❝কাজলদীঘি❞
BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১০২ নং কিস্তি
—————————
একরাশ বিস্ময় মেয়েটার চোখে মুখে ভেসে উঠলো। হাসতে গিয়ে গালে টোল পরেছে। নীচু হয়ে আমার পায়ে হাত দিল।
থাক থাক।
তুই তো ওকে চিনবি না। তুই যখন ছেড়েছিস ওর তখন বছর পাঁচেক বয়েস। আমাদের রনিতা ম্যাডাম ছিল মনে আছে। রিসেপসনিস্ট। যাকে তুই একবার খুব ঝেড়েছিলি।
হ্যাঁ হ্যাঁ বল না।
পিউ রনিতা ম্যাডামের মেয়ে। রনিতা ম্যাডাম অসুস্থ হয়ে পড়ায় ম্যাডাম পিউকে মায়ের চাকরিটা দিয়েছেন।
সন্দীপদা মাকে একবার ফোন করে জানাই।
জানা।
মেয়েটা নাচতে নাচতে বেরিয়ে গেল।
অর্ক ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকলো।
কি হয়েছে কি বলো।
আমার দিকে তাকিয়ে।
তুমি!
গোবর্ধন ব্যানার্জী। হারামী এক ঘণ্টা নিচে বসে বসে মাছি তাড়াচ্ছে।
আমার দিকে তাকিয়ে।
টুপিটা চশমাট পর। সন্দীপ বললো।
কেন আমি কি তোমার….।
একবারে মুখ খিস্তি করবি না। যথেষ্ট বয়েস হয়েছে।
অর্ক হাসছে। এরই মধ্যে ফোন কানে তুলে নিয়েছে। ওরে অরিত্র একবার নীচে আয় কাণ্ড দেখে যা। হরিবোল।
আমার দিকে তাকিয়ে।
আচ্ছা তোমার স্বভাব চরিত্র কি একটুও বদলায় নি?
তোর মালটা কিন্তু হেবি চামকি দেখতে লাগছে।
ধ্যুস, কি কথার কি উত্তর। তুমি দেখলে কোথায়?
এই তো কিছুক্ষণ আগে ঘেমে ঘুমে ওপরে গেল।
বুঝেছি। সব মাপা হয়ে গেছে।
হ্যাঁ।
সায়ন্তন, অরিত্র হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো।
আমাকে দেখে হাসতে হাসতে সোফায় এলিয়ে পরলো।
দাঁড়া দাঁড়া অরিত্রদা। সায়ন্তন আমার দিকে তাকিয়ে।
কেন কি হলো!
তুমি ওই কর্নারের চেয়ারটায় বসে ছিলে না। সায়ন্তন বললো।
বেশ তো বগলদাবা করে নিয়ে ওপরে চলে গেলি।
দেখলি দেখলি অর্কদা।
অনিদা, সায়ন্তন এখন রেগুলার….। অবশ্যি সন্দীপদার তাতে শায় আছে। অরিত্র বললো।
খিস্তী খাওয়াবার কল করছিস। সন্দীপ বললো।
কেন, সায়ন্তন এখনও আইবুড়ো আছে?
ওই আর কি….। অর্ক বললো।
এই তো….। সায়ন্তন বললো।
কাগজের লাইনের মাল তায় আবার এই হাউসের চিফ ফটোগ্রাফার….। সন্দীপ বললো।
চাটতে খুব ভালোলাগছে না। সায়ন্তন চেঁচিয়ে উঠলো।
সন্দীপদা চলো ওপরে যাই। তুমি এসেছো যে, ম্যাডাম জানে? অরিত্র আমার দিকে তাকাল।
না মনে হয়।
তাহলে এতক্ষণে পিউ জানিয়ে দিয়েছে।
আমরা সবাই ঘরের বাইরে এলাম। অর্ক জড়িয়ে ধরে আছে।
কোনদিক দিয়ে যাবরে…, তোরা তো অফিসের হাল হকিকত বদলে ফেলেছিস।
অর্ক হাসছে। পিউ বলে মেয়েটা দাঁড়িয়ে পরলো।
মাকে ফোন করেছিস? সন্দীপ বললো।
মেয়েটি চোখ নাচিয়ে হ্যাঁ বললো।
ম্যাডাম….শুনেছেন….বাবুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছি। অরিত্রর কানে ফোন।
হেঁটে উঠবো, লিফ্টে নয়। আমি বললাম।
সন্দীপ হাসছে।
আমরা তিন তলায় এলাম। অনেকে নামছে উঠছে। আমাদের দেখে একটু থমকে দাঁড়াচ্ছে। আবার যার যার মতো চলে যাচ্ছে।
তিন তলাতে এসেও দেখলাম অনেক পরিবর্তন। আগের থেকে অনেক বেশি ঝকঝকে। দাদার ঘরের সামনে মিত্রার বাবার বিশাল একটা অয়েল পেন্টিং লাগান হয়েছে। অনেকে করিডরে দাঁড়িয়ে। আমি একমাত্র বরুণদাকে চিনতে পারলাম।
বরুণদা এগিয়ে এলো। হাতে হাত রাখলো।
তাহলে হেঁটেই উঠলে।
হ্যাঁ।
আগে কোথায় যাবে?
