❝কাজলদীঘি❞
BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১১১ নং কিস্তি
—————————
জীবনে শালা ইঞ্জেকসন নিলাম না। তোরা ছুঁচ ফুটিয়ে হাতে কড়া ফেলে দিলি।
দোষ করবি তার ফল ভোগ করবি না।
তোর লোকজন ডাক আমি ট্রলিতে শুয়ে পরি।
দিব্যি বেড থেকে নেমে ট্রলিতে শুয়ে পরলাম।
কনিষ্ক বেরিয়ে গেলো। আমি চোখ বন্ধ করে মরার মতো পরে রইলাম।
আমাকে নিয়ে আসা হলো। আবার ঘর বন্ধ।
কনিষ্ক দেখলাম এই ঘরে দুটো নার্স ফিট করেছে।
আসার সঙ্গে সঙ্গেই তারা তাদের কাজ শুরু করে দিল।
কনিষ্ক বললো, এখন কিছু করার দরকার নেই। পেসেন্ট এখন অনেকটা নর্মাল হয়ে এসেছে। ও বেল বাজালে আসবেন, অক্সিজেনটা আর কিছুক্ষণ পর খুলে দেবেন।
কনিষ্ক নিজেই খাটটাকে একটু উঁচু করে দিল।
সিস্টার। কনিষ্কর ডাকে একজন ফিরে তাকাল।
আমি যদি থাকি ভালো, না হলে ড্রিপটা শেষ হলে বন্ধ করে দেবেন।
আচ্ছা।
আপনারা বাইরেই থাকুন।
ঠিক আছে স্যার।
মেয়েদুটো বেরিয়ে গেল।
এগুলোকে কোথা থেকে ফিট করলি।
করিত কর্মা মেয়ে। তোর কাজে লাগতে পারে।
অরিত্র ফোন করেছিল?
না।
একবার মিস কল মার।
কনিষ্ক ফোন মারতেই সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই এলো।
কিরে?
এতক্ষণ তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। বার বার বলছে আউট অফ রিচ। তুমি রাখো ফোন করছি।
কনিষ্ক।
বল।
মুখের বাটিটা খোল। অসুবিধে হচ্ছে।
কনিষ্ক অক্সিজেন মাস্কটা খুলে নিল।
ফোনটা বেজে উঠলো। নীরু ঘরে ঢুকলো।
অনিমেষদা খেপে গেছে। স্যার, অনিমেষদা আসবে বলছে।
কেন, মিত্রা ফুস ফাস করেছে।
বলতে পারবো না। তবে বড়োমাদের সঙ্গে এক সঙ্গে বসে আছে।
বল মিনিট পনেরো বাদে আসতে, আমি একটা কাজ সেরে নিই।
কার ফোন?
অরিত্রর।
কাজ শুরু করে দিয়েছে?
অনেকক্ষণ। কনিষ্ক বললো।
কনিষ্ক ফোনটা আমার হাতে দিল। আমি ইশারায় বললাম দূরে সরে যা। কনিষ্ক, নীরু দজনেই মুচকি মুচকি হাসছে।
হ্যালো।
তুই ঠিক আছিস তো?
সন্দীপের গলায় উৎকন্ঠা ঝড়ে পরলো।
আমি ঠিক আছি। তবে ঠিক থাকার কথাটা কাউকে জানিও না। বুঝলে।
কাউকে জানাব না।
বউকে ভালোবেসে গল্প করবে না, আজ অনেকদিন পর অনির সঙ্গে কথা বললাম।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। বলবো না।
এবার ভালো করে আমার কথা মন দিয়ে শোন।
বল।
রাজনাথের কেশের সময় তোকে একটা ফাইল রাখতে দিয়েছিলাম মনে আছে।
সেটা তুই ম্যাডামকে দিয়েছিলি।
ফাইলটা এখন কোথায়?
ম্যাডাম আমাকে রাখতে দিয়েছিল।
এখন কি তোর কাছে না মিত্রার কাছে?
আমার কাছে আছে তবে অফিসে না বাড়িতে খুঁজে দেখতে হবে।
যেখান থেকে পারিস, খুঁজে বার কর।
ঠিক আছে বার করবো।
ওই ফাইল ঘেঁটে দেখ তিনটে লেখা পাবি। এখনকার তিনজন সচিবের। মনে পড়ছে।
আবঝা আবঝা মনে পড়ছে।
ওই জন্য তোর কিছু হয়নি।
তুই লিখবি আমি মনে রাখবো, কি করে হয়।
শোন তিনজনের বাজার এখন রমরমা। মাটিতে পা পড়ছে না। কালকে একটু বেলুনে পিন মেরে দে। দেখবি দৌড়ো দৌড়ি শুরু হয়ে যাবে। গেম আবার তোর হাতে।
আমি এখুনি খুঁজে বার করছি।
ওটা ওদের প্রথম ঘোটালা। একটু এডিশন অল্টারেশন করে ছেপে দে। শেষে প্রশ্নটা রাখবি যারা জীবনের প্রথমে আইএএস হয়ে এইরকম ঘোটালা করে থাকে তারা পরবর্তী কালে এরকম দফতরের সচিব হলো কি করে?
তখন অনিমেষদারা ছিল।
এখন নেই। ওরা কিন্তু আছে। আর ঘোটালা সব সময় ঘোটালা। সাধারণ পাবলিক অতো বোঝে না। মালটা ঝেড়ে দিয়ে পাবলিকের সিমপ্যাথি তোল।
ঠিক আছে।
দ্বীপায়ণ কাছে আছে?
আছে।
দে।
আর কিছু বলবি না?
কাগজের অবস্থা?
ঝুলন্ত সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে, তোকে অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছে।
বাহাত্তর ঘণ্টা সময় দে।
তাই হোক। নে দ্বীপায়ণের সঙ্গে কথা বল।
বলো অনিদা। শরীর ঠিক আছে।
খুব ভালো আছি। কোনও টেনশন করবে না।
ঘণ্টা দুয়েক আগে পর্যন্ত টেনশন ছিল, এখন নেই।
কেন!
যখন শুনলাম তুমি নিজে ফোনে কথা বলতে চাইছো।
শোনো আমি একটা লেখা এখন লিখতে বসছি। বাংলায় লিখে পিডিএফ করে তোমাকে মেল করবো তার সঙ্গে সব ডকুমন্টেস থাকবে। তুমি সব দেখে নিয়ে আমাকে জানাবে। কিন্তু আমার সিগন্যাল না পেলে তুমি ওই কপিটা নিউজরুমে পাঠাবে না। আর একটা কথা।
বলো।
নিজে হাতে কম্পোজ করবে।
আচ্ছা।
নীরু বেরিয়ে গেল।
অরিত্রকে দাও।
বলো দাদা। অরিত্রর গলাটা এখন যথেষ্ট পরিষ্কার।
সিম পেয়েছিস।
ব্লাড ডোনেট করে আমি বৃষ্টি দুটো সিম পেয়েছিলাম। বৃষ্টি বললো ওগুলো কাজে লাগিয়ে দাও। এ্যাক্টিভেট করা আছে। এখনও ব্যবহার করিনি।
সিম দুটো কোথায়?
