কাজলদিঘী (১০৯ নং কিস্তি)

❝কাজলদীঘি❞

BY- জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১০৯ নং কিস্তি
—————————

তুই তাড়াহুড়ো করিস না। কথাটা বললি আমাকে একটু সময় দে।

দেখো দু-পক্ষেরই দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। বাঁচার তাগিদে যে কোনও সময় হিট করতে পারে। আমি সে সময়টুকু দিতে চাই না।

তুই কি শয়নে স্বপনে এসব নিয়েই চিন্তাভাবনা করবি। আর কি কোনও কাজ নেই।

দিদাই খিদে পেয়ে গেছে।

মেয়ে ঘরে ঢুকলো। আমার সঙ্গে চোখাচুখি হলো।

বাবা তুমি কখন এলে?

ঘণ্টা খানেক। পড়ছিলি?

একটু।

সোফার পেছনে এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো।

তুই এই সপ্তাহটা বাদ দিয়ে আগামী সপ্তাহে কাজগুলো কর।

বিধানদা আপনি কি বলেন?

সব শুনে তো মনে হচ্ছে তুই একটা সুনির্দিষ্ট প্ল্যান করে ফেলেছিস।

অস্বীকার করবো না।

তুই কি শুধু সুতপারটা করতে চাইছিস না সবার?

সবারটাই।

বিধানদা হাসছে।

অংশু, সুরোর মতো আর সবাইকে নিশ্চই ঠিক করে রেখেছিস।

হ্যাঁ।

ডাক্তার সত্যি তুমি ওকে স্টাডি কর। একমাত্র দেখছি তোমার কথাগুলো ওর ক্ষেত্রে খেটে যায়। দাদা বললো।

ডাক্তারদাদা মুচকি মুচকি হাসছে।

বুঁচকি।

ছোটোমা রান্নাঘর থেকে ডাকলো।

অনিসা আমার গলা ছেড়ে দিয়ে চলে গেল।

তোমরা কোথায় গেছিলে?

বড়োমার দিকে তাকালাম।

কথা শেষ—

কথা কি কখনও শেষ হয়। এ আবহমানকাল ধরে চলবে।

আবার কি গণ্ডগোল করলি।

আমি করিনি, করার লোকের অভাবও নেই। আমি শুধু গণ্ডগোলটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি। তারই এক ঝলক শুনলে।

লেখাটা দেখেছিস? দাদা বললো।

বড়োমা দাদার দিকে কটকট করে তাকাল।

অনিসা চা নিয়ে এলো। মাঝখানের ছোট্ট টেবিলটায় নামিয়ে রাখলো।

আমি বড়োমাকে জড়িয়ে ধরলাম।

তোমার সম্পত্তিটা আমার নামে লিখে দিও। মিত্রা কিছু দেবে না বুঝলে।

কবে নিবি বল?

এই সপ্তাহের মধ্যে লিখিয়ে নেব।

ডাক্তারদাদা হাসছে।

মিত্রা তোর নামে মিথ্যে বদনাম দিল।

ও সারা জীবন দেবে।

অফিস থেকে ফিরে এসে কি বললাম তোমাকে। আজ সকালে উঠে কি বলেছি। আমি যে সারারাত ওর ঘরে ছিলাম সেই হুঁসটা ওর ছিল।

কনিষ্ক সকালে ফোন করে কি বললো, মিলি সকাল থেকে চারবার বাথরুমে চলে গেল। বটা ফোন করে বললো ম্যাডাম আমাদের ডেট কিছু তোমাকে জানিয়েছে। বিতান, পিকুকে তোমরা কাছ থেকে দেখেছো। আর ও দিব্যি ঠেলাঠুলি দেওয়ার পর ঘুম থেকে উঠে বললো, আগে ডাকতে পারিসনি।

অনিমেষদা, বিধানদা হাসছে।

ও পৌঁছবার আগে একপ্রস্থ আমার ঘরে মিটিং হয়ে গেছে।

কেন? আমি বললাম।

তুই ঝাড় শুরু করলে আমি কিভাবে ওদের বাঁচাব।

এবার সবাই জোড়ে হেসে উঠলো।

সত্যি দেখো, ও মিটিং কল করলো। যতো জ্বালা আমার।

চায়ে চুমুক দিল।

জ্যেঠিমনি পর্যন্ত বেরোবার সময় বললো, পিকু ছোটো, ভুল করলে ওকে শাসন করবি।

কি খারাপ লাগে।

আমার দিকে তাকিয়ে।

তোর কোনও হুঁস আছে।

সেদিন খেতে বসে আমাকে মুখের ওপর কি বললো শুনেছিলি। আমার কিন্তু একটুও খারাপ লাগেনি। তোর বৌদি সুরো মন খারাপ করেছিল। ওমা তারপর দিন সকালে গিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কি কান্না। আমি অবাক। তারপর গল্পটা বললো। আমি স্টান্ট হয়েগেলাম। বিধানবাবুকে বলার পর বিধানবাবু পর্যন্ত কিছুক্ষণ স্থবিরের মতো বসে রইলো।

অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

ডাক্তারদাদা বললো। রামকিঙ্কর।

হ্যাঁ। ডাক্তারদাদা, অনিমেষদার দিকে তাকাল।

ও পড়াশুনো করে। এ্যাপ্লাইটাও করে খুব সুন্দর।

কোথায় গেছিলে বললে না। বড়োমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম।

একটা কাজে গেছিলাম।

কেমন দেখলে মেয়েটাকে?

