কাজলদিঘী (৯৯ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

৯৯ নং কিস্তি
—————————

সুবীর ঘরে এলো। পেন আর কাগজটা আমার হাতে দিল।

আমি জমা দেওয়ার স্লিপটা বাঁহাতে ফিলাপ করলাম। ইসলামভাই এক দৃষ্টে আমাকে দেখে যাচ্ছে।

ডিনোমিনেসনটা বলো। সুবীরের দিকে তাকালাম।

সব হাজার টাকার নোট ছিল।

আমি সেই ভাবে ফিলাপ করে আজকের ডেট দিয়ে নিজে হাতে সই করলাম।

সুবীরের দিকে তাকালাম।

মাথায় ঢুকছে না?

সুবীর মাথা দোলাল।

বেশি ঢুকিয়ে কাজ নেই মাথা ফুটো হয়ে যাবে। আমি তিনবছর পরে কি হতে পারে তা ভেবে কাজ করছি।

সুবীরের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল।

শত্রুকে কখনও নিজের মুঠো থেকে রিলিফ দেবে না। তাহলে সে তোমায় হিট করবে। সেটা মারাত্মক, তাকে তোমার হাতের মুঠোয় চেপে ধরে দম বন্ধ করে দেবে। একটু খুলবে, দেখবে সে রিলিফ পেলো, আবার মুঠোয় এনে ফেলবে, এইভাবে চলবে, দেখবে তাতে বেশ মজা।

ইসলামভাই হাসছে।

তোর মাথায় ঢুকছে না।

না দাদাভাই। সুবীর বললো।

তোকে বুঝিয়ে দেব। সেরকম ধাক্কা এখনও খাস নি।

সুবীর মাথা নীচু করলো।

এটাকে স্টাম্প মেরে আমাকে এনে দাও।

একটা আমাদের কাছে থাকবে।

হ্যাঁ। আর একটা আমার কাছে। টাকাটা আমি জমা দিচ্ছি।

দাদা একটু খুলে বলুন না।

ঠিক আছে স্টাম্প মেরে নিয়ে এসো, বলছি।

সুবীর চলে গেল।

চিকনা আর বাসু ঘরে ঢুকলো।

কিরে সুবীর হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ো দৌড়ি করছে?

দু-জনে আমার পাশে এসে বসলো।

তুই এখনও খাস নি? বাসু বললো।

খাচ্ছি।

আগে খা তারপর কথা বলবি। এখন অনেকটা হাল্কা হয়ে গেছে।

তোরা খা।

আমরা খেয়েছি।

বাসু নিজেই টিফিন ক্যারিয়ারটা খুললো। আমি দেখে অবাক হয়ে গেলাম।

দেখছিস তোর বৌয়ের কীর্তি। আমাকে জন্মেরশত খাওয়ার পাঠিয়েছে।

ও জানে তুই একা খেতে পারিস না।

দুটোর বেশি একটাও খাব না। বাকিটা তোরা ভাগাভাগি কর।

নেপলা আমার বলার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলো।

চিকনা একটু কড়া করে চা বল না।

সুবীর ঘরে ঢুকলো। স্লিপটা আমার হাতে দিল।

এটা কি সুবীর? চিকনা বললো।

কালকের সেই টাকাটা।

নিশ্চই কোনও ঝামেলার গন্ধ।

অনিদা তাই বলছে।

সুবীর বসলো। আমার দিকে তাকাল।

এবার বলুন।

আগে পরোটা আর আলুভাজা খাও, তারপর বলছি।

চিকনা হাসলো। খেতে খেতে বললো।

সুবীর তোকে আজ নিয়ে তিনদিন দেখছে। তাই না?

হবে হয়তো।

বাবা সুবীর, আমরা ওকে ছেলেবেলা থেকে দেখছি। কতো মারামারি পেটাপিটি করেছে তার ইয়ত্তা নেই। এখন একটু একটু চিন্তে পারি। তুমি বাবা তারাহুড়ো কোরো না।

এই আরম্ভ করে দিলে। সুবীর বললো।

মীরচাচা ঘরে ঢুকলো।

আমি ইসলামভাইয়ের দিকে তাকালাম।

মীরচাচাকে একটা দাও।

আমি খেয়েছি।

আমি জানি তুমি খেয়েছো। একটা পরোটা খাওয়ার মতো জায়গা তোমার পেটে আছে।

তুই এমন ভাবে কথা বলিস, না ইচ্ছে থাকলেও খেতে হয়।

দেরি কোরো না চা এসে যাবে। চিকনা বললো।

আমি একটু জল খেয়ে, সুবীরের দিকে তাকালাম।

আজকে হালচাল কি?

বেশ ভালো।

ব্যাপারটা কি জানার জন্য মনটা খুব উসখুস করছে তাই না?

সুবীর হাসলো।

আমি গল্প বলছি, তোমাকে ভেতরের ব্যাপারটা বুঝে নিতে হবে।

সুবীর আমার দিকে স্থির চোখে তাকাল।

ইসলামভাই, ইকবালভাইও আমার দিকে তাকিয়ে।

মণ্ডলের জামাই ব্যাঙ্ক থেকে বেশ কিছু টাকা লোন নিয়েছে। ফেরত দেয়নি। ব্যাঙ্ক থেকে তাকে প্রেসার দেওয়াতে সে স্বীকার করেছে তার কাছে এখন টাকা নেই। মণ্ডলের জামাই কাঞ্চনিমাসির নাতি। মাসি তাকে আমার কাছে নিয়ে এলো।

আমি একটা স্টাম্প পেপারের ওপর একটা এগ্রিমেন্ট করে তাকে ব্যাঙ্কিং ইন্টারেস্ট সমেত পনেরো লাখ টাকা ক্যাশ ধার দিলাম। উদ্দেশ্য সে ব্যাঙ্কের টাকা শোধ করবে। আমার সোর্স কি যদি বলতে চাও হাজার একটা আছে। আমি দেখিয়েও দিতে পারি, আবার প্রমাণও দিতে পারি। বিনিময়ে সিনেমা হলের কাগজ বন্ধক হিসাবে তার কাছ থেকে নিয়ে নিজের কাছে রাখলাম। পরে ব্যাঙ্কে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম সে এক টাকাও জমা দেয়নি। চেপে ধরলাম। তখন সে চারলাখ টাকা নিজের কাছে রেখে এগারোলাখ টাকা আমাকে ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার জন্য দিল।

কালকে আমার জমা দেওয়ার কথা, কিন্তু কালকে আমার বহু ঝামেলা ছিল। তাই ব্যাঙ্কে আসতে পারিনি। আজ জমা দিলাম। তোমরাও তার ইন্টারেস্ট মুকুব করলে।

পরবর্তী কালে গল্পটা পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী এরকম না হয়ে অন্য রকমও হতে পারে। তোমাকে একটা হিন্টস দিলাম।

সুবীর আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। বাসু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।

যদি কম বেশি হতো। চিকনা বললো।

তাহলে ও টাকা অন্য জায়গায় খাটিয়েছে।

তোর টাকা!