বৃষ্টিকে আনতে পাঠিয়েছি।
ফোন কিনেছিস?
সুমন্ত আনতে গেছে।
ছিদামকে দে।
ধরো।
দাদাগো বড়ো কষ্টে আছি।
কেনরে কি হলো?
অনাদিদা একবারে ছারখার করে দিল।
একটু সবুর কর। শোন।
বলো।
সুবল ঘড়ুই বলে যে ছেলেটা গেটে থাকে ওকে আর ওর ঘরে যে তিনজন থাকে অরিত্রর সঙ্গে ওদের পাঠিয়ে দে।
ঠিক আছে।
কানে মন্ত্রণা দিয়ে দিবি, কয়েকদিন আমার কাজ করতে হবে।
এবার বুঝে গেছি। খেলা কি আজ থেকে চালু করছো।
ইচ্ছে আছে। দময়ন্তী কোথায়?
তোমার ঘরের কাছাকাছি আছে। সিপি, এসপিকে সাসপেন করেছে, তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে।
দময়ন্তীকে ম্যাথরানি সাজিয়েছিস?
হ্যাঁ। তোমার ঘর থেকে তিনটে ঘর পরে আছে।
ফোন করে বলে দে বিকেলের দিকে একবার আমার সঙ্গে দেখা করতে।
আচ্ছা।
অর্ককে কোথায় রেখেছিস?
এ খবর তোমাকে কে দিল!
তোকে জায়গাগুলোর হদিস আমি দিয়েছি।
ছিদাম হাসছে।
অর্কদা ভালো আছে।
ওকে খবর দে, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বল এখুনি।
ফোন নম্বর?
অরিত্রর কাছে দুটো নম্বর আছে নিয়ে রেখে দে, এখন থেকে তিনদিন ওইটাই আমার ফোন নম্বর হবে। আমাকে ওই নম্বরে লেটেস্ট নিউজ দিবি।
ঘুঁটি সাজিয়ে নিয়েছ।
কিছুটা। অর্জুন কোথায়?
আবার কাকে ওরাবে!
কাউকে নয়। দরকার আছে।
বম্বেতে আছে।
ঠিক আছে।
কিছু বলতে হবে?
ফোন করে জানিয়ে দে, আজই বিকেলের ফ্লাইটে কলকাতায় ল্যাণ্ড করতে।
আচ্ছা।
ওকেও ওই দুটো নম্বর দিয়ে দিবি। যখন তখন দরকার হতে পারে। সঙ্গে যেন পুরো টিম কলকাতায় আসে।
অনিমেষদা, ডাক্তারদাদা ঘরে ঢুকলো। খাটে বসে আমি দিব্যি ফোনে কথা বলছি দেখে, চোখ কপালে উঠে গেছে। কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে এলো। অনিমেষদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কনিষ্ক চেয়ার এগিয়ে দিল। আমি হাত দেখিয়ে বললাম বসো।
অরিত্রকে দে?
দিচ্ছি।
বলো।
ছিদাম চারজনকে দেবে ওদের সঙ্গে নিয়ে তুই এখুনি আমার কাছে আয়।
ঠিক আছে।
চারদিকে চোখ কান খোলা রাখবি।
ফোনটা কেটে দিয়ে কনিষ্কর হাতে দিলাম।
খাট থেকে নামতে গেলাম। হাতে টান পরলো, উঃ করে উঠলাম।
দেখছিস এখুনি একটা বিপদ ঘটাচ্ছিলি। কনিষ্ক চেঁচিয়ে উঠলো।
খেয়াল ছিল না বিশ্বাস কর।
খেয়াল থাকবে কি করে, তুই তো এখন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছিস।
ডাক্তারদাদা চেঁচিয়ে উঠলো। দুজনেই সামনের দিকে এগিয়ে এলো।
অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে মাথা দুলিয়ে চলেছে।
ডাক্তারদাকে তবু দেখেছি, তোমাকে কতদিন পর দেখলাম। আমি বললাম।
বাইরের লোকগুলোর কথা তোর একবারও ভাববার ইচ্ছে হয় না।
হয় তো—কি করবো বলো, অবস্থা যা বুঝলাম, হাতে আর সময় নেই, তাই অভিনয় করতে হচ্ছে। এ ছাড়া উপায় নেই।
তোকে তো কেউ কিছু বলে নি। অনিমেষদা হাসছে।
আমি সুস্থ হলে, লোকাল থানা থেকে আইও এসে আমার বয়ান নেবে। এটাই আইন। সেখানে সিআইডির ডিআইজি, এসপি, সিপি আমার বয়ান নিতে আসছে। এরপরও বলবে, আমার বোঝার কিছু বাকি আছে। তোমরা আমাকে ঢাক পিটিয়ে নাই বা বললে।
তোমরা বলবে তোর নাম সকলে বলছে। তোকে সকলে জড়াচ্ছে। অস্বীকার করছি না। তাই যাদের ধরেছে তাদের বয়ানের ওপর ভিত্তি করে আমাকে ধরতে পারে। কিন্তু আইনের চোখে আমি যে অনি তা প্রমাণ করা শক্ত, এটা ওরা বুঝে গেছে।
কোর্টে তুললেও আমি বেকসুর খালাস। তাছাড়া আমার ওপর সেন্ট্রালের অনেক কিছু নির্ভর করে। সেটা এখনও তোমরা জানো না। পরে হয়তো জানবে।
তাছাড়া আমি ইংলন্ডের পাসপোর্ট হোল্ড করছি। আমি ভারতের নাগরিক নই।
তুমি বলবে ডিএনএ টেস্ট।
আমাদের দেশের সংবিধান বড়ো জটিল। একমাত্র মিত্রা যদি আমার এগেনস্টে কেশ করে, তার ছেলেমেয়ে আমার ঔরসজাত কিনা, ও যদি কোর্টে দাঁড়িয়ে ডিএনএ টেস্ট করাতে চায় তাহলে হবে, আর আমার ছেলে-মেয়েরা, নচেত নয়।
কি ডাক্তারবাবু মিললো আমার কথা?