মালকিনের সঙ্গে একটু দেখা করি। যদি একটা চাকরি দেন।
অর্ক পেটে খোঁচা মারল।
বরুণদা, একেবারে নিপাট ভদ্রলোক।
আমরা সবাই মিত্রার ঘরের দিকে এলাম। বরুণদা গেট খুললো।
আসতে পারি ম্যাডাম।
আমার কথা শুনে মিত্রা চেয়ারে বসে হাসছে। টিনা, মিলি, অদিতি বসে রয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
ভেতরে এলাম।
সবাই বসলো।
বোস। মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
ম্যাডাম আপনি একবার দেখুন, যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। অর্ক বললো।
ম্যাডাম অনিদা বেকার হয়ে গেছে, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বললো, একটা চাকরি দরকার। প্লিজ ম্যাডাম, আমাদের একজন সিনিয়ার জার্নালিস্টের পদ খালি আছে, আপনি অনিদাকে একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দিন। অরিত্র বললো।
সকলে হাসছে।
সেই জন্য বাড়ি থেকে বেরোবার সময় বড়োমার কাছ থেকে পঞ্চাশটাকা ধার করেছে।
এ্যাঁ, বলো কি! সত্যি! বরুণদা বললো।
ওকে জিজ্ঞাসা করো।
মিলিরা হেসেই চলেছে।
একটু জল খাওয়াবি। তোদের অফিসে এলাম, সব ঠিক আছে একটু জলের বন্দোবস্ত নেই।
আমি চেয়ারে বসলাম।
কেন! এতক্ষণ নিচে ছিলি দেখিস নি?
তারমানে এমন জায়গায় আছে যাতে চোখে না পরে।
যাওয়ার সময় দেখিয়ে দেব।
মিত্রা নিজের জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিল।
আমি ঢক ঢক করে নিমেষে গ্লাসটা খালি করে দিলাম।
টুপিটা খোল। মিত্রা বললো।
ম্যাডাম একবার চশমাটা পরতে বলুন। অরিত্র বললো।
তাহলে একেবারে গাবর্ধন ব্যানার্জী। সন্দীপ বললো।
সেটা আবার কে? বরুণদা বললো।
সন্দীপ পকেট থেকে সেই ভিজিটর স্লিপটা বার করে বরুণদার হাতে দিল।
বরুণদা একবার চোখ বুলিয়ে হেসে উঠলো।
সত্যি তোমার মাথা থেকেই বেরোয় এসব।
একঘণ্টা নিচে বসে বসে বেমালুম মেপে নিল। অর্ক বললো।
একঘণ্টা আগে এসেছে! মিত্রা বললো।
নিচে পিউকে একবার জিজ্ঞাসা করুণ তাহলেই বুঝতে পারবেন।
সন্দীপ উঠে দাঁড়াল।
চল হাতের কাজগুলো সেরে আসি।
মালকিন চা খাওয়াবে না। সন্দীপের দিকে তাকালাম।
তুই আর কতো রঙ্গ করবি বলতো।
আমার চাকরিটা। একদিন তোকে বাঁচিয়েছি, আজ আমার এই দুর্দিনে….।
সন্দীপ কোনও কথা বলতে পারছে না। আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
ঠিক আছে তুই নিউজরুমে যা আমি যাচ্ছি।
ওরা বেরিয়ে গেল।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
মাথায় লাল টিপ, কোথায় গেছিলি?
কালীঘাটে।
কবে থেকে ধর্মে মতি হলো।
চা খাওয়াবি, না কেটে পরবো।
এই তো সবে এলি। একটু অপেক্ষা কর। বস বলে কথা। বসের চা কি এলেবেলে হতে পারে।
মিত্রার কথা শুনে বরুণদা হাসছে।
কি খাবি?
তুই খাওয়াতে পারবি না।
তখন একবার বললি, ডিম পাঁউরুটি এখনও পাওয়া যায়।
তুই খাবি।
তুই খেলে আমার আপত্তি নেই। মাঝে সাঝে গরীবের খাবার, সখ করে খেতে ভালোই লাগে।
তাহলে চল পার্কস্ট্রীটের ফুটপাথে গিয়ে ছেঁড়া পরটা, ঘুগনি, আর জিলিপি খাই।
মিত্রা চোখ বড়ো বড়ো করলো।
মিত্রাদি মনের কথাটা বলে ফেলেছে। মিলি বললো।
মিত্রা চোখ দিয়ে হাসছে।
অর্ক, নেপলা, সাগির খুব জোড়ে হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো।
মিত্রা অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে।
ম্যাডাম আর একটা কেশ আছে। নেপলার কাছ থেকে শুনুন। অর্ক বললো।
ওরা হেসেই চলেছে।
তোমরা হাসলে কথা বলবে কি করে! মিত্রা বললো।
না হেসে আপনিও থাকতে পারবেন না।
আমি নেপলার দিকে তাকিয়ে আছি।
বোকার মতো হাসে দেখো। আমি বললাম।
তুমি উঠে দাঁড়াও।
কেন বলবি তো।
উঠে দাঁড়াও না।
নেপলা জোড় করে উঠে দাঁড় করাল। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে পার্স আর রুমালটা বার করলো।
এই দেখুন ম্যাডাম। দুটোই দশটাকা করে।
মিত্রার চোখ বড়ো বড়ো। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
তোর জন্য আমি সব গুছিয়ে রেখে এসেছিলাম।
আরও আছে।
মিলিরা হেসে গড়া গড়ি খাচ্ছে।
আপনি কোনওদিন পুরুত ঠাকুরকে বলতে পেরেছেন খুচরো নেই, প্রণামী দিতে পারি যদি খুচরো করে দাও।
কে বলেছে!