ছেলে-মেয়ের বাবা হয়েছিস, তা না হলে এখুনি কানটা ধরতাম।

এখন ধরতে ইচ্ছে করে না?

না।

বলো না কেমন দেখলে।

দাদারা সবাই হাসছে।

বড়োমা ভ্রু কুঁচকে হাসছে।

দেখলি ছোটো, তোকে তখনই বলেছিলাম, তুই চল। তুই কি বললি অনি বুঝতে পেরে যাবে। আমি অনির সঙ্গে যাব। হলো এবার।

ছোটোমা হাসছে।

ও জানলো কি করে বলো?

ওর কি লোকের অভাব। কার পেট থেকে কথা বার করেছে কি করে জানবো।

এটুকু তোমায় বলতে পারি এখানে কেউ বলেনি।

তাহলে নেপলা বলেছে।

আবিদ যে বললো নেপলাকে কিছুই বলেনি।

নেপলাকে ডাকো তাহলেই ধরতে পারবে।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। জামাকাপর ছাড়ি এবার খাওয়ার ব্যবস্থা করো।

ওরে বাবা কি ঘুমরে। উঃ যেন কুম্ভকর্ণ ঘুমচ্ছে। বিশ্বব্রহ্মান্ড রসা তলে যাক, ও ঘুমিয়ে যাচ্ছে। সারারাত জাগবে, আর এখন পরে পরে ঘুমবে।

দু-তিনবার ধাক্কা খেলাম।

কিছু কথা কানে ঢুকছে কিছু ঢুকছে না। পিট পিট করে চেয়ে দেখি ঘরে বড়োমা, ছোটোমা, দামিনীমাসি দাঁড়িয়ে।

শোন ওকে ঠেলা মেরে ওঠাতে পারছি না। তুই একটু পরে ফোন কর।

বুঝলাম মিত্রা ফোন করেছে।

ছোটোমা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

পাশ ফিরলাম, চোখ মেলে তাকালাম।

দামিনীমাসি, বড়োমা হাসছে।

ছোটো, চোখ খুলেছে। বড়োমা বললো।

আমি এখুনি জল আনতে যাচ্ছিলাম ওর গায়ে ঢালতাম।

আড়মোড়া ভাঙলাম।

ঝামেলা কোরো না।

কটা বাজে খেয়াল আছে। ছোটোমা তারস্বরে চেঁচাচ্ছে।

কি হবে ঘড়ির কাঁটা দেখে?

মেয়েটাকে তো সবাই মিলে তিতি বিরক্ত করে মারছে।

ফোন বন্ধ করে রাখতে বলো।

তুই ওঠ আগে, হ্যাপা সামলা।

কি হয়েছে বলবে?

অনাদি সকাল থেকে তিনবার ফোন করেছে। থানা থেকে দু-বার লোক এসে ঘুরে গেছে।

আমি কি করবো?

কি করবো মানে!

তুই লিখবি ওদের ধমকাবে।

এবার ঘুমটা সম্পূর্ণ ভেঙে গেল। উঠে বসলাম।

কে কাকে ধমকেছে?

কাউকে ধমকায়নি। তুই ওঠ।

এই যে বললে ধমকেছে।

ভুল বলেছি। ছোটোমার চোখেমুখে কপট দুষ্টুমি।

নেপলা কোথায়?

বাগানে চেয়ার নিয়ে বসে আছে।

আর কে আছে?

আবিদ আর সাগির আছে।

একবার ডাকো।

ছোটোমা আমার মুখের দিকে তাকালো। কি বুঝলে কে জানে নেপলাকে চেঁচিয়ে ডাকলো।

নেপলা পরি কি মরি করে ছুটে এলো।

কি হয়েছে!

অনি ডাকছে।

ঘরে ঢুকলো।

তিনজনেই আমাকে দেখে হেসে গড়িয়ে পরে।

হাসছিস কেন?

তোমার কাঁচা ঘুম কে ভাঙালো।

কি হয়েছে রে!

কিছু হয়নি। সবাই তেলে বেগুনে জ্বলছে।

তোর ম্যাডাম ফোন করেছিল ছোটোমাকে।

ম্যাডামকে তো বললাম তুমি ফোন রিসিভ করবে না। কিছু বললে বলবে ওটা যার ব্যাপার তাকে ফোন করুণ।

আমার ফোনটা কোথায়?

আমার কাছে।

অন করেছিস।

খেপেছো।

অন কর। কেউ ফোন করলে বলবি। আপানার এ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। যদি থাকে তবেই দেখা করা যাবে, না হলে নয়। এ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইলে পনেরো দিন পর ডেট দিবি। কেশটা বুঝলি।

নেপলা হেসে গড়িয়ে পরে।

ছোটোমা, বড়োমা, দামিনীমাসি আমার দিকে তাকিয়ে।

থানা থেকে বড়বাবু এসেছিল।

কি করতে?