সত্যি অনিমেষ এর ভেতরে যে এতটা প্যাঁচ আছে আমি বুঝতে পারি নি।
দেখলেন নীরু যখন ওসিকে প্রেসার করছে, ওদের মুখচোখ তখন কেমন শুকিয়ে গেছে।
সে তো তুমি বলার পর লক্ষ্য করলাম। ওকে নিয়ে এই কদিন মনের ওপর দিয়ে যেরকম টানা-হ্যাঁচড়া গেল ভাববার সময় পেলাম কোথায় বলো। দিনরাত শুধু ওকে নিয়ে ভেবেছি। একটা অপসান ফেল, আর একটা অপসান কাজে লাগিয়েছি।
কনিষ্ক একবার চারদিকটা দেখে নিয়ে বড়োমাদের ডেকে নিয়ে আয়।
এই যে মেয়েকে পাখি পড়ার মতো করে বললি, কাউকে বলবি না।
অনিমেষদার ডায়লগটা শুনলি না। নরমে গরমে দিল।
কনিষ্ক হাসছে।
আমাকে কিছু খেতে দিবি?
স্যুপ দিচ্ছি, আর কিছু খেতে চাইবি না।
তাই দে।
কেন ওকে গলা ভাত দে না। ডাক্তারদাদা বললো।
প্রেসারটা বেড়ে গেছিল। সুগারটাও বেড়ে গেছে।
এখন প্রেসার দেখেছিস।
নর্মাল আছে।
ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকাল।
দেখ তোর কিছু হলে অনেকের ক্ষতি হয়ে যাবে। আমার সব পরিশ্রম পণ্ড।
দেখবে আমার কিছু হবে না। আমি তো কারুর অনিষ্ট করতে চাইনি। যারা ক্ষতি করতে চায় তাদের আটকাবার চেষ্টা করি।
কে বোঝাবে তোকে।
অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
বিধানদারা কেমন আছেন?
সবাই ভালো আছে। তুই যাকে যেমন রেখেছিস।
সুযোগটা কাজে লাগান গেল না।
তোকে যে এতো লোকে ভালোবাসে জানতাম না। তাই অনেক ভেবে চিন্তে পা ফেলতে হচ্ছে। তোর রাজনীতি আমার রাজনীতি সমান নয়।
হাসলাম।
আমাকে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে।
এখন মন মেজাজ ঠিক নেই। পারবো না।
বেশি কথা বলতে হবে না। শুধু হ্যাঁ না বলবে।
পারবো না।
ঠিক আছে, বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে এমন কিছু ঘটবে যা প্রচণ্ড ঝড়ে পরিণত হবে, অনেক কিছু ওলট-পালট হয়ে যাবে। এই সুযোগটা কাজে লাগাও, এ ছাড়া এই মুহূর্তে আমার আর কোনও গতি নেই।
কি করতে চাইছিস বল!
বলা যাবে না। তবে পরিবেশ এবং পরিস্থিতির ওপর স্থির নজর রাখো। সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমি অসুস্থ না হলে ব্যাপারটা অন্যদিকে মোড় নিত। এখন অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। বলতে পার আমার হাতের বাইরে।
বড়োমারা সব হুড়মুড় করে আমার ঘরে ঢুকলো। ছোটোমা এসে জড়িয়ে ধরলো।
চোখ দিয়ে কেউ জল বার করবে না।
কে কার কথা শোনে। মিনিট পাঁচেক হুলুস্থূলুস চললো। একজন নার্স খাবার নিয়ে এলো। কনিষ্ক তার পেছন পেছন। আমার অবস্থা দেখে বললো।
দাঁড়া স্যালাইনটা খুলে দিই। নাহলে একটা অঘটন ঘটতে পারে।
আমি বাম হাতটা কনিষ্কর দিকে এগিয়ে দিলাম। কনিষ্ক খুলে দিল।
ছোটোমার চোখের জলে আমার কাঁধ ভিঁজে গেছে।
কনিষ্ক কয়েকটা চেয়ার আনতে বল।
বড়োমা আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
বুঁচকি তো সব রিপোর্ট করেছে, তাহলে ওরকম ভাবে তাকিয়ে আছো কেন। দেখো জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি, বৌদি কিরকম ভাবে তাকিয়ে আছে। দাদা, মল্লিকদা কোথায়?
বড়োমা চুপ।
ছোটোমা আমাকে ছেড়ে স্যুপের বাটিটা মেয়েটির কাছ থেকে নিল। মেয়েটি চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছে। আমাকে সকালে একরকম দেখে গেল, এখন আর একরকম দেখছে। কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
কনিষ্ক এটা কিসের স্যুপ। ছোটোমা বললো।
মিক্সড স্যুপ।
আমরা বাড়ি থেকে করে আনতে পারবো না।
বিকেলে করে এনো। মাথায় রাখবে মাটির তলার কোনও জিনিষ দেবে না।
কেন! ওর সুগার ধরা পড়েছে।
সামান্য।
এই রোগা পেটকা শরীরে সুগার!
কনিষ্ক হাসছে।
একজন এসে কয়েকটা চেয়ার দিয়ে গেল। ওরা সবাই বসলো।
বড়োমার দিকে তাকালাম।
নিজের বাড়ি ছেড়ে থাকতে একটু কষ্ট হচ্ছে।
বড়োমা মুখ নামিয়ে নিল।
সব ঠিক হয়ে যাবে, ভেব না।
দেখলাম মল্লিকদা দাদাকে ধরে ধরে এনে ঘরে ঢোকাল। দাদার হাতে লাঠি। মুখটা সামান্য বাঁকা। শরীরটা কেমন দুমড়ে মুচড়ে গেছে। একটা চোখ কেমন ছোটোছোটো।
খাট থেকে নেমে দাঁড়ালাম চোখ স্থির। আমি এগিয়ে গেলাম। দাদাকে জড়িয়ে ধরলাম।
তুই এখন ভালো আছিস। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।
তোমার এই অবস্থা…!
তোর কথা শুনে আর ঠিক থাকতে পারেনি। সেরিব্রাল হয়েছিল, বাঁদিকটায় প্রবলেম হয়েছে সামন্তদা ট্রিটমেন্ট করছে। বলতে বলতে মল্লিকদার গলা ভেঙে গেল।
আমি দাদাকে জড়িয়ে ধরলাম। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। চোখদুটো ভীষণ জ্বালা জ্বালা করছে। দাদাকে ধরে বসালাম।
হাঁটু মুড়ে দাদার পায়ের কাছে বসলাম। দাদা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। নিঃসার বাঁ হাতটা কেমন শরীর থেকে ঝুলে আছে। মুখে হাসি কিন্তু হাসতে পারছে না।
অফিসে গেছিলে? গলাটা ধরে এলো।
তিনমাস যাই নি।
আজকে একবার যাবে।
মাথা দোলাল, যাবে।
তিনটে লেখা পাঠিয়েছি। কালকে ছাপার জন্য।
দাদার মুখটা হাসিতে ভরে উঠলো। বাঁকা চোড়া এই হাসির মধ্যে সেই প্রাণোচ্ছলতা। বুকের মধ্যে আবার মোচড় দিয়ে উঠলো।
কি লিখলি?