অনিদা। পুরুত ঠাকুরকে দশটাকা দিয়ে পাঁচটাকা ফেরত নিয়েছে।
তুই….।
মিত্রা আর কথা বলতে পারল না। হাসতে হাসতে চেয়ারে বসে পরলো।
সবাই হাসছে।
তোর এতো দৈন্য দশা। মিত্রা হাসতে হাসতে বললো।
তাহলে কি বলেছিলাম আপনাকে।
তারপর পার্স থেকে একশো টাকার বান্ডিল বার করলো।
পকেটে পয়সা নেই তা নয়। আছে। জিজ্ঞাসা করুণ তারপর কোথায় গেছিল।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
তুই তো….।
তাহলে বুঝেছেন অনিদার সঙ্গে বেরলে মার খাওয়ার কতটা ভয় থাকে।
মিত্রা রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে।
আপনাকে বলেছিলাম না শুধু নুন দেয়নি বলে এক ডলার কম।
এবার ওরা সবাই জোড়ে হেসে উঠলো।
বরুণদা হাসতে হাসতে একবার আমার দিকে, একবার মিত্রার দিকে তাকায়।
বরুণদা শোনেনি না? নেপলা বললো।
আবার দেখলাম সন্দীপরা সবাই হুড়মুড় করে ঢুকলো।
নেপলা একবার বলো। মিত্রা বললো।
তোমার এতো হাসছো ঠিক মাথায় ঢুকছে না। বরুণদা বললো।
শুনুন তাহলে বলি।
ওখানে একদিন আমি সাগির আর অনিদা বেরিয়েছি।
এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে খুব জল পিপাসা পেয়েছে। দেখলাম মিক্সড জুস পাওয়া যাচ্ছে। এক গ্লাস দু-ডলার। অনিদা নিজেই অর্ডার দিল। আমাদের দিলো আমরা চোঁ-চা করে খেয়ে নিলাম।
আমরা চুমুক দিয়ে খাচ্ছি। অনিদা দেখি আলগোছে খাচ্ছে। কেমন যেন খটকা লাগল।
আমাদের খাওয়া শেষ তখনও অনিদা আলগোছে খেয়ে চলেছে।
তারপর দেখলাম পকেটে থেকে পাঁচডলার বার করে ছেলেটার হাতে দিচ্ছে। গ্লাসের তলায় দেখলাম তখনও একটু রয়ে গেছে।
পাঁচডলার দেখে ছেলেটা চেল্লাতে শুরু করলো।
আমরাও একটু অবাক হয়েগেছি। ছ-ডলারে কথা হলো অনিদা পাঁচ ডলার ঠেকাচ্ছে।
অনিদার সঙ্গে তর্কাতর্কি লেগে গেল।
অনিদার সে কি ভুরু নাচান। চোখ মুখ কুঁচকে ভুরু নাচিয়ে হাসতে হাসতে বললো। জুসের মধ্যে নুন দিয়েছিলি। নুন দিসনি বলে একডলার বাদ।
অনিদার কথা শুনে আমরা তখন হাসব না কাঁদব। বুঝলাম এবার পাবলিকের মার পিঠে পরতে পারে।
ঘরের সকলে হাসছে, বরুণদাও হেসে গড়িয়ে পরেছে।
কি বলবো বরুণদা আপনাকে, তখন মার খাওয়ার ভয়ে পালাতে পারলে যেন বাঁচি।
ছেলেটাও বেশ চেঁচামিচি করছে। দু-একজন এসে দাঁড়িয়ে পরে কথা শুনছে।
অনিদা ওকে গ্লাসের শেষটুকু খাইয়ে প্রমাণ করলো ও নুন দেয় নি। একডলার তো দিলই না, আরও একগ্লাস জুস খেল।
ওই দিনের ঘটনার পর ছেলেটার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল। বাংলাদেশের ছেলে।
মনটা খুব ভালো।
এখন সেই ছেলেটাই আমার ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্সের ম্যানেজার। একেবারে ডিটো অনিদাকে নকল করে। যখন সেলসম্যান হিসাবে জয়েন করেছিল তখন হায়েস্ট সেল দিত। তারপর অনিদাই তৈরি করে দিল।
অর্ক ধুপ করে আমার পায়ে পড়ে গেল।
ওরে অর্ক ওর পায়ে আর ধুলো নেই। মিত্রা চেঁচাল।
না ম্যাডাম যেটুকু আছে চেঁছেপুঁছে নিয়ে মাদুলি করবো। যদি কিছু শিখতে পারি।
চা খাওয়াবি। চেঁচিয়ে উঠলাম।
এখনও আসে নি?
অরিত্র বেড়িয়ে গেল।
হাসাহাসির মধ্যেই ছিদাম চা নিয়ে ঢুকলো। পেছন পেছন মেয়ে। ঘরে ঢুকেই পেছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
হাঁ করো।
কেনরে।
করো না।
হাঁ করলাম।
আমার মুখে একটু চুড়মুড়ভাজা ঢুকিয়ে দিল।
পরীক্ষা কেমন হলো।
দারুণ। মা সুন্দরদা কোথায়?
লাইব্রেরীতে।
অনিশা ফোন করলো।
তুই আগে মায়ের ঘরে আয়, বাবা এসেছে।
কিরে ছিদাম এতো দেরি?
