কাজলদিঘী (১০৪ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১০৪ নং কিস্তি
—————————

এবার মেয়ে ট্রে-টা টেবিলে রেখে দরজা খুললো।

একগাল হাসি।

তুমি সবার শেষে এলে।

অংশু ভেতরে এলো। আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো।

কখন এলে?

দাঁড়াও এখন গিলছি পরে কথা বলছি।

অংশু তার শ্বশুর, শ্বাশুড়ীকে প্রণাম করে আর সবাইকে প্রণাম করলো।

তাই বলি অনিদা কাকে বললো, গিলছি। সুরো রান্নাঘর থেকে মুখ বার করলো।

আমি একটা ফিচলেমি হাসি হাসলাম।

সুরো দাঁত কিড়মিড় করলো।

আর গোটা কয়েক দিয়ে যা। আর একটু তরকারি।

তুমি রেডি হয়ে নাও বার বার দিতে পারবো না। সুরো, অংশুর দিকে তাকাল।

অংশু হাসছে।

সুরো একটা প্লেটে করে নিয়ে এলো। সকলের মুখ চলছে। সুরোর ছেলেটা আমার কোলের মধ্যে ঢুকে একটু একটু করে লুচি ছিঁড়ে খাচ্ছে।

সকলে ওর দিকে তাকায় মুচকি মুচকি হাসে।

ও তোকে কিছুতেই ছারবে না বুঝলি অনি। অনিমেষদা বললো।

আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি ওকে জড়িয়ে ধরেছিলাম বলে ওর তাকানোটা তো দেখ নি।

সবাই হাসছে।

সকালে কি তরকারি হয়েছিল?

কেন, সেটাও খেতে হবে?

দিলে একটু ভালো হতো।

ফ্রিজে ইলিশমাছ পরে আছে কয়েকটা। ঠান্ডা।

একটু ঝোল আর আলু নিয়ে আয়। মাছ খাবো না।

সুরো একবার আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে, কোমর দুলিয়ে চলে গেল।

নেপলা কি কি মিষ্টি এনেছিস। অনিমেষদা বললো।

পাতে পড়ুক বুঝতে পারবে। আমি বললাম।

সুতপা। অনিমেষদা খেতে খেতে ডাকলো।

বৌদি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

কি হলো।

তোমার ছেলেকে কয়েকটা মিষ্টি এনে দাও।

কেন!

ও যেভাবে রাজধানী এক্সপ্রেস চালাচ্ছে।

বৌদি হেসে রান্নাঘরে চলে গেল।

সুরো একটু ইলিশমাছের ঝোল আর আলু দিয়ে গেল।

একটা লুচি দিয়ে মুখে তুলেই চেঁচিয়ে উঠলাম, সুরো।

আবার কি হলো।

কে বানিয়েছে রে?

মা।

হতেই পারে না। বুঝেছি মাছটাকেই নষ্ট করে দিয়েছিস।

সুরো ট্রেতে করে মিষ্টির প্লেট নিয়ে বাইরে এলো। সবাইকে দিল।

খাওয়া শেষ করে কোঁত কোঁত করে একগ্লাস জল খেয়ে, থালাটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

শান্তি। অনুপদা তাকাল।

হ্যাঁ।

আমি রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম।

দেখলাম তিনজনেরই মুখ চলছে। প্লেটটা রেখে হাত ধুলাম।

এবার একটু গরম চা, তাহলেই ষোলকলা পূর্ণ। রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বললাম।

মিত্রা মুখ নাড়াতে নাড়াতেই হাসলো।

আমি বড়ো ঘরের সোফায় এসে বসলাম।

ঘরটার কোনও পরিবর্তন হয়নি। আগের মতোই আছে। অনিমেষদা এই একটা জায়গায় সারাজীবন সাধারণ থেকে গেল। কোনও বিলাসিতা নেই। চাইলে রাজপ্রাসাদ বানিয়ে ফেলতে পারতো। অন্যান্য নেতারা কেউ যে বানায়নি তা নয়। অনিমেষদা কখনই তা চায়নি। বরং মাঝে মাঝে আক্ষেপ করেছে ঘনিষ্ঠ জনের কাছে।

ঘরের যেখানে যেমন ছিল ঠিক তেমনি আছে। কোনও পরিবর্তন নেই। নিশ্চই সুরোরা এলে পাশের ঘরটায় থাকে।

দুটো ঘর, একটা ড্রইং কাম ডাইনিং রুম, রান্নাঘর, বাথরুম।

ড্রেসিন টেবিলের ওপর অনিমেষদা বৌদির ছাত্রাবস্থায় তোলা ছবিটার দিকে চোখ পড়ে গেল। এখনও ঠিক তেমন আছে যেমন দেখেছিলাম। তখন বৌদিকে সত্যি দেখতে বেশ সুন্দর ছিল। তবে বড্ড রোগা। বৌদিরা থাকতো বাঁশদ্রোণীর ওখানে জয়হিন্দ কলোনীতে। পার্টিতে হাতেখরি কলেজ জীবনে। তারপর ধীরে ধীরে এই জায়গায়। কেউ বলতে পারবে না বৌদি পার্টির দৌলতে কলেজে প্রফেসারিতে ঢুকেছে। নিজের যথেষ্ট যোগ্যতা ছিল। যোগ্যতার জোড়েই কলেজে চাকরি।

ফ্রেমে বাঁধানো ছবিগুলো কেমন যেন একটু লালচে হয়ে গেছে।

অনিমেষদারা একে একে ভেতরে এলো।

কিরে একা একা বসে করি কাঠ গুনছিস নাকি? প্রবীরদা বললো।

না। বসে আছি।

কখন বেরিয়েছিস বাড়ি থেকে? অনিমেষদা বললো।

সাড়ে দশটা এগারটা হবে।

এতক্ষণ কোথায় ছিলি!

