কাজলদিঘী (১১৬ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১১৬ নং কিস্তি
—————————

মামনি তোর আরও দুটো ছেলেমেয়ে বারলো।

ইসলামভাই মিত্রার দিকে তাকাল।

মিত্রা একটু অবাক হয়ে গেছে, চোখে মুখে তার প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট।

একথা বলছো কেন।

একটু অপেক্ষা কর সব জানতে পারবি।

বড়োমা খিদে পেয়েছে।

ইসলামভাইয়ের দিকে তাকালাম।

তোমাদের স্নান হয়ে গেছে?

সব সেরেই বেরিয়েছিলাম।

তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও দুপুরের দিকে আমার একজন গেস্ট আসতে পারে আলাপ করিয়ে দেব।

আর কত ছলনা করবি বল।

হাসলাম।

রতন, আবিদ, নেপলা, চিকনা ঘরে ঢুকলো। দরজা থেকে আমাকে সোফায় বসে থাকতে দেখে নেপলা ছুটে এলো। পায়ের কাছে বসে পরে কোলে মুখ গুঁজলো।

সুরোর ছেলে মিলির মেয়ে হাসছে।

আঙ্কেল শুরশুরি লাগছে।

ওদের কথার ছিরিতে রতনরা হাসছে।

শরীর ঠিক আছে? রতন বললো।

এখন ঠিক আছে।

আবার বিগড়বে?

হতে পারে।

মুন্না তোরা এখন বসবি। ছোটোমা কাছে এসে বললো।

ছোটোমা, অনন্য বাড়িতে।

হ্যাঁ। তুই আসার একটু পরে এসেছে। দাদাকে স্নান করাচ্ছিল।

অনিসা।

ওপরে আছে। নামছে।

কনিষ্কদেরে দেখতে পাচ্ছি না।

ওপরে আছে, আসছে।

নেপলা এবার ওঠ। আমি ঠিক আছি। একমাত্র তুইই আমাকে বিপদে ফেলতে পারিস। আর কেউ পারবে না।

নেপলা মুখ তুললো। চোখের কোল চিক চিক করছে।

কেন বলছি? একটু ভাব।

তারপর ওর মাথার বাবরি চুলটা ঘেঁটে দিলাম।

ধৈর্য হারাবি না। ধৈর্যের সঙ্গে ঠিকমত যুদ্ধ করতে পারলেই জিতে যাবি।

কি করবো সবাই মিলে যদি চেপে ধরে।

নেপলা আবার মুখ নীচু করলো।

সহ্য করতে না পারলে ওখান থেকে নিজেকে আস্তে করে সরিয়ে নিবি। তারপর ভোঁ ভাঁ।

সকাল থেকে এতো দৌড়ঝাঁপ করলি, খুঁজে পেলি।

ভাইদাকে বলো। আমি যেতে চাই নি। বার বার বলেছি যার কাজ তাকে করতে দাও, তোমাদের থেকে তার চিন্তা অনেক বেশি।

রতন, আবিদও অমনি নাচতে শুরু করলো।

আবিদদা করে নি, রতনদা করেছে।

গো-মুর্খ সব।

বাচ্চাগুলো কোলে গোঁতাগুঁতি করছে।

কিরে তোরা ঘুমবি না?

মাথা দোলাচ্ছে।

মা আবার পিঠে গুম গুম।

মারবে না।

চিকনা আমার মোবাইলগুলো তোর কাছে না?

ঘরে রেখে এসেছি।

সাদাটা একটু নিয়ে আয়।

চিকনা বেরিয়ে গেল।

বোচন দাদাকে ধরে ধরে ঘর থেকে নিয়ে এলো।

ছেলেটা একেবারে ঘেমে নেয়ে গেছে। আমি বাচ্চা দুটোকে কোল থেকে নামিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

বোস তোকে উঠতে হবে না।

অনন্য দাদাকে ধরে চেয়ারে বসালো।

বড়ো, ডাক্তার কোথায় গেল?

আসছে।

এবার খাবার দাও।

আমি একদৃষ্টে দাদাকে লক্ষ্য করছিলাম, শিশুর মতো ব্যাবহার করছে। একেবারে ইনোসেন্ট।

বার বার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। এই টেবিলটায় কতো স্মৃতি লুকিয়ে আছে। দাদা বড়োমার খুনসুটি, আমি বড়োমা, ছোটোমার মাঝখানে বসে খাচ্ছি। এবাড়িতে মিত্রার প্রথমদিন আসার সেই স্মৃতি, এক টেবিলে বসে সবাই খেলাম। সেই শুরু….আরও কতো কি।

তুই বসবি তো?

বড়োমার কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম।

তুই তোর দাদা আর ডাক্তার বসে যা। পরে ওরা সবাই বসবে।

বুঝলাম ডাক্তারদাদা এখন দাদার খেতে বসার সঙ্গী। হয়তো আরও কেউ কেউ বসে….।

দাদা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। ডান চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে আসছে।

ইচ্ছে না থাকলেও দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ বললাম।

তারমানে এই টেবিলটায় আর কোনওদিন সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া হবে না। দাদা ডানহাতটা ঠিক মতো নাড়া-চাড়া করতে পারে না। তাহলে কি দাদাকে কেউ খাইয়ে দেয়, না দাদা বাঁহাতে চামচ দিয়ে খায়।

ডাক্তারদাদা এলো, তাকেও খুব একটা সতেজ মনে হচ্ছে না। বেশ নড়বড়ে। বড়োমা তিনজনের খাবার টেবিলে এনে রাখলো।

আমি যা যা বলেছিলাম একেবারে ঠিক সেই সেই খাবারই তৈরি হয়েছে। একটু আগে খুব খিদে পেয়েছিল, এখন কিছুই আর খেতে ইচ্ছে করছে না।

নীরু ঘরে ঢুকলো।

কি বে-আক্কেলে ছেলে তুই।

নীরুর কথাটা শুনে খুব রাগ হচ্ছিল, সামলে নিলাম।

কয়েকটা ট্যাবলেট হাতে গুঁজে দিয়ে বললো, এগুলো খেতে হবে না।

বাধ্য ছেলের মতো জল দিয়ে গিললাম।

চিকনা ফোনটা এনে আমার হাতে দিল। পকেটে রেখে দিলাম।

আমার খাবার থালার চারপাশে বাটির মেলা। দেখে নিজেরই হাসি পেলো। বড়োমারা যেন আমাকে জামাই আদর করছে। আমি একটা কথাও মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলাম না। অনিসা ঢুকে দাদার পাশে দাঁড়াল।

