কাজলদিঘী (১২০ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১২০ নং কিস্তি
—————————

মিলি, অদিতি সকলকে প্লেটে করে খাবার এগিয়ে দিল।

রাঘবন একবার প্লেটটা দেখে হাসলো। খাবার মুখে তুললো।

দারুণ টেস্ট।

টিনা, অনিসাকে দেখলাম চায়ের ট্রে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। বুঝলাম ও ঘরে গেল।

খেতে খেতেই একটু হাসি ঠাট্টা হলো। রাঘবন কফি খেয়ে ও ঘরে চলে গেল।

বাইরেটা মনে হয় ইসলামভাই, রতন, আবিদ, চিকনা সামাল দিচ্ছে। ওদের ব্যস্ততা দেখে তাইই মনে হচ্ছে।

আমি দুটোর বেশি কচুরী খেতে পারলাম না। গাটা কেমন গুলিয়ে উঠলো। মিত্রার হাতে প্লেটটা দিয়ে দিলাম।

চিকনা দৌড়ে ঘরে ঢুকলো।

অনিমেষদা।

অনিমেষদা চিকনার দিকে তাকাল।

ছিপি, বোতল, ঘটি, বাটি সব এসেছে—

অনিমেষদা চিকনার কথায় জোরে হেসে উঠলো।

দিদি।

অনিমেষদা বড়োমার দিকে তাকাল।

একসপ্তাহ আগে যারা তরপাচ্ছিল তারা সব এই বাড়িতে মিটিং করতে এসেছে।

বড়োমা হাসলো।

তুই কিন্তু এখনও ঝুলিয়ে রেখেছিস। অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।

ও আবার কি ঝোলা ঝুলি করছে। বড়োমা বললো।

সকালে আসতে বললো একটা প্রজেক্ট আছে। দেড়শো কটি কাটমানি দিতে হবে।

বড়োমা আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকাল।

এখন ছেড়ে দাও অনিমেষ, আগে আমরা একটু গুছিয়ে নিই। তারপর চেপে ধরা যাবে। বিধানদা হাসতে হাসতে বললো।

প্রবীরকে একবার ফোন করুণ এখানে আসবে না অফিসে চলে যাবে।

বিধানদা ফোনটা বার করলো পকেট থেকে।

সুজিতদারা ফুল ফ্যামালি ঢুকলো।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেলাম। প্রণাম করে সুজিতদার মুখো মুখি দাঁড়ালাম।

সুজিতদা আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। চোখ দুটো সামান্য ছল ছল করছে। কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকুনি দিলাম।

আবার কি হলো।

ভাবিনি তুই ফিরে আসবি। গলাটা ভারি হয়ে এলো। কেঁদে ফেললো।

এই দেখো।

তিনমাস আগে তোর মুখ একবার দেখেছিলাম। তারপর আর দেখি নি। সহ্য করতে পারিনি বলে।

পাস্ট ইজ পাস্ট।

লোককে কথাটা বলি বটে, কিন্তু নিজের আত্মীয় কেউ যখন ওই অবস্থায় থাকে তখন কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজতে ইচ্ছে করে।

এখন আমি তোমার সামনে স্ব-শরীরে দাঁড়িয়ে।

বৌমাকে সঙ্গে নিয়ে এলাম। তোকে দেখে নি।

মেয়েটির দিকে তাকালাম মিষ্টি মুখটা।

নীচু হয়ে আমাকে প্রণাম করলো।

বড়োমা তোমার কে হন?

পিসীমনি।

কি বৌদি চুপচাপ কেন। অনি ঠিক হয়ে গেছে।

এখনও ঠিক হসনি। সব খবর পাই।

তোমার রয়টারের অভাব নেই।

কি গুবলুবাবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে হবে। কচুরী আছে। সাঁটাতে হবে।

সুজিতদার মুখটা যন্ত্রণা কাতর তবু হাসলো।

মিত্রা কাল ফোন করে বললো, কে যেন এসেছেন।

সেন্ট্রালের হোম সেক্রেটারি।

চলে গেছেন—

না। ও ঘরে মিটিং করছেন।

সুজিতদা এসে দাদার পাশে চেয়ারে বসলো। বৌদিরা ভিড়ে মিশে গেল।

একে একে চম্পকদা, সনাতনবাবু এলো। শুভ, শুভরদাদু এলো। সকলের একই প্রশ্ন। কি উত্তর দেব। কোনও প্রকারে থোড় বড়ি খাঁড়ার মতো উত্তর দিয়ে এড়িয়ে গেলাম।

সবাই গোল হয়ে বসে কথা বলছে। আমি দাদার ঘরে এলাম। দেখলাম জ্যেঠিমনি, বড়োমা বসে গল্প করছে।

বড়োমা মিত্রা কোথায়?

কেন বাইরে নেই!

খেয়াল করিনি।

কি দরকার বল।

আমি বাথরুমে যাচ্ছি। একটা পাজামা পাঞ্জাবী এনে দিতে বলো।

তুই যা আমি বলে দিচ্ছি।

বাথরুমের কাজ শেষ করে যখন বেরতে গেলাম তখন দেখলাম ঘরে আরও লোক জন। মিত্রাকে দেখতে পেলাম না। তবে ইসি ঘরে আছে। আমাকে থমকে দাঁড়িয়ে পরতে দেখে এগিয়ে এলো।

ছুটকি ও ঘরে গেছে। প্যান্ট জামা পরবি, না পাজামা পাঞ্জাবী পরবি।

পাজামা পাঞ্জাবী দে।

আমাকে বড়োমার ড্রেসিনটেবিলের কাছ থেকে পাজামা পাঞ্জাবী এনে দিল।

আমি বাথরুমে দাঁড়িয়েই পরে নিলাম। তারপর বেরিয়ে এলাম।

বড়োমা, জ্যেঠিমনি দেখলাম অনেকের সঙ্গে বসে কথা বলছে। বেশির ভাগ ভদ্রমহিলাকেই চিনতে পারলাম না।

সবাই আমার দিকে তাকিয়ে দেখছে।

তুই কি বেরবি? জ্যেঠিমনি বললো।

কেনো বলো।

তোকে সবাই দেখতে এসেছে। এরা তোকে এতদিন দেখে নি।

আমি ভ্যাবলার মতো সকলের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

তুমি এমনভাবে বললে আমি মিনিস্টার ফিনিস্টার হয়ে গেছি।

তার থেকেও বেশি কিছু।

বুঝলাম বড়োমার গর্বে বুক ভরে যাচ্ছে। ইসি, জ্যেঠিমনি হাসছে।

মিত্রা কোথায়? বড়োমার দিকে তাকালাম।

রাঘবন ও ঘরে ডাকল। কি সব সই সাবুদ করাচ্ছে। তোর দাদাকে দিয়েও কয়েকটা কাগজে সই করালো।