ছিদাম হাসছে।
চায়ের পট রেখে পায়ে হাত দিল।
সব ঠিক আছে।
ছিদাম মুখ নীচু করে হেসেই চলেছে।
তোমার বিস্কুট আনতে গিয়ে দেরি হলো।
ওর বিস্কুট মানে! মিত্রা চেঁচালো।
দাদা যে বিস্কুট খেতে ভালোবাসে।
সেই কুত্তা বিস্কুট।
ধ্যুস তুমি না। মিলি চেঁচিয়ে উঠলো।
আবার একচোট হাসি।
সুন্দর এলো, আরও কিছুক্ষণ চললো।
অনিসা ছিদামের কাছ থেকে একটা বিস্কুট নিয়ে খেতে শুরু করলো। সুন্দরকে একটা দিল।
মা দাঁত ভেঙে যাবে।
তোর বাবার প্রিয় বিস্কুট।
সুন্দর হাসছে।
মিত্রার কাছে গিয়ে মিত্রার চায়ের কাপে বিস্কুট ডোবাল।
তোর দাঁতে জোড় নেই।
টু মাচ হার্ড।
তুই একটু চা খা।
তোমার থেকে দাও।
মিত্রা সুন্দরের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আমি বিস্কুট চা খালাম।
ম্যাডাম দাদা খেয়েছে? নেপলা বললো।
না।
ঠিক আছে আধা ঘণ্টা পর ঘুরে আসছি।
তোমার দাদা কি খাবে শুনেছ।
আবার একটা গল্প বলতে হয়।
না এখন থাক পরে শুনবো।
মিত্রাদি। মিলি তাকাল।
তুই আর মিত্রাদি করিস না। মিত্রা তাকাল মিলির দিকে।
মিলি ইসারা করছে।
কি হয়েছে বলো না মিলিদি। নেপলা চেঁচাল।
ও আনন্দতে বলে দিয়েছে। মিত্রা বললো।
ঠিক আছে। তুমি একরকম বলেছো আমি চাংওয়াতে আর একরকম বলছি। ভাগাভাগি করে সবাই খেয়ে নেব। নেপলা বললো।
নেপলা আঙ্কেল আমার জন্য ভেজ। সুন্দর বললো।
কেন! মিত্রা বললো।
ও দাদার মতো, মাছটা তবু একটু আধটু খায়, মাংস ডিম না পসন্দ। নেপলা বললো।
মিত্রার মুখটা হাত দিয়ে ঘুরিয়ে সুন্দর জিজ্ঞাসা করলো, মা নেপলা আঙ্কেল কি বললো।
মিত্রা বললো, তুই মাংস খাস না। তাই বললো।
ইয়েস।
মা আমরা তাহলে একটু ঘুরে আসি। অনিসা বললো।
যাও।
শোন। আমি বললাম।
বলো।
দেখতো, পিকু, বিতান আছে কিনা, থাকলে একটু ডেকে দে।
চা খেয়ে ওরা সবাই বেরিয়ে গেল। ঘরে আমি, বরুণদা, মিত্রা।
কিছুক্ষণ ফর্মাল কথা হলো। তারপর আমি বরুণদার দিকে তাকালাম।
বরুণদা।
বলো।
তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।
কি।
মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে।
প্লাস্টিকের মধ্যে থেকে হার্ডডিক্সটা বার করলাম।
আচ্ছা তোমার কি কোনও ব্যাগট্যাগ নেই।
কেন?
একটা প্লাস্টিকের মধ্যে এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ। তুমি জান কি, যে কোনও সময়ে একাট আইসির ওপর একটু চোট লাগলে….।
কিচ্ছু হবে না। অনেক মানুষের চোখের জল, দীর্ঘ নিঃশ্বাস আছে। সেগুলো ঠিক করতে হবে না।
এটাতে আবার কি আছে?
আমাদের ওখানকার নার্সিংহোমের অরিজিন্যাল মেসিনের হার্ডডিক্সের কপি। হিমাংশুকে একবার ডেকে নাও। দু-জনে মিলে দেখ পরিস্থিতি কি। আমাকে ইমিডিয়েট জানাও।
আজকে!
যদি পারো ভালো হয়। অনাদি অনেক নোংরাম করেছে, কতটা? আমাকে জানতে হবে।
এটা কি ব্যাকআপ হার্ডডিক্স।
বলতে পারবো না। কপি করতে বলেছিলাম। ওরা হার্ডডিক্স সমেত কপি করে দিয়েছে।
বরুণদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
তুমি যে সেদিনকে কি সব করলে।
ওটা একটা পথ এটা আর একটা।
দাঁড়াও হিংমাংশুকে একটা ফোন করি।
বরুণদা, হিমাংশুকে ফোন করলো। হিমাংশু কথা দিল আসছে।
বরুণদা উঠে দাঁড়াল। যাই গিয়ে লেগে পড়ি।
কেউ যেনো….।
জানি, তোমাকে আলাদা করে মনে করাতে হবে না।
খেয়ে যাও। মিলি আনতে পাঠিয়েছে। মিত্রা বললো।
এলে আমাকে একটা খবর দিও।
বরুণদা চলে গেল। আমি উঠে দাঁড়ালাম।
তুই আবার কোথায় যাবি?
একটু বাথরুমে যাব।
বাথরুমে গিয়ে মুখে হাতে ভালো করে জল দিলাম। সাবান দিয়ে কপালের সিঁদুর মুছলাম। বাথরুম থেকেই শুনলাম ছোটোমার সঙ্গে মিত্রা কথা বলছে।
ছোটোমার হাসিতে ফোনটা ফেটে যাবার উপক্রম।
পঞ্চাশ টাকা নিয়ে বাবু কি কিনেছে জান।
কি?
ফুটপাথ থেকে একটা রুমাল কিনেছে, একটা টুপি কিনেছে, আর ফোমের মানিপার্টস পাওয়া যায় দেখেছো।
হ্যাঁ।
সেই একটা কিনেছে। তাও জানতে পারতাম না। যদি নেপলা না বলতো।
ছোটোমা হাসছে।
আর কি করেছে জান।
কি?