অনাদিদা দেখা করতে চায়।

এ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে দিবি।

তুমি সত্যি লোকগুলোকে পাগলা কুত্তা বানিয়ে দেবে।

ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বেরতে আরম্ভ করেছে। যখন গল গল করে বেরবে তখন দেখা পাবে।

ছোটোমাদের দিকে তাকালাম।

এবার চা দাও। সব সল্‌ভ করে দিলাম।

দেব না এমন, দাঁত বার করে হাসি বার করে দেব।

নেপলারা চলে গেল।

চেয়ারে জামাকাপর রাখা আছে। বাথরুম থেকে এসে পরে নিবি। ছোটোমা ধমকের সুরে বললো।

আমি বিছানা থেকে নেমে এসে টেবিলের ওপর থেকে ব্রাস আর মাজনটা নিলাম। বাথরুমে ঢুকলাম। বেরিয়ে এসে দেখলাম ঘর রেডি। চাদর-টাদর সব বদলান হয়ে গেছে।

আজকেও দেখলাম একটা নতুন প্যান্ট জামা। গায়ে চড়িয়ে নিলাম। এতো রংচংয়ে জামাকাপর এরা যে কেন কেনে কে জানে।

ঘরের দরজা ভেজিয়ে বাইরে এলাম।

আবিদ, সাগির, নেপলা বাগানে তিনটে চেয়ার নিয়ে বসে জমপেশ গল্প করছে। আমাকে দেখে নেপলা উঠে এলো। আবিদ, সাগির হাসছে।

পাগলের মতো হাসছিস কেন?

ফোন খুলতেই দশখানা ফোন।

দেখলাম ও ঘর থেকে দামিনীমাসি একবার মুখ বার করলো।

অনিমেষদা ফোন করেছিল। তোমায় বললো একবার ফোন করতে। নেপলা বললো।

ফোনটা হাতে নিয়ে রিং করলাম।

ঘুম ভাঙলো।

এই উঠলাম।

কবে থেকে আবার পিএ এ্যাপয়েন্টমেন্ট করলি?

ঘণ্টা খানেক আগে।

অনিমেষদা হাসছে।

সকালে অনাদি প্রবীরকে ফোন করেছিল। একবার বসতে চায়।

বসবে, আমাকে জিজ্ঞাসা করছো কেন?

উদ্দেশ্য তুই তোকে জিজ্ঞাসা করবো না।

অনাদি নাকি মিত্রাকে ফোন করেছিল, ধমকেছে।

অনাদি না। ওর সচিব।

নিরঞ্জনদা কোথায়?

ওর ওখানে আছে।

নিরঞ্জনদাকে বলে দাও, এই ব্যাপারে যেন মাথা না গলায়।

আলাদা করে বলার দরকার নেই ও যা বোঝোর বুঝে গেছে।

বৌদিকে বলেছিলে?

বলেছিলাম।

কি বলেছে?

তুই জেনে নে।

আর কিছু বলবে?

আজ তোর কি প্রোগ্রাম।

জানিনা খেয়ে দেয়ে বেরবো। তারপর দেখি।

ফোনটা খোলা রাখিস।

আচ্ছা।

নেপলার দিকে তাকালাম।

ইসলামভাই কই রে?

ইকবালভাই, ইসলামভাই দুজনে কোথায় গেল।

খেয়েছিস?

হ্যাঁ।

স্নানটান করে রেডি হয়ে নে, বেরবো।

আমি ফোনটা পকেটে রেখে এ ঘরে এলাম।

ছোটোমা হাসছে।

একবারে হাসবে না। কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়েছো।

টেবিলের ওপর রাখা বোতল থেকে ঢক ঢক করে কিছুটা জল খেলাম।

তোর লেখাটা পড়লাম।

আমি কোনও উত্তর দিলাম না। সোফায় এসে বসলাম।

কি খাবার আছে?

কি খাবি বল।

একটু চা দাও। তারপর একেবারে ভাত খেয়ে বেরোব। হাই উঠলো।

আর হাই তুলিস না। অনেক ঘুমিয়েছিস। দুটো কচুরী খাবি।

মাসি নিয়ে এসেছে না বাড়িতে বানিয়েছ?

তোর জেনে কি হবে, খাবি কিনা বল।

দাও।

ছোটোমা দুটো কচুরী দিয়ে গেল। সবে মাত্র খাওয়া শেষ করেছি, নেপলা ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকলো।

অনিদা।

কি হয়েছে।

পুলিশ এসেছে।

ঠিক আছে যা বসতে বল, আমি যাচ্ছি।

মনে হচ্ছে স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চ।

ঠিক আছে তুই যা।

তোমায় খুঁজছে। ঠিক সুবিধার বুঝছি না।

কি বলছে কি?

তোমায় ডেকে দিতে বলছে, না হলে ভেতরে আসতে বাধ্য হবে।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। বড়োমা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সামনে এসে দাঁড়াল।

চা খাবি না?

দাও।

দামিনীমাসি হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘর থকে চায়ের কাপ নিয়ে এলো।

ওরা তোকে ধরতে এসেছে?

বড়োমার চোখমুখ শুকনো হয়ে গেছে।

হবে হয়তো।

তুই কিছু বলবি না?

