কাজলদিঘী (১১৫ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১১৫ নং কিস্তি
—————————

দ্বীপায়ণ, সন্দীপ, অর্ক ঘরে ঢুকলো। পেছনে নীরু।

দ্বীপায়ণ, সন্দীপ ঘরে ঢুকেই জড়িয়ে ধরলো, অর্ক পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।

কনিষ্কদা অনিদাকে একটা মিষ্টি দিতে পারি।

একবারে না।

প্রসাদ।

সামান্য।

দে না একটা খেলে কিছু হবে না।

না বলেছি, যতোক্ষণ নর্মাল না হচ্ছিস একটু রেস্ট্রিকসনে থাক না।

ওরটা আমাকে দে, আমি খেলেই ওর খাওয়া হয়ে যাবে।

নীরু হাত পাতলো।

আমি একটুখানি ভেঙে মুখে দিলাম।

বিশ্বাস কর কাল মাত্র দু-ঘণ্টা ঘুমিয়েছি। একটুও ক্লান্তি লাগছে না। সন্দীপ বললো।

কাগজ দেখেছো? দ্বীপায়ণ বললো।

এখনও দেখি নি। অর্ক—

বলো।

কনিষ্ক বললো, নীচে কারা সব এসেছে।

ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া। তোমাকে ধরার জন্য খালি ছোঁক ছোঁক করছে।

একটু গিয়ে বলে দে। আমি বিকেল পাঁচটা থেকে ছ-টা পর্যন্ত প্রেস কনফারেন্স করবো। দাদার বাড়িতে। ওরা যেন ওখানে সকলে চলে আসে।

অর্ক বেরিয়ে গেল। একজন আয়া এসে আমার খাবারটা দিয়ে গেল।

খুব খিদে পেয়েছে। আমি খেতে খেতেই ওদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম।

সন্দীপ, মৈনাক তোকে ফোন করেছিল?

তোর লেখাটা প্রেসে পাঠিয়েই ফোন করেছিল।

এখানে ফোন করে জানতে পারলাম তোর শরীর আবার গণ্ডগোল করেছে।

লেখাটা কি ওদের ন্যাশন্যাল এডিসনে ধরিয়েছে?

হ্যাঁ। এডিটর নিজে ইনিসিয়েটিভ নিয়ে করেছে। তোর নামেই লেখাটা বেরিয়েছে।

সকাল থেকে কোনও ফোন এসেছিল।

খুব থমথমে অবস্থা। এ্যাসেম্বলি সেশন চলছে। অনিমেষদারা অনাস্থা প্রস্তাব আনছে। আজ না হলেও কাল আলোচনা ভোটাভুটি। তার তোরজোড় চলছে।

স্পিকার গ্র্যান্ট করেছে?

কিছু জানি না। অরিত্র তার টিম নিয়ে কাজ করছে। সুমন্ত অফিস সামলাচ্ছে।

অনাদিকে এ্যারেস্ট করেছে?

এখনও করে নি। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। মনে হয় এ্যারেস্ট করতে বাধ্যহবে। জনমতের যা চাপ।

কাল কাগজ বেশি ছাপিয়েছিলি।

তুই যা বলেছিলি তার থেকেও একলাখ বেশি ছাপতে হয়েছে।

একস্ট্রা কাগজ বিক্রির টাকাটা ওয়েলফার ফান্ডে যাবে। খরচ খরচা বাদ দিয়ে।

ম্যাডামকে একটু বলে দিস।

আচ্ছা।

কাল আর একটা লেখা দেব। একটু রাতের দিকে এসে আমার কাছ থেকে পিক আপ করবি।

প্রয়োজন পরলে বসে থাকবো।

দ্বীপায়ণ তোমার ওখানে আরও কিছু ছবি আছে।

হ্যাঁ, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি বলে একটা আলাদা ফোল্ডারে রেখে দিয়েছি।

ঠিক আছে তোমরা এখন যাও। সন্দীপ।

বল।

অর্ককে এখন ডিস্টার্ব করবি না।

হয়তো করতাম, এখন সব জানার পর আর করবো না।

দ্বীপায়ণের সঙ্গে কাল খুব গণ্ডগোল করেছিস।

বিশ্বাস কর লেখাটা দেখার পর, নিউজরুমে যা একটা হই হুল্লোড় হলো না। তোকে কি বলবো। বার বার তোর কথা মনেপড়ে যাচ্ছিল। তোর সঙ্গে এই আনন্দটা শেয়ার করতে পারলাম না।

বৌয়ের সঙ্গে করেছিস?

দ্বীপায়ণ ফিক করে হেসে উঠলো।

দেখেছিস ইমোসনটাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এসে আছাড় মারলি।

যা সত্যি তাই বললাম। তুই বুকে হাত দিয়ে বলতো কাল তুই তোর বউকে জড়িয়ে ধরে একসট্রা একটা কিস দিস নি?

তুই দেখতে গেছিলি—সন্দীপ চেঁচিয়ে উঠলো।

মানস চক্ষে দেখলাম।

শালা মালকিনকে বিয়ে করেছিস বলে পার পেয়ে যাচ্ছিস, নাহলে আমিও কথা বলতে পারি, এটা মনে রাখিস।

গরম খেয়ে যাচ্ছিস কেন—টেক ইট ইজি।

ঢ্যামনা।

বানান করে বলতে হয় এটা কতোবার বলবো। খুব গম্ভীর হয়ে বললাম।

দ্বীপায়ণ হাসতে হাসতে প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যায়।

তুমি থামো তো। সন্দীপদা তোমাকেও বলি।

কনিষ্করা মুখ টিপে হাসছে।

কনিষ্ক, সন্দীপকে এককাপ হরলিক্স খাইয়ে দে।

কেনো তুমি খাও না। আমি কি শিশু।

নীরু শিশু যখন বেরে ওঠে তখন তাকে কি খাওয়াতে হয়।

কমপ্ল্যান।

ঢ্যামনা স্কয়ার।

সন্দীপ উঠে দাঁড়াল।

চলো দ্বীপায়ন, বসে থেকে আর লাভ নেই।

আমি সন্দীপের হাতটা চেপে ধরলাম।

চলে যাবে, আর একটু বসো না। গল্প করি।

আবার হাসির রোল।

সন্দীপ কট কট করে আমার দিকে তাকিয়ে।

শোন, মৈনাক যদি ফোন করে, বলিস আমি ফোন করবো। তবে কোন নম্বর থেকে করবো জানি না। আমার এই মুহূর্তে কোনও নম্বর নেই।

সন্দীপ গম্ভীর হয়ে তাকাল।

আমি হেসে ফেললাম।

ওরা দু-জন বেরিয়ে গেল।

ঘরে আমি, কনিষ্ক, নীরু আর চিকনা।

চিকনা দেখতো গেটে কে বসে আছে।

চিকনা দরজাটা খুলতেই ছেলেটা উঁকি মারলো।

সুবল কইরে?