কালীঘাটে গেছিল। পুরুত ঠাকুরকে বলেছে আমার কাছে খুচরো নেই দশটাকা দিয়ে পাঁচটাকা ফেরত নিয়েছে।
তুই একবার ভাব।
আমি কি ভাববো বলো।
ভেবেই বা করবি কি।
ওর এই জায়গাটাকেই আমি ভালোবেসেছি ছোটোমা। কলেজ লাইফেও দেখেছি। এখন এই বিশাল ঐশ্বর্যের মধ্যেও ওকে দেখছি। ওর জীবনযাত্রার চাহিদা এতো তুচ্ছ যে আমার পক্ষে তাল মেলান সম্ভব হয়ে ওঠে না।
মেয়েরা এইখানেই মরেছে বুঝলি। তোর মল্লিকদাকে দেখছিস না।
তখন আমাকে খেতে চাইল, তুমি তো শুনলে।
হ্যাঁ।
অন্যরা হলে কি বলতো, চল হোটেলে যাই। লাঞ্চ করি।
ওর কাছে এই কথাটা শোনা মানে হাতে চাঁদ পাওয়া।
আমাকে কি বললো জানো।
কি?
খুবতো খাওয়াবি খাওয়াবি করছিস, চল পার্কস্ট্রীটের ফুটপাথে ছেঁড়া পরটা, ঘুগনি আর গরম জিলিপি খেয়ে আসি।
ছোটোমা হাসছে। তোর কপাল, কি করবি বল।
এই রকম কপাল নিয় আমি বার বার পৃথিবীর আলো দেখতে চাই ছোটোমা।
এখন কোথায়?
বাথরুম থেকে সবে বেরলেন। আমার সামনে দাঁড়িয়ে তোমার কথা শুনছে।
রিপোর্ট করা হয়ে গেল।
হ্যাঁ গুছিয়ে করলাম।
গুড।
শুনতে পাচ্ছ।
পাচ্ছি। তোর ঘরে আর কেউ আছে।
না।
আচ্ছা করে ঘার মটকা।
কি আর মটকাব। লোকে শুনলে কি ভাববে বলো।
আমি দরজার দিকে হাঁটা লাগালাম।
বাবুর রাগ হয়েছে। ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তোমার সঙ্গে পরে কথা বলছি।
মিত্রা চেয়ার থেকে উঠে এসে আমার হাতটা খপ করে ধরলো।
ওমনি রাগ হয়ে গেল।
আমি কি তোদের হাতের খেলার পুতুল।
আমি কি সেই কথা বললাম।
তাহলে।
তোর কথা ছোটোমাকে বলবো না তো কাকে বলবো।
কেন বলবি, আমি কি তোকে বলতে বলেছি।
ঠিক আছে বাবা, আর কোনওদিন বলবো না। হয়েছে তো। এবার বসবি চল।
একটা কাজ সেরে আসি।
আগে খেয়েনে তারপর যা।
মিত্রা আমার হাতটা ধরে চেয়ারে বসাল।
আমি চুপ করে বসে রইলাম। কোনও কথা বললাম না।
মিত্রা মনে হয় মিলিকে ফোন করলো। শুধু এটুকু বুঝতে পারলাম। তারাতারি না এলে এবার তোদের অনিদা কেটে পরবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা অবশ্য সবাই চলে এলো। খাওয়া-দাওয়া করে আমি আর অপেক্ষা করলাম না। হিমাংশুও এসেছিল ওদের বললাম তোরা কাজ কর আমি একটু কয়েকটা কাজ সেরে নিই।
বেরিয়ে এলাম।
প্রেস রুমের পেছন দিয়ে সোজা ছাদে চলে এলাম। এই পাশটা দিয়ে বড়ো একটা কেউ যাতায়াত করে না। দেখলাম বটাদার জায়গাটা ছিদাম বেশ ভালোই গুছিয়েছে। আমাকে দেখে এগিয়ে এলো।
চা খাবে দাদা।
দে।
দেখলাম অফিসের স্টাফেরা যারা চা খাচ্ছিল তারা আমার দিকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছে। বেশ ভালো লাগছিল। আমাকে কেউ চেন না। আমিও কাউকে চিনি না। ভাবছে হয়তো আমি এই কাগজের অফিসের অন্য ডিপার্টমন্টের স্টাফ।
ছোটোছোটো খিস্তি খাস্তাও চলছে নিজেদের মধ্যে। বন্ধু-বান্ধবরা একসঙ্গে হলে যা হয়।
ছিদাম দেখলাম গ্যাসে চা বসিয়েছে। দুটো বাচ্চা এলো।
ম্যাডামের ঘরে চা নিয়ে যেতে বলেছে।
ক কাপ।
অনেক লোক আছে। একটু বেশি করে বানিয়ে দাও।
ছিদাম আমার মুখের দিক তাকিয়ে হাসছে।
গরম জলের কেটলিটা নিয়ে আয়।
ছেলেটা চলে গেল।
হ্যাঁরে ছিদাম এখন কি আর কয়লায় কাজ হয় না।
না। ম্যাডাম বারন করে দিয়েছে।
তোর কাছে সিগারেট আছে।
আছে। এখানে খাওয়া যাবে না।
কেন।
ম্যাডামের হুকুম।
তাহলে।
তুমি গিয়ে ভেতরের ঘরের চৌকিতে বসো।
আমি চেয়ার টেবিল ছেড়ে ভেতরে চৌকিতে গিয়ে বসলাম।
বুঝলাম এটা একবারে পেছন পাশ। এখানে কেউ একটা বড়ো আসে না। এটা মনে হয় ছিদামের পার্সোনাল রুম। ছোটো পাঁচিলের ওপাশটা ক্যান্টিন।
ছিদাম চা নিয়ে এলো। পাখাটা চালালো। আমি একটু কাত হয়ে শুয়ে পরলাম।
একটা বছর কুড়ির ছেলে এলো।
ছিদামদা নিচে অনেক চায়ের অর্ডার আছে।
তুই একটু সামলে দে। আমার দাদা এসেছে দেশ থেকে একটু কথা বলি।
আমি চায়ে চুমুক দিয়েছি।
ছিদাম একটা সিগারেট এনে আমার হাতে দিল। তারপর আবার বাইরের দিকে গেল।
ছিদামদা।
কিরে।
নতুন মালিক অফিসে এসেছে। এ্যাড ডিপার্টমেন্টে খেয়ো-খেয়ি শুরু হয়ে গেছে।
কি হয়েছে রে?