দুদুন মেখে দিই।

আমি পারবো। জিভের আড়ষ্টতা এখনও ভাঙেনি।

দাদা চামচে দিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ভাতটা মাখার চেষ্টা করছে। ঠিক মতো পারছে না। অনিসা একটুখানি ভাত মেখে এক জায়াগয় জড়ো করে দিল। মাছটা বেছে দিল। আমাকে যা খাবার দেওয়া হয়েছে। দাদাকে তা দেওয়া হয় নি। দাদার খাবর সম্পূর্ণ আলাদা।

দাদা একটা কথাও বলছে না। অনিসা চামচে করে মুখের সামনে এগিয়ে দিচ্ছে। শিশু পাখীকে তার মা যেমন ঠোঁট দিয়ে খাওয়ায়, শিশুটা যেমন সব সময় হাঁ করে থাকে, দাদাও ঠিক তাই।

বুঝলাম ডাক্তারদাদা খেতে খেতে আমাকে লক্ষ্য করছে।

একটু খেতেই আমার পেটটা কেমন যেন ভরেগেল। কিছুতেই খেতে পারছি না। ভাত নিয়ে শুধু নাড়াচাড়া করে চলেছি।

বান্ধবী। ডাক্তারদাদা ডাকলো।

বলো।

অনিকে দুটো ট্যাংরা দাও। ওতো কিছুই খাচ্ছে না।

না এখন থাক, রাতে খাব।

একিরে! তোকে যেমন ভাত দিয়েছিলাম তেমনই পরে আছে। বড়োমা কাছে এগিয়ে এল।

যতোটা পারলাম খেলাম, বাকিটা ওরা খেয়ে নেবে।

চিংড়িমাছটা খা।

মিলির মেয়ে আর সুরোর ছেলে খাবে।

তোর জন্য ওরা এতো কষ্ট করে রান্না করলো।

দেখো আমি সব একটু একটু খেয়েছি। বেশি বেশি খাওয়ার অভ্যাসটা নষ্ট হয়ে গেছে। একটু সময় দাও, দেখবে আবার আগের মতো খেতে শুরু করবো।

সুতপা এতো কষ্ট করে তোর জন্য আলুর দম করলো।

একটা গোটা আলু খেয়েছি। আর ভালো লাগছে না।

বড়োমা আজ কেন জানি না কোনও জোড় করলো না।

শেষ-মেষ অনিসা দাদাকে চামচে ছেড়ে হাতে করে খাইয়ে দিতে শুরু করলো। দাদাও পরম পরিতৃপ্ত সহকারে খাচ্ছে।

এ দৃশ্য আমি যেন কিছুতেই দেখতে পারছি না। কখনও কল্পনা করতে পারি নি, আমাকে এই দৃশ্য দেখতে হবে।

ডাক্তারদাদা তোমরা খাও, আমি উঠলাম।

নেক্সট দিন আমাদের সঙ্গে খেতে বসবি না। গলাটা একটু কর্কশ শোনাল।

একথা কেন বলছো? মাথা নীচু করেই বললাম।

তোকে বোঝার মতো বয়স যথেষ্ট হয়েছে। সবাইকে ভাবতে বলিস, কেন এই কথাটা বললাম নিজে একটু ভাব।

মাথা নীচু করে একটুক্ষণ দাঁড়ালাম। তারপর বেসিনে হাত ধুয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে এলাম।

আসার পথে কনিষ্ক, নেপলাদের বাগানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখলাম।

জানলাটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। আমগাছটা, পেয়ারাগাছটা, নিমগাছটা, একই জায়গায় ঠিক সেইভাবে দাঁড়িয়ে। হেমন্ত শেষ, শীতের আমেজ একটু একটু করে পড়তে শুরু করেছে। পাতা ঝড়ে গিয়ে নতুন কচিপাতা গজিয়েছে। ভজু বাগানের শেষপ্রান্তে ঝাঁট দিয়ে দিয়ে ঝোড়েপরা পাতা জড়ো করছে। বাগানটাকে আবার আগের চেহারায় ফিরিয়ে আনার অক্লান্ত চেষ্টা।

দুপুরের মরা রোদের ছিটে ফোঁটা আমাগাছের ফাঁক দিয়ে ঘরে এসে পড়েছে। কিছুতেই মনটাকে কনসেনট্রেট করতে পারছি না। এলোমেলো নানা চিন্তা এসে বার বার ভিড় করছে।

মানুষ ভাবে এক হয় আর এক। নার্সিংহোম থেকে বেরবার মুহূর্তে মনে মনে কতো ছবি এঁকেছিলাম। একটা ছবিও মিললো না। বরং ঘটলো তার ঠিক উল্টো। দাদা সত্যি সত্যি তাহলে পঙ্গু হয়ে গেল! আর কোনওদিন ঠিক হবে না! দাদা কি মহাপাপ করেছিল!

ওষুধগুলো খেয়ে নে।

নীরুর ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম। জানলার দিক থেকে ফিরে ওর দিকে তাকালাম।

নীরুর চোখগুলো কেমন ছোট ছোট হয়ে গেল।

আমার কপালে হাত দিল।

কিরে শীত শীত করছে?

না।

চোখগুলো কেমন ছল ছল করছে। লাল হয়ে গেছে!

এমনি।

শুনলাম ঠিক মতো খাস নি।

খেতে ইচ্ছে করছিল না। জলের বোতলটা একটু দে।

নীরু টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ব্যাগ থেকে প্রেসার মাপার বাক্সটা বার করলো।

আমি এগিয়ে গেলাম।

ওর হাত থেকে জলের বোতলটা নিয়ে ওষুধগুলো খেয়ে নিলাম।

খাটে একটু বোস।

তোরা খেয়েছিস?

এবার বসবো।

মিলি এসেছে?

ফোন করেছিল, অফিস থেকে বেরিয়েছে।

নীরু হাতে বেল্ট লাগিয়ে ফস ফস করতে শুরু করলো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে।

কি দেখছিস?

নর্মাল আছে।

নীরু বাক্স গুছিয়ে নিল।

পারলে একটু শুয়ে পর।

ঘুম আসবে না।

ঘুম আসার দরকার নেই। শুয়ে থাকলেই যথেষ্ট।

সিগারেট খাওয়া যাবে?