ব্যাটা মহা তেঁদর, পড়েটরে নিয়ে সই করছে।

তা বলতে পারবো না। ডাক্তার, অনিমেষ আছে।

বড়োমা এবার সকলের সঙ্গে পরিচয় পর্ব শুরু করালো।

ইনি হচ্ছেন বিতানের শ্বাশুরী, ইনি আমার মামাতো ভাইয়ের বৌ, ইনি হচ্ছেন মিত্রার পিসিমা, ইনি হচ্ছেন দিদির বোন জ্যেঠিমনির দিকে তাকাল, ইনি হচ্ছেন ইসির শ্বাশুরী…।

প্রণাম করতে করতে আমার কোমর ব্যাথা হয়ে গেল।

তুই নিশ্চই আগে কাউকে দেখিস নি।

ওনারা যদি আমাকে আজ প্রথম দেখে থাকেন তাহলে তাইই দাঁড়ায়।

সব সময় ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা, সোজা কথা বলতে পারিস না। ইসি পেটে খোঁচা মারলো।

ওনারা হাসছেন।

আপনারা গল্প করুণ, আমি একটু বাইরে গিয়ে বসি।

যাও বাবা।

ঘর থেকে বেরিয়ে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। বেরিয়ে দেখলাম গোল টেবিলে রাঘবন বেশ জমিয়ে গল্প করছে সকলের সঙ্গে। শুভর দাদু, সুজিতদা, চম্পকদা, সুতনুবাবুও আছেন।

অনিমেষদা হাসতে হাসতে বললো, তোকে দেড়শো কোটি কাটমানি দিতে প্রস্তুত আছি।

সবাই জোড়ে হেসে উঠলো। রাঘবনও হাসছে।

অনিমেষ টাকার এ্যামাউন্টটা অনেক কম হয়ে গেছে। ডাক্তারদাদা বললো।

চাইলে বেশি দিতে পারি।

রাঘবনের দিকে তাকালাম।

তুই কাটমানি চেয়েছিস, আমি যদি কিছু পার্সেন্টেজ পাই তাই বলে দিলাম।

সিবিআইকে খবর দেব।

তুই দিবি না।

আমি ডাক্তারদাদা, দাদার পাশে গিয়ে বসলাম।

ফিরেই বিজনেস আরম্ভ করে দিয়েছিস। চম্পকদা বললো।

তুমি নিজেই বলো না।

শুভর দাদু হাসছে।

রাঘবনের দিকে তাকালাম।

ওনার পরিচয় পেয়েছ।

পেয়েছি মানে। ওনার নোটের ফাইলগুলো এখনও আমাদের দেশের সম্পদ। প্রায়ই সেগুলো মন দিয়ে পড়ি। আমি ওনার নাম শুনেছি। এখানে এসে পরিচয় হলো।

তুমি নাকি মিত্রা, দাদাকে দিয়ে কি সব সই করাচ্ছ।

ওটা আমার এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পার্ট, তোকে জানতে হবে না।

অনিমেষদা হাসছে।

মিলি, অদিতি চা দিয়ে গেল। বেচারারা কাল থেকে খাটতে খাটতে মুখ শুকিয়ে গেছে।

তোমার মিটিং শেষ?

হ্যাঁ। বাকি বলেছি এগারটার পর অফিসে।

ও ঘরে কে আছে?

পিল্লাই আছে। কথা বলছে।

তোমার সঙ্গে ও খেয়ে বেরবে তো।

এখন খাবো না। ছোটোমাকে বলেছি। বিকেলে খাবো।

উপোস!

রাঘবন হাসছে।

আবার আসবে নাকি?

না, বড়োমাদের জন্য গাড়ি পাঠাব বলেছি।

গাড়ি পাঠাতে হবে না। তুমি তোমার মতো যাবে, ওরা ওদের মতো যাবে।

সরি, এটা মাথায় আসে নি। ইমোসন্যালি বলে ফেলেছি।

মিত্রা ঘরে ঢুকলো।

বেশ খুশি খুশি মুখটা।

কাজ হয়ে গেছে? রাঘবন বললো।

মিত্রা মাথা দোলাল।

অল চ্যাপ্টার আর ক্লোজড।

মিত্রার পেছন পেছন পিল্লাই এসে দাঁড়াল।

রেডি।

হ্যাঁ স্যার।

রাঘবন উঠে দাঁড়াল।

অনিমেষদাদের দিকে হাতজোড় করে দাঁড়াল। এবার যাব।

মিত্রা বড়োমা, ছোটোমাকে ডাকো।

মিত্রা দাদার ঘরের দিকে গেলো। বড়োমারা বেরিয়ে এলো। রাঘবন দাদা, বড়োমা ছোটোমা, ডাক্তারদাদাকে প্রণাম করে বেরিয়ে গেল। ওরা সবাই পেছন পেছন বাগান পর্যন্ত গেল। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলাম।

হুটার বাজিয়ে রাঘবন বিদায় নিল।

দুপুরে সবাই একসঙ্গে খেতে বসলাম, মিলি অদিতিরা পরিবেশন করছে। কনিষ্করাও আছে। কথাটা আমিই প্রথম তুললাম।

ডাক্তারদাদা।

ডাক্তারদাদা খেতে খেতে আমার মুখের দিকে তাকাল।

তোমাকে একটা কথা বলতাম।

বল।

দাদাকে আমি লণ্ডন পাঠাতে চাই।

ডাক্তারদাদা কথাটা শোনার পর একবার অনিমেষদার মুখের দিকে তাকাল, তারপর বড়োমার মুখের দিকে। আবার খেতে শুরু করলো।

কেন?

আমি একবার শেষ চেষ্টা করবো।

দেখ হান্ড্রেড পার্সেন্ট রিকভার হবে না। তবে সিক্সটি টু সেভেন্টি পার্সেন্ট হবে।

সেটা আমার থেকে তুমি ভালো বুঝবে। দাদাকে আমি আর একটু স্বাভাবিক দেখতে চাই।

আমি জানি তুই এডিটরের এই অবস্থাটা সহ্য করতে পারছিস না। তুই সকলের সঙ্গে হাসছিস কথা বলছিস, কিন্তু তোর চোখ মাঝে মাঝে খুব বিষণ্ণ হয়ে পরছে। এটা লক্ষ্য করেছি। অনিমেষ, বান্ধবীকে এই কথাটাও আমি আগাম বলেছি।

ডাক্তারদাদা খাচ্ছে।

এডিটর কানটাতেও একটু কম শুনছে।

এখানে কি এর ট্রিটমেন্ট করা যেত না। ছোটোমা বললো।

না ছোটো সেই এ্যাপারেটার্স নেই। থাকলে অনেক আগে আমি তার ব্যবস্থা করতাম। ফেলে রাখতাম না। তনু আমাকে তিন-চারবার ফোন করেছে। মিত্রাকেও বলেছে। তোমাদের সাহস করে বলে উঠতে পারি নি। অনির এই হাল। চারদিকে একটা অরাজকতা। খারাপ লাগলেও মুখ বুঁজে ছিলাম। আজ মনে হচ্ছে আমরা সবাই একটু রিলিফ পেয়েছি। তাই কিনা বলো?