নীচে আছে স্যার।

একটু ডাক।

আচ্ছা স্যার।

খাসা মাল, এগুলোকে পেলি কোথায়?

কি করে বুঝলি!

খোঁজ নেওয়া হয়ে গেছে। আমাদের ওখানকার শিববাজারের মাল।

তুই তো বড়ো জহুরী।

চিকনা দাঁত বার করে হাসছে।

আমি এবার বালিশের তলা থেকে ফোনটা বার করলাম।

দেখলাম আইড্রপের শিশিটা যথাস্থানেই আছে।

শালা মনে পড়ে গেছে। নীরু কাছে ছুটে এলো।

তোর আবার কোথায় চুলকুনি হলো।

শিশিটা বার কর।

কেন!

নীরু নিজেই বালিসের তলায় হাত ঢুকিয়ে দিয়ে শিশিটা বার করে আনলো।

কি করে বুঝলি এটা ক্যামেরা?

চোরের মন সব সময় বোঁচকার দিকে থাকে।

চিকনা শিসিটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে।

শালা এটা নিয়ে এসেছিল।

কনিষ্ক তুই বুঝতে পেরেছিলি। নীরু বললো।

না ওর মতো বুঝি নি। তবে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা গণ্ডগোল আছে এটা বুঝেছিলাম। ও কথা বলছে ঠিক, কিন্তু ঘুরে ফিরে চোখটা ঠিক ওই জায়গায় চলে যাচ্ছে। পরে যখন অনাদির কলার চেপে ধরলো, তখন বুঝলাম। সামথিংস হ্যাপেন।

নীরু আবার আমার দিকে তাকাল, বল না।

একচ্যুয়েলি ও কালকে যে বোতামগুলো লাগিয়েছিল মোটা মুটি তার সিমিলারিটি ছিল কিন্তু এটা বেশি চকচক করছিল। আর সাইডে খুব হাল্কা করে একটা কালো বর্ডার চোখে পড়েছিল। এই ব্যাপার আমি বহুবার করেছি। তবে সেটা পেনের সাহায্যে। আনকোরা মাল যা হয় আর কি।

কতোক্ষণ রেকর্ডিং করা যাবে।

ধর আধঘণ্টা।

কি রকমভাবে করে।

দুরকমের হয়। একটা সেল্ফ রেকর্ডিং, আর একটা তোর হয়ে কেউ রেকর্ডিং করছে। তবে সেল্ফ রেকর্ডিংই বেশি করে লোকে।

কনিষ্ক আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।

কনিষ্ক আমি বাড়ি যাব। তুই, নীরু আজ সারাদিন আমার সঙ্গে থাকবি।

কেন!

দরকার আছে। সময় সব বলবে।

এদিককার অবস্থা কে সামলাবে?

আমি বলছি আর কিছু হবে না। তুই অনিকেত, বটাকে দায়িত্ব দিয়ে যা।

ঠিক আছে তুই রেডি হ। আমি ওদের সব বোঝাই।

যা।

ওরা বেরতে যাবে সুবল ঘরে ঢুকলো।

স্যার ডেকেছিলেন।

আমার মেটিরিয়লস দে।

দশ মিনিট সময় দিতে হবে।

কেন! অন্য কোথাও রেখেছিস?

সুবল মাথা নারছে।

আমি বাড়ি যাব। তোরা আমার সঙ্গে যাবি। রেডি হয়ে নে।

ঠিক আছে স্যার।

সুবলের সঙ্গে কনিষ্ক, নীরুও বেরিয়ে গেল।

আমি ফোনটা অন করে রাঘবনকে ডায়াল করলাম।

রিং হতেই ধরে ফেললো।

আমি দুপুরের ফ্লাইটে কলকতা যাচ্ছি।

আমি অনেক দিন বাড়ি যাইনি। এখন বাড়িতে যাচ্ছি।

ঠিক আছে আমি খুঁজে চলে যাব।

তুমি খুঁজবে?

ঠিক আছে।

ফোনটা রেখে দিল।

চিকনা আমার দিকে তাকিয়ে।

তোর মতো ইংরাজী বলার চেষ্টা করি, পারি না।

আস্তে আস্তে হবে।

তনুদির কোনও খবর নিয়েছিস?

দেখছিস তো কি অবস্থা। তবে গুরুমার সঙ্গে নিশ্চই কথা হয়।

আমি আবার ডায়াল করলাম।

দাদা আমি আপ্পে।

ভীকু কোথায়?

এখন কিছু দিন পাবে না।

কাল কি হয়েছে শেষ পর্যন্ত?

ঝেরে দিয়েছে। অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তোমাকে সময়মতো ফোন করবে।

আচ্ছা।

ফোনটা স্যুইচ অফ করে রেখে দিলাম। চিকনা আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।

পামটপটা বার করে অন করলাম। মেল গুলো একবার চেক করলাম। দেখলাম ভীকু একটা মেল করেছে। ভালো করে দেখে নিলাম।

মনটা খারাপ হয়ে গেল। পামটপটা বন্ধ করে রেখে দিলাম।

তোর মোবাইল কোথায়?

চিকনার দিকে তাকালাম।

স্যুইচ অফ করে রেখে দিয়েছি। প্রয়োজন পরলে অন করে ফোন করি।

একবার বাসুকে ফোন করে আমাকে দে।

চিকনা মোবাইলটা অন করে বাসুকে ফোন করলো। বুঝলাম ভয়েজ অন করে রেখেছে।

কিরে অনি কোমন আছে?

আমার সামনে বসে আছে।

দে।

তোর কথা শুনতে পাচ্ছে।

অনি।

বল।

শরীর ঠিক আছে।

আপাততঃ ভালো আছি।

কতদিন পর তোর গলা শুনছি।

কি করবি বল। গলাটা ভারি হয়ে এলো। ওখানকার অবস্থা কি রকম?