একটু অফিসে গেছিলাম। তারপর ইকবালভাইয়ের মসজিদে, তারপর তোমার এখানে।

অনিমেষদা, বিধানদা সোফায় আমার দু-পাশে বসলো। ওরা চারজন খাটে। মাঝখানে ছোট্ট সেন্টার টেবিল।

কাল আমরা চলে এলাম। ওখানকার পজিশন? অনুপদা বললো।

ব্যাঙ্কের কিছু ঝামেলা ছিল, ওগুলো মেটালাম। এসপি সুকান্তকে পাঠিয়েছিল। ওকে….।

কেন! অনিমেষদা বললো।

যা হয় আর কি—

ফেরার সময় তোর সঙ্গে দেখা করে নি?

করেছে।

অনাদি বলছিলো, কেশ উইথড্র করে নেবে—

ও বললে আমি মানব কেন—

কেন ঝামেলায় যাচ্ছিস। একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং চাইছে, করে নে।

তুমি কি এরইমধ্যে সব সেরে ফেলেছো?

এই তুই উল্টো চাপ দিতে শুরু করলি।

অনুপদা, রূপায়ণদা ফিক ফিক করছে।

নিরঞ্জনদা—

বল—

সকাল থেকে কোথায় ছিলে? বাড়িতে দেখতে পেলাম না।

পার্টির একটু কাজ ছিল।

তুমি তো পার্টি ছেড়ে দিয়েছ।

অনিমেষবাবু দিলেন।

তোমার বনের এক্স-হাজবেন্ড কি বলছে?

আমার সঙ্গে দেখাই হয়নি।

পকেট থেকে সুমন্তর দেওয়া চিরকুটটা বার করলাম। অনিমেষদা, বিধানদা আমার দিকে তাকিয়ে।

সকলা দশটা পঁয়ত্রিশ তুমি রাইটার্সে গেছিলে। ওখান থেকে বেরিয়ে লালাবাজারে এসেছো এগারোটা পঁয়তাল্লিশ, তারপর ওখান থেকে তুমি নিজাম প্যালেসে পৌঁছেছো একটা পনেরো… বাকিগুলো বললাম না, পাঁচটা কুড়ি তুমি পার্টি অফিসে ঢুকেছো।

সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। বৌদি, মিত্রা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো।

শুরু করে দিয়েছিস। বৌদি বললো।

চুপ করে রইলাম।

আমি কাগজটা ভাঁজ করে প্যান্টের পকেটে রাখলাম। অনিমেষদা অবাক হয়ে আমাকে দেখছে।

তোমার সঙ্গে তোমার বোনের এক্স হাজব্যান্ড ছিল। বর্তমানে যিনি স্বরাষ্ট্রদপ্তরের সচিব।

তুই অনিমেষবাবুকে জিজ্ঞাসা কর।

তুমি পার্টির কাজে গেছিলে, না অন্য কাজে গেছিলে?

অনিমেষদা বৌদিকে ইশারা করলো বেড়িয়ে যেতে। আমার চোখ এড়াল না।

তোমাকে পর্শুদিন কলকাতায় আসতে বলেছিলাম, কেন বলেছিলম?

নিরঞ্জনদা চুপ করে রইলো।

অনুপদা।

বল।

তোমাদের সবার কাছে আমি কিছু জিনিস জানতে চাই। একটু বলবে।

আমি জানি তুই কি জানতে চাইবি। পাস্ট ইজ পাস্ট। একটা ধাক্কা দরকার ছিল খেয়েছি। এবার শুধরে নেওয়ার সুযোগ এসেছে।

ওকে বলতে দাও না অনুপ। বিধানদা বললো।

আমি জানি বিধানদা ও কি বলতে চায়। যাদেরকে ও আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছিল কেন তারা আমাদের বিরোধী হলো। কিরে তাই তো?

আমি অনুপদার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তুই ফিরে আসার পর তোকে নিয়ে আমি, রূপায়ণ অনেক হোম ওয়ার্ক করেছি। দুজনের মধ্যে চূড়ান্ত আলোচনা হয়েছে। তুই আমাদের থেকে অনেক ছোটো, তবু বলতে দ্বিধা করছি না, কোনও কোনও ক্ষেত্র তোর ম্যাচুরিটি এবং কনটাক্ট আমাদের থেকে অনেক স্ট্রং। তুই আগে ঘর সামলাস তারপর বাইরেটায় হাত দিস, আমরা ঘর না সামলে বড্ডবেশি বাইরের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম।

অনুপদা থামলো।

বিধানদা, অনিমেষদা সোফার ওপর একটা পা মুড়ে বসলো।

শ্যামের ব্যাপারটায় আমার দোষ ছিল।

সেটা আমি বিধানদা অনিমেষদার কাছে স্বীকার করে নিয়েছি। ঠিক মতো নার্সিং করতে পারি নি। অনাদির ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা।

কি রকম?

নিরঞ্জনদা যে ব্যাপরগুলো বলেছিল, সেগুলো আমরা মানতে পারিনি। বিধানদার কানে বহুবার তুলেছি। তুই জিজ্ঞাসা করতে পারিস।

এখানে কি তোমাদের মধ্যে কোনও ইগোক্লাস ছিল।

ছিল। তাই ধপাস করে পড়ে গেছি। সবাই যদি রাজা হতে চায় তাহলে কি করে হয়।

অনুপদার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।

তুই প্রবীরকে জিজ্ঞাসা করে দেখ, আমি যখন প্রতিবাদ করেছি, প্রবীর তখন থাবাড়ি দিয়েছে।

কেন?

সেটা তুই প্রবীরকে জিজ্ঞাসা কর। আমি সেদিনই প্রবীরকে বলেছি, অনি কিন্তু চুপচাপ সব দেখে যাচ্ছে। ওর অনেক প্রশ্ন, তার উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি হ। ও কি করবে না করবে সেটা পরের ব্যাপার। আগে ও নিজে সব জানবে, ভালোকরে বুঝবে, তারপর হাত দেবে।

আমি প্রবীরদার দিকে তাকালাম, প্রবীরদা মাথা নীচু করলো।

অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

নিরঞ্জনদাকে তুমি পাঠিয়েছিলে?