ছোটোমা চুপ করে রইলো।

ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকাল।

কে কে যাবে?

দাদার সঙ্গে তুমি, বড়োমা, ছোটোমা, মল্লিকদা, ইকবালভাই, ইসলামভাই, মিত্রা। অনন্য যদি কলেজ থেকে ছুটি পায় তাহলে ও যাবে। ওখানে তনু, সুন্দর সব ব্যবস্থা করবে।

বাড়িতে কে থাকবে?

দামিনীমাসি সামলাবে। আমি আছি। আরও সবাই আছে। অসুবিধে হবে না। ইকবালভাই, ইসলামভাই ফিরে এলে রোটেসনালি কেউ না কেউ যাবে। আমি খোঁজ খবর নিয়েছি, তিন মাসের থেরাপি। প্রায় চার-পাঁচ মাস থাকতে হবে।

অনিসা, দাদাকে চামচ দিয়ে খাওয়াচ্ছে। আমি একবার দাদার দিকে তাকালাম। আমরা যে কথা বলছি দাদা সেটা সঠিক বুঝতে পারছে না। আমাদের দিকে তাকায় আর খায়।

তোর কি কোনও নির্দিষ্ট প্ল্যান আছে?

আছে।

এখন জানতে পারি কি?

না।

অনন্য আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। আমার কথাগুলো খুব মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে।

কবে যেতে হবে?

আমাকে দিন পনেরো সময় দিতে হবে। তার মধ্যে আমি সমস্ত ব্যবস্থা করে ফেলবো।

তোর শরীরের অবস্থা এরকম।

আমাকে নিয়ে ভেব না। আমি ঠিক হয়ে গেছি। নীরু, কনিষ্ক আছে। সামলে নেব।

অনিমেষ, সুতপা….?

ইকবালভাইরা ফিরে এলে যাবে। অনিমেষদাকে এক দেড়মাস সময় দিতে হবে। আমারও কিছু কাজ আছে। পরের দিকে নীরু, কনিষ্ক যাবে।

তুই কি সব ঠিক করে রেখেছিস?

মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি। দেখতে দেখতে চার-ছটা মাস কেটে যাবে।

এদিকের অবস্থাও নড়বড়ে।

তোমায় বললাম তো সামলে নেব।

আমার কোনও আপত্তি নেই, তোর বড়োমাকে জিজ্ঞাসা কর।

বড়োমার কোনও ওজর আপত্তি এখানে খাটবে না। আমার ডিসিসানটা আমি ফাইন্যাল বলে মনে করছি। শুধু তোমার সঙ্গে আলোচনা করলাম, আমি ঠিক না ভুল।

আমার গলার স্বরটা মনে হয় একটু অন্যরকম লাগলো সবার কাছে। আমার দিকে তাকাল।

তুই সঙ্গে চল। তুই গেলে বুকে একটু বল পাই। ছোটোমা বললো।

ছোটোমার দিকে তাকালাম। ডাক্তারদাদা হাসছে।

না। মানে….।

প্রয়োজন পরলে নিশ্চই যাব।

ভালোকথা বলছিস, ও রকমভাবে ধমকাচ্ছিস কেন।

অনিসা হেসে উঠলো।

হাসছিস কেনরে বুঁচকি।

তুমি যখন আমাকে বকো।

দেবো না ঘা দু-চার।

বড়োমা, জ্যেঠিমনি মুখ টিপে হাসছে।

আমার কিছু কাজকর্ম আছে এখানে। ডাক্তারদাদা বললো।

কালকের থেকে তোমাকে কনিষ্ক, নীরু ছুটি দিয়ে দেবে। তুমি পনেরো দিনে তোমার কাজ কর্ম গুছিয়ে নেবে।

অনন্য।

বলো।

কালকে একবার কলেজে তোমার প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলে নেবে।

আমি কথা বলে নেব। ডাক্তারদাদা বললো।

ঠিক আছে।

উঠে দাঁড়ালাম। বেসিন মুখ ধুয়ে সোজা চলে এলাম এ ঘরে।

আজ প্রায় দেড়মাস বাদে বাড়ির বাইরে পা রাখলাম। দামিনীমাসি বারণ করেছিল। বোঝালাম আর কতো ঘরে বসে থাকি বলো।

দামিনীমাসি আর বাধা দেয় নি।

দাদারা নেই কেমন যেন সব ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তবু মেয়েটা সব সময় কাছে কাছে থাকে। কলেজ থেকে কোথাও যায় না। কারুর কোনও দরকার পরলে ওর সঙ্গে বাড়িতে এসে দেখা করতে হবে। কলেজ শেষ হলেই সোজা বাড়ি ফিরে আসে। কখনও আবিদ কিংবা রতন পৌঁছে দিয়ে যায়। মিত্রার অবর্তমানে আমার বড়ো পাওয়া। এই মুহূর্তে আমার লোকাল গার্জেন।

জ্যেঠিমনি, ইসি, পিকু প্রায় দিনই রাতে এ বাড়িতে থাকে। কখনও কখনও বরুণদাও থেকে যায়। রতন, আবিদের কথা বাদই দিলাম।

মিলিরা প্রতিদিন একবার করে আসে। দেখা করে যায়। শনি, রবিবারটা ওরা সবাই থাকে। বেশ হই হুল্লোড় হয়। প্রতিদিন একবার করে নিয়ম করে দাদাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলি। মেয়ে চ্যাটে বসে ওদের সঙ্গে কথা বলে।

আমার চারপাশটা কেমন যেন শূন্য শূন্য। এখন আগের থেকে অনেক স্থিতাবস্থা তবু মন মানে না। মনে হয় আমি যেন পৃথিবীতে একলা। মিত্রা নেই, ছোটোমা নেই, বড়োমা নেই বিশেষ করে দাদার মুখটা চোখের সামনে বার বার ভেসে ওঠে।

সকালটা সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হয়। যখন দেখি দাদা বাগানে আর হাঁটছে না।