দিয়েছি নাকি। শুধু কাগজ বানিয়েছি।

তোর মাথায় এগুলো ইনস্ট্যান্ট আসে?

না, পরিবেশ পরিস্থিতি গল্প তৈরি করে দেয়।

তুই কি ভাবছিস ও তোকে টাকা দেবে।

ও জীবনে দিতে পারবে না। সিনেমা হলটা বন্ধক রেখেছে। তার কাগজ ওই বাক্সে ছিলো। আমি নিয়ে নেবো। তারপর ওটাকে গোডাউন বানাবো। গ্রামের মানুষ যা ফসল ফলাবে কিনে ওখানে রাখবে। শহর থেকে চালানদারদের এনে উৎপন্ন মাল শহরে চালান করে দেব। না হলে ফার্মে বেচে দেব। ফার্ম যা করে তাই করবে।

খুব বেশি হলে ভাড়া কম রেখে ছোটো একটা কোল্ডস্টোরেজ বানিয়ে দেব। আমার গ্রামের চাষীরা উপকৃত হবে।

তার মানে মণ্ডলের জামাই গল্প হয়ে গেল!

চিকনা এমনভাবে বললো, সবাই হাসলো।

অনাদির কি করবি? মীরচাচা বলে উঠলো।

সময় লাগবে চাচা। তবে ও আবার গ্রামের ছেলের মতোই হবে, এটা তোমাকে বলতে পারি।

শাস্তি দিবি না।

তাহলে ঠগ বাছতে গাঁ উজার হয়ে যাবে।

মীরচাচা চুপ করে গেল।

একটা ছেলে চা নিয়ে এলো সঙ্গে সঞ্জু এলো।

কিরে দোকান বন্ধ করে দিয়েছিস? আমি বললাম।

হ্যাঁ।

এবার খাওয়া দাওয়া দিবা নিদ্রা।

না। খেয়ে চলে আসবো। জেনারেটরটা খুলেছি। একটু তেল জল দিতে হবে।

ছেলেটা সবার হাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল।

সুবীর তখনও গুম হয়ে বসে আছে।

কি সুবীরবাবু এখনও রেশ কাটলো না।

সুবীর আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

হাসছো কেনো?

আপনার কিছু কথা চিকনাদার মুখে শুনেছি, সঞ্জুদা, বাসুদা মাঝে-মাঝে বলে। সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। ঠিক মেলাতে পারছি না।

কি রে! আবার কি হলো? সঞ্জু বললো।

কালকে মণ্ডলের জামাইয়ের ঘটনা। চিকনা বললো।

তুই তো বললি ব্যাঙ্কে ঢুকিয়ে দিয়েছিস।

সেই টাকা কিভাবে শো করা হবে তাই বলছিল।

সুবীর কুপোকাত?

বাসু হাসলো।

এবার আমাদেরটা বল। মীরচাচা বলে উঠলো।

তোমাদের আবার কি? চিকনা বললো।

ও বলেছে একটা প্ল্যান দেবে তাতে সোনা ফলে যাবে।

চিকনা আমার দিকে তাকাল।

কেন বুড়োটার মাথা খারাপ করবি।

তুই থাম না বাপু।

ওর কথা শুনোনা চাচা, যেটুকু আছে সেটুকুও চলে যাবে।

তোর গেছে, তুই তো বেশ আছিস।

চিকনা চুপ করে গেল।

তোমার কতো বিঘে জমি আছে?

মীরচাচার দিকে তাকালাম।

কুড়ি বিঘের মতো।

বছরে কতো ধান পাও।

এক বিঘেতে?

হ্যাঁ।

ধর চল্লিশমন।

তার মূল্য কতো।

হাজার দশেক টাকা। খুব ভালো দাম পেলে আর একটু বেশি।

খরচ কতো পরে?

হাজার সাত থেকে আট।

তারমানে তোমার হাজার তিন-চারেক টাকা থাকে।

ওইরকম।

তোমার জমির আশেপাশে কাদের জমি আছে?

আমাদের ফ্যামিলিরই বেশি। বাকিটা বিষই পাড়ার। তাঁতী পাড়ার কিছুটা আছে।

আচ্ছা একসঙ্গে চল্লিশবিঘে জমি পাশাপাশি হবে তোমাদের পরিবারের।

চেষ্টা করলে হয়ে যাবে, তার বেশিও হতে পারে।

একসঙ্গে চল্লিশবিঘে কিংবা তার বেশি জমি যদি পাও তাহলে একসঙ্গে সবাই মিলে চাষ করো।

সে হবার নয় মারপিট লেগে যাবে।

কেন?

এ বলবে আমার জমির ফলন বেশি তোর কম। এইসব।

ভুল কথা। তুমি তোমার জমির যতটা যত্ন নাও আর একজন নেয় না। তাই ফলন বেশি কম হয়। যদি একসঙ্গে চাষ করো দেখবে ট্রাক্টরের খরচ, ধান বোনার খরচ, ধান কাটার খরচ, ধান তোলার খরচ, ম্যায় মুনিসের খরচ সব কমে যাবে।

তারওপর ব্যাঙ্ক তোমাদের যদি ব্যক্তিগত ভাবে বিঘে প্রতি পাঁচ হাজারটাকা লোন দেয়, সেটা দেখবে একজায়গায় জড়ো করলে আরও বেশি লোন পাবে।

এমনকি ফলনও তুমি আগের থেকে বেশি পাবে।

তাই!