হ্যাঁ।

কি জন্য বলো।

কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে চাই।

ওই কাঁটার জোড় নেই।

সেটা নিরঞ্জনবাবুর মুখ থেকে সব শোনার পর বুঝলাম।

তোমার এখনও ঘোলাজলে মাছ ধরার অভ্যাসটা গেল না। চিরটাকাল এই একটা স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে না।

বিধানদা হেসে উঠলো।

তোমার মতো একজন পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ এই ভুলগুলো করবে কেন?

একটু থামলাম।

তোমার জায়গায় আমি থাকলে অনাদি অনেক দিন আগে খরচের খাতায় চলে যেত, এতদূর এগোতে পারতো না। পায়রা যদি বেশি ছটফট করে তাহলে তার ডানায় সুতো বেঁধে ছেড়ে রাখতে হয়, দেখবে সে আর উড়তে পারছে না। শুধু পাখনা দুটো কনটিনিউ নাড়িয়ে যাবে।

অনুপদা মিটি মিটি হাসছে।

তুই তো দেবাকে এখনও রেখে দিয়েছিস। অনিমেষদা বললো।

ঠিক। খাইয়ে পড়িয়ে বাঁচিয়ে রেখেছি। কেন বলো?

অনিমেষদা আমার মুখের দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে।

দেবা যখন চারাপোনা ছিল, তখন ওকে একবার বড়সিতে ধরেছিলাম। তারপর বড়সির কাঁটাটা ছাড়াতে গিয়ে ইচ্ছে করে ওর ঠোঁটটা ছিঁড়ে দিয়ে পুকুরে ছেড়ে দিলাম। তারপর আর অনেক দিন পুকুরের ধারে যাইনি। হঠাৎ একদিন পুকুরের ধারে গেলাম দেখলাম দেবা বেশ বড়ো পাকা রুই বনেগেছে। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে জল তোলপাড় করে ফেলছে।  এবার পুকুরে কাঁটা হীন বড়সি ফেলি আর ভালো ভালো খাবার দিই। দেবা শুধু খায় আর পালিয়ে যায়। মহা আনন্দ, একদিন দামি দামি খাবার লাগিয়ে বেশি কাঁটা দিয়ে বড়সি আড়লাম, দেবা ধরা পড়ে গেল। এখন পুকুর থেকে তুলে এনে একটা বড়ো চৌবাচ্চায় রেখেছি। কি হবে? পুকুরের পকা রুই কি চৌব্বাচায় বাঁচে, আস্তে আস্তে মরে যাবে।

বিধানদা জোরে হেসে উঠলো, সবাই হাসছে। অনিমেষদা মুচকি মুচকি হাসছে।

এটা আমার থিওরি। তোমারটা বলো।

সুতপা। অনিমেষদা চেঁচালো।

বৌদিকে ডাকছো কেন?

তোর কীর্তি কলাপগুলো ওর জানা দরকার। আমার থেকে ওর বেশি ইন্টারেস্ট।

তাতে কি তোমাকে আমি ছেড়েদেব ভেবেছো। আমার হিসাবটা আমাকে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে হবে।

প্রবীরদা, অনুপদা, রূপায়ণদা হেসেই চলেছে। নিরঞ্জনদা হাসছে তবে জোড়ে নয়।

বৌদি ঘরে ঢুকলো।

আরি বাবা, খুব হাসিহাসি চলছে।

অনি যা ডায়লগ দিল। রূপায়ণদা বললো।

কেন!

দাদার কাছ থেকে শুনে নাও।

ওদের একটু চা করতে বলো, আর তুমি একটু বসো। অনিমেষদা হাসতে হাসতে বললো।

কেন?

এমনি।

শিখণ্ডি দাঁড় করাচ্ছ?

বৌদি হাসছে।

তোমাকে সেদিন একটা গল্প শুনিয়েছে, আজ আমাদের সবাইকে এখুনি আর একটা গল্প শোনাল, স্টক প্রচুর বুঝলে।

বৌদিকে গল্প শুনিয়েছে মানে। অনুপদা বললো।

বিধানদা হাসছে, অনিমেষদার চোখে মুখে স্নেহ ঝড়ে পরছে।

সুতপা তোমাদের পরে বলবে।

বিধানদা জানে?

আমাকে আর বিধানবাবুকে বলেছে।

বৌদি পর্দা সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। আবার ফিরে এলো।

অনাদির ব্যাপারটা তুই কি ফাইন্যাল করলি। অনিমেষদা তাকালো।

এখনও কিছু ভাবি নি। তবে অনাদির এতটা উত্তরণের পেছেনে কে? সেটা তামাদের কাছে জানতে চাইছি। না বললে ঠিক খুঁজে নেব।

জটিল প্রশ্ন।

কেন?

প্রথম ভুলটা নিরঞ্জনবাবু করেছিল। আমি সেটাকে এক্সকিউজ করে দিয়েছিলাম।

কার কথায়?

কারুর কথা না শুনে নিজের একার ডিসিশনে।

অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে।

তারপরের ভুলটা প্রবীর করেছিল, তখন ও ওই ডিস্ট্রিক্টটের দায়িত্বে ছিল। ভুলটা যখন ধরা পড়লো তখন অনাদি পিছলে বেড়িয়ে গেছে। ওই ডিস্ট্রিক্টের আরও কিছু লোক ওকে সাপোর্ট করলো। তারপরেই ও ধরাকে সড়াজ্ঞান করতে আরম্ভ করলো।

দু-বার সুযোগ দিলাম, তারপর এক্সপেল করলাম।

তখন ইলেকসন সামনে চলে এসেছে। ও নতুন দল গড়লো।

খবর নিয়ে জানতে পারলাম তোর সমস্ত ব্যাপারটা ও ভাঙিয়ে খেয়ে ফেলেছে। কিছু আর অবশিষ্ট নেই। জনসাধারণের মধ্যেও ওর একটা ক্লিন ইমেজ তৈরি করে ফেলেছে। এককথায় বলতে পারিস পাইয়ে দেবার রাজনীতি।

একচুয়েলি সংগঠনটা ও খুব ভালো বুঝেগেছিল। তারপর এ্যান্টি এস্টাব্লিশমেন্ট। যদিও ওটা তোর কাছ থেকে পাওয়া। তারপর পাওয়ার একবার হাতে এসেগেলে যা হয়।

অমূল্য দলে রয়ে গেল ওকে এক্সপেল করলে?