ডাক্তারদাদা বলেছে, দাদা আগের থেকে অনেক ইমপ্রুভ করেছে। কিন্তু দাদার কথা শুনে আমি কিছু বুঝতে পারি না। এখনও কেমন জড়ান জড়ান লাগে। মাঝে দাদাকে ভিডিও কনফারেন্সে দেখেছি। শরীরটা আগের থেকে একটু ইমপ্রুভ করেছে। চোখটা আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

আগামী সপ্তাহে অনিমেষদা, বৌদি, মেয়ে ওখানে যাবে। ইকবালভাই, ইসলামভাই ফিরে আসবে। সুরো বলেছে কয়েকদিন এখানে এসে থাকবে। ওর শ্বশুর মশাই অনুমতি দিয়েছে, আপত্তি করে নি।

বাসে উঠে কখন যে আমার কলেজ চত্বরে এসে পৌঁচেছি খেয়াল করিনি। হেঁদুয়াতে বাসটা দাঁড়াতে নেমে পরলাম।

হঠাৎ এই বাসেই বা উঠলাম কেন! এখানেই বা নামলাম কেন? সত্যি, কিছুতেই মনে করতে পারছি না।

এসেই যখন পড়েছি একবার নিজের পুরনো হস্টেলে, কলেজে যেতে ইচ্ছে করলো।

কলকাতায় আমার প্রথম পাড়া বলতে আমার কলেজ হস্টেলের পাড়া। সেখানে আমার জীবনের একটা অধ্যায় আত্মগোপন করে আছে।

কলেজের সামনে এসে দাঁড়াতেই সেই একছবি। মেয়েরা ছেলেরা পাশাপাশি সিঁড়িতে বসে আছে। বাড়িটা এখনও সেইভাবেই দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে পলেস্তরা খসিয়ে রং করা হয়। একবার ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছে করলো।

কেউ যদি কিছু ভাবে? নিজের মনে নিজে বললাম।

তবু সিঁড়ি দিয়ে পায়ে পায়ে ওপরে উঠে এলাম।

বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। আমার জীবনে প্রথম পাকা বাড়ির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

সেই অডিটোরিয়াম সেই পুরনো বেঞ্চ। এই বেঞ্চে আমার মিত্রার কতো স্মৃতি লুকিয়ে আছে। পায়ে পায়ে অডিটোরিয়াম পেরিয়ে একবার লাইব্রেরীর কাছে গেলাম। একবার উঁকি দিয়ে ভেতরটা দেখলাম। না আমার পরিচিত কাউকে দেখছি না। সব নতুন মুখ।

দোতলায় আমাদের বাংলা অনার্সের ক্লাস হতো। একবার যেতে ইচ্ছে করলো। মনকে মানালাম বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।

পায়ে পায়ে অডিটোরিয়ামের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসছিলাম। একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা আমার পথ আটকে দাঁড়ালেন। মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। আমারও মুখটা কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছে কিন্তু ঠাহর করতে পারছি না। প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা।

আপনি অনি ব্যানার্জী?

এবার স্মৃতি ঘাঁটতে শুরু করলাম। নিশ্চই আমাকে চেনে।

হ্যাঁ ম্যাডাম।

আপনি এখানে?

নিজের ছাত্রাবস্থাকে খুঁজতে এসেছিলাম। আপনাকে ঠিক….।

আমি ডা. রায়ের ছাত্রী আপনি যেবার আউটগয়িং আমি সেই বছর জাস্ট এমএ দিয়ে কলেজে লেকচারার সিপে জয়েন করলাম। আপনাকে পড়াবার সৌভাগ্য আমার হয় নি।

হাসলাম।

দু-একজন ছাত্র-ছাত্রী ম্যাডামের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

রেজাল্ট যেদিন নিতে এলেন সেদিন ডা. রায় আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন মনে পড়ছে?

মুচকি হাসলাম, বলতে পারছি না, সেই তিরিশ বছর আগের কথা মনে থাকে কি করে।

আমার হাবভাবে ভদ্রমহিলার মুখটা সামান্য ফ্যাকাসে হলেও হাসিটা অমলিন রইলো।

কাগজের অফিসে আপনাকে বহুবার দেখেছি। সুমন্ত দেখিয়েছে। মিত্রার সঙ্গেও আলাপ করেছি।

আমার খুব লজ্জা করছিল, স্মৃতি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য।

ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে তাকালেন। তোরা চিনতে পারিস ওনাকে?

সবাই আমার দিকে তাকিয়ে।

না ম্যাম।

উনি অনি ব্যানার্জী।

আমাদের কাগজের নাম বললো।

হ্যাঁ ম্যাম চিনতে পারছি।

আজই ওনার লেখা লিড নিউজ হয়েছে। আর একজন বলে উঠলো।

প্রতিদিন হয়, তোরা লক্ষ্য রাখিস না তাই।

আমার দিকে তাকিয়ে বললেন চলুন প্রফেসারস রুমে।

না ম্যাডাম আজ থাক। পরে একদিন আসবো।

ম্যাডামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম।

একটা সিগারেট কিনলাম।

দু-একটা টান দেওয়ার পর ভালো লাগলো না। ফেলে দিলাম। দুটো ক্যান্ডি কিনলাম। পায়ে পায়ে নিজের হস্টেলের সামনে এসে দাঁড়ালাম।

কলেজে ক্লাস শেষের পর যে যার ফিরে আসছে। আমি পায়ে পায়ে ভেতরে এলাম। আমাদের সময় মেয়েরা গেস্ট রুম ছাড়া এই হস্টেলের ভেতরে ঢুকতে পারতো না। এখন দেখছি শুধু ভেতরে নয়, ঘরে যাওয়ার পার্মিশন পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। যুগের পরিবর্তন।

একজন এসে কাছে দাঁড়িয়ে বললো, আপনি অনেকক্ষণ থেকে বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। কাউকে খুঁজছেন?

সুপার আছেন?

হ্যাঁ।

একটু দেখা করা যাবে?

আসুন।

আমি ছেলেটির পেছন পেছন ভেতরে এলাম। দোতলায় উঠলাম। আমাদের সময় যে ঘরে সুপার থাকতেন সেই ঘরটাই এখনও বরাদ্দ সুপারের জন্য। সুপার বলতে কলেজের একজন প্রফেসার। তিনি কলকাতায় থাকেন না। কলকাতার বাইরে থাকেন। তাই কলেজ তাকে এই ঘরটা দিয়েছে, আর তিনি এই ছাত্রাবাসের দেখাশুনো করেন।

ছেলেটি বেল বাজাল। কিছুক্ষণ পর একজন ভদ্রমহিলা দরজা খুললেন।

ম্যাডাম স্যার আছেন?