ডবল না হলেও কাছা কাছি পাবেই। আমি এটুকু বলতে পারি। আমার কথা শুনে একটা ফসল করো না। না পোষালে করবে না। আবার পূর্বো অবস্থায় ফিরে যাবে।

ঠিক আছে একবার জ্ঞাতিদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখি।

তবে মাথায় রাখবে। গতবারে ওই জমিতে কার কতো ধান হয়েছিল তার একটা হিসাব করে নেবে। দেখবে তার থেকে বেশি হচ্ছে কিনা। তারপর যার যতোটা জমি আছে সেই ভাবে ধান ভাগ করে নাও। তাতে দেখবে খরচ কম লাভ বেশি।

চাচা তুমি না করলেও আমি, পচা, পাঁচু করবো। আমাদের জমি পাশাপাশি জোড়া লাগালে দশবিঘের বেশিই হবে। চিকনা বললো।

আমারটা ঢুকিয়ে নে। সঞ্জু বললো।

তোর কনটা।

ওই যে পাঁচুদের কোনার জমিটার পাশে দুবিঘে মতো যেটা পরে আছে। সঞ্জু বললো।

তবে তার আগে নিজেদের মধ্যে একটা এগ্রিমেন্ট করে নিবি। কার কতোটা জমি এই স্কিমে রাখা হচ্ছে। না হলে পরে গণ্ডগোল হবে। আর ওই এগ্রিমেন্টের ওপর বেইজ করে ব্যাঙ্ক লোন দেবে।

তুই তো সুবীরের কাজ বারালি। ইসলামভাই বললো।

একেবারেই না, বরং কমালাম। সুবীরকে চারজনকে লোন দিতে হতো। চারজনের কাগজ তৈরি করতে হতো। চারবার মেইনটেন করতে হতো। এখানে একটা এগ্রিমেন্টের ওপর কাজ হয়ে যাচ্ছে। একটা মেইনটেন করলেই চারজনেরটা মেইনটেন হয়ে যাচ্ছে।

আইডিয়াটা বেশ ভালো। ম্যানেজার বললো।

অনেকটা সমবায় ভিত্তিক।

আমি হাসলাম।

আমার বুদ্ধি নয় বইপড়া বিদ্যে আউড়ালাম। ওরা যদি করতে পারে দেখবো পুঁথিগতো বিদ্যে কতটা কাজে লাগাতে পারলাম।

এটা ইমপ্লিমেন্ট করতে পারলে কিন্তু দারুণ হবে। আমাদের সরকারি বহুস্কিম আছে আমরাও কো-অপারেটিভকে হেল্প করতে পারবো।

ওই স্কিমগুলো মাথায় আছে। একচ্যুয়েলি সরকারি যে নীতি নির্ধারণ করা হয় তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ কিন্তু তার ইমপ্লিমেন্টেশন ঠিক হয় না বলে উন্নতির পথ রুদ্ধ হয়ে থাকে।

একদম ঠিক কথা। আপনি এসব খোঁজ-খবর নেন কখন? ভাববার সময়ই বা পান কখন?

আমি যে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই।

ভদ্রলোক খুব জোড়ে হেসে উঠলেন।

ইসলামভাই আমরা মেজাজে গল্প করে চলেছি, দুটো মক্কেল গেলো কোথায়?

নেপলার দিকে তাকালাম।

একবার অনুপদাকে ফোন কর না।

আর এক রাউণ্ড চা হয়ে যাক। ইকবালভাই বললো।

হলে খারাপ হয় না।

সঞ্জু দেখ না কানাইদার ছেলে খুলে রেখেছে নাকি। চিকনা বললো।

আমাদের যে চা করে তাকে বলি। সুবীর বললো।

নেপালার গলা পেলাম। তোমরা কোথায়?…. পৌঁছেগেছো….ঠিক আছে।

কোথায় রে? আমি বললাম।

বাঁধে উঠেছে। মিনিট খানেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে।

ওদের জন্যও চায়ের কথা বলো।

সুবীর উঠে গেলো।

মীরচাচা।

বল।

আমি আগামী সপ্তাহে আসবো। এদিকটা ভালো করে দেখবে।

তোকে বার বার কইতি হবে নি।

বাসু।

বল।

স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিকে রিজাইন দেবার জন্য প্রেসার কর। আশারাখি কাজ হবে। তারপর আমি আগামী সপ্তাহে আসবো, তখন যা করার করবো।

রিজাইন যদি দেয় তখন কি হবে?

ছাগল, নতুন ম্যানেজিং কমিটি তৈরি হবে। সঞ্জুর ছেলে পড়ে ও সেক্রেটারী হবে।

তুই কি এখানেও ছক করে রেখেছিস? চিকনা বললো।

ইসলামভাই আবার হাসলো।

বড়দিদিমনিটা সুবিধার নয়। সেক্রেটারীর সঙ্গে লটঘট কেশ আছে।

আচ্ছা তুই ঘরের বাইরে বেরোস নি। খবর পেলি কি করে! চিকনা বললো।

গন্ধে বুঝলি, দুয়ে দুয়ে চার।

বাসু, সঞ্জু হাসছে।

কাল দেখলি না মণ্ডলের জামাই কেমন তরপে উঠলো, বেশি বাড়াবাড়ি করলে সব ফাঁস করে দেব।

কাল রাতে কি কথা হয়েছিল মনেই নেই। তোর মনে থাকে কি করে? বাসু বললো।

এখানেই গণ্ডগোল।

তুই আবার নতুন করে ঘুঁটি সাজাতে শুরু করেছিস। চিকনা বললো।

তা একপ্রকার বলতে পারিস। ও ভুলে যাব একটা উপকার কর না।

আবার কি মনে পড়ে গেল! বাসু বললো।

হাসলাম।

আমাকে গোটা দশেক প্যান্টের পিস আর জামার পিস দে। একটু ভালো কোয়ালিটির।

কার জন্য?

তোকে জানতে হবে না।

একবারে একডজন করে নিয়ে নে। একটু কম পয়সা হবে।

বাসুর কথায় হেসেই যাচ্ছি, তাই দে।

নেপলা চলে যাও বেছে বেছে নিয়ে আসবে।            

বাসুর কথায় নেপলা, আবিদ, সাগির তিনজনেই উঠে দাঁড়াল।

হুড়মুড় করে অনুপ, হিমাংশু ঢুকলো।

নেপলা একটু ঠান্ডা জল খাওয়াতে পারবে। ঢুকতে ঢুকতে অনুপ বললো।

একটু বোস। আমি বললাম।

পেট আঁইঢাঁই করছে।

কেনো!

লোভের মারে দুজনে তোদের এখানকার ছানার জিলিপি আর রসোগোল্লা সাঁটিয়ে দিয়েছি।

কতোগুলো?

প্রায় গোটাদশেক করে।

এ্যাঁ!