ওটা নিরঞ্জনবাবু যেমন আমাদের রিপোর্ট দিয়েছিল। তাছাড়া সেই সময় অনাদির থেকেও অমূল্যর সাংগঠনিক ক্ষমতা খাতায় কলমে বেশি ছিল, তবে অনাদি ভেতর ভেতর ব্যাঙ্কটাকে কাজে লাগাল। সাধারণ মানুষ ওর দিকে ঢলে পরলো।

ব্যাঙ্ক ওর নয়, এটা তুমি ভালো করে জানতে। আর রাতারাতি এই সব ঘটে নি সময় লেগেছে। তোমরা খোঁজ খবর নাও নি কেন?

তখন একের পর এক এতো ঝামেলা, ঠিক মতো মাথা ঘামাতে পারিনি। ভেবেছিলাম ইসলামটা ঠিক চালিয়ে নেবে। ফেল মেরে গেল। নিজের পকেট থেকে শুধু টাকা ঢেলেই গেল।

চিকনাকে কাজে লাগাও নি কেন?

এই একটা মস্ত বড়ো ভুল বলতে পারিস। সেটা আমরা পার্টির কোর কমিটির মিটিংয়ে রিয়েলাইজ করেছিলাম।

অমূল্য, অনাদির নামে মিথ্যে ব্লেম দিয়েছে?

আমি জানি তুই ঠিক কোন জায়গাটা ধরে এগতে চাইছিস।

তুমি অমূল্যের কেশটা আমাকে ক্লিয়ার করো।

অনুপ সেটা আমাকে বলেছিল।

কিন্তু অমূল্য যেহেতু প্রবীরদার লোক ছিল তাই তুমি কিছু বলো নি। এতে প্রবীরদার সঙ্গে অনুপদার ইগোর লড়াই তৈরি হয়েছিল।

মানুষ মাত্রেই ভুল হয়।

বিধানদা তখন আপনি কি করছিলেন?

সেই সময় আমার হার্টের ব্লকেজ ধরা পরলো। সামন্তকে জিজ্ঞাসা করিস। তোর নার্সিংহোমে তিনমাস শুয়ে ছিলাম। অনুপ এসে আমাকে বলেছে। আমি অনিমেষকে আলাদাভাবে বলেছিলাম। হেঁপি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।

প্রবীরদা তুমি অনাদিকে দেখেছ, তোমার এই ভুলটা হলো কেন?

তুই যদি সেই সময় উপস্থিত থাকতিস তুইও হয়তো ভুল করতিস। কেউ অনাদির হয়ে একটা কথা বলে নি। অমূল্য সেই সময় দেবাকে কাজে লাগিয়েছিল। অনেক পরে অবশ্য সেটা বুঝেছিলাম।

অমূল্য এখন অনাদির সঙ্গে ভিড়েছে।

এইবার তোর ওখানে গিয়ে সেটা উদ্ধার করলাম।

কেন আগে জানোনি?

এখনও নিরঞ্জনদাকে ওই ডিস্ট্রিক্ট সম্বন্ধে আমরা ট্রাস্ট করি। নিরঞ্জনদা হাতের তালুর মতো জেলেটাকে চেনে।

তারপর।….

ধীরে ধীরে আলোচনা প্রায় দু-ঘণ্টা গড়ালো। তুমুল তর্ক বিতর্ক। বৌদি শুধু বসে শুনে গেল। একটা কথারও কোনও উত্তর দিল না। আমি উঠে দাঁড়ালাম।

তোমরা তোমাদের কাজ করো, আমার কাজ আমাকে করতে দাও।

সে তুই কর। আপত্তি নেই। আমরা আস্তে আস্তে তোর নিউজটাকে হাতিয়ার করছি। এটা মাথায় রাখিস। মাঝপথে যেন ডোবাস না। আর একটা কথা।

অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

তোর অনেক টাকা। পার্টি ফান্ডে কিছু ডোনেট কর।

বৌদি হেসে উঠলো।

ঘরের বাইরে এলাম।

পাশের ঘরে খুব হই হুল্লোড় চলছে। আমি পর্দা সরিয়ে উঁকি মারলাম।

নেপলা উঠে এলো।

কথা হয়ে গেছে?

একটু বাকি আছে।

সেরে নাও।

অনিমেষদা একটা কথা বলছিল।

আবিদ এসে দাঁড়াল।

ও শোনা হয়ে গেছে। প্রবীরদারা তোমার ওখানেই বলেছে। রতনদা কিছুটা জোগাড় করেছে। কিছুটা বাকি আছে।

অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

আমি এখন ধার করে চলছি। এরা এখন বিজনেস ম্যাগনেট।

এই শুরু করে দিলে….। নেপলা চেঁচামিচি শুরু করে দিল।

যতোটা হয়েছে রতনকে বল কালকে পৌঁছে দিতে।

তোমাকে ভাবতে হবে না। ওটা রতনদার দায়িত্ব।

সবাই একে একে উঠে এলো।

সুরো বন্ধু কোথায়?