একবারে ঠাণ্ডা মেরে গেছে। সবাই তোর আসার অপেক্ষায়।

নীপা, কাকীমা, সুরোমাসি সব ঠিক আছে।

হ্যাঁ। মাঝে মাঝে কান্নাকাটি করে। তারপর আবার ঠিক হয়ে যায়।

স্কুলের পজিসন কি?

স্থিতাবস্থায়। সঞ্জু ব-কলমে দেখাশুন করছে।

নীপার মেয়েটা?

ঠিক আছে।

কাগজ দেখেছিস?

দেখেছি।

কাঞ্চন কিছু বলছিল?

হয়তো মনে মনে একটু কষ্ট পাচ্ছে। মুখে গালাগালের চোটে ভূত ভাগিয়ে দিচ্ছে।

কাকা-কাকীর শরীর কেমন?

তারা এখন তোর বাড়িতে।

কেন!

ভিটে মাটি পর্যন্ত বেচে দিয়েছে।

কি বলছিস!

এখানকার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখবে না।

তার মানে!

তুই সুস্থ হয়ে এখানে আয় তারপর সব বলবো।

কাকা-কাকীকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে!

তাহলে আর বলছি কি। ও যে এতোটা অধঃপাতে যাবে কল্পনা করিনি।

কে কিনেছে!

পালের ঘরে কেনা পাল।

শালা ধরি বাজ। আমার নাম করে ওকে বলে দে বাড়িটা ছেড়ে যেন চলে যায়। থানা পুলিশ করলে বংশ নির্বংশ হয়ে যাবে। যতটাকা দিয়ে কিনেছে সে টাকা ফেরত পেয়ে যাবে।

হারামী বিক্রী করে নি, বন্ধক দিয়েছে।

তাহলে আরও ভালো। যাই দাঁড়া।

থানা থেকে কোনও সমস্যা করছে।

আমরা সেরকম কাজ এই মূহূর্তে করছি না।

একটু ধৈর্য ধর তারপর যাচ্ছি।

তুই এখন কোথায়?

ব্যাঙ্কে এসেছি। লোন দেওয়া চলছে।

কাজ কর, পরে ফোন করবো।

ঠিক আছে।

ফোনটা চিকনার হাতে ফেরত দিলাম।

খাট থেকে নিচে নামলাম।

কোথায় যাবি?

একটু বাথরুমে যাব।

ধীরে সুস্থে বাথরুমে গেলাম।

আবার চারদিকে জট পেকে গেছে। শালা মানুষ কতো নিচ হলে তাহলে তার জন্মভিটে বন্ধক দিতে পারে। কেনা পালও কি হারামী, জানে বাপ বেঁচে থাকতে অনাদি বেচতে পারবে না। সুদে আসলে এক হয়ে গেলে, মালটা জোড় করে লিখিয়ে নেবে।

বাসুর কথা শুনে মনে হচ্ছে আরও কিছু ও বলতে চাইলেও এই মুহূর্তে বলতে পারছে না।

বাথরুমের বাইরে এসে দেখলাম কনিষ্ক, নীরু ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে।

চিকনা তুই কতোদিন গ্রামের বাইরে আছিস?

কেন বলতো।

বলনা। আমি একটা হিসেব করবো।

আড়াই মাস।

ঠিক আছে বাড়িতে গিয়ে তোর সঙ্গে একটু বসবো। কনিষ্ক ডিসচার্জ সার্টিফিকেট লিখেছিস?

না।

কেন।

তোকে এখন ছাড়া যাবে না।

পাগলা, যা বলি শোন না।

তুই বাড়ি যেতে চাইছিস চল। থাকতে চাইলে থাকতেও পারিস।

এতক্ষণ সবাই মিলে এই ঘোঁট পাকালি।

হ্যাঁ।

আমি যদি নিজে থেকে বণ্ড দিতে চাই।

সেই সুযোগ তোকে দেব না।

ভারি পাকা ছেলে তোরা।

কনিষ্ক হেসেফেললো।

মিত্রা গাড়ি পাঠিয়েছে?

না। এ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে শুয়ে যাবি।

বুঝেছি আবার একটা ছক কষেছিস তোরা। এত জায়গায় মাথা লাগাই কি করে বল।

নীরু হাসছে।

কটা বাজে বল।

পৌনে একটা।

শুইয়ে নিয়ে যাবি না বসে নিয়ে যাবি।

শুইয়ে নিয়ে যাব।

খুব ভালো, মাল পত্র নিয়ে আসতে বল।

গেটের বাইরে অপেক্ষা করছে, গিয়ে শুয়ে পর।

সুবল কোথায়?

ওরা রেডি হয়ে নিচে অপেক্ষা করছে।

আচ্ছা অর্কটা সেই যে হাওয়া হয়েগেল আর এলো না।

ওটা তোর চ্যাপ্টার।

চিকনা মোবাইলগুলো পকেটে ভর।

চিকনা আমার কথা মতো কাজ করলো।

ঘরটা একবার তাকিয়ে দেখলাম। আজ তিনমাসের ওপর এই ঘরটা এই নার্সিংহোমটা আমার ঘরবাড়ি ছিল। বেঁচে থাকার জন্য, আমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এই ঘরটা আমাকে এদের সকলকে অনেক সাহায্য করেছে।

আমার বন্ধু অনাদি। তার কিছু স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটায় আমাকে তিনমাস ভুগতে হলো। বলতে পারি মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরে এলাম। আমি যা করেছি, তা ঠিক করেছি কিনা জানি না। তবে খরাপ লাগলেও আমাকে এই কাজ করতে হয়েছে। নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

কি হলো হঠাৎ দাঁড়িয়ে পরলি কেন।

দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। ট্রলিটা সামনেই ছিল শুয়ে পড়লাম।

লিফটে নিচে নামলাম। আমাকে এ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো।

নীরু, চিকনা, কনিষ্ক আমার কাছেই থাকলো।

অত্যাধুনিক এ্যাম্বুলেন্স বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। সব কিছুই আছে। এয়ারকন্ডিসন মেশিন চলছে। নীরু আমার মুখে রোদ পরছিল বলে, পর্দাটা একটু সরিয়ে দিল।

বেরোবার সময় অনিকেত, বটাকে দেখতে পাই নি। অনেকেই নিচে ভিড় করেছিল।

বাড়ির দিকে রওনা হলাম।

চারদিক বন্ধ। রাস্তা দেখার কোনও উপায় নেই। বাইরের রোদের আলোটা পর্দার ফাঁক দিয়ে এসে ভেতরটা আলোকিত করেছে। শুধু অনুভব করতে পারছি। ওরা তিনজন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

কি ভাবছিস?