তাহলে কেল্ডড্রিংকস আনি। নেপলা বললো।

তাই আনো। খেয়ে যেন দু-চারটে ঢেঁকুর ওঠে।

বুড়ো বয়সে লোভ এখনও গেল না। আগে চা খাবি না আগে ঢেঁকুর তুলবি।

দুটোই।

এবার সকলে হাসলো।

আমি একা, হিমাংশুও খেয়েছে।

কই ওতো ঢুকে বলে নি, তুই বললি কেন। তারমানে তুই সহ্য করতে পারিস না।

অনুপ হাসছে।

নেপলারা বেড়িয়ে গেল।

ওনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না। হিমাংশু বললো।

তোরা যেখানে গেছিলি, উনি ওখানকার স্টেট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার।

অনুপ, হিমাংশু দুজনেই ওনার সঙ্গে হাতে হাত রাখলো। আমি ওদের পরিচয় দিলাম।

আপনার ব্যাঙ্কে একটা চিঠি দিয়ে এসেছি। ফর্ম্যাল। অনুপ বললো।

কেন আমি আবার কি অপরাধ করলাম।

আপনি ওই নিতাইবাবুকে একটা লোন দিয়েছেন কাগজপত্র না দেখে।

আমি না আমার আগের ম্যানেজার।

ওই হলো উনি দিয়েছেন এখন আপনাকে হেপা পোহাতে হবে।

ম্যানেজার ভদ্রলোক হাসছেন। ওরা আমার পাশে এসে বসলো। বাসু, চিকনা জায়গা করে দিল।

তোর এখানকার বিএলআরও মশায়ের পুরে প্যান্টা জামা খুলে দিয়েছি। অনুপ বললো।

করেছিস কি! অফিসের মধ্যে লেংটো হয়ে কাজ করবে কি করে!

শালা বজ্জাতের এক শেষ।

তুই আজকে এই কালো প্যান্ট আর কোট পরে গেছিস কেন?

বোঝাতে হবে না আমি কে। নাহলে ব্যাটারা পাত্তা দেবে—

ইসলামভাইরা মুচকি মুচকি হাসছে।

তোর এই রোগা প্যাটকা শরীরে কি তেজ।

ওরা হেসেই চলেছে।

তোর বাসন্তীমায়ের জমি, আর পীরবাবার জমি সাল্টে দিয়েছি। ওকে পনেরদিন সময় দিয়েছি, তারপর হাইকোর্টে টেনে নিয়ে যাব।

এইটা তুই ভালো খবর দিলি। খুব চিন্তায় ছিলাম। মনাকাকার কাছ থেকে শুনেছি বাবা অনেক কষ্টে জমি কিনেছিলেন, আমি শুধু দান করেছি, তাও ব্যাটারা ভাগিয়ে নিয়েছে।

ব্যাটা চ্যালেঞ্জ করছিল, দিলাম উইলটা মুখের ওপর ছুঁড়ে, তারপর সুপ্রীম কোর্টের অর্ডারটা ধরিয়ে দিলাম। তখন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। তারপর তোর কথাটা একটু ছুঁয়ে দিলাম।

ব্যাশ কেঁদে ফেলে আর কি। বলে, মিঃ চ্যাটার্জী আমাকে পনেরোদিন সময় দিন। আমি সব ঠিক করে কারেকশন করে দেব। তারপর ব্যাটাদের এ্যারেস্ট করে যে কোর্টে তুলেছে তাও দিলাম।

সুকান্তর সঙ্গে দেখা হলো।

আমাদের পেছন পেছন আসছে। এই তো সবেমাত্র আসামী নিয়ে সদর থেকে ফিরলো।

দুটো পুরো গ্যারেজ।

হ্যাঁ। যে কটা ধারা প্রয়োগ করেছে, ছয় মাসের আগে জামিন হবে না। ম্যাক্সিমাম জেল কাস্টডি দেবে। হাইকোর্ট ছাড়া জামিন হওয়া মুস্কিল। তাও আবার সেই ধরণের জাঁদরেল উকিল দরকার।

বয়ানটা কে লিখলো তুই না সুকান্ত?

অনুপ হাসছে।

হারামী।

আবিদ একটা দু-লিটারের বোতল নিয়ে ঢুকলো।

অনুপ হাত বাড়ালো।

দাঁড়াও সুবীরের কাছ থেকে গ্লাস নিয়ে আসি।

হিমাংশু। আমি বললাম।

তোর কো-অপারেটিভের কাজ গুছিয়ে দিয়েছি। সুবীরের কাছ থেকে জেনে নিতে পারিস।

একেবারে আপ-টু-ডেট?

গতোমাস পর্যন্ত করে দিয়েছি। এ মাসেরটা ঝামেলা হবে। অনুপ গণ্ডগোল করলো।

যাঃ এ কথা বলো না। তাতে কতোটা উপকার হলো বলো। জার্কটা কেমন পরলো। দেখবে ব্যাঙ্ক অনেকটা অক্সিজেন পেয়ে যাবে। টাকা থাকলে তো রোল হবে। টাকাই নেই রোল হবে কি করে।

অনুপ আমার দিকে তাকালো।

ফর্মেশনটা একটু চেঞ্জ করতে হবে।

কিরকম?

সুবীরকে বলেছি। কিছু স্টেশনারি তৈরি করতে হবে। কি করে কি করতে হবে ও বুঝে নিয়েছে।

এখন সুবীর লোন সেংশন করতে পারবে তো?

কেন পারবে না। নেকু, তুই জানিস না, তিনদিনে কি টার্নওভার হয়েছে। তবে বড়ো লোন সেংশন করতে বারণ করে দিয়েছি। ছোট ছোট লোন, গৃহস্থ মেয়েদের বেশি দিতে বলেছি। যারা ঘরে বসে অবসর সময়ে হাতের কাজ বেশি করে।

চাষের সময়।

সে তো সুবীর বুঝবে। তারপর বাসু, চিকনা, সঞ্জু, মীরচাচারা তো রইলো।

আবিদ গ্লাস নিয়ে ঢুকলো। পেছন পেছন সুবীর।

দাদা এখন চা আনবে না?

কেন আনবে না। আনতে বলো। অনুপ চেঁচিয়ে উঠলো।

তোদের বাহনগুলোকে খাইয়েছিস। অনুপের দিকে তাকালাম।

তোর মতো কিপ্টা নাকি। আমরা যা খেয়েছি ওরাও তাই খেয়েছে।

তোর মতো সাধু পুরুষ ভূ-ভারতে যদি দু-একটা থাকতো।

আবিদ কোল্ডড্রিঙ্কসের গ্লাস এগিয়ে দিলো। অনুপ ঢক ঢক করে খেয়ে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বললো, আর একটু ঢালো।

বাড়িতে গিয়ে আর খাবি না?