ঘুমিয়ে পড়েছে।

অংশু।

অংশু আমার মুখের দিকে তাকাল।

তোমার সঙ্গে আজও কথা বলা হলো না।

অংশু হাসছে।

মন্ত্রী আমলা হয়ে গেছি, কি করবে বলো।

তার থেকেও বেশি। সুরো বললো।

বকিস না।

আমি ঘরে গিয়ে একবার খাটের দিকে তাকালাম। পাশ বালিশটা জড়িয়ে ধরে সুরোর ছেলেটা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। মাথায় একবার হাত রাখলাম।

ঘরের বাইরে এলাম।

ওরা কথা বলছে।

অনির এখন অনেক পরিবর্তন তাই না মিত্রা। বৌদি বললো।

অনির পরিবর্তন হয়েছে। বুবুনের হয় নি।

তুই তো বেশ ভালো বললি। রূপায়ণদা বললো।

আমার এক্সপ্রেসনটা তোমাদের বললাম, তোমাদের এক্সপ্রেসন কি বলতে পারব না।

বৌদি যেটা বললো।

অনি এখন অনেক ধীর স্থির, কথা বলার থেকে শোনে বেশি….।

আমি বৌদির দিকে তাকালাম।

তাকাস না। তোর সামনে তোর গুণ গাইছি না, পেছনেও গাই।

আমি তোমাকে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলতে বলি নি।

একটুও বাড়িয়ে বলছি না। তোর বুকের ভেতরটা অনেক কাছ থেকে দেখলাম।

বৌদিকে জড়িয়ে ধরলাম। অনুপদাদের দিকে তাকালাম।

আসি, কিছু নতুন খবর এলে দিও।

তোরটা কতটা গোছালি জানাস।

দেখতে পাবে।

অনিমেষদারাও সবাই নিচে এলো। অনুপদারা যার যার নিজের নিজের দিকে রওনা হলো, আমরা বাড়ির দিকে।

মেয়ে সারাটা রাস্তা কিচির মিচির করলো। কোনওটার উত্তর দিয়েছি। বেশির ভাগ সময়টা চুপ করে থেকেছি।

আবিদ শুভকে নামিয়ে দিয়ে যাব।

আমি একা চলে যেতে পারবো।

আমি জানি তুমি এখন প্রাপ্তবয়স্ক।

অনিসা হেসে ফেললো।

হলো, এবার আর বলবি।

শুভ চুপ করে রইলো।

বাবা দেখলি তোকে বকলো না কিছুই বললো না। কিন্তু এমন একটা কথা বললো….।

তুই চুপ করবি। শুভ খেঁকিয়ে উঠলো।

কেন করবো রে। তোকে কে বলতে বলেছিল।

মিত্রার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

আবিদ তোর ওখান থেকে জলের বোতলটা দে।

আবিদ গাড়ি চালাতে চালাতে দিল।

কাল সকালে রতনদা তোমার কাছে আসবে।

কেন কোনও সমস্যা।

না। পরবর্তী প্ল্যান একটা করে রেখেছে, তোমার সঙ্গে বসে সেটেল করবে।

সাগির, অবতার কোথায় বলতো, সকাল থেকে একবারও ফোন করলো না।

ভয়ে।

কেন।

তুমি যদি গালাগাল করো।

আবার কি করলো।

সকালটা রতনদার সঙ্গে ছিলো। তারপর লক্ষীকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আকাশের পাখী হয়ে গেল। শুধু উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।

কথাটা তুই আমাকে বলেছিস, এটা ওদের কানে তুলে দিবি।

নেপলা পেছন ফিরে তাকাল।

আমি বলে দিয়েছি। তাই আর ফোন করে নি।

শুভর বাড়ির সামনে এলাম।

শুভ নামলো।

আপনি যাবেন না?

দাদুকে বলবে আমি ঠিক সময়ে চলে আসবো।

আচ্ছা।

আবিদ গাড়ি ছাড়লো, শুভ হাত নাড়লো।

শুভর বাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে ঢুকতে মিনিট পাঁচেক সময় লাগলো।

বাইরের ঘরে এসে বড়োমাকে মুখটা একবার দেখিয়েই নিজের ঘরে এলাম। টান মেরে পাঞ্জাবীটা খুলে ফেললাম। কাঁধে টাওয়েলটা ফেলে বাথরুমে ঢুকলাম। বাথরুমের কাজ সেরে মুখ-হাত-পা ভালো করে ধুয়ে বাইরে এলাম।

মিত্রা এরইমধ্যে চেঞ্জ করে ফেলেছে।

হাসলাম।

তুই সত্যি মেয়েছেলে।

প্রমাণ চাস ব্যাটাছেলে কিনা?

না। অনেক প্রমাণ দিয়েছিস আর দিতে হবে না।

সেই অফিসে তোর বাথরুমে ঢুকেছিলাম। তারপর বাড়িতে এসে। একচ্যুয়েলি কি জানিস, নিজের জিনিষটা মন মতো ব্যাবহার করতে পারি।

বুঝেছি। লেকচার কম মেরে পাজামা-পাঞ্জাবী লাগা। দাদা তোর জন্য হাঁ করে বসে আছে। কখন অনি ও ঘরে ঢুকবে।

কেন!

অফিসে কি সব ঝড় তুলে দিয়ে এসেছিস। সবাই দাদাকে ফোন করেছে।

আবার কি ঝড় তুললাম, তুই তো ছিলি!

তোর প্রেজেন্ট হওয়াটাই একটা ঝড়।

পাজামা, পাঞ্জাবী গলালাম।

আজ রাতে কিন্তু ঠেসে ঘুম মারবো, কোনও গল্পটল্প নয়।

দিদিভাই ফোন করেছিল। কাল সকালে আসবে।

কথা বলতে পারবো না। দেখলি তো সকলকে ডেকেছি।

তোর রকম সকম দেখে পিকু ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে, বরুণদা বলেছে ওসব কম্ম আমার নয়। মালিক হতে গেলে কিছু দায়ভার বহন করতে হবে, না হলে ছেড়ে দিতে হবে। পিকু এক কথায় রাজি হয়ে গেছে। ছেড়ে দেবে। মাকে সাউকিরি মেনেছে। জ্যেঠিমনিও পাত্তা দেয়নি।

কালকের কথা কালকে ভাবা যাবে। তোরা সবাই মিলে আমাকে ছিবড়ে বানিয়ে দিবি।

আমাকে বলছিস কেন। বিতান, বড়োমাকে ফোন করেছে। তুমি আমাকে বাঁচাও পিসি। কাল অনিদা মিটিং কল করেছে। নির্ঘাৎ কপালে দুঃখ আছে।

মিলিরা কিছু বলে নি?

ওরা ঘা খেয়ে খেয়ে প্রুফ হয়ে গেছে। তুই এতো সব খবর পেলি কোথা থেকে?