সময় হয় নি এখনও।

তোকে ওরা নিয়ে গিয়ে কি করবে?

কি করে বলবো, না গেলে বুঝতে পারবো না।

ঘর থেকে বাইরে বেড়িয়ে এলাম। দেখলাম বেশ জোড়ে জোড়ে কথা চালাচালি চলছে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বারান্দায় এলাম।

কি হয়েছেরে নেপলা।

উনি ধমকাচ্ছেন।

কেন রাগ করছিস। উনি ওনার ডিউটি করতে এসেছেন।

ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম, একবারে বাচ্চা অফিসার। দেখে মনে হচ্ছে মুখার্জী যখন আমার সঙ্গে কাজ করেছিল তার যে অভিজ্ঞতা ছিল, এর তাও নেই।

কাকে চান?

বাইরে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। চারখানা গাড়ি। প্রায় দশ জন অফিসার। সব সাদা এ্যাম্বাসাডার। চিরাচরিত প্রথা।

অনিন্দ ব্যানার্জী। মানে আপনাকে।

কারন জানতে পারি?

গেলেই জানতে পারবেন।

যদি না যাই?

তাহলে হাতকড়া লাগিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হবো।

বাবা এতো ধরে আনতে বললে, বেঁধে নিয়ে যাবার ধান্দা করে।

নেপলার হাতে কাপটা দিলাম। বড়োমার দিকে তাকালাম। চোখ ছল ছল করছে।

ভেবো না, চলে আসবো।

ছোটোমা, দামিনীমাসি কেমন স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কারুর মুখে কোনও কথা বের হচ্ছেনা। আবিদ, সাগিরের চোখ স্থির।

আমাকে চারজন পাহাড়া দিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলো।

গাড়িতে উঠে বসলাম।

একবার গেট পেরিয়ে বাড়ির দিকে তাকালাম।

বড়োমা, ছোটোমা, দামিনীমাসি বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বড়োমা কাপরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছছে ওদের দেখে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।

গাড়ি চলতে শুরু করলো। আজ মনে হলো সত্যি আমাকে এ্যারেস্ট করা হলো।

এছাড়া অনাদির আর কোনও গতি ছিল না। ওকে বাঁচতে গেলে আমাকে বাঁচিয়ে রাখা চলবে না। এই সার কথাটা ও বুঝে গেছে। যার জন্য এই ডাস্ট্রিক এ্যাকসন ওকে নিতে হচ্ছে।

কিন্তু ও জানে না। কি ভুল ও করে ফেললো।

ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। একজন মাত্র ফোনে আমাকে নিয়ে যাবার কথা ওপরতলায় জানিয়ে দিল।

কথা শুনে বুঝলাম এতো সহজে ব্যাপরটা ঘটে যেতে পারে বিশ্বাস করতে পারছে না।

মনে হচ্ছে এই সবের কারিগর, নিরঞ্জনদার বোনের সেই হ্যাজব্যান্ড। আমলা বলে কথা।

শ্যাম, শিবু, দারুর মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। এতক্ষণে নেপলা খবর পাঠিয়ে দিয়েছে। আগুন জ্বলে যাবে চারপাশে।

অনাদি কার বুদ্ধিতে এটা করলো, ঠিক মাথায় ঢুকছে না। কাল রাতে তবু অর্ককে ফোন করে একটা আগাম আভাস দিয়েছিলাম।

গাড়িটা এসে থামতে চমকে তাকালাম। আমার পরিচিত জায়গা। মিঃ মুখার্জীর কাছে বহুবার এই বিল্ডিংয়ে এসেছি। শেষবার এসেছিলাম, রাজনাথের সেই তথাকথিত জঙ্গি ছেলেগুলোকে ধরতে।

একজন বেশ রুঢ় গালাগাল দিয়েই আমাকে গাড়ি থেকে নামতে বললো। একেবারে বাচ্চা ছেলে। বসের কথায় ভীষণ নাচানাচি করছে। খুব খারাপ লাগলেও এখানে মাথা গরম করা যাবে না। তাহলে সব ভেস্তে যাবে। আমাকে জানতেই হবে রাঘবনের এ্যান্টি লবির কোন লবিটা অনাদিকে সাহায্য করছে।

গাড়ি থেকে নিচে নেমে এলাম।

আমাকে এখন কেউ চেনে না। আঠারো বছর আগে অনেকেই আমাকে চিনতো।

মিঃ মুখার্জী যে ঘরে বসতেন সেই ঘরেই আমাকে নিয়ে আসা হলো। একজন নতুন মুখ মিঃ মুখার্জীর জায়গায় বসে আছেন। স্টাউট ফিগার। আরও দু-জন ঘরে ছিলেন। ঘরের চেহারাটা এই আঠারো বছরে অনেক বদলে গেছে।

আমাকে দেখে ভদ্রলোক হাসি হাসি মুখে উঠে দাঁড়ালেন।

আসুন মিঃ ব্যানার্জী।

হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। আমিও সৌজন্য সহকারে হাতটা বাড়িয়ে দিলাম।

আমি শৌণক লাহিড়ী, ইনি সুপ্রতিম চ্যাটার্জী, আর ইনি সতপাল রানা।

আমি এবার বুকে হাত দিয়ে নমস্কারের ভঙ্গিতে দাঁড়ালাম।

আপনারা এবার যান।

যারা আমাকে এই ঘর পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল তারা বিদায় নিল। আমি একবার ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম।

বসুন।

শৌণকবাবু বললেন।

বসলাম। আমার একপাশে সতপাল রানা, আর একপাশে সুপ্রতীম চ্যাটার্জী।

কি খাবেন, ঠান্ডা না গরম?