ইচ্ছে করছে।

দে না একটা।

নীরু পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকটটা বার করে দিল। লাইটারটাও দিল।

প্যাকেটটা রাখ, আমি খেয়ে আসছি।

যা।

নীরু বেরিয়ে গেল। আমি আবার জানলাটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। সিগারেট ধরালাম।

ভজু বাগানের কলটায় স্নান করছে। রোদ্দুরটা এখন আর ঘরে নেই উধাও হয়ে গেছে।

মনাকাকার কথাটা মনে পড়ে যাচ্ছে। লোকটা সারাটা জীবন একটা পরের ছেলেকে মানুষ করে গেল। নিজের বলতে কেউ নেই। হয়তো ভেবেছিল শেষ জীবনটা আমি দেখব। পারলাম না। আমার মুখ না দেখেই মারা গেল। দাদার মতো মনাকাকাও হয়তো এতোটাই কষ্ট পেয়েছে। মুখে কাউকে কিছু বলতে পারে নি।

প্রথম জীবনে আমি, শেষ জীবনে চরম নিঃসঙ্গতা, বুকের ভেতরটা কেমন মোচর দিয়ে উঠলো।

সিগারেটটা খেতে ভালো লাগছে না। কেমন যেনো তেঁতো তেঁতো লাগছে। ফেলে দিলাম।

তোর কি শরীরটা খারপ লাগছে?

ফিরে তাকালাম, চিকনা।

না। ঠিক আছি।

একটু শুয়ে পর।

ভালো লাগছে না। চিকনা।

বল।

কাকার স্ট্রোক হয়েছিল না?

হঠাৎ এই কথাটা জিজ্ঞাসা করছিস!

বল না।

হ্যাঁ।

তুই তখন বাড়িতে ছিলি?

না।

কোথায় ছিলি?

আনাদির তাড়া খেয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলাম।

কেন!

ব্যাঙ্কের টাকা নিয়ে ও নয়ছয় শুরু করেছিল। মানতে পারি নি। প্রতিবাদ করেছিলাম।

তোর টিম?

ও তখন প্রতিমন্ত্রী, হাতে ক্ষমতা। আমি চুনোপুঁটি।

মারা যাবার সময় কাকার কাছে কে ছিল?

নীপা আর সুবীর ছিল।

তুই কি একেবারেই ছিলি না?

পোড়াবার সময় ছিলাম। তখনই নীপার সঙ্গে যা একটু কথা হয়েছিল। তারপর তোকে ফোন করলাম। তুই যে ভাবে বললি, সেই ভাবে কাজ করেছি।

তখন তুই এই কথাটা বলিস নি।

একবার ভেবে দেখ সেই সময় তোর ওপর কি ভীষণ চাপ ছিল।

তবু তোর একবার বলা উচিত ছিল। যাক কী বললো নীপা।

কি আবার বলবে। স্ট্রোক হওয়ার পর ডাক্তার ডাকার সময় দেয় নি। বাসু যখন ডাক্তার নিয়ে এসেছিল তখন সব শেষ। স্যার মনেহয় বুঝতে পেরেছিলেন। সময় ঘনিয়ে আসছে। বার বার তোর নাম করছিলেন। তুই স্যারের একটা অবলম্বন ছিলি।

কাকার শ্রাদ্ধ কে করলো?

নীপা মুখাগ্নি করেছিল। যেহেতু ও অন্য গোত্রের তাই চারদিনে শ্রাদ্ধ হয়েছিল।

নীপার মেয়েটা তখন হয়েছিল?

হ্যাঁ।

কাকা নীপার মেয়ের মুখ দেখেছিল?

তখন ওর বয়স আট দশ মাস হবে। তবে মেয়েটার ছয়মাস বয়সে মুখে ভাত দিয়েছিল।

অনিসা, অনন্যর বয়স তখন কতো?

চার সাড়ে চার।

চুপ করে থাকলাম।

তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো। চিকনার দিকে তাকালাম।

বল।

ওখানকার অবস্থা একটু খারাপ হয়েছে।

কি বললি!

না সেরকম কিছু নয়, একটু আগে বাসু ফোন করেছিল।

কেন?

কাল রাতের ঘটনার পর সব চুপ চাপ ছিলো। ঘণ্টা তিনেক আগে আট-দশটা বাইক গ্রামের ওপর দিয়ে গেছে উইথ আর্মস।

কোথায় গেছে?

অমূল্যের বাড়িতে গিয়ে উঠেছে।

দপ করে মাথাটায় আগুন জ্বলে উঠলো।

শুয়োরের বাচ্চাটাকে এতোদিন বাঁচিয়ে রেখেছিস কেন। কেটে মালঞ্চের জ্বলে ভাসিয়ে দিতে পারিসনি। একদিন এই সব কাজ হরবকত করেছিস। আজ চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে আছিস কেন। তোর টিমটা কি সব নুলো হয়ে গেছে।

আমার তারস্বর চিৎকারে চিকনা কেমন ভয় পেয়ে গেল। মুখে চোখে বিষ্ময়।

আমি ফোনটা পকেট থেকে বার করে অন করলাম।

প্লিজ অনি তুই বিশ্বাস কর আমি ঠিক….। চিকনা আমার পা ধরে ফেললো।

নিজের অজান্তেই বুঝলাম মুহূর্তের মধ্যে আমার চেহারার পরিবর্তন হয়ে গেছে।

তোদের দ্বারা কিছু হবে না।

হ্যালো।

শ্যাম।

কি রে অনিদা ক্যামন আছিস?

ভালো আছি।

তোর গলাটা ক্যামন কর্কশ ঠেইকছে। কি হইছে বইল?

তোরা সব ঠিক আছিস?

হ।

বাচ্চাগুলো কেমন আছে?

ভালো আছেক।

শুনলাম অমূল্যর বাড়িতে আট-দশটা বাইক ঢুকেছে উইথ আর্মস।

আমার কাছে খবর এইসে গেছে, তোকে চিন্তা করতে হবেক লাই।

অমূল্যর বংশ লোপাট করে দে। একটা বডিও ফেলে রাখবি না। খড়গাদায় ঢুকিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দে। কাউকে যেন খুঁজে না পাওয়া যায়।

আমার লোক জন সব উদের কাছা কাছিই আছে। লইখ্য রাইখছে।

কাজ শুরু করে দে, বসে থাকিস না।

আরও দুইটো আছে, কাইল ছার পাইছে।

কারা।

মণ্ডল আর মণ্ডলের ছেলে। শুনলাম ওরাই পচ্চিম থেকে ভাড়া কইরে লেইয়ে এইছে।

ও দুটোকেও রাখিস না।

অর্জুন আছে না ভাগি গেইছে?

খবর পাই নি।

আমাকে ফোন কইরেছিল।

কি বললো?

দুবাই চইলে যাচ্ছে।

একটা টেনসন থেকে মুক্তি দিলি। যাক তুই খবর পাঠিয়ে দে। আমি গিয়ে দেখতে চাই সব মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কোনও গন্ধ যেন না পাই।

আমি খপর পঠায়ে দিচ্ছি।

তুই ভালোপাহাড় থেকে এখন একবারে নরবি না। যতক্ষণ আমি সিগন্যাল না দেব।

আইচ্ছা।

ফোনটা পকেটে রেখে জানলার থেকে ঘুরে তাকালাম।

গেটের মুখে সব চেনা মুখ।

ইসলামভাই এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো।

এ তুই কি করলি?