কুড়ি বছর আগে লিখেছিলাম। সেটা ছাপতে বলেছি।
ঘরের সবাই চুপ। একমাত্র আমি দাদা কথা বলছি। বড়োমা আজ কোনও বাধা দিচ্ছে না। দাদাকে কোনও বকাবকি করছে না।
আমাদের বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছে।
আমি এখান থেকে ওই বাড়িতেই যাব, তুমি আমাকে সাতদিন সময় দাও।
তুই পারবি।
তুমি এখন বাড়ি যাও। আমাকে নিয়ে আর ভাবতে হবে না। আমি ভালো হয়ে গেছি।
একটু বসি।
দাদা আমার হাতটা চেপে ধরলো।
ঠিক আছে।
উঠে দাঁড়ালাম। মনের ভেতরটা যেনো আগুন জ্বলছে। তাড়াহুড়ো করা একবারে চলবে না। খুব সাবধানে ধীর স্থির ভাবে পা ফেলতে হবে। একটু বেসামাল হলেই পিছলে পরে যাব।
নিজের জায়গায় এসে বসলাম।
ছোটোমা আমাকে স্যুপের বাটিটা এগিয়ে দিল।
তোমরা খেয়েছো?
তুই খা। তোর শরীরটা ঠিক রাখতে হবে। ডাক্তারদাদা বললো।
আমি একা একা খাব?
তুই এখন রুগী।
তোমরা এখন সবাই চলে যাও।
তুই তাড়াতে চাইছিস কেন বল? বৌদি ঝাঁঝিয়ে উঠলো।
সুতপা তোমাদের সঙ্গে কথা বলার মতো মন বা মানসিকতা ওর এখন নেই। ও মনে মনে ঘুঁটি সাজিয়ে চলেছে। আমরা সব জেনেও তিনমাসে কিছু করতে পারিনি। কেন করতে পারি নি, সেটা জানার প্রয়োজন ওর নেই। ও ওর মতো চলবে।
আমার দিকে তাকাল। আমরা যে কিছু করবো ডকুমেন্টস কোথায়। আমাদের হাতে ডকুমেন্টস নেই। ডকুমেন্টস কোথায় আছে কার কাছে আছে ও ছাড়া কেউ জানেও না।
স্বগতোক্তির সুরে অনিমেষদা বললো।
এই তিনমাস অনেক সহ্য করেছি আর সহ্য করতে পারছি না।
বৌদির দিকে তাকালাম।
আমাকে বিশ্বাস করতে পারো বৌদি, মাত্র সাতদিন সময় চাইছি তোমাদের কাছে।
সারাটা জীবন নিজের কথা ভেবেছিস। তোর সঙ্গে যে আরও লোকজন আছে তাদের কথা একবারও ভেবেছিস।
চুপ করে রইলাম। এই সময় আর কোনও কথা বলা যাবে না। এরা বস্তুবাদে বিশ্বাসী। যতই রাজনীতি করুক, পরিশীলিত মনের অধিকারী হোক। শেষমেষ সেই সংসার।
কথা না বলে চুপ চাপ স্যুপ খেতে শুরু করে দিলাম।
নিস্তব্ধ ঘর।
নীরু ঘরে ঢুকলো। ঘরের পরিবেশ দেখে একটু থমকে গেল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে।
কি খবর আনলে নীরুবাবু। অনিমেষদা তির্যক ভঙ্গিতে বললো।
নীরু একবার আমার দিকে তাকাল।
সেরকম কিছু না।
খেলা যে তুমি শুরু করেছো সে বোঝার বয়স হয়েছে।
অরিত্র এসেছে।
তাহলে এই যে তুমি বললে কাজ শুরু হয়নি।
বৌদির দিকে তাকাল।
সুতপা এবার চলো। তুমি বললেও যা হবে, না বললেও তা হবে। ওর কাজ ও করে যাবে।
তুই আর ঝামেলায় জড়াস না। ছোটোমা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আমি না জড়াতে চাইলেও ওরা আমাকে জড়িয়েছে। তুমি বলো আমার কি করার আছে।
যে যা করে করুক।
তোমাদের এই ক-মাসে ঠিক থাকতে দিয়েছে। যদি আমি কিছু করে থাকি তাহলে আমাকে নিয়ে টানা টানি করুক, তোমাদের হ্যারাস করবার কি দরকার ছিল।
আমাদের কেউ হ্যারাস করে নি।
আমি কেন এই তিনমাস নার্সিংহোমে পরে রইলাম। কি অন্যায় করেছি?
ঠিক আছে সব বুঝলাম, তুই এবার থেমে যা।
কথা দিলাম থেমে যাব। তার আগে নিজের সম্মানটা ফিরিয়ে আনবো। মাথা নীচু করে নয়, মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।
বড়োমা একটা কথাও বললো না। শুধু কাপরের খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছে গেল।
ওরা একে একে সবাই চলেগেল। ঘর থেকে বেরবার আগে বড়োমা গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকাল। চোখে-মুখে সম্মতির ছোঁয়া। তুই যা করছিস ঠিক করছিস। আমি স্থানুর মতো কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। অনেকক্ষণ পর অরিত্র এসে ঘরে ঢুকলো।
আমাকে দেখে মরা হাসি হাসলো।
ভালো আছিস?
হ্যাঁ।
দাদাদের সঙ্গে দেখা হলো?
একেবারে শাঁড়াসি আক্রমণ। কোনও প্রকারে প্রাণ হাতে নিয়ে চলে এলাম।
চলে গেছে?
গাড়িতে উঠলো।
সবাই?
হ্যাঁ।
সুবলদের নিয়ে এসেছিস?
বাইরে আছে।
ডাক। কনিষ্ক কোথায়?
নিচে আছে, আসছে।
অরিত্র বাইরে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সুবলদের নিয়ে ঢুকলো। সুবল এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। ওর দেখা দেখি আর তিনজন ছেলেও তাই করলো।
তোদের ছিদাম কিছু বলেছে?