তা হয়, বাঙালি মাছে-ভাতে মানুষ, কি বলো হিমাংশু।

হিমাংশু হাসছে।

ভানু ঘরে ঢুকলো।

অনি থানার বড়োবাবু আসছেন।

তোকে তুলে নিয়ে যাবে।

ভানু হাসছে।

ম্যানেজার বাবু আমি রেডি। আপনি একবার দেখে নিতে পারেন। তাহলে বড়োবাবুর গাড়িতেই বেড়িয়ে যেতে পারবেন। সুবীর বললো।

ম্যানেজার বাবু হাসছেন।

চা-টা খেয়ে নিই।

সুবীর বেরিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর চায়ের ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে এলো। সুকান্ত পেছন পেছন ঢুকলো।

আমাকে দেখে সামনে এগিয়ে এসে একগাল হেসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।

আবার কি হলো?

অনুপদা খুব বাঁচান বাঁচিয়ে দিয়েছে।

বসো।

আপনি চলে যাবেন?

হ্যাঁ।

ও ঘরে চলুন কিছু কথা আছে।

সবার সামনে বলা যাবে না।

না। একেবারে অফিসিয়াল।

চা খাও তারপর যাচ্ছি।

না। চা খেতে খেতে সেরে নিই।

আমাকে আবার বেড়তে হবে। আপনি এখানে আসার পর থেকে নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছি না।

আমি চায়ের কাপ নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

সুবীর কোথায় বসবো?

বড়োবাবু জানেন কোথায় বসতে হবে।

এই সুবীর আর বড়োবাবু নয় এবার আমরা বন্ধু হতে পারি।

সুবীর হাসলো।

আমরা দুজনে সুবীরের পার্শোনাল চেম্বারে এসে বসলাম। সুকান্ত চায়ে চুমুক দিল।

দাদা এবার আমাকে বাঁচাতে হবে।

তোমার আবার কি হলো?

অনাদিবাবু কাল রাতেই কলকাতা ফিরে গেছেন।

তাই নাকি!

আজ সকালে স্যার ফোন করেছিলেন। আমাকে সুন্দরবোন ট্রান্সফার করবে। আরও অনেক কিছু বলেছে, আপনাকে বলা যাবে না।

তোমাকে ট্রান্সফার করবে কেন?

স্যারকে সেইভাবে ফোন করেছিলো, কাগজপত্র পাঠাতে বলেছে।

তোমার স্যারকে পাঠিয়ে দিতে বলো।

কালকে ওনার কনস্টিটিউয়েন্সির রাইট হ্যান্ড লেফ্ট হ্যান্ডকে এ্যারেস্ট করেছি, সেটাও ওনার একটা রাগ।

সেই নিয়ে কিছু বলেছে?

আমাকে ফোন করে বলেছিল ছেড়ে দিতে।

বুঝেছি। তোমার কাছে যখন ট্রান্সফার অর্ডার আসবে তখন আমাকে একটা ফোন করবে।

আমি অনাদিবাবুকে সাতবছর দেখছি। আপনার বন্ধু বটে, আমাদের পুলিশের চোখ….।

জানি।

স্যার আমাকে চেপে ধরেছেন।

কি জন্য?

কাল অর্কদা যেভাবে ফোন করেছে, অনাদিবাবু একটা চান্স পেয়ে গেছেন।

তাহলে অনাদি মরবে। আমার কিছু করার নেই।

আমি সুমন্তদার মাধ্যমে অর্কদাকে ফোন করেছিলাম।

কি বললো?

আমাকে গালাগাল করলো।

ফোন করতে গেলে কেন?

চাকরি চলে গেলে খাবো কি।

তোমাকে খাওয়াবার মতো সামর্থ সুমন্তর আছে।

সুকান্ত হাসছে।

আপনি আজ রাতে পৌঁছলে সিপি সাহেব আপনার সঙ্গে দেখা করবেন।

আমার পৌঁছতে পৌঁছতে অনেক রাত হবে।

এসপি সাহেবের ব্যাপারটা আপনি দেখুন, উনি আমাকে ভীষণ হেল্প করেন।

দেখ যে গণ্ডগোলগুলো করে রেখেছেন সেগুলো কিছু করা যাবে না। তুমিও শুনলাম অনেকের কাছ থেকে টাকা পয়সা নিয়েছো?

সুকান্ত জিভ বার করলো।

এ কি বলছেন দাদা।

তাহলে আমার কাছে যা খবর এসেছে তা ভুল।

আপনি যদি আমার ছেলের মাথায় হাত রেখে শপথ করতে বলেন, আমি করবো। আপনাকে এটুকু বলতে পারি আমি একপয়সাও নিই নি। তবে অন্য কেউ নিয়ে থাকলে আলাদা ব্যাপার।

তুমি ওই থানার ইনচার্জ, এড়িয়ে গেলে চলবে কি করে?

আপনি সব জানেন। আমি কতোটুকু করতে পারি।

তোমার চেষ্টার মধ্যে খামতি রয়েছে।

বলতে পারেন গা ভাসিয়ে দিয়েছি।

তুমি কিন্তু অনেক ভালো কাজ করতে পারো এখানে। করতে পারলে এখানকার মানুষ তোমায় মাথায় করে রাখবে। প্রশাসনও তোমায় নড়াতে চড়াতে ভয় পাবে। কারন কি জানো, মানুষ যদি তোমায় ভালোবাসে, তারা যদি তোমাকে চায়, প্রশাসনও তোমাকে যথেষ্ট সমীহ করবে।

প্রথম প্রথম করেছিলাম, তারপর আপনার বন্ধু যে ভাবে পলিটিক্যাল প্রসার শুরু করলো, সব কিছু থেমে গেল।

দেখো আর যাই করুক তোমার সরকারি চাকরি ওর পক্ষে খাওয়া খুব মুস্কিল।

আপনি বলছেন!