কিছু না। কতদিন পর বাড়ি যাচ্ছি। আমার সেই চেনা পরিবেশ। চারদিকে আমার পরিচিত মুখগুলো আবার ভিড় করবে। খুনসুঁটি, হাসাহাসি, এক টেবিলে বসে খাওয়া। তোর মেয়েটা সুরোর ছেলেটা সেদিন এলো, ঠিক ভালো করে কথা বলা হলো না।

মন খারাপ লাগছে?

না।

তোর তো আবার মন-টন বলে কিছু নেই।

হাসলাম।

শুধু যন্ত্রের মতো কাজ করে যেতে ভালোবাসিস।

ঠিক কথা বলেছিস। এবার যান্ত্রিকতা ছেড়ে মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবো।

মানুষ তুই আছিস। অতিমনবীয় ব্যাপারটা একটু কমিয়ে ফেলতে হবে। অনেক হয়েছে।

টান টান হয়ে শুয়ে ছিলাম, পাশ ফিরলাম।

অচ্ছা সত্যি বলতো কনিষ্ক যে পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আমি এতদিন চলে এলাম। তাতে অন্যভাবে যদি বাঁচতে চাইতাম এদের সঙ্গে পেরে উঠতাম। ওরা নোখ দাঁত বার করে আমাকে আঁচড়াতে কামড়াতে আসবে আর আমি ওদের মাথায় স্নেহের হাত বোলাব।

সে কথা বলবো না। তবে যতটা রিজিওনেবল হওয়া যায়, এই আর কি।

সব কিছু আধা আধা হয় না। নয় এপাশ নয় ওপাশ। মধ্যপন্থী হয়ে আবেদন নিবেদন করে আমি বেঁচে থাকতে পারবো না।

চরমপন্থী হয়ে হিংসায় উন্মত্ত হয়ে বেঁচে থেকে লাভ।

তুই যেটা চরমপন্থী বলছিস আমি সেটা সবক শেখাবার পথ বলে মনে করি।

আমি তোর জায়গায় নেই। তাই ঠিক সেইভাবে বুঝতে পারবো না। হয়তো তুই ঠিক, আবার নাও হতে পারিস।

আমি অতীতের কথা বাদই দিলাম। তুই অনাদির কথাটা একবার ভাব।

তুই অনাদিকে অনেকদিন ধরে দেখছিস। কেন ও এরকম হলো। একটা গ্রামের ছেলে….।

তুই ওর মনের সুপ্ত বাসনায় আগুন জ্বালিয়েছিলি। সময়ের অনেক আগে ও অনেক কিছু পেয়েগেছিলো। ফল যা হয়, আরও চাই, তার থেকেই ওর পদস্খলন।

তুই নিজের দিকে একবার তাকা। পাথর কেটে জল এনেছিস। অনাদিকে কোনওদিন রাস্তার কলের জল খেয়ে দিন কাটাতে হয়নি। অনাদির জীবনে এমন কোনও দিন খুঁজে পাবি না, দুবেলা দুমুঠো ভাত জোটে নি। তোর ক্ষেত্রে এর ভুরি ভুরি নিদর্শন আমি দিয়ে দিতে পারি।

আমি কনিষ্কর দিকে তাকিয়ে।

তুই সব সময় নিজেকে দিয়ে সবাইকে যাচাই করতে চাস, আমার মনেহয় অনাদির ক্ষেত্রে তোর কোথাও একটা সূক্ষ্ম ভুল হয়েগেছিল।

ঠিক ভুল নয়, অতি বিশ্বাস। চিকনা বললো।

আচ্ছা চিকনা তুই কোনওদিন স্বপ্নে ভাবতে পেরেছিলি, তুই এই জায়গায় আসবি।

একদম না।

যদি ধরে নিই এটাও একটা ক্ষমতা তুই বিগড়ে গেলি না কেন?

ভুল করছিস। নীরু বললো।

কেন বল।

তোকে বাসু, চিকনা, সঞ্জয় একভাবে দেখেছে। কনিষ্ক বললো।

সেখানে অনির প্রতি ওদের একটা গভীর ভালোবাসা আছে। আর অনাদি তোকে বৈতরণী পার করার শিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করেছে। বৈতরণী পার, এবার মুখ মুছে ফেলে দাও। তবে তুই যে ওর থেকেও শতেক যোজন দূরে চলে যেতে পারিস সেটা ও কল্পনা করতে পারে নি। এই জায়গায় ও তোকে আণ্ডার এস্টিমেট করেছে।

ও কি এটা কখনও বোঝে নি, না বুঝতে চায় নি।

গড নোজ।

গাড়িটা এসে থামলো। একটু টাল খেলাম।

উঠতে পারবি।

হ্যাঁ হ্যাঁ।

হেঁটে যেতে পারবি না ধরে নিয়ে যেতে হবে।

যেতে পারবো।

দাঁড়া গাড়িটা ভেতরে ঢুকুক।

আমি উঠে বসি। না হলে বড়োমারা আবার উল্টোপাল্টা চিন্তা করবে।

পর্দা সরিয়ে দেখলাম গাড়িটা বাগানে এসে দাঁড়াল। চিকনা হাতটা ধরলো। আমি ধীরে ধীরে নামলাম।

যা ভেবেছি ঠিক তাই, এ্যাম্বুলেন্স দেখে সবাই ছুটে এসেছে।

বড়োমার চোখে মুখে উৎকন্ঠা, ও কনিষ্ক!

কিছু হয় নি। এ্যাম্বুলেন্সে আসা সেফ তাই নিয়ে এলাম।

বড়োমা এগিয়ে এসে আমাকে ধরলো।

তিনমাস পর আবার বাগানে পা রাখলাম। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম একই রকম আছে। তবে বাগানের ঘাসগুলো অনেক বড়ো হয়ে গেছে। ভজুরাম এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

আমাকে কেউ তোমাকে দেখতে নিয়ে যায় নি। তোমার মাথাটা দেখি।

কেন?