হ্যাঁ।
আমার ঘরের বাইরের করিডরে তোদের ডিউটি থাকবে। আমার পরিচিত লোক ছাড়া কেউ এই ঘরে ঢুকতে পারবে না। সুবল তুই থাকবি আমার গেটের সামনে, ওরা তিনজন করিডরে।
ঠিক আছে।
কনিষ্কদা তোদের ড্রেস দিয়ে দিচ্ছে পরে নে। বাকিটা ছিদামদা যে ভাবে ইনস্ট্রাকসন দিয়েছে সেই ভাবে চলবি।
আচ্ছা।
ওরা চারজনে বেরিয়ে গেল।
অরিত্র মোবাইলদুটো পকেট থেকে বার করলো।
টাকা ভরেছিস?
দুটোতে তিনহাজার করে ভরেছি। টক টাইম সাড়ে চারহাজার করে পাবে।
আচ্ছা।
নম্বরটা সকলকে দিয়েছিস?
একটা নম্বর সকলকে দিয়েছি। আর একটা নম্বর দিই নি।
কোনটা সকলকে দিয়েছিস বল?
সাদা মোবাইলটার নম্বর। লালটা কাউকে দিই নি।
দুটোর নম্বর মোবাইলে সেভ করে দিয়েছিস?
হ্যাঁ। সাদাতে আমাদের সকলের ফোন নম্বর সেভ করা আছে। সব নতুন নম্বর। একটা কথা বলবো—
বল—
সকালে তোমাকে যে সিম দুটোর কথা বলেছিলাম সে দুটো এখানে লাগায় নি। দুটো নতুন সিম কিনেছি।
কোথা থেকে?
ফ্রি পাচ্ছিলাম। একজনের থেকে নিয়েছি।
কার নামে তুলেছিস।
নেট থেকে দুটো ভোটার আইডি কার্ডের নম্বর আর নাম বার করে আপাতত দিয়েছি। লাইন চালু করে দিয়েছে। পরে ডকুমেন্টস দেব বলেছি। জানি তোমার তিন চারদিনের খেল।
অর্কর খবর কি?
ফোন করেছিল। বলেছি এক ঘণ্টা পর ফোন করতে।
ঠিক আছে। তোকে যা প্রশ্ন করবো তার উত্তর দিয়ে যাবি, তরপর তোর কথা শুনবো।
তার আগে একটা কথা বলে নিই।
বল।
তোমার লেখাটা পাওয়া গেছে। সন্দীপদা কিছু কথা বলতে চায়।
তুই পড়েছিস।
পড়েছি। কাল বেরলে আবার আগুন জ্বলবে। বহু ইন্টার লিঙ্ক নিউজ তৈরি হয়ে যাবে। আমার হাতেও কিছু মেটিরায়লস আছে।
রাতে গিয়ে লিখে ফেলবি উইথ ডকুমেন্টস। এই সাতদিনে নিঃশ্বাস ফেলতে দেব না। একবারে ছারখার করে দেব। সন্দীপকে ফোনে ধরে আমাকে দে।
তোমার শরীর ঠিক আছে?
যতো টেনসন নেব, তত শরীর ইমপ্রুভ করবে।
কনিষ্ক, নীরু, বটা, অনিকেত ঘরে ঢুকলো। বটাকে এখন অনেকটা ফ্রেস লাগছে।
কিরে টিনা আজ দেয় নি?
বটা প্রথমে বুঝতে পারে নি। একটু থেমে যখন বুঝতে পারলো তেড়ে গালাগাল দিল।
অনিকেত, নীরু হাসছে।
নারে নীরু ওর মুখ চোখ দেখে আমি ভাবলাম টিনা হয়তো ডিভোর্স করেছে।
দেখছিস কনিষ্ক, আমরা মরছি আমাদের জ্বালায় ওকে দেখ, দিব্যি আছে।
কনিষ্ক?
বল।
অনুপ, হিমাংশু কোথায়?
অনুপ মনে হয় এতক্ষণে দিল্লীর ফ্লাইট ধরে নিয়েছে। হিমাংশু কাল হাইকোর্টে ফার্স্ট আওয়ারে কাউকে দিয়ে প্লিড করাবে। তার তোরজোড় করছে।
ওদিককার কোনও খবর?
সব চুপ চাপ।
সাদা ফোনটা বেজে উঠলো। অরিত্র তুলে বললো, অর্ক।
কনিষ্ক বললো, শোনা যায়—
অরিত্র বললো, হ্যাঁ—
ভয়েজ অন কর, আমরা শুনবো।
অরিত্র ভয়েজ অন করলো। নিজেই ধরলো। অরিত্র হ্যালো বলতেই, অর্ক চেঁচিয়ে উঠলো।
ঢ্যামনা এতক্ষণ কি করছিলি?
এই তো সবে মাত্র অনিদার ঘরে এলাম।
কেমন আছে?
কথা বল। তোর কথা শুনতে পাচ্ছে।
রেকর্ডিং করছিস নাকি?
না, তবে সবাই শুনছে।
আর কে আছে?
কনিষ্কদারা আছে।
সরি কনিষ্কদা, স্লিপ অফ টাং। দাদাগো—
বল—
কতদিন পর তোমার গলা শুনছি।
কাঁদছিস নাকি?
একবারে না। চোখ দুটো পাথরের করে নিয়েছি।
তোকে কতোগুলো দায়িত্ব দেব।
শালা সিআইডি অফিসারগুলো জ্বালিয়ে পুরিয়ে মারছে।
কাল থেকে আর জ্বালাবে না।
নিশ্চই ঝোলা থেকে বাঘ বার করছো?
হ্যাঁ।
তোকে আমি পরে ফোন করছি। এই তিনমাসে যা মেটেরিয়াল তুলেছিস হাতের কাছে রাখ।
আচ্ছা।
লাইনটা কেটে দিলাম।
সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোনটা বেজে উঠলো। অরিত্রর হাতে দিলাম। দাদা এই নম্বরটা সেভ করা নেই মনে হচ্ছে কোড নম্বরটা দেখে মুম্বাইয়ের ফোন।
দে। হ্যালো—
অনিদা—
বলছি—
অর্জুন—
তুই কোথায়—
সবে মাত্র এয়ারপোর্টে নামলাম। তোমার গলাটা এরকম শোনাচ্ছে কেন?
কিছু শুনিস নি—
সব শুনেছি। দু-বার তোমায় দেখেও এসেছি।
অপারেশনরে পর গলাটা এরকম হয়ে গেছে। ঠিক হতে আরও মাস খানেক লাগবে।
অর্জুন চুপ করে রইলো।
কবে এসেছিলি?
একবার তোমার খুব টাফ পজিসন ছিল, জ্ঞান ছিল না। তখন এসেছিলাম। আর একবার তোমার জ্ঞান এসেছিল কিন্তু কাউকে তোমায় দেখতে দিচ্ছিল না।
তুই ঢুকলি কি করে?