কেন?

উনি একবার দেখা করতে চান।

কি দরকার বলুন?

একটু ডেকে দেবেন। সামান্য কথা বলতাম।

ভদ্রমহিলা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কি বুঝলেন কি জানি। অপেক্ষা করতে বলে ভেতরে চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর এক বছর চল্লিশ বয়সের ছেলে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল।

ইনি আমাদের প্রফেসর সেন। এই হস্টেলের সুপার। ছেলেটি বললো।

আমি বুকে হাত রেখে নমস্কার করলাম।

কি চাই বলুন?

আমি একসময় এই হস্টেলে কাটিয়ে গেছি।

ভদ্রলোক আমার কথা শুনে একটু অবাক হলেন। ভাবলেন এ কি-রে বাবা!

আপনি কি আমাদের কলেজের ছাত্র ছিলেন?

হ্যাঁ।

কোন ইয়ার?

বললাম।

আপনার নাম?

অনি ব্যানার্জী।

নামটা শুনেই ভদ্রলোকের মুখটা কেমন যেন হয়ে গেল। তারপর একগাল হেঁসে বললেন, ভেতরে আসুন, ভেতরে আসুন। মিতু দেখবে এসো কে এসেছেন।

আজ যাব না স্যার।

স্যার বলবেন না। আমি আপনার থেকে অনেক জুনিয়র।

ততক্ষণে সেই ভদ্রমহিলা ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছেন।

যে ছেলেটি আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল সে আর নরে না।

প্রফেসর সেন এবার সটাং আমার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যেতে চাইলেন।

এত সহজে আপনাকে ছাড়বো না।

বাধ্য হয়ে ভতরে ঢুকলাম।

স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করালেন। কিছুক্ষণ বসে কথা বললাম। চা খেলাম।

স্যার আপনাকে একটা কথা বলবো।

এই দেখুন তখন থেকে আপনি আমাকে স্যার স্যার বলছেন। আমারই বরং আপনাকে স্যার বলা উচিত। বলুন কি কথা।

আমি একবার ষোল নম্বর ঘরটাতে যাব।

নিশ্চই যাবেন। আপনি ওই ঘরে থাকতেন?

হ্যাঁ।

ওখান থেকে উঠে বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ষোল নম্বর ঘরটাতে এলাম।

দেখলাম ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। প্রফেসর সেন নিজেই দরজায় কড়া নারলেন। একটা ছেলে দরজা খুললো।

কি করিস, কতক্ষণ থেকে দরজায় কড়া নাড়ছি।

দেখলাম আরও দু-তিনজন ছাত্র চলে এসেছে।

এই দাদাকে চিনতে পারিস?

ছেলেটি আমার দিকে একবার তাকাল। মাথা নামিয়ে নিল। বেচারা ঘুমিয়ে পড়েছিল। চোখ তাই বলছে।

বিছানার ওপর যে কাগজটা পরে আছে নিয়ে আয়।

ছেলেটি ভেতরে গেলো। কাগজটা নিয়ে এলো।

উনি ফ্রন্টপেজে আমার নামটা দেখিয়ে বললেন উনি হচ্ছেন এই ব্যক্তি। আমাদের কলেজে যখন পড়তেন তখন তোর এই ঘরটাতে উনি থাকতেন।

এইবার ছেলেটির ঘুম একেবারে ভেঙে গেল। একগাল হেসে বললো, ভেতরে আসুন।

সবাই এবার হুমরি খেয়ে পড়েছে।

আমি ভেতরে এলাম। ঘরটা যেমন ছিল এখনও ঠিক তেমনি আছে। সেই কাঠের চার ব্লেডের পাখা। ঢকাং ঢকাং করে ঘুরছে। পেটটা বিশাল মোটা। নাই নাই করেও মোন-খানেক ভাড়ি।

এই ঘরে আমার অনেক স্মৃতি। এই ঘর থেকেই আমি দামিনীমাসির আশ্রয়ে উঠে গেছিলাম। জীবনের আর এক অধ্যায়ের সম্মুখীন হয়েছিলাম। দেখতে দেখতে তিরিশটা বছর কেটে গেছে।

জানলাটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। ছোট্ট মাঠের ধারেই সেই পাকা রাস্তা।

হুড়মুড় করে সব চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

গ্রামের ছেলে শহরে এলেই তার পেখম গজায়। ধরাকে সড়াজ্ঞান করে। পৌরুষ যেন মুহু-মুর্হু জেগে ওঠে। আমি নিজেও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। পাখনা গজালো। কাক থেকে ময়ূর হয়েগেলাম।

এখানকার সমবয়সী পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খুব তারাতারি ভাব জমিয়ে নিলাম। হলায় গলায় বন্ধুত্ব। শুধু আমি নয় হস্টেলের আরও অনেকের সঙ্গেই সক্ষ্যতা গড়ে উঠলো।

অবসর পেলেই হস্টেলের সামনের রাস্তায় ক্রিকেট ফুটবল খেলতে নেমে পরতাম।

তখন এই তল্লাটে আমাদের হোস্টেলটা একমাত্র পাকা বাড়ি।

রাস্তার ওপারে সব খোলার চালের বাড়ি। বলতে গেলে বস্তি।

রবিবারের খেলাটা খুব জমতো। পাড়ার গুরুজনেরাও বাজার শেষে চা-টা খেয়ে আমাদের সঙ্গে একদান লেগে পরতো।

আমরা যেখানে খেলতাম তার সামনেই সর্বেশ্বর জ্যেঠুর রেশনের দোকান।

রেশন দোকানটা তখন টিনের চালের ছিল।

বল প্রায়ই জ্যেঠুর দোকানে ঢুকে পরতো। জ্যেঠু রাগ করতো। যাকে বলে একেবারে রেগে অগ্নিশর্মা। বড়োরা গিয়ে যখন বলতো কি করছো সর্বেশ্বরদা বাচ্চাগুলো যাবে কোথায় বলো। তখন অবশ্য জ্যেঠু আর রাগ করতো না।

জ্যেঠুর দোকানে ভেঁদোদা বলে একটা গোলগাল কালো মতো লোক রেশনের জিনিষ-পত্র মাপা-মাপির কাজ করতো। মাঝে মাঝে লড়ি করে চাল, গম, তেল এলে মাথায় করে নামিয়ে দোকানে রাখতো।

শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা কোনওদিন ভেঁদোদাকে আমি হাফ প্যান্ট আর একটা স্যান্ডো গেঞ্জির জায়গায় কিছু পড়তে দেখি নি। খুব বেশি হলে শীতকালে একটা মেয়েদের ছোটো চাদর জড়িয়ে নিত।