যে যার ঘর গোছাতে ব্যস্ত। কে কতো কামাবে তার হিসাব কষছে। নতুন মালিককে এবার ঝেড়ে ফাঁক করে দেবে।
নতুন মালিকটা আবার কেরে।
ওই যে কমপিউটার ঘরের বড়কর্তা, তার ছেলে নতুন মালিক হয়েছে। ম্যাডামের মেয়ে, ছেলে সবাই নতুন মালিক।
তোকে কে বললো?
নিচে সব বলাবলি করছে।
তাতে কি হয়েছে, ম্যাডাম তো আছে।
থেকে কি করছে, টিনা ম্যাডাম কিছু করতে পারছে। সব শালা মদের বোতলে পয়সা উড়িয়ে দিচ্ছে। নিজে খেলেও পার্টির নামে বিল করে।
তুইও তো ভাগ পাস।
দিলে নেব না কেন।
এবার একটু কমসম নে।
কেন বলো?
যা বললাম তাই কর, তোরই ভালো হবে।
ডালমে কুছ কালা লাগতা হ্যায়।
ছিদাম হাসছে।
আমি খাটে শুয়ে শুয়ে সিগারেটে সুখ টান দিয়ে চলেছি। ছিদাম এলো।
তুমি কিছু মনে কোরো না। ওটা এরকম একটু বেশি বকে। খুব সাধাসিধে।
বটাদার পরিবারের কেউ আমাদের অফিসে কাজ করে।
ছেলেটাকে ম্যাডাম প্রেসে নিয়েছে। মেয়েটা লাইব্রেরীতে কাজ করে।
নতুন কিছু খবর আছে।
কম বেশি সব জায়গাতেই তোমাকে হাত দিতে হবে। তবে এ্যাড আর প্রেসে প্রথম হাত দাও। সুতনুবাবু রিটায়ারের পর বিতানবাবু ঠিক ম্যানেজ করতে পারছে না।
সুতনবাবু একবারে আসে না?
কেন আসবে না। তুমি যে কো-অপারেটিভ করে দিয়েছিলে, তার দায়িত্ব সামলায়।
তোর ম্যাডাম কিছু বলে নি?
বলেছিল, সুতনুবাবু বলেছে শরীর আর দিচ্ছে না।
নতুন ম্যানেজার কিরকম?
একটু ছুঁকে ছুঁকে বাই আছে। সত্যি কথা বলতে কি তোমার মতো চোখ সকলের নয়।
তোর ছেলে।
এবছর কলেজে ভর্তি হয়েছে। সাংবাদিকতায় অনার্স নিয়ে পড়ছে।
খুব ভালো খবর দিলি। কোথায় পড়ছে?
ওই তো গড়িয়াহাটের ওখানে কি একটা কলেজ আছে, সেখানে।
তুই চিরকাল সেই মুখ্যু রয়ে গেলি।
তুমি আছো, খেয়ে পরে চলে যাবে। ম্যাডামকে ধরে করে বাড়িটা কোনওপ্রকারে পাকা করে নিয়েছি। ব্যাশ। ছেলেমেয়ে বলতে পারবে না, আমাদের মাথার ওপর ছাদ কোথায়।
যেখানে ছিলি সেইখানেই।
আবার কোথায় যাব!
মেয়েটা।
এবার উচ্চমাধ্যমিক দেবে।
তাহলে তুই গুছিয় নিয়েছিস।
সব তোমার আর্শীবাদ।
আমার পুরণো নম্বরটা চালু করেছি।
ঠিক আছে।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে চলে এলাম। ফোনটা অন করে প্রথমে অনিমেষদাকে একটা ফোন করে বলে দিলম, আমি ঠিক সময়েই যাচ্ছি। আরও কয়েকটা ফোন করলাম।
মিত্রার ঘরের দরজাটা খুলতেই দেখলাম শুভ, অনন্য, সুন্দর, অনিশা বসে আছে।
আমি ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়াল।
অনন্য তোমার কাল কোনও ভাইট্যাল ক্লাস আছে?
একটা পর্যন্ত আছে, তারপর না গেলেও চলবে।
অনিশা তোমার?
আমার কাল ছুটি।
কালকে তোমরা দুটো থেকে অফিসে থাকবে।
এই মুহূর্তে আমার গলার স্বরটা ওদের কাছে যেন ঠিক পরিচিত ঠেকছে না। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে। আমি চেয়ারে বসে ফোনটা কাছে টেনে নিলাম।
এখন আমাদের এ্যাডমিনস্ট্রেটিভ অফিসার কে?
এই মুহূর্তে কাউ নেই। বরুণদা দেখাশুন করে।
এ্যাড?
মিলি যেমন দেখছিল তেমনি দেখছে।
প্রেস?
টিনা দেখছে, তবে বিতানের ওপর দায়িত্ব দেওয়া আছে।
অদিতি?
ট্রন্সপোর্ট। তবে ওরা তিনজন ওভার অল সব কিছুই দেখে।
প্রেসের ম্যানেজার?
বছর দুয়েক হলো একজন নতুন ম্যানেজার এ্যাপয়েন্ট করা হয়েছে।
কিরকম কাজ করছে?
এখনও সেরকম কিছু কানে আসে নি।
বরুণদার নম্বর কতো?
মিত্রা বললো, আমি বোতাম টিপলাম।
রিং বাজলো।
বরুণদা।
হ্যাঁ। তোমার মালপত্র উদ্ধার হয়েছে। তুমি করেছো কি!