আমাকে কে আটকাবে।
তোর সঙ্গে আর কে এসেছে?
আমি একা এসেছি। বাকি সব মিড নাইটের ফ্লাইটে আসছে।
তোর নম্বরটা সেভ করলাম।
তুমি কি এখন নার্সিংহোমে আছো?
হ্যাঁ।
ঠিক আছে।
আসার আগে একবার ফোন করবি?
আচ্ছা।
ফোনটা বন্ধ করে নম্বরটা সেভ করলাম। কনিষ্করা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
এটা কে?
একটা ছেলে।
সে তো গলা শুনেই বুঝলাম। এ তো যে সে ছেলে নয়—
কি করে শুনলি?
কান থাকলে শোনা যায়। এয়ারপোর্টে নেমে তোকে ফোন করছে। আবার তোর পিক টাইমে তোকে দেখে গেছে।
জানতে হবে না। তোদের যেমন ডাক্তারী করতে গেলে অনেকের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করতে হয়, আমাকেও তেমনি কাজ করতে গেলে অনেকের সঙ্গে পরিচয় রাখতে হয়।
গলা শুনে তো মনে হচ্ছে এ আলাপের অনেক ঊর্ধে।
অরিত্র ফোনটা এগিয়ে দিল।
রিং হচ্ছে সন্দীপদার ফোনে, ধরো।
হাতে নিলাম।
হ্যালো।
অনি।
বল।
তোর লেখা পেয়েছি। বাড়িতে আমার লকারে ছিল।
দেখে নিয়েছিস সব?
কমপোজ করে নিলাম।
ছবি গুলো ঠিক আছে?
দ্বীপায়ণকে টাচ করতে দিয়েছি।
ডকুমেন্টস গুলো স্ক্যান করেছিস?
হ্যাঁ।
লেখাটা রি-রাইট করেছিস?
সুমন্তকে দিয়েছি।
ওখানে আরো দুটো মাল পেয়েছি। ঝেড়ে দেবো?
বুঝলে ঝেড়ে দে।
দাদাকে জানিয়েছি—সন্দীপের গলাটা ভাড়ি হয়ে এলো।
আমি চুপ করে রইলাম।
অন্যায় করেছি?
না।
রবীনের হাত দিয়ে দাদাকে একটা কপি পাঠিয়েছি।
ভালো করেছিস—
তুই কিছু বলছিস না—
পরে বলবো—
ঠিক আছে রাখছি—
আচ্ছা—
বার বার চোখের সামনে দাদার ভাঙা চোড়া মুখটা ভেসে উঠছে। যতোবার চোখের সামনে মুখটা ভেসে উঠছে তত বুকের জ্বলুনিটা বেড়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে চুপ করে রইলাম।
যাক যা বলছি শোন, আমি তোদের কিছু কথা জিজ্ঞাসা করছি জানা থাকলে বল।
কনিষ্ক আমার চোখে চোখ রেখেছে।
নীরু একবার প্রেসার আর পাল্স-বিটটা কাউন্ট করে নে।
নীরু উঠে এলো।
টেবিল থেকে একটা ঘড়ির মতো কি নিয়ে এসে কব্জিতে বেঁধে দিল। তারপর হেসে ফেললো।
কি দেখলি?
ঠিক আছে।
কনিষ্কর দিকে তাকালাম, শান্তি—
অনিকেত হাসছে।
অরিত্র।
বলো।
সেদিন আমার ঘটনাটা প্রথম কে জানতে পেরেছিল?
শুভ।
কি করে?
তোমাকে নিয়ে আসার পর বড়োমা ম্যাডামকে ফোন করে সব জানায়। ম্যাডাম অর্ককে বলে। অর্ক সঙ্গে সঙ্গে শুভকে ওখানে পোস্টিং করে দেয়।
এরপর অর্ক তোমার বাড়িতে চলে আসে কিছুপক্ষণ পর সায়ন্তনও চলে আসে। সায়ন্তন শুভকে ফিডব্যাক দিতে শুরু করে। পরে শুভর সঙ্গে আরও তিনজন যায়। শুভকে অর্ক ফলো আপ করছিল। আমি হেড কোয়ার্টার ফলো আপ করছিলাম। ওরা বললো এই ধরণের কোনও খবর ওদের কাছে নেই।
তারপর!
এক ঘণ্টা পর অর্ক আমাকে ফোন করলো।
ইমিডিয়েট আয় অনিদাকে ইনজিওর্ড অবস্থায় পিজিতে এ্যাডমিশন করা হয়েছে।
গিয়ে কি দেখলি?
তুমি অজ্ঞান হয়ে পরে আছ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। অনিমেষদা কি সব কথা বলছে পুলিশের সঙ্গে। নেপলা মনে হয় গাড়ির নম্বরগুলো সব নোট করেছিল। সেগুলো দিয়ে ওখানেই একটা ডাইরী করা হলো।
আমাকে কারা ভর্তি করাতে নিয়ে গেছিল?
ডাক্তাররা সেটা কিছু বলতে পারছে না। বললো কয়েকজন এসে ওনাকে ভর্তি করে দিয়ে গেছে।
তখন এমন পজিসন তোমার চিকিৎসা হবে না আমরা লড়াই করবো।
তারপর ডাক্তারদাদা এলো। তখন ওই ডাক্তারগুলোর আর এক রূপ বেরিয়ে পরলো। সে কি তেল দেওয়া। ডাক্তারদাদাকে নিয়ে ভেতরে গেল। কি সব বলাবলি করলো। তারপর ডাক্তারদাদা নিজের বণ্ডে তোমাকে এই নার্সিংহোমে নিয়ে এলো।
নিউজ করা হয়েছিল?
আমরা সবাই যখন চাপ দিলাম। সিআইডি সব অস্বীকার করলো। বললো এরকম কোনও ঘটনা ঘটে নি। সবাই মিলে ঠিক করলাম শুভর তোলা ছবি দিয়ে ফোটো নিউজ করবো। সেই ভাবেই নিউজ করা হলো। পরের দিন বেলা বারোটা থেকে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল।
তিনজনের নাম জানলি কি করে?
অর্ক জোগাড় করেছিল।
আমাকে যারা নিয়ে এসেছিল তাদের ধরা হয়েছিল?