একবারে আমার কাজে তোমরা কেউ বাধা দেবে না। তাহলে আমার আগুনে তোমরাও পুরে ছাই হয়ে যাবে। ক্ষমতা কি ভাবে ব্যাবহার করতে হয় দেখে নাও।

ঠিক আছে, আমি অন্যায় করে ফেলেছি, তুই একটু শান্ত হ।

ছাড়ো আমাকে। তোমরা সব চলে যাও এ ঘর থেকে।

পাটা জোড়ে ছুঁড়ে দিলাম। চিকনা দু-হাত দূরে ছিটকে পরলো।

ইসলামভাইয়ের হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে জোড় করে মুক্ত করলাম।

পকেট থেকে ফোন বার করলাম।

আবার ডায়াল করলাম।

অর্ক।

বলো দাদা।

খবর কি?

এখনও এ্যারেস্ট করে নি। পলিটিক্যালি ঝুলিয়ে রেখেছে।

তুই একবার বাড়িতে আয় দরকার আছে।

ওরা ছটার সময় প্রেস কনফারেন্স করবে বলেছে।

ঠিক আছে।

একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো।

বল।

গলাটা ঠিক ভালো ঠেকছে না।

এলে সব জানতে পারবি।

কনিষ্ক, নীরু এগিয়ে এলো।

এটা কি পাগলাম আরম্ভ করেছিস!

আগুন ঝড়া চোখে ওদের দিকে তাকালাম।

তুই কি ভেবেছিস একবারে সুস্থ হয়েগেছিস!

আর সুস্থ হওয়ার দরকার নেই, যথেষ্ট হয়েছে।

ফোনটা বেজে উঠলো।

পকেট থেকে বার করলাম। সুমন্তর নম্বরটা ব্লিঙ্ক করছে।

বল কি হয়েছে।

বাবাঃ কি হয়েছে! গলাটা কেমন যেন শোনাচ্ছে।

না কিছু হয় নি, কি খবর আছে বল।

অনাস্থা প্রস্তাবের ভোটাভুটি শেষ হল। সরকার পড়ে গেছে।

তুই এখন কোথায়?

বিধানসভায় লবিতে বসে আছি। তোমাকে প্রথম খবরটা দিচ্ছি।

ওরা যে খবর দিল কাল পর্শু বসবে।

বিরোধীদের চাপে আজই বসতে বাধ্য হয়েছে।

ঠিক আছে। কাজ সেরে পারলে রাতে দেখা করবি।

তোমার প্রেস কনফারেন্সের এ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছে সন্দীপদা।

চলে আয়, তখন কথা হবে।

আচ্ছা।

ফোনটা হাতে নিয়ে ডাকলাম।

নেপলা।

আমার ডাকে নেপলা ভেতরে এলো।

ইসলামভাইয়ের ফোনটা বেজে উঠলো। ইসলামভাই নম্বরটা দেখে বাইরে চলে গেল।

চিকনার দিকে চোখ পরে গেল।

আবার মাথাটা কেমন গরম হয়ে গেল।

ফ্যাঁস ফ্যঁসে গলায় চেঁচিয়ে উঠলাম। হিজরের মতো বেঁচে থাকবি না। পুরুষের মতো বাঁচার চেষ্টা কর। না হলে হাতে তালি মেরে “কার হলো গো” বলে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে হবে।

চিকনা মাথা নীচু করে বসে আছে।

কনিষ্ক, নীরু দুজনেই বেরিয়ে গেল।

ঘরের মুখের ভিড়টা আস্তে আস্তে পাতলা হয়ে যাচ্ছে।

ইকবালভাই স্থবিরের মতো সোফায় বসে।

নেপলার দিকে তাকালাম।

আলতাফকে ফোনে ধরে আমাকে দে। বল আমার ফোন বন্ধ আছে।

আমায় ফোন করেছিল।

কি বলেছে।

যে কাজ দিয়েছিলে হয়ে গেছে।

এতক্ষণ বলিসনি কেন।

খেতে বসার কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিল।

ডিটেলসে আমার আইডিতে মেল করে দিতে বল।

করে দিয়েছে।

অনুপের কোনও খবর রেখেছিস।

এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করেছে। বললো ডাইরেক্ট এখানে আসছে।

যা বাইরে গিয়ে অপেক্ষা কর।

আবার জানলার কাছে এলাম। জানলার রেলিংটা ধরে দাঁড়ালাম। শীতের বেলা, এরই মধ্যে মরে এসেছে। সূর্যের আলো পাঁচিল ছুঁয়ে বাইরে চলে গেছে।

শুয়োরের বাচ্চাগুলো জ্বালিয়ে পুরিয়ে মারছে। সব শালা সাপের পাঁচ পা দেখে ফেলেছে। একটু সুস্থ ভাবে বাঁচতে চাই, তাও দেবে না। সব সময় পেছনে একটা না একটা লেগে রয়েছে।

তুই বিশ্বাস কর, বাসু ফোন করে যা বললো, ওদের সঙ্গে যোঝবার মতো ক্ষমতা আমাদের নেই।

ফিরে তাকালাম। চিকনা মাথানীচু করে পায়ের কাছে বসে।

সব বাইরের ছেলে, একটাকেও কেউ চেনে না।

আমি চিকনার দিকে তাকিয়ে আছি।

তোকে বলতে ভয় করছে।

কি হয়েছে।

আমাদের দলের শবর পাড়ার একটা ছেলে বাধা দিয়েছিল। গুলি করেছে।

বেঁচে আছে না মরে গেছে?

বলতে পারবো না।

খবর নিয়ে আমাকে জানা। শ্যামের সঙ্গে কনট্যাক্ট রেখে টোটাল ব্যাপারটা ফলোআপ কর।

তুই আমার ওপর রাগ করিস না।

রাগ করার কোনও ব্যাপার নেই। বড়োমাকে গিয়ে বল আমাকে একটু চা দিতে।

চিকনা বেরিয়ে গেল।

সন্ধ্যে হয়ে আসছে। জানলার কাছটায় এগিয়ে গেলাম। সামান্য শীত শীত করছে।

ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কানে আসছে। দু-একটা জোনাকী ইতি উতি উড়ে বেরাচ্ছে।

রাঘবন বলেছিল আসবে, এখনও এসে পৌঁছলো না। হয়তো কাজে ফেঁসে গেছে। অনুপকে দিয়ে আইন মাফিক এবার সমস্ত কাজগুলো প্রসিড করে নিতে হবে। না হলে সমস্যা আরও বেড়ে যাবে।