কেন খুব অন্যায় কাজ করে ফেলেছি।
হিমাংশু হাতে চাঁদ পেয়ে গেছে।
ওর ল্যাপটপে সব ডেটা ভড়ে নিতে বলো।
তোমার বলার আগেই ভড়ে নিয়েছে।
শোনো না।
বলো।
কাল একটা মিটিং কল করো প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টের মাথা গুলোকে নিয়ে। আমি বসবো।
এরই মধ্যে ঘাঁটাঘাঁটি করে নিয়েছো মনে হচ্ছে?
না না সেরকম কিছু নয়।
তুমি কোথায়?
মিত্রার ঘরে।
বসো যাচ্ছি।
কি বলি শোনো আগে।
বলছিনা একটু বসো, যাচ্ছি।
ইন্টারকমে ওরা সবই শুনতে পেল।
একবার মিলি, অদিতি আর টিনাকে ডাক।
ফোনটা বেজে উঠলো।
দেখলাম নেপলা।
তুমি কোথায়?
তোর ম্যাডামের ঘরে।
সারা বিল্ডিং তোমাকে খোঁজা হয়ে গেল।
আয় এখানে আছি, এবার বেরবো।
আবার ফুরুত হয়ে যেওনা যেন।
আচ্ছা।
মিত্রা এরই মধ্যে ওদের ফোন করে দিয়েছে। অনন্যরা চুপ চাপ আমাকে দেখে চলেছে।
নিউজরুমের নম্বর কতো?
মিত্রার দিকে তাকালাম।
মিত্রা ডায়াল করে রিসিভারটা টেবিলের ওপর রাখল। স্পিকারে শোনা যাচ্ছে।
হ্যালো।
সন্দীপ।
তুই কোথায় বলতো, সবাই একপাক চারদিক খুঁজে নিল, তোকে পাওয়া গেল না।
আমি মিত্রার ঘরে। একবার আয়।
এখুনি?
ঠিক আছে এক কাজ কর, আজ না কাল ফার্স্ট আওয়ারে তোদের সঙ্গে একটু বসবো। আসতে পারবি।
কখন বল।
সকালবেলা। ধর এই আটটা। আমার বাড়িতে। তুই দ্বীপায়ন, অর্ক, অরিত্র, সায়ন্তন।
কিছু ঘোটালা মনে হচ্ছে?
চুপ করে রইলাম।
তোর গলার টিউনটা ঠিক পরিচিত ঠেকছে না।
না-রে আমি ঠিক আছি।
তুই বোস, এখুনি যাচ্ছি।
মিলিরা ঘরে ঢুকলো।
কিগো মিত্রাদি অনিদার তলব মানেই বুকের ভেতরটা ধুকপুক করতে শুরু করেছে।
হাসলাম। না না সেরকম কিছু নয়। কাল বরুণদাকে একটা মিটিং কল করতে বলেছি। তোমাদের কাগজপত্র একটু গুছিয়ে নিতে অনুরোধ করার জন্য ডেকেছি।
ওই খানেতেই তো গলা খুস খুস শুরু হয়ে গেল। মিলি বললো।
তোমরা বাবাকে এতো ভয় পাও? অনিসা বললো।
থাম, কথা বলিস না। তোর বাবাকে তো দেখিস নি। ঠিক মতো ব্যাট ধরলে যে কনো বড়ো বোলার মাঠের বাইরে আছাড় খাবে।
আমার দিকে তাকিয়ে, বলোনা অনিদা।
আমি মিলির দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
সত্যি। আমি কি কি দেখতে চাইব তোমরা সব জান, একটু গুছিয়ে নাও। যতটা পার আপডেট করে নাও।
তোমার ঘ্রাণ শক্তি এতো তীব্র….।
আমি মিলির দিকে তাকিয়ে হাসছি।
টিনা, অদিতির দিকে তাকালাম।
আমরা রেডি। তুমি এখুনি বললে বসতে পারি।
ছিদাম একবার উঁকি মারল।
মিত্রা ইশারায় চায়ের কথা বললো।
বিতান আর পিকুকে সকাল থেকে দেখলাম না।
এসেছিল। তুই তখন ছিলি না। মিত্রা বললো।
টিনা।
বলো।
তুমি তো প্রেসটা দেখছো।
হ্যাঁ।
আমাদের মেশিনম্যান কয়জন।
একজন হেড মেশিনম্যান, দু-জন এ্যাসিসটেন্ট। বাকি প্রায় তিরিশজন কাজ করছে প্রেসে। সব মিলিয়ে ধরো চল্লিশ জন।
এর ওপর ম্যানেজার।
হ্যাঁ।
বিতান কি দেখে।
প্রেসের ব্যাপারে সমস্ত ডাটা আমাকে এনে দেয়। আমি হিসেব করি। তুমি যেভাবে শিখিয়ে দিয়ছিলে সেই পথে এখনও হাঁটছি।
আঠারো বছরে বহু পরিবর্তন হয়েছে।
সেগুলো মেইন্টেইন করি।
নতুন মেশিন কিছু কেনা হয়েছে না?
দুটো হাইস্পিড মেশিন এসেছে।
ওই মেশিন দুটোর ম্যানুয়ালটা আমাকে একটু দেবে?
নিয়ে আসি।
যাও।
টিনা উঠে চলে গেল।
টিনাকে তো বাঁচিয়ে দিলে, এবার আমাদেরটা বলো। মিলি বললো।
অনিসা হেসে ফেললো।
তোকে বলেছি না একবারে হাসবি না। বুড়ো বয়সে ঝাড় খেতে কার ভালো লাগে?
মিলি, অনিশার দিকে তাকাল।
তোমার এ্যাড-ডিপার্টমেন্টে এখন কতো স্টাফ আছে?