তারমানে তুমি পড়াশুনো করো না।

সুকান্ত আমার দিকে তাকাল।

চাকরি করতে হয় করছো, অনেকটা গড্ডালিকা প্রবাহের মতো। তারপর একদিন হঠাৎ থেমে যাবে। তখন দিশেহার হয়ে পড়বে। বেঁচে থাকাটা তখন মূল্যহীন বলে মনে হবে।

একটু থামলাম। চায়ে চুমুক দিলাম।

চাকরিটাকে এনজয় করো। দেখবে এর মধ্যেও একটা লাইফ আছে।

আপনার মতো করে এইভাবে আগে কখনও কেউ বলে নি।

আমি ব্যাপারটা উপলব্ধি করি, তাই বলতে পারছি।

একটু থামলাম।

দেখো সুকান্ত পৃথিবীতে কেউ খারাপ নয়। পরিবেশ তাকে খারাপ পথে পরিচালিত করে। বেঁচে থাকার জন্য তোমার কিছু কিছু বেসিক নীড বলো, ডিমান্ড বলো, আছে। এটা মানো।

সুকান্ত মাথা দোলালো। মানে।

তুমি যদি তা না পাও কি করবে?

সুকান্ত চুপ করে রইলো।

যাক ভীমপুরের নার্সিংহোম দুটো তোমার থানার জুরিসডিকসনে পড়ে না?

সুকান্ত চমকে উঠে আমার চোখে চোখ রাখলো।

কেন বলুন?

হঠাৎ তোমাকে এই প্রশ্নটা করলাম কেন, তোমার কি মনে হয়?

আমি জানি ওখানে কি হয়।

স্টেপ নাওনি কেন, তোমার সুপিরিয়র মানা করেছে?

আমার এখানে কেউ রিপোর্ট করে না।

রিপোর্ট করতে এলে তোমরা নাও না, থানার বাইরে আন্ডারস্ট্যান্ডিং করো।

বিশ্বাস করুণ দাদা।

অনাদি, মন্ডলের জামাই, স্কুলের সেক্রেটারি, কৌস্তভবাবু এখানে বকলমায় মালিকানা উপভোগ করছে।

অনাদিবাবু আছেন কিনা বলতে পারবো না। তবে আর তিনজন রয়েছে।

ল্যাজেরা থাকবে মাথারা থাকবে না তা হয়?

দাদা, স্যার শিবুর ওপর নজর রাখতে বলছেন।

ওই ভুলটা করবে না। তোমার স্যার শিবুর হট লিস্টে আছে। তুমি যে ছিলে না তা নয়। তোমার সঙ্গে আমার একটা ছোট্ট রিলেশন বেরিয়ে পড়ায় তুমি লিস্টের বাইরে চলে গেলে। তোমার স্যারও এই মুহূর্তে সেই জায়গায় আছে। এই খবরটা তার কানে তুলে দিও। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমার কিছু করার থাকবে না। সব আমার হাতের বাইরে চলে যাবে। খামোকা আমার বোনটা বিধবা হবে।

দাদা!

সুকান্ত চমকে আমার মুখের দিকে তাকালো।

এটা তোমার এসপির কানে তুলে দেবে। ধীরে চলো নীতি নাও। ওদের কাছে যা মেটিরিয়ালস আছে তোমাদের ফোর্সের কাছে আছে?

সুকান্ত মাথা দোলাচ্ছে, না।

পারবে ওই গাদা বন্ধুক নিয়ে ওদের স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের সামনে দাঁড়াতে।

সুকান্ত আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাল।

না হলে তোমার এসপিরও বিপদ আছে।

আমি কাল কলকাতা যাব। পর্শু আমাকে একটু সময় দেবেন।

এসো, যাবার আগে একবার ফোন করে নেবে, কোথায় কখন কি ভাবে থাকবো নিজেই জানি না।

আপনার নম্বর আমার কাছে নেই।

এই মুহূর্তে আমার কোনও নম্বর নেই। সুমন্তকে বলবে যোগাযোগ করিয়ে দেবে।

উঠে দাঁড়ালাম। দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। এ ঘরে এসে ঢুকলাম।

কটা বাজে খেয়াল আছে।

ইসলামভাই আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো ঠিক, কিন্তু চোখ সুকান্তর মুখের দিকে।

কটা।

সাড়ে তিনটে বেজে গেছে।

চলো চলো। আর দেরি করলে বড়োমা একেবারে মাথা চিবিয়ে ছেড়ে দেবে।

কতোবার ফোন হয়েছে জানিস।

ঠিক আছে বাবা আর বলতে হবে না।

ম্যানেজার বাবু আপনি রেডি। সুকান্ত বললো।

হ্যাঁ। আপনার গাড়িতে তুলে দিয়েছি।

চলুন। আমাকে আবার ফিরে সদরে যেতে হবে।

সবাই একসঙ্গে নিচে নেমে এলাম।

নেপলারা কোথায় ইসলামভাই।

ওরা চলে গেছে, কি সব গোছগাছ আছে।

বাসু।

বল।

তোকে যা বলেছিলাম…।

ওরা নিয়ে গেছে।

তুই চল।

না আজ থাক, তুই তো আবার আসছিস।

ঘণ্টা খানেকের মধ্যে চলে আসবো।

আমি চিকনার পেছন বসলাম। সুকান্তকে বললাম, এদিকটা একবার দেখো।

আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো। হাসিটায় কোনও প্রাণ নেই।

আমরা চলে এলাম।

বারান্দায় উঠতে উঠতে বড়োমার মুখ ঝামটানি শুরু হয়ে গেল। একটু শুনতে হলো। কি আর করা যাবে।

তোর ফোন কোথায়?

ব্যাগে ছিলো। মিত্রারা সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।

কি ছেলে তুই! ছোটোমা বললো।

কি করবো, তখন মনে ছিল না।

আর সে বেচারা ফোন করে করে হদ্দ।

কে?

মিত্রা, তনু দুজনেই।

ছোট একবার মিত্রাকে ফোন করে দে। বড়োমা বললো।

আমি কোনও প্রকারে জামাকাপর খুলে পুকুরের দিকে চলে গেলাম। বেলা পড়ে এসেছে। কাল এইসময় বাড়িটা বেশ জমজমাট ছিল। আর আজ কেমন মরা মরা লাগছে। সঞ্জুর লোকজন বেশির ভাগ বাইরের লাইট খুলে নিয়েছে। ঘরের ভেতরের লাইটগুলো রয়েছে। আমি, চিকনা দুজনে একসঙ্গে স্নান করতে নামলাম।

কাল অনাদি ওখান থেকেই চলে গেছে। চিকনা বললো।

কার সঙ্গে?