দিবাকরটাকে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। ওটা আমার বেঁচে থাকার পথে আর একটা কাঁটা।

ইদানীং দেখছি আমি হঠাৎ হঠাৎ কেমন রেগে যাচ্ছি। কেন? আগে এরকম ছিলাম না। অনেক টাফ পজিসনে আমি পরেছি।

তখন চিকনার ওপর রাগ করাটা আমার অন্যায় হয়ে গেছে। খুব সাধারণ ভাবেই ব্যাপারটা আমি ট্যাকেল করতে পারতাম। তা না করে সাত পাড়া জানিয়ে বসলাম। দশজনকে জানিয়ে আরও টেনসন বারালাম।

নিজের প্রতি নিজে ছিঃ ছিঃ করে উঠলাম। হঠাৎ এরকম হঠকারিতা করতে গেলাম কেন।

সরকার পরে গেল। তারমানে এবার অনিমেষদারা সরকার গড়ার তোড়জোর শুরু করে দেবে। অনেক অঙ্ক, অনেক হিসাব। শ্যামকে স্যারেণ্ডারের জন্য আমার ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করবে। শ্যাম যদি বেঁকে বসে, তাহলে আবার এক টানা-পোড়েন।

শ্যামই বা কেন ছেড়ে দেবে। এতদিন তিলে তিলে যে সংগঠনটা ও মজবুত করেছে, এক নিমেষে তা ভেঙ্গে ফেলা যায় না। এর পেছনে আরও বড়ো ইতিহাস আছে, সেটা কজনই বা জানে। ওপরের রাজনীতিটা নিয়েই সবার মাথা ব্যাথা।

সত্যি নিজেকে শিক্ষিত বলে জাহির করতে রুচিতে বাধে, ঘেন্না হয়। সব জায়গায় কোরাপসন। টপ টু বটম। কোথাও এতটুকু ফাঁক নেই।

কিন্তু ওই আদিবাসিগুলো? দেখো ওদের মধ্যে কোনও কোরাপসন নেই। প্রকৃতির কোলে লালিত পালিত। জীবন ধারণের জন্য যতোটুকু প্রয়োজন ততটুকু পেলেই খুশি। বিশ্বাসী সহজ-সরল।

বহুবার বলেছি চল আমার ওখানে কাজ দেব।

হাসতে হাসতে বলেছে, খরগস পাওয়া যায়, ইঁদুর পাওয়া যায়।

কেনরে!

ইঁদুরপুরা দিয়ে পান্ত না খেলে মন ভরে না।

কি সহজ সরল স্বাভাবিক উক্তি। শহরের বাবুরা এর মর্ম উদ্ধার করতে গিয়ে দশপাতার প্রবন্ধ লিখে ফেলবে। হয়তো বা রিসার্চের সাবজেক্ট হয়ে যাবে, আর ওই সব জল জ্যান্ত মানুষগুলো।

শ্যামের শালি বুধিয়া একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল।

এই অনিদা মজা লিবি।

প্রথমটা ঠিক বুঝতে পারি নি। পরে যখন বুঝতে পেরেছিলাম, বুধিয়াকে ডেকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুই কেন ও কথা বললি।

তুই আমাদের জন্য এততো করিস কিছু লিস লাই।

তাতে কি হয়েছে?

তুই ছাইড়া ইখানে কততো বনবাবু আইসে, তারা মজা লেয়।

তুইও যাস?

মাঝে মাঝে যাই, পরিচিত না হলি যাই না।

কে নিয়ে যায়?

কেনে মুখিয়া আছে না।

যাস কেন?

দুটা পয়সা আইসে।

যদি কোনও সমস্যা হয়।

আগে হইতো, এখন হয় না।

কেন?

বাবুরা সব সঙ্গে করে বেলুন লিয়ে আসে।

তোর কিছু মনে হয় না।

কেনে, আমি কি দেবতা লাকি।

বুধিয়া খিল খিল করে হাসছে। ওর আদল বুক থেকে কাপর খসে খসে পড়ছে।

সেই আদি অনন্তকাল ধরে শুধু বাবুদের খুশি করে যাও। এটাই ওরা মেনে নিয়েছে। বাবুরা ফুর্তি করে, জোড় জবরদস্তি করলে বিয়েও করে নেয়। ছয় সাতদিন সুখে ঘর সংসার করে। তারপর বাবু কাজের নাম করে সেই যে চলে যায়, আর ফেরে না। বেওয়ারিশ বাচ্চার মা হয়ে যায় এই সব পাহাড়ী মেয়েগুলো।

তুই বইসে বইসে ভাব, আমি চইলে যাই।

বুধিয়া চলে গেছিল। ওর চোখের নাচন আমার বুকেও যে মোচড় দেয় নি তা নয়। নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম। পরে শ্যামকে ব্যাপারটা বলেছিলাম।

শ্যাম হাসতে হাসতে বলেছিল, বছরে দু-মাস কাইজ থাইকে, কেন্দুপাতা আর কাইঠ ক্যুইরা কতদিন চইলে। পেইটটা চাইলাতে হবে। তুরা সাহায্য করিস তাতে কতটুকু খিদে মিটে বইল। সরকার আমাদের জন্য কিছু কইরেছে। সরকার টিবকইল পুঁইতেছে গরমে জল পরে না। তুই ইঁদারা খুঁইড়ে দিছিস গ্রাম শুধু লোক জল খায়।

তারপর থেকেই জেদটা কেমন যেন চেপে বসেছিল। এখন বুধিয়া ওখানকার স্কুলের শিক্ষিকা। সাধ্য মতো যখন যা পাই পাঠাই।

সরকার এদের জন্য ঠাণ্ডা ঘরে বসে বড়ো বড়ো পরিকল্পনা করে, স্টেট টাকা পাঠায় এদের উন্নতির জন্য, ব্লকের অফিসাররা সেই টাকা খরচ করতে পারে না। টাকা ফিরে যায়, এরা যে তিমিরে পরে থাকার সেই তিমিরেই পরে থাকে। মাঝখান থেকে শ্যামেরা নিষিদ্ধ সংগঠনের তকমা পেয়ে গেল। কি অদ্ভূত আমাদের এই সংসারটা।

ওদের ভেতরে যতো ঢুকবে, হাজার বিষ্ময় তোমার সামনে এসে হাজির হবে। অবাক হয়ে শুধু দেখবে। সমাধান? বিষবাঁও জলে।

কিরে অন্ধকারে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছিস?

লাইটটা জ্বলে উঠতেই চোখটা বন্ধ করলাম। কিছুক্ষণ পর খুললাম।

কনিষ্ক, নীরু, ইসি, মিত্রা ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে।

ইসি ছোট্ট টেবিলটার ওপর চায়ের ট্রেটা রাখলো। দু-জনেই আমার দিকে তাকিয়ে।

মন ঠিক হলো। কনিষ্ক বললো।

এ মন ঠিক হবার নয়।

কেন!