চুপ করে থাকলাম।

তুই তো অনিমেষদাদের সঙ্গে মিটিং নিয়ে ব্যস্ত ছিলি। আমার মোবাইল থেমে থাকে নি। প্রতি মুহূর্তে বিজি ছিল।

যাক আমার জন্য তোর একটা কাজ বারলো। মিত্রা আমার আদলগায়ে নাক ঘসছে।

ওটা আবার কি হচ্ছে।

তোর গা দিয়ে বুনো বুনো গন্ধ ছাড়ছে। একটু পাউডার মাখ।

মিত্রার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলাম।

পাঞ্জাবীর বোতামটা লাগিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলাম।

এ ঘরে এসে ঢুকলাম। দাদা, মল্লিকদা, বড়োমা বড়ো সোফায় আয়েস করে বসে। ছোটোমা রান্নাঘরে। আমি একটা দখল করে বসলাম।

বড়োমা আমার দিকে তাকিয়ে।

ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছো কেনো?

চা খাবি?

বাবাঃ এ তো মেঘ না চাইতে জল, দাদা বলেছে বুঝি ?

হ্যাঁ। বড়োমার চোখে হাসি।

তাহলে হাফ কাপ।

ছোট শুনলি বাবুর কথা।

শুনেছি।

মল্লিকদা হাসছে।

তুই নাকি আমার চাকরি নট করে দিয়ে এসেছিস। মল্লিকদা বললো।

শুধু তোমার নয়, দাদারও। বয়স হয়েছে এখন শুধু রেস্ট। সময় সুযোগ পেলে এদিকে সেদিকে ঘুরতে যাওয়া।

কে নিয়ে যাবে?

কেন, আমি নিয়ে যাব।

ছোটোমা চা নিয়ে এলো। সেন্টার টেবিলে ট্রে-টা নামিয়ে রেখে বললো।

তোর সময় হবে?

খুব হবে।

তাহলে ভালোই হলো, কি বলো দিদি।

দাদা চায়ে চুমুক দিল।

আজ অনেকদিন পর অফিসে গেলি, কি বল?

বুঝলাম ভূমিকা শুরু হয়ে গেল।

হুঁম।

অনেক বদলে গেছে।

মাথা দোলালাম।

আমার ঘরটা কিন্তু যেমন ছিল তেমনি রেখেছি।

আমি ভূমিকা বাড়তে দিলাম না।

তোমার ঘরে ঢোকা হয়নি। কাল ঢুকবো। ইচ্ছে আছে তোমার ঘরে বসেই মিটিংটা করবো।

আমি ছাড়া আমার ঘরে বসে কোনও মিটিং-ফিটিং হবে না।

তুমিও থাকবে।

তাহলে হবে।

ছোটোমা হেসে ফেললো।

দাদাকে তুই আর এগোতেই দিলি না। মল্লিকদা ফুট কাটলো।

আমি হাসছি।

অনিসারা একে একে ঘরে ঢুকলো। গোল হয়ে ঘিরে বসে গেলো।

ডাক্তারদাদাকে দেখতে পাচ্ছি না।

এসে পরবে। অপেক্ষা কর। দাদা বেশ মেজাজে কথা বললো।

সকাল বেলা তিনজনে মিলে কোথায় গেছিলে?

তুই সব বলিস। 

মনে মনে যা ভেবেছো এখন ওসব করতে যেও না।

কি ভেবেছি তুই বল।

বয়স হয়েছে সম্পত্তিগুলোর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এই তো?

তুই সব বুঝে গেছিস।

বুঝি নি, বোঝার চেষ্টা করছি।

কি করে বুঝলি?

ডাক্তারদাদার বয়স হয়েছে, তোমার হয় নি।

বড়ো শুনছো, একেবারে পাকা মাথা।

তোমার পাল্লায় পড়ে।

কেন আমি কি করলুম শুনি।

অনেক কিছু করেছো, সব খবর রাখি বুঝলে।

ওমনি একটা ঢিল ছুঁড়লি। লাগে তাক না লাগে তুক।

কাপটা সেন্টার টেবিলে নামিয়ে রাখলাম। বড়োমার দিকে তাকালাম।

ভাইপো কি বলছে?

আমায় কিছু বলে নি।

তার মানে কিছু একটা বলেছে।

মা একবার ডাক্তারদাদাইকে ডাক।

বাড়িতে নেই কাজে গেছে, এখুনি চলে আসবে। বড়োমা কট কট করে উঠলো।

হুঁম বুঝেছি খুব জটিল অবস্থা।

একবারে বিজ্ঞদের মতো কথা বলবি না। বড়োমা বললো।

মা ওই ঘর থেকে আমার ফোনটা নিয়ে আয়।

অনিসা উঠে গেল।

সারাদিন কোথায় কোথায় গেলি?

ছোটোমা আমার পাশে এসে বসলো।

কেন খবর পাও নি?

তোর মুখ থেকে শুনি।

বললাম।

দিদির কাছে মাছ খাস নি কেন? ছোটোমা বললো।

অনেক দিন না খাওয়ার ফল, একটু সময় দাও, ঠিক হয়ে যাবে।

আমি রাতে তোর জন্য পাবদা মাছের ঝোল করেছি।

খাব।

না না খোস মেজাজে আছে…. তোরা বৃথা টেনশন করছিস….ধর কথা বল।

মিত্রা আমার ফোনে কথা বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো। পেছনে অনিসা।

কে?

বিতান।

কি হয়েছে?

এখনও অফিসে বসে কাগজ পত্র ঘাঁটছে, রেডি হয় নি।

কথা বলবো না, বাড়ি চলে যেতে বল।

দাদার কথা শুনলি। এবার চলে যা।….ঠিক আছে।

তুই অফিস শুদ্ধু সবাইকে টেনশনে ফেলে দিয়েছিস। দাদা বললো।

তোমাকেও?

দাদা হে হে করে হেসে উঠলো।

মিত্রা ফোনটা আমার হাতে দিল।

আমি হামাংশুকে ডায়াল করলাম। রিং বাজলো।

কোথায় রে, গাড়ির আওয়াজ পাচ্ছি?