এতক্ষণ খুব গরমের মধ্যে ছিলাম, একটু ঠান্ডা খেয়ে শরীরটা জুরোই।

উনি হাসছেন। বেল বাজালেন।

আর দু-জন বেশ ভালো করেই যে আমাকে মাপছেন তা চোখ এড়াল না।

একজন দরজা ঠেলে ভেতরে এসে দাঁড়ালেন।

কোল্ড ড্রিংকস।

মনে মনে ঠিক করলাম প্রশ্ন না করলে কোনও উত্তর নয়। উত্তরটাও এমন ভাবে দিতে হবে যাতে পরের প্রশ্নটা করার ঝুঁকি এরা নেয়। না হলে বুঝতে পারবো না, এরা কোন লবির হয়ে কাজ করছে। বাকিটা শুধু দেখে যাওয়া। এমনকী জিজ্ঞাসাও করবো না কেন আমাকে এখানে নিয়ে আসা হলো।

আপনি খুব লেট রাইজার। বিদেশে থাকাকালীনও কি আপনার এরকম হ্যাবিট ছিল?

এটা খুব ছোটোবেলার অভ্যাস। অনাথ ছেলে।

আপনার বাবা-মা নেই!

ছিলেন, তবে মনে পড়ে না।

আপনার বাড়ি কোথায়?

নবদ্বীপ।

তাহলে ইস্ট মেদিনীপুরে আপনার কে থাকে?

আমার পালক পিতা। ছোট থেকে তাকে কাকা বলে ডাকি।

এনি ব্লাড রিলেশন।

এখনও খুঁজে চলেছি।

স্ট্রেইঞ্জ।

সেই ভদ্রলোক আবার ঢুকলেন।

ট্রের ওপর চারটে কোল্ড ড্রিংকসের গ্লাস। টেবিলে রেখে চলে গেলেন।

নিন।

এতো ঠান্ডা খাই না। একটু গরম হোক।

বাই দ্যা বাই মিঃ ব্যানার্জী একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো। সুপ্রতীমবাবু ঘারের কাছে নিঃশ্বাস ফেললেন।

বলুন।

আপনি শ্যাম, শিবু, দারু বলে কাউকে চেনেন?

দুম করে কথাটা ছুঁড়েই আমার চোখে চোখ রাখলেন।

কোথায় থাকে বলুন?

ভালোপাহাড়।

চিনি।

এরা একটা নিষিদ্ধ সংগঠন চালায়। যা ভারতে নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে।

ভারতের সাধারণ নাগরিক হিসাবে, আর একজন সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে আমার হৃদ্যতা আছে। সংগঠন করাটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। ওটা সরকার আর যে করছে সে বুঝবে।  তাছাড়া আমি যাদের এই নামে চিনি তারা এই নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে আদৌ যুক্ত আছে কিনা সন্দেহ।

কি করে বললেন?

একসময় মাঠে ঘাটে একসঙ্গে খেলেছি। সেই জায়গা থেকে বলছি।

আপনি যেমন পরবর্তীকালে একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক হয়েছেন, সেও একটা নিষিদ্ধ সংগঠণের মাথা হয়েছে।

ব্যাখ্যাটা আপনার ব্যক্তিগত, আমার মুখে বসাবার চেষ্টা করবেন না।

মিঃ লাহিড়ী, বহুত সরেস মাল। থুতু দিয়ে চিঁড়ে ভিঁজবে না। এবার মিঃ সতপাল রানা তরতর করে উঠলেন।

হাসলাম।

মিঃ লাহিড়ী আমাকে এখানে কতক্ষণ থাকতে হবে।

কেন?

তাহলে একটা ফোন করতাম।

কোথায়?

থাক।

না না আপনি করুণ। মিঃ লাহিড়ী ফোনটা এগিয়ে দিলেন।

না আপনাদের কাজ আগে শেষ করুণ।

আপনাকে কেন এখানে নিয়ে আসা হয়েছে আপনি কিছু জানেন?

কি করে জানবো। এটুকু বুঝলাম ধরে আনতে বলা হয়েছে। আমাকে বেঁধে আনা হয়েছে।

এবার দেখলাম মিঃ লাহিড়ী হাসলেন না। বেশ গম্ভীর।

আপনার সঙ্গে যে নিষিদ্ধ সংগঠণের যোগাযোগ আছে। আমরা তার খবর চাই।

কি করছেন কি বলুন তো লাহিড়ীবাবু, ঘা দু-চার পরলে এমনিই মুখ থেকে গড় গড় করে সব বেরিয়ে যাবে। আবার রানা চেঁচিয়ে উঠলো।

এবারও হাসলাম।

মিঃ রানা আপনি একজন সিনিয়ার অফিসার।

ওর বায়োডাটা আমি জানি মিঃ লাহিড়ী।

জেনে থাকতে পারেন। আপনার জানাটা শেষ কথা নয়।

আপনি আধঘণ্টা আমার হাতে ছেড়ে দিন, দেখুন যা চাইছেন তা বের করে দিচ্ছি।

লাহিড়ী খুব ঠাণ্ডা চোখে রানার দিকে তাকাল।

আমিও রানার দিকে তাকিয়ে।

রানা মনে হয় এইবার কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছে। চুপ করে গেল।

সুপ্রতীমবাবু তখনও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

আপনার গ্রাম যে থানার আণ্ডারে সেই থানার ওসি সুকান্তবাবুকে চেনেন।

চিনি।

আজ সকালে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছে।

এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

আপনি কিছুই জানেন না!