দূর তারপরেই তো আমাদের কাগজে হামলা হলো।
প্রথমে দাদাকে নিয়ে গেল পুলিশ হেডকোয়ার্টারে সে এক বিচ্ছিরি অবস্থা।
তোমাকে তখন বাঁচান টাফ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রেস ক্লাব প্রশাসনের ওপর এক হাত নিল। সিএম নিজে বললো আমি ব্যাপারটা টেক ওভার করছি। কে কার কথা শোনে, প্রশাসন তখন দু-কান কাটা।
ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াতে তোমাকে নিয়ে ঘন ঘন নিউজ। এর মধ্যেই ওই তিন অফিসারের বাচ্চা ছেলেগুলো স্কুল থেকে ফেরার পথে হাওয়া। অনাদিদার প্রশাসনিক প্রেসার শুরু হয়ে গেল। রাতে শ্যাম নিজে মিডিয়াতে সব জানাল। নাম ধরে ধরে পরিষ্কার বলে দিল। ওই তিনজনকে না পেলে ওদের বাচ্চাগুলোকে মেরে দেবে। এবং তার ভিডিও ফুটেজ মিডিয়াতে পাঠিয়ে দেবে।
তার সঙ্গে আমার নামটা জুড়ে দিল। আমি বললাম।
জুড়ে দিলো মানে।
তুমি ওদের জন্য যা করেছো এতদিন সরকার তা করতে পারে নি। তুমি ওদের কাছে ভগবান।
ওই পাশে আগুন জ্বলতে শুরু করলো। শ্যাম এও পর্যন্ত হুমকি দিল, ওই পরিবারের যদি কোনও অনিষ্ট হয় তাহলে অনাদিদাকে পর্যন্ত মেরে দেবে।
সঙ্গে সঙ্গে অনাদিদা সবাইকে এ্যারেস্ট করতে শুরু করলো। ফলস কেস। প্রথমে ইসলামভাইকে দিয়ে বউনি। দাদাকে একরাত রেখেছিল। ভাগ্যিস অনুপদা চলে এসেছিল। বার করে আনলো।
আমাদের কথা ছাড়ো, আমরা ইয়লো জার্নালিজম করেছি তার দায়ে জেল খানার মুখ দেখতে হয়েছে। আমি, অর্ক, শুভ। শুভকে কয়েকটা চড় থাপ্পর কষিয়েছিল। পাকা ছেলে বলে।
সবাইকে একরাত করে অনাদিদা জেলখানাটা কেমন দেখতে ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছে। অনুপদা রেগুলার কোর্টে প্লিড করে সবাইকে বার করে।
অনিসা, অনন্য।
মিথ্যে কথা বলবো না। শুধু দাদাকে ডাকা ছাড়া কাউকে ছোঁয় নি। পুলিশ পাঠিয়ে ইনট্রোগেশন করেছে। কনটিনিউ প্রেসার ক্রিয়েট করে গেছে।
এরপর আমাদের অফিসে নতুন ইউনিয়ন গজিয়ে দিয়ে গেম খেলতে চাইল। পারে নাকি, সবাই মিলে একদিন এমন ধোলাই দিল ছেলেগুলোকে, ইউনিয়ন উঠে গেল। সেই লোকগুলোর পর্যন্ত চাকরি চলে গেল। তারা এখন রেগুলার অফিসের সামনে এসে অনাদিদার বাপ-বাপান্তর করছে।
ওই তিনজনকে ধরা হয়েছিল?
হয়েছিল, কিন্তু প্রমাণাভাবে ছাড়া পেয়েছে। তারা ডিনাই করেছে ওরকম কিছু সেদিন ঘটে নি।
তাহলে কাগজের ছবি গুলো।
তাতে ওদের ছবি ছিল না। যাদের ছিল, তারা এখনও ভেতরে। বেরতে পারে নি। ওপর তলা মুখ মুছে নিয়েছে। সব দোষ ওদের ঘারে দিয়ে দিয়েছে।
বাচ্চাগুলো।
এখনও শ্যাম ছাড়ে নি। বাচ্চাগুলো এখনও ঠিক আছে, তবে বাচ্চার বাপেদের মধ্যে একটাকে প্রায় উড়িয়ে দিয়েছিল, ভাগ্য জোড়ে বেঁচে গেছে। এখনও মনে হয় নার্সিংহোমে ভর্তি। ভদ্রলোকের সঙ্গে যে দু-জন বডিগার্ড ছিল মারা গেছে। অনাদিদা এখন জেড প্লাস ক্যাটাগরির ভিআইপি।
কাগজের হাল হকিকত।
প্রথম দশ পনেরো দিন বহুত ঝামেলা হয়েছিল, তারপর যেই কে সেই।
দাদার স্ট্রোক কবে হয়?
অরিত্র চুপ করে গেল।
কোথায় হয়েছিল?
অফিসে।
কবে?
পুলিসের হেডকোয়ার্টার থেকে ফিরে এসে।
কে ডেকে পাঠিয়েছিল?
এখন যে সিপি হয়েছে সে।
নিশ্চই ধোয়া তুলসী পাতা নয়। ইনফর্মেশন জোগাড় করেছিস।
অর্কর কাছে সব আছে। তুমি উত্তেজিত হবে না। প্রশাসন এখন টলোমলো।
সব টাল খাইয়ে দেব।
নিউজ মিডিয়া, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া সব এগেনস্টে দু-একটা বাদে।
দেখলাম অনিমেষদা, বিধানদা, প্রবীরদা ঘরে ঢুকলো।
আমার চোখে চোখ রেখে হেসে ফেললো।
সব খবর গুছিয়ে নিয়ে নিয়েছিস—অনিমেষদা বললো।
চুপ করে রইলাম।
একটু শান্তিতে বাঁচতে দিবি না।
আমি কি অশান্তি করলাম!
কনিষ্করা উঠে দাঁড়িয়ে বসার জায়গা করে দিল।
প্রবীর তুমি বলো ও কি অশান্তি করলো?
দাঁড়ান না। এবার ওকে থামাতে আমাদের লড়তে হবে। অনাদি চুলোর দোড়ে যাক।
সবাই প্রবীরদার মুখের দিকে তাকিয়ে। একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে।
কনিষ্ক। অনিমেষদা খুব ধীর স্থির ভাবে বললো।
সবে খেতে বসেছিলাম। খাওয়া হয়নি। একটু চায়ের ব্যবস্থা করতে পারিস।
আর কিছু খাবেন?
কিছু স্ন্যাক্স পারলে নিয়ে আয়। তিনজনের জন্য।
আমার দিকে চাইলো।
বিধানবাবুকে দেখতে চেয়েছিলি। দেখ মুখটা।
বুঝতে পারছি অনিমেষদা ভেতরে ভেতরে ভীষণ রেগে গেছে, মুখে কিছু বলতে পারছে না।
আমাদের আগে একটু চা দে। তোরা বাইরে গিয়ে বোস।
ওরা সবাই বেরিয়ে গেল।
বিধানদা এগিয়ে এসে আমার দু-কাঁধে হাত রাখলো। আমি মাথা নীচু করে আছি।
আমার দিকে তাকা?