কে যেন এসেছিল। চ্যালা-চামুন্ডার তো অভাব নেই।

তোকে কিছু বলে যায় নি?

আমাদের কারুর সঙ্গেই দেখা করে নি।

ও তো তোদের সঙ্গে গেলো।

তুই যখন সুকান্তকে ফোন করতে বললি। তখনই কাদের সঙ্গে ফুসুর ফুসুর করছিল। তারপর আমাদের সঙ্গে বেরিয়ে বললো, তোরা যা আমি একটু পড়ে আসছি।

ও কার সঙ্গে গেলো?

শবর পাড়ার একটা ছেলের সঙ্গে।

শিবু দেখেছে?

আশেপাশে তখন ওদের কাউকে দেখতে পাইনি।

কাগজপত্র সব ব্যাঙ্কে আছে তো?

লকারে তুলে রেখেছি।

খুব সাবধান যেন না হারায়।

তোকে কথা দিলাম জান থাকতে আর হবে না।

সেক্রেটারী…।

সব কাচিয়ে নিয়ে চলে এসেছি। ওটা শিবু একলাই করেছে।

কোনও অঘটন ঘটে নি?

সেক্রেটারী একটু তরপেছিল, দুটো বন্দুকের বাঁট দিয়ে পেটে এমন দিয়েছে, গড় গড় করে সব বার করে দিয়েছে।

যাদের যাদের কাগজ আছে সব গুছিয়ে রাখ। আমি আগামী সপ্তাহে এলে তাদের সকলকে ডাকবি। আমি নিজে ওদের সঙ্গে বসে কথা বলবো।

মীরচাচা মনে হয় তলায় তলায় একটা কিছু করার প্রিপারেশন নিচ্ছে।

এখন কিছু করতে বারণ করবি। আমি ফিরে এলে সব হবে।

দু-জনে স্নান সেরে উঠে এলাম।

নীপা পাজামা-পাঞ্জাবী রেডি করে রেখেছিল। ধোপ দুরস্ত হলাম। নীপা দেখে হাসলো।

হাসছো কেনো?

নেড়ামুন্ডি মাথাটায় কবে চুল বেরোয় দেখি। তখন আগের মতো লাগে কিনা একবার দেখবো।

সুবীর ঠিকমতো নারাচাড়া করছে তো?

দিলো পেটে একটা চিমটি।

সুযোগ পেলেই….।

হাসলাম।

সবাই একসঙ্গে খেতে বসলাম। বড়োমারা সব কাপর জামা পরে রেডি হয়ে বসেছে।

চিকনা।

চিকনা আমার দিকে তাকালো।

ভানুরা সব খাওয়া দাওয়া করেছে?

আগে আগে চলে এলো। নীপা বলতে পারবে।

সব খেয়েদেয়ে ও বাড়িতে রয়েছে। নীপা বললো।

বহুযুগ পর আজ মাছ খাবো। আমার প্রিয় খাবার মাছের মোলা। সুরোমাসি বেশ রসিয়ে বসিয়ে মাখছে। গন্ধটা বেশ ভালোই ছেড়েছে।

ও নীপা ছেলেটা ফিরেছে। বাইরে মৌসুমি মাসির গলা পেলাম।

সকাল থেকে মানুষটা কতোবার এলো জানো?

কেনো!

তোমার জন্য নিজে হাতে টবা থেকে মাছ ধরেছে।

আবার টবায় নেমেছে!

কে বলতে যাবে।

হাসলাম। সুরোমাসির কাছ থেকে নিয়ে এসো।

দিয়েছি তো দেখতে পাচ্ছ না।

ছোটোমার ফোনটা বাজলো। ফোনটা হাতে নিয়ে একবার নম্বরটা দেখলো।

নে তোর ধন্বন্তরী ফোন করেছে।

আমি ফোনটা হাতে নিয়ে কানে দিতেই মিত্রার হাসির শব্দ।

হাসছিস কেনো।

এতো শাধের জিনিষ ভুলেগেলি কি করে।

খেয়াল ছিল না। তোরা এখন কোথায়?

বাড়িতে ঢুকে পড়েছি, আধাঘণ্টা হলো। তনু রেডি হচ্ছে, এবার বেরবে।

এতো দেরি হলো?

আমি, তনু, মেয়ে একটু মার্কেটিং করছিলাম।

আমি খেতে বসেছি।

ছোটোমা বললো, স্নানকরতে গেছিস। এতো দেরি?

কিছুটা ঝামেলা মেটালাম।

আবার কিসের ঝামেলা?

ওই একটু ছিলো আর কি, রাস্তায় কোনও অসুবিধা হয়নি।

তোর এসপি নার্সিংহোমের সামনে অপেক্ষা করছিল।

তোকে স্যালুট করেছে?

ঠাণ্ডা খাইয়েছে সকলকে।

গরম হয়েগেছিলি তাই।

কখন বেরবি?

খাওয়া শেষ হলেই বেরবো।

তনুর সঙ্গে কথা বল।

বলো তনু।

কি বলবো।

ঠিক ভাবে যাবে। পৌঁছে একবার ফোন করবে। অনুপ কাল সকালের ফ্লাইটে যাচ্ছে। বাড়িতে আসুবিধে হলে ওর ফ্ল্যাটে চলে আসবে।

মিত্রাদি ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

কোথায়?

বিতানের বোন সানারা দিল্লীতে আছে না।

এই দেখো ভুলেই গেছিলাম। ওরা তোমাকে এয়ারপোর্টে পিকআপ করতে আসবে?

হ্যাঁ।

তোমার সঙ্গে পরিচয় নেই।

করে নেব।

যাক একটা চিন্তা দূর হলো। নাও রেডি হয়ে বেরিয়ে পরো।

আচ্ছা।

আমি ফোনটা ছোটোমার হাতে দিলাম। ছোটোমা কানে দিল।

মৌসুমিমাসি গ্যাঁট হয়ে সামনে বসেছে। আমার দিকে তাকিয়ে।

মাসি গুঁড়ো চিংড়ি টবাতে এখনও আছে?