নতুন করে তোকে কি বলবো।

তাহলে এক কাজ কর।

বল।

বাসন মাজা পাউডার দিয়ে ভালো করে মেজে নে। দেখ মনের ময়লা ওঠে কিনা।

ওটা বাসন মাজা পাউডারে হবে না। তার জন্য অন্য পাউডার লাগবে।

ইসির দিকে তাকালাম।

সকালে তোকে একবার দেখলাম, তারপর আর দেখতে পেলাম না।

একটু স্কুলে গেছিলাম।

আবার সমস্যা হচ্ছে নাকি?

সব সময় কিছু না কিছু লেগে থাকে। আবার নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়।

সোফায় এসে বসলাম।

মিত্রা চায়ের পট থেকে কাপে চা ঢাললো।

আমাকে একটা চাদর দিবি বেশ শীত শীত করছে।

শাল বার করে দিই।

তাই দে।

মিত্রা উঠে টেবিলের সামনে গেল। ড্রয়ার থেকে চাবিটা নিয়ে একটা শাল বার করে দিল।

তোদের শীত করছে না? কনিষ্কর দিকে তাকালাম।

করছে তবে তোর মতো নয়। এই শীতটা বেশ আরামদায়ক।

চায়ে চুমুক দিলাম।

মিলির মেয়ে সুরোর ছেলে হাত ধরা ধরি করে ঘরে এসে ঢুকেই আমার কাছে এলো।

চা খাচ্ছ।

তুই খাবি।

আমার কথা বলার কোনও অবকাশ দিল না। দুজনে দুটো বিস্কুট নিয়ে আমার কাপে ডুবিয়ে খেতে শুরু করলো।

ইসি, মিত্রা হাসছে।

দেখ কারুর কাপে ডোবাল না। ওরটাতেই ডোবাতে হবে।

এই মেয়ে তোর বাবারটাতে ডোবা না। ইসি হাসতে হাসতে বললো।

না।

মিলির মেয়ের সোজাসুজি জবাব।

কনিষ্ক, নীরু হাসছে।

আচ্ছা ইসি কনিষ্কর মেয়েটার বরাবর অনির দিকে নজর কেন।

কনিষ্ক ঠেসে একটা থাপ্পর মারলো নীরুর থাইতে।

হ্যাঁরে শালা ও যখন হয় তার পনেরো বছর আগে থেকে ও দেশের বাইরে।

নীরু উঃ উঃ করে হাসছে।

কনিষ্কর থেকে একটু তফাতে গিয়ে বললো। শিব ঠাকুর যদি দুধ চায়, গরু বনে গিয়ে দিয়ে আসে। এইরকম বহু গল্প শুনেছিস না।

কনিষ্ক উঠে দাঁড়াবার আগেই, নীরু ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল।

বাচ্চা দুটো হাসছে, দু-জনের দুটো বিস্কুট খাওয়া হয়ে গেল। কে আগে কাপে ডোবাবে তাই নিয়ে একটু ঠেলা ঠেলি হলো।

আমরা চা খেতে খেতেই কথা বলছিলাম।

সুরো ঘরে এলো।

একিরে! এইতো একপেট খাইয়ে তোদের দুটোকে পাঠালাম। কনিষ্কদা সত্যি তোমার মেয়েকে নিয়ে আর পেরে উঠছি না। ছেলেটার দিকে তেরে এলো।

দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে কাছে এগিয়ে আসতেই আমি সুরোর হাতটা চেপে ধরলাম।

বদমাশ।

সুরোর ছেলে আমার চাদর চেপে ধরে কোলে মুখ লুকিয়েছে। মিলির মেয়েটা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।

একবারে না।

তোমার জন্যই বাঁদর তৈরি হবে।

হোক, আমার মতো না হলেই হলো।

সুরো আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়েছে।

দুজনেই আমার কলের মধ্যে ঢুকে পরেছে, হাতে বিস্কুট মাখা মাখি।

পারলে হাতদুটো বরং বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ধুইয়ে দে। সুরোর দিকে তাকালাম।

তোমার চা জুটেছে।

ওরা খেয়ে নিক, তারপর খাবো।

সুরো আমার কোল থেকে দুটোকেই হিড়হিড় করে টানতে টানতে বাথরুমে নিয়ে গেল।

অর্ক হই হই করতে করতে ঘরে ঢুকেই আমার পাশে এসে বসে জড়িয়ে ধরলো।

আদর দেখছিস। মিত্রা, ইসিকে খোঁচা মারলো।

না ম্যাডাম, অনিদা আমার ফ্রেন্ড-ফিলোজাফার-গাইড। বাবা-মা ছাড়া জীবনে কারুর কাছ থেকে যদি কিছু পেয়ে থাকি সে হলো অনিদা। চেষ্টা করলেও এই ঋণ জীবনে শোধ করতে পারবো না।

গ্যাস খাওয়াস না। খবর কি বল। হাসলাম।

আর দশ মিনিট বাকি আছে। বাইরে কিন্তু সব ওবি ভ্যান এসে দাঁড়িয়ে আছে।

লাইভ দেখাবে নাকি?

সেইরকমই তো মনে হচ্ছে।

কেন ঝামেলা বারাচ্ছিস। খবর তো হয়ে গেছে।

পেয়ে গেছ!

হ্যাঁ।

ভাবলাম আমি তোমাকে প্রথম দেব।

সুমন্ত ফোন করেছিল।

খেয়াল ছিল না। ওতো সকাল থেকে ওখানে হত্যে দিয়ে বসে আছে।

এরা এ্যাকচুয়েলি কি জিজ্ঞাসা করতে চায়।

সব অনাদি চন্দ্রকে নিয়ে।

এর বাইরে কিছু জিজ্ঞাসা করবে না?

করলে তোমার মতো তুমি উত্তর দেবে।

কতক্ষণ?

মিনিট পনেরো নিশ্চই।

তুই আজকে একটা ঝেড়ে দে।

তা বলতে। অরিত্রকে ডেকে দিয়ে দিয়েছি।

অনাদিকে এ্যারেস্ট করেছে?

এখনও খাতায় কলমে নয়। তবে ছাড়ে নি। ইন্ট্রোগেসন চলছে।

কি মনে হচ্ছে?

যারা সরকার ফর্ম করবে, তারা যা বলবে তাই হবে।

তোর এখন পোয়া বারো।

হুঁম। সুপ্রিয় ঘোষ, দিলীপ পাল ঘন ঘন ফোন করছে।

কাকে?