এই তো ইসলামভাই আর ডাক্তারদাদাকে ছেড়ে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছি।

তোর সঙ্গে আছে না বেরিয়ে এসেছে?

কিছুক্ষণ আগে ছেড়েছি।

কালকে তোকে একবার দুপুরের দিকে আসতে হতে পারে।

বুঝেছি। চলে আসবো।

যা বাড়ি যা।

ফোনটা বন্ধ করে বড়োমার দিকে তাকালাম।

ডাক্তারদাদা, ইসলামভাই এখুনি এসে পরবে, খাওয়ার ব্যবস্থা করো।

তুই কি করে জানলি?

যে ভাবে জানা যায়।

ও হিমাংশুকে ফোন করলো। বুঝলে না। দাদা বললো।

শুনলে।

জানলি কি করে ডাক্তার হিমাংশুর ওখানে গেছে।

হিমাংশু দুপুরে একবার কথায় কথায় হাই তুলেছিল। তিনজন এসেছিল। জাস্ট অঙ্কটা এক্স ধরে মিলিয়ে দিলাম। বীজগণিত।

ঘরের সকলে হো হো করে হেসে উঠলো।

সকালে মিত্রার ঠেলায় ঘুম ভাঙলো।

কিরে ওঠ সবাই চলে এসেছে।

আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম।

আগে ডাকিসনি কেন।

অতো রাত পর্যন্ত কি সব পড়াশুনো করলি। তাই ভাবলাম সবাই আসুক, ডাকব।

কটা বাজে বল।

পৌনে আটটা।

কারা এসেছে?

দিদিভাইরা।

সন্দীপরা আসে নি?

ফোন করেছিল, সবে মাত্র বাড়ি থেকে বেরোল।

তুই এখানে মিটিং করবি, অফিসে মিটিং করবি, ভেবেছিসটা কি।

সক্কাল সক্কাল ধমকাস নি।

মিত্রা আমার কথা শুনে হেসে ফেললো।

এই মিটিংটা অফিসে করা যেত না। তাই ওদের বাড়িতে ডাকলাম। কেনরে বড়োমা কিছু বলছে?

প্রত্যেকেই তোকে নিয়ে একটু সময় কাটাতে চায়।

আমার কপালে এইসব নেই বুঝলি।

এইসব এবার ছাড়।

চুপ করে রইলাম।

তোর স্নান হয়েগেছে?

অনেকক্ষণ।

তুই এখন ওই লালপাড় তসরের শাড়ি, লাল ব্লাউজ, মাথায় বড়ো করে লালটিপ পরে ঠাকুর পূজো করিস না?

হুঁ করি।

কখন!

সাড়ে ছটা থেকে সাতটা।

পায়ে নুপুর পরিস।

মিত্রা ছোট্ট মেয়ের মতো শব্দ করে হেসে উঠলো। আঠারো বছর আগের সেই হাসিটা চোখে লেগে আছে। ঠিক অতটা মিল খুঁজে পেলাম না। হসির শব্দটা মিলে গেল।

সে বয়েস কি আছে। ছেলে মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে।

মেয়কে প্র্যাক্টিশ করা।

সময়ে হবে। ওরা কি তোর মিত্রার মতো। কোনও প্রকারে কপালে হাতের তালুটা ঠেকিয়ে দিয়ে প্রণাম সারে। ওখানে সবাই তোর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করছিল বলে কি হাসাহাসি।

সত্যি কেমন বদলে গেলাম না। বরং ওই দিনগুলো ভালো ছিল। ধ্যুস কেন যে তোকে বিয়ে করতে গেলাম।

মিত্রা হাসছে।

বিছানা থেকে নামলাম।

মিত্রার মুখো মুখি দাঁড়ালাম। দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে করলো, পারলাম না।

একটু পেছন ঘুরে দাঁড়া।

কেন বলবি তো?

ঘোর না।

মিত্রা ঘুড়ে দাঁড়ালো।

তোর চুলগুলো আগের থেকে ছোটো হয়ে গেছে। যত্ন নিস না।

আচ্ছা সব কি তুই আঠারো বছর আগের মতো পাবি।

কেন পাব না।

তুই কি আঠারো বছর আগের মতো আছিস।

অবশ্যই আছি।

সামান্য হলেও গায়ে মাংস গজিয়েছে। সে খেয়াল আছে।

কখনই না।

বললেই হলো। আঠারো বছর আগের ছবি আর এখনকার ছবি মিলিয়ে দেখ।

চুলটা উঠতে দে। তারপর খচা খচ ছবি তুলে মিলিয়ে দেখবো।

টাওয়েলটা কাঁধে নিয়ে বাথরুমে চলে গেলাম। ফিরে এসে দেখলাম। ঘর টিপ টপ। বিছানার এক কোনে আমার পাজামা পাঞ্জাবী রাখা, ঘরের দরজাটা সামান্য ভেজান। আমি রেডি হলাম। টেবিলের ওপর ফাইল পত্র অগোছালো ভাবে ছড়ানো ছিটানো ছিলো। একবার কাগজপত্রগুলো দেখে নিয়ে গুছিয়ে রাখলাম। ঘরের দরজাটা হাট হয়ে খুলে গেল।

তোর এখনও হয় নি! ওখানে দাঁড়িয়ে কি খুচুর খুচুর করছিস।

ফিরে তাকালাম। মিত্রা, ইসি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

ফাইলগুলো গোছাছিলাম।

বড়োমা এখনও তোর জন্য চা খায় নি।

যাচ্ছি।

যাচ্ছি না, এখুনি চল।

ইসি হাসছে।

দেখছিস তোর বোনের অবস্থা।

ফাইলগুলো গুছিয়ে ওদের সঙ্গে বেরিয়ে এলাম।

মোটামুটি সকলেই উপস্থিত। পিকুবাবুর মুখটা গম্ভীর গম্ভীর। বরুণদা আমায় দেখে হাসছে।

কি সাহেব সারাদিনের প্রস্তুতি নিয়ে নিলে।

আমি গিয়ে সোফাতে বড়োমার পাশে বসলাম।

বড়োমা একবার আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকাল। ডাক্তারদাদা হাসছে, বললো—।