মাথা তুললাম না।
তাকা না। একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?
আমি মাথা তুললাম।
আমাকে তোর বিশ্বাস হয় না?
তবু চুপ করে রইলাম।
বল না?
হ্যাঁ হয়।
তাহলে এই সব নোংরা খেলায় মাতছিস কেন?
আমি কোনও নোংরা খেলা খেলছি না।
অর্জুন কেন কলকাতায় এসেছে?
আমার গালে কেউ যেন ঠাস করে একটা থাপ্পর মারল। তাহলে কি এই কারণে এরা এই মুহূর্তে আমার কাছে এসেছে!
অনিমেষদার দিকে তাকালাম। বুঝলাম আমার চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে।
অনিমেষ না, আমার দিকে তাকা।
আপনি চলে যান।
তাহলে অর্জুন তোর ডাকে কলকাতায় এসেছে।
চুপ করে রইলাম।
এবার বল জানলাম কি করে। অনিমেষদা খ্যার খ্যার করে উঠলো।
তুমি কোনও কথা বলবে না।
কেন বলবো না। যে লোকটা দু-দুবার এই নার্সিংহোমে এসে ঘুরে গেছে, কাক পক্ষী পর্যন্ত টের পায় নি। শেষ বার যাবার সময় তোকে যে ঘুসি মেরেছিল, সেই সতপাল রানাকে গুলি করে গেল, ভাগ্যের জোড়ে লোকটা বেঁচে গেল। মরলো ড্রাইভার আর দেহরক্ষীটা। ইন্টারপোল যার পেছনে আজ সাত বছর হন্যে হয়ে ঘুরছে, পটাসিয়াম সায়োনাইডের টিউব জিভের তলায় দিয়ে যে এ্যাকসন করে, সে কি করতে কলকাতায় এসেছে, কেন এসেছে, একটা দুধের শিশু পর্যন্ত বলে দিতে পারবে।
মাথা তুলে দেখলাম কনিষ্করা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে।
বুঝতে পারছি আমার চোখের রং বদলে গেছে।
তুমি চলে যাও। আমাকে আমার কাজ করতে দাও।
কেন যাব, সবে খেতে বসেছিলাম, তোর বৌদি ভাতের থালা থেকে তুলে দিয়েছে। যে মানুষ দুটোকে গত তিনমাস বুঝিয়ে শুনিয়ে হাত-পা বাঁধার মতন ফেলে রেখে দিয়েছি, চব্বিশটা ঘণ্টা গুমড়ে গুমড়ে মরছে। কাউকে মনের কথা পর্যন্ত বলতে পারে না। সে আজ তোর বৌদিকে ফোন করেছে, বৌদি আপনারা ওকে থামান। ও আগুন জ্বালিয়ে দেবে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে।
ইসলামভাই কোথায়?
তোর জেনে কি হবে।
অনিমেষদা খানিকটা চেঁচামিচি করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি মাথা নীচু করে বসে আছি।
বিধানদা আমার কাঁধে হাত দিয়ে তখনও দাঁড়িয়ে।
অনিমেষটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, শুধু উল্টপাল্টা বকছে। মনে কিছু করিস না।
তবু আমি মুখ তুললাম না।
বল না অর্জুন কেন এসেছে। আমি জানি আগের ঘটনাটা ও নিজে থেকে ঘটিয়েছে। তুই তখন অসুস্থ, তোকে দেখে ও নিজেকে সামলাতে পারে নি।
বিধানদা নিজেই আমার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে থুতনিটা ধরে মুখটা তুললো।
ও কারুর ক্ষতি করতে কলকাতায় আসে নি।
তুই তো ওকে ডেকে পাঠিয়েছিস, এটা ঠিক।
হ্যাঁ।
সেটাই তো জানতে চেয়েছি। কেন?
ইসলামভাই, ইকবালভাইদের দিয়ে যে কাজটা করা যাবে না, সেই কাজটুকু ও করে চলে যাবে।
বিধানদা হাসছে। প্রবীরদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। দুজনে এবারে চেয়ারে বসলো।
কনিষ্কই একমাত্র ঘরে দাঁড়িয়ে। আর সবাই ঘরের বাইরে।
চা এলো। ওদের দিয়ে নার্স মেয়েটা বেরিয়ে গেল।
কনিষ্ক, অনিমেষ কোথায়? বিধানদা বললো।
বাইরে আছেন।
একবার ডাক।
কনিষ্ক বেরিয়ে গেল।
তুই তো অনুপকে, রূপায়ণকে একেবারে পাত্তা দিস না। তাই নিয়ে আসি নি।
আমি চুপ।
তোর কথা মতো সুতপার শেয়ারগুলো সুরো আর অংশুর নামে ট্রান্সফার করা হয়েছে।
বুঝলাম বিধানদা একটা একটা ঢিল ছুঁড়ে চলেছে। কোনটা গিয়ে লাগবে নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
অনিমেষদা ঘরে ঢুকল। চোখা চোখি হলো। একটা চেয়ারে বসলো।
দেখ যেটা ঘটে গেছে। সেটা ফিরে আসবে না। আমরা যতটা পেরেছি সামলে দিয়েছি। হ্যাঁ কিছু কিছু জায়গায় আমরা ফেল করে গেছি। সেখানে ক্ষমতটা আসল কথা।
বিধানদা একবার চায়ে চুমুক দেয় আর কথা বলে।
তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?
বলো।
মিঃ বাজরিয়ার কেশটা কি অর্জুন ঘটিয়েছিল?
হ্যাঁ।
অনিমেষদা হাসছে।
অনিমেষ হাসবে না ও স্বীকার করে নিয়েছে।
বিধানদা আমার দিকে তাকাল।
গোটা পৃথিবী জানলো ওনাকে শ্যামরা ল্যান্ডমাইনে উড়িয়েছে।
আমি চুপ করে রইলাম।
জানিস আমি অনিমেষ এই তিন মাসের মধ্যে একবার দুবাই গেছিলাম।
আমি মাথা তুললাম।
বিধানদা হাসছে।
তোর প্রচুর সম্পত্তি।
আমি বিধানদার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।
বিশ্বাস হচ্ছে না। তোর বড়োমাকে জিজ্ঞাসা করিস।
দাদাকে পুলিশ হেডকোয়াটারে ডেকে নিয়ে যায় কোন সাহসে। তোমরা তখন কি করছিলে?
চলবে —————————
from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/Dl3Urqy
via BanglaChoti
Comments
Post a Comment