আমাকে।

বাবাঃ তুইতো ভি ভি আইপি।

সব তোমার জন্য।

হাসছি।

এইরকম ভাবে মাথায় চাদার মুড়ি দিয় জবুথবু হয়ে বুড্‌ঢার মতো বসে আছ কেন?

শীত করছে।

মাথা থেকে নামাও।

গ্রামের ছেলে, শীতকালটা একটা বড়ো গামছা গায়ে দিয়ে কাটিয়ে দিতাম। তোর ম্যাডামকে বললাম শীত করছে, দিলো একটা শাল বার করে, এর মর্যাদা দিতে হবে তো।

মিত্রা হাসলো।

তা বলে খোঁট্টাদের মতো এইরকম ভাবে সাত প্যাঁচ জড়াতে হবে।

বল বল তোর ফ্রেন্ড, ফিলোজাফার, গাইডকে। মিত্রা কট কট করে উঠলো।

বড়ো আরাম বুঝলি অর্ক।

মাঝে মাঝে তুমি এমন গাঁইয়া হয়ে যাও না। প্রেস্টিজে পুরো পেরেক। খোলো খোলো ওদের ডাকি। কোথায় বসবে?

এই ঘরেই ভালো। কি বল কনিষ্ক।

খারাপ হবে না।

দাঁড়াও ওদের ডাকি।

অর্ক উঠে গেলো।

আমাকে আর একটু চা দে। ইসির দিকে তাকালাম।

ওই দুটো গেল কোথায় বলতো? কনিষ্কর দিকে তাকালাম।

সুরো গোঁতাতে গোঁতাতে নিয়ে গেল।

সুরোটা মহা তেঁদড়, বাচ্চাগুলোকে কি যে ভাবে। কনিষ্ক, মিলিকে দেখতে পেলাম না।

তোর মেজাজ ঠিক হলে দেখা দেবে বলেছে।

হাসলাম।

ইসি আবার পট থেকে চা ঢেলে দিল। চুমুক দিলাম, একটু ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।

প্রায় পনেরো কুড়িজনের একটা দলকে নিয়ে অর্ক ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল।

আমি উঠে দাঁড়ালাম।

এ ঘরে হবে না। একজন বললো।

আরও আছে!

তুমি বরং বারান্দায় এসো। একটা টেবিল চেয়ারের ব্যবস্থা করি। অর্ক বললো।

দরকার লাগবে না। আমি বরং একটা চেয়ারে বসি। ছোটো টেবিলটা বাইরে বার করে নে।

তাই হোক।

বারান্দায় আসতেই দেখলাম ওই ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে এসেছে।

ইসি পেটে খোঁচা মেরে বললো, আমরা বরং ও ঘরে টিভির সামনে গিয়ে বসি। ভালো দেখতে পাবো।

আমি চেয়ারে বসলাম।

ক্যামেরা নিয়ে কে কোথায় দাঁড়াবে নিজেদের মধ্যে একপ্রস্থ ঝগড়া করে তারপর ওরা প্রশ্ন করতে শুরু করলো। আমি একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেছি।

মুখের ওপর তীব্র হ্যোলোজেনের আলো এসে পরছে। ভীষণ অসুবিধে হচ্ছে। চোখ মনে হচ্ছে যেন ঝলসে যাবে। বেশ গরম লাগছে। ভাবলাম চাদরটা খুলে পাশে রাখি। তারপর নিজেই ভাবলাম, এখন লাইভ টেলিকাস্ট চলছে খারাপ দেখাবে।

মাঝে একসঙ্গে অনেকে প্রশ্ন করছিল, আমি বললাম একজন একজন করে প্লিজ।

প্রায় মিনিট পনেরো আমাকে নিয়ে ওরা নানাভাবে নাড়াচাড়া করলো। বেশির ভাগটাই অনাদিকে নিয়ে। এমনকি যারা চ্যানেলের নিউজ রুমে বসে কো-অর্ডিনেট করছিল, তারাও আমাকে একে একে নানা ধরণের প্রশ্ন করলো।

প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করলাম। এর মাঝে আস্তে করে সিডির ব্যাপারটাও উল্লেখ করে দিলাম। সময় হলে সেটাও আপনাদের হাতে তুলে দেব। পনেরো মিনিট বলে প্রায় আধঘণ্টা পর ওদের হাত থেকে রেহাই পেলাম।

ঘরে এসে সোফায় বসলাম। বেশ গরম লাগছে। ভেতরটা ঘেমে গেছে। শালটা খুলে খাটের ওপর ছুঁড়ে দিলাম। সাংবাদিক ছেলেগুলো তখনও তাদের ব্যাগ গুছিয়ে উঠতে পারে নি। ছোটোমা, বড়োমা, বৌদি, দামিনীমাসি, জ্যেঠিমনি এসে আমাকে গোল করে ঘিরে বসলো।

ছোটোমা আমার গলা জড়িয়ে ধরে, গালে গাল ঘসে বললো, মেজাজটা তখন সপ্তমে চড়িয়েছিলি এখন একটু ঠাণ্ডা হয়েছে।

ছোটোমার দিকে তাকালাম, হাসলাম।

তখন যা ভয় করছিল তোকে দেখে, হাত-পা সব পেটে ঢুকে যাবার জোগাড়।

তুই তো এরকম রাগ করিস না—বৌদি বললো।

আমি চুপ করে আছি।

গেটের মুখে দাদা, ডাক্তারদাদাকে দেখে উঠে দাঁড়ালাম। নিজে থেকে এগিয়ে গেলাম।

অনন্য, দাদার একটা হাত ধরেছে। আর একটা হাতে লাঠি।

আমি কাছে গিয়ে দাদাকে ধরলাম।

দাদা আমার মুখে হাত বোলাচ্ছে।

আমার স্বপ্ন মিথ্যে হয় নি।

কথা জড়িয়ে গিয়ে একটা গোঁ গোঁয়ানির শব্দ।

মাথা নীচু করে নিলাম। আবার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো।

খুব ভালো বলেছিস।

মাথা তুললাম। পেছনে মল্লিকদা দাঁড়িয়ে। হাসছে।

আমি দাদাকে আঁকুড় করে ধরে নিয়ে এসে সোফায় বসালাম।

ছোটো অনি আজ আর একটা নতুন মাইলস্টোন টাচ করলো….।

ডাক্তারদাদার কথা শেষ হলো না।

এক কাপ চা তো?