তোমার মাথা নাকি ফাটিয়ে দিয়েছে।

তোকে কে বললো?

বুঁচকি দিদি। দেখি দেখি তুমি নীচু হও।

পরে দেখিস।

ছগনলাল এগিয়ে এসেছে।

কেমন আছ ছোটোবাবু।

ভালো আছি। তুমি কেমন আছ।

মনে শান্তি নেই।

বড়োমার দিকে তাকালাম। এখনও চোখের উৎকন্ঠা কাটে নি।

জড়িয়ে ধরলাম।

আমি ঠিক আছি। দাদা কোথায়?

এতক্ষণ দুটোতে বাইরের বারান্দায় বসেছিল। এই ভেতরে নিয়ে গেলাম।

আমি বড়োমাকে ধরেই আস্তে আস্তে ভেতরে এলাম।

বারান্দায় সবাই দাঁড়িয়ে, ইসির চোখটা ছলছলে।

তোর আবার কি হলো?

মুখে কিছু বললো না। জড়িয়ে ধরলো।

পিকু কেমন আছে?

মাথা দোলালো, ভালো।

বরুণদা।

আবার মাথা দোলাল।

ভেতরে এলাম। দাদা, ডাক্তারদাদা দুটো সোফায় দুজনে বসে।

আমি এগিয়ে গিয়ে দুজনকে প্রণাম করলাম। দাদা জড়িয়ে ধরলো। জড়িয়ে জড়িয়ে বললো।

কাল তোর শরীরটা আবার খারাপ হয়েছিল।

না। ওরা তোমাকে বানিয়ে বানিয়ে বলেছে।

ছোটো যে সকাল না হতেই ছুটে গেল।

বাগানে মর্নিং ওয়াক করছিল।

দাদা হাসছে। একটা চোখ হাঁসলে কেমন ছোট হয়ে যাচ্ছে। আমার মাথার পেছনদিকটা একবার কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলো কতোটা কেটেছে।

কি দেখছো?

ওরা আমায় কিছু বলে নি।

ডাক্তারদাদাও বলে নি?

ডাক্তার বড়ো চালাক। খালি বুজরুকি দেয়।

ডাক্তারদাদার দিকে তাকালাম। হাসছে।

চোখে ভালো দেখতে পাই না। তোর লেখাটা আজ পড়েছি। আগে লিখলে ভালো করতিস।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে সোফায় বসলাম।

বড়োমা ঠাকুরের ফুল এনে মাথায় ঠেকাল। একটা বেলপাতা তুলসীপাতা দুমড়ে মুচড়ে মুখে ঢুকিয়ে দিল।

বুঝলাম আস্তে আস্তে চারদিকটা জেগে উঠছে।

বৌদি তখনও রান্নাঘর থেকে বেরোয় নি।

আমি সোফা থেকে উঠে রান্নাঘরে গেলাম। প্রণাম করলাম।

সুরো আসে নি?

বাইরে নেই।

দেখছি না।

তাহলে দুটোকে নিয়ে ওপরে গেছে স্নান করাতে।

গ্যাঁড়া দুটো এসেছে—

তুই বলেছিস, না এনে পারে। মিলি অফিসে যাওয়ার সময় নামিয়ে দিয়ে গেল। বললো দুপুরে চলে আসবে।

তোমার রেডি হয়ে গেছে?

আর একটু বাকি আছে। মন্দিরে গেলাম।

তুমি কি আজকাল এসব বিশ্বাস করছো নাকি?

বয়স হচ্ছে।

হাসলাম।

তুই কি এটা পরে থাকবি না ছাড়বি।

মিত্রা পেছনে এসে দাঁড়াল।

ছোটোমা এগিয়ে এলো।

চা খাবি।

দাও।

র চা চিনি ছাড়া।

তাই দাও।

বলবি তো। মিত্রা খিঁচিয়ে উঠলো।

কি বলবে। ছোটোমা বললো।

পাঞ্জাবীটা ছাড়ার কথা বলছি।

ঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে ছাড়িয়ে দে। অতো বলাবলির কি আছে।

মিত্রা আমার হাত ধরলো। কনিষ্ক, নীরু বারান্দায় দাঁড়িয়ে। দুজনেই ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে।

বোস আমি আসছি। নীরুর পিঠে টোকা মারলাম।

নীরু হাত দেখাল।

আমি মিত্রার পাশে পাশে হেঁটে এ ঘরে এলাম।

অগোছাল ঘর। বুঝলাম ওবাড়ি থেকে এবাড়িতে এসে এখনও গুছিয়ে উঠতে পারে নি।

ঘরের দরজাটা কোনওপ্রকারে বন্ধ করেই আমাকে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।

আমি আজ কোনও বাধা দিলাম না। কাঁদুক। কার কাছে ও হাল্কা হবে। জীবনে সুখটা কি জানিষ ও অনুভব করতে পারলো না। সুখ যখনই এসেছে বর্ষার মেঘের মতো, একটু এসেই আবার বিদায় নিয়েছে। আমাকে নিয়ে ও অনেক স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু পাকচক্রে ভগবান ভূত হয়ে গেছে।

আমি না থাকলেও ছেলে-মেয়েদুটো ওর পাশে আছে। এই-ই যথেষ্ট। তবু একান্ত নিজের বলতে আমি ছাড়া ওর কে আছে।

মুখটা বুক থেকে তুলে ধরলাম। চোখের পাতা ভিঁজে সপ সপে হয়ে গেছে।

তোর কিছু হলে আমি বাঁচবো না। তুই ছাড়া আমার কে আছে বল। আমার মাথার ছাতা তুই।

কেন এসব কথা ভাবছিস?

তোকে ওরা মারতে এসেছিল।

কারা বলবি তো?

যারা কাল মরেছে।

ভুল শুনেছিস।

তুই নিজে মুখে স্বীকার করেছিস।

ওটা বলতে হয় তাই।

এখনও তুই আমাকে বোঝাবি। সারাটা জীবন বুঝিয়ে এলি। একটু সত্যি কথা বল।

চুপ করে রইলাম।

আরও দুজন এখনও কলকাতায় আছে। তোকে মারার জন্য।

তোকে কে বললো।

ইসলামভাই, রতন, আবিদ, নেপলা হন্যে হয়ে খুঁজছে।

নেপলা এখানে!