লেস ইন্টারেস্টেড।

তাকে গ্রপ্তার করা হয়েছে।

সে বুঝবে, প্রশাসন বুঝবে।

আপনাকে সাহায্য করার জন্য।

আবার একগাল হাসিতে মুখটা ভরিয়ে তুললাম।

আচ্ছা মিঃ ব্যানার্জী আপনি নীতিন বাজরিয়াকে চেনেন। মিঃ লাহিড়ী বললেন।

কে সেই ব্যাক্তি!

যার জন্য আপনি আপনার জীবনের আঠারোটা বছর নষ্ট করলেন।

দেখুন আমি সাধারণ ব্যবসায়ী। ব্যবসায়িক কাজ কর্ম নিয়েই থাকতাম। আমার….।

সজোরে একটা ঘুসি আছড়ে পরলো আমার মুখে, দড়াম করে একটা আওয়াজ, চেয়ার সমেত ছিটকে পরলাম। মাথার পেছন দিকটা প্রচণ্ড যন্ত্রণা করছে। চোখে অন্ধকার দেখলাম। কাঁচা কাঁচা খিস্তি কানে ভেসে এলো।

চোখ মেলে তাকালাম। মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা। চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে। ঠোঁট নাড়তে পারছি না। আমাকে কিছু দিয়ে যেন বেঁধে রাখা হয়েছে। একবার ঘরটার চিরদিকে তাকাবার চেষ্টা করলাম। দেখলাম মেসিনে ভর্তি। একটা মেয়ের মুখ আমার চোখের সামনে নেমে এলো চিনতে পারছি না।

মেয়েটা হাসছে। মাথায় কি যেন একটা লাগানো। পোষাক দেখে মনে হয় নার্স।

আমি কোথায়? তাহলে কি নার্সিংহোম কিংবা হাসপাতালে!

মেয়েটা ছুটে বাইরে চলে গেল। আবঝা একটা শব্দ কানে ভেসে এলো। ডা. সামন্ত।

মাথাটা যন্ত্রণা করছে। চোখ বন্ধ করলাম। আবার খোলার চেষ্টা করলাম।

সারাটা ঘর আমার চোখের সামনে অন্ধকার অন্ধকার লাগছে।

আপনি ভুল দেখেছেন।

না স্যার বিশ্বাস করুণ।

লাখে একটা এই পেসেন্টের সেন্স ফেরে।

বিশ্বাস করুণ উনি চোখ মেলে তাকিয়েছেন, চারদিকে চেয়ে চেয়ে দেখলেন।

স্যার আমি বরং বসছি।

মনে হচ্ছে কনিষ্কর গলা।

না ওর পরিচিত কেউ এখানে থেকো না। অতর্কিত তোমাদের কাউকে দেখলে লস অফ মেমারি হয়ে যেতে পারে। এতো বড়ো অপারেসনটার ধাক্কা ওর শরীর সামলে নিতে পারেনি। এই মুহূর্তে আমি কোনও রিক্স নিতে পারছি না।

ঠিক আছে আমি মনিটরিং করছি।

কেন জেদ করছিস কনিষ্ক। ডাক্তারি শাস্ত্রে ইমোসনের কোনও জায়গা নেই। ও এখন আমাদের পেসেন্ট। এই অবস্থা থেকে ওকে রিকভার করে তোলাই আমাদের একমাত্র কর্তব্য। শেষ নিঃশ্বাসটুকু পর্যন্ত তোকে লড়তে হবে। পেথিডিন কখন দিয়েছিস?

দুপুরে একবার চার্জ করেছি।

মাথায় কখন ড্রেসিং করেছিস?

সকালে করেছি।

কিরকম দেখেছিলি।

যা চেকিং করতে বলেছেন সব করেছি। নর্মাল।

মাথার ইনজুরিটা।

ড্রাই হয়ে এসেছে।

ওষুধগুলো শরীরটা ঠিক ঠাক নিচ্ছে এটাই রক্ষে। নিজে বোঝতো কতোটা টাফ কন্ডিসন থেকে রিকভার করার আপ্রাণ চেষ্টা করছি।

বুঝি স্যার মন যে মানে না।

ওরা কথা বলে চলেছে আমার কানে আর কোনও কথা ঢুকছে না।

আমি যেনো অনেক পথ ঘুরতে ঘুরতে হাঁপিয়ে উঠেছি। একটা বিশাল অশ্বত্থ গাছের তলায় এসে বসেছি। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। পাখিরা যে যার সব ঘরে ফিরে যাচ্ছে। একটা কিচির মিচির শব্দ। ক্লান্ত শরীরটা আবেশে এলিয়ে পরেছে।