সত্যি, বান্ধবীর থেকে তোমার মাথাটা এতো পরিষ্কার।

তা বলবে না। কাজের বেলা কাজী কাজ ফুরলে পাজী, আহাম্মকের দল সব।

বড়োমার কথায় ঘর ভর্তি সবাই হেসে উঠলো।

তোমার ছেলে কিরকম গরম গরম ডায়লগ ঝারলো বলো।

বড়োমা মুখ টিপে হাসছে।

তখন কথা বলছিলাম বলে শুধু থামোনা থামোনা করছিলে। দামিনী অনির কথা না শুনে শুধু ফোনই করে গেল।

ওকে যারা ভালোবাসে তারা কি জানতো, তাই জানালাম। দামিনীমাসি বললো।

একমাত্র সুতপা কথা না বলে শুনলো, আর সঠিক জায়গায় ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিল।

বৌদি এবার বড়োমার পেছনে মুখ লোকাচ্ছে।

আমি ভাবলাম আমার ছোটোগিন্নীকে একটা ম্যাসেজ করে বলি দ্যাখ একবার….।

হ্যাঁ বুড়ো তোমাকে বিয়ে করতে যাব কেন। অনিসা কটকটিয়ে উঠলো।

সেকিরে! তোর জন্মের দিন তোর মার সঙ্গে পাকা কথা হয়েছে।

মার সঙ্গে হয়েছে। আমার সঙ্গে হয় নি।

হাসা হাসি চলছে ছোটোমা উঠে দাঁড়াল।

ছোটোমা।

কনিষ্কর ডাকে ছোটোমা ফিরে তাকাল।

অনির জন্য খানিকটা ন্যুডুলস করে দাও। কয়েকটা ওষুধ খাওয়াতে হবে।

আর পারছি না। এবার ক্ষেমা দে। আমি বললাম।

তা হবে না অনি। তিনটে মাস কোর্সটা কমপ্লিট করতে হবে। তুই যদি ভেবে থাকিস তুই সুস্থ, তাহলে আমাদের ডাক্তারী শাস্ত্র ভুল হয়ে যাবে।

তোমাকে একটা প্রশ্ন করবো, উত্তর দিতে পারবে।

এই মুহূর্তে উল্টো-পাল্টা প্রশ্ন করলে তার কোন জবাব আমি দেব না।

কনিষ্ক হাসছে।

অনেক দিন থেকে ভাবছিলাম তোমায় বলবো, সুযোগ হচ্ছিল না। তাছাড়া….।

বল।

আমাদের শরীরে যে জিনটা ধারন করে আছি তার কতো পার্সেন্ট এ্যানিম্যাল জিন।

ডাক্তারদাদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।

হঠাৎ তুই এই পরিবেশে বসে আমাকে এই প্রশ্নটা করলি?

মনে হলো তাই।

তোর এমনি এমনি মনে হয় না।

হাসলাম।

তোর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর, আমি সংস্কৃতটা বেশ ভালো করে রপ্ত করেছি বুঝলি। আমার মাস্টার মিত্রার জ্যোতিষদাদা, ভদ্রলোকের এই শাস্ত্রটাতে বেশ ভালো জ্ঞান। সংক্ষেপে তোকে বলি—

বলো।

তুই উপনিষদের ব্যাখ্যা দিয়ে, ডারউইনের থিওরিকে নস্যাৎ করতে চাইছিস। সেটা কিন্তু বেশ টাফ ব্যাপার।

বৌদি দেখলাম সোজা হয়ে বসলো।

দাদা এক মিনিট, আমি এখুনি আসছি। ছোটোমা কথাটা বলেই ওঘরে দৌড় দিল।

আমি হাসছি।

জানিস অনি এই জিন সাবজেক্টটা সমুদ্রের মতো এপার ওপার দেখা যায় না। তুই একবার নেমে পরলে এর তল খুঁজে পাবি না। এখনও যারা ব্যাপারটা নিয়ে পড়াশুনো করছে, তাঁরা সব সেইরকম মাপেরই মানুষ। কে কখন খায়, কে কখন শোয়, তারা নিজেরাই জানে না।

আমার কাছে খবর আছে বিদেশে এই নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। তাদের হাতিয়াড় আমাদের বেদ, উপনিষদ, পুরান।

ওমনি শুরু করে দিয়েছেন। ছোটোমা বলতে বলতে ঢুকলো।

পেছনে অর্ক, নীরু, মিলি।

অস্বীকার করবো না।

ভক্ত প্রহল্লাদের গল্পটা তোমার মনে আছে।

সামান্য।

আর একবার বলতো শুনি। বড়োমা চেঁচিয়ে উঠলো।

সংক্ষেপে বলছি।

হিরণ্যকশীপুর এক পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন। তার ওপর দেবতার বরে তিনি অমর। সাধনায় তিনি সিদ্ধিলাভ করে বড় চেয়েছিলেন তাঁকে কোনওমানুষ মারতে পারবে না। জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে কোথাও তাকে কোনও শক্তি মারতে পারবে না। এমনকী কোনও পশু কোনও অস্ত্রেও তার মৃত্যু হবে না। মোদ্দা কথায় কোনও মানুষ কোনও অস্ত্র, পৃথিবীতে রয়েছে এমন কোনও প্রাণীর দ্বারা তার মৃত্যু হবে না।

ফলে তিনি দেবতাদের ত্রাস হয়ে উঠলেন। এমনকী সেই হিসাবে চরম নাস্তিক হয়ে উঠলেন।

ভক্ত প্রহল্লাদ দেবতা অন্তপ্রাণ। হিরণ্যকশীপুর তাঁকে অনেক ভাবে পরীক্ষা করলেন। প্রহ্লাদ বেঁচে গেল। একদিন তাকে রাজপ্রাসাদে ডেকে নিয়ে এসে রাজা হিরণ্যকশীপুর জিজ্ঞাসা করলেন এই প্রসাদের কোথায় তোর দেবতা আছে।

শিশু প্রহ্লাদ সরল বিশ্বাসে বললেন সবজায়গায় তিনি বর্তমান।

হিরণ্যকশীপুর প্রসাদের একটা থাম্বা দেখিয়ে বললেন, এখানে তোর দেবতা আছে।

প্রহ্লাদ সরল বিশ্বাসে বললেন হ্যাঁ আছে।

হিরণ্যকশীপুর সেই থাম্বায় সজোরে লাথি মারলেন। ভেঙে পরলো সেই থাম্বা। তার থেকে বেরিয়ে এলো ভয়ংকর এক মানুষের মূর্তি। তার মুখটা সিংহের মতো শরীরটা মানুষের মতো। হাতে সিংহের মতো নোখ। যাকে আমরা বলি নৃসিংহ অবতার। তিনি হিরণ্যকশীপুরকে তার দুই থাইয়ের মাঝখানে রেখে নখের আঘাতে তার পেটটা চিরে দিলেন।

আজ ঠিক এইরকম ফর্মেসনের একটা প্রাণী তৈরির জন্য ওখানকার গবেষকরা প্রাণপাত করছে।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/4D1M7VA
via BanglaChoti

Comments