একমাত্র নেপলাই ওদের চেনে।

কে বললো?

কে আবার বলবে, ওদের মুখ থেকেই শুনলাম।

মিত্রার চোখে চোখ রাখলাম। আগের থেকে অনেক বেশি শক্ত, তবে আমার সব কথা ও সহ্য করতে পারবে এটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না।

কি ভাবছিস?

আমাকে তোর কেমন মনে হয়।

একবারে কথা ঘোরাবার চেষ্টা করবি না। যা বলছি তার উত্তর দে।

ব্যাপারটা কারা কারা জানে?

ওরা ছাড়া একমাত্র অনিমেষদা আর আমি জানি। তবে কেউ কিছু আঁচ করলেও করতে পারে।

তার মানে সাতকান হয়ে গেছে।

হয় নি।

তুই কিছু ভাবিস না। ওরা বেঁচে নেই। কাল মাঝ রাতে ওদের মেরে ফেলা হয়েছে।

কি বলছিস তুই!

ঠিক বলছি।

কে মারলো?

কেউ হয়তো কাজটা করেছে।

তুই আমার গায়ে হাত দিয়ে বল।

আমি তোকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছি। এতেও বিশ্বাস হচ্ছে না।

তখন তুই অসুস্থ হয়ে পরেছিলি।

তাতে কি হয়েছে। আমার চারপাশে আমাকে আমার আত্মীয় স্বজনকে দেখার প্রচুর লোক আছে।

এই খুন-জখম আর ভালো লাগছে না।

তুইও এই কথাটা বললি।

বলতে চাই না। তবু কেমন যেন বার বার মনে হয়।

তোর হকের জিনিষ কেউ যদি গায়ের জোরে কেরে নিতে চায় তুই মেনে নিবি।

তা মানবো কেন!

তাহলে তোকে এই ছোটোখাটো ব্যাপারগুলো মেনে নিতে হবে।

এগুলো ছোটখাটো ব্যাপার!

তাহলে কি বলবো বল। তোকে একটা মশা কামড়াচ্ছে তুই তাকে একটা থাপড়ায় মেরে ফেললি, তুইও একটা প্রাণ নষ্ট করলি, তোর কোনও ফিলিংস হয়।

তা বলে একটা জল জ্যান্ত মানুষ।

ওরা মশার মতো জীবন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে।

মিত্রা আমার মুখের দিকে বিষ্ময়ে তাকিয়ে।

দেখ ডারউইনের একটা থিওরি আছে সার্ভাইভ্যাল অফ ফিটেস্ট। দশজন শিশু যদি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে দশজনই যে বেঁচে থাকবে তার কোনও গ্যারান্টি নেই। তোকে পরিবেশ এবং প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হবে। আমি লড়াই করছি, আমি বাঁচব।

তাহলে ইসলামভাই যে বললো খুঁজে পেয়েছে।

কোনও দিন খুঁজে পাবে না।

মিত্রা আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।

দেখ ইসলামভাইয়ের সাম্রাজ্যটা গলির মধ্যে। এরপর পাকা রাস্তা আছে। তারপর আছে ভিআইপিদের রাস্তা। তারওপর আছে রাজপথ। আমি শুধুমাত্র পাকারাস্তার লোকদের ব্যবহার করছি। এখনও ভিআইপি এবং রাজপথের রাস্তার লোকদের ব্যবহার করিনি। ইসলামভাই খোঁজপাবে কি করে?

মিত্রা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।

দেখ ওই দিনকার ঘটনাটা একটা অঘটন।

সতপাল রানার কাছে আমার সঠিক পরিচয়টা ছিল না। তাই ও গোঁয়ার্তুমি করে ভুল করে ফেললো। তার জন্য ওকে জীবনটাই দিয়ে দিতে হলো। পরে হয়তো ও রিয়েলাইজ করতে পেরেছিল। কিন্তু সেটাও অনেক দেরি হয়ে গেছে।

তুইও তো এরকম ভুল করতে পারিস।

কখনই করবো না। আমি আমার এক্তিয়ারের বাইরে কখনই যাই না। সবচেয়ে বড়ো কথা আমার নিজস্ব কোনও চাহিদা নেই। আমার জীবনে একটাই চাহিদা তোদের সকলকে ভালো রাখা। তার জন্য যদি আমাকে জীবন দিতে হয়….।

মিত্রা আমার মুখটা চেপে ধরলো। বুকে মাথা রাখলো। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো।

তুই এইভাবে দুর্বল হয়ে পরলে….।

তোকে ছাড়া শুধু আমি নয়, বড়োমা, ছোটোমা, দাদা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা কতজোনের নাম বলবো কেউ আর বাঁচবো না। তোকে জড়িয়ে ধরেই যে আমাদের সব স্বপ্ন।

আমি মরবো এটা ভাবছিস কেন।

এই তিনটে মাস কিভাবে কাটলো তুই একবার ভাব।

আমি মানছি। কিন্তু ওটা আমার হাতে ছিল না।

সেই উত্তাল পরিস্থিতি তুই যদি একবার দেখতিস।

এর থেকেও তো তুই আরও উত্তাল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিস। তখন তোর অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখাই দায় ছিল, সেটার থেকে বরং ভালো আছিস।

তখন বয়স কম ছিল, মনের জোরে অনেক কিছু করতে পেরেছি।

এখন তোর হাতে সেই দিনকার থেকে অনেক বেশি ক্ষমতা। এটা মানিস?