কিচ্ছু ভালো লাগছে না। যেন মনে হচ্ছে। এইখানে এই ঘাসের বিছানাতে শুয়ে একটু ঘুমিয়ে পরি। টান টান হয়ে শুয়ে পড়লাম।

মাথার ওপর খোলা আকাশ। গাছের ডালে পাখিরা এসে বসছে। ডানার ঝাপটানি।

কিরে আমার জায়গায় টান টান হয়ে শুয়ে আছিস কেন। ওঠ।

ঘুমটা ভেঙে গেলো। সেই পক্ককেশ বৃদ্ধ। পরনে সাদা ধপধপে আলোয়ান।

মস্তানি। দিয়েছে এক ঘুসিতে কাত করে।

উঠে বসলাম, চারদিকে ঘন অন্ধকার। এক ফালি চাঁদ আকাশে উঁকি মেরে আমার দিকে তাকাল। যেন আমার এই অবস্থা দেখে মুচকি মুচকি হাসছে। তার আলোর ছটা বুড়োর চোখে মুখে। কি অসীম সুন্দর মুখ খানা। চাঁদের রূপকেও যেন হার মানায়।

বুড়ো ধব ধবে একটা কাপর পেতে বসলো।

আমি চেয়ে চেয়ে বুড়োকে দেখেই চলেছি। চোখের তৃষ্ণা যেন আর মেটে না।

তুই ভীষণ ক্লান্ত যা বাড়ি চলে যা।

একটু বসি। আপনার সঙ্গে ভীষণ কথা বলতে ইচ্ছে করছে।

কি কথা বলবি—

এতদিন আমি যা কিছু করলাম সব কি অন্যায়?

না তুই জ্ঞানতঃ ঠিক কাজ করেছিস, কিন্তু তোর সব কাজ তো সাধারণ মানুষে মেনে নেবে না। তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলেই তারা প্রত্যাঘাত করবে।

চুপ করে রইলাম।

তোর একটাই সমস্যা বুঝলি—

বলুন।

তুই ভীষণ আবেগ তাড়িতো হয়ে কাজ করিস।

আবেগ না থাকলে কাজ করবো কি করে? আবেগই তো ভালো কাজ করার মূল মন্ত্র—

ঠিক কথা। আবেগটাকে আরো রুঢ় বাস্তবে নামিয়ে আনতে হবে।

অন্যায়টাকে অন্যায় বলা অপরাধ?

মোটেই না। তবে সোজাসুজি নয়। তোকে প্রথমে একটা ব্যুহ্য রচনা করতে হবে।

যথা সাধ্য চেষ্টা করি।

সামান্য ফাঁক থেকে যায়। ওটাও রাখা চলবে না।

বুড়ো কিছুক্ষণ চুপ থাকলো।

মহাভারতের কৃষ্ণকে দেখেছিস। যাকেই মনে করেছে বধ করবো, করেছে। কিন্তু কি ভাবে। একটু পড়াশুনো কর দেখবি, সেই লোকটাকে দিয়ে আগে অন্যায় কাজ করিয়ে নিয়েছে। তারপর সেই অন্যায়ের আধারে সে অর্জুনকে দিয়ে একে একে বধ করেছে।

অর্জুন যখন বলেছে না আমি এ কাজ করতে পারি না। তখন তিনি বলেছেন এই ব্যক্তি তোমার এই এই ক্ষতি করেছে। ওই ব্যক্তি তোমার ওই ওই ক্ষতি করেছে। কৃষ্ণ কিন্তু সব জানতো। ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে। এটা রাজনীতি। এই রাজনীতি তোকেও করতে হবে।

চুপ করে রইলাম।

আর একটা কথা তোকে বলি।

বুড়োর মুখের দিকে তাকালাম। চাঁদের আলোয় চোখ দুটো ভীষণ উজ্জ্বল।

ছেলে-মেয়ে দুটো বড়ো ভালো, ওদের দিকে একটু নজর দে।

চোখ মেলে তাকালাম। আমার মুখের কাছে মেয়ের মুখ। চোখ দুটো ছল ছলে। হাসার চেষ্টা করলাম। কতটা পারলাম জানি না।

কষ্ট হচ্ছে। মেয়ের গলাটা ধরা

কথা বলতে পারছি না।

চোখের ইশারায় বললাম সামান্য।

কোথায় কষ্ট হচ্ছে।

চোখের ইশারায় বললাম মাথায়।

কার সঙ্গে কথা বলছিস!