আমার বয়সী ছেলে ছোকরারা প্রায়ই ভেঁদোদাকে বলতো—ভেঁদো বাঁশী বাজে।

ভেঁদোদা খুব রেগে যেত, রাস্তা থেকে ঢিল তুলে মারতে তেরে আসতো।

আবার আমাদের সঙ্গে যখন ক্রিকেট খেলবে তখন ভেঁদোদা শুধু ফিল্ডিং করবে। কোনও দিন ব্যাট করবে না। যে যেদিকে বল মারবে ভেঁদোদা দৌড়ে সেই বল নিয়ে আসবে। ছুঁড়লে সেই বল নিয়ে আসার জন্য আবার দু-জন লোকের দরকার পরতো।

ভেঁদোদার এই রকম থ্রোয়িং।

আমিও মাঝে মাঝে পাল্লায় পরে ভেঁদোদাকে রাগাতাম,—ভেঁদো বাঁশী বাজে।

ভেঁদোদা হাতের সামনে যা পেতো ছুঁড়ে মারতো।

আমরা হাসতে হাসতে যে যার এদিক ওদিক ছুটে পালিয়ে যেতাম।

ভেঁদোদা কাঁদতে কাঁদতে সর্বেশ্বর জ্যেঠুকে গিয়ে নালিশ করতো।

আমরা আবার ভেঁদোদার পেছনে লাগতাম।

কিরে ভেঁদোদা, সর্বেশ্বর জ্যেঠুকে নালিশ করে কটা বালিশ পেলি।

কেন ও কথা বললি।

কি হয়েছে।

ভেঁদোদা চোখ ছল ছল করে মাথা নীচু করে চলে যেতো। কোনও কথা বলতো না।

মাঝে মাঝেই সর্বেশ্বর জ্যেঠু যখন দোকান থেকে বাড়িতে চা খেতে যেত। আমরা দল বেঁধে রেশন দোকানে হাজির হতাম।

ভেঁদোদা একটু চিনি দিবি।

না দেব না।

আর কোনও দিন বলবো না। একটু চিনি দে।

ঠিক, আর বলবি না।

বলছি তো আর বলবো না।

ভেঁদোদা সবার হাতে বস্তা থেকে নিয়ে একটু একটু করে চিনি দিতো। মহা অনন্দে চিনি মুখে দিয়ে রাস্তার কলের একপেট জল খেয়ে আবার খেলতে আরম্ভ করতাম।

ঝুনে ওই পাড়াতেই থাকতো। কালো, রোগা ডিগডিগে কিন্তু অসম্ভব জোড়ে বল করতো। ক্যাম্বিশের বল একটু জলে ভিঁজিয়ে নিলে তার জোড় আরও বেড়ে যেত। ঝুনের বল আমরা কেউই ভালো মতো খেলতে পারতাম না।

আমি তো ওর বল প্রায়ই গায়ে খেলতাম। বেশ লাগতো।

মাঝে মাঝে যে দু-চারটে আলটপকা মারতাম না তা নয়। সে কচিৎ কদাচিৎ।

সেদিন দুপুরে ম্যাচ। আমাদের হস্টেলের ছেলেদের সঙ্গে ওই পাড়ার ছেলেদের। খেলা বেশ জমে উঠেছে। টান টান উত্তেজনা। আমরা একপ্রকার হারতে বসেছি। আমি ব্যাট করছি। বল করছে ঝুনে। সেদিন আমার ঘাড়ে কি ভূত চেপেছিল কে জানে। ঝুনেকে বেধড়ক মারছিলাম।

সেই ওভারটা ঝুনে বল করতে এসেছে। দৌড় শুরু করেছে। হঠাৎ দেখি ভেঁদোদা রাস্তায় নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে। হেরো পার্টি, হেরো পার্টি বলে।

হঠাৎ মাথাটা কেমন গরম হয়েগেল। স্টান্স নিতে গিয়েও সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। রাগের চোটে বলে বসলাম ভেঁদোদা এবার কিন্তু তোর বাঁশী বাজিয়ে দেব।

ঝুনে কিন্তু দৌড় থামায় নি। বলটা করা মাত্রই বলটা লাফিয়ে উঠে আমার মুখে লাগলো। একবারে ঠিক ঠোঁটের ওপর। ঠোঁটটা ফুলে গেল। একটু কেটে গেল।

ঝুনেকে মারতে তেড়ে গেলাম। বড়রা সবাই ছুটে এলে। একটা হুলুস্থূলুস পরে গেল। সবাই এসে ধরা ধরি করে আটকে দিল।

আবার বল করতে গেল ঝুনে। পর পর তিনটে বল মারার পর আমি ফিফথ বলে বোল্ড হয়ে ফিরে এলাম।

মনটা খারাপ হয়ে গেল। ম্যাচটা হেরেও গেলাম। একটু খানি মাথা গারম করার জন্য একটা বিশ্রী কাণ্ড হয়ে গেল। পাড়ার গুরুজনেরা কি ভাবল।

হস্টেল ফিরে এলাম। বেশ মনে আছে আর বেরোই নি। চুপচাপ নিজের ঘরেই রইলাম।

বিকেল হয়ে গেছে, সন্ধ্যে হয় হয়। খাটের মধ্যে শুয়েই আড়মোড়া খাচ্ছি। মাঝে মাঝে দুপুরের কথাটা মনে পড়ে গেলেই মনটা কেমন খচ খচ করে উঠছে।

ইস কেন ভেঁদোদাকে ওই সময় কথাটা বলতে গেলাম। ঝুনেকে ঠিক মতো খেলে দিতে পারলেই ম্যাচটা জিতে যেতে পারতাম। আর কিছুই নয় কলেজ হস্টেলের একটা নাম হতো।

সাত-পাঁচ ভাবছি।

হঠাৎ দেখলাম ঝুনে আর পদু আমার ঘরে ঢুকলো।

কিরে অনি অন্ধকারে শুয়ে আছিস? পদু বললো।

আমি খাট থেকে নেমে আলোটা জ্বালালাম।

আলো বলতে একটা একশো পাওয়ারের বাল্ব।

ওপরের দিকে তাকালাম। দেখলাম একটা তারের সঙ্গে সেই ভাবেই বাল্বটা ঝুলছে।

ঝুনেকে দেখেই মাথাটা গরম হয়ে গেল।

তোর কাছে ঝুনে ক্ষমা চাইতে এসেছে।

কেন? ও তো ওর কাজ করেছে। তবে আমারই ভুল হয়েছে।

তুই ব্যাপারটা বোঝ।

বোঝাবুঝির কিছু নেই পদু। আমি তখন রেডি ছিলাম না। ওর বলটা তখন না করাই উচিত ছিল। আমি হলেও তাই করতাম। এটাকেই স্পোর্টস ম্যান স্পিরিট বলে।

কিছু ওষুধ খেয়েছিস?