মিত্রা চোখ তুলে তাকাল।

তুই তা ইউটিলাইজ কর। দেখবি সমীহ আদায় করে নিবি। মাথায় রাখবি তুই একা নোস তোর ওপর বারশো পরিবার নির্ভরশীল। এটা ডাইরেক্ট। ইনডিরেক্ট ভাবে তুই মাস গেলে দুলক্ষ লোকের পেটের ভাত জোগাস। এটা নেহাত কম নয়।

অতএব মুখে বললাম আর তোকে টলিয়ে দিলাম, এটা হতে পারে না। যে তোকে টলাতে চাইবে সে কিন্তু দশলাখ লোকের অন্নসংস্থান করছে না। তার যদি একটু বোধ বুদ্ধি থাকে সে তোকে হুমকি দেখিয়ে ভয় দেখাতে চাইবে। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা তার নেই।

মিত্রার চোখে হাসি।

গালের দুপাশে হাত দিয়ে ঠোঁটটায় চকাত করে একটা চুমু খেয়ে মাথাটা একটু ঝাঁকিয়ে দিলাম।

এবার ঘটে কিছু ঢুকেছে।

মিত্রা হাসছে।

বয়স অনেক হয়েছে। দুদিন পর ঠাকুমা, দিদিমা হয়ে যাবি। এবার নিজে থেকে একটু ভাবনা চিন্তা করতে শেখ না।

করি তো, মাঝে মাঝে কেমন তালগোল পাকিয়ে যায়।

পাজামা-পাঞ্জাবী দে।

মিত্রা টেবিলের ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে আলমাড়ির কাছে গিয়ে খুললো।

কোনটা পরবি।

যেটা হোক একটা দে না।

তোর দিকে এখন তোর মেয়ের খুব নজর। উল্টো পাল্টা কিছু পরলেই আমাকে বকবে।

হাসলাম। কেন?

আমাকে বলে, বাবা ওইরকম সব জামা কাপর পরে তুমি কিছু বলতে পার না।

আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে।

আর একটা কথা বলেছে।

কি!

তুমি বাবাকে ভীষণ ভালোবাসো এটা ঠিক, কিন্তু কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে গেছে।

কেন!

তোর মেয়েকে জিজ্ঞাসা করিস। এখন ছোটোমাকে নিয়ে পরেছে।

সেটা কিরকম?

তোমার সঙ্গে দাদানের কি করে আলাপ হলো? ইসলামদাদাই তোমার ভাই হলো কি করে?

ছোটোমা কি বলে?

তোর বাবার কাছ থেকে জেনে নিবি।

তখন মেয়ে কি বলে?

তাহলেই হয়েছে। এমন একটা গল্প দেবে না। তারপর গল্পের কনক্লুসন একশো বছর পর গিয়ে শেষ হবে। এ জম্মে আর জানা যাবে না। সার বুঝেছে বুঝেছিস।

জ্যেঠিমনির চ্যাপ্টার।

মেয়ে জানে কিনা বলতে পারবো না। তবে মনে হয় ছেলে সব জেনে ফেলেছে। কথায় কথায় বলে আমি বাবার জায়গায় থাকলে হয়তো এর থেকে বেশি নিষ্ঠুর হয়ে যেতাম। ইসলামভাই আর ইকবালভাইকে বলে দাদাই তোমাদের দ্বারা কিচ্ছু হবে না।

আমি হাসলাম।

ছেলেমেয়েকে ওদের সঙ্গে এইভাবে কথা বলতে মানা করিস।

না না সেইভাবে বলে না। তবে বেশ ভালো যুক্তি দেয়। ইসলামভাই তো প্রায়ই বলে বাপের রক্তটা শরীরে বইছে। জানিস মামনি বোচনকে দেখে ওই বয়সের অনির কথা প্রায় মনে পড়ে যায়। শুধু দুজনের স্ফেয়ার আলাদা, একজন ডাক্তারি পড়ছে আর একজন সাংবাদিক ছিল।

ওরা অনন্য বা অনিসার কথায় দুঃখ পায়না?

একবারে না। কথার থ্রোয়িং বলার স্টাইল একবারে তোর মতো। এই তিন মাসে তোর যে কটা অপারেসন হয়েছে। ও তোর পাশে ছিল। কনিষ্করা বার বার বারন করেছে। তার প্রতি উত্তরে বলেছে, আমার বাবা হতে পারে, এই মূহূর্তে উনি পেসেন্ট, আমি সেই চোখে দেখবো, আমার কোনও নার্ভাসনেস নেই। এমনকি দাদার ওই অবস্থাতেও ও সর্বক্ষণ পাশে ছিল।

প্রত্যেক দিন রাতে ফিরে বড়োমাকে ধরে ধরে সব বোঝাত। ডাক্তারী শাস্ত্র মতে আমরা পেসেন্টের বাড়ির লোকদের এই কথা বলি। কিন্তু দুদুনের ব্যাপারটা আলাদা তাই তোমাকে ডিটেলসে বলছি।

বড়োমা কি বলে?

বোচনকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কাঁদতো। দাদাকে নিজে হাতে ফিজিও থেরাপি করে।

এখনও!

হ্যাঁ। খাওয়ার চার্ট নিয়ে পেছন পেছন ঘুরতো। ধমকাতো।

একটু বেচাল হলে মাঝে মাঝে ডাক্তারদাদাকেও ধমকায়।

তাহলে তুই বৃথা চিন্তা করছিস, তোর এখন ভরা সংসার।

কেন তোর নয়।

আমার কথা ছাড়। আমি উড়ে এসে জুড়ে বসা পাবলিক।

দেব না এমন।

মিত্রা পেটে খোঁচা মারলো।

তোর দাড়িগুলো কেমন খোঁচা খোঁচা লাগছে।

ভাবছি রাখবো।

বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে।

বিচ্ছিরি না তোর অসুবিধে হবে তাই বল।

মিত্রা লাজুক মেয়ের মতো হাসলো।

সব আসুবিধে শুধু আমার, তোর কিছু হয়না, তাই না।

ওর কথার কোনও উত্তর দিলাম না। আমি পাজামা-পাঞ্জাবী পরে ফেলেছি।

দেখ তোর মেয়ে দেখলে রাগ করবে না?

এটা মেয়ে নিজে পছন্দ করে কিনেছে।

তোর থেকে চয়েস ভালো।

মিত্রা জড়িয়ে ধরলো।

এখনও পর্যন্ত দরজায় কেউ নক করলো না।

করবে না। বড়ো হয়ে গেছি।

তনুকে ফোন করেছিলি?