মিত্রা ঘরে এসে দাঁড়াল।

চোখে চোখ পড়তেই কাপরটা মুখে চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো।

কনিষ্ক, নীরু ঘরে ঢুকে মিত্রাকে বাইরে বার করে নিয়ে গেল।

মেয়ে আমার বুকে হাত রেখেছে।

আমি হাতটা নাড়াবার চেষ্টা করলাম পারলাম না।

মেয়ে নিজের হাতটা আমার হাতের ওপর রাখলো। মেয়ের ছোঁয়ায় যেনো নতুন প্রাণ ফিরে পাচ্ছি। একটা অদ্ভূত অনুভূতি সারাটা শরীরে।

হাতটা মনে হয় বাঁধা আছে। সামান্য কেঁপে উঠলো।

চোখ দিয়ে মনে হয় জল গড়িয়ে পড়ছে। মেয়ে একটু তুলো নিয়ে মুছিয়ে দিল।

ডাক্তারদাদা ঘরে এলো। চোখে মুখে এক বোঝা কালি কেউ লেপে দিয়েছে।

আমাকে দেখে হাসলো। আমিও হাসার চেষ্টা করলাম।

আমাকে চিনতে পারছিস।

মুখে কথা বলতে পারছি না। চোখে কথা বলছি।

যাক বাঁচালি। একুশ দিনের লড়াইটা সার্থক।

হাতটা নাড়াবার চেষ্টা করলাম।

কনিষ্ক হাতটা খুলে দে।

কনিষ্ক হাতের বাঁধনটা খুলে দিল।

ওর হাতটা চেপে ধরলাম। কেঁদে ফেললো।

কনিষ্ক। ডাক্তারদাদা চেঁচিয়ে উঠলো।

কনিষ্ক দাঁড়াল না। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

পায়ের কাছে নীরু মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে। চোখ মুখ কেমন বসে গেছে। সেই ঝকে ঝকে মুখটা কেমন উধাও।

কথা বলার চেষ্টা করলাম পারছি না। মনে হয় ঠোঁট নড়ছে গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না।

হাত দিয়ে ইশারা করলাম।

পেন কাগজ। ডাক্তারদাদা বললো।

চোখের ইশারা করলাম। হ্যাঁ।

নীরু বেরিয়ে গেল। মেয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। মায়ের থেকে অনেক শক্ত। চোখ ছল ছল করছে ঠিক, কিন্তু কাঁদছে না। কপালের শিরাগুলো সামান্য ফুলে ফুলে রয়েছে।

আমার কপালে হাত রাখলো। চোখ বন্ধ হয়ে এলো।

মনে হয় সারা মাথা মুখ ব্যান্ডেজ দিয়ে মুড়ে দেওয়া।

নীরু পেন কাগজ নিয়ে এলো। ধরতে পারলাম না। কেমন জানি জোর পাচ্ছি না। আঙুল দিয়েই লিখে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, বড়োমা।

খবর পাঠিয়েছি আসছে। ডাক্তারদাদা পাশে চেয়ারে বসলো।

মাথাটা নাড়াবার চেষ্টা করলাম।

এখন না। এই বুড়ো বয়সে অনেক যুদ্ধ করলাম। আর কয়েকটা দিন সুযোগ দে।

বাইরে একটা কান্নার রোল কানে এলো। ডাক্তারদাদার মুখটা বিরক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো।

নীরু।

হ্যাঁ স্যার।

এখানে ওসব করতে বারণ কর। একজন একজন করে ঘরে ঢুকবে। কোনও কথা বলতে পারবে না। এই মুহূর্তে মেশিনগুলোর রিপোর্টিং চেক কর। আমার এ্যানালাইসিস করতে লাগবে।

ঠিক আছে স্যার।

নীরু মনে হয় পর্দা সরিয়ে একবার দরজার কাছে দাঁড়াল। কাকে ইসারায় কিছু বললো।

আর একটা কাজ কর।

বলুন।

আমাদের টোটাল টিমটাকে একবার ডেকে পাঠা।

আচ্ছা স্যার।

নীরু আবার বাইরে উঁকি মেরে কনিষ্ককে বললো।

আমি দরজার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছি।

তুই ঠিক আছিস।

চোখের সঙ্গে এবার একটু ঘাড়টা নাড়ালাম।

একবারে নয়। ডাক্তারদাদা উঠে দাঁড়াল।

মা রে তুই একবার বাবার ওপাশ দিয়ে গিয়ে ওই হাতটা খোল তো। দেখিস চ্যানেলগুলোয় যেন হাত না পরে।

মেয়ে মাথার শিয়র দিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়াল। মনে হচ্ছে বাম হাতের থেকে ডানহাতটা অনেক বেশি হাল্কা। জোরটাও অনেক বেশি পাচ্ছি।

বড়োমা, ছোটোমা, দামিনীমাসি, বৌদি ঘরে ঢুকলো। চোখগুলো সব ফোলা ফোলা। চোখের পাতা এখনও জলে ভিঁজে আছে। আমি একদৃষ্টে ওদের দিকে তাকিয়ে আছি।

ডাক্তার অনি কথা বলবে না। বড়োমার গলা বসে গেছে।

বলেছি না কোনও কথা নয়। শুধু দেখবে আর বেরিয়ে যাবে। ডাক্তাদাদা ধমকে উঠলো

চোখের ইশারায় কাছে ডাকলাম।

বড়োমা আমার ডানহাতটা চেপে ধরলো।

ফুঁপিয়ে উঠলো।

শ্যাম আমার পায়ে হাত দিয়ে শপথ করে গেছে। তুই চোখ না খুললে ওদের কাউকে বাঁচাবে না।

চলবে —————————



from বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড https://ift.tt/4qeJ28d
via BanglaChoti

Comments