গ্রামের ছেলে, ওষুধের দরকার পরে না। ওটা তোদের শহরের ছেলেদের জন্য।

অতোটা রক্ত বেরোল।

তাতে কি হয়েছে।

হঠাৎ ঝুনে আমার হাতটা চেপে ধরলো।

আমাকে ক্ষমা কর অনি।

ছাড়, ফালতু কথা একবারে বলবি না। তোকে আমি এই পাড়ায় সবচেয়ে বশি ভালোবাসতাম।

ঝুনের ধরা হাত থেকে আমার হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিলাম।

ঝুনে মাথা নীচু করে বললো, তুই তখন ওই কথাটা বললি কেন।

রাগে তখন আমার দিক-বিদিক জ্ঞান শূন্য অবস্থা, সারাটা শরীর জ্বলছে। একে হারের জ্বালা আর একদিকে ঝুনের এই ন্যাকামো।

কি কথা!

ভেঁদো এবার তোমার বাঁশী বাজিয়ে দেব।

বেশ করেছি, সবাই বলে, তাই বলেছি।

ঝুনে খুব নীচু স্বরে বললো।

ভেঁদো আমার দাদা, বাঁশী আমার বাবা।

কথাটা শোনার পর আমি হঠাৎ কেমন যেন বোবা হয়ে গেলাম। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচর দিয়ে উঠলো। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে কাঁদতে পারছি না। ঝুনকে বুকের সঙ্গে জাপ্টে ধরলাম।

ঝুনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

ভেঁদোদা আমার বড়দা। এ্যাবনর্মাল। অনেক চিকিৎসা করিয়েছি। কিছু হয় নি। তুই তো আমাদের অবস্থা জানিস না। আমাদের বাড়িতেও যাস নি।

নয় ভাই বোনের সংসার। বাবা-দাদা সর্বেশ্বর জ্যেঠুর দোকানে কাজ করে। যা পায় তাতে সংসার চলে না। আমি মেজদা, সেজদা, ছোটদা টিউশনি করে কতো পাই বল। তাও সেজদা নাটক করে বেড়ায় যা পয়সা পায় নিজের পেছনে খরচ করে, একটা পয়সাও সংসারে দেয় না।

দিদিরা ব্লাউজ সেলাই করে। তোর মুখ থেকে আগে কখনও ওই কথা শুনিনি। শোনার পর মাথাটা কেমন যেনো হয়ে গেল। নিজেকে….

অনেকক্ষণ ঝুনেকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

ঝুনেরা তারপর চলে গেল। আমি আর নিচে খাবার ঘরে খেতে যাই নি। খেতে ইচ্ছে করছিল না। সারাটা রাত ঘুমতে পারি নি। বার বার ঝুনের কথাগুলো মনে পরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জীবনে যদি কোনওদিন স্ট্যাণ্ড করতে পারি, আমি নিজের পয়সায় ভেঁদোদার চিকিৎসা করবো।

মিঃ ব্যানার্জী।

আমার স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। মনে হয় চোখটা ছল ছল করছিল। পকেট থেকে রুমাল বারকরলাম।

চোখটা মুছলাম।

সরি।

প্রফেসর সেন আমার দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে।

ছাত্ররাও যারা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তারাও আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

একটা কথা মনে পড়ে গেল।

ভদ্রলোক কোনও কথা বললেন না।

ঠিক আছে মিঃ সেন। আমি এখন যাই।

একটু চা খান।

না। পরে একদিন এসে আপনাদের সঙ্গে গল্প করবো।

আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালাম না। সোজা নিচে চলে এলাম।

বার বার ঝুনে, পদুর মুখটা চোখের সামনে ভসে আসছে।

বেরিয়ে এলাম।

পাশের রাস্তা দিয়ে একটু হেঁটে আমাদের সেই খেলার মাঠ, বড় রাস্তায় এসে পরলাম।

সব কিছু যেন অচেনা ঠেকছে। সেই রেশন দোকানটা এখন পেল্লাই একটা মাল্টি স্টোরেড বিল্ডিং হয়েছে। পাশা পাশি আরও দু-চারটে বড়ো বড়ো বিল্ডিং উঠেছে।

রেশন দোকানের বোর্ডটা দেখতে পেলাম।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। ভেঁদোদাকে দেখতে পেলাম না। ঝুনের বাবাকেও দেখতে পালাম না। একটা বছর তিরিশের ছেলে সর্বেশ্বর জ্যেঠুর চেয়ারে বসে আছে। মাল মাপছে একটা বছর পঁচিশ বয়সের ছেলে।

আমাকে উঁকি মারতে দেখে ছেলেটি চেঁচিয়ে উঠলো, কাকে চান।

সর্বেশ্বর জ্যেঠু।

উনি এখন দোকানে বসেন না। স্ট্রোকে পঙ্গু হয়ে বাড়িতে শুয়ে আছেন। আমি ওনার ছেলে, কি দরকার বলতে পারেন।

কথা বলার ধরনটা ভালো লাগলো না। কেমন যেন লাগলো। এইভাবে নিজের বাবার সম্বন্ধে কেউ কথা বলতে পারে!

আমি চুপ করে আছি দেখে। ছেলেটি কেমন ভাবে যেন তাকাল।

কোথা থেকে আসছেন?

আমি এখন বালিগঞ্জে থাকি। আগে এই পাড়ায় থাকতাম।

ও।

কথার মধ্যে দিয়েই ছেলেটি বুঝিয়ে দিল। বাবা তুমি এবার কেটে পরো, তোমাকে আমার আর প্রয়োজন নেই।

কি করি, কি করি। একবার ঝুনের বাড়িতে যাই। দেখি চিন্তে পারে কিনা। পদুর বাড়িটা গলি তস্য গলির মধ্যে। এতদিন পর ঠিক ঠাহর করতে পারবো কি না কে জানে।

বিকেল গড়িয়ে গেছে। সূর্যের রং কমলা। একটু পরেই সন্ধ্যে হয়ে যাবে।

সামনের দোকান থেকে একটা সিগারেট কিনে ধরালাম। সেই গলির মুখে এসে পরলাম। আগে কাঁচা রাস্তা ছিল। এখন দেখলাম সিমন্টের রাস্তা হয়েছে। কিছুটা যেন শ্রী ফিরেছে।