চল্লিশজন মতো।
পুরনো কতো জন?
তুমি যাদের দেখে গেছ তাদের মধ্যে মাত্র তিনজন আছে।
চম্পকদা আসেন?
সপ্তাহে একদিন মিটিংয়ে এ্যাটেন্ড করেন। বলতে পারো আমাদের পরামর্শদাতা।
কালকে একবার চম্পকদাকে আনার ব্যবস্থা করো?
আচ্ছা। আর বলো।
এই চল্লিশজনের টিমের সকলকে একটা মান্থলি টার্গেট দাও?
অবশ্যই।
কে কতোটা এ্যাচিভ করছে?
সিক্সটি থেকে সেভেন্টি পার্সেন্ট।
বাকিটা হচ্ছে না কেন?
মিলি চুপ করে রইলো।
তুমি একটা স্টেটমেন্ট বানিয়ে দাও। আমি একটু দেখব।
লাস্ট কয় কোয়ার্টার আগে থেকে দেব বলো?
গতো বছরের পুরোটা এ বছরের আপডেট।
মিলি সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারকমে কার সঙ্গে কথা বলে প্রিন্ট আউটের কথা বলে দিল।
এবার আমারটা বলো। অদিতি বললো।
তুই ভালো আছিস, যতো ঝামেলা আমার আর টিনার। এখন থেকে বলে রাখছি অনিদা, সবার সামনে ঝাড়বে না। রাতে বাড়িতে গেলে যত খুশি ঝাড়বে।
মিত্রা হাসছে, অনিশা হেসে কুটি কুটি খাচ্ছে।
তোকে বলেছি না একবারে হাসবি না। মিলি আবার অনিশার দিকে তাকাল।
বাবা বলেছে কালকে আমরা মিটিংয়ে থাকব।
বাড়ির মিটিংয়ে থাকিস, অফিসের মিটিংয়ে থাকবি না।
সন্দীপরা সব একসঙ্গে ঢুকলো।
অর্ক ঢুকেই আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো।
ম্যাডাম দাদা এতক্ষণ কোথায় ছিল বলুন তো?
মিত্রা, অর্কর দিকে তাকাল।
সবাই অর্কর দিকে তাকিয়ে।
ছিদামের খাটে শুয়ে ছিল। আপনাকে তখনই বলেছি। গোবর্ধন সেজে একঘণ্টা, আর ছিদামের খাটে একঘণ্টা, সব হিসাব নেওয়া হয়ে গেছে।
মিলির দিকে তাকাল।
মিলিদি, কনিষ্কদাকে রাতে প্রেসারটা দেখিয়ে নিও।
তোরা বেশ ভালো আছিস।
কেউ ভালো নই। কাল সকালে বাড়িতে বডি ফেলতে হবে।
তোদের আগে আমি বডি ফেলবো।
অর্ক পাশের চেয়ারে বসে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললো। আমি ঝাড় খাওয়ার জন্য রেডি, তবে তেঁয়েটে হচ্ছে সন্দীপদা, বহুবার সাবধান করেছি শোনেনি।
ওমনি আমার ঘাড়ে দোষ চাপালি। সন্দীপ চেঁচিয়ে উঠলো।
আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। তোমরা সবাই ঘরে ঢুকে কেমন যেন সেই জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো অবস্থা, ব্যাপারটা কি বলো তো! মিত্রা অর্কর দিকে তাকাল।
ম্যাডাম এতদিন থুতু দিয়ে ছাতু গোলা হচ্ছিল এবার জলদিয়ে গোলা হবে। এবার বুঝে নিন। অর্ক বললো।
অরিত্র। আমি বললাম।
যুদ্ধ করার জন্য তোমার যা যা অস্ত্রের দরকার সব রেডি, যখন বলবে হাজির করে দেব।
আমারও। অর্ক বললো।
বরুণদা, হিমাংশু ঢুকলো। পেছন পেছন ছিদাম।
বাবাঃ! সব রথী মহারথী হাজির একবারে।
ছিদামদা, অনিদার বিস্কুট এখানে একটা দেবে। অর্ক চেঁচালো।
হিমাংশু, বরুণদা চেয়ারে বসলো। আমি হিমাংশুর দিকে তাকালাম।
এতদিন ধোঁয়াসার মধ্যে ছিলাম। এখন মেঘ অনেকটা কেটে গেছে।
তাড়াতাড়ি লাস্ট এইট ইয়ার্সের মালটা বার করে দে।
কাল পাবি না। পর্শু পাবি।
ছিদাম সকলকে চা দিল।
অর্ক। আমি বললাম।
বলো।
সুমন্তকে দেখতে পাচ্ছি না?
আমার থেকে তুমি ভালো জান ও কোথায় আছে। দেব না একটা এমন।
অর্ক ঘুসি তুললো।
আচ্ছা ম্যাডাম আজ থেকে ঠিক একুশদিন আগে বিকলের দিকে আপনাকে এসে একটা প্রণাম করেছিলাম মনে আছে। অর্ক বললো।
হ্যাঁ।
আপনি বললেন, হঠাৎ ঘটা করে এতো প্রণাম কিসের অর্ক।
মিত্রা ঘার দোলাচ্ছে।
নেপলা, সাগির ঘরে ঢুকলো।
সেদিনটা আমার জীবনের একটা স্মরণীয় দিন।
নিশ্চই সেই কেশ অর্কদা। নেপলা বললো।
অর্ক মাথা দোলাচ্ছে।
সাগির শুনে নে। দুজনে চেয়ার টেনে নিয়ে বসলো।
চলবে —————————
from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/uscezah
via BanglaChoti
Comments
Post a Comment