না বাপু ছেলেপুলেগুলান সব ধরি লেয়। যেটুকু পাইছি লেই আসছি।

তোমার বৌমা খেতে খুব ভালোবাসে।

তারজন্য লেই আসছি। ও বড়োবৌ।

মা পুকুরঘাটে গেছে। নীপা চেঁচালো।

কেনো তুমি জানো না, তোমার বৌমাকে দেওয়া হয়েছে কিনা।

ওকে ঘন্ট দিছু।

দিয়েছি।

ইসলামভাই হাসছে।

চিকনিশাক কি চন্দ্রের ঘরের খেতে তুলেছো।

না।

তাহলে।

বেলতলায় তোর বাপের যে জমিনটা ছ্যালো সেউখানে হইছে।

চাড্ডি বেশি তুলতে পারতে।

তুলছি তো।

নীপা সঙ্গে দিয়ে দেবে।

মিত্রাদি নিয়ে চলে গেছে।

ছোটোমা কান থেকে ফোনটা নামিয়েই….।

ওখানে গিয়ে এতক্ষণ কি করলি বললি না। ছোটোমা খোঁচা মারলো।

কেনো ইসলামভাই বলে নি।

তোকে জিজ্ঞাসা করেছি, মুন্নাকে করিনি।

গাড়িতে যেতে যেতে বলবো।

অতোগুলো প্যান্টজামার পিস কিনেছিস কেনো।

দরকার আছে।

সে তো বুঝলাম, দরকারটা কিসের?

চলো যেতে যেতে দেখতে পাবে।

সুবীর।

বলুন।

কাল ব্যাঙ্কে একটা নোটিস টাঙিয়ে দেবে। যারা যারা লোন নিতে চায় তারা যেন সাতদিনের মধ্যে দরখাস্ত করে। তারপর আমি এলে ওগুলো প্রসেসিং কোরো।

ঠিক আছে।

এবার একটু ধরে খেলবে। না হলে আবার বিপদে পড়বে।

এবার আর ভুল করবো না।

চিকনা।

বল।

নীপা তোকে ঠিক ঠাক মাইনে দিচ্ছে।

দেখছো বড়োমা। কি রকম খোঁচাচ্ছে। নীপা চেঁচিয়ে উঠলো।

বড়োমা হাসছে।

নীপা এখন স্কুলের দিদিমনি, এই সামান্য কাজটুকু থেকে রিজাইন দিয়েছে। চিকনা বললো।

ভাগ চাইছে না।

সে আর বলতে। প্রতিদিন কি এলো আর কি গেলো, এইটুকু হিসাব নেয়।

এবার থেকে দিবি না।

বয়েই গেছে। নীপা বললো।

সুবীর হাসছে।

ঘরে কতো ধান আছেরে?

তিনটন মতো।

ওই ধানে চিঁড়ে করা যায়?

মাঝে করেছিলাম মার খেয়ে গেছি।

এবার কিছুটা কর দেখি। আর মুড়ির ছাতু। অনেকে জানেই না মুড়ির আবার ছাতু হয়।

ওখানে পাঠালে চলবে। সাগির বললো।

চিকনা খরিদ্দার পেয়ে গেলি।

চিকনা হাসছে।

হ্যাঁগো চিকনাদা, আমরা মাঝে মাঝে অনিদার কথায় করে খেতাম। দু-একজন যারা আমার বন্ধু-বান্ধব তারাও খেয়ে অবাক। তবে একটা কাজ করতে হবে অনিদা।

বল।

পঞ্চাশগ্রাম একশো গ্রামের প্যাকেট করতে হবে। প্যাকেজিং-এর ব্যাপারটা দেখতে হবে।

নিজেরা নিজেরা ভাব। কি ভাবে কি করা যায়।

চিকনার দিকে তাকালাম।

এখানকার মাদুর পৃথিবী বিখ্যাত এই শিল্পটার ওপর জোড় দে।

সুবীর।

বলুন।

মাদুর কাঠির চাষ যারা করে তাদের একটু বেশি করে লোন দাও। তাহলে ঘরের মেয়েরা বেশি কাজ পাবে।

একটু থামলাম।

মাথায় রাখবে ঘরের মেয়েদের তুমি যত এনগেজ করবে, তত পিএনপিসি বন্ধ হয়ে যাবে।

সেটা আবার কি! নীপা বললো।

পরনিন্দা পরচর্চা।

ছোটোমা হেসে আমার গায়ে ঢলে পরলো। দামিনীমাসি, জ্যেঠিমনি মুখ টিপে হাসছে। বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

বুঝলে সুবীর এটা ঠিক মতো বন্ধ করতে পারলেই তুমি ওদের ঠিক পথে নিয়ে আসতে পারবে, ওদের ঠিক মতো ম্যানেজ করতে পারলে, দেখবে ছেলেরা আর বেচাল হবে না।

ইসলামভাই খেতে খেতে মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। ইকবালভাই সোজা হয়ে বসলো।

তুই বুঝলি কি করে?

দেখে শিখছি। তবে সমস্যাও আছে। তাকেও ওভারকাম করা যায়।

কিরকম?

তুমি একটু ভাবো বুঝতে পারবে।

গল্প করতে করতে খাওয়া হলো। বেড়োতে বেড়োতে আরও আধঘণ্টা দেরি হলো। সন্ধ্যা হওয়ার মুখে আমরা বেরিয়ে এলাম। সেই একচিত্র। কাকীমা, সুরোমাসি, নীপার চোখ ছল ছল। সব মায়ার বন্ধন। নীপা, সুবীর বাজার পর্যন্ত আমাদের ছাড়তে এলো।

বাসু দোকানেই ছিল, দেখে এগিয়ে এলো। মীরচাচা দেখলাম ডিগ্গীখুলে কি সব ঢোকাচ্ছে।

তোর জামার পিস প্যান্টের পিসের দাম কতো হয়েছে। বাসুকে বললাম।

তোর জেনে লাভ।

পয়সা দিতে হবে।

তোর পকেটে পয়সা আছে।

এবার সত্যি সত্যি হেসে ফেললাম।

ফিরে এসে দেব।

যখন টাকা নিয়ে আসবি জিজ্ঞাসা করবি।

কিরে বাসু অনি কি বলে। মীরচাচা এগিয়ে এলো।

তুমি কি ঢোকালে।

বৌমনি যাওয়ার সময় বড়ো মুখ করে চেয়েছিল, তখন কাটতে পারি নি। এখন দিয়ে দিলাম।

কি চেয়েছিল।

ডাব।

গাছ শুদ্ধু কেটে দিয়ে দিলে নাকি!

না দু-কাঁদি দিলাম।

চিকনাকে সব বলেছি শুনে নিও। আমি আগামী সপ্তাহে আসবো। মীরচাচা, ইকবালভাই, ইসলামভাইয়ের সঙ্গে কোলাকুলি করলো।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/Xf12QFm
via BanglaChoti

Comments