কিন্তু একটা জলের কলে পঞ্চাশ জনের লাইন এখনও বন্ধ হয় নি। সেই তারস্বর চিৎকার ঝগড়া ঝাঁটি লেগেই আছে। কার আগে লাইন ছিল, কে লাইন ভেঙে আগে জলের বালতি বসিয়েছে। এই সব।

পায়ে পায়ে মনে করতে করতে ঝুনের বাড়ির কাছে এসে দাঁড়ালাম।

সেই কর্পোরেশনের কলটা এখনও রয়েছে। ঝুনের দিদিরা লাইন দিয়ে এখান থেকে জল ধরতো। একটা বোতল পর্যন্ত ফাঁকা রাখা চলবে না। টাইম কলের জল বলে কথা।

আমি দাঁড়িয়ে পরলাম। দরজা দিয়ে একবার ভেতরে উঁকি মারলাম।

কাকে চাই।

একবারে বাজখাঁই গলা, জলের কলে বসে একজন বয়স্ক মহিলা বালতিতে জল ধরতে ধরতে চেঁচিয়ে উঠলেন।

ঝুনেকে একটু ডেকে দেবেন।

কলের ধারে দাঁড়ানো সব মেয়েরাই আমার কথাটা শুনে কেমন যেন আকাশ থেকে পরলো। চোখে মুখে তারই বর্হিঃপ্রকাশ।

কোথা থেকে আসা হচ্ছে শুনি।

কি বলি। এর কোনও উত্তর নেই।

কাছে পিঠেই থাকি।

ওঅঅঅঅ। তা জানো না, তারা কতোকাল আগে এ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।

ভাবিনি, সত্যি সত্যি ঝুনেরা এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারে।

ফিরে আসতে গিয়ে একটু থমকে দাঁড়ালাম।

পদুরা কোন গলিতে থাকে একটু বলতে পারবেন।

এবার সবাই কেমন আমাকে সন্দেহের চোখে দেখছে। যেনো ভূত দেখছে।

চিটিংবাজটাকে আবার কিসের দরকার শুনি। দেখে তো ভদ্রঘরের ছেলে মনে হচ্ছে।

কথার পিঠে কথা, মেয়েলি ক্যাচাল শুরু হয়ে গেল।

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। বেশ্য পট্টির ক্যাচাল হজম করার শক্তি যার আছে তার কাছে এইটুকু কোনও ব্যাপার নয়।

একজন বলে উঠলো, আরে উনি হচ্ছেন আপার লেবেলের চিটিংবাজ।

একটু থমকে গেলাম। কেমন যেন একটা খটকা লাগল।

যদি একটু রাস্তাটা বলে দেন।

সামনের দুটো গলি ছেড়ে তিন নম্বরে ঢুকবেন। ডাইনে গিয়ে বাঁয়ে, আবার একটু গিয়ে বাঁয়ের গলিতে ঢুকে চার নম্বর বাড়ি।

নিজের মনে নিজেই হাঁসলাম। বেশ্যা পট্টিতে কোঠা আছে গলি নেই, বস্তিতে গলি তস্য গলি। মাথাতে একটুও ঢুকলো না। সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। বেশ বুঝতে পারলাম কলের ধারের অতগুলো মেয়েলি চোখ আমার দিকে শ্যেন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।

ঠোক্কর খেতে খেতে পদুর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। সেখানেও একই অবস্থা। জলের কলে গণ্ডগোল। কলকাতা শহরে বস্তিগুলোর হাল কোনওদিন ফিরবে কিনা জানি না।

একজন ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞাসা করলাম পদু কি এই বাড়িতে থাকে?

না।

তাহলে!

থাকতো, এখন থাকে না।

বুঝলাম পদুকে গোপন করার সব ব্যবস্থা পাকা। মাথায় কিছুই ঢুকছে না। দাঁড়িয়ে থাকলাম।

কি চাই বলুন?

ওর সঙ্গে একটু দেখা করবো।

কোথা থেকে আসছেন?

আগে এখানে থাকতাম, এখন থাকি না।

কোথায় থাকতেন?

কি বলি।

বানিয়ে বানিয়ে বললাম, ওই রেশন দোকানের বাড়িতে থাকতাম।

নাম কি?

সত্যি বলবো না মিথ্যে বলবো। এরা শুধু প্রশ্ন করবে আমি উত্তর দিয়ে যাব তা হয় না।

আপনি কে?

আমি ওর ভায়ের বউ। উনি আমার ভাসুর হন।

পদু কি আছে?

দেখা হবে না।

কেন বলুন?

সবাই আপনার মতো এসে ভালো ভালো কথা বলে। বাড়ির বাইরে এলেই ঘা দুচ্চার দিয়ে চলে যায়।

ভদ্রমহিলার কথা শুনে অবাক হয়েগেলাম।

কেন!

অভাবের সংসার, সবার কাছ থেকে টাকা ধার করে। শোধ করতে পারে না।

চুপ করে থাকলাম।

নাম বললে ও চিনতে পারবে না। একবার বলুন আসতে, আমি চলে যাব। আমার কাছ থেকে ও কোনও দিন টাকা ধার করে নি।

সবাই কেমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এইরকম কথা যেন ওরা প্রথম শুনছে।

সন্ধ্যে হয়ে আসছে। কর্পোরেশনের বাতি ওয়ালা একটা লাঠি নিয়ে বস্তির আলো জ্বালতে জ্বালতে চলেছে। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর একজন ক্ষীণজিবী আধবুড়োটে লোক আমার সামনে এসে দাঁড়াল। পরনে একটা আধময়লা লুঙ্গি, হাতকাটা স্যান্ডোগেঞ্জি। তাও কেমন ছিট ছিট দাগ। সারাটা শরীরের ছত্রে ছত্রে দারিদ্রতার পোস্টার। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর তিরিশ বছর আগের দেখা পদুর মুখের হদিস পেলাম।

হেসেফেললাম।

চিনতে পারছিস না?

মাথা দোলাচ্ছে। না।

আশে-পাশে ছোটো বড়ো ল্যান্ডা-গেন্ডা মেয়ে-পুরুষে জড়িয়ে ধরেছে। মার খাওয়ার হাত থেকে পদুকে হয়তো বাঁচাতে এসেছে সবাই।

কাছে এসে ওর দুই কাঁধা হাত রাখলাম।

একটুও চিনতে পারছিস না!

মাথা দোলাচ্ছে। চোখ যেন মাইক্রস্কোপের মতো করে কাকে খুঁজে চলেছে।

না।

আমি অনি।

পদু জড়িয়ে ধরলো।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/yEbQwlP
via BanglaChoti

Comments