সকালে তোর কাছ থেকে ফিরে এসে কথা বলেছি। ওর মনটা খারাপ।

বিকেলে কথা বলবো।

বার বার বলছিল, এই সময় ওর পাশে থাকতে পারলাম না। তবু তুমি আছো মিত্রাদি।

বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

সুন্দরের সঙ্গে কথা বলেছিস।

বলেছি। কাল রাতে মেয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছে, আর কেঁদেছে। ছেলেটার প্রতি কেমন মায়া পড়ে গেছে। যেদিন যায় সেদিন বড়োমা, ছোটোমাকে জড়িয়ে ধরে কি কাঁদছিল।

তোমরা বাবাকে নিয়ে লণ্ডনে চলে এসো। আমি আমার বন্ধুদের বলে সব ব্যবস্থা করবো। আমার অনেক বন্ধুর বাবা-মা ওখানকার বড়ো বড়ো ডাক্তার।

আমি মিত্রার কথা শুনে যাচ্ছি।

যাওয়ার দিন ওর মা-বাবা, ভাই-বোন এসেছিল। এখন একটু একটু বাংলা বলতে পারে। বোঝে। সবাইকে প্রণাম করেছে। জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। বার বার বলেছে বাবাকে তোমরা একটু দেখ।

ও চলে যাবার পর টনা-মনার চোখ মুখের অবস্থা দেখলে তুই ভয় পয়ে যেতিস। প্রবীরদা পুরো ফিউজ হয়ে গেল। ধরে রাখা যায় নাকি। তোর কানেকসনের কিছু লোকের সঙ্গে মনে হয় টনা-মনার পরিচয় আছে। ইসলামভাইকে তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে দেয়। শেষে অনিমেষদা অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করে।

ছেলে এখন প্রায়ই যায় ওখানে। কনিষ্কদের ভূত ওর মধ্যেও ঢুকেছে। কিছু বন্ধুবান্ধবও জুটিয়ে নিয়েছে।

সুন্দর দাদার অবস্থা দেখে গেছে।

হ্যাঁ।

ওই-ই তো দাদাকে নিয়ে অফিস থেকে নার্সিংহোমে নিয়ে এসেছিল। দাদার সঙ্গে ও পুলিশের হেডকোয়ার্টারে গেছিল। বহু তর্কবিতর্ক হয়েছে। তারপর দাদা অফিসে আসে। ও সঙ্গে ছিল।

দাদা নাকি এসি ঘরের মধ্যে বসেও প্রচণ্ড ঘেমে যাচ্ছিল।

সঙ্গে সঙ্গে সন্দীপকে নিয়ে সোজা নার্সিংহোম। নিজেই দাদাকে কোলে করে নিচে নামিয়েছে।

আমাদের বিয়ের দিন ওর বয়স ছিল মাস ছয়েক। তোর মনে পড়ে সেদিনকার কথা।

মিত্রা মাথা দোলাল।

জানিস মিত্রা মাঝে মাঝে নিজের প্রতি নিজের ভীষণ রাগ হয়। মনে হয় জীবনটাকে নিয়ে আমি খুব বেশি ছিনিমিনি খেলে ফেললাম। সারাজীবনটা শুধু এক্সপেরিমেন্ট করে গেলাম।

একটু থামলাম।

চল ওরা আমাদের জন্য সবাই বসে আছে। অর্ককে বলেছি বিকেলে প্রেস কনফারেন্স করবো।

কোথায়!

এই বাড়িতে বসেই করবো। শেষ খবর কি হলো জানি না।

আঙ্কেল। আঙ্কেল। আঙ্কেল।

একটা বাচ্চামেয়ের গলা ভেসে এলো। দরজায় দুম দুম করে বাড়ি মারছে।

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। আমাকে ছেড়ে দিল।

মিলির মেয়ে।

দরজা খুলতেই দেখলাম সুরোর ছেলে মিলির মেয়ে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই হাততালি দিয়ে উঠলো। দুজনে দুটো লম্বা ঠ্যাং জড়িয়ে ধরেছে। আমি কোলে তুলে নিলাম।

কিরে স্নান করা হয়ে গেছে।

আমরা লবস্টার দিয়ে ভাত খেলাম।

ওরে বাবা লবস্টার! সেটা আবার কি?

জানো না, বোকা কোথাকার।

সুরোর ছেলেটা মিলির মেয়ের দিকে তাকিয়ে।

ওর দিকে তাকালাম। তুই খেয়েছিস?

মাথা দোলাল।

আমার জন্য রেখেছিস?

বোমবোম রেখেছে।

মিত্রা জোড়ে হেসে উঠলো।

আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।

সেটা আবার কেরে।

বড়োমাকে বোমবোম বলে।

দুটোকে কোল থেকে নামালাম। দু-হাতে দু-টোকে ধরে এ ঘরে এলাম।

ইসলামভাই, ইকবালভাই সোফায় বসে। দাদাকে, ডাক্তারদাদাকে দেখতে পেলাম না। দুজনেই আমাকে দেখে হাসছে।

আঙ্কেল মা আমাকে বকেছে।

সুরোর ছেলেটা আমার হাতটা ধরে নারালো। আমি ওর দিকে তাকালাম।

কি বলছে গো অনিদা।

সুরো রান্নাঘরের সামনে থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।

মিলির মেয়েটা হাসছে।

তুই আমার লবস্টারটা খেয়ে নিলি কেন।

ওই জন্য মা বকেছে?

না গো আমি খাই নি।

দু-জনকে নিয়ে সোফায় বসলাম।

দু-জনে দুই ঠ্যাংয়ের ওপর ঘেঁসা ঘেঁসি করে বসলো। ইসলামভাই আমার দিকে তাকিয়ে সমানে হেসে চলেছে।

মনে খুব ফূর্তি মনে হচ্ছে।

আমার না তোর?

আমি তো হাসছি না।

এইবার কি এই দুটোকে কাছে রেখে দিবি।

কেন?

আভাসে ইঙ্গিতে সেরকমই তো বুঝছি।

নেপলা কই?

সব স্নান করতে ঢুকেছে।

যে কাজে বেরিয়েছিলে হয়ে গেছে?

ইকবালভাই এবার শব্দ করে হেসে উঠলো।

বড়োমা দেখলাম নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

ওমা তোমরা এতো হাসছো কেন।

আঙ্কেল দুদু হাসছে কেন।

দুদুদের খুব আনন্দ হচ্ছে তাই।

তুমি হাসো।

পরে।

হাসো না। মিত্রা মিচকেপোরা শয়তানের হাসি মুখে মেখে সোফায় এসে বসলো।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/twDkgZp
via BanglaChoti

Comments