গল্প করো, আমি শুধু তোমাদের চায়ের জোগান দিই।
পা দাপাতে দাপাতে, সুরো ঘরের বাইরে চলে গেল।
প্রবীরদা তখনও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে চলেছে।
কি সিএম বাবু হাসছো কেন—এবার ঠাণ্ডা ঘর, লালবাতি, হুটার অলা গাড়ি….।
তোর মুখে এসব কথা মনায় না।
কেন আমি কি ভিন গ্রহের বাসিন্দা?
অবশ্যই।
ভুল করলে। এদের অরিজিনালিটি জানলে তুমিও কেঁপে উঠবে, কজন জানে বলো। সাধারণ পাবলিক, তোমরা কে কি বললে কাগজে পড়ে তা নিয়ে নাচা নাচি করে। ঝড় ওঠে। আসল সমস্যা যে তিমিরে থাকার সেই তিমিরেই রয়েছে।
এদের অরিজিনালিটিটা একটু বল শুনি। সত্যি আমার সেই ভাবে জানা নেই। বইপত্র পড়ে যেটুকু জেনেছি। তোর মুখ থেকে শুনে মনে হচ্ছে সেটাও ভাষা ভাষা।
ক্লাস ফোরে লীলা মজুমদারের একটা গল্প পড়েছিলাম, এখন ডিটেলসে বলতে পারবো না। তবে তার সার কথাটা ছিল, বন থেকে জানোয়ার তুলে আনা যায়, কিন্তু জানোয়ারের মন থেকে বন তুলে ফেলা যায় না। গল্পটা একটা বাঘকে নিয়ে ছিল। এখানে বাঘের জায়গায় তুমি দারু, শ্যাম, শিবুকে বসিয়ে নিতে পারো।
আমি তোকে নিয়ে ওদের কাছে যাব।
প্রবীরদার দিকে তাকালাম।
এটা তুমি ইমোসন্যালি বলছো। এর জন্য ওই চেয়ারটার যা প্রটোকল আছে তা মেনে চলতে গেলে কামিং পাঁচ বছরে তুমি সময় বার করতে পারবে না।
সুরো চা নিয়ে এলো।
হ্যাঁরে মেয়েটা ছেলেটাকে দেখতে পাচ্ছি না।
ভজুদার সঙ্গে ও ঘরে খেলা করছে।
সবাই চায়ে চুমুক দিল। ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। শ্যামেদের গল্পটা একটু বল শুনি।
তোমায় আলাদা করে বলবো।
কেন আমরা শুনতে পারি না। অনিমেষদা পাশ থেকে বলে উঠলো।
খেপে যাবে। তারপর আমার নামে হুলিয়া জাড়ি করবে অনাদির মতো। ব্যাটাকে পাগল সাজিয়ে জেলে পুরে দে।
অনিমেষদা, মিত্রার দিকে তাকাল।
আমায় না, যা খুশি ওকে বলতে পারো। আমি বেশ আছি।
প্রবীরদা হাসছে।
শুরু কর। তোর গল্পটা আগে শুনি তারপর আমার কাজ। অনিমেষদা বললো।
আমি অনিমেষদার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম।
মুখার্জীর কথা তোমরা নিশ্চই জান।
হ্যাঁ।
মুখার্জী আমাকে ওই সময় ভীষণ হেল্প করেছিল। অনেক সরকারি নথিও আমাকে জেরক্স করে দিয়েছিল পড়াশুনো করার জন্য। আমি কিন্তু গল্প বলছি এটা মাথায় রাখবে, আরও বেশি জানতে চাইলে বা খোঁজ খবর নিতে চাইলে তোমরা নিজেদের মতো করে নেবে।
ভারতের ম্যাপে দেখবে ডেকান প্লেটো একটা বিশেষ অঞ্চল। যাকে ভূগোল বইতে বলা হয় দাক্ষিনাত্যের মালভূমি অঞ্চল, এর ঠিক লাগোয়া ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চল।
এখানে এমন কোনও মিনারেল নেই যা পাওয়া যায় না। তেল, গ্যাস বাদে। অঞ্চলটা গড়ে উঠেছে, ঝাড়খন্ড, বেঙ্গল, বিহার, উড়িষ্যা, অন্ধ্র, এমপির কিছুটা নিয়ে। একসময় এই ডেকান প্লেটো শাসন করতো রাজা কৃষ্ণদেব রাও। সেটা ষোলোশ সতেরোর কথা। আমি অতদূরে যাবো না।
ভারতের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবে, পৃথিবীর সবচেয়ে দামী দামী এবং মূল্যবান পাথর ভারতেই মিলেছে। কহিনুর হীরে থেকে শুরু করে তাবৎ সব নামজাদা হীরে। তার প্রমাণ, নাদির শাহ কতোবার ভারত আক্রমন করেছিল নিশ্চই দেখেছ। মোগলরা এখানে তিনশো বছর রাজত্বই করে ফেলেছিল। তারপর ভারতের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ধীরে ধীরে মিশে গেল। এখন কাউকে খুঁজে পাও? মাঝে মাঝে নাম কা ওয়াস্তে কয়েকজনের নাম শোনা যায়। তারাও মেটিয়াবুরুজের বস্তিতে থাকে।
তখন ভারতে এক একটা অঞ্চলে এক একটা রাজা। উনিশো সাতচল্লিশ সালে দেশ স্বাধীন হবার পর সবাই ভারতের মধ্যে যুক্ত হলো। কিন্তু হায়দরাবাদের নবাব তখনও এই স্বাধীনতা মেনে নিল না।
কেন?