ছোটবাবু এলেন এবার একটু চা হোক।

ছোটোমা একবার রান্নাঘর থেকে উঁকি মেরে বললো—

কচুরী খাবি।

কম করে।

কেন তোর ভাগের যতগুলো আছে নে। যতটা পারবি খাবি। মিত্রা বললো।

ডাক্তারদাদা একবার মিত্রার দিকে তাকাল।

কাল অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশুনো করেছিস শুনলাম। আমার লেখাটা লিখলি? দাদা বললো।

লিখেছি।

বড়োমা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। আমি বড়োমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

কেন ঝামেলা বাড়াচ্ছ, প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু ডিমাণ্ড আছে।

মিত্রার দিকে তাকিয়ে কথাটা বললাম।

মিত্রা মুখ নীচু করে নিল। মিটি মিটি হাসছে।

ছোটোমা কচুরী নিয়ে এলো।

খাওয়া কথাবার্তা হাসাহাসি চলছে। গেটের মুখে এসে নেপলা, আবিদ, সাগির, অবতার, রতন এসে দাঁড়াল।

হঠাৎ মুখের অবস্থানের পরিবর্তন হলো। ওরা সেটা বুঝতে পারলো।

আয় ভেতরে আয়।

পাঁচজনে ভেতরে এলো। ভজু খেতে খেতে উঠে দাঁড়ালো।

তুই খা, আমরা চেয়ার নিয়ে নিচ্ছি। আবিদ বললো।

ভজু আবার বসে পরলো।

আমি প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে দিলাম। গোটা তিনেক খেয়েছি। আর ভালো লাগলো না।

ছোটোমা এবার চা দাও।

আর দুটো খা।

ভালো লাগছে না।

ছোটোমা রান্নাঘর থকে ওদের খবার এনে দিলো। আমার প্লেট এখন মেয়ের হাতে চলে গেছে।

নেপলা একটা কাজ করবি।

বলো।

দশটা টাইমস অফ ইণ্ডিয়া কিনে আন।

খেয়ে নিই তারপর যাচ্ছি।

তাই কর।

আমি যাব অনিদা। ভজু চেঁচালো।

পারবি।

পারবো।

নেপলার কাছ থেকে পয়সা নিয়ে নে।

টাইমস অফ ইণ্ডিয়া নিয়ে কি করবি। দাদা তাকাল আমার দিকে।

দরকার আছে।

তোর মতি গতি বোঝা মুস্কিল।

পিকু টেরিয়ে টেরিয়ে আমার দিকে দেখছে।

আমি উঠে গিয়ে বেসিনে হাত ধুলাম। টাওয়েলে মুখটা মুছে ঘুরে দাঁড়াতেই অবতার জড়িয়ে ধরলো।

ভুল হয়ে গেছে আর হবে না। ফার্স্ট এন্ড লাস্ট চান্স।

সাগিরও উঠে এসেছে। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে।

নেপলারা খেতে খেতে মুচকি মুচকি হাসছে।

সবাই এবার ঘুরে তাকিয়েছে।

নেপলা ছাড়া তোদের দুটোকে আমি কোনও কাজে লাগাই নি? দুবাইতে বসে তোদের এখানে কি কি কাজ আছে তা চক আউট করে দিয়েছি।

ইসলামভাই এবার সারা শরীর কাঁপিয়ে হেসে উঠলো।

ভাইদা একবারে হাসবে না। সাগির তাকাল।

হাসবো না। তোরা শক্তের ভক্ত। নরমের যম।

তুমি বিশ্বাস করো, আমি করেছি। রতনদাকে নেমেই সব বলেছি। অবতার বললো।

তার কি রেজাল্ট হয়েছে জানিয়েছিস।

রতনদা কোনও কথা বলেনি।

রতন কেন বলবে, রতনের পেছন পেছন ঘুরে কাজটা করার দায়িত্ব তোর। রতন না পারে আবিদ আছে, ইকবালভাই আছে, ইসলামভাই আছে। আর কি চাস।

ভাইদা, ইকবালভাইকে বলিনি।

কেন। ডাকাতি করতে যাচ্ছিস।

অবতার আমাকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে রইলো।

লক্ষ্মী কাল চলে গেছে, ওমনি নাচা নাচি শুরু হয়ে গেছে। তোরা….।

সাগির আমার মুখ চেপে ধরলো।

বলেছি না, আর হবে না।

বাহাত্তর ঘণ্টা সময় দিলাম। তার মধ্যে কি কি আপডেট হলো জানাবি। আমি শনিবার দেশে যাবো। মাথায় রাখবি।

রতন হাসছে।

ওমনি কেশটা খাইয়ে দিলে। সাগির, রতনের দিকে তাকাল।

হিমাংশুর সঙ্গে বসেছিলি?

এদিকে রেডি না করে বসি কি করে।

কাগজপত্রগুলো তৈরি করেছিস?

হিমাংশুদা পরে যেতে বলেছে। সাগির বললো।

গেছিলি?

সাগির চুপ করে রইলো।

আমি গিয়ে আবার নিজের জায়গায় বসলাম। দেখলাম ভজু কাগজ নিয়ে এসেছে।

আমার হাতে দিল। আমি একটা নিয়ে ন-নম্বর পাতাটা খুলে দেখলাম। হ্যাঁ আমি যা বলেছিলাম মৈনাক সেই ভাবেই লেখাটা ছেপেছে।

সুন্দরের দিকে তাকালাম।

তোমার লেখা বেরিয়েছে। সকলকে কপি দাও।

সুন্দর লাফিয়ে আমার কাছে চলে এলো। আমাকে জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘোসেই মিত্রার কাছে গিয়ে জাপ্টে ধরে ওকে কোলে তুলে নিয়ে একপাক ঘুরে নিলো।

ওরে ছাড় ছাড় এখুনি পড়ে মরবো।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/Y1rplT7
via BanglaChoti

Comments