মোগলদের পর ভারতের রাজ-রাজাদের ইতিহাসে হায়দরাবাদের নবাব ছিলেন সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। এই ডেকান প্লেটোটা তিনি কব্জা করে রেখেছিলেন।
কেন?
মিনারেল।
নবাবের নিজস্ব সৈন্য বাহিনী ছিল। বলতে পারো প্রাইভেট আর্মি। তার প্রধান ছিলেন কাশিম রিজভি। এর কাজ ছিল ডেকান প্লেটোর গভীর জঙ্গলে ঢুকে মিনারেল তুলে আনা। কাদের দিয়ে তোলাত?
জঙ্গলের আদিবাসীদের দিয়ে।
শ্যামের দাদুর বাবারা এক সময় কাজ করেছে, শয়ে শয়ে আদিবাসী এই ব্যক্তিগত মালিকানার খনির গহ্বরে হারিয়ে গেছে।
কি করে?
ইঁদুর যেমন গর্ত খোঁড়ে, তেমনি আদিবাসীদের কোমড়ে দড়ি বেঁধে গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে পিটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। আর বলা হতো দড়ি যতোক্ষণ না টানছি ততক্ষণ বেরবি না।
কতো আদিবাসী নারী-পুরুষ গর্তের মধ্যেই দম আটকে মরে গেছে।
এই মিনারেল বাইরে পাঠান হতো। বৃটিশরা ভাগ পেতই, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীন সব জায়গাতেই এই মিনারেল যেত। বৃটিশরা তাই কোনওদিন হায়দরাবাদের নবাবকে চটাতেন না।
বৃটিশ প্রিয়েডে একমাত্র হায়দরাবাদের নবাবেরই অধিকার ছিল বিদেশে ব্যবসা করার।
ইতিহাস তাই বলে। একটু খোঁজাখুঁজি করলে সাপোর্টিং ডকুমেন্টস পাওয়া যেতে পারে।
এর মধ্যে একটা ছোট্ট করে তথ্য দিয়ে রাখি উনিশো সাত সালে মিঃ এ কে রায় নামে এক বাঙালী ভদ্রলোক এই অঞ্চলে ওভারসিয়র হিসাবে কাজ করতে এসেছিলেন। আদিবাসীদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে একটা সংগঠন তৈরি করেছিলেন।
এঁরা নবাবের সেনাদের কাছ থেকে আদিবাসীদের ন্যায্য দাবি দাওয়া আদায় করার জন্য লড়াই করতেন। ক্রমশঃ এরা ওই অঞ্চলে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। উনিশো একান্ন সালে সরকারের সঙ্গে নবাবের নিগোসিয়েশনে এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়।
ভারত স্বাধীন হলো, কিন্তু হায়দরাবাদের নবাব কিছুতেই ভারতের স্বাধীনতা মনে নিলেন না। তিনি মনে করতেন ভারতের মধ্যে হায়দরাবাদ একটা আলাদা স্টেট। উনিশো একষট্টি সালে জেনারেল চৌধুরী নবাববের প্রাইভেট আর্মিকে পরাজিত করে জায়গাটা অধিকার করেন।
কিন্তু ততদিনে এই সব সৈন্যরা মিনারেল মধু কি জিনিষ জেনে ফেলেছে। তারা জঙ্গলে আশ্রয় নিল। নবাবের আশ্রয়ে থেকে এই মিনারেল ব্যবসার ঘাঁতঘুঁত ভালো জেনে ফেলেছিলেন। ভেতরে ভেতরে তারা কাজ শুরু করে দিলেন।
আবার অত্যাচার অনাচার। তার ফল স্বরূপ ওই অঞ্চলে আবার বামপন্থী আন্দোলন সংগঠিত হলো। তৈরি হলো পিডব্লুজি। পিপলস ওয়ার গ্রুপ। এরা গেরিলা যুদ্ধ করতো। যাকে আর্মির ভাষায় বলা হয় পিচ। চানক্য, মাও দুজনেই এই ব্যাপারটা ভীষণ পছন্দ করতেন। এঁদের উত্তরণ এই পথ ধরেই। শিবাজীও তার ব্যতিক্রম নয়।
মিঃ রায়ের কিছু লোকজনও এবার এতে ভিড়ে গেলেন।
সামনে সংগঠন পেছনে রমরমিয়ে ব্যবসা।
কিছুদিন চলার পর সেটাও নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়ে গেল।
ব্যবসা কিন্তু থেমে থাকল না। ব্যবসা চলছে।
আবার এই অঞ্চলে একটা সংগঠন গজিয়ে উঠলো। নাম তার এমসিসি। মাওইস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার। তখন কমিউনিস্ট আন্দোলন ভারতে বেশ ভালো করে দানা বেঁধে উঠছে। সবাই মিলিজুলি সরকার। সেই এক ব্যাপার সামনে সংগঠন পেছনে মিনারেলের ব্যবসা। র মেটিরিয়ালস আদিবাসী। এত সস্তায় লেবার কোথায় পাওয়া যাবে। তাছাড়া তাদের মতো জঙ্গল চিনবেই বা কজন।
বেশ কিছুদিন রম রম করে চললো। এবার কিন্তু অনেকেরই চোখ ফুটে গেল। আবার নবাবের ফর্মুলা। ছোট ছোট সংগঠন গড়ে উঠলো এক একটা অঞ্চলে। সবাই কিন্তু বামপন্থী। উদ্দেশ্য একটাই মিনারেল ব্যবসা।
আজ তুমি শ্যামেদের যে সংগঠনটাকে নিষিদ্ধ বলছো এরা তারই বাই প্রডাক্ট।
একটু ভালো করে ভেবে বলতে পারবে কোন সালের কোন ডেটে এই সংগঠনটার জন্ম হয়েছিল। সঠিক বলতে পারবে না। আর চেষ্টা করলেও তুমি এদের জঙ্গল থেকে বাইরে বার করে এনে, সমাজের মূল শ্রোতে মেশাতে পারবে না। আজ এদের নিষিদ্ধ করেছ, কাল দেখবে আর একটা নামে এরা গজিয়ে উঠেছে।
এস ওয়াজেদ আলি, ভারতবর্ষ, সেই ট্র্যাডিসন সমানে চলিতেছে।
সারাটা ঘর নিস্তব্ধ। আমি উঠে দাঁড়ালাম। ধীর পায়ে টেবিলের কাছে গেলাম। ব্যাগ থেকে শ্যামের দেওয়া ছোটো ছোটো পুঁথির মতো সোনার বলগুলো হাতে নিলাম। আবার নিজের জায়গায় এসে বসলাম। মুঠো খুলতেই হাতের তালুতে রাখা বলগুলো ঝকমকিয়ে উঠলো। সবার চোখে বিষ্ময়।
অনিমেষদা আমর দিকে বিষ্ময়ে তাকিয়ে। প্রবীরদা, বিধানদার চোখ ছানাবড়া।
কি এ গুলো!
সোনার পুঁথি। নিখাদ। চব্বিশ ক্যারেট কিংবা তার বেশি। আমাদের কলকাতার কোনও সোনার দোকান এই ক্যারেটের সোনা দিতে পারবে না।
পেলাম কোথায়?
অনিমেষদার চোখে জিজ্ঞাসা।
সুবর্ণরেখায়।
এ্যাঁ।
এ্যাঁ না যা সত্যি তাই বলছি।
সুবর্ণরেখা নদীতে সোনা পাওয়া যায়। তাই জন্যই তো নদীর নাম সুবর্ণরেখা।
অনিমেষদা, ছোটোমার দিকে তাকাল।
এখন চা পাওয়া যাবে না। আগে শেষ হবে তারপর চা।
অনিমেষদা হাসছে।
সুবর্ণরেখা বেরিয়েছে ছোটনাগপুরের মালভূমি আঞ্চল থেকে।
তারপর মেদীনিপুরের ওপর দিয়ে আবার ওড়িষ্যাতে ঢুকেছে।
তারপর চাঁদিপুরের কাছে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।
নদী বয়ে গেছে ঝাড়খন্ড, ওড়িষ্যা এবং বেঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। ঠিক এই সব অঞ্চলেই দেখ এই নিষিদ্ধ সংগঠনের যতো রমরমা।
একসময় রাকামাইনস থেকে প্রচুর সোনা চুরি যেত। সুবর্ণরেখা রাকা মাইনসের একবারে পেটের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে। চুরি আটকাতে তৎকালীন বিহার সরকার চান্ডিল ড্যাম তৈরি করলো। লোকে জানলো সেচের কাজে বাঁধ বাঁধা হচ্ছে। কিন্তু সেটার থেকেও বড়ো কারণ মিনারেল মাফিয়াদের হাত থেকে রাকামাইনসকে বাঁচানো।
বছরের একটা টাইম সুবর্ণরেখার জল রাকামাইনসের সোনা ধুয়ে তার বুকে করে বয়ে নিয়ে আসে। তখন তার জল আর আকাশী রংয়ের থাকে না। তখন তার রং গাড় সোনালী বর্ণের। জলের রং দেখে এই অঞ্চলের আদিবাসীরা বলতে পারে এই জলে কতটা সোনা পাওয়া যাবে।
ছোটো থেকে বড়ো সবাই লেগে পরে সুবর্ণরেখার বালি ধরার কাজে। এটা তাদের রক্তে মিশে আছে। বাপ ঠাকুর্দার কাছ থেকে শেখা বিদ্যে। এই আদিবাসীদের কাজে লাগায় মিনারেল মাফিয়ারা। বলতে পারা যায় এই সব উটকো সংগঠন।
জল থেকে বালি তুলে আনে। তাকে শুকনো করে। কুলোয় যেমন চাল থেকে খুঁদ বাদ দেওয়া হয় ঠিক সেই ভাবে প্রসেসিং হয়।
তারপর এ্যাসিডে ফেললেই এ্যাসিডের ওপরে ভেসে ওঠে একটা পাতলা আস্তরণ তারপর আগুনে ফুঁ দিয়ে তৈরি হয় এই সব ছোট ছোট পুঁথির দানা।
বহু হাত ঘুরে তা চলে আসে কলকাতার স্বর্ণকারদের হাতে। কিছুটা চলে যায় বম্বেতে।
তারপর কতরকমের দামী দামী পাথর আছে। তার কোনও ইয়ত্তা নেই। শ্যাম, শিবু, দারু পাহাড়াদার আসল মাথাগুলোকে ধরো দেখি, তোমাদের কতো বড়ো বুকের পাটা।
আমি নিজে চোখে এই সব কাণ্ড কারখানা দেখে এসেছি। দেখবে লতায় পাতায় সব পার্লামেন্টের ঠাণ্ডা ঘরে বসে আছে।
এটা তোমাকে একটা উদাহরণ দিলাম। আরও আছে।
একবারে মুখ বুঁজে বসে থাকবি। যতক্ষণ আমি চা না নিয়ে আসি। ছোটোমা দৌড় লাগাল।
ইসি পেছন পেছন দৌড়লো।
মিত্রা, ছেলে, মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তিনজনের মুখেই এক অসীম পরিতৃপ্তির ছোঁয়া। মেয়ে মায়ের কাঁধে মাথা রেখেছে।
দাদা, ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকিয়ে।
দাদা অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে বললো।
বুঝলে অনিমেষ, ও পড়াশুনোটা বেশ মন দিয়েই করে। গল্পটা ও খারাপ বলে নি। আমিও একসময় এই ব্যাপারটা নিয়ে পড়াশুনো করেছিলাম। তারপর সময়ের অভাবে এগোতে পারিনি। আমরা পড়াশুনো করে তারপর বিষয়বস্তু দেখতে যাই। ও প্রথমে নিজের চোখে দেখে তারপর পড়াশুনো করে।
ছোটোমা ঘরে ঢুকলো। সঙ্গে চানাচুর নোনতা বিস্কুট।
দিদান আমি একটু খাব।
অনিসার কথায় ছোটোমা দাঁতমুখ খেঁচালো।
দাওনা।
তুই বাবার থেকে নিবি, বোচন মার থেকে নেবে।
দে-না একটু। বড়োমা বললো।
যা ও ঘর থেকে দুটো কাপ নিয়ে আয়।
অনিসা মায়ের কাছ থেকে উঠেই দৌড় মারলো।
সবাই সবার সঙ্গে কথা বলছে। চায়ে চুমুক দিলাম।
আচ্ছা অনি ঠিক ওই সব জায়গাতেই যে প্রেসিয়াস মিনারেল আছে তা জানা গেল কি করে?
ডাক্তারদাদার দিকে তাকালাম। হাসলাম।
সেখানেও গোলমাল আছে।
কি রকম!
অনেক খবর তোমরা সংবাদ পত্রে দেখ, কটা মনে রাখো? সেগুলো খবরই থেকে গেছে, তার ভেতরেও কোনওদিন ঢোকার ইচ্ছে তোমাদের হয়নি। মোদ্দা কথা নিজের গণ্ডির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা তোমরা কখনও করো নি। স্টিল টু ডে।
প্রবীরদা আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
মাঝে-মাঝেই আমরা কাগজে দেখি জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়ার একজন ওপরতলার অফিসার বেপাত্তা, কাগজ কলমে জানানো হয় মিনারেল মাফিয়া তাকে তুলে নিয়ে গেছে। কিংবা পন বন্দি করেছে। কয়েকদিন কাগজে কলমে খুব লেখা লিখি হলো। প্রশাসন নড়েচড়ে বসলো। খোঁজ খোঁজ রব পরে গেল। তারপর কাগজ সেই নিউজটা আর ফলোআপ করলো না। প্রশাসন ঘুমিয়ে পরলো। সেই অফিসারকেও সারা জীবনের জন্য আর খুঁজে পাওয়া গেল না। লোকটা মরে গেলো, না বেঁচে আছে তার হদিস আমরা কেউ কোনওদিন রাখলাম না।
নেতাজী, চৈতন্য বড়ো উদাহরণ।
তাঁদের জন্মদিন পালন হয়, মৃত্যু দিন পালন হয় না। কেন?
একটা দিন আসে নিউজটা ডেড নিউজে পরিণত হয়।
ভাবছো কেন বলছি।
আমার গল্পের সত্যতা যাচাই করার ইচ্ছে থাকলে একটু পড়াশুনো করে নিও।
প্ল্যাটিনাম পৃথিবীর সবচেয়ে প্রেসিয়াস মেটাল। এটা একটা বাচ্চা ছেলেও জানে। আমাদের দেশে কোথায় কোথায় প্ল্যাটিনাম আছে আর কোথায় আয়রণ ওর আছে, এটা কারা জানবে? যারা জিওলজিস্ট তারা। এটা একটা বাচ্চা ছেলেও বলে দিতে পারে। তারাই তো খনন কার্য করে সঠিক রিপোর্টটা সরকারের কাছে পৌঁছে দেবে। সরকারের মন্ত্রী আমলারা জিওলোজিস্ট নয়।
মজার ব্যাপার দেখ আমাদের দেশের জিওলজিস্টরা বেপাত্তা হয়ে যায়। খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি তাদের পরিবারকেও না। কেন বলো?
বেশ কয়েক দশেক আগে এক বিদেশীরাষ্ট্র সরকারে কাছে আবেদন করলো, আমাদের কিছু আয়রণ ওর দরকার। আমাদের দেশে পথে ঘাটে আয়রণ ওর পরে আছে। এই রাষ্ট্রের সঙ্গে ওই রাষ্ট্রের দরপত্র নিয়ে দরকষাকষি হলো। দাম ঠিক হলো। চুক্তি পত্র পর্যন্ত সাইন হলো।
এবার সেই বিদেশী রাষ্ট্রকে কয়েকটি জায়গা দেখানো হলো। তারা বেছে বেছে একটা জায়গা পছন্দ করলো। সরকার দেখলো হ্যাঁ ওখান থেকে সেই বিদেশী রাষ্ট্রকে আয়রণ ওর তোলার অনুমতি দেওয়া যেতেই পারে।
দেশের সম্পদ বিদেশে রপ্তানি করছি। রাজকোষ ফুলে ফেঁপে উঠছে। অসুবিধে কি?
যাক সেই দেশ উত্তরপূর্ব ভারতের কোনও এক বন্দর থেকে জাহাজ বোঝাই করে সেই র-আয়রণ ওর তাদের দেশে নিয়ে যেতে শুরু করলো। দেশের লেবাররাই কাজ করছে।
আমাদের দেশে কিছু সৎ মানুষ এখনও আছে। বিশেষ করে আদিবাসী সম্প্রদায়ে। এক আদিবাসী মালবাহী মাল লোড করতে গিয়ে দেখলো। আরে এতে তো আয়রণ ওরের সঙ্গে প্ল্যাটিনাম মিশে আছে। সে ওই অঞ্চলের লোক একজন জিওলজিস্টের থেকে তার চোখের ধার এবং ভার অনেক বেশি। কথাটা জানা জানি হলো। সংবাদ ওপর তলায় চলে গেলো। খননকার্য বন্ধ হলো।
যাচাই করে দেখা গেলো, সেই লেবার মিথ্যে বলে নি। এবার খোঁজ খোঁজ পরে গেল সার্ভে রিপোর্টের, রিপোর্টে দেখা গেলো ওখানে আয়রণ ওরই একমাত্র পাওয়া যাবে আর কোনও মিনারেলের নাম গন্ধ নেই। তাহলে প্ল্যাটিনাম এলো কোথা থেকে। এবার সেই জিওলজিস্ট টিমের খোঁজ পরলো। যাঁরা এই খনন কার্য করে রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন।
একজন জিওলজিস্টকেও শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেল না। কিন্তু হিসেব করে দেখা গেল সরকারী খাতায় তাদের যা বয়স তাদের চাকরি করার কথা। আরও খোঁজ খবর করা হলো।
আরও পরে জানা গেলো। তারা কেউ দশ বছর আগে কেউ এগারো বছর আগে মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে তাদের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।
অনেক খোঁজা খুঁজি করে তাদের পরিবারকেও পাওয়া গেল না।
তাহলে ব্যাপারটা কি হলো? জিওলোজিস্টরা জানতো না, না তারা জেনেশুনে ভুল রিপোর্ট দিয়েছিল? তার হদিস কিন্তু এখনও ফাইল বন্দি হয়ে আছে। ওই সব ফাইল সরকারী কোল্ড স্টোরেজে চলে যায়। সেখান থেকে আর বেরোয় না। সব ধামাচাপা।
নিষিদ্ধ বস্তুর দিকে আমার নজর একটু বেশি থাকে। খোঁজ চালিয়ে গেলাম। শেষ মেষ জানতে পারলাম সেই মহামান্য জিওলোজিস্টরা অরিজিন্যাল রিপোর্টটা যেই দেশ ওখান থেকে আয়রণ ওর তুলে নিয়ে তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছিল, তাদের কাছে বিক্রী করেছিলেন। খোঁজ খবর করলে জানা যাবে হয়তো সেই দেশে সেই সব জিওলজিস্টরা বহাল তবিয়েতে বেঁচেও আছেন।
দেখ আমাদের দেশে কিন্তু র-মেটিরিয়ালস থেকে প্রসেস করে আয়রণ বার করে নিজের দেশে নিয়ে যেতে পারতো, তা কিন্তু তারা করলো না। ধরা পরে গেলে আর কাঁচা মালটাই পাওয়া যাবে না। তার থেকে নিজের দেশে জাহাজে করে নিয়ে চল।
আরও মজার ব্যাপার কি জানো। ওটা আয়রন ওরের মাইনই ছিল না।
বেশির ভাগটাই ছিলো প্ল্যাটিনামের। ধরো সেভেন্টি থার্টি।
কিন্তু যে আদিবাসীর জন্য এতো বড়ো একটা অঘটনের হাত থেকে আমাদের দেশ বাঁচলো। তার নাম কজন জানে। নাম কিনেছে ওই বিটের অফিসার। তার হয়তো প্রমোশন হয়েছে। সরকারী বদানুকুল্যে নিজেদের হয়তো একটু বেশি মাত্রায় গুছিয়ে নিয়েছে। আর সেই সাঁওতাল? ইঁদুর পোড়া দিয়ে দিব্যি পান্তা খাচ্ছে। এতে কিন্তু সেই আদিবাসী পুরুষের এতটুকু পৌরষত্ব কমে নি। সে বহাল তবিয়তে আছে। মাঝখান থেকে আমরা ব্যাটাদের গলায় নিষিদ্ধ সংগঠনের তকমা ঝুলিয়ে দিয়েছি।
অনিমেষদার দিকে তাকালাম। মিটি মিটি হাসছে।
আমিও একটা বিটকেল হাসি ঝারলাম। অনিমেষদা হাত তুললো কানটা ধরার জন্য।
বিধানদা হাসতে হাসতে বললো, অনিমেষ অনি যা বললো তা গল্প, এটা ঠিক। শেষের ঘটনাটা তুমি আমি দুজনেই জানি।
প্রথমের গল্পটা কিন্তু সিরিয়ালের মতো। এখনকার বেশির ভাগ সিরিয়ালেই দেখতে পাবে প্রথমেই লেখা থাকে এই সিরিয়ালের সব চরিত্র কাল্পনিক। অনেকটা সেইরকম।
তবে কাল্পনিক হলেও ওর গল্পের মধ্যে যথেষ্ট সত্য লুকিয়ে আছে।
অনুপদা, রূপায়ণদা ঘরে ঢুকলো।
সব্বনাশ! এ তো বিরাট আসর। ঢুকতে ঢুকতে অনুপদা বলে উঠলো।
ইস অনুপ তুই কি মিশ করলি। প্রবীরদা বললো।
কেন!
নেমন্তন্ন খাওয়া শেষ। এখন খালি পান দেওয়া বাকি।
অনুপদা-রূপায়ণদা, প্রবীরদা আর মিত্রার মাঝখানে এসে আমার মুখের সোজাসুজি বসলো।
ব্যাপারটা কি বিধানদা, জম্পেশ আড্ডা। বাড়ির সব লোক এই ঘরে। অনুপদা বললো।
রতনের দিকে তাকাল।
রতন, বাবা গাড়িতে খাবারগুলো আছে একটু ধরা ধরি করে নামা। চিকনা একলা পারবে না।
আমার দিকে তাকাল।
কি অনিবাবু শরীর-টরীর সব ঠিক আছে?
ঠিক আছে মানে একেবারে টং টং করছে। প্রবীরদা বললো।
তাহলে ওরকম বুড়োদের মতো জবুথবু হয়ে বসে আছে।
গ্রামের ছেলে না।
মিত্রা খুব জোড়ে হেসে উঠলো।
হাসি একটা রোগ। পেছন থেকে ইসলামভাই, ইকবালভাইও হেসে উঠলো।
সুতপা তোমার ছেলের কীর্তিকলাপ কিছু বুঝছো। মাথায় কিছু ঢুকছে।
অনিমেষদা আমার কাঁধে হাত রাখলো।
অনুপদা, প্রবীরদার দিকে হেলে পরেছে, প্রবীরদা ফিস ফিস করে কি যেন বলছে।
আমি এতক্ষণ ওর গল্প শুনছি আর ভাবছি। ও সত্যি আঠারোটা বছর বিদেশে ছিল, না বিদেশের গল্প দিয়ে দেশেই থেকেছে। অনিমেষদা কেমন স্বগতোক্তির ঢঙে বললো।
ডাক্তারদা কেমন যেন নড়েচড়ে বসলো।
অনিমেষদা ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
কি ডাক্তারবাবু আমার এ্যাজামসানটা কি ভুল?
ভালো পয়েন্ট ধরেছো, ব্যাপারটা এতদিন একবারে মাথায় আসে নি। আজ কিন্তু ওর গল্প শোনার পর নতুন করে ভাবতে ইচ্ছে করছে।
দেখুন গত আঠারো বছরে ও অনেক গল্প লিখেছে। খুব সুকৌশলে সব কাজগুলো উদ্ধার করেছে। এমনকি ওর সাঙ্গপাঙ্গরাও জানে ও ওদের সঙ্গেই আছে। তাহলে এতোসব ও জানল কি করে—একদিনে নিশ্চই নয়। ইট উইল টেক টাইম। বাইরে থাকলে এই সময় ও পেলো কি করে—আর শ্যামেদের ব্যাপারটা দশ-এগারো বছরের পুরনো। তাহলে?
কিরে অনি, দাদা কি বলে? ছোটোমা চোখ মুখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকাল।
যার মনে প্রশ্নের আবির্ভাব হয়েছে তাকে জিজ্ঞাসা করো। আমি কি করে জানবো।
বৌদি এবার হেসে উঠলো।
আচ্ছা কনিষ্ক তোরা এতো কিছু জানিস? তোরাও তো বহুবার ওখানে গেছিস। এখনও মাঝে মধ্যে যাস। অনিমেষদা বললো।
বিন্দু বিসর্গও জানি না। ওর পাল্লায় পরে ডাক্তারি করতে যেতাম। রুগী দেখতাম, ওষুধ দিতাম। এখনও সময় পেলে তাই করি। পকেটে স্যামপেল ওষুধ নিয়ে যাই।
কখনও মনে প্রশ্ন আসে নি?
কে উত্তর দেবে? শ্যাম! একটাই কথা তুরা ভদ্রলোক আছিস কনিষ্কদা, কেনে আমাদের কথা জানতে চাস। আমরা ছোটোলোক আছে।
আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
নীরুকে জিজ্ঞাসা করুণ। আমাদের সঙ্গে শ্যাম সব সময় একটা ডিসটেন্স তৈরি করে চলতো, কিন্তু কখনও কোনও অসম্মান হয় এটা করতো না।
এককথায় আমরা হচ্ছি অতিথি। অনি ওদের ঘরের লোক। হাঁড়ির খবর পর্যন্ত অনিকে দেওয়া যায়। তাতে কোনও অসুবিধে নেই। নীরু বললো।
আমাদের খাওয়া শোয়ার জন্য অন্য ব্যবস্থা, অনির জন্য অন্য। এমন বহুদিন গেছে। আমরা নিকোনো মাটির ঘরে আরাম করে শুয়েছি। অনি ওদের সঙ্গে মাঠে ঘাটে সারারাত কাটিয়েছে। কনিষ্ক বললো।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
বিধানবাবু।
আমার কিছু বলার নেই অনিমেষ।
অনিমেষদা আমার দিকে একটু হেলে পরলো।
আস্তে করে বললো, অমূল্যকে বাঁচিয়ে রেখেছি।
অনিমেষদার দিকে তাকালাম। চোখে হাসি মুখ ভাবলেশহীন।
আমার মুখের জিওগ্রাফি যে সামান্য হলেও পরিবর্তন হলো সেটা অনিমেষদা ধরতে পেরেছে।
মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম।
বৌদির সঙ্গে চোখা-চুখি হতে দেখলাম বৌদি ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে।
আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। অনুপদা, প্রবীরদা চাপাস্বরে কথা বলছে।
অনুপদা, কি খাবার আনলে?
আমার কথা শুনে অনুপদা আমার দিকে তাকাল।
পোলাও, মাংস, মিষ্টি।
অনিসা ওপরের দিকে হাত ছুঁড়লো, ওআও।
ওটা আবার কি রে! ছোটোমা বললো।
রাতের খাওয়াটা বেশ জমিয়ে হবে কি বলো মা।
মিত্রা মেয়ের রকম-সকম দেখে হাসছে। অনন্যর চোখ আমার মুখের ওপর।
সুতপা একটু চা খাওয়াবে। এতক্ষণ ওর ভাষণ শুনেই সময় কেটে গেল। কাজের কাজ কিছু হলো না। অনিমেষদা, বৌদির দিকে তাকিয়ে বললো।
ভজু ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকলো।
অনিদা অনিদা পুলিশ এসেছে। রতনদার সঙ্গে বাগানে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
অর্কর দিকে তাকালাম।
তুমি বসো, আমি দেখছি।
অর্ক, সুমন্ত বেরিয়ে গেল।
অনিমেষদা আমার দিকে ঘুরে তাকাল।
প্রবীরদা, অনুপদা, রূপায়ণদার ভ্রু-সামান্য কুঁচকেগেছে।
আবার কি গণ্ডগোল পাকালি!
আমি কেন পাকাব, পাকালে তোমরা পাকাবে।
ইসলামভাই, ইকবালভাই ঘরের বাইরে গিয়ে থমকে দাঁড়াল।
ওসি সাহেব অর্ক, সুমন্তর সঙ্গে ঘরের চৌকাঠে এসে দাঁড়াল।
স্যার।
একটা স্যালুট মারলো।
আমি তাকিয়ে ভালো করে ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করলাম।
অনিমেষদা তাকিয়ে আছে।
ভেতরে আসুন।
উনি জুতো খুলে ভেতরে এলেন।
একটা চিঠি আছে স্যার।
দিন।
উনি ওনার হাতের ফাইল থেকে খামটা আমার হাতে দিলেন। দাঁড়িয়ে রইলেন।
অর্ক একটা চেয়ার এনে ওনাকে বসতে দে।
অর্ক যাওয়ার আগেই ভজু চেয়ার নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
আমি খামটা খুলতেই অনিমেষদা ঝুঁকে পরলো।
আমি অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে উল্টদিকে হেলে পরলাম।
ব্যক্তিগত চিঠি, তোমার দেখা উচিত নয়।
অনিমেষদা, ওসি সাহেব হাসছেন। ঘরের আর সবার মুখভঙ্গি একই পর্যায়ে।
দেব না একটা থাপ্পর। অনিমেষদা বললো।
সব সময় এরকম মারপিট করলে চলে।
প্রবীরদারা হাসছে।
আমি আড়াল করেই চিঠিটা বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। ওসি সাহেবের দিকে তাকালাম।
আপনার লোকরা এখন থেকে এখানে থাকবেন?
হ্যাঁ, স্যার।
আপনিও থাকবেন?
হ্যাঁ, স্যার।
ওয়ার্লেসে ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিন।
আচ্ছা স্যার।
কজন আছেন আপনারা?
পনেরোজন মতো আছি স্যার।
ঠিক আছে আপনি রেডি হোন, তারপর আপনার সঙ্গে কথা বলছি।
ওসি সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। আমি আসছি স্যার—
মাথা দোলালাম।
আমি কথা বলছি ঠিক কিন্তু সকলের মুখের চেহারা লক্ষ করছি। কারুর মুখের চেহারাই ঠিক নেই। সবার মনেই একটা কু-ভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ব্যাপারটা এরকম।
আবার কি হলো?
অর্ক, সুমন্ত আমার দিকে তাকিয়ে। বোঝার চেষ্টা, ব্যাপারটা কি?
চিঠিটা দেখি, কি লেখা আছে। বৌদি হাত বাড়াল।
ব্যক্তিগত পত্র, দেখতে নেই।
উঠে গিয়ে কানটা মুলেদাও, দেখবে সরসর করে দিয়ে দেবে। সুরো বলে উঠলো।
আমি সুরোর দিকে তাকালাম। তারপর বৌদির দিকে।
সকালের আলুরদম কিছু অবশিষ্ট আছে।
চলবে —————————
from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/9rJQ4Ho
via BanglaChoti
Comments